Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi » Page 4

সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi

টুসকি বলল, পিসিদের বাড়িটা কি ব্যাক ডেটেড্ দেখেছিস ছোড়দা? পয়সাকড়ি তো যথেষ্টই আছে, পিসের ভাইগুলোও নেহাৎ আজেবাজে নয়, একটা তো নাকি ইঞ্জিনীয়ারও। কিন্তু আজ পর্যন্ত বাড়িতে ফোন আনল না। কী যে মুস্কিল! একটু খবর নিতে দরকার হলে ছোটো সেই বেলেঘাটায়।

শিলাদিত্য বলল, পিসি তো বলে, কত বছর ধরে নাকি চাইছে, পাচ্ছে না।

ছাড় তো! টুসকি ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, ‘পাচ্ছে না’! পাবার ঢের কলকৌশল আছে বাবা। সেই কলকাঠিটি নাড়লেই আজ বললে কাল দেবে।

শিলাদিত্য বলল, তোকে এসব জ্ঞান কে দিচ্ছে? যুধাজিৎ বুঝি?

ভাগ। তোর যুধাজিতের তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, তাই তোর পিসির বাড়ির টেলিফোন নিয়ে আলোচনা করতে বসবে। নেহাৎ দু’দিন তোর সন্ধানে এসে, তোকে বাড়িতে না পেয়ে দয়া করে আমার সঙ্গে দুটো কথা কয়েছিল। তো সেইটুকুর মধ্যে কি টেলিফোন প্রসঙ্গ উঠবে?

আরে বাবা আড্ডার মেজাজের সময় যে কোন প্রসঙ্গ এসে পড়ে! তাহলে এসব জ্ঞানট্যান পাচ্ছিস কোথায়? কোথায় কী কলকাঠি নাড়তে পারলে, কী হয় না হয় জানলি কোথা থেকে?

আহা রে ছোড়দা! আর নেকু সাজতে হবে না। এইমাত্র পৃথিবীতে পড়লাম, না? চোখকান খুলে রেখে পৃথিবীটাকে রীতিমত যাকে বলে ‘অবলোকন’ করা। তাই করে আসছি বুঝলি? এই তো আমার বন্ধু কাকলীর ছোট কাকা, দুদিনে একখানা টেলিফোন বাগালো।

আরেব্বাস। তোর ওই লক্কাপায়রা বন্ধুটির বাড়িতে এতোদিনে ফোন? ওকে দেখলে তো মনে হয় সিনেমার নায়িকাদের মতো সবসময় সোফায় গা গড়িয়ে লম্বা লম্বা রঙিন নোখওলা আঙুলকটি দিয়ে রিসিভারটাকে কাছে টেনে এনে, ফোন ধরে শুধু বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে প্রেমালাপ করে।

মার্ভেলাস! আমার বন্ধুকে এতো খুঁটিয়ে কখন দেখলি রে দাদা? লক্ষণ তো ভালো নয়। ওঃ তোর ওই ন্যাকা মার্কা বন্ধুটি সম্পর্কে যে দেখছি তোর খুব উচ্চ ধারণা? লক্ষণ ভালো নয়? ওকে দেখলেই আমার হাসি পায়।

হাসি পায়? কেন? হাসিটা কী দেখে?

আগাগোড়াই দেখে। যেন একটা রঙচঙে ডল পুতুল। এসব মেয়েদের দিয়ে কিস্যু হয় না। কেবলমাত্র বড়লোকের বাড়ির শো-কেসেই মানায়। তোর মতন একটা ঘটির সঙ্গে যে কী করে এতো ভাব হলো তাই ভাবি।

কার সঙ্গে যে কার কী করে ‘ভাব’ হয় তার হিসেব কষবি তুই? তাহলে মার রাঙাদার বাড়ির সেই মেয়েটার কথা মনে ভাব? ওই রাঙাদার দূরসম্পর্কের ভাইঝি না ভাগ্নী কে যেন? সাদা বাংলায় আশ্রিতা। নেহাৎ গাঁইয়া মার্কা! সাত-চড়ে রা নেই! আমি তো বলতাম পুঁটুরানী। দেখতেও এমন কিছু আহামরি নয়। ভাতের দাম উসুল করতে মামার সংসারে রাতদিন গাধার মতো খাটতো। তার সঙ্গে কিনা লটকে গেল খোদ মামীর আমেরিকা ফেরৎ হীরের টুকরো বোনপোটি। ব্যাস! সেই পুঁটুরানীর এখন আমেরিকায় বসবাস। এখন নাকি নিজের হাতে গাড়ি চালায়, শহর চষে বেড়ায়। ভেবে দ্যাখ তাহলে? কার সঙ্গে কী করে ভাব হয়। হয়তো ভবিষ্যতে এমনও দেখতে পাবি ওই কাকলীই কোনো বোষ্টম বাড়ির ছেলের প্রেমে পড়ে স্রেফ বিশুদ্ধ হিন্দুনারী মার্কা সাজ সেজে ঠাকুরপুজোর চন্দন ঘষছে। কিংবা নয়তো—একটা হাড় গরীব বেকারের সঙ্গে লটকে পড়ে তাঁদের ভাঙ্গাচোরা দুখানা ঘরের বাসায় গিয়ে কোমরে আঁচল জড়িয়ে রাঁধছে, বাসন মাজছে, কাপড় কাচছে।

তার মানে, মেয়েরা বহুরূপী।

ভাগ, চাষার মতো কথা বলিস না। আমার ভাষায় মেয়েরা হচ্ছে শতরূপা’। যে কোন পরিবেশে বিকশিত হয়ে তাক লাগিয়ে দিতে পারে। যাকগে। … তবে মেয়েদের সম্পর্কে কখনো চট করে কোনো মন্তব্য করে বসিস না। আর মেয়েদের তত্ত্ব বোঝবার চেষ্টা করিস না। ব্যাপারটি হচ্ছে ‘অকূল সমুদ্র’। তবে হ্যাঁ, যে কথাটা হচ্ছিল, কাকলীদের বাড়িতে টেলিফোন এই নতুন নয়। ওর জন্মাবার আগে থেকেই আছে। এটি হচ্ছে ওর ‘ছোটকাকা স্পেশাল’। ওই ছোটকাকা হঠাৎ তার ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে দিয়ে দারুণ লাভজনক কী একটা বিজনেসে নেমেেেছ, বাড়ির একখানা ঘরকে অফিস ঘর বানিয়ে ফেলে জাঁকিয়ে বসেছে। সেই অফিসের জন্যেই টেলিফোন। তো বলল, দুদিনের মধ্যে পেয়ে গেছে।

তা পেতে পারে। ঘুষের কারবারে সবই সম্ভব। তো বিজনেসটা কিসের?

সে জানি না। তবে কাকলী বলল, ছোটকাকা তার শোবার ঘরে বিছানার মাথার কাছে একখানা লক্ষ্মীঠাকুরের ছবি টাঙিয়ে রেখেছে, কালীঘাটের পট মার্কা। সেই ছবির তলার ক্যাপসান—’বাণিজ্যে বসতিঃ লক্ষ্মী’। তো তোর বন্ধু ওই যুধাজিৎও তো সেই আদর্শে বিশ্বাসী।

শিলাদিত্য একটা নস্যাৎ করা ভঙ্গীতে কাঁধ নাচিয়ে বলে, ‘বিশ্বাসী’ সবাই। তবে ক্যাপাসিটি থাকা চাই আর মূলধন থাকা চাই হে।

ক্যাপসিটি যে কার মধ্যে কী আছে, মাঠে না নামলে কী বোঝা যায় রে ছোড়দা? চোখ বুজে একবার মাঠে নেমে পড়ে দেখতে হয়। তোর ওই যুধাজিৎ তো তোকে খুঁজতে আসে ওই পরামর্শের জন্যেই। তোকে তার বিজনেসের পার্টনার করতে চায়।

শিলাদিত্য বোকা নয়। মনে মনে একটু মুচকি হাসলো। উৎসাহটা কিসের? আমাকে বিজনেসের পার্টনার করতে, না তোকে লাইফের পার্টনার করতে? ঘনঘন আসার একটা ছুতো দরকার তো?

মুখে অবশ্য তখন বলল না, বলল, আমার বাবা ওসব ঝামেলার ব্যাপারে মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করে না। শাঁসালো একখানা চাকরি জোটাতে পারলে দিব্যি হেসে খেলে কাটিয়ে দেওয়া যাবে।

শাঁসালো একখানা চাকরি। রঙিন স্বপ্ন! ওই স্বপ্নেই বিভোর থাক। আমার মতে তোর একটু এ নিয়ে ভাবা উচিত। দাদাটা তো হিসেবের বাইরে। ওর ওপর সংসারের কোনো প্রত্যাশা নেই। তুই যদি বেশ ‘একখানা’ না হতে পারিস সংসারের ভবিষ্যৎটা কী?

শিলাদিত্য একটু স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, তোর হঠাৎ এমন সংসার চিন্তা? ব্যাপারটা কী?

ব্যাপার আবার কী! চেতনা থাকলেই চিন্তা আসে।

মনে হচ্ছে চেতনাটি যেন হঠাৎই গজিয়েছে! তা যাক! ও নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এখন হঠাৎ পিসির বাড়ির খবরের ধান্ধা কেন শুনি?

আর বলিস না। সাতজন্মে তো আসে না পিসি। ‘সংসার’ নিয়েই মত্ত। বুড়ো মা-বাপকে একবার আধবার দেখতে আসা যে কর্তব্য তাও ভাবে না। তো বৃদ্ধা মহিলাটি নাকি গতরাত্রে কী স্বপ্নটপ্ন দেখেছেন, তাই বেশ কাতর।

স্বপ্ন! কী স্বপ্ন!

কী স্বপ্ন তা কী আর বলেছে আমায়? এমনি নিজের মনেই বলছিল, ‘কাল ভোররাতে টুনুরে স্বপন দেখলুম। মনটা যেন কেমন উথালপাথাল করছে।’ তাই মনে হলো, ফোন থাকলেই এখুনি একটা খবর নিয়ে ফেলে ওই উথালপাথালকে সামাল দেওয়া যেতো। বেচারী বুড়ি!

শিলাদিত্য একটু অপ্রতিভভাবে বলে, আমারও একবার ওনাদের ওই ওপরতলার ঘরে যাওয়া হয়ে ওঠে না। বৃদ্ধাকে তো তবু খাওয়ার সময়টময় একটু দেখা যায়। বুড়ো ভদ্রলোককে তো—

মনে করতে পারল না শিলাদিত্য, কতদিন হয়ে গেল দাদুর সঙ্গে দেখা হয়নি। নাঃ, এক আধবার ওপরে যাওয়া দরকার!

আর ওই রকম মনো দুর্বলতার বশেই বোধ হয় চট করে একটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসল, আচ্ছা—দেখি, যদি আজ একবার বেলেঘাটায় যেতে পারি।

তারপরেই বলল, আগে পিসিরা বেশ কেমন কাছাকাছি ছিল। ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে পিসির বাড়ি বেড়াতে যাওয়াটা তো প্রায়ই ছিল। মনে আছে তোর?

মনে আর থাকবে না কেন? বেলেঘাটায় তো গেছে পিসিরা বড়জোর বারো তেরো বছর। তার আগের স্মৃতিটা কী ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে? সত্যি, বেশ তো ছিল! কী যে হলো!

শিলাদিত্য বলল, “ছিল’ তো বেশ! সেটা থাকতে পেল কই? কোথা দিয়ে যে কী হয়ে গেল! কী একখানা বাড়ি ছিল পিসিদের, মনে আছে? গেলেই মনে হতো বিয়েবাড়িতে এসেছি। সর্বদা গমগম করছে। পিসি শুনলে হেসে হেসে বলতো, এদের এই বাড়িটা রোজই বিয়েবাড়ি। যখন ইচ্ছে চলে আসিস, দেখবি—খাবার রেডি। আসিস না? কাছেই তো।

কথাটা সত্যি।

সত্যব্রত একটু চেষ্টাতেই বেশ কাছেপিঠেই মেয়ের জন্যে ‘সম্বন্ধ’ পেয়ে গিয়েছিলেন। যেমন তেমন ‘সম্বন্ধ’ নয়, একেবারে দুর্দান্ত। মেয়ের রূপের জোর ছিল বলেই অবশ্য অতো সহজে মানিকতলার মুখুয্যে বাড়িতে মেয়ে দিতে পেরেছিলেন উদ্বাস্তু হয়ে আসা সত্যব্রত। বিশাল বাড়ি, বৃহৎ পরিবার। দু’বেলায়—ফেলে ছড়ে শতখানেকের ওপর পাত পড়ে। না হবে কেন? মেয়ের শ্বশুররাই তো পাঁচ পাঁচটি ভাই একত্রে। আর তাদের প্রত্যেকের ওপরই মা ষষ্ঠীর কৃপার পরাকাষ্ঠা। বাদে বড়কর্তা। তিনি নিঃসন্তান, অকালে বিপত্নীক। বাকি চারজনের? এক একজনের গোটা সাত-আট করে।

সত্যব্রতর বেহাইটি ভাইদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। তা তাঁরও তো ছেলেমেয়ে মিশিয়ে পুরো আটটি!

ফুটপাতের ওপর। মোটা মোটা থাম বসানো, তার ওপর ভর করে মস্ত গাড়িবারান্দা।

সাবেকি ধরনের গ্রীল। তিনতলার ওপর সারি সারি বড় বড় ঘর। উঁচু উঁচু জানলা, শার্সি, খড়খড়িদার।

তাকালেই বেশ সমীহ আসে। যদিও কালের প্রলেপে তখনই বাড়িতে খানিকটা জীর্ণতার ছাপ পড়েছিল। তবু কথায় বলে, মরা হাতি লাখ টাকা। এখন থেকে চারপুরুষ আগে সেই কোন এক মুখুয্যে যুবক রংপুর থেকে কলকাতায় চলে এসেছিলেন ভাগ্য ফেরাতে, এবং ফিরিয়েও ছিলেন। তারই ফলশ্রুতি ওই মস্ত তিনতলা প্রসাদতুল্য বাড়ি। আর তাঁর পরবর্তী জন বাড়ির সংলগ্ন জমিতে ভালোমতো একটি প্রেস বসিয়েছিলেন। সেই পরবর্তী জনই ছিলেন এদের পিসির শ্বশুর।…রংপুরের রং-এর স্মৃতি তাঁর মনের মধ্যে ছিল না। কারণ সেখানে তাঁর কোনো দানই ছিল না। তিন পুরুষের এই বসবাসের ফলে, উত্তর কলকাতার বনেদিয়ানার কালচারটিই তাঁদের রপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

বাড়িতে মেয়ে-পুরুষ মিলিয়ে গোটা পাঁচ-ছয় কাজের লোক (তখন অবশ্য ‘কাজের লোক’ বলার রেওয়াজ ছিল না)। সব খাওয়াপরা, রাতদিনের। সবকটারই এ বাড়িতে কাজ করতে করতেই চুলে পাক ধরে গেছে। কারো বা চুলে চুনকাম। এরা মনিব বাড়িকে ‘আপন বাড়ি’ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না, মনিবের ছেলেমেয়ে নাতি-পুতিদের প্রাণতুল্য দেখে। সেবাযত্ন তো করেই, শাসন করতেও ছাড়তো না। এবং বলা বাহুল্য, তাতে মনিবানীরা ‘প্রেষ্টিজ’ হানি হলো বলে গোঁসা করতেন না। বরং পরে ছেলেমেয়েদের বলতেন, হয়েছে তো? দুষ্টুমির ফল ফলেছে তো? আর যার কাছেই যা হোক, ওই ‘নন্দদা’ আর ‘বিন্দাবন’দার কাছে পার পাবে না বাবা।

নন্দ আর বৃন্দাবন দুই খুড়ো আর ভাইপো। কিন্তু ছেলেদের কাছে সম্বোধন ক্ষেত্রে দু’জনেই দাদা। তা আগের দিনে পয়সাওলা লোকেদের বাড়ির দাসদাসী, দারোয়ান, মালি, এখন স্বজন-পোষণের ঢালাও কারবারই করতো।

বেশ কিছুদিন কাজ করে শেকড় বসে গেলেই দেশ থেকে একটা বালখিল্য ভাইপো ভাগ্নে এনে হাজির করতো। বলতো যে ক’দিন না চাকরি জুটিয়ে দিতে পারছে, এখানেই কিছু ফাইফরমাস খাটুক, দুবেলা দু থালা ভাতের বিনিময়ে। অতঃপর দেখা যেতো কেমন করে যেন সেই সংসারেই তার চাকরি পাকা হয়ে গেছে!

দাসীরাও ওই একই শর্তে এনেছে বিধবা বোনঝি। ঘরে নেয় না এমন ভাইঝি, বা মা-বাপমরা একটা পাড়াপড়শীরই মেয়ে। ঠিকই তারা সেই সংসারেই অপরিহার্য হয়ে যেতো। না যাবে কেন? তাদের হিতাকাঙ্ক্ষিণী মাসি কি পিসি তো ভরা বয়েসের মেয়েটাকে চোখ ছাড়া করে যে-সে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিতে পারে না? অতএব কাছেই থাক।

তা টুনির শ্বশুরবাড়িতেও তখন এরকম কেস ছিল কিছু।… আর শ্বশুরবাড়ির হালচাল ধরনধারণ? সে তো বলাই হয়ে গেছে। স্থানীয় কালচারটি সম্পূর্ণভাবেই মজ্জাগত হয়ে গেছল। বাড়িতে অত জায়গা থাকতেও কর্তারা শীতের দিনে বাড়ির বাইরের রোয়াকে খেঁটে ধুতি অথবা গামছা পরে ডলে ডলে তেল মাখতেন, বেলা দুটোর আগে ভাতে বসতেন না এবং রাতে এগারোটার আগে নয়। খাওয়া মাখায় ছিলেন যাকে বলে রাজসই।

দেশভাগের পর চার বছরের মেয়েটাকে নিয়ে চলে এসেছিলেন সত্যব্রত, সেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন তার পনেরো বছর বয়েসে…তখন বাজারদর এমন কিছু মাখন মাখানো বা মাটিতে লুটোনা নয়। দিনদিন উঁচুতেই উঠেছে সে দর! কিন্তু সাবেকি ব্যবস্থাটি এতটুকুও টসকায়নি। তখনো নিত্যদিনের কাঁচাবাজার আসতো ঝাঁকামুটের মাথায় চাপিয়ে। মানিকতলা বাজারের এক বিশেষ মেছো বরাদ্দমাফিক সক্কালবেলাই একখানা দশ-বারোসেরি রুই কী কাতলা নিয়ে এসে ধড়াস করে গেরস্থর উঠোনে ফেলে নিজের আনা বঁটিতে চক্ষের নিমেষে ঘ্যাস ঘ্যাস করে কুটে মাছের খামি ‘গণ্ডা’ হিসেবে গুনে একধারে থাক করে রেখে ল্যাজা মুড়ো তেল ডিম কানকো কাঁটাদের ভব্যিযুক্ত করে গোছ করে রেখে বিদায় নিতো। মাসিক বন্দোবস্তের ব্যাপার। সক্কালবেলা গেরস্থপোষা মাছটা এসে না পড়লে ইস্কুল অফিস সামাল দেওয়া যাবে কী করে? মেছো চলে যাবার পর নিঃসন্তান আর অকালে বিপত্নীক সেই বড়কর্তা অর্থাৎ টুনির জ্যাঠশ্বশুর ধীরেসুস্থে চাকর নিয়ে বাজারে বেরোতেন অন্যান্য মাছের সন্ধানে। এক এক ভাইয়ের রুচি পছন্দ হিসেব করে দৈনিক চার-পাঁচ রকম মাছ ছিল তাঁর অবশ্য আনিতব্য।

রেলের চাকরি করতেন ভদ্রলোক, তখন রিটায়ার করেছেন, অগাধ অবসর। সেই অবসরটি বাজারদোকান ঘুরে সংসারের মনের মতো রসদসংগ্রহ করতে ব্যয় করার থেকে সময়ের সদ্ব্যয় আর বেশী কী হতে পারে? তাছাড়া বাড়িতে যদি খানিকটা করে নিয়েই না আসা হবে, তো বাজার ভর্তি ইয়া বড় বড় বাগদা চিংড়ি, গলদা চিংড়ি, রুপো ঝকঝকে ইলিশ, ডিমভর্তি মস্ত মস্ত ট্যাংরা, বাটা, পার্সে, লাফাই-ঝাঁপাই কই মাছ, পুরুষ্টু ভেটকি, সরপুঁটি, চিতল এবং মৌরলা সোনাখড়াকেরা বাজার আলো করে বসে আছে কেন? … তাছাড়া শীতের সময় পেল্লায় হাত-পা-ওয়ালা রাক্ষুসে গলদা, অথবা মোটাসোটা দাঁড়া কাঁকড়ারাই বা আসে কেন বাজারে? …যে সময়ের যা, গেরস্থ তার স্বাদ পাবে না?…ওটা গেরস্থর নিয়ম।…তবে? নিয়ম অনুযায়ীই আমের সময় ঝোড়াঝোড়া ল্যাংড়া, বোম্বাই, হিমসাগর, আবার জনগণের জন্যে কিছু অনামী আম এসে পড়বে না বাড়িতে? লিচুর সময় লিচুর ঝাড়, কাঁঠালের সময় কাঁঠাল?

দিনকাল যে পাল্টাচ্ছে বাজারদর যে ক্রমেই ওপরদিকে উঠছে, এ খেয়াল আসতো না বড়দা মৃগাঙ্ক মুখুয্যের। সেটা খেয়াল করিয়ে দেবার সাহসও আসতো না অন্য ভাইদের অথবা বড় হয়ে ওঠা ভাইপোদের। সাহস যা কিছু—চিরকালের বালবিধবা পিঠোপিঠি দিদি নিরুপমা দেবীর। তা তিনিই বা আর কী বুঝ দেবেন? তিনিও তো নিজ ক্ষেত্রে সমান অবুঝ। তাঁরও তো তখনো বাৎসরিক আমের মোরব্বা বানাতে দশ সের চিনি বরাদ্দ। এছাড়া আরো বহুবিধ আচারের পার্ট ছিল তাঁর। ডালাডালা তেঁতুল, ঝুড়িঝুড়ি কুল আরো কত কীই আচারে পরিণত হতো।

কিন্তু সংসারের সদস্যর সংখ্যা হিসেব করলে এসব যে খুব ‘বেশি’ উপচে পড়া হতো তা তো আর বলা যায় না? তাঁর ঠাকুরঘরে বিশেষ দিনে একটা ভোগ দিতে হলেও তো বারকোষ বোঝাই মিষ্টি চাই! মাথাপিছু একটা তো দিতেই হবে সবাইকে। বড়দের কিছু স্পেশাল। মৃগাঙ্কর হিসেবেও তাই! মাথাপিছুর হিসেব করলে একজোড়া গলদা কী এমন? তবু ছুঁচ আর চালুনির কাহিনির মতই নিরুপমা বলতেন, হ্যাঁরে মৃগু, বাবার আমলের বাজারদর আর আছে? তাই এখনো সেই স্টাইল চালিয়ে যাচ্ছিস? হাত একটু ছোট করতে শেখ?

মৃগাঙ্ক অবলীলায় বলতেন, ছোটো করতে শিখব? কী যে বলিস দিদি? বলি সংসারের ক্রমশ ডালপালা বাড়ছে না? সে হিসেবে তো আরো বাড়াবারই কথা। সেটাই ওঠা যাচ্ছে না বাজার খারাপ হয়ে পড়ায়। এই যে কালকের হিমসাগর আমগুলো? দেখতেই একঝোড়া এলো, সকলের আস্ত এক একটা কী কুলোলো? কুলোয়নি, আমার হিসেব আছে।

নিরুপমা বকে উঠে বলেন, তা ওই হাতি হাতি আম বাচ্চা ছেলেপুলেরাও গোটা গোটা খাবে?

বাঃ। খাবে না? আম তো ছেলেপুলেরই খাদ্য। আমরা ছেলেবেলায় কত খেয়েছি ভেবে দ্যাখ? এক একদিন রাত্তিরে ভাতই খেতাম না, আম খেয়েই পেট ভরাতাম। মনে নেই? তেমন দরাজ জিনিস পাচ্ছে এরা? সবদিন সকলের একটা আস্ত জোটে না। লোকজনেদেরও কী তেমন প্রাণভরে দিতে পারা যায়, বাবা যেমন দিতেন? এরপর আরো হাত ছোটো করতে বলিস?

নিরুপমা বলেন বলি কী আর সাধে? জিনিসপত্তরের দাম দেখেই বলি।

তো তুমিই বা কী কম হে নিরুপমা দেবী! পিঠোপিঠি দিদির সঙ্গে অনেক সময় এহেন ভাষা চালাতেন মৃগাঙ্ক। বলতেন, তোমার পঞ্চভ্রাতার রাতের ‘ডিনারে’ রাবড়ির বাটির বরাদ্দটি প্রাণ ধরে বন্ধ করতে পেরেছ? বাবার আমলের রাবড়ির সের ছিল বারো আনা, আর এখন? তবু দৈনিক এক সের করে রাবড়ি আসছে না?

নিরুপমা রাগ দেখিয়ে বলতেন, এই, খবরদার। খুঁড়বি না। রাবড়ি আমার নাড়ুগোপালের রাতের ভোগ না?

তা জানি। ওই চালাকিটি করে রেখেছ, যাতে বরাদ্দটি কিছুতেই বন্ধ না হয়। তোমার গোপালের প্রসাদ শুধু রাত দুপুরে তোমার ভাইদের ভোগে লাগে। সংসারের আর কারো জোটে না। তাতেই মন কেমন লাগে।

থাম তো। ছেলেপুলেরা বাটি বাটি দুধ খাচ্ছে না? তোরা তা খাস? তো সে দুঃখু তো মাঝেমধ্যে নিবারণও করিস ভাইরে।…তিন-চার টাকা সের রাবড়ি, তাও এক একদিন পাঁচ সাত সের এনে হাজির করে খাওয়াস না? তার সঙ্গে লুচি।

মৃগাঙ্ক ক্ষুব্ধ হাসি হেসে বলতেন, সে তো অঙ্ক কষে, মুফতে দিদি। যেদিন তোমাদের সংসারে কোনো বিশেষ পুজোটুজোর দিনে হোল ফ্যামিলির নিরিমিষ ব্যবস্থা হয়, রান্নাঘরে মাছ ঢোকে না, সেইরকম দিনেই লুচি-রাবড়ি। অনেক অঙ্ক কষে এখন সংসার চালাতে হয় দিদি।

তা সাবেকি চালের বাড়িতে মাঝেমধ্যে আসতো এমন সব আমিষবর্জিত দিন। যথা— সরস্বতীপুজো, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো, মহাষ্টমী, চৈত্র সংক্রান্তি, যার পোশাকী নাম ‘মহাবিষুব সংক্রান্তি’। আরো এমন ছিল কিছু কিছু। দশহরার দিন তো রান্নাঘরে হাঁড়িই চড়তো না। সমগ্র সংসারের ‘ফলারের ব্যবস্থা’। মায় দাসদাসী পর্যন্ত।

তা মৃগাঙ্ক যতই নিজের অঙ্ক কষে সংসার চালানোর বাহাদুরির কথা ঘোষণা করুন, সেই ফলারও হতো রাজকীয়। অন্য ভাইরা নিজেরা আড়ালে একটু বলাবলি করলেও, ‘বড়দা তো দেখছি সমান স্টাইলেই চালিয়ে যাচ্ছেন—’ তবে কেউ মুখটি তুলতে পারতেন না বড়দাদার সামনে।

মৃগাঙ্ক কি খুব রাগী মেজাজী ছিলেন? মোটেই না। সদাহাস্য লোক, ভাবভঙ্গী যাকে বলে ‘কাছাখোলা’। তবু সাহসের অভাব। এ অভাব ভয়ে নয়, ভক্তিতে ভালোবাসায় শ্রদ্ধায় সমীহে।…বড়দা যে খাঁটি সোনা, সে ধারণা সকলের। এবং বড়দা যে এ সংসারের সকলের হিতাকাঙ্ক্ষী তাও সবাই জানে এবং মানে। অতএব ‘বড়দা যা ভালো বুঝবেন! বড়দা যা করবেন!’

প্রেসের আয় হিসেবমতো সকলেরই, কাজেই ‘বড়দা সংসার চালাচ্ছেন’ ভেবে বিবেকের দংশনও কিছু নেই। প্রেসের আয় থেকেই সংসার চালান মৃগাঙ্গ। সে আয়-ব্যয়ের হিসেব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতে আসে না।

মৃগাঙ্ক একবার তেমন কথা তুললে, সকলেই চোখ কপালে তুলে বলে, রক্ষে করো বাবা। ওসব আমাদের মাথায় ঢুকবে না। ও তোমার ব্যাপার।

প্রকৃতপক্ষে সংসার পরিচালনা করেন এই দুই ভাইবোন, মৃগাঙ্ক আর নিরুপমা। যাঁদের ‘নিজের’ বলতে কিছু নেই। হয়তো সেইজন্যেই অন্য সকলের এতো নিশ্চিত্ততা। ওই দুটি মনিষ্যির তো নিজ স্বার্থ বলে কিছু নেই? এবং দুজনেই কৃচ্ছ্রসাধনের ধারায় চলেন। নিরুপমা তো সমাজ ধর্মেই বরাবর একাহারী একবস্ত্রা। বাইরে বেরোতে একটা সেমিজ আর সিল্কের চাদর, বাড়িতে উদয়াস্ত মটকার থান। আর মৃগাঙ্ক? তিনি স্বভাবধর্মে। তিনি পাঞ্জাবির ঘাড় ছিঁড়লে, নিজে দাঁড়া দাঁড়া সেলাইয়ে রিপু করে নেন, ধুতি ছিঁড়লেও সেলাই চালাতে কসুর করেন না। গামছাখানা যতক্ষণ না টুকরো হয়ে গিয়ে জবাব দিচ্ছে, তাকে ছাড়েন না। পায়ের চটিও কাঁটা না-ফোটালে নয়।

এই নিয়ে অবশ্য সকলেই বকাবকি করে। মৃগাঙ্ক অম্লানহাস্যে বলেন, আরে বাবা, যখন আপিসে গেছি, তখন কী কম বাবুয়ানা করেছি? সদ্য পাটভাঙা গিলে করা পাঞ্জাবি, চুনটকরা ধুতি। নিউকাট জুতো। পাঁচজনে না দেখে মুখার্জিদা ময়লা পরে এসেছেন। তো এখন আর কার ধার ধারি?…

বলতেন আর থাবা থাবা মুড়ি মুখে পুরতেন তেলে জবজবে মুড়ি কাঁচালঙ্কা সহযোগে। মুড়ির জন্যে কোথা থেকে যেন খাঁটি ঘানির তেল যোগাড় করতেন মৃগাঙ্ক।

অবশ্য একাই খেতেন না। মুড়িপর্ব এ বাড়িতে প্রায়শই চলতো। তা সবাই যেদিন খাবে, তার কত তরিবৎ। তেল নুন কাঁচালঙ্কা বাদেও শশা নারকেল ছোলার ঘুঘনি, বেগুনী, আলুর চপ! ইচ্ছে হলে মুড়িতে টাটকা ছোলার ছাতুও মেখে নাও।…আবার শীতের দিনে কখনো শখ জাগতো—মুড়ির সঙ্গে বেগুন পোড়া। সে এক পেল্লায় ব্যাপার। একটা তোলা উনুন জ্বেলে বামুনঠাকুরের খিদমদখাটুনি অভয়ের মা বসে বসে ঢলঢলে ঢলঢলে এক ঝুড়ি বেগুনই পোড়াতো। তাদেরকে খোসা ছাড়িয়ে তেল নুন মাখতো বাড়ির কোনো মেয়ে বৌ।

নিরুপমা বলতেন, তুই আর ‘ছুটির দিনে মুড়ি জলখাবার হোক’ বলে র‍্যালা তুলিসনে মৃগু! তোর মুড়ির বাহারের বদলে অনেক কম খাটুনিতে আর কম খরচে লুচি আলুর দম হতে পারতো।

পারতো মানছি। তো সেটা এমন একটা টেস্টফুল ব্যাপার হতো?…বল!

তা সংসার সদস্যরা সবাই সেটায় স্বাক্ষর দিতো। বলতো, ‘সত্যি বড়দার তরিবতের মুড়ি একখানা মুখরোচক জিনিস বটে।’

টুনি বিয়ের পর কয়েকটা বছর দেখেছে এই রমরমা। গোড়ায় গোড়ায় বাপের বাড়িতে এসে গল্প করতে করতে হেসে লুটোতো। তখন বলতো, “ওদের বাড়ি’ কোনো একসময়, সেটা ‘আমাদের বাড়িতে’ রূপান্তরিত হয়ে গেছল। বলতো, ওদের বাড়ি যা হবে, তাই হিমালয় পর্বত। বুঝলে মা? জ্যেঠুর শখ হলো

শীতের দিনে সকলকে ফুলকপি কড়াইশুটির খিচুড়ি খাওয়াতে হবে। ‘হবে’ মানে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাইকেই খেতে হবে। কাজ করবার লোকজন পর্যন্ত। বাদে বড় পিসিমা।…তো শখ যখন হয়েছে, তখন হতেই হবে। বড় ধামার এক ধামা কড়াইশুটি ছাড়ানো হলো, একঝোড়া কপি এল, মুঠো দুচার গরম মশলা, ঠোঙ্গা ভর্তি তেজপাতা, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকী করে ‘খিচুড়ি’র হাঁড়ি নামালেন।…আর পোষপার্বণের কথা তো বলতে বসলে ফুরোবে না। অদ্ভুত মানুষ। খুব বেশী জিনিস না হলে কিছুতেই মন ওঠে না। ছুটির সকালে ছেলেপুলেদের বাঁধাবরাদ্দ পরোটা জলখাবার না করিয়ে বলতেন, ‘আমি আনাচ্ছি।’ ব্যাস, খাবারের দোকানে অর্ডার চলে গেলে তাদেরই দোকানের লোক ঝোড়ায় করে গরম হিঙের কচুরি, আর বারকোষ ভর্তি গরম জিলিপি দিয়ে গেল। নাও, কে কত খাবে খাও। ফুরোলে আবার অর্ডার চলে যাবে।

সবাই শুনে হাসতো, চোখ বড় করতো।

সত্যব্রত বলতেন, লোকটা নিজে খায়? না তাতে কিপটেমি করে?

হেসে ফেলতো টুনি, নাঃ, তা করেন না। খাওয়াতেও ভালোবাসেন, খেতেও ভালোবাসেন। বড় জামবাটির একবাটি মাংস খেতে পারেন। হাঁসের ডিমের ডালনা হলে, অন্তত চারটি ডিমের কমে চলবে না। অন্যদেরও আরো নে আরো খা’ করেন, তবে সবাই তো অতটা পারে না। সেজজ্যেঠুর তো দুটো হাঁসের ডিমেই পেট ছেড়ে দেয়।… হি হি!

হ্যাঁ, হাঁসের ডিমই। নিরুপমার উপস্থিতিতে তো আর বাড়িতে মুরগির ডিম ঢুকতে পারে না?

সত্যব্রত বলতেন, বেশ বাড়িতে বিয়ে দিয়েছি তোর। খেয়েই ফতুর হবে।…দু’বছরের বড়দাদা আদিত্য বলতো, ‘গ্রান্ড বাড়ি বাবা। আমাদের যে কী বাড়ি!”

কিন্তু সেসব বোলবোলাও কতদিনই বা দেখল টুনি? সেই মৃগাঙ্ক মুখুয্যে নামের টগবগে ছটফটে লোকটা কিনা হঠাৎ একদিন বিনা নোটিশে কথা কইতে কইতে ফস করে মারা গেল!

কে জানতো, তার হৃদয় এমন দরাজ হলেও হার্টটা ছিল ‘ড্যামেজড’!

কিন্তু সে তো হলো। এদিকে তলে তলে যে তিনি কী সর্বনেশে কাণ্ড করে বসেছিলেন, সেটা তাঁর ওই বিনা নোটিশে জবাব দিয়ে বসার আগের ক্ষণ পর্যন্তও কেউ টের পায়নি।

যখন টের পেল তখন মাথায় হাত দিয়ে বসতে হলো সংসারকে। চার-চারটে কর্তা কর্তা ভাই, কারো সঙ্গে পরামর্শ মাত্র না করে, বাড়িখানি মর্টগেজ করে বসে আছেন মৃগাঙ্ক।

না না, রেস খেলেও নয়, নেশাভাঙ করেও নয়, স্রেফ সংসারের ঠাট বজায় রাখতে। বাজারদর যতই বাড়ুক, বাবার আমলের ঠাটটা সমান রাখতে চেষ্টা করে গেছেন ভদ্রলোক। …যদি এখনও ভদ্রলোক’ বলা হয়।

যে ব্যক্তি শ্মশানে গিয়ে ভস্ম হয়ে গেছে, তাকে আর ভয় কী? তার সম্পর্কে ন্যায্য কথা আর যে কেউ চট করে বলে না উঠুক ভাদ্রবৌয়েরা বলে উঠলেন। বললেন, তার মানে পরের ধনে লপচপানি করে গেছেন। আর আশ্চর্য বলি, বাপের সম্পত্তি তো সকলেরই তো উনি একা বাড়ি মর্টগেজ দিলেন যে? আইন আছে?

তা নেই। তবে আইনের দায়ে তো ফেলা যাচ্ছে না। কাগজপত্রে নাকি অন্য ভাইদের সই রয়েছে।

কী করে? জাল করে না কি?

না তা ঠিক নয়, তবে তাদের সরলতা আর বিশ্বস্ততার সুযোগটি নিয়ে। কী সব কাগজপত্র ভাইদের সামনে ধরে দিয়ে বলেছিলেন বটে, তোরা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে একটা একটা সই করে দে। এ ছাড়া তো আর উপায় নেই।

কিন্তু ভাইরা সে কাগজে চোখ বোলানো আবশ্যক মনে করেননি বলে আর কষ্ট স্বীকার করেননি। মনে করেছিলেন, সেই যে একবার কর্পোরেশনের একটা নোটিশ এসেছিল অনেক ট্যাক্স বাড়াবার জন্যে, বড়দা বলেছেন, একসঙ্গে এতোটা বেড়ে যাওয়া? মগের মুলুক নাকি? রোসো একটা পিটিশান ছাড়া যাক।…এটা হয়তো সেই পিটিশান বাবদই। এই ভেবেই চোখবুজে সই করেছে। সরল বিশ্বাসেই করেছে।…

সব ব্যাপারেই তো এইভাবে চোখবুজে থেকেছে ভাইয়েরা। সরল বিশ্বাস অবশ্যই, তাছাড়া বরাবরের বোজা চোখ হঠাৎ খুলতেও তো একটা লজ্জা আসে।

ছাপাখানা সম্পর্কেও তো ওই একই লজ্জা ব্যাপার!

কেউ কোনোদিন তাকিয়ে দেখেনি, সেটার আয়-ব্যয়ের অবস্থা কী?… সংসার-তরণীটি চলে যাচ্ছে দিব্যি তরতরিয়ে, এই তো যথেষ্ট। এবং অন্যায্যও নয়। বাপের বিজনেস, সকলেরই সমভাগ। বাপঠাকুর্দার বাড়ির বেলাতেও তাই।

হ্যাঁ আইন একটা হয়েছে বটে, ছেলেরা এবং মেয়েরা পিতৃসম্পত্তিতে সমান ভাগ পাবে, তবে সে আইন তেমন চালু হয়েছে কই? যো সো করেই সেটা প্রায়শ নাকচ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সেকেলে প্যাটার্নের বাড়িতে।

সেকেলে তো বটেই। টুসকি যার জন্যে বলে, আসলে পয়সার অভাব নয় রে ছোড়দা, মানসিকতার অভাব। টেলিফোনটা যে সংসারজীবনে একটা অপরিহার্য অংশ, সেটা ওদের মাথাতেই আসে না।

শিলাদিত্য আজকাল হঠাৎ হঠাৎ বোনের কথায় যেন চমকে ওঠে। মনে হয়ে টুসকির মুখে এ রকম কথা! কবে শিখল?…পাকাপাকা কথা বরাবরই কয়, তবে এমন পরিণত কথা কয় কী?…তাছাড়া—কেমন যেন একটু বেপরোয়া বেপরোয়া ভাব

মানিকতলার মুখুয্যেদের সেই বাড়িটাকে নাকি এখন ভেঙে সমতল করে, সেখানে ‘বহুতল’ বাড়ি উঠেছে।…কিনেছে এক বাজারিয়া না কে যেন!

তা পুরোনো বড় বড় ইমারৎ-টিমারৎ আর কে কেনে ওরা ছাড়া? এ তো যৎসামান্য একখানা গেরস্থবাড়ি মাত্র, কত কত স্মৃতিমণ্ডিত সৌধই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। তাদের আসল বর্মাটিক-এর জানলা দরজা, মেজেয় বিছোনো মার্বেল পাথর। এসবও তো নেহাৎ কম দামে বিকোয় না।

তবে কোন বাঙালির এমন টাকা আছে যে, শুধু কোনো মহৎ স্মৃতি বাঁচাতে একখানা পুরোনো বাড়ি কিনে ফেলবে?….তা ফেলতে পারলে আজ বিদ্যাসাগরের বাড়ির এমন হাল হতো না, এমন হাল হতো না বঙ্কিমচন্দ্রের, কেশব সেনের এবং স্বামীজির বাড়ির।…

যাক সে প্রসঙ্গ স্বতন্ত্র। বলতে বসলে ফুরোবার নয়। বাঙালিচিত্তে ঐতিহ্য সম্পর্কে মুল্যবোধের বড় অভাব। যে হুজুগের তালে ভেসে যেতে পারে, একেবার পিছন দিকে তাকিয়ে দেখতে চায় না।…তাছাড়া ঝামেলা ঝঞ্ঝাটহীন নিশ্চিত্ততাই তার একমাত্র কাম্য।

অতএব, মানিকতলার ওই মুখুয্যে বাড়িটা যদি এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়ে সেখানে আকাশছোঁয়া বাড়ি উঠতে থাকে, অবাক হবার কিছু নেই।

মর্টগেজ করা বাড়িকে ছাড়িয়ে নিয়ে, আবার তাতে গুছিয়ে বসে বসবাস করার কথা আর কেউ ভাবলই না। শশাঙ্ক, অশঙ্ক, উতঙ্ক কী শুভ্রাঙ্ক কেউই না। সহজ আর নির্ঝঞ্ঝাট উপায়টাই বেছে নিল বাকি চারজনেই। বাড়িটা বেচে দিয়ে টাকাগুলো ভাইয়ে ভাইয়ে ভাগ করে নিয়ে যে যার আপন আপন ব্যবস্থা করে নিল।

অর্থাৎ চারজনে চারদিকে। নিজের মতো করে বাড়ি কিনে করে নিল। উতঙ্ক তো আবার বাড়িভাড়া করে থাকাই সুবিধে মনে করল।…বলল, টাকাগুলো ফিক্সড রেখে, সেই টাকায় ভাড়াটা যুগিয়ে যাই। আজকালকার দিনে বাড়ি বানানোটা বোকামি। প্রথম কথা তো— ভবিষ্যতে ছেলেবেটারা একান্নবর্তী হয়ে থাকতে চাইবে না, আর তেমন বড় বাড়ি করতেও পারবো না যে আমার তিন ছেলের সংসার ধরবে। তার মানেই বাড়ি ‘বিক্রমপুরে’। তাছাড়া প্রধান কথা—বাড়িভাড়া আইনে, ভাড়াটেকে তো আর উচ্ছেদ করা যায় না। বাড়িওলাও যদি মনের দুঃখে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে চলে যায়, ভাড়াটে ঠিক গ্যাঁট হয়ে বসে থাকবে। তবে আর মিথ্যে কেন, হাতের টাকা খরচ করে বসা?

উতঙ্ক ভাড়াটে বাড়িতে আছে। এবং সেই সবথেকে ভালো অবস্থায় আছে। বড় বড় তিনখানা ঘরওয়ালা মস্ত ফ্ল্যাট। জীবনযাত্রার সমস্ত হাতের মুঠোয়। এখন অন্য গিন্নীরা নিজ নিজ পতিদেবতাদের বুদ্ধিহীনতার দোষ দেয়। তবে শুভ্রাঙ্ককে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবার মানুষটি নেই। সেই বাড়ি নিয়ে ডামাডোলের সময়ই শুভ্রাঙ্ক-গৃহিণী তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ সন্ধ্যাতারার হাতে সংসারটি সঁপে দিয়ে বিদায় নিয়েছেন।

বেলেঘাটার বাড়িটি তখনো তৈরি হয়নি। সেই বাড়িতে সন্ধ্যাতারা অর্থাৎ টুনিই গৃহিণী হয়ে গৃহপ্রবেশ করেছে, শ্বশুর তিন দ্যাওর আর চারখানা ননদকে নিয়ে। তা সেও তো বছর চোদ্দ আগের কথা। তারপর ননদদের বিয়ে হয়ে গেছে। শূন্যপুরণের ক্ষেত্রে এক দ্যাওরের বৌ এসেছে এই যা।

অতএব বেলেঘাটার বাড়িতে টুনির মতে এখন ছোট্ট হালকা সংসার। কিন্তু টুসকি কখনো ওখানে গেলেই বলে, বাবাঃ পিসির বাড়ি যে কত লোক। গিয়ে প্রাণ হাঁপায়।

মা বলে, বাবাঃ। তাহলে পিসির সেই আগেকার সংসারের কথা ভাব? মানিকতলার বাড়ির? তখন টুসকি বলে, সে আর একরকম! তখন যেন মনে হতো ওদের বাড়ির সবাই হাওয়ায় ভাসছে। এখন মনে হয় পাথর বইছে।

কেন এমন হয় কে জানে।

পুরোনো সেই দাসদাসীরা বিদায় নিয়েছে বলে? পাঁচজনের একজনও আর কাজ করতে রাজী হলো না। সকলেই দেশে চলে যেতে চাইল। নন্দ, বৃন্দাবন, সুধীর, মনোরমা, সুখদা এমনকী বামুনঠাকুরও বলল, আর বাড়িতে কাজ করবে না। কেটারারের অফিসে কাজ করবে।…

তাছাড়া বাড়ির কারুরই আর তেমন ক্ষমতা হলো না তাদের উপযুক্ত চাহিদা আর বদভ্যাস বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাউকে নিজ নিজ ছোট সংসারের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে। এখন তো দেখা যাচ্ছে বড়কর্তা আর তাঁর দিদিটি মিলে লোকজনকে কী মাথায় তুলেছিলেন। কে পারবে বাবা সেই জের টানতে। না পারলেই তো ওদের সামনে হেয় হওয়া!

নিরুপমার তাঁবে থাকা গিন্নী-মহিলারা এতোদিন খেয়াল করেননি তাঁরা কী যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। দেখেশুনে মনে হতো—দিব্যি আছে।…একসঙ্গে দু’তিন জন বসে গালগল্প করতে করতে কুটনো কুটছে, খাবার করছে, কেউ দুধ জ্বাল দিয়েছে, তাড়াহুড়োর সময় গুছিয়ে পরিবেশন করেছে, তাদের দেখে মনে হতো না কষ্টে আছে।

এখন তারা স্বামীপুত্তুরকে শোনাচ্ছে এযাবৎ প্রখরা ননদ আর খামখেয়ালি ভাসুরের চাপে কী কষ্টেই কাটিয়েছে।

তা সেই প্রখরা ননদটির কী গতি হলো?

তো তাঁর প্রতি অবিচার করেনি, বাড়ি বিক্রী এবং প্রেস বিক্রীর টাকা থেকে তাঁকে হাজার কয়েক টাকা দিয়ে তাঁর গুরুআশ্রম নবদ্বীপে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে মেছুনির ‘আঁশচুপড়ি’। চিরকেলে ঘোরতর সংসারী মানুষ। তাঁর কী আর গুরু আশ্রমে পড়ে থাকা পোষায়? সত্তর বছর বয়সেও তো তিনি তাজা পোক্ত। কাজেই তিনি তখন তাঁর এক মাসতুতো বোনঝির বাড়িতে গিয়ে বসেছিলেন। তাদের লোকাভাব, আগ্রহ করে নিয়েছিল। তাছাড়া নিঃসম্বল নয়, টাকা আছে।

তো সেই বোনঝিকেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত দেহরক্ষা করেছেন নিরুপমা।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *