Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi » Page 21

সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi

এককথায় সমস্যার সমাধান করে দিলো যুধাজিৎ। অবলীলায় বলে উঠলো, পুরুলিয়া? সে আর এমন কী ব্যাপার? ‘বাই কার’—এই তো চলে গেলে হয়! আর সকলে মিলেই চলে যাওয়া যায়!

‘বাই কার?’ শিলাদিত্য বলে ওঠে, সে তো অনেক সময় লাগবে?

এমন বেশী কিছু নয়। তাতে অন্য একটা সুবিধে, সেখানে গিয়ে পড়ে ‘আসামী’ কে খুঁজে বার করতে, যানবাহন কী পাওয়া যায় না যায়, এটা নিজের হাতের মুঠোয় থাকবে

শিলাদিত্য আর একবার মনে মনে ঈষৎ ঈর্ষাবোধ করে। এতো সহজেই এমন বলতে পারা ঈর্ষার ব্যাপার বৈকি! শিলাদিত্য পারবে কোনোদিন?…হঠাৎ যেন ছোটবোনটার ওপরও একটু হিংসে হিংসে ভাব এসে গেল। টুসকি এখন ওই উচ্চস্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। ‘পৌঁছে যাচ্ছেই’ বা কেন, সর্বেসর্বাই হতে যাচ্ছে। একেই বলে কপাল। এই তো সেদিনও ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছিল।

তা টুসকিও এই কথাটাই ভেবে চলেছে ক’দিন ধরে। কেমন একটা আচ্ছন্নের মতো। এই তো সেদিনও আমি ‘ফ্যা ফ্যা’ করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, কিছু রুজিরোজগারের চেষ্টায়। সেদিন~হ্যাঁ, সেই পরম দিনটিতে যদি রাস্তায় ওই দেবীমূর্তিটির সঙ্গে দেখা হয়ে না যেতো, তাহলে আরো কতোকাল ঘুরতে হতো কে জানে! হয়তো চিরকালই। কে আসতো টুসকিকে একটা সুন্দর জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে? বাবা? দাদারা? হুঁঃ। শেষ পর্যন্ত হয়তো ওদের সংসারের রথের অচল চাকাখানাকে সচল করবার চেষ্টা করতে বুড়িয়ে যেতে হতো!

হ্যাঁ, সেই দিন টুসকিকে আক্ষরিকভাবেই পথ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে সেই মহিমময়ী দেবী তাকে নিয়ে গেলেন স্বার্থের বারান্দায়। যেখানে সেই স্বর্গভূমিতে অনায়াসে প্রবেশের জন্যে রয়েছে দুহাট করে খোলা একটি দরজা।

যুধাজিৎ অবশ্য প্রথমটা বলে উঠেছিলো, কাব্যিক কথাটথা আমার আসে না টুসকি সে তো বুঝেই গেছো। তবে বলতেই হয় সাহসেরও অভাব দস্তুরমতো! ওই বনছায়া দেবীটির সাহসের সিকিও যদি তাঁর পুত্রটির থাকতো, তাহলে অবস্থা এতোদিনে অন্য চেহারা নিতে পারতো। ‘রাস্তা থেকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে বাড়িতে এনে ঢুকিয়ে ফেলা।’ উঃ। ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে!

টুসকি বলেছিলো, কেবলমাত্র একটু সাহসের অভাবেই কতো জীবন বেহাল হয়ে যায়, বরবাদ হয়ে যায়!

আমার কিন্তু সাহসের অভাব ছিলো, তোমাদের বাড়ির ওই কট্টর বংশাভিমানের বহর দেখে! একটা সিডিউল কাস্ট হয়ে কী করে—

থামুন তো! বাজে কথা বলবেন না! ‘সিডিউল কাস্ট’ আবার কী?

কট্টর ব্রাহ্মণদের কাছে কুলীন ব্রাহ্মণ ব্যতীত বাকি সকলেই তাই!

হঠাৎ টুসকি বলে ওঠে, আমরা কী তাহলে এখন জাতপাতের তর্ক নিয়ে সময়টা খরচ করবো? মাসিমা কিন্তু এক্ষুণি তাঁর চা-জলখাবারের সম্ভার নিয়ে হানা দেবেন।

যুধাজিৎ একবার তাকিয়ে দেখেছিলো। তারপর একটু হেসে বলেছিলো, সত্যি আমি কী বোকা! চলো দুজনে একসঙ্গে মাকে প্রণাম করিগে!

যেতে হবে না। মা এলেন বলে।

টুসকি!

তা মেখলা বলতে হবে।

করে গেছে! মেখলা আবার একটা নাম না কি? টুসকি টুসকি টুসকি …. টুসকি, সেই যেদিন তোমায় প্রথম দেখেছিলাম, সেইদিনই বোধহয় আমার ভাগ্যনির্ণয় হয়ে গিয়েছিলো।

তোমার, না আমার।

তোমারটা তুমিই জানো। ভাগ্য না ‘দুর্ভাগ্য’। আমারটা জানি। এখন যেন অনুভব করছি, সেই প্রেরণাতেই তদবধি এমন ভূতের মতো খেটে চলবার শক্তি পেয়েছিলাম। মনের মধ্যে অদৃশ্য একটা প্রতিজ্ঞা, যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

ধ্যাৎ! আমি আবার একটা ‘কিছু’? তাই আমার জন্যে এই দৃঢ়সংকল্প?

কে যে কার কাছে ‘কিছু’ তা কী সে জানে?

শুনে হেসো না, আমি কিন্তু পাপিয়াকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতাম!

কী আশ্চর্য! তুমি তো ওকে ছেলেবেলা থেকেই দেখছো?

জন্মাবধিই!

টের পাওনি ও কোথায় বাঁধা পড়ে আছে?

নাঃ। কোনোদিনও না। দাদার মতো ওইরকম একটা কাঠখোট্টা লোক, যে না কী মেয়েদের দিকে তাকিয়েও দেখে না, কিংবা দেখলে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকায়, তাকে যে কোনো মেয়ে—

সেই কথাই তো বলছিলাম। কে যে কার কাছে ‘কী’ তা সে নিজেও সবসময় চট করে বুঝে উঠতে পারে না। হয়তো এখন দেখবে তোমার সেই কাঠখোট্টা দাদাটির মধ্যেও ফল্গুধারা প্রবাহিত!

টুসকি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো, দরজার বাইরে বনছায়ার গলা শোনা গেল, হ্যাঁ, খাবারের ট্রে-টা রেখে দিয়েই ছুটে চা নিয়ে আয়। দেরী করবি না। তুই তো সকল কাজেই বাঘের মাসি।

অর্থাৎ কাজের মেয়েটাকে নির্দেশ দিচ্ছেন।

মেয়েটা ঢুকে এসে সামনে টেবিলে সেই ট্রে-টা নামিয়ে রেখে চলে গেল। চটপট ই গেল।

আর যুধাজিৎ বলে উঠলো, মা, তোমার ‘বাঘের মাসি’র আপাতত তো খরগোশের ভূমিকায় দেখছি। ও আসবার আগেই চটপট একটা কাজ সেরে নিই। টুসকি! কুইক। একসঙ্গে দুজনে চরণ ছোঁওয়া চাই।

বনছায়া?

বনছায়া কোনো কথাবার্তার দিকে গেলেন না। একসঙ্গে দু’হাতে দুজনেকে ধরে, স্রেফ যাকে বলে ‘ভ্যাক’ করে কেঁদে ফেললেন।

এই সেরেছে। মা, তোমার বাঘের মাসি এলো বলে। চোখ মোছো।…চোখ মোছো। টুসকি বোঝো! কী ফাঁদে পড়ে বসলে। এই ছিঁচকাঁদুনি খুকিটিকে নিয়ে সারাজীবন ঘর করতে হবে তোমায়!

হ্যাঁ, সেই দিনটি। যেন টুসকির জীবনের চাকাখানায় কে একটা পাক দিয়ে মোড় ঘুরিয়ে দিলো।

এখন টুসকির ছোড়দা টুসকিকে মনে মনে হিংস করছে।

নীহারিকার মনের মধ্যে অনেক ভাবের উথালপাতাল। যাবো তো? যদি সেই হৃদয়ের বালাইহীন ছেলেটা তার মার মান না রাখে? তাও ওই পরের ছেলেটার সামনে! যে ছেলেটার কাছে ‘মা’ নামক আবেগটি সত্যিই ‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’। সে বড়ো লজ্জা! সে বড়ো অপমান! তাই নীহারিকা বলে ওঠে, আমি নাই গেলাম। তোমরাই যাও না!

যুধাজিৎ সবলে সে প্রস্তাব উড়িয়ে দেয়। কী যে বলেন মাসিমা! আপনিই তো আসল! আপনি যাবেন না, এ হয় না।

নীহারিকা দুর্বলভাবে বলে, বাঃ! আমি আসল কেন? বিয়ের বরকনেই যখন নেমন্তন্ন করতে যাচ্ছে-

যুধাজিৎ বললো, সেটা না হয় বিয়ের নেমন্তন্ন। আর ছোটবোনটার বিয়েটার দায়-দায়িত্ব নেবার জন্যে তাকে তলব দিতে যাবার জন্যে? কে সেই জোরটি খাটাবে? বলতে হবে না, ‘কনের বাবা অসুস্থ হলে তাঁর বড়ছেলেই সব ভার নিতে বাধ্য!’ সেটা কে বলবে?

চিরঅহঙ্কারী নীহারিকা গাঙ্গুলীও কী সেই ভ্যাবলা বনছায়া সরকারের মতো ভ্যাঁক করে কেঁদে ফেলবে?

নাঃ। সেটা ফেললো না! তার চোখের স্নায়ুরা কেঁদে ফেলায় অনভ্যস্ত! জ্বলে উঠতে, আগুন ঠিকরোতেই অভ্যস্ত। তাই এ হেন মোক্ষম মুহূর্তেও সামলে গেল।

নীহারিকার সেই জোর কোথায়? যে জোরে ছেলেকে বলা যায় ‘এটা তুমি করতে বাধ্য’! নীহারিকার সে আশ্বাস কোথায় যে আশ্বাস সাহসের জোগানদার! যে আশ্বাস বিশ্বাস এনে দিতে পারে ও আমার কথা রাখবেই।

কিন্তু নীহারিকাই কী কোনোদিন তার সন্তানদের মধ্যে সেই ‘মাতৃমূর্তিটি’ স্থাপন করবার ক্ষমতা অর্জন করেছিলো? নীহারিকা জানতো না, সন্তান কখনোই তার মাকে ‘নায়িকা’রূপা দেখতে ভালোবাসে না!

অতি স্মার্ট অতি তীক্ষ্ণ। ‘আপন ভালো লাগা না লাগার’ মনোভাব উত্তাল একটি ‘যুবতী নারী’ কে শিশুও ‘মা’ হিসেবে পছন্দ করে না। সে তার মার সবটা মনোযোগ চায় তা সেই ‘মন’টা ভোঁতাই হোক, আর জবড়জং সেকেলেই হোক

তাছাড়া—অন্য পুরুষের প্রতি আসক্ত নারী!

সে তার সন্তানদের প্রতি যতো স্নেহময়ীই হোক, তাদের কাছে পাশমার্ক পাবে না! সে হিসেবে সব সন্তানই ‘মনু’র কালের! আর নীহারিকা তো তেমন বিগলিতকরুণা স্নেহময়ীও নয়। যেমন তার শাশুড়ি নয়নতারা, বা ননদ সন্ধ্যাতারা। যেমন ওই বনছায়া সরকার।

ছেলেরা মায়ের কাছে বোধহয় এইরকম মূর্তিটিই চায়।

এ এক অবচেতনের অন্তর্নিহিত রহস্য। এখানে সমস্ত আধুনিকতাই ‘ফেল’।

মা অবশ্যই বন্ধুর মতো হবে, তবে তার মাতৃমহিমাটি পূর্ণ বিকশিত রেখে।

নীহারিকা চিরকাল তার নিজের মনকে বুঝিয়েছে, আমি কি কখনো কোনো গর্হিত কিছু করেছি? অন্যায় কিছু করেছি?

কিন্তু তাতে তার সন্তানদের মনকে বোঝাতে পারেনি। তারা তাদের মাকে ভালো হয়তো বাসতে পেরেছে, কিন্তু শ্রদ্ধা করতে পারেনি!

শ্রদ্ধাহীন ভালোবাসার মূল্য কতোটুকু?

নীহারিকার তার শ্বশুর-শাশুড়ি সম্পর্কে ব্যবহারও কী তার ছেলেমেয়ের কাছে তাকে ছোট করে দেয় না? ছেলেবেলা থেকেই তো দেখে আসছে তারা ওই গুরুজন দুটির প্রতি মায়ের কীরকম একধরনের বিদ্বেষ, যার থেকে জন্ম নিয়েছে অবজ্ঞা তাচ্ছিল্য। এবং সেটা খানিকটা জোর করেই। ‘ওনাদের প্রাধান্য দেব না’ এই সংকল্পে।

তবে আর নীহারিকা তার সন্তানদের কাছে একটি ‘সশ্রদ্ধ’ প্রাধান্য প্রত্যাশা করবে কোন্ ভরসায়?

কার্যকারণ খতিয়ে দেখবার বোধ নেই, তবে অভিমানবোধটি তো আছে? তাই নীহারিকা আজ তার ছেলেকে ডাকতে যাবার প্রস্তাবে বলে, আমার কথাই কী শুনবে?

যুধাজিৎ ঈষৎ গম্ভীর হয়ে বলে, যাতে শোনে তেমন জোরের সঙ্গে বলবেন!…না না, চলুন। চলুন। আপনিই আসল।

নীহারিকা চুপ করে যায়। মনের মধ্যেকার ঢেউকে সংহত করে।

তা শিলাদিত্যও একবার বলে, আমারই বা যাবার দরকার কি, বলতে গেলে একটা ফালতু ম্যান। শুধু গাড়িতে জায়গা জোড়া করা।

যুধাজিৎ প্রায় ধমকের গলায় বলে ওঠে, মেয়েলি ন্যাকামি রাখ্ তো! মনে রাখতে হবে তিন তিনটি ‘অবলা’ যাচ্ছেন সঙ্গে। একটি গার্ডের দরকার নেই?

তুই-ই তো আছিস?

ধ্যাৎ। আমি তো ড্রাইভার মাত্র!

কী, তুই সঙ্গে ড্রাইভার নিবি না?

নাঃ! কী দুঃখে একটা বাইরের লোককে আমাদের এই দারুণ ঘরোয়া অভিযানের মধ্যে ঢোকাবো? এই তো কিছুদিন আগে দিদি আর তস্য পরিবারকে নিয়ে টাটায় ঘুরিয়ে আনলাম। দিদির শ্বশুরবাড়ির কার যেন বিয়ে উপলক্ষে—এরকম ক্ষেত্রে ড্রাইভারকে নেওয়া মানে ঘরোয়া গল্পে বাধা। এবং একটা সিট নষ্ট।

তাহলে যাচ্ছে কে কে?

যুধাজিৎ চটপট জবাব দেয়, কেন, মাসিমা, তাঁর পুত্রকন্যা ও ভাবী জামাতা, এবং অভিমানকারী দলের গাইড ‘মেয়ে ডাক্তারবাবু’!

পাপিয়া বলে ওঠে, আঃ। আপনিও এই সব শুরু করলেন?

বাঃ। ‘যস্মিন দেশে যদভাষা’! সেখানে আপনার অভিধাটি কী ছিলো?

আহা। একবার শুনে নিয়ে ভারি বাহাদুরি। আমায় ক্ষ্যাপালে কিন্তু ডিউটি দেব না।

পাপিয়ার মুখে রক্তিম আভা!

তবু এখন আর টুসকির তা দেখে গা জ্বলে যায় না।

টুসকি এখন সিংহাসনে উঠে বসেছে!

যাত্রাকালে নয়নতারা আঁচলে চোখ মুছে বললেন, দুর্গা দুর্গা! দারোগা পুলিশ সবাই মিলে গিয়ে আসামীডারে ধরা আন তো দেখি এবার। ছাড়ান-ছোড়ন দিবা না!

সত্যব্রত একটু হাসলেন, গিয়ে পেলে তবে তো? সেটা তো সত্যিই আসামীর মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছে!

আর আদিত্য?

আদিত্য হঠাৎ এক অদ্ভুত কাজ করে বসলো। অর্থাৎ অদ্ভুত কথা বলে বসে! যাত্রাকালে সবাই তো তাঁর কাছে বলে যেতে এসেছে। প্রণাম নিতে চায় না, তাই কেউ সে চেষ্টা করে না। এমনি যাচ্ছি তাহলে’? বলা!

আদিত্য হঠাৎ তার বাবার কথার পরই হাত বাড়িয়ে পাপিয়ার পিঠটা একটু ছুঁয়ে বলে ওঠে, দেখবো তুমি কেমন বাহাদুর মেয়ে!

সকলেই একটু চমকালো

এ কথার অর্থ? পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবার বাহাদুরি?

কিন্তু সেই কথাটার মধ্যে অমন একটা গম্ভীর ব্যঞ্জনা কেন?

যাক, নিহিতার্থ পরে ভাবা যাবে। এখন আর দেরী করা নয়।

সকলের মধ্যেই অনিশ্চয়তার একটা উদ্বেগ ছিল, তবে যাকে ‘বাহাদুরি’ দেখাবার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে সমুদ্রের ঢেউ। তবু অভিযানটা যেন একটা প্রমোদ ভ্রমণের মতোই করে তুললো যুধাজিৎ, শিলাদিত্যকে দলে টেনে।

মাঝে মাঝে গাড়িকে থামিয়ে চা খাওয়া, গ্রাম্য দোকানের জিলিপি খাওয়া! সবসময় হাসিগল্পের মেজাজ দেখানো। এবং মাঝে মাঝেই পাপিয়ার প্রতি কটাক্ষপাত, কী? চিনিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন তো ডাক্তারবাবু? হঠাৎ বলে বসবেন না তো—এইরকমই তো দেখেছিলাম জায়গাটা! ঠিকানাহীনের ঠিকানা বার করা তো সহজ কাজ নয়।

তো একেবারে যে খুব সহজ হলো তা নয়।

না, জায়গাটায় পৌঁছানো অত সহজ হয়নি। কিন্তু পৌঁছে যাবার পর? প্রথম তো ‘তারক’ নামের ছেলেটার অপার বিস্ময়ের বিহ্বলতা। অ্যাঁ, আপনারা! সব্বাই! মাসিমাসুদ্ধু? মেসোমশাই কেমন আছেন? দাদু-দিদা? পাপিয়াদি আপনি আবার? অ্যাঁ? স্বপ্ন না তো! তারপর মাথা চাপড়ে বললো, আপনারা এখন এলেন। এই ক’ঘণ্টা আগে বড়দাবাবু কোথায় যেন মীটিং করতে গেল।

মীটিং করতে?

ওই যা বলেন। সাঁওতাল বস্তিতে গিয়ে গিয়ে বাদ্যিবুলি ঝাড়া, এই আর কী? আমি তো মীটিংই বলি।

পাপিয়া আস্তে বলে, তুমি যে বলেছিলে, তোমার বড়দাকে কোথাও একা ছাড়ো না! বারণ করলেও সঙ্গে যাও!

তো সে কী আর বলতে কসুর করেছিলুম গো! তো অ্যাইসা এক ধমক, তুই রান্নাটান্না করে রাখ্। এসে দারুণ খিদে পাবে, তা মনে রাখিস! এসেই খেতে না পেলে তোকেই খেয়ে ফেলবো!

শিলাদিত্য বলে, তাহলে তোর বড়বাবুর সাধারণ মানুষের মতো ক্ষিদেটিদে পায়?

তারক হেসে ফেলে বলে, ওই অ্যাকটা জায়গায় একটুখানি কাঁচা রয়ে গেছে। বেশী খিদে পেলে যেন চোখে অন্ধকার দেখে। তো যা না খাদ্যর ছিরি। রান্না! রান্না দেখলে আপনাদের কান্না পাবে।

নাঃ! হঠাৎ একটা ওলট-পালট কাণ্ড ঘটে গেল। নীহারিকা হঠাৎ যুধাজিতের বোকাটে মা-টির মতো ডুকরে কেঁদে উঠলো।

ছেলের আস্তানাটা দেখে পর্যন্ত তার মনের মধ্যে যে কান্নার ঢেউ উঠেছিল, তাকে আর সামলাতে পারলো না।

এ হেন অবস্থায় যা যা হবার তাই হয়।

তারক আকুলতা করতে থাকে, কী করে তার এইসব প্রাণের জনদের আতিথ্য আপ্যায়ন করবে! অতিথিরা আশ্বাস দিতে থাকে, কোনো ভাবনা নেই, তাদের সঙ্গে প্রচুর জিনিস আছে। দেদার ফল কিনে সঙ্গে নিয়েছিল যুধাজিৎ। দেদার খাবার জলের ব্যবস্থাও ছিল। তাছাড়া নীহারিকার অবদানও ছিলো বেশ কিছু। সারা রাস্তা খেতে খেতে এসেও রয়ে গেছে প্রচুর। অতএব ‘হে বাবা তারকনাথ ঠাকুর, আপনি নিশ্চিন্ত হন’।

নীহারিকার আজ বাঁধ ভেঙেছে। তাই তারকের হাত ধরেও কেঁদে ফেলে বলে, ওই পাগলটার সঙ্গে তুইও এই কষ্ট করে চলেছিস তারক?

যুধাজিৎ বলে ওঠে, ভালোবাসায় কী না হয়। প্রায় প্রভুভক্ত সারমেয়। যুধিষ্ঠিরের মহাপ্রস্থান যাত্রায় সেই সঙ্গী বেচারীর কী হাল হয়েছিল? তবু ব্যাটা সঙ্গ ছেড়েছিলো? ছাড়েনি।

শিলাদিত্য বলে, তার তো জানা ছিল, শেষ পর্যন্ত স্বর্গে পৌঁছনো যাবে। এর কী?

যুধাজিৎ বলে, ওর বোধহয় আলাদা কোনো স্বর্গ নেই।ওই বড়দাবাবুই ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষচতুর্বর্গ!

টুসকি হঠাৎ হাত বাড়িয়ে পাপিয়ার কাঁধে একটা সূক্ষ্ম চিমটি কেটে ভালোমানুষের মতো গলায় বলে, এ ধরনের লোক কিন্তু অন্যের পক্ষে বেশ ডেঞ্জারাস হয়।

নীহারিকা সেই কেঁদে ফেলার পর চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো, এখন একটু চকিত হয়ে বললো, কেন? ডেঞ্জারাস কেন?

টুসকি আরো নিরীহভাবে বললো, না, মানে ওর মারও তো তোমার মতোই অবস্থা। তায় আবার ওর মারও একমাত্র ছেলে।

কথাটা মোড় ঘুরিয়ে নেওয়ায় পাপিয়া মনে মনে কৃতজ্ঞ হলো!

এরা বেরিয়েছিলো একেবারে কাকভোরে। এখন পৌঁছনোর পর আরো এতোক্ষণ গেল। এখন বেলা গড়িয়ে বিকেলে পৌঁছে গেছে। কেউই আর বাপ্পার সেই অপরূপ ঘরের মধ্যে বসে নেই। বাইরে খানিকটা মাঠমতো আছে, সেখানেই বসছে, ঘোরাঘুরি করছে, গাড়ি থেকে জল এনে খাচ্ছে।

শিলাদিত্য একবার বলে উঠলো, এই তারক, দাদা তোকে কোন্ বেলার জন্যে রান্না করতে বলেছিলো?

কোন্ বেলা আবার? দুপুরবেলা।

তো এখনো তো এলো না, কখন খাবে?

সেটা তারকের জানার রাইট নাই। বেলা পার করে ফিরলে, সেই ভাত সন্ধেয় খেয়ে নেয়।

চমৎকার! তো কই রাঁধতে তো দেখলাম না তোকে?

রাঁধার দরকার আছে মনে হলো না! আপনারা তো বললেন, সাথে অনেক খাবার, অনেক ফলটল আছে!

কথাটা বলার পর একটু ঘাড় চুলকে বলে তারক, তাছাড়া আপনাদের সামনে সেই লাল লাল বুকড়ি চালের ভাত। রাঁধি বা কোন্ লজ্জায়? ব্যান্ননের মধ্যে তো কাকুড় আর করলা! নীহারিকা হঠাৎ দুই কানে হাত চাপা দিয়ে বলে ওঠে, তুই থামবি? বিশ্বাসঘাতক নেমকহারাম!

নীহারিকার মুখে এই ভাষা? তাও কিনা ভাবী জামাইয়ের সামনে!

কিন্তু তারক কী এই গালাগালে জ্বলে উঠলো?

তা উঠলো না। শুধু একটু দার্শনিক হাসি হেসে ঠান্ডা গলায় কথাটার জবাব দিলো, হ্যাঁ, সেটা বলতে পারেন। কিন্তু তারক হতভাগার যে ডাইনে গেলেও পাতক, বাঁয়ে গেলেও পাক? কার কাছে বিশ্বাসের মর্যেদাটি রাখা উচিত তাই তো ভেবে পাই না। মায়ের চিন্তায় তো জলাঞ্জলি দিয়ে বসে আছি। বলতে গেলে সেখানেও এক প্রকার বেইমানি, নেমকহারামি করা হয়েছে। সারাজীবন বুড়ি মনে মনে ভেবে এসেছে তার একদিন ‘দিন’ আসবে। তো সে আশায় তো ছাই পড়ে বসে আছে। তবে বুড়িকে সাফ জবাব দিয়ে রেখেছি, তারকের আশা ছাড়ো।

নীহারিকা তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে, সাফ জবাব? তা দিবি বৈকি! কেমন গরুর চ্যালা!

সঙ্গে সঙ্গে তারক বলে ওঠে, অন্যকে কী দোষ দেবেন, গুরুখানা তো আপনারই ছিষ্টি মাসিমা! তো—আরে। ওই যে আসতেছেন ‘ম্যাস্টোরবাবু’! প্রায় লাফিয়ে এগিয়ে যায়।

শিলাদিত্য আর যুধাজিৎ এদিক ওদিক ঘুরছিলো, তাদের দেখা গেল না এখন।

বাপ্পা বলে উঠলো, এ কী? এর মানে? তোমরা? এভাবে? মা! কী হয়েছে বাড়িতে? ওঃ। পাপিয়ার ষড়যন্ত্র!

টুসকি এগিয়ে এসে বাপ্পার একটা হাত চেপে ধরে বলে, খবরদার, পরের মেয়েকে দোষ দিতে বসবি না বলছি দাদা! এসেছি আমিই। আমার বিয়েতে তোকে নিয়ে যেতে! এক ইঞ্চি ওজর করবি না! চল্ আমাদের সঙ্গে!

তা বলে টুসকির ওই দুঃসাহসিক আর নাটকীয় ঘোষণাটুকুতেই কাজ হয়েছিলো না কি?

অতো সহজ নয়। ফুঁ দিয়ে কী পাহাড় নড়ানো যায়? যায় না। যায়ওনি।

সমবেত শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছিলো।

‘বাপ্পা’ নামক অনড় পাহাড়তুল্য জনকে সপ্তরথী বেষ্ঠিত হতে হয়েছিলো। আর বিপাককালে যা হয়। চিরকালীন নিয়ম, একান্ত অনুগত জনও বিরোধী শিবিরে গিয়ে ওঠে। তাই হয়েছিলো। তারক যে সব মন্তব্য করছিলো, তাতে এই বিরোধী পক্ষেরই হাত শক্ত হয়েছিলো।

প্রথমটা অবশ্য বাপ্পা আচমকা এদের একসঙ্গে দেখে একটু হতচকিত হয়ে গিয়েছিলো। চমকে ভেবেছিলো, বাড়িতে কী ভয়ানক একটা কিছু দুর্ঘটনা ঘটে গেছে? তাই এভাবে সকলে মিলে—

কে? কে? কে সেই দুর্ঘটনার নায়ক? বাবা! দাদু! শিলু। শিলু ভাবতেই মনটা যেন অসাড় হয়ে গেল।…ঠিক! ঠিক! তাই হবে। মায়ের কপালে সিঁথিতে সিঁদুরের লেখা বাবার সম্পর্কে নিশ্চিত্ত করে দিয়েছিলো। আর দাদু দিদা? ওঁদের জন্যে শোকবার্তা বয়ে নিয়ে আসবেন মা? এমন মনে হয় না। শিলু! বুকের মধ্যে ভয়ানক একটা মোচড় দিয়ে উঠলো, কিন্তু সেই বোকাটে কাজটাকে লজ্জা দিয়েই যেন হঠাৎ পিছন থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠটি বেজে উঠলো, এই যে এসে গেলি তাহলে? ভাবনা হচ্ছিলো কোনো সূত্রে পুলিশের হানার খবর পেয়ে হয়তো আসামী ভাগা!…চেহারাখানা তো ফাইন বাগিয়েছিস। করেছিস কী? অ্যাঁ। চেনবার উপায় রাখিসনি একেবারে।

বাপ্পার বুকের মোচড়টা হাস্যকর হওয়ায় বাপ্পা অবজ্ঞাভরে বলেছিলো, তবু তো চিনলিও!

আর সেই মুহূর্তেই টুসকি এগিয়ে এসে ওই নাটকীয় ভঙ্গীর উক্তিটি করে বসেছিলো!

বিয়ে। টুসকির

এতেও অবশ্য আবার একটু থমকে ছিলো বাপ্পা। তাকিয়ে দেখেছিলো তার অনেকদিন অদেখা ছোট বোনটার মুখের দিকে। বরাবরই যাকে দেখলে মনটা স্নেহে ভালোবাসায় ভরে উঠতে চাইলেও, সেন্টিমেন্ট প্রকাশের ভয়ে, সাবধান হতে গিয়ে কঠোর হয়েছে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাব দেখিয়েছে।

এখন সেই মেয়ের মুখটা যেন আলাদা একটা লাবণ্য! দেখে—আর একবার দেখতে ইচ্ছে করে। যদিও সারাদিনের অভিযানের ফলে মুখের রং বদলেছে, চুলের স্টাইল ঘুচে গেছে, জামাকাপড় লাট মোচড়া। তবু ভিতর থেকে যেন একটা আলোর আভাস।

তবু বাপ্পা নিজ স্বভাবে বলেছিলো, বিয়ে! তাই না কী? যেতেই হবে? তো খুবই দুঃখিত। এখন তো আমার পক্ষে যাওয়া একদম অসম্ভব!

সঙ্গে সঙ্গে মা ঠিকরে উঠে বলেছিল, ওঃ। তাহলে কী ঘটলে তোমার যাওয়া সম্ভব হবে বাবা? মা মরলে শ্রাদ্ধ করতে যেতে? তাই বা কী? তোমরা তো আবার ‘ছেরাদ্দ পিণ্ডি মানোই না। ইচ্ছে করে ভাষাটা খারাপ করে বলেছিলো নীহারিকা।

আশ্চর্য! মনে মনে তো সারাক্ষণ ভেবে এসেছে, ছেলেটাকে দেখলেই তার ওপর আছড়ে পড়ে কেঁদেকেটে বলে উঠবে—এতো নিষ্ঠুর কেন রে তুই? কেন? কেন? তোর মনটা কী লোহা পাথর দিয়ে গড়া? মা বলে একটু দয়ামায়া ভালোবাসা নেই?

কিন্তু তেমন হলো না। ছেলের ওই হতশ্রী চেহারা আর হতশ্রী বেশবাস দেখে বুকের মধ্যে যে রাগ দুঃখ ক্ষোভ অভিমান কষ্ট উথলে উঠেছিলো, তার প্রতিক্রিয়াতেই সেই তার চির-অভ্যস্ত ব্যঙ্গের সুরই বেরিয়ে এসেছিলো!

কিন্তু দোষ দেওয়াটা উচিত হয় না নীহারিকাকে। তার সর্বদা হাহাকার করা মাতৃহৃদয়ের মধ্যে একটু প্রত্যাশা থাকা কি খুব বেশী প্রত্যাশা যে মাকে এভাবে দেখে ছেলেটা একটু বিহ্বল হবে, বিচলিত হবে। রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠবে, ‘মা! তুমি! তুমি চলে এসেছো’?

ছেলের মধ্যে সে আবেগ দেখা গেল কই?

প্রথমটা একটু বিহ্বলমতো ভাবে সবাইয়ের দিকে তাকিয়েছিলো। তারপর কিনা বলে উঠেছিলো, ‘ওঃ। পাপিয়ার ষড়যন্ত্র।’ তার মানে মায়ের দিকে চোখ পড়বার আগেই চোখ অন্যত্র চলে গিয়েছিলো।

আশাহত ক্ষুব্ধ হৃদয় এমন কতো কী ভেবে বসে!

অতঃপর অবশ্য বল গড়িয়ে চলেছিলো এ কোর্ট থেকে ও কোর্টে।…শিলাদিত্য ব্যঙ্গ করে বলেছিলো, তোদের নেতারা তো বাবা স্বজন-বাৎসল্যে রেকর্ড করে। তোরই বা এমন উলটো মতি কেন?

পাপিয়া বলেছিলো, ষড়যন্ত্রের নায়িকা হতে পারার গৌরবটির দাবি করতে পারলে তো বর্তে যেতাম বাপ্পাদা! সে দাবি কই? ব্যাপার অন্য। আমার শুধু গাইডের ভূমিকা!

অন্য সকলের সামনে সহজ হতে চেষ্টা করে সে। বুকের মধ্যে দামামা পিটলেও, রক্তের মধ্যে ঘুঙুর বাজলেও, নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে। এর নামই বোধহয় ‘লোকবল’। লোকবলই বুকের বল বাড়ায়।

সপ্তরথীর মধ্যে তো আবার বাপ্পার মতে, ‘একটা উটকো ছেলে। ওটা আবার কী করতে এসেছে সঙ্গে?’

অথচ মা কিনা ওর সামনেই বিচ্ছিরি রকমের একটা সীন ক্রিয়েট করে বসলো। বাপ্পা যখন কিছুতেই হেললো দুললো না, সকলের শত নির্বেদেও একইভাবে বলে চলেছে, বলছি তো আমার পক্ষে এখন যাওয়া সম্ভব নয়।…তখন মা কি না হঠাৎ চীৎকার করে বলে উঠলো, ঠিক আছে। তোরা ফিরে যা! আমি যাবো না। আমি এই নিষ্ঠুর ছোটলোকটার সামনে না খেয়ে পড়ে থেকে তিলে তিলে মরবো! ওর সামনে শাড়ির আঁচল গলায় ফাঁস লাগিয়ে ওই গাছটার ডালে ঝুলে পড়বো! আমি—আমি—

আর ওই রাস্কেলটা কিনা তাই শুনে হেসে বলে উঠেছিলো, ‘ও মাসিমা, কোন্‌টা আগে কোনটা পরে? দুবার মরা তো কোনো শাস্তের লেখে না।’

রাগে মাথা জ্বলে উঠেছিলো বাপ্পার।

তবু শেষ পর্যন্ত নীহারিকা যখন সত্যিই বাপ্পার কুঠুরিটার মধ্যে ঢুকে পড়ে অনড় হয়ে বসে থেকেছিলো, “কিছুতেই আমি হেরে গিয়ে একা ফিরবো না’ বলে এবং রাত্রি নেমে এসেছিলো এই বেয়াড়া বিশ্রী একটা জায়গায়, বাকিজনেরা গাড়িখানার ধারেপাশে দাঁড়িয়ে থেকেছিলো ‘শেষ রায়’-এর আশায়, তখন বাপ্পা বলে উঠেছিলো, ঠিক আছে যাচ্ছি তোমাদের সঙ্গে, কিন্তু গিয়েই ফিরে আসবো, থাকা চলবে না!

টুসকি তখন বলে উঠেছিলো, বেশ তাই যদি তোর ধর্মে হয়, তাই করিস। দেখিস না আমার বিয়ে। কিন্তু মাকে তো এখানে ফেলে রেখে চলে যেতে পারি না। মাকে বাদ দিয়ে কী আমি বিয়ের পিঁড়িতে–

বলে সেও লজ্জার মাথা খেয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেছিলো।

তারপরও অবশ্য বিস্তর কথার চাষ চলেছে। বাপ্পার হাড়জ্বালানো সেই উটকো লোকটা শেষ পর্যন্ত বলেছে—নিয়মের ফাঁস এড়ানো যায় না দেখছি! ‘এককথায়’ বিয়েটা হতে চলেছিলো, কিন্তু হবে কেন? ‘লাখ কথা ভিন্ন বিয়ে হয় না’ সে ট্র্যাডিশানটা তো বজায় থাকতেই হবে।…

আবার তারপরও বলেছিলো, কিন্তু মাসিমা, আপনি আপনার ওই সারাদিনের অস্নাত অভুক্ত ছেলেটাকে একটু জল পর্যন্ত খেতে না দিয়ে যা শাসানিটি দিলেন, সেটি কিন্তু খুব একখানা স্নেহময়ী জননীতুল্য হয়নি। বলতে হয়, ‘সব কথা পরে হবে, আগে তুই হাতমুখ ধুয়ে একটু খা তো!’ কী বলুন? ঠিক কিনা?

যতোক্ষণ না ছেলে গাড়িতে উঠছে, নীহারিকা পাথরপ্রতিমা। এখন কাঠ কাঠ গলায় বলে, ওদের এইরকম হৃদয়হীন মা দেখাই অভ্যাস।

তবুও তো আপনার কন্যেটি এখন থেকেই কান্না শুরু করেছে মাকে ছেড়ে অন্যত্র যেতে হবে বলে।

বাপ্পা সেই সময় রাগ চেপে বলে উঠেছিলো, আচ্ছা, আপনি কে বলুন তো? আপনাকে তো চিনতে পারলাম না!

রাগ তো হচ্ছিলোই। মার ওপর এতো ওর ফড়ফড়ানি কিসের? একেই তো চিরগার্জেন নীলুমামার ফড়ফড়ানি চিরকাল অসহ্য ছিলো, আবার এই নতুন গার্জেনটি জোটালেন মা কোথা থেকে?

তা কথা তো দেখছি বেপরোয়া আর গায়ে-পড়া।

বলে কিনা, সেরেছে। ‘আমি কে?’ এর উত্তর তো আমি নিজেই জানি না দাদা! আর চেনা? সেটাই কী সহজ? কে কাকে চিনতে পারে? চিনতে জীবন কেটে যায়।…তো যাক, হবে সে চেষ্টা পরে। এখন যথাবিহিত কাজগুলো হয়ে যাক। এই যে ‘বাবা তারকনাথ’, তুমি তোমার বড়দাবাবুর চান-এর ব্যবস্থাটি করে দাও, এবং নিজেও ঠিক হয়ে নাও। মায়ের স্টকে যা কিছু আছে দুজনে মিলে তার সদ্ব্যবহার করে নিয়ে গাড়িতে ওঠা যাক। চটপট করতে হবে। যদিও চাঁদের আলো রয়েছে তবু রাত করা ঠিক নয়।

তারক মনে মনে ভাবে, এটি তো দেখছি, ছোড়দাবাবুর সেই গাড়িবান বন্ধুটি। তো ইতিমধ্যে খুব জমিয়ে নিয়েছে দেখছি। ওর গাড়িতেই আসা হয়েছে দেখা যাচ্ছে। গাড়িবান লোকেদের এই একটা মস্ত সুবিধে। চট করে জমিয়ে নিতে পারে। যে কারণে এনাদের নীলুমামাটি সর্বঘটে কাঁঠালি কলা হয়ে থেকেছেন। তো সেই পোস্টটা কী এখন ইনিই নিয়েছেন? গাড়িখানা তো বৃহৎ আর মারকাটারি! নীলুমামার গাড়ির মতো ঘুণধরা নয়।

মনের কথা মনে রেখে প্রশ্ন করেছিলো, তো তারক না হয় পড়ে থাকলো। এতো জনাই কী গাড়িতে ধরবে?

কী সর্বনাশ! তারক পড়ে থাকবে কি?

এখন শিলাদিত্য বলে উঠলো, তুই না গেলে তোর বড়দাবাবুর ধাক্কা ধরবে কে? ‘এতো জনা’ আবার কী? বড় গাড়ি! এই তো পাঁচজনে তো এসেইছি। বাড়তি তুই আর দাদা। তো দাদা না হয় তোর কোলে চেপেই যাবে।

এ কথাটা অবশ্য দাদার আড়ালে। বাপ্পা যখন ফ্রেশ হতে গেছে।

পুরুলিয়া থেকে গাড়িতে রাঁচী যেতে কোন্‌খানে যেন ‘রাঁচী রোড রেস্টহাউস’ নামে পথিকদের জন্যে একটি মনোরম ঠাঁই আছে, আগে থেকে সেখানে তিনখানা ঘর বুক করে রেখেছে যুধাজিৎ।

ভাবী বরকে যতো দেখছে টুসকি, আপন ভাগ্যের’ মহিমায় মোহিত হচ্ছে! নীহারিকাও মোহিত হচ্ছে ভাবী জামাইয়ের কর্মদক্ষতায়। ঠিক নীলুদার মতোই চৌকস, আর সবদিকে নজর!

শিলাদিত্য অবশ্য মোহিত হচ্ছে না। বলতে গেলে যেন বেজারই হচ্ছে। হলেও বন্ধু, কোন পুরুষটি আবার অপর এক পুরুষের কর্মদক্ষতা দর্শনে মোহিত হয়। তাহলে আদিত্য নামের লোকটা চিরকাল অমন উল্টোপাল্টামি করে এলো কেন? এখন তো আবার খেঁকি হয়ে উঠেছে। কেবলমাত্র হীনমন্যতায় ভুগে ভুগেই তো? আমি যা পারি না ও তা পারে। আর সেই ‘পারার’ মহিমায় আমারই আপনজনেরা বিগলিত হয়। ছিঃ!

বাপ্পার মধ্যেও কী সেইরকম একটা হীনমন্যতা বোধ আসছে? যে বাপ্পা তার আশপাশের সবাইকে ‘মানুষ বলে ধর্তব্যই করেনি কোনোদিন, প্রায় সকলকেই ‘নিচু’ চক্ষে দেখে এসেছে, আরাম আয়েস বিলাসিতাকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখেছে, সেই বাপ্পা আজ ঘুমোতে যাবার আগে, ‘রেস্ট হাউসের’ ঘরের অ্যাটাচড্ বাথরুমে প্রাণভরে স্নান করে এসে আর তার আয়েসি বিছানায় গা গড়িয়ে শুয়ে পড়ে কিছুতেই যেন নিজেকে সকলের থেকে উচ্চস্তরের ভেবে আত্মপ্রসাদ অনুভব করতে পেরে উঠছে না।

ঘুম আসছে না! টুকরো টুকরো কিছু কথা যেন ছুরির মতো বিঁধছে।

তোর মোহ অঞ্জনটুকু চোখ থেকে মুছে একবার স্পষ্ট চোখে দেখতে চেষ্টা কর দাদা! ভেবে দ্যাখ তুই কিসের জন্যে জীবনটাকে বিকিয়ে দিয়েছিস?

যার যা আদর্শ সে সেই মতোই চলবে।

কিন্তু আদর্শটারই যে গোড়ায় গলদ! তোদের ‘গুরুধামে’র অবস্থাটি দেখছি তো? সত্তর বছরেই একটা লোহার প্রাসাদে মরচে ধরে গেল, একখানা বিশাল পাথরের প্রাসাদ, যাকে তোরা ‘অবিনশ্বর’ বলে মনে করে রেখেছিলি; সেটা বিশ্বজনের চোখের সামনে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়লো!

এ নিয়ে আমি কারো সঙ্গে তর্ক করতে চাই না।

কিন্তু বাপ্পাদা, তর্কে নারাজ হয়ে তারাই, যারা জানে সে তর্কে জিততে পারবে না।

তুমি আবার এসব কথায় কেন? ডাক্তার মানুষ রোগীর চিন্তায় থাকো না!

‘ডাক্তারের কাজ শুধু দেহের চিকিৎসারই নয়, মনের চিকিৎসারও বাপ্পাদা! তুমি তোমার ওই নিরক্ষর আদিবাসী ছাত্রদের ‘সমাজতন্ত্র’ শেখাতে বসে তাদের কী দিতে পারবে? যেটা তোমাদের আদি আশ্বাস, সকলকে অন্তত ভাতকাপড় আর মাথার ওপর আচ্ছাদন। তাই কী এদেশে সম্ভব করতে পারবে? এখনো ভাবো তোমরা? লোভ আর দুনীর্তি হাত ধরাধরি করে নিজেদের মধ্যে দিব্যি একটি সমঝোতা করে নিয়েছে এখানে। তার বাইরে বেরিয়ে পড়বার ক্ষমতা, ক্ষমতাবানেদের মধ্যে নেই। কাজেই অক্ষমদের হচ্ছে শুধু স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্নভঙ্গের দুঃখ বহন করা। বড়ো বড়ো কথা শুধু কথাতেই থেকে যায় বাপ্পাদা, কাজে লাগে না, তা তো চিরকালের পৃথিবীই দেখে আসছে! লোভই হচ্ছে মানুষের প্রধান মৌলিক বৃত্তি! টাকাই চিরকালের পৃথিবীর চাকা ঘুরিয়ে আসছে। এবং তাই ঘুরিয়ে চলবে!

চমৎকার। পৃথিবী সম্পর্কে শেষ রায় দেওয়ার ক্ষমতা রাখো তাহলে? এও তোমাদের ডাক্তারী শাস্ত্রে আছে না কি?

ঠাট্টা করে লাভ নেই বাপ্পাদা! কতকগুলো ব্যাপারে, নিরপেক্ষ চোখে দেখতে পারলে, শেষ রায় দেবার ক্ষমতা সকলেরই থাকে।

বাপ্পার মধ্যে এখন যেন অহঙ্কারের বদলে একটা হেরে যাওয়ার গ্লানি।

কারণ বাপ্পার দীক্ষাদাতা নেতারা বড় গোহারা হেরে ভূত হয়ে বসে আছেন। হেরে বসে আছেন লোভের কাছে, বাসনার কাছে, উচ্চাভিলাষের কাছে!

তারকটা পর্যন্ত বলছে, ছাড়ান দ্যান ওনাদের কথা বড়দাবাবু। এই তো মায়ের মনি বাড়ির ঘটনা দেখে এলুম সেবার। ওনারা আপনাদের মতোন কতকগুলান ছেলেপেলেকে সগগোলাভের পথ দেখাচ্ছি’ বলে চোখ বেঁধে কাঁটাবেন ছেড়ে দিয়ে, নিজেরা ‘মচ্ছিমূলো’ খাচ্ছে-দাচ্ছে, আয়েস করছে, ভোঁ বাজিয়ে লাল আলো জ্বালিয়ে ইয়া মটরগাড়ি চেপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আর যে যেখানে যতো আত্মজন আছে তাদের বাড়বিদ্ধি ঘটাচ্ছে! আবার শুনি নাকি লুকিয়ে বিদেশের ব্যাঙ্কে টাকা জমিয়ে জমিয়ে রেখে আসছে। আর আপনাদের? লবডঙ্কা। মা-বাপ ভাই-বন্ধু সব্বাইকার থেকে কেড়ে নিয়ে ভুলভুলিয়ায় ছেড়ে দিচ্ছে। আত্মজনের চোখে জল ঝরাচ্ছো আপনারা। আপনি তো বলতেন, ওরে তারক, দেখিস দেশে আর গরীব বড়লোক এত ভেদ থাকবে না, সবাই সমান খাবে, সমান পরবে। সমান স্টাইলে থাকবে। হচ্ছে তাই? হি হি!’

নাঃ। এতো আরামের বিছানাতেও ঘুম আসছে না। কারণ—ওইসব জ্বালাভরা কথাগুলোর মাঝখানে মাঝখানে, আবার একজোড়া মায়াময় ভালোবাসাভরা চোখ যেন বাপ্পা নামক কাঠ-পাথর ছেলেটাকেও বিচলিত করে চলেছে। নীরবে বলে চলেছে, বাপ্পাদা ‘জীবন’ কে গ্রহণ করায় কী অন্যায় থাকে? বাপ্পাদা, ভালোবাসাকে’ অস্বীকার করা জীবনকে নিয়ে কী মানুষের ভালো করা যায়?…

শেষরাত্রির দিকে একটু ঘুম এসেছিলো, ভেঙে গেল শিলাদিত্যর ডাকে, দাদা, চটপট সেরে নে। ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়তে হবে। রোদটা যতো অ্যাভয়েড করা যায়।

রাত্রে বলেই রেখেছিলো আমি তোর ঘরে থাকলে সারারাত বকবক করে তোর ঘুমের ডিসটার্ব করবো। দারুণ টায়ার্ড আছিস, মস্ত লম্বা একটা ঘুম দিয়ে নিবি দাদা। ভোরে উঠতে হবে!

সেই সঙ্গে নিজের শেভিং সেটটা আর একপ্রস্থ পোশাক দিয়ে রেখে বলে গিয়েছিলো, আগে আমার জামা তোর গায়ে আঁটতো না, এখন বোধহয় ঢলঢল করবে। একস্ট্রা একসেট সঙ্গে ছিলো, রেখে গেলাম। তোকে দেখে মনে হচ্ছে লম্বাতেও বুঝি ছোট হয়ে গেছিস। যাক, একটু ফ্রেশ হয়ে না গেলে বাবার পক্ষে ‘দেখা’ ক্ষতিকর হতে পারে। জানিস তো ভদ্রলোক এখন হার্টের রোগী। এদের বাথরুমে নতুন সাবান তোওয়ালে আছে। দেখে রেখেছি।

তো সেই হার্টের রোগী বাবার কথা ভেবেই কী বাপ্পা ফ্রেশ হতে গিয়েছিলো? না ওই শাওয়ারটা তাকে টানছিলো?

আঃ, নিজেকে উন্মুক্ত করে অঝোরধারা শাওয়ারের তলে সঁপে দেওয়ার যে কী আরাম, তা কি আগে কখনো খেয়াল করেছে বাপ্পা? কতোদিন এমন করে স্নান করতে পায়নি সে!

এখন মনে হচ্ছে যেন শরীরের প্রতিটি কোষ তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলো! জল পেয়ে বেঁচে উঠলো।

আচ্ছা এতোদিন তো বাপ্পা এই অভাবটা এমন করে অনুভব করেনি। তারকের বয়ে নিয়ে আসা সামান্য জলের সঞ্চয়েই তো কাজ মিটিয়ে নিয়েছে। বরং বেচারার কষ্ট হবে বলে, সাধ্যপক্ষে কম খরচে চালিয়েছে। মনে হয়নি মস্ত একটা অভাব রয়েছে। অথচ এখন মনে হচ্ছে কতোদিন ধরে কী বঞ্চিতই ছিলাম!

তাদের নলিন সরকার স্ট্রীটের পুরোনো প্যাটার্নের বাড়িটাতেও নীহারিকা নীলুদার সহায়ে অনেক আধুনিকতার ছাঁচ এনেছিলো। প্রধানত বাথরুম আর রান্নাঘরে। নীচের তলার সাবেকি রান্নাঘরটা তো ত্যাগই করে দোতলায় বানিয়ে নিয়েছিলো। নীচেতলার সবটাই প্রায় বাপ্পার নামে উৎসর্গ করা ছিলো। বসবার ঘর স্নানের ঘর। হ্যাঁ, স্নানটাই ছিলো বাপ্পার একমাত্র বিলাস। রাত এগারোটা বারাটায় ফিরেও ঘণ্টাখানেক ধরে স্নান করেছে। …সেটা কবে থেকে যেন ঘুচে গেছলো? ওঃ। সেই মাথা ফাটার পর থেকে। মাথার সেই ক্ষতটার জায়গায় এখনো হাত লাগলে চিনচিন করে ওঠে।

কিন্তু আর কোথাও কী কখনো চিনচিন করে উঠতো না? শৈশবে বাল্যের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেলে? কী মধুর সুন্দর ছিলো সেই সময়টা? দাদু দিদার ঘরের সামনের সেই ছোট্ট ছাতটায় লাট্টু ঘোরাচ্ছে দুটো ছোট ছেলে! একজন পারছে, একজন তেমন ভালো পারছে না। অথচ সেই ছেলেটাই বড়ো!…দাদু-দিদা হাসছেন, হাততালি দিচ্ছেন। একটা কথা প্রায়ই মনে পড়ে, দিদা বলে উঠলেন, আমার বড় খোকারে দ্যাখচ, যেন দেবদূতটি! রোদ লেগে কপালে ঘাম ফোঁটাতেও কী জেল্লা!

দাদু বললেন, দেবদূত তো? সে আর ওই লাট্টু ঘোরানোর মতো তুচ্ছ খেলায় জিতবে কী করে? হা-হা-হা। কেনই যে এই কথাটা মনে পড়ে বাপ্পার।

বেসিনের সামনের দেয়ালে টাঙানো ঝকঝকে আর্শিটার ওপর চোখ ফেললো বাপ্পা! কতোদিন এরকম একখানা বড় আর্শিতে নিজেকে দেখেনি বাপ্পা। দেখলো! দেখে যেন অবাক হলো। আমার মুখের চেহারাটা এই রকম হয়ে গেছে না কী? গায়ের ভিতরের রংটা হয়তো পুরনোর নমুনা ধরে রেখেছে একটু, কিন্তু মুখের চামড়াটা? যেন রোদে ঝলসানো কোনো একটা পাকা ফলের মতো! নাকি পুরনো ব্রোঞ্জের কোনো মূর্তির মতো!

এতোটা বদলে গেছে বাপ্পা, টের পায়নি তো।

আচ্ছা তারকটা তো কই…?

নাঃ, হয়তো সেও গেছে বদলে। তবে নিকষকালোর বদলটা অতো ধরা পড়ে না। হয়তো তারকের মা তাকে দেখে ডুকরে উঠে বলবে, এ কী চেহারা হয়েছে রে তোর তারক?

যে ডুকরে ওঠাটা বাপ্পা তার নিজজনেদের কাছ থেকে এক একবার দেখলো। সেই প্রথম একদিন, পাপিয়াও তো প্রায় ডুকরেই উঠেছিলো, এ কী চেহারা হয়েছে আপনার বাপ্পাদা!

বাপ্পার মনে পড়ছে বাপ্পা তখন ভাবতে চেষ্টা করছিলো পিসির বাড়ির এই মেয়েটা তাকে ‘আপনি’ বলতো কিনা। সেই কবে যেন হাসপাতালে তো দেখতেও এসেছিলো পিসিকে সঙ্গে নিয়ে।

তো তখন কী বাপ্পা কিছু কথা কয়েছিলো? মনে পড়েনি।

তবু বলে উঠেছিলো, আবার ‘আপনি’ কেন?

এবারে অবশ্য টুসকির সঙ্গে মিশে গিয়ে তুমি তুমিই’ করছে। যেন টুসকিরই মতো একজন! অথচ—দুটো গভীর আবেশময় চোখ জানিয়ে দিয়ে চলেছে, আমি তা বলে টুসকির মতো কেউ একজন নয়। আমি বিশেষ একজন। ওর মুখে কী অনির্বচনীয় লাবণ্য। ও তো দেখা যাচ্ছে রীতিমত সুন্দরী! আচ্ছা ওর হঠাৎ আমার মতো একটা বাউণ্ডুলেকে ভালোবাসতে আসবার কী দরকার পড়েছিলো? আশ্চর্য!

এবারে একসময় বলে ফেলেছিলো, আচ্ছা বাপ্পাদা, নিজের জিনিসকে তো লোকে যত্নই করে, ধরে আছড়ে মারে কী? তো শরীরটা তো তোমার নিজের জিনিসই?

এখানে জামাটা ছাড়বার সময় শিলটা দেখে দেখে বলে উঠেছিলো, কী রে দাদা, আহার্যের অভাবে কোনো কোনো সময় নিজের পাঁজরের খাঁজ থেকে মাংস কেটে নিয়ে চালিয়ে নিস না কী? পাঁজরে কখানা হাড় তা তো একনজরেই গোনা হয়ে গেল।

মা বলেছিলো, তোর চেহারা দেখে আমার মাথা খুঁড়ে মরতে ইচ্ছে করছে যে রে বাপ্পা।

তবু এখনো বাকি আছেন বাবা দাদু দিদা।

আচ্ছা আছেন তো সবাই ঠিকঠাক? না না, আছেন নিশ্চয়ই?

তবে সেই সর্বঘটে নীলুমামাই বা অনুপস্থিত কেন? পৃথিবী থেকে কেটে পড়েননি তো? আশ্চর্য, হঠাৎ এমন কথাটা মনে আসতে যেন একটা কষ্ট ভাব এলো।

আর্শিতে নিজের ছায়া! অথচ এখন সেখানে কেবলই অন্যের ছায়া। পিসি? পিসির কথাও মনে পড়ে গেল। আচ্ছা—এতো সব্বাইকে একসঙ্গে মনে পড়ে গেল কেন? …ওঃ। কারণটা এখন গিয়ে এই সব্বাইয়ের সঙ্গে মুখোমুখি হতে হবে ভেবে এই আতঙ্কে!

অনুভব করছে, সেই মুখোমুখি হওয়া মাত্রই প্রথম শব্দ উচ্চারিত হবে, ইস। এ কী চেহারা হয়েছে?’

অনুভব করছে। কারণ আর্শির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই শব্দটা তার নিজের মধ্যেই ধ্বনিত হয়েছিলো!

তবু তবু কেন পিসির বাড়ির ওই মেয়েটা বাপ্পার মনের মধ্যে এমন একটা অস্বস্তি ভরে দিয়ে বসলো? ঝেড়ে ফেলবার চেষ্টা করেও পেরে উঠছে না। লেগেই থাকছে।

নাঃ। মনের এই দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। বাপ্পা মনে মনে কঠিন হবার চেষ্টা করে।

কিন্তু, মজা এই, কাঠিন্যটা হঠাৎ হঠাৎ অন্যত্র বাজে খরচ হয়ে যাচ্ছে।

ব্রেকফাস্ট করতে বসে হঠাৎ বলে উঠলো, এতো লাকসারির কোনো মানে হয় না। সাধারণ কোনো ডাকবাংলোয় উঠলেও—

শিলাদিত্য বলে উঠলো, “সাধারণ’? সাধারণ কিছু তুই পাচ্ছিস কোথায়? অসাধারণকে তবু আগে থেকে কব্জা করে রাখলে —

সপক্ষে কিছু যুক্তি তো থাকবেই! বলে ডিমসেদ্ধ দুটো ঠেলে রেখে খেতে লাগলো।

বসেছে সকলেই একসঙ্গে। তারকও আছে একধারে। গম্ভীরভাবে বলে উঠলো, ঠেলে দিচ্ছেন তো, আমায় দ্যান। অনেককাল ভালোমন্দ খাই নাই। ফেলে দিলে তো আর বিল থেকে দামটা বাদ দেবে না।

সঙ্গে সঙ্গে সেই একদিনের কথা মনে পড়ে গেল, তিনটে মানুষেরই। বাপ্পার সেই পাতার কুঁড়েয় দুটো ডিমসেদ্ধ তিনজনে ভাগ করে খাওয়া।

পাপিয়া অজানিতেই তাকালো সেই দুটো মানুষের মুখের দিকে। আরো কঠিন হলো বাপ্পা। বলে উঠলো, ঠিক আছে, এবারে আর আমার সঙ্গে আসবি না। খবরদার। ভালোমন্দ খাবার জন্যে থেকে যাবি ‘মাসিমার’ কাছে।

মাসিমা অবশ্যই নীহারিকা।

তিনি আশায় বুক বেঁধে বলে উঠলেন, সে তো থাকবেই। তোকেই কি আর ওই অখদ্যে জায়গায় ফিরে যেতে দেবো।

ওই আনন্দেই থাকো। বলে উঠে পড়লো।

আবার গাড়িতে স্টার্ট দেবার আগে গাড়ির চালক যখন বলে উঠলো, দাদা তো বোনের বিয়েতে বোনের নেমন্তন্নয় যাচ্ছেন, এই হতভাগা লোকটারও ওই একই আর্জি! তার বিয়েটাতেও যাওয়া চাই।

তার মানে?

বাপ্পার তো ওর ওপর মেজাজ খাপ্পাই হয়ে আছে, তাই রুক্ষস্বরে বলে ওঠে, তার মানে? আপনাকে চিনি না জানি না—

বাঃ। এই তো কাল থেকে চিনলেন জানলেন। গিয়ে অবশ্য যথারীতি নেমন্তন্ন পত্তরও দেওয়া হবে। যেতেই হবে কিন্তু।

আশ্চর্য! খামোকা অন্য একজনের বিয়েতে—কবে সেটা তাই শুনি?

যুধাজিৎ মাথা চুলকে বলে, আজ্ঞে বিয়ের তারিখ লগ্ন সবই ওই একই সঙ্গে পড়ছে।

উপস্থিত সকলের মুখেই চাপা হাসি। কিন্তু বাপ্পার সেটা চোখে পড়ে না।

বাপ্পা প্রায় ব্যঙ্গের গলায় বলে ওঠে, চমৎকার। নিজের বোনের বিয়ে ফেলে আমি কার না কার বিয়েতে—

চাপা হাসিরা ফেটে পড়ে।

আর পাজি তারকটা কিনা, দাঁত বার করে বলে ওঠে, ওই কাঠফাটা রোদে, ঘুরে ঘুরে আর সাঁওতালগুলার সঙ্গে মিশে মিশে আপনার মগজটা শুকিয়ে ঘুঁটে হয়ে গেছে দেখছি বড়দাবাবু! বলি বিয়েটা তো একটা পার্টনারশিপ বেবসা তাই না? কাজেই ওই একটা বিয়েতে যোগ দিলেই আপনার দুটোর কাজ মিটে যাবে।

থাম, বোকার মতো বাজে বাজে হাসিসনি। মা, এর মানেটা কী?

মা কিছু বলার আগে পাপিয়া চাপা হাসির আলো মুখে ছড়িয়ে বলে ওঠে, কাল থেকে দেখছো বাপ্পাদা, বুঝতে পারোনি বাপ্পাদা, টুসকি আর ইনি দুজনে ওই একটা বিয়েরই দুই শরিক।

ওঃ। তাই।

বাপ্পা কটুগালয় বলে ওঠে, ওঃ। তাই। তা বোঝা একটু শক্ত বৈকি। কী করে জানবো বিয়ের আগেই জামাই শ্বশুরবাড়ির লোকের ওপর এতো সর্দারি করে বেড়াচ্ছে!

জ্বলন্ত দৃষ্টিটাকে অন্য দিকে ফিরিয়ে গাড়িতে উঠে বসে।

দৃষ্টিটা তো জ্বলবেই। তখনো যে সমবেত হাসির রেশ বাতাসে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তার মানে সবাই মিলে বাপ্পাকে নিয়ে মজা দেখছে।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *