Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi » Page 2

সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi

তখন থেকেই অপমানের জ্বালায় জ্বলছে মেখলা। বাবা যথারীতি অভিযোগে সোচ্চার হয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠতো, কী? এতোক্ষণে বাড়ির কথা মনে পড়লো? অথবা ‘ তোমরা সব ভেবেছ কী?’ এইরকম কিছু একটা বলে, তাহলে অবশ্যই রাগ হতো কিন্তু অপমান হতো না। রাগের প্রতিক্রিয়ায় পরে বাবাকে শুনিয়ে শুনিয়ে মাকে বলা যেতো, কী পরিস্থিতিতে এতো দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু নিঃশব্দ অভিযোগের উত্তর হয় না। …শুধু মনে মনেই উত্তরগুলো ডালাবন্ধ ঝাঁপির মধ্যে সাপের মতো গজরাতে থাকে। …কেন? মেখলা কী কিছু গর্হিত কাজ করে ফিরল? তাই অমন বরফ শীতল নীরব দৃষ্টি হেনে চলে যেতে হবে? এবং মাথাধরার ছুতো করে না খেয়ে ঘুমোতে যেতে হবে?

বয়ে গেছে। আমি ভালো করেই খেয়ে দেয়ে নিচ্ছি। বাবা হয়েছ বলেই মাথা কেননি তুমি। অবচেতনের কুটিল অন্ধকার থেকে একটা তীক্ষ্ণ মন্তব্য উঁকি মারে, বাবা হতে যে কত কাঠখড় লাগে, তা ভালোই জানা হয়ে গেছে। ছেলেবেলার মতো এখন আর বাবাকে পরম পিতা তুল্য মনে করবার বোকামি নেই।

অবশ্য মেখলার এতোটা সাহস পৃষ্ঠবল হিসেবে ছোড়দাকে পাওয়ায়। এ বছর গানের স্কুলে ফার্স্ট হওয়ায় শিলাদিত্য হঠাৎ ছোট বোনটার ভবিষ্যৎ গড়ে দেবার চেষ্টায় দায়িত্ববান হতে চাইছে। কাজেই কোনোখানে ভালো গানের জলসা হলে, বা নামকরা গাইয়ে বাজিয়েদের আসার সম্ভাবনা থাকলে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে টিকিট কিনে সঙ্গে করে নিয়ে যায় মেখলাকে। খুব একটা অনেক বড় দাদা নয় পিঠোপিঠিই, তবু দাদা তো? …আর তাদের পারিবারিক পরিবেশে মেখলা একা কোথাও যাবার কথা তো ভাবতেই পারবে না। তাই সেদিন বলেছিল, জীবনে কোনোদিন সামনে বসে ‘চাক্ষুষ চক্ষে’ দেখে রবিশঙ্করের সেতার শুনিসনি? বেচারা! আহা ঠিক আছে হয়ে যাবে।

মা অবশ্য তার ছোটছেলের এ ধরনের সুমতিতে খুশী। মা তো সর্বদাই বলে, তেমন চেষ্টার জোর থাকলে, এতোদিনে টুসকি রেডিওতে, টি.ভিতে গান গাইবার চান্স পেয়ে যেতো। ওর থেকে কত নীরেস গলা নিয়েও রুতজনা কেমন এগিয়ে যাচ্ছে। খুঁটির জোর আছে। এই যে ওদের ‘সুর ঝঙ্কার’-এর প্রধানা? তিনি একটু চেষ্টা করলে হতো না কিছু? হুঁঃ। মুখে তো ওর গলার খুব প্রশংসা করেন, কিন্তু আসল কাজের বেলায় কিছু না। শিলুটা যদি অন্তত—

শিলুর কাছে অবশ্য কোনো খুঁটির আশ্বাস নেই, তবে সে চায় তার গুণী বোনটা নিজস্ব জগতের একটু স্বাদ পাক, সে-জগতের বাতাসে একটু নিঃশ্বাস নিক। প্রশংসনীয় ইচ্ছাই। বড়দা বাপ্পাদিত্যটি একদম অন্য গ্রহের জীব। তার সঙ্গে সপ্তাহেও দুটো কথা হয় কিনা সন্দেহ!

কিন্তু মায়ের মনোবাঞ্ছা আর বাবার মানসিকতায় কোনো মিল নেই। বাবা এসব দেখলেই রাগে গরগর করে। বলে, “নিজে উড়ছিস ওড়, ধরে রাখবার উপায় নেই, বোনটাকেও আবার উড়তে মদত দেওয়া কিসের জন্যে?

তবে তেমন প্রকাশ্যে বলতে পারে না, নীহারিকার থাবাড়ি খেয়ে সামলে যায়। আজকের অভিযানের খবরেও আদিত্য অভিমত প্রকাশ করেছিল, সিনেমা নয়, থিয়েটার নয়, বাজনা শোনে। তার জন্যে আবার ঘটা করে যাবার কী দরকার? গানবাজনার জ্বালায় তো কান ঝালাপালা। টি.ভি. খুললেই গানবাজনা, রেডিও খুললে গানবাজনা, রাতদিন তোমাদের ক্যাসেটে গানবাজনা। আবার সময় নষ্ট করে ছুটে ছুটে যাবার কী আছে?

বাবার এসব কথা অবশ্য ওরা অমৃতং বালভাষিতং হিসেবেই ধরে নেয়। গোলা লোকেদের তো এইরকমই মানসিকতা হবে।

জানে, যাব, দেখব, ফিরতে একটু দেরি হলে, একটু তর্জন গর্জন শুনব, তেমন হলে তার বদলাও নিয়ে নেব, ব্যস। কিন্তু আজ পরিস্থিতি অন্য।

দোতলায় চারখানা ঘরের একখানা বাপ্পার দখলে, একখানা শিলাদিত্যর, একখানা বর্তমান কর্তা-গিন্নীর আর একখানা আপাতত যতদিন না ভিন্ন গোত্র হয়ে যাচ্ছে ততদিন মেখলার। অতএব নিজেকে নিয়ে ভাববার সুযোগ আছে।

আগে যখন প্রাক্তন কর্তা-গিন্নীর এই দোতলাতেই ঠাঁই ছিল তখন মেখলাকে শুতে হতো ঠাকুমার খাটে। অন্য খাটে দাদু। পচা লাগতো। বিছানায় শুয়েই ওঁদের যতো গল্প। আর দুই ভাইকে শুতে হতো একই ঘরে। বাপ্পার পক্ষে সেটা ছিল বিরক্তিকর। ব্যবস্থার বদল হয়ে বাঁচা গেছে। বুড়ো-বুড়িকে ছাতের ঘরে চালান করবার বুদ্ধিটা যে মার খুব জুৎসই হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।

এখন মেখলা একা ঘরে আলো নিভিয়ে আর পাখা খুলে দিয়ে শুয়ে পড়ে নিজেকে নিয়ে ভাবতে পাচ্ছে। আর আশ্চর্য, হঠাৎ দেখছে বাবার বিরুদ্ধে যে অভিযোগটা তীব্র হয়ে উঠেছিল সেটা কখন বিলীন হয়ে গেছে। এখন চোখের সামনে ছায়া ফেলে ফেলে ঘোরাঘুরি করছে একটা সদ্য দেখা মূর্তি। যার আকৃতিটা রীতিমত আকর্ষণীয় হলেও প্রকৃতিটা নয়। ওঃ! কী চ্যাটাং চ্যাটাং কথা। যেন বিশ্বনস্যাৎ ভাব! টাকায় সব কেনা যায়। রমণীর মন তো তুচ্ছ ব্যাপার। টাকার পাহাড় জমিয়ে তুলতে পারলেই দিকবিদিক থেকে মেয়েরা ছুটে এসে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সেই পাহাড়ের মালিকের প্রেমে পড়তে আসবে। ছোটলোক। …

কিন্তু সেই ছোটলোকটাকে কিছুতেই মুছে ফেলতে পারা যাচ্ছে না। তার শেষ কথাটা যেন একটা মোহময় মায়াজাল বিস্তার করতে চাইছে। …এখন ভাবছি গাড়িটা বেচে ফেলবো কি না।

কেন এই ভাবনা? মেখলা একবার চড়েছে বলে? ন্যাকামি! ঢং! মেখলাকে ঠাট্টা করা?

যতই বিরুদ্ধবাদকে জড়ো করতে থাকুক মেখলা, ঘুমের আগে পর্যন্ত সেই বাজে লোকটাই তার চিন্তাকে আছন্ন করে রাখে। …

সত্যিই কী কোনোদিন হঠাৎ এসে পড়বে না কী?

বলা তো হলো, কেন? শুধু এখানে আসার জন্যেই এ পাড়ায় আসা যায় না? দূর। কথার কায়দা ছাড়া আর কিছুই নয়। ভীষণ কায়দাবাজ। আচ্ছা ছোড়দা ঠাট্টা করে যা বলল, সেটাই সত্যি নয় তো? কোনো বড়লোকের আহ্লাদি মেয়ের প্রেমেফ্রেমে পড়ে কোনো দাগা পায়নি তো? কোনো দাগা আর কী? গরীব বলে হ্যানস্থা! যা স্বাভাবিক। লোকটা তাতেই মরীয়া হয়ে টাকাই পরমার্থ বলে এমন উগ্র মতবাদের আশ্রয় নিয়ে বসেছে। কীরকম বাড়ির ছেলে কে জানে?

ছোড়দাকে বেশী কিছু জিগ্যেস করতে গেলেই হয়তো সন্দেহ করে বসবে। টুকটাক প্রশ্নে জেনে নিতে হবে। কেন হবে, কোন্ দরকারে, সেটা অবশ্য মাথায় আসে না।

তা রাতেই যত গল্পের দোষে দোষী কী একা মেখলার বুড়ো বুড়ি ঠাকুমা ঠাকুর্দা? তার মা বাবাই বা কী? কিন্তু কেনই বা তা হবে না? নিতান্ত নিভৃত হবার জন্যেই তো রাত্রির সৃষ্টি। সংসারের আর কারো সঙ্গে এমন নিজেকে মেলে দিয়ে আলাপ করা সম্ভব?

আবার আর কার সঙ্গেই বা যথেষ্ট পরিমাণে হাড়াই ডোমাই ঝগড়া হয়ে যাবার পরক্ষণেই আবার গলাগলি সন্ধি সম্ভব?

যে যার স্বস্থানে প্রস্থান করলে নীচে নামবার সিঁড়ির দরজাটায় তালা লাগিয়ে নিজের ঘরে এসে ঢোকে নীহারিকা। হ্যাঁ, ও তালাটা সে নিজের হাতে লাগায়, এবং চাবিটা নিজের কাছেই রাখে। না রাখলে হয়? কাজলকে ভার দিলে? কে বলতে পারে নীহারিকার অজ্ঞাতসারে ওই ধুরন্ধর মেয়েটি নিঃশব্দে নীচের তলায় নেমে যাবে কিনা! নীচের তলায় লক্ষীছাড়া তারকটার স্থিতি না? সবদিক ভাবতে হয় নীহারিকাকে।

নিজের ঘরে ঢুকে এসেও দরজায় খিল লাগিয়ে,’পানপরাগ’-এর কৌটোটা হাতে নিয়ে গুছিয়ে বসে শায়িত স্বামীকে একটা ঠ্যালা মেরে কাঠগড়ার আসামীর প্রতি জজের উক্তির স্বরে বলে, তোমার আজকের আচরণটা কী রকম হলো?

উত্তর অবশ্য এলো না।

জেগে ঘুমোলে এতো চট করে ঘুম ভাঙার কথা নয়।

নীহারিকা আর একটা ঠ্যালা মেরে বলে, মেজাজ দেখিয়ে না খেয়ে পড়ে থেকে ধাষ্টামো ছাড়া অর কিছু হলো?

তথাপি নীরবতা।

বলি, মেয়েটা ছেলেটাকে যে তুমি না হোক এমন অপমান করলে, তার পরিণামটা ভেবেছ?

অপমান! ঘুমন্ত বাঘ গর্জে ওঠে।

অপমান মানে?

নয়তো কী? তোমার মেয়ে একটু গানবাজনা শুনতে গেছলো বৈ কোথাও গিয়ে ক্যাবারে ডান্স নাচতে যায়নি? তাও তো শুনি আজকাল অনেক মেয়ে মা বাপের অজান্তে তা যায় রোজগারের চেষ্টায়।

আদিত্য ক্রুদ্ধ গলায় বলে, এসব অ-সভ্য কথার অর্থ?

অর্থ? অর্থ হচ্ছে তোমার চৈতন্য করানো। আজকের কালকে তো চেনোনি এখনো! ভাই আদর করে বোনকে একটু এখান ওখান নিয়ে যায়, এতে তো তোমারই বর্তে যাওয়া উচিত। আজকালকার দিনে ক’টা ভাই এমন করে? বলি একটা মাত্রই তো মেয়ে? বাপ হয়ে মেয়ের জন্যে কিছু করেছ কোনোদিন?

আদিত্য আহত গলায় বলে, কিছুই করিনি?

করবে না কেন? মেয়েকে খেতে পরতে দিয়েছ। ইস্কুল কলেজের মাইনেটাও দিয়েছ, আর সেটাই যথেষ্ট ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করছ।

আদিত্য গম্ভীরভাবে বলে, আর কী করতে হয় ছেলেমেয়ের জন্যে?

নীহারিকা ধিক্কারের গলায় বলে, তা জানি। তোমার জানার জগতের দৌড় ওই পর্যন্তই। ছেলেমেয়ের বিশেষ করে আজকাল মেয়ের কেরিয়ার গড়ে তোলার জন্যে লোকে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল চষে বেড়িয়ে কী না করছে। যে লোকের নিজের এক পয়সার মুরোদ নেই, সেও কীভাবে কোথায় ধর্ণা দিয়ে স্কলারশিপ যোগাড় করে মেয়েকে হয়তো বিদেশেই পড়তে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এই তো তোমার নিজের বোনের দেওরই তো—

তার কথা বাদ দাও। একের নম্বরের ধান্দাবাজ।

তা আজকালকার যুগে ধান্দাবাজেদেরই জয়জয়কার বুঝলে? ‘ধান্দাবাজ’ বলে নাক কোঁচকালে কী হবে? কত ছেলে একটু তবলা পিটতে শিখেও ধান্দার জোরে আমেরিকা চলে যাচ্ছে।

সকলকে দিয়ে সব হয় না।

না হলে নতিস্বীকার করে মেনে নিতে হয়। বুঝলে? মেজাজ দেখাতে আসলে চলে না।

নীহারিকা উষ্ণ হয়, মেয়েটার ছেলেবেলা থেকে গানের ঝোঁক, গলাও ভালো, শিখে নিতে পারে তাড়াতাড়ি—তোমার একটু চেষ্টা যত্ন থাকলে ও অনেক উন্নতি করতে পারতো। তো এতো করে বলে মরে আজ পর্যন্ত মেয়েটাকে নিয়ে একদিন রেডিওতে অডিশান দেওয়াতে নিয়ে যাওয়াতে পারলুম না! গানের ইস্কুলটায় ভর্তি করে দিয়েছিলুম সেও আমি। সাঁতার ক্লাবে ভর্তি করে দিয়েছিলাম সেও আমি—

দিয়েছিলে–তো মেয়েটা ডুবে যেতে যেতে রয়ে গিয়েছিল তাই রক্ষে।

নীহারিকা ওই অতীত প্রসঙ্গের উল্লেখে উত্তপ্ত হয়ে বলে, সেটা তোমার মেয়ের নার্ভাসনেসের ফল। তোমারই মেয়ে তো! কতই আর হবে? খেলাধুলোতেও তো …।

আদিত্য আবার শুয়ে পড়ে বলে, তা একটা মেয়েকে সব বিদ্যেয় চৌকস হতে হবে তার কোনো মানে আছে?

মানে তোমার মতো কূপমণ্ডুকের কাছে নেই, আজকের সমাজের কাছে আছে। আজকের যুগে একটা ‘চৌকস মেয়ে’ হচ্ছে স্ট্যাটাস সিম্বল। বুঝলে? তায় তো তোমার মেয়ে দেখতে সুন্দরীও। তা এসবের মানেই জানলে কোনোদিন? জানো শুধু ঘরে দুটো টাকা এনে দিলেই সকল কর্তব্য সমাধা হলো। আর মনের জগতে? সেখানে তো সর্বদা এই চিন্তার চাষ — ‘বাবা মার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো? মা বাবা ক্ষুণ্ণ হচ্ছেন না তো? তেনাদের সম্যক্‌ মান মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে তো?”

আদিত্য আবার উঠে বসে, এই সব বলি আমি?

মুখে বল না, মনের মধ্যে কী হয়, সে কথা আমার ভালোই জানা। ওই ওনাদের জন্যেই আরো পুরোনো খুঁটি আঁকড়ে বসে থাকতে হয়েছে।

আদিত্য গম্ভীরভাবে বলে, ওঁরা তো সংসারের কোনো কথাতেই থাকেন না।

নীহারিকা ঝাঁজের সঙ্গে বলে, ‘থাকেন না!’ তবে—অবলোকন করেন। কখন কে ফিরছে, তাতে নজর ফেলে বসে থাকেন। বাধ্য হয়েই আমায় মিছে করে বলতে হলো, ‘বাপ্পা বলে গেছে আজ রাতে না ফিরতেও পারে।’

এই কথা বলতে হলো!

তা না বললেই তো রাত বারোটা পর্যন্ত বাপ্পা বাপ্পা করে হামলাবেন। না খেয়ে বসে থাকবেন। আমার যে জ্বালা কত! এই যে টুসকিরা ফিরলো, যে ছেলেটা গাড়ি করে পৌঁছে দেয়ে গেল, সে কে, কী বৃত্তান্ত সব হয়তো জিগ্যেস করতে বসবেন কাল। ছাতের আলশের ধারে দাঁড়িয়ে এই অবধি জেগে বসে থাকাটাই কেন? অ্যাঁ?

প্রসঙ্গর পরিবর্তন ঘটে।

আদিত্য বলে, গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে গেল? কোন্ ছেলেটা?

কেন? তুমি দেখোনি?

নাঃ আমি কোনো গাড়িফাড়ি দেখিনি। দরজা খুলে শুধু ওই দুই অবতারকেই তো দেখলাম।

চমৎকার। আমি কোথায় ভাবছি, তোমায় বলবো, শিলুকে জিগ্যেস করে জেনে নেবে ছেলেটি কে? কতদিনের বন্ধুত্ব? আর তুমি দ্যাখোইনি? দেখবে কোথা থেকে? রাগে যে অন্ধ হয়েছিলে। ও আমাকেই খোঁজ নিতে হবে। তোমার দ্বারা যে কত হয় তা জানা আছে আমার! তবে এইটি বলে রাখছি—এখন আর ছেলেমেয়ের ওপর বেশী মেজাজ দেখানো চলবে না, সেটি মনে রেখো।

মনে রাখবো!

ব্যঙ্গ করার কিছু নেই। এ যুগের এরা, কথার একটু উনিশ বিশে হয়তো নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, হয়তো বা গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেশলাই জ্বালায়। এ আমাদের আমল নয় যে সব মুখ বুজে সহ্য করবো। মেজাজ দেখিয়ে খেতে বসা হলো না বাবুর। লোকলজ্জা আমাকে দিব্যি বসে গরগরিয়ে খেতে হলো।

এখন নীহারিকার কণ্ঠস্বর ভারাক্রান্ত, আজ—চিংড়ি দিয়ে নতুন কপির তরকারি রাঁধা হয়েছিল।

আদিত্য হঠাৎ একটু হেসে ফেলে বলে, তা আমার ভাগটা কী আর ফ্রীজে তোলা নেই? আচ্ছা! খুব হয়েছে! নীহারিকা বলে, এখন ওঠো দিকি। ঘরে একটু মিষ্টি এনে রেখেছি, খেয়ে একটু জল খেয়ে ঘুমোও!

আদিত্য বিনাবাক্যব্যয়ে সেই চমচম দুটি গলাধঃকরণ করে চোঁ চোঁ একগ্লাস জল খেয়ে বলে, তো আমায় তো কই তখন একবার কেউ সাধতেও এলে না। সবাই তো বেশ—

নীহারিকা একটু ঢোক গিলে বলে, তখন তোমার ছেলেমেয়ের মেজাজ যা টনকো!

কথাটা অবশ্যই সত্য। তবে এক্ষেত্রে আংশিক সত্য।

‘বাবা খাবে না। মাথা ধরেছে’। শুনে, নয়নতারা কী একটু উসখুস করে বলে ওঠেননি, ‘অ মা। মাথা ধরার কারণে রাতে উপুস থাকবে? খালি পেটে মাথা আরো অধিক ধরে। কই দেখি—ঘুমায় গেছে না কী?’ বলে ছেলের ঘরের দিকে আসছিলেন, নীহারিকাই নিবৃত্ত করেছে। বলেছে, “আঃ ঘুমের বড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েছে—এখন আর—’

দরজার পর্দাটা বোধহয় একটু বেশী করে টেনে দিয়েছে।

তখন অবশ্য শিলাদিত্য বলেছে, আশ্চর্য! একরাত্তির না খেলে মানুষ মারা যায়? ডিসটার্ব করার দরকার কী?

আর মেখলা হি হি করে বলেছে, ‘জানিস না রাত উপসে হাতি কাবু! তাই না বুড়ি? অতএব ওদের ওপর দোষটা চাপানোয় দোষ হয়নি।…

কিন্তু নীহারিকা?

তার তো ‘চিংড়ি মাছ সম্বলিত নতুন ফুলকপির তরকারি’র জন্য মনটা করকর করছিল।

তবু ওই এক মনোভঙ্গী। যেটা অবচেতনের কারসাজি। যদি মায়ের ডাকাডাকিতে লোকটা উঠেই আসে। আসতে পারে, মাতৃভক্ত পুত্র তো। তাহলে ছেলেমেয়ের সামনে তার ‘প্রেস্টিজ’ থাকবে? হয়েতো বলেই বসবে, ‘বাবার অবস্থা হয়ে উঠেছিল—একবার ডাকিলেই খাইতে যাইব। তাই না মা?’

তা ওরা পারে। মা বাপকে নিয়ে ঠাট্টাতামাসা করতে ওদের বাধে না।

তাছাড়াও—আরও একটি ভাবভাবনা কাজ করেছে বৈকি। একটা গোলমেলে পরিস্থিতি যদি নীহারিকার বিরোধী পক্ষের হস্তক্ষেপে আয়ত্তে এসে যায়? তাতে তো নীহারিকারও প্রেস্টিজের প্রশ্ন।

নয়নতারাও সিঁড়ি বেয়ে উঠে সিঁড়ির দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন। তালা অবশ্য নয় শুধুই ছিটকিনি।

দুজনের দু’ঘরে খাট বিছানা। সিঙ্গল খাট। এ বয়সে যেমন হওয়া সঙ্গত। কিন্তু বেশীর ভাগ দিনই গল্প করতে করতে হাই ওঠা দেখলে, সত্যব্রত বলেন, ‘এইখানেই একটু গড়িয়ে নাও।’ এবং নয়নতারাও নিতান্ত বাধ্য মেয়ের মতো গুটিসুটি হয়ে, সেই সরুরই একাংশে শুয়ে পড়েন। রোগা হাড়-জিরজিরে মানুষ, কতটুকুই বা জায়গা লাগে?

তবু সত্যব্রত বলেন, দেখো যেন পড়ে আছাড় খেও না।’ এবং সাবধানার্থে নিজেকে খানিকটা সঙ্কুচিত করে নেন।

বিয়েটা বলতে গেলে নেহাৎই বাল্যে। বারো বছর পার হয়েছে মাত্র। বর অবশ্য বছর দশেকের বড়। বলতে গেলে আজীবনের সম্পর্ক। …সেই কাল থেকে এই কাল, জীবনের কত বাঁকে বাঁকে কত সুখদুঃখ, কত ওঠাপড়া, অতঃপর এই দেশভাগের অভাবিত ভয়ঙ্করতা। তবু দুটো মানুষ কোনো সময়ই বিচ্ছিন্ন থাকেননি। থাকা সম্ভব, সেটাই যেন মনে আসে না।

নদে জেলার মেহেরপুরের মেয়ে নয়নতারা, তাহেরপুরে মামার বাড়ি। পিসির বাড়ি শান্তিপুরে। ছেলেবেলাটায় এই তিনটে জায়গাই ছিল পৃথিবী। বিয়ে হলো পাবনায়। …বড় দুঃস্বপ্নেও ছিল না, এই সবের মাঝখানে হঠাৎ ভয়ানক এক বিদারণ রেখা পড়ে যাবে।… তবু পাবনায় থাকতে থাকতে—কথায় একটা ‘টান’ এসে গিয়েছিল। বাপের বাড়ি এলে সবাই বলতো তুই দেখছি বাঙাল হয়ে গেছিস।’

নয়নতারা রেগে বলতো, “কী যে কও তমরা। আমি তো বুঝি না।’…এদের মধ্যে হাসির ঢেউ পড়ে যেতো।

তা বাপের বাড়ি আসাআসিই বা ক’দিন? পাবনায় বৃহৎ বাড়ি বৃহৎ সংসার। বৌ ভিন্ন অচল।… নয়নতারার শ্বশুর পুণ্যব্রত গাঙ্গুলীও ছিলেন উকিল। খুব নামডাক।…বাড়িতে জনা তিন খুড়শ্বশুর খুড়শাশুড়ি, তাঁদের সন্তানসন্ততি, তাছাড়া—আশ্রিত প্রতিপাল্য কত লোক। ….’কাজের লোকই কম ছিল? বালিকা নয়নতারার মনে হতো—বুঝি অগুণতি। কত জন্য যে কত সময় আসছে, খাচ্ছে।… কেউ বা দালানের ওপর পেতল কাঁসার বাসনে, কেউ কেউ বা উঠোনে কলাপাতা পেতে। নিত্যদিনের খাওয়া, তবু ওটাই ওদের সুবিধে। আসবার সময় সঙ্গে একটা বড়সড় পেতলের ঘটি আনতো, আর একখানা কলাপাতা কেটে আনতো। ….অভাব তো নেই। বাড়ির ধারেকাছেই যত্রতত্রই তো কলাবাগনে।…পাতা কাটলে গাছের ক্ষতি এটা জানা থাকলেও মানা হতো না। কতই ক্ষতি হবে? কত কলা খাবে গেরস্থ?…

ওরা পাতাটা বিছিয়ে বসতো শূন্য ঘটিটা পেতে। একটা গিন্নীবান্নী দাসী এসে ঘটিটায় জল ঢেলে দিয়ে যেতো, আর পাতের পাশে রাখতো এক খামচা নুন, আর মুঠোখানেক কাঁচালঙ্কা।….অতঃপর সেই দাসীই রান্নাঘরের সামনের দাওয়ায় একখানা বড় গামলা আর একটা বড় কাঁসি পাততো।

হেঁশেল থেকে ভাত ডাল আর মাছ তরকাৱি আলগোছে ঢেলে দিতেন মেজখুড়ি। …আবার দাসী ক্ষেত্তরের মাও সেই উঠোনে পাতা পাতায় আলগোছে ঢেলে দিত সেসব।

এই ব্যবস্থায় কেউ কোনো ছুঁৎমার্গের নীচতা দেখতে পেতো না, এবং ভোজনকারীও অপমানাহত হতো না। এই নিয়মটি তো চন্দ্র সূর্যের মতই নিশ্চিত নিয়ম। এর মধ্যে আবার প্রশ্ন কিসের?…

খাওয়ার পর লোকটা পাতাটা মুড়ে নিয়ে চলে যাবে। আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়ে পুকুরে হাত মুখ ধুয়ে, ঘটিটা পুকুর থেকে ভরে এনে জায়গাটা ধুয়ে পরিষ্কার করে দিয়ে যাবে।

একজন নয়, দফায় দফায় এমন কতজন। যাদের দালানে বসবার অধিকার, তাদের সম্পর্কে এ নিয়ম নয়। তাদেরও আলগোছেই, তবে স্বয়ং মেজখুড়িই পরিবেশনকারিণী।….

নতুন বৌ হাঁ করে বসে বসে দেখতো, কী বিশাল একখানা ভাতের পাহাড় লোকগুলোর পেটের মধ্যে চালান হয়ে যেতো।…মেজখুড়ি বলতেন, ‘হ্যাঁরে আর দুটি ভাত দিই?’

সে একগাল হেসে বলতো, ‘তা আজ্ঞে দেন চারটি’।

যতবার জিজ্ঞেস করা হবে, একই উত্তর।

অবশ্যই আবার তার সঙ্গে ডাল চচ্চড়ি, দু’একখানা মাছ। ঘরের পুকুরের মাছ। গোনাগুনতির ধার কে ধারে?…

উঠোনে-বসাদের ভার ক্ষেত্তরের মার হাতে। সে যে বারবার জিগ্যেস করবে না, এ সন্দেহ ছিল বলেই নয়নতারার এক পিসশাশুড়ি তসর থান পরে মালা জপতে জপতে তদারকি করতেন, ‘অ ক্ষেত্তরের মা! গামলা খান আর একবার হেঁশেল ঘরের দুয়োরে পাত গে যা।…ব্যান্ননও আনবি খানিক।’

বৌ নয়নতারা ভাবতো, এরা তো রোজই খায়, তবে আবার নেমন্তন্নির মতো এমন ‘আর নিবি?…. আর দুটো নে—’ বলা হয় কেন? পেট না ভরলে তো চেয়েই নেবে।

তো একদিন বলেই ফেলেছিল এক ননদকে। বড়দের সঙ্গে তো কথা বলার রেওয়াজ ছিল না! সে তো হেসে গড়িয়ে বলল, ‘অতো খেয়ে আর চাইতে লজ্জা লাগে বোধহয়।’ আবার কথাটা চাউরও করল।

পিসশাশুড়ি শুনে একটু হাসলেন, মানুষজনকে খেতে বসিয়ে শুধোতে হয় বৌ! এটা নিয়ম।…বাড়ির জনদের শুদোই না? ছানাপোনাগুলানদের বারবার শুদোই না?…তো শিখে রাখো এসব। দু’দিন বাদে তো তোমারেও হেঁশেলের ভার নিতি হবে।’

তখন অবশ্য নয়নতারা শুনে শিউরে উঠেছিল রান্নাঘরে ভাতের হাঁড়ির আয়তন দেখে। দাউ দাউ করে কাঠের উনুন জ্বলছে, আর পরপর হাঁড়ি চড়ছে।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই নয়নতারা অবাক হয়ে দেখলো নিজেই সে তার লিকলিকে দু’খানা হাতে সেই বিশাল হাঁড়ি নামাচ্ছে।…বড় বড় পেতলের গামলার ওপর ঝুড়ি পাতা, ভিজে গামছা দিয়ে চেপে ধরে তাতেই হাঁড়িদের উপুড় করে দেওয়া।… ওতেই ফ্যান ঝরবে।… পরে রান্নাঘর সাফ করতে এসে ক্ষেত্তরের মা সেই সব ফ্যান ভর্তি গামলাদের বয়ে বয়ে নিয়ে যাবে গোয়ালে। ঢেলে দেবে তাদের ডাবায়। অতঃপর বাসনমাজুনিদের এলাকায় নামিয়ে দেবে গামলাদের।

গামলাগুলো যখন সোনা হেন ঝকঝকে হয়ে দাওয়ার ধারে উপুড় হয়ে হয়ে পড়তো, কিশোরী নয়নতারা ভাবতো, ‘বাবাঃ, এদের বাড়ি যে রোজই যজ্ঞি।’

হ্যাঁ, তখনও ‘এদের বাড়ি’।

কখন কোন্ ফাঁকে হয়ে গেল ‘আমাদের বাড়ি’। দেবাৎ বাপের বাড়ি গেলে, অনেক কিছুই দেখে বলতো, ‘আমাদের বাড়িতে এটি হবার জো নাই’।

কিন্তু খুব বেশীদিন কী নয়নতারাকে সেই বিশাল হাঁড়ি নামাতে হয়েছিল? ‘দেশভাগের’ সূচনা বা নামেতেই বাড়ির লোকজন যেন কমতে শুরু করলো। দালানে উঠোনে দু’প্রস্থ নেমন্তন্নি বসায়ও কিঞ্চিৎ ভাঁটা পড়লো।…. ছোট খুড়শ্বশুর সপরিবার কেষ্টনগরে শ্বশুরবাড়িতে চলে এলেন। পরে আরও গেলেন সেজখুড়ো।

তথাপি নয়নতারার বয়েসের হিসেবে, যা ছিল, তাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু কেউ বলেনি ‘আহা ছেলেমানুষ’! বৌ তো খাটবার জন্যেই।

শ্বশুর তখন বিগত। বিধবা শাশুড়ি শুচিবাইয়ের দাপটে, সকাল থেকে বিকেল অবধি পুকুরঘাটেই পড়ে থাকতেন।

ভোর রাত্তির থেকে প্রায় মাঝরাত্তির পর্যন্ত কাজকর্মের দায় মিটিয়ে শুতে আসা। এসে স্বভাবতই দেখতে হতো বরটি নিদ্রাগত। বেচারী বউ সেই বৃহৎ জোড়া খাটেও আস্তে আস্তে উঠে একপাশে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়তো।

তবে বর তো আর কুম্ভকর্ণের চ্যালা নয়, যে এই ঘটানার পরও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবে? …দরজায় খিল দেওয়ার শব্দ, চুড়ির শব্দ, এটুকুই প্রতীক্ষারতের ঈষৎ ঘুম এসে যাওয়া চেতনার ওপর ধাক্কা দেবেই। বর তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে, ‘আরে পড়ে যাবে না কী’? বলে সাপটে টেনে নিতো।…

আবার কোনো কোনোদিন কপট নিদ্রাও ছিল। সেদিন অন্য নাটক।

আজ এই গভীর হয়ে যাওয়া রাত্তিরে শুতে এসে নয়নতারার হঠাৎ পাবনার সেই বাড়ির বধূজীবনের কথা মনে পড়ে গেল।…সেও বৃহৎ বাড়ির একাংশের একটি নিভৃত দিকেই ছিল পুত্র সত্যব্রতের এলাকা। শোবার ঘর, সংলগ্ন ছোট একটা ঘর বাক্স প্যাঁটরা রাখবার। আর একটুকরো জাফরি দেওয়া বারান্দা। যেখান দিয়ে দেখা যেতো বাড়ির পিছনের কলাবাগান আর গোয়ালবাড়ি।

তবু কী মনোরম সেই দৃশ্য। যেন স্বর্গভূমি।

প্রথম যুগে তো সেই ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্তই স্বর্গ থেকে বিচ্যুতি। ভোরে নেমে যাবার সময় সেই জাফরিতে একবার উঁকি দিয়ে চলে যাবার সময় মনে হতো যেন—”স্বৰ্গ হতে বিদায়’। আর রাতে আস্তে এসে ঘরের সামনেটায় দাঁড়ালেই অনুভবে এসে যেতো স্বর্গে পুনঃপ্রবেশ।…পরে ছেলেমেয়ের জন্মের পর অবশ্য অনেক পটপরিবর্তন হয়েছিল, তবু নিজের সেই ঘর বারান্দাটিতে যেন ছিল স্বর্গদ্বার।…

পাবনার বাড়িতে উদয়াস্ত খাটুনি ছিল, সাজপোশাকের কোনো পারিপাট্যের প্রশ্ন ছিল না, সকলের মিটিয়ে ভাত খেতে বসতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল, একবারের জন্যে হয়তো ভাঁড়ারের মেজেয় একটু আঁচল পেতে গড়িয়ে নিয়েই আবার ‘সন্ধেবাতির’ তাড়ায় উঠে পড়া। এবং অতঃপর রাতের হেঁশেল।…তথাপি কোনোদিন কী মনে হয়েছে তরুণী নয়নতারার, ‘খুব কষ্টে আছি’। এখনো মনে হয় কী সুখের দিনই ছিল সেসব।

তরুণী ছাড়া আর কী? পনেরো বছর বয়সে আদিত্য জন্মেছে, সেই আদিত্য মাত্র দশ বছরের হতেই তো দেশছাড়া।…মাত্র পঁচিশ বছর। এখন এ বয়সে বেশীর ভাগ মেয়েরই বিয়ে হয় না।…

অথচ নয়নতারা?

পাবনার সেই বাড়ির আর পাড়ার সবাই জানতো নয়নতারা গাঙ্গুলীবাড়ির গিন্নী .সত্যব্রত যে মাত্র একটিই ছেলে পুণ্যব্রত গাঙ্গুলীর।…খুড়শাশুড়িদের অবশ্য মাথার মণি করেই রাখতেন নয়নতারা, পিসশাশুড়িকে গুরুদেবী-তুল্য। তবু আশ্রিতজন প্রতিবেশীজন সকলেই জানতো নয়নতারার কাছেই প্রত্যাশার পাত্রটি ধরলে পূরণ হবেই। নয়নতারার ওপরই অগাধ আস্থা, অগাধ ভালোবাসা।

এখন নয়নতারা মাঝেমাঝেই সেই ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেন।…সে কোন নয়নতারা?…এখনকার এই মানুষটাই না কী? এখন যাকে নিজস্ব নিত্য প্রয়োজনের তুচ্ছতম বস্তুটির জন্যেও অপরের মুখাপেক্ষী হয়ে অপেক্ষার ক্ষণ গুনতে হয়। ….হয়তো নিজের প্রয়োজন আরো সঙ্কুচিত করে ফেলা যেতো, কিন্তু সত্যব্রত নামের এই মানুষটিকে নয়নতারা অসুবিধেয় পড়তে দেবেন কোন প্রাণে?… তাছাড়া—তাকে আজকের সম্যক অবস্থাটির স্বরূপ থেকে যতটা সম্ভব আগলে রাখতে চেষ্টা যে।…মানুষটা তো এখন সবকিছু স্বকর্ণে শুনতে পায় না, তবে তার কানে সাংসারিক সংবাদসমূহ শোনাবার সময় সংবাদটাকে মিহি চালুনিতে ছেঁকে মোলায়েম করে ফেলায় দোষ কী। …

বয়েস হলে কী নিজের থেকে বয়েসে অনেক বড়, আর চিরকাল যার কাছে ছিল আপন মানসিক আশ্রয়, তার উপর বাৎসল্য স্নেহের মতোই একটা মমতা জন্মায়?…

নয়নতারা এসে দেখলেন, টেবিল ল্যাম্পটা নিভানো, জানলা দিয়ে আকাশের আলো আসছে, সেই মায়াময় আলোয় সত্যব্রতর ঘুমিয়ে পড়া মুখের দিকে তাকিয়ে যেন সময়ের সীমা হারিয়ে গেল।…উজান ঠেলে নিয়ে গেল নয়নতারাকে অনেকখানি পিছনে। যেন নবীনা নয়নতারা নিঃশব্দে এসে শয়নকক্ষে ঢুকে এলেন।… তাকিয়ে দেখলেন মানুষটা ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরে আলো জ্বলছে না, জানলা দিয়ে আকাশের আলো এসে পড়েছে ঘুমন্ত মুখটার ওপর।

নিজের শূন্যতাবোধের থেকেও, মন কেমন করে উঠতো, ওই ঘুমিয়ে পড়া লোকটার জন্যেই। রাগ করতে জানতো না, অভিমান দেখাতেও না। বরং ষোলো আনা সহানুভূতি ওই বেচারী বৌটার ওপরই।… তার যে এতোক্ষণে ছুটি মিলল, এতে যেন নিজেই কিছুটা অপরাধী।…

অথচ তখন নয়নতারা তার সমবয়সিনীদের কাছে সব শুনেছে রাগে ঘরে যেতে দেরি হলে কত সময় রাগীবাবুরা রাগ দেখাতে ছাতে গিয়ে শুয়ে থাকেন। অথবা—সারারাত্তিরে আর কথাই কইতেন না, কখনো ঘুমের ভান করে পড়ে থাকেন। বৌ বেচারাকেই কেঁদে-ককিয়ে অবস্থা সামাল দিতে হয়।

এই মানুষটি চিরকাল বড় স্নেহ ল।

সেই নবীনা নয়নতারা যেন এই প্রবীণা নয়নতারাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তেমন কুণ্ঠিত আর দুঃখিত মনটি নিয়ে আস্তে ঘুমন্ত মানুষটার কাছ ঘেঁষে গুটিসুটি শুয়ে পড়েন।

আশ্চর্য! ওই লোকটাও কী উজান বেয়ে পিছনে চলে গিয়েছিল এতোক্ষণ? তাই ‘কপট নিদ্রা’র পার্ট প্লে করছিল? আর এখন সেই যুবক সত্যব্রতর মতই আবেগঘন স্বরে ‘আরে পড়ে যাবে নাকি’? বলে কাছে টেনে নেয়!

নয়নতারা রোগা একটুখানি, পাবনার গাঙ্গুলীবড়ির কাঠামোয় গড়া সত্যব্রত এখনো বেশ পুষ্ট বলিষ্ঠ!

কানটাই তাঁকে মেরেছে। নচেৎ আরো বেশ কিছুদিন ওকালতিটা চালিয়ে যেতে পারতেন।

কাছে টেনে নিয়ে বললেন, একটা চড়াই পাখির শরীর।

নয়নতারা একটু হেসে বললেন, তা বলে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাবো এমন ভয় করো না।

সত্যব্রত তাঁর মাথায় একটু আদরের হাত বুলিয়ে বললেন, নীচে খুব একখানা নাটক হচ্ছে বোধহয়?

নয়নতারা বললেন, আজ আবার অন্যরকম। যাকগে ওসব কথা।…তবে ছেলেটা মাথা ধরেছে বলে খায়নি, সেটাতেই মনটা কেমন করছে। সুখের সংসার বাইরের কোনো জ্ঞাতিগোত্তর নাই, শুধু নিজেদের মধ্যেই যে ক্যান এমন অশান্তি সৃষ্টি করে! …দুর্মতি! …আজ আমার কী মনে হচ্ছিল জানো? যেন পাবনার বাড়িতে রয়েছি। আর—

সত্যব্রত ব্যাকুল গলায় বললেন, সত্যি? তোমারও? আমারও যেন ঠিক তাই। আজকের বাতাসটা যেন সেই আগের মতো—

তা নয়নতারার ছেলে যদি মাকে বলে, “তোমার ফিসফিস কথাও বাবা বেশ শুনতে পান—’ খুব ভুল বলে কি?

সত্যিই তো—নয়নতারা তো এসব কথা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছিলেন না।…

ওদের নামিয়ে দিয়ে যুধাজিৎ গাড়িটাকে আস্তে আস্তে চালিয়ে নিয়ে ফিরতে থাকে। অথচ—এখন রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা, ঝড়ের বেগেই চলে আসতে পারতো। তা এলো না। কেন এলো না কে জানে? সময়টুকু একটু তারিয়ে উপভোগ করার জন্যে?

উত্তর থেকে দক্ষিণ। সময় নেহাৎ কম লাগবে না।

খানিকক্ষণ যেন কিছুই ভাবছিল না যুধাজিৎ। হঠাৎ একসময় ভাবল, আচ্ছা আসবার সময় আমি অমন একটা বোকাটে সেন্টিমেন্টালের মতো কথা বললাম কেন? গাড়িটা তো আমায় বেচতেই হবে। খদ্দেরের সঙ্গে কথা প্রায় ঠিক। শুধু নিজে হাতে দু’দিন চালিয়ে দেখতে চায় বলেই গাড়িটাকে নিয়ে বেরিয়েছিল। না বেচলে চলবে?

চলে এসে ল্যান্সডাউন মার্কেটের কাছাকাছি একটা গাড়ি-সারাইয়ের কারখানায় এলো। করোগেটের সিটের দিগগজ একখানা গেট খুলে বেরিয়ে এলো কারখানার মালিক। পরনে লুঙ্গি, গায়ে একখানা চেককাটা ফতুয়া। ভেতরে অনেকখানি জায়গা।

নিচু গলায় দু’একটা কথা হলো। মনে হলো যুধাজিৎ গাড়িটার মেরামতির যৎসামান্য একটু খুঁৎ-এর কথা বলছে। মালিক জোরে জোরে মাথা নাড়ল। ভাবটা যেন ও কিছু না।

তারপর গাড়িখানাকে ওই এবড়ো-খেবড়ো ফাঁকা জমিটার ধারে একটা ঢাকা গ্যারেজের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। এরপর যুধাজিৎ খুব জোর পায়ে একটু হেঁটে এসে ওই কারখানার কাছাকাছি একটা বাড়িতে এসে কড়া নাড়লো।

কিন্তু এ কী শিলাদিত্য কথিত সেই কলেজের কাছের (অর্থাৎ ওদের কলেজ আশুতোষ কলেজের) বড়সড় দোতলা বাড়িটা? যেখানে শিলাদিত্য ছাত্রাবস্থায় মাঝে মাঝেই আসতো!

নাঃ! এ সে বাড়ি নয়। এবং সত্যি বলতে ‘বাড়ি’ নামের যোগ্য কিনা তাই সন্দেহ। ‘বাসা’ বলাই সঙ্গত। যেখানে বাস করা হয়, সেটাই ‘বাসা’। পাখির বাসাও বাসা। এই গলি রাস্তাটার নাম একটা আছে তবে সেটা চিঠির ঠিকানা সময় ছাড়া অন্য কোনো সময়ে ব্যবহার হয় না। সবাইয়ের মুখে মুখে শীতলাতলা’।

হ্যাঁ, এখানে কোন্‌খানটায় যেন একটি শীতলামাতা প্রতিষ্ঠিত আছেন, তাই জায়গাটা ‘শীতলাতলা” নামেই পরিচিত হয়ে গেছে। যুধাজিৎ-এর মনে পড়ে ছেলেবেলায় তার একবার জলবসন্ত হয়েছিল, সেরে যাওয়ার পর মা এই শীতলাতলায় পুজো দিতে এসেছিলেন।

কিন্তু শুধুই কী ওই একদিন, কত কারণেই তো একদা বনছায়া এই রাস্তাটা পার হয়ে হয়ে এদিকওদিক গেছেন। ছেলেদের নিয়ে ম্যাডাক্স পার্কের দুর্গাঠাকুর দেখতে, তিনকোণা পার্কের জমজমাট কালীঠাকুর দেখতে। তখন কোনোদিন কী ভাবতে পেরেছিলেন এই শীতলাতলায় মন্দিরের সেবাইতের জীর্ণ একখানা একতলা বাড়ির একাংশ ভাড়া নিয়ে সেখানে বাস করবেন?…মানুষ কত কীই ভাবে। কত কীই স্বপ্ন দেখে। আবার কতসময় এমন অনেক অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপিত হয়, যা তার দুঃস্বপ্নের মধ্যেও ছিল না কোনোদিন।

অথচ এটাই ঘটনা যে গোপাল ভট্টচায্যির বাড়ির একাংশে দু’খানা ছোট্ট ছোট্ট ঘর আর আনুষঙ্গিক যা লাগে, রান্নার জায়গা, স্নানের ঘর ইত্যাদি তাই নিয়ে ছোটছেলের সঙ্গে বাস করছেন।…

হ্যাঁ যুধাজিৎকে বনছায়া চিরকালই ‘ছোটছেলে’ই বলেন। এটাই বনছায়ার শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতা।

দরজা খুলে দিলেন বনছায়া। বললেন, কী রে এতো রাত হলো? বলেছিলি যে ফাংশান সাড়ে ন’টা পর্যন্ত। তারপর দলকে হল ছেড়ে দিতে হয়।

যুধাজিৎ ঢুকে এসে সেই দীনহীন বাড়ির মধ্যেও সোফাসেটি-ডিভ্যান সাজানো ঘরের মধ্যে চলে এসে বসে পড়লো। এই ডিভ্যানটাই এখন যুধাজিতের রাত্রির শয্যা।

চিরকালের বাড়িটা ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে, তার বহুবিধ আসবাবপত্রকে নয়ছয় করে বাড়ি খালি করে দিতে এসেছে, তবু যতটা সম্ভব এর মধ্যেই এনে ভরতে হয়েছে। পাশের ঘরটাতেও তো বনছায়ার চিরকালের জোড়া খাটটা পাতা। যাতে ঘরটার প্রায় সবটাই ভর্তি!

বসে পড়ে বলে উঠল যুধাজিৎ, যা বলেছিলাম, তা কাঁটায় কাঁটায় সত্য মা।

তাহলে?

তাহলে? যুধাজিৎ বলল, বলতে পারো একটা অ্যাডভেঞ্চার করে এলাম।…কী? অবাক হচ্ছো? কই হ্যাঁ করছো না তো? একটু হাঁ করবে তো?…কী হয়েছিল জানো?…হল থেকে বেরিয়ে দেখি আমার এক কলেজীকালের বন্ধু—ও, শিলাদিত্যকে তো তুমি জানো? কত সময় কলেজফেরৎ এসে তোমার কাছে খাবার খেয়ে গেছে।…তো তার সঙ্গে দেখা। শুধু সে নয় সঙ্গে আবার তার এক ছিচকাঁদুনি বোন।…রাত হয়ে গেছে প্রায় কাঁদো কাঁদো, ছোড়দা বাড়ি গিয়ে কী হবে?…তো এবারের গাড়িটাও টেস্ট করতে নিয়ে বেরিয়েছিলাম জানো তো?…খুব রাজাই চালে বললাম, “চল তোদের পৌঁছে দিয়ে আসি’….

হেসে উঠে বলে, তো তার বাড়ি হচ্ছে সেই শ্যামবাজারের মোড়ের কাছে।….

কাজেই— মা বললেন, তারপর? এখন খাওয়াদাওয়া হবে তো? না কী বন্ধুর বাড়িতে দারুণ খেয়ে আসা হয়েছে?

মাই গড। আমি তাদের বাড়ির মধ্যে ঢুকেছি না কী?…বন্ধ দরজার সামনে দুটি ভীতকাতর ভ্রাতা ভগিনীকে দাঁড় করিয়ে রেখে সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে স্টার্ট মারা।

ওমা। চল চল। বিকেলেও কিছু খেলি না—। এখন তো আবার চান করতে বসবি। চটপট সেরে নে বাবা।…

ছোট্ট ঘর দু’খানাই শুধু জিনিসপত্রে বোঝাই নয়, রান্নাঘরেও জায়গার বালাই নেই, ছোট একটা খাবার টেবিল আর একটা চেয়ারেই।

বনছায়া ছেলের খাবারটা সাজাতে বসেন সেই টেবিলে। খাওয়াদাওয়ায় বরাবরই একটু ‘বাবু’ তাঁর এই ছোটছেলে।…সেই মতই ব্যবস্থা রাখেন বনছায়া। বহিরঙ্গে অবশ্যই দারিদ্র্যের চেহারা যথেষ্ট পরিস্ফুট, তবে ভিতরটা তত নয়।

যুধাজিতের বাবা বলতেন, “মানুষের অবশ্য প্রয়োজনের’ মধ্যে তিনটি হচ্ছে-‘খাওয়া’, ‘পরা’ এবং ‘থাকা’ তাই না? তা কোনটিকে তুমি সবথেকে প্রাধান্য দেবে বলো তো?”

ছেলেমানুষ যুধাজিৎ বলতো, ‘তা কী জানি? বোধহয় খাওয়াই। না খেলে মানুষ বাঁচে না।’

‘তা ঠিক। তবে আমার মতে বাকি দুটো খারাপ হলে, সে বাঁচার কোনো মানেই হয় না।’

অতএব?

অতএব তার মধ্যে প্রথম প্রাধান্য দেওয়া উচিত ‘পরা’কে। কারণ তোমার সম্পর্কে যা কিছু ধারণা বা জানা, সেই বাবদ তুমি শুধু ওইটুকুই নিয়ে লোকসমাজে প্রকাশিত হচ্ছো। তাই কি না? সবাই তোমার বাড়িতে চলে এসে দেখবে না তোমার ‘খাওয়া’ ‘থাকার’ ব্যবস্থা। ‘পরার’ পর প্রধান হচ্ছে থাকা। সম্ভবমতো ভালো জায়গায় ভালোভাবে থাকাটাই জরুরি।…লোকে সেটাই দেখবে।…তোমার রান্নাঘরে কী রান্না হচ্ছে দেখতে আসবে না।’

বনছায়া বলেছেন, ছেলেকে তো বেশ শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। লোক দেখানোটাই বুঝি সব?

রণজিৎ বলেছেন, সব কিছুতে অবশ্যই নয়, তবে—নিতান্ত ‘ব্যক্তিগত’ এই তিনটিতে লোক দেখানোর দরকার আছে ছায়া। সামাজিক মানুষজীবনে এই জিনিসটা তো সব থেকে বড় দরকার, অন্যের চোখে শ্রদ্ধা সমীহর পাত্র হওয়া! তাই না? তো কেউ যদি লোকসমাজে একটা ছেঁড়া ময়লা সাজে সেজে যায়, কেউ তাকে সমীহ করবে? সমাজছাড়া সাধুসন্নিসী হয় আলাদা কথা।…আবার দেখো—কেউ যদি এসে দেখে তুমি নেহাৎ দীনহীনভাবে থাকো, সঙ্গে সঙ্গে তোমার সম্মানের পারা অনেক ডিগ্রী কমে গেল। উল্টোটা হলে, ফলটা উল্টোই।

বনছায়া হাসতেন। বলতেন, তোমার যুক্তি অকাট্য।

কে জানতো পাকেচক্রে সেই বনছায়াকে আর তার ছেলেকে এমন দীনহীনভাবে থাকতে হবে। যুধাজিৎ অবশ্য রোজ একগাল উপদেশ বর্ষণ করে, আর কিছুটা দিন মা। তারপর দেখো—ধরে নাও তোমার এখন রাক্ষসের হাতে বন্দিনী রাজকন্যার মতো দশা।

ওমা। রাক্ষসটা আবার কে?

কেন? এই আমি।…আমি বাদ না সাধলে, ছোটখাটো নতুন আর সুন্দর একটা বাড়ি তো তোমার হতো।

বনছায়া বলেন, নাঃ। এখন তোর স্টাইলেই ভেবে দেখছি—ছোট্টয় তেমন সুখ নেই। কোনোমতে একটা মাথা গোঁজার আশ্রয় বানিয়ে ফেললে সেই মাথা গোঁজাটাই থেকে যাবে। মাথা তোলা আর হবে না।

মা। মনে হচ্ছে এই ভাবধারায় কপিরাইটটা আমার।

বনছায়া হেসে ফেলে বলেন, তা হতে পারে। অজ্ঞাতসারে আত্মসাৎ করে বসে আছি।

ভিজে ভিজে পিঠটার ওপর একখানা বড়সড় শুকনো তোয়ালে চাপা দিয়ে খেতে বসে যুধাজিৎ বলে, আচ্ছা মা, এতোরকম করার কী দরকার বলো তো? শুধু শুধু খাটুনি?

বনছায়া বলেন, এতো আবার কী? আর খাটুনিই বা কী? একটা ছেলের রান্না! এই তো কাজ।

একটা ছেলের যে একশোটার তুল্য ঝক্কিই বাবা। না না, কাল থেকে খুব সামান্য কিছু রাঁধবে।

তোর হুকুমে না কী? তোর হুকুম মানতে আমার দায় পড়েছে।

আমার আচরণটা কিন্তু বাবার মতবাদের বিরোধী হয়ে যাচ্ছে মা। বাবা কী বলতেন মনে আছে তো?

বনছায়া একটু গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলেন, শেষজীবনে কোন কাজটাই বা তাঁর মনের মতো হয়েছিল জিতু?…মনের কন্ঠেই মানুষটা…

হঠাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে সহজ গলায় বলেন, তোর দাদার একটা চিঠি এসেছে। তাই না কী! বিরাট ব্যাপার।

তা ব্যাপারটা বিরাট হলেও—চিঠিটা বিরাট নয়। পোস্টকার্ডে দু’লাইন। ছেলের স্কুলের ছুটি হয়েছে, কলকাতায় যেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু গিয়ে কোথায় উঠবে ভেবে—

যুধাজিৎ বলল কেন? প্রধান জায়গাটির কী হলো? সেটা তো কেউ কেড়ে নেয়নি।

বনছায়া একটু মলিন হাসি হেসে বলেন, কে যে কখন কার কী কাড়ে রে।…এর আগে সেই যে একটা খামে চিঠি দিয়েছিল? তাতে লিখেছিল, শাশুড়ি মারা যাওয়ায় শ্বশুর হঠাৎ যেন চোখের চামড়াহীন হয়ে গেছেন।…আমরা ‘যাবো’ বলা সত্ত্বেও লিখে পাঠিয়েছেন, রাঁধুনী দেশে গেছে, বৌমার শরীর ভালো নয়, এ সময় তোমাদের বোধহয় না আসাই ভালো। এসে কষ্ট, একটুও সুখ পাবে না।’…ভাবতে পারিস, ‘না আসাই ভালো’ বাপ হয়ে মেয়েকে বলছে।…খুব শ্বশুরের ওপর চটে গিয়েই তোর দাদা হঠাৎ মাকে অতবড় একখানা চিঠি লিখে ফেলেছিল।…তো যাক-সেই মেয়েটা কত বড় রে?

মেয়েটা।

যুধাজিৎ আকাশ থেকে পড়ে। কোন মেয়েটা?

আহা ওই যে শিলাদিত্যের বোন না কে?

সর্বনাশ। মেয়েদের গায়ে কী বয়েস লেখা থাকে মা?…কুড়ি থেকে চল্লিশ পঞ্চাশ পর্যন্ত প্রায় সব মেয়েই তো একই রকমের।

কুড়ি থেকে চল্লিশ পঞ্চাশ? যা হয় বললেই হলো।

কী জানি বাবা। আমার তো তাই মনে হয়। কত সময় রাস্তায় দুটো মেয়েকে দেখে ভাবি দুটো পিঠেপিঠি বোন। হঠাৎ শুনতে পাই একজন আর একজনক ‘মা’ বলে ডাকছে।

বনছায়া জোরে হেসে ওঠেন।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *