সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক
আদিত্য গাঙ্গুলীর পাশের সহকর্মীর রিপোর্টে জানা গেল টেলিফোন ধরে উনি বলে উঠেছিলেন, কে বলছেন? নীলুদা? আপনি কোথা থেকে? পাবলিক ফোন থেকে? কেন? কী ব্যাপার?…
তারপরই বলে উঠলেন, কী বলছেন? বাপ্পাকে হসপিটালে পাওয়া যায়নি? গত রাত থেকে? তার মানে? তার মানে?
হাত থেকে রিসিভারটা প্রায় পড়ে গিয়েছিল। আর তারপরই গাঙ্গুলীদা চেয়ারে গড়িয়ে পড়ে বলেছিলেন, পাখার স্পীড্টা—
অতঃপর আর কথা বলার অবস্থা ঘটেনি।
ওনার অফিসের ডাক্তারকে ফোন করেছিলেন, পাওয়া যায়নি তাঁকে। কাজেই নিজেরা আর রিস্ক না নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌঁছোতে এসেছেন।
হার্ট অ্যাটাক।
এই ফার্স্ট? আগে আর কখনো?
নয়? ঠিক আছে? আপনাদের ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানকে খবর দিন।
এমনকি একজন ওই ‘খবর দেওয়া’ পর্যন্ত অপেক্ষাও করেছিলেন। তিনি ‘এক্ষুণি যাচ্ছি’ শুনে আবার অফিসে ফিরে গেলেন। বাড়িতে টেলিফোন নেই। খুবই অসুবিধেকর ব্যাপার
এই নীলুদাই ইতিপূর্বে অনেকবার বলেছেন, ওহে আদিত্য গাঙ্গুলী, একটা দরখাস্ত করে দাও না, তারপর আমি দেখছি।
বয়েসে কিঞ্চিৎ বড়, অথচ মান্যে কিঞ্চিৎ ছোট, তাই শুধু ‘আদিত্য’ না বলে ওই গাঙ্গুলীটা যোগ করে যেন বাক্যের ভারসাম্য রক্ষা করেন নীলাম্বর
তা ‘আমি দেখছি’ এ আশ্বাস পেয়েও আদিত্য গাঙ্গুলী শুধু গা করেনি তাই নয়, বেশ যেন প্রতিরোধ প্রতিরোধ মনোভাব রেখে বলেছিল, কেন? আমার এই ছাপোষা গেরস্থ বাড়িতে টেলিফোনের এত কী দরকার? বাবা যখন প্র্যাকটিসে ছিলেন, একবার ঢের চেষ্টা করা হয়েছিল, পাওয়া যায়নি। এখন তো আর সে প্রশ্ন নেই।
শ্যালক তবু বলেছিলেন, আহা, এমনিতেই তো জিনিসটা যথেষ্ট দরকারি না কি?
আমাদের মতো বাড়িতে ক’জনার টেলিফোন আছে নীলুদা? ও রাখা মানেই একটা বাড়তি খরচের দায়। কাজের মধ্যে ‘কন্যে’ তাঁর বান্ধবীদের সঙ্গে লাগামছাড়া আড্ডা দিয়ে দিয়ে বিল ওঠাবেন
মুখে এইটুকুই বলেছিল আদিত্য গাঙ্গুলী, তবে মনে মনে আরও কিছু বলেছিল কিনা সেটা বোধহয় ভগবানের পার্শ্বচরেরও জানা নেই।
তবে হয়নি ফোন।
এখন নীলুকে একবার আদিত্যর অফিস, একবার পারিবারিক ডাক্তার এইসব করতে ছুটোছুটি করতে হলো বেশ। অবশ্য দূরেটুরে নয়। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েক গজ গেলেই ‘প্রভাত বান্ধব’ স্টেশনারি শপ্টিতেই পাবলিকের জন্য ফোন রাখা আছে। চার্জ একটু বেশি। তা কী আর করা যাবে? দরকারের বাড়া মনিব নেই।
তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়ল ওরা।
আর যেতে যেতে নীলু ভাবলেন, অথচ নীহার তখন যেভাবে চিৎকার করে উঠেছিল, কী বললি? বলে তখন তো মনে হলো নীহার না হার্টফেলই করে বসে।
নীহার বলল, আমি সঙ্গে যাই নীলুদা।
নীলুদা বললেন, কী যে বলিস। তুই গিয়ে, কী সুবিধে হবে? শিলু রয়েছে, তোদের ডাক্তারবাবু রয়েছেন, আমি তো রয়েইছি। তুই বরং আদিত্যর মা-বাবাকে একটু দেখগে যা।
শুনে রাগ এসে গিয়েছিল নীহারিকার।
আদিত্যর মা-বাবার খুবই কষ্ট বুঝলাম। কিন্তু এই নীহারটা? সে একেবারে ফালতু? অথচ হিসেব মতো তারই তো বেশি প্রাণ ফাটবার কথা। আদিত্যর যদি কিছু হয়, নীহারিকার মতো ক্ষতি আর কার হবে?…আর যে নীহারিকার একটা ছেলে, এই খানিক আগে কর্পূরের মতো উবে গেছে।
তখনো যখন নীলুদা বলল, চল হে তারক দেখে আসি, তুমি কী শুনতে কী শুনে এসেছ—
তখন নীহারিকা বলেছিল, আমিও যাই তোমাদের সঙ্গে নীলুদা।
নীলুদা অনায়াসে নিষ্ঠুরের মতো বলেছিল, না না, তুই আবার কী যাবি? ব্যাপারটা আসলে কী তার ঠিক নেই। ওইসব হসপিটাল—ফিটালে অনেক সময় উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে বসে। হয়তো কোনো কারণে বেড বদল করেছে। যাই হোক এখন আর এই নিয়ে তোর শ্বশুর-শাশুড়িকে কিছু বলিসনি তুই। বরং হসপিটালে কোনো ব্যবস্থার জন্যে আমি তারককে নিয়ে বেরিয়েছি—বলে ওনাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কর।
আশ্চর্য। যার আপনজন, তার থেকেও বেশি চিন্তা ওই ওনাদের জন্যে!
অবশ্য ‘ওনাদের’ কাছে কথা গোপন থাকেনি। কারণ তারককে নিয়ে হাসপাতালে যথাসম্ভব খোঁজপত্র করে শেষমেষ থানায় ডায়েরি করে এবং আদিত্যর অফিসে ফোন করে, যখন ফিরে এসেছিলেন নীলুদা, তখনো নীহারিকা শ্বশুর-শাশুড়িকে খাইয়ে নিতে পারেনি। ঘটনা লুকনো যায়নি।
কিন্তু তারপর?
যখন আদিত্যের মানবিকতাবোধ সম্পন্ন সহকর্মীরা আদিত্যকে ট্যাক্সি চাপিয়ে নিয়ে এসে ধরাধরি করে নীচের তলাতেই দালানে একটা চৌকির ওপর শুইয়ে দিল?
না তারপর আর খাওয়া-দাওয়ার প্রশ্ন কোথায়?
নীহারিকার বাকি ছেলেটা আর মেয়েটা?
তারা বাড়ির খবর জানবে কোথা থেকে? তারা যথারীতি নিজ নিজ কর্ম সমাধা করে যথাসময়ে বাড়ি ফিরে দেখেছে, তাদের মাথায় ব্যান্ডেজ-বাঁধা দাদা হাসপাতাল থেকে উধাও। আর তাদের বাবা আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত।
একজন একসময় কখন যেন বলে উঠেছিল, তারক? এক গেলাস জল দে তো।
সাড়া পায়নি।
কাজেই জলও পায়নি।
সন্ধ্যা পার হয়ে যাওয়া সময়ে হঠাৎ তারককে একটা ঝোড়ো কাকের মতো চেহারা নিয়ে এসে দাঁড়াতে দেখে বুকটা কেঁপে উঠল টুনির! বেলেঘাটার শুভ্রাংশু মুখুজ্যের পুত্রবধূ সন্ধ্যাতারার!…মনের মধ্যে যে একটা সহজাত চেতনা কাজ করে চলে, সেই চেতনাই বলে উঠল, ‘এ চেহারা ভালো নয়! এ চেহারা কোনো দুঃসংবাদবাহী!
তারককে সত্যিই ঝোড়ো কাকের মতো দেখাচ্ছে। সারাদিনের অস্নাত অভুক্ত ছেলেটার ওপর দিয়েও তো ঝড় কম যায়নি।
টুনি অবশ্য মনকে অলক্ষণে চিন্তা থেকে জোর করে সরাবার চেষ্টা করে। তবু অবচেতনে প্রশ্ন ওঠে, কে? কে? মা? না বাবা? এই প্রশ্নটা আসাই স্বাভাবিক। যদিও মানুষ প্রতি নিয়তই অস্বাভাবিক আর অনিয়মের দর্শক হয়ে চলে, তবু তার ভিতরে ‘স্বাভাবিক নিয়মের’ একটা ছক আঁকাই থাকে। সেইটাকে ধরেই চলে তার চিন্তাভাবনা। তাই টুনি ‘ভাববে না’
ভেবেও, ভেবে ফেলল, কে? কে? মা? না বাবা?
তবু টুনি সাহসে ভর করে শুকনো গলাকে ভিজে করে বলে উঠল, কীরে তারক? তুই এমন অসময়ে? কী খবর?
আর তারপরই, খবর শোনামাত্রই টুনি তার স্বভাব ছাড়া ভাবে প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে, অ্যাঁ? কী বললি? ও তারক। এ আবার কী কথা? এ কী বললি, তুই?
চিরশান্ত সভ্য মার্জিত টুনির কণ্ঠে আচমকা এমন একটা আর্তস্বর ওঠায় বাড়ির যে যেখানে ছিল, ছুটে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হলো!
এ বাড়িতে এখনো এই রীতিই রয়ে গেছে। এ বাড়ির কাছে ‘আপনজন’ শব্দটি যেন গৃহবিগ্রহের মতো সম্ভ্রমের আর পবিত্রতার! আর এদের ‘আপনজন’ শব্দটার অনুভূতি বেশ অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত!
এ সংসারের সদস্যদের কাছে অপর সদস্যের নিজস্ব আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব চেনা পরিচিত, সক্কলের হিসেব উঠে আছে পাকা খাতায়।
কাজেই বাড়ির বড়বৌ সন্ধ্যাতারার নিজস্ব আত্মীয়রা সংসারের সক্কলেরই নিজস্ব ‘নিজজন’। অতসব এ সংসারের সদস্যদের সকলের কণ্ঠ থেকেই আর্তস্বর ওঠে, সে কী? কী বলছো? হাসপাতাল থেকে হারিয়ে গেছে বাপ্পা? এমন আবার হয় না কি?
এই খবরটাই বিস্ময়ের। তার সঙ্গের খবরটি অবশ্য বিস্ময়ের নয়, শুধুই পরম বিষাদের। আচমকা ছেলের উধাও হওয়ার খবরে বাপের ‘হার্ট অ্যাটাক’ হয়ে বসা খুব বিস্ময়ের না হলেও বিপদের। চিন্তার! ভাবনার! অচৈতন্য অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেছে আদিত্যকে! এ সংবাদ যেন অশনি সঙ্কেতবাহী!
মনের অগোচর কথা নেই।
এখন টুনি মনে মনে বলে ওঠে, এর থেকে যে ‘মা’র কিছু হলেও ভালো হতো গো!….হ্যাঁ ওই ‘মা’ পর্যন্তই ভাবতে পারল। সহজাত সংস্কারে মা থাকতে ‘বাবা’র কথা ভাবনায় স্থান পেতে পারে না।
এখন তারককে ঘিরে অজস্র প্রশ্ন।
হ্যাঁ তারক। হাসপাতাল থেকে রোগী উধাও হয়ে যেতে পারে? পাহারা থাকে না? নার্স ডাক্তার এদের নজর থাকে না?
ওরে তারক! হাসপাতালেই কেউ ‘কিছু’ করে বসে ওই বলে প্রচার করছে না তো? ওইটুকু ছেলেটাকে অকারণ ‘কে কী’ করতে যাবে? অকারণ? তা অন্তরালে কোনো কারণ থাকতেও পারে। পার্টি করতো যখন, তখন বিরোধীপক্ষ তো থাকবেই একটা, মতবিরোধের জের হয়তো। তা হয়তোই। তা বলে এমন ভয়ঙ্কর একটা কিছু করে বসতে পারে কেউ। পারবে না কেন? তোমাদের কাছেই ‘ওইটুকু একটা ছেলে’ আসলে তো আস্ত একটা মানুষই।…কিন্তু হসপিটাল বলে কথা! সেখান থেকে ‘পেশেন্ট’ বিপদে পড়বে?
মন্তব্যের জোয়ার বইছে।
আজকাল যা অবস্থা, পড়তেই পারে।
হাসপাতালে তো এখন শুয়োর চরে। সমাজবিরোধীদের আড্ডাখানা! এ কি সেকাল? যে দূর দূর দেশ থেকে লোকে কলকাতায় চলে আসছে ভালো চিকিৎসা পাবার আশায়? এসে তো হাসপাতালেই ভর্তি হতো। তখন কি এমন অলিতে গলিতে মোড়ে মোড়ে প্রাইভেট নার্সিংহোম ছিল? তবু আসতো লোকে। মফস্বলের লোকেরা জানতো যত দূরারোগ্য রোগই হোক একবার কলকাতায় গিয়ে পড়তে পারলেই বেঁচে যাওয়া।
একদা এক চিন্তানায়ক শহরবাসীকে উপদেশ দিয়েছিলেন ‘ব্যাক টু দি ভিলেজ।’…’গ্রামে ফিরে যাও।’
তো কেউ সে উপদেশ নেয়নি। গা করে ‘ব্যাক’ করেনি। কেউ গ্রামে ফিরে যায়নি। তবে আর কী হবে? মহম্মদ যখন পর্বতের কাছে গেল না, পর্বতই মহম্মদের কাছে চলে এল।’
তারক! তুই ঠিক দেখেছিলি? টিফিন ক্যারিয়ারটা হাতে নিয়ে একটা পাক ঘুরেই চলে আসিসনি তো তোর বড়দাবাবুকে দেখতে না পেরে? তন্নতন্ন করে দেখিসনি?
তারক গম্ভীর গলায় বলে, বাড়িতে না হোক বিশবার এই একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। তারপর গে আপনাদের ‘নীলুবাবু আমায় সঙ্গে নিয়ে নিজে চক্ষে দেখে এসে
দাদার অবস্থা কী খুব চিন্তার তারক?
তারক যেন এখন ত্রাণকর্তা ভগবান!
তারক যেন সকল প্রশ্নের উত্তর জানা মহাপুরুষ একজন।
টুনির এই উৎকণ্ঠিত প্রশ্নে টুনির হার্টের রোগী শ্বশুর শুভ্রাংশুও তাঁর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আরাম চেয়ারটি ছেড়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। সান্ত্বনার গলায় বলেন, অতো চিন্তা করছো কেন বৌমা? তোমার এই হাড়বুড়ো শ্বশুরটা দু’দুবার মরণ-বাঁচন অ্যাটাক হয়েও এখনো পৃথিবীর অন্নজল ধ্বংসাচ্ছে না?….দাদার জন্যে ততো ভাবনা নয়, সেরে উঠবেন তাড়াতাড়ি। ভাবনা ছেলেটাকে নিয়ে। আচ্ছা তারক, হাসপাতালে ওর কোনো বন্ধুবান্ধব বা ওই রকম কেউ দেখতে আসতো?
তারক একটু দার্শনিক হাসি হেসে বলে, বন্ধু? না দাদামশাই, ‘বন্ধু’ বলে তেমন কেউ আসতো না। মাথাফাটা রুগীটাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে বন্ধুরা সেই যে বেপাত্তা, আর তাদের টিকিও দেখি নাই।
হুঁ। তো তোমায় কে পাঠাল?
তারককে কারো ‘পাঠাতে’ লাগে না! তারক যা করে নিজের বিবেচনায় করে! তো আমি এখন যাই পিসিমা।
পিসিমা, তস্য শ্বশুরঠাকুর এবং উপস্থিত জনমণ্ডলী একযোগে উচ্চারণ করে ওঠেন, ওমা সে কী? এই অবস্থায় এক্ষুনি ধুলোপায়েই ফিরে যাবে? একটু অন্তত চা জলখাবার খেয়ে যাবে তো? সারাদিন তো খাওয়া হয়নি। নাওয়া-ধোওয়াও হয়নি মনে হচ্ছে। যাও হাত মুখ ধুয়ে নিয়ে
হ্যাঁ এই মুখুয্যে বাড়ির আতিথ্যপ্রবণতা এই রকমই। একজন ভৃত্য সম্পর্কেও সমান মমতায় আর আগ্রহে ব্যস্ত হয় এরা। মানুষ বলে কথা।
দেখতেই তো পাওয়া যাচ্ছে—মানুষটার চেহারায় সারাদিন না-নাওয়া খাওয়ার ছাপ! তাহলে? কেবলমাত্র আপনজনদের জন্যেই উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় অস্থির হতে হবে?
তারকের কাছে এ প্রস্তাবটা অবশ্যই পরম লোভনীয় বলে মনে হলো, তবু তারক নিজস্ব স্বভাবের ডাঁটে বলে উঠল, নাঃ। অতো সবে দেরি হয়ে যাবে। চলি।
আহা। কতই আর দেরি হবে?
শুভ্রাংশু বললেন, বৌমা, তোমাদের রান্নাটান্না তো বোধহয় হয়ে গেছে? তারককে বরং দুটি ভাত খাইয়ে দিলেও পারো! যা বুঝলাম অন্নটা তো জোটেনি আজ।
ভাত!
এই ঝাঁঝাঁ করা শরীরে তারকের মনে হলো, শব্দটা যেন একটা স্বর্গীয় শব্দ। তবু তারক বলল, না না! ওসব ঝামেলায় যাবেন না পিসিমা! বরং ওই চা-ই একটু
পিসিমার ‘জা’ বলে উঠলেন, ঝামেলায় তোমার পিসিমাকে যেতে হবে কেন তারক? ওঁর এখন মন উতলা। তুমি হাতমুখ ধুয়ে এসো তো—যা দেবার আমিই দিচ্ছি!
তারক তার মনিব বাড়িতেও তোয়াজেই থাকে। তবু হঠাৎ তার মনে হলো তোয়াজ আর মমতা এক জিনিস নয়। এ বস্তু দুর্লভ।…চলে গেল হাতমুখ ধুতে
কিন্তু এ যুগে—এদের সংসারটায় এমন দুর্লভ বস্তুটির সঞ্চয় কী সূত্রে?
হয়তো সেই একদার মানিকতলার মৃগাঙ্ক মুখুয্যের সূত্রেই। ব্যাচিলার মৃগাঙ্ক মুখুয্যের সেই বিরাট সংসারটি, যেখানে গিয়ে দাঁড়ালেই রোজই মনে হতো যজ্ঞিবাড়ি। যেখানে দৈনিক এক এক বেলায় ষাট-সত্তরটি পাত পড়তো। মৃগাঙ্কর সর্বকনিষ্ঠ শুভ্রাংশুর সংসারটি এখনো তার ঐতিহ্যটি কিছুটা বহন করে চলেছে! যে বেচারা নাকি বড়দার আকস্মিক মৃত্যুর পর তার মেজদা সেজদাদের ইচ্ছের চাপে বাধ্য হয়ে নতি স্বীকার করে মানিকতলার সেই চকমিলানো বাড়িখানাকে বিক্রী করার দলিলে স্বাক্ষর করে নিজের প্রাপ্য অংশের টাকাটুকু নিয়ে এই বেলেঘাটায় চলে এসে কেবলমাত্র আপন সংসারটি নিয়েই সংসার পেতে বসেছে।
কিন্তু এ যুগের মতে তার আপন সংসারটুকুও তো ‘টুকু’মাত্র নয়! শুভ্রাংশুরও তো চার ছেলে তিন বৌ, এবং তাদের সন্তান-সন্তুতি। কিন্তু আশ্চর্য! এরা সবাই এখনো এদের চিরদিনের ঐতিহ্যটি যতটা সম্ভব বজায় রেখেছে।
কী করে সম্ভব হলো?
হয়তো অকালমৃত শাশুড়ির সংসারে অকাল গৃহিণী হওয়া বড়বৌ সন্ধ্যাতারার গুণেই। যে তার হৃদয়ের অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়ে সংসারটাকে সর্বদা সরসা আর স্নিগ্ধ করে রেখেছে।
হয়তো পরবর্তী স্টেজে আর এ ঐতিহ্য বাহিত হবে না। হয়তো ওই সন্ধ্যাতারারই ছেলের বৌ এসে পুরো সংসারের ছাঁচটাই বদলে দিয়ে ছাড়বে।…তাইতো হয়। একটা মাত্র বৌ-ই একখানা পুরো সংসারের জিওগ্রাফি পাল্টে দিতে পারে।
তবে এখনও এরা পুরোনো ছাঁচে আবদ্ধ। তাই বড়বৌয়ের বাপের বাড়ির বিপদকে নিজেদের বিপদ বলে মনে করে মেজবৌ অনায়াসে একটা ভৃত্যকেও সস্নেহে বলে উঠতে পারে, দেখলে তো, মাথায় একটু জল পড়ায় আর পেটে দুটি ভাত পড়ায় শরীরে শান্তি এল কি না, শরীরটিকে তো আগেই ঠিক রাখতে হবে বাবা। বিশেষ করে বিপদ আপদের সময়। খাটতে হয় তো ডবল।
বড় অন্তরঙ্গতার সূর! যে অন্তর একটা ভৃত্যকেও মানুষ’ বলে গণ্য করে।
হ্যাঁ, এইটাই তো সেই বাড়িটা। দৈবাৎ যে বাড়িটার কাছাকাছি এসে পড়ে যুধাজিৎ বলে উঠেছিল, একটা রাস্তার লোক কিছু না খেয়ে দরজা থেকে ফিরে গেলে যে বাড়ির ‘বাড়িসুদ্ধু সবাই মর্মাহত হয়, সে বাড়িটা তো একবার দেখা দরকার।’
সেই দেখার সূত্রেই তো ছেলেটার নাম এ বাড়ির পরমাত্মীয়দের তালিকায় উঠে পড়েছে। যার জন্যে ও বাড়ির টুসকি নামের মেয়েটার সেদিন থেকে দুঃখ অভিমান ক্ষোভ আর হিংসের জ্বালা!
ভাতের সামনে বসে তারকের মনে হলো, যেন কতকাল এই স্বর্গীয় বস্তুটির স্বাদ পায়নি।
এমনিই হয়। দুপুরে তো ভাত তরকারি ভর্তি টিফিন ক্যারিয়ারটা হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে আনতে আনতে তারক কষ্টে চোখের জল সামলে সংকল্প করছিল, বড়দাবাবুকে না পাওয়া পর্যন্ত তারক আর ভাত খাবে না।
সংকল্পটা অবশ্যই অবাস্তব। তবু সেটা যে অবাস্তব, তা একটা দিনেই মালুম হয়ে গেল।
হঠাৎ টুনি বলে উঠল, বাবা! আমি তারকের সঙ্গে ওবাড়ি চলে যাব?
মিনতির গলা! আবেদনের গলা!
আহা টুনির ভাই বৌ নীহারিকা ভাবতে পারে যে এমন মিনতির গলায় তার শ্বশুরের কাছে অতি সামান্য একটা ব্যাপারের জন্যেও একটু অনুমতি চাইছে?
ভাবা যায় না।
শুধু নীহারিকা কেন, আজকের যুগে কেউই কী ভাবতে পারে? টুনির মতো এতোখানি বয়েসের গিন্নীবান্নী তো দূরের কথা নতুন বৌয়েরাই?
না, এ যুগের মেয়েরা অমন ‘অবমাননার’ জীবনের কথা ভাবতে পারে না। সে একটা ‘অ্যাডাল্ট’ মানুষ নয়? তার নিজস্ব ইচ্ছে অনিচ্ছে তার গতিবিধির একটা স্বাধীনতা থাকবে না? কোথাও একটু বেরোতে হলেই কর্তা গিন্নীর পারমিশান নিতে হবে? কেন? নজরবন্দী আসামী নাকি?
বলতে আসুক দিকি কেউ তেমন কথা, জোঁকের মুখে নুন দেবার মতো শুনিয়ে দেব না আচ্ছা করে?
খুব ভদ্র মার্জিত সভ্য বৌ হলে, বড়জোর সেজেগুজে চটিটা পায়ে গলাতে গলাতে বলে, “মা, একটু বেরুচ্ছি।’
তো এ যুগে মা’য়েরা খুবই বুদ্ধিমতী, তাঁরা আর দ্বিরুক্তিমাত্র করেন না। সস্নেহে বলেন, এসো। বলেন, ‘দুর্গা দুর্গা।’
কিন্তু ‘বাবা’ সম্প্রদায়টি (যদি পুত্রবধূ আসা অবস্থা পর্যন্ত জীবিত থাকেন। থাকেন না তো বড় একটা। এখনো যুগের ধর্মটি আয়ত্ত করে উঠতে পারেননি। তাঁরা অর্থাৎ তাঁদের একজন রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত থাকলে নির্ঘাৎ বলে বসবেন, ‘এখন আবার কোথায় বেরোচ্ছ বৌমা?”
ব্যস! তারপর যা হবার তাই হবে। এবং পরে পুত্ররত্ন অনায়াসে বাবাকে জ্ঞান দিতে আসবেন, ‘আশ্চর্য! দেখই যখন মান থাকে না, তখন সব ব্যাপারে নাক গলাতে আসো কেন?’
কিন্তু বেলেঘাটার এই মুখুয্যে বাড়িটায় এখনো তেমন হাওয়া ঢোকেনি। তাই গিন্নীবান্নী বৌ মিনতির সুরে বলে, বাবা! আমি তারকের সঙ্গে একটু ও-বাড়ি চলে যাব? মনটা বড্ড কেমন করছে!
বাবা বলেন, তা তো করতেই পারো মা। তা যাবে তো যাও। তাহলে তুমিও একটু খেয়ে নিয়ে—
কিন্তু এই উদার ছাড়পত্র কোনো কাজে লাগল না। তারক গম্ভীরভাবে বলল, আমি তো এখন আর ও-বাড়ি ফিরছি না।
ফিরছি না? ও মা! রাত তো প্রায় নটা বাজে, এতো রাত্তিরে আর কোথায় যাবি তারক? আর কাউকে খবর দিতে হবে?
তারক দুটো হাত উল্টে বলে, জানিনে। আর কে কোথায় আছে ওনাদের, তাও জানি না। মেসোমশাইয়ের দিকে এই আপনাকেই জানি।…আর যা করবার ওই নীলু মামাবাবুই করবে! সর্বঘটে কাঁঠালি কলা। ‘যেদিকে জল পড়ে সেদিকে ছাতি ধরে।’
‘যেদিকে জল পড়ে, সেদিকে ছাতি ধরে—’ এমন একটি মহৎ ব্যবহারের সঙ্গে ‘সর্বঘটে কাঁঠালি কলা’ শব্দটি খাপ খেলো কিনা তা বোধহয় ভেবে দেখেনি তারক। অথবা ভেবে দেখবার বুদ্ধিই নেই। তবে তার ভিতরকার একটা অবজ্ঞার ভাব তার চোখেমুখে ফুটে ওঠায় ওই মহৎ ব্যবহারটিকেই গৌণ করে দিল।
শুভ্রাংশু বিচক্ষণ ব্যক্তি, তাড়াতাড়ি বললেন, বিপদের বাড়ি, তারক হয়তো কোনো দরকারি কাজ নিয়ে বেরিয়েছে। তোমার মনটা যখন বেশি উতলা হচ্ছে, দেবুর সঙ্গে, কী খোকার সঙ্গেই চলে যাও!
দেবু অর্থাৎ টুনির বর দেবাংশু, আর খোকা টুনিরই পুত্ররত্ন স্নেহাংশু।
টুনি একটু মলিনভাবে বলে, যে যাবে আজ তো আর রাতে ফিরতে পারবে না! সকালে দু’জনারই তাড়া। সেই ভেবেই। তারককে বলছিলুম। কী রে, তারক। তোর কী অন্য পাড়ায় কাজ?
তারক গম্ভীরতরভাবে বলে, কাজ আর তারকের কোনো পাড়াতেই নাই পিসিমা। আপনার কথাটা রাখতে পারলুম না, মাপ করে দেবেন। মেজ পিসিমা, আপনার যত্ন চিরকাল মনে থাকবে। চলি—বলে হঠাৎ সামনের জনেদের এক একটা প্রণাম ঠুকে বেরিয়ে যায় তারক।
ব্যাপার কি বল তো বৌমা?
শুভ্রাংশু বললেন, তোমাদের তারকের আজকের ভাবটা যেন কেমন অন্যরকম মনে হলো।
মেজ জা বললো, সত্যি! হঠাৎ চিরকাল মনে থাকবে’ বললো কেন?
এই সময় পাপিয়া বলে উঠল, কিছুই নয়, ও একটু কায়দা করে কথা বলতে ভালোবাসে। তাছাড়া ওর ওই ‘বড়দাবাবু’ তো প্রাণ! মনটন ভালো নেই; হয়তো মানতফানত করতে কোনো মন্দিরেটন্দিরে যাবে।…যাক গে, তুমি চটপট রেডি হয়ে নাও বড়মা, আমিই তোমায় নিয়ে যাচ্ছি। আমার তো আর সকালবেলা অফিসের তাড়া নেই, রাতে না ফিরলেও চলবে। …মা। আমার আর বড়মার খাবারটা দিয়ে দাও তো চটজলদি!
টুনি বিমনাভাবে বলে, তুই নিয়ে যাবি? তোর সঙ্গে এতো রাত্তিরে—
আঃ। তুমি থামো তো বড়মা। কলকাতা শহরে নটা রাত্তিরকে কেউ এতো রাত বলে না! তোমাদের শ্যামবাজারের পাড়ায় দেখবে চলো, এখন সন্ধে! মা। কুইক!
তারপর বলে ওঠে, দাদু তোমার আপত্তি নেই তো?
দাদু বলেন, নাঃ! তোরা এখনকার মেয়েরা তো আর আগের মতো ‘চেলির পুঁটুলি’ হয়ে নেই। তোরাও তো ছেলেদের মতোই। তবে সাবধানে যাবি। সত্যি ও এ রকম একটা খবর পেয়ে, নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা তো যায় না!
টুনি!
হাপসে পড়লেন নয়নতারা! তুই এসে গেছিস। খোকারে যখন হাসপাতালে নিয়ে গেল, আমার প্রাণের মধ্যে কেবলই তোর মুখটা। ভাবচি, কে খবরটা দেবে? তো, পেলি কোনো খবর?
ওই তো তারক গিয়ে বলল—
তারক? অ। সে তবে নিজের বুদ্ধিতে তোর কাচেই গেচল। আর ইদিকে তারক তারক রব! কই ডাকতো তারে!
ওমা! সে তো এলো না। বলল, কাজ আছে এখন ফিরবে না। তাই পাপিয়া আমার মেজ জায়ের মেয়ে—
নয়নতারা ক্লান্তক্লিষ্ট স্বরে বলেন, অর আর পরিচয় লাগবে না টুনি। দেখছি না জন্মাবধিই। তারপরই হতাশভাবে বলেন, কী হবে টুনি?
টুনি কেঁদে ফেলে।
ঠাকুর যা করবেন।
পাপিয়া এসে আস্তে নয়নতারার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলে, আপনাদের ঠাকুর যা করবেন ভাবেন তা যখন করেই ছাড়েন, জানেনই, তাহলে আর ‘কী হবে’ ভেবে লাভ কী দিদা?
নয়নতারা রুদ্ধকণ্ঠে বলেন, বুঝি তো সবই দিদি, তবু মন মানে কই? পাবনার ওই মানুষটার মতন স্থিরতা আসে কই? যা টুনি, তর বাপের কাছে। এম্বুলেন্স গাড়িটা বেরিয়ে যাওয়া অবধি সেই যে একখান বই হাতে বসেছে, কাঠ না পাথর
টুনি আস্তে বাবার ঘরে ঢুকে যায়।
পাপিয়া শুকনো মুখে বলে, আর সবাই কোথায় দিদা?
আর সবাই আর কে দিদি? ছোটখোকা তো ওর বাপের সাথে গেছে মামার গাড়িতে। টুসকি কোথায় কে জানে! বৌমা তো হাসপাতালে যাবার জন্যে জেদাজিদি করছিলেন, তো অর দাদা নিল না। বলল, সেখেনে কতো রকম ঝামেলা। তো সেই অবধি ঘরে খিল বন্ধ করে শুয়ে আচেন। মেয়ে কত ডাকাডাকি করল. দরজা খুলল না। ত–বৌমার প্রাণের মদ্যেটা যে কী করছে তা কী বুজছি না দিদি? দু’দুটো ধাক্কা।…তবে উনি এমন ভাব দ্যাকাচ্চেন, যেন সকল কষ্ট ওঁরই, আর এই দুই বুড়াবুড়ির বুকে যেন দুখান্ করে মুগুর পড়ে নাই। যেন এরা কেউ না। পড়শী—
হঠাৎ মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে সামনের ছাতে চলে যান।
বাংলা কাগজ যুধাজিৎ মায়ের জন্যেই রাখে। নিজের ভাগের ইংরিজি খানা হাতে রেখে, মায়েরটা মায়ের কাছে পৌঁছতে যেতে যেতে হেডিংগুলোয় চোখ পড়েই যায়। আলগাভাবেই চোখ ফেলছিল, কারণ নিজে গুছিয়ে বসবে ‘স্টেটসম্যান টাকে নিয়ে। হঠাৎ চোখটা আটকে গেল একটা খবরে—প্রথম পৃষ্ঠাতেই নীচের দিকে—
…‘হাসপাতাল থেকে রোগী উধাও।’ হাসপাতালের নামটা দেখল। মনে মনে হাসল একটু! যা অবস্থা হয়েছে আজকাল আমাদের রাজ্যের, তাই এইরকম জায়গা থেকেও এমন ঘটনা ঘটে। বোধহয় কুকুরে তাড়া করেছিল। শোনা যায়। তা এইসব হাসপাতালে জেনারেল ওয়ার্ডেটোয়ার্ডে কুকুররা নাকি যথেচ্ছ বিচরণ করে বেড়াবার ছাড়পত্র পায়।…মাকে দেখাবে বলে পড়তে পড়তেই যাচ্ছিল, হঠাৎ থমকে গেল, রোগীর নাম বাপ্পাদিত্য গঙ্গোপাধ্যায়…নলিন সরাকর স্ট্রিটস্থ আদিত্য গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র! এই রোগীর মাথায় এখনো ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। অথচ—রোগী ওয়ার্ড থেকে পলায়ন করতে পারল। খবরে প্রকাশ উক্ত রোগীর পিতা নাকি পুত্রের এভাবে নিখোঁজ হওয়ার খবরে তৎক্ষণাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।’
অতঃপর আরো যা লেখা, তা হচ্ছে প্রতিবেদকের বিক্ষুব্ধ মন্তব্য! কলকাতা শহরেই যদি এমন ঘটে, তাহলে মফস্বল জায়গাগুলির অবস্থা কী? সেই প্রশ্নে নানা কথা।
আসলে আজকাল সাংবাদিকদের নিয়ম অনুসারে প্রায়শই এ ধরনের ঘটনাকে ভাষার কারুকার্যে একটি গল্পের চেহারা দেওয়া হয়। কাজেই আরো কিছু ইনোনো বিনোনো মন্তব্য রয়েছে।…কিন্তু এ ব্যাপারটা কী? নলিন সরকার স্ট্রিট! আদিত্য গাঙ্গুলী। বড় যেন পরিচিত শব্দ।…ওঁর বড় ছেলেটি যে ‘পার্টি কবলিত’ সেকথাও জানা। তবে তার নামটা জানা ছিল না যুধাজিতের। কিন্তু দুই আর দুইয়ে চার-এর মতো একটা স্থির সিদ্ধান্তেই আসতে হয়— ‘শিলাদিত্য’র সঙ্গে মিল রয়েছে নামটার!
খুব গোলমেলে ব্যাপার তো! কে এরা?
মাকে চিরাচরিত নিয়মে সকালবেলায় যেখানে পাবার কথা, সেখানে অর্থাৎ রান্না অথবা ভাঁড়ার ঘরে পাওয়া গেল না। দেখল কাজের মেয়েটা একটা বঁটি নিয়ে বসে আলু ছাড়াচ্ছে। যুধাজিৎকে দেখেই একগাল হেসে বিনা প্রশ্নেই বলে ওঠে, মাসিমায়ের খোঁজ করছেন? তিনি এখন বাজার করতে বেরিয়েছেন।
যুধাজিৎ আকাশ থেকে পড়ে, বাজার করতে?
মেয়েটা কান অবধি দাঁতের বাহার ছড়িয়ে বলে, তাই তো বললো মাসিমা, যাই বাগানে গিয়ে একটু বাজার করে আসি। বিনি পয়সার বাজার হি হি! সিম হয়েছে, উচ্ছে হয়েছে
যুধাজিৎ ‘বাজার করতে যাওয়ার’ অর্থ হৃদয়ঙ্গম করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।…যাক যা ভাবা গিয়েছিল, তা কাঁটায় কাঁটায় ফলে গেছে। এই কিছুকালের মধ্যেই বনছায়ার বাগানের নেশা ধরে গেছে।…তবে লক্ষ্য করে দেখেছে যুধাজিৎ ফুলের থেকে যেন ফলের দিকেই অধিক ঝোঁক মার। এর নামই হচ্ছে জাত সংসারী।
তাছাড়া আগে চিরকালই টবে টবে ফুলের সাধনা করেছেন, ফসলও ফলিয়েছেন। তবে সে তো একটা গতানুগতিক ব্যাপার। কিন্তু শাক পাতা সব্জির ফসল? নাঃ, তেমন ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেনি। বালীগঞ্জ এলাকায় বড় রাস্তার ওপর কারই বা তেমন হয়? এ একটা আলাদা নেশা!
যদিও খবরের কাগজের খবরটায় যুধাজিৎ একটু চিন্তান্বিত, তবু এখন হেসে হেসেই মাকে বলে, কি মা, বেচারী বাজারের ফড়েদের অন্ন মারছ?
বনছায়ার হাতে একটি ছোট মতো বেতের ডালা, তাতেই তুলে জমা করেছেনে চারটি সিম, চারটি উচ্ছে, কয়েকটা টম্যাটো, বেশ লকলকে একগাছা লাউডগা, আর ঝুরো ঝুরো চারটি ধনে পাতা, আর চারটি কাঁচা লঙ্কা।
বনছায়ার ফসলের সম্ভারের চেহারাটি অবশ্যই ‘নিউমার্কেটিয়’ নয়, ছোট্ট ছোট্ট উচ্ছে, সরু সরু সিম, বাঁকাচোরা ছোটবড় মিশোনো কাঁচা লঙ্কা। তবে লাউডগাটি মন্দ না, আর ধনে পাতাগুলো বেশ তাজা!
বনছায়া একগাল হেসে বলেন, দ্যাখ না এরপর আলু ছাড়া আমাদের এই ছোট্ট সংসারটির যুগ্যি সব সব্জি করে ছাড়ব! কী মজা যে লেগেছে রে—সত্যি হবে কী না হবে ভেবেও খানিকটা করে জায়গা খুঁড়ে মেথি আর আস্ত ধনে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম, ওমা দিব্যি পাতা ধরে গেছে। কাল তোকে মেথি শাকের সুক্ত খাওয়াবো!
যুধাজিৎ বলে, তাহলে তুমি আর বেকার নও? মোটামুটি একটা কর্মসংস্থান হয়েছে?
বনছায়া আবার হেসে ফেলেন। বলেন, তা সত্যি, এ বেশ একটা নেশার মতো। ছোট্ট ছেলেটা হাসতে শিখলে কী হামা দিতে শিখলে দেখে যেমন একটা আহ্লাদ আহ্লাদ ভাব হয়, গাছে ফলধরা দেখলেও যেন তেমনি হয়।…দুগ্গা বলেছে, পেঁপে গাছেও নাকি খুব তাড়াতাড়ি ফল ধরে। কাঁচা পেঁপে তো খুবই উপকারী একটা তরকারি। আর ওই দ্যাখ না কুমড়োলতায় কেমন ছোট্ট ছোট্ট কুমড়োর ছানা ধরেছে, বাড়তে বেশি সময় লাগে না। ‘মাটি’ বড় জিনিস রে।
যুধাজিৎ দেখে তার মায়ের মধ্যেকার চিরকালের সেই আনন্দময়ী বালিকা ভাবটি ফুটে উঠেছে, মুখের হাসিতে চোখের চাওয়ায়।
মা, কত অল্পে সন্তুষ্ট। মনে মনে ভাবল যুধাজিৎ!
তারপর বলে উঠল, ব্যস! তাহলে তো সংসারের একটা মস্ত খরচ বেঁচে যাচ্ছে। কাঁচা বাজারের খরচ তো আজকাল সোজা নয়। তাছাড়া একদম গাছভাঙা ফ্রেশমাল।
ঠাট্টা করছিস?
বাঃ! ঠাট্টা করব কেন? সত্যিই তো। আমিই তো তোমায় প্ররোচনা দিয়েছিলাম, বাগান করো, আর ছেলের বৌ আনি আনি বাতিক থাকবে না।
বনছায়া রাগরাগ ভাব দেখিয়েও হেসে ফেলে বলেন, বটে? কাঁচা পেঁপে আর কাঁচা লঙ্কা ফলিয়েই আমার ঘর-সংসার ভরে উঠবে?…তোর মাথায় কী এতো দুষ্ট্রবৃদ্ধিও খ্যালে রে। নে চল।
হয়েছে তোমার বাজার করা?
হয়েছে।
আবার হেসে ফেলেন বনছায়া।
চা-টা খেয়েছ?
খেয়েছি বাবা খেয়েছি। কুটুমবাড়িতে আছি নাকি, তাই খোঁজ নিচ্ছিস?
কী জানি। তোমার তো আবার বারোমাসে বারোশো পার্বণ। তো কাগজটাগজ পড়ো?
ও মা। তা আবার পড়ি না? বলে কাগজের জন্যে হাঁ করে থাকি। এসেছে?
এসেছে। আচ্ছা মা, এই খবরটা একটু পড় তো।
বনছায়া বলেন, চশমা তো সঙ্গে নেই, ঘরে যাই। কেন কী খবর রে?…বনছায়ার স্বরে উদ্বেগ।
পড়েই দ্যাখো।
ঘরে চলে এসে চশমা পরে চোখটা বুলিয়েই বলেন, এসব ঘটনা তো নিত্যিই দেখি। হাসপাতাল থেকে পালানো, হাসপাতালে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা, তা হ্যাঁরে, নামগুলো কেমন চেনা চেনা লাগছে যে। তোর সেই বন্ধু—গৃহপ্রবেশের সময় যার মা-বোন এসেছিল, বোনটার হঠাৎ শরীর খারাপ হলো, তারাই নয় তো? তুই যখন খামে ঠিকানা লিখছিলি, দেখেছিলাম যেন আদিত্য গাঙ্গুলী, নলিন সরকার স্ট্রিট। অ জিতু, তাদের কেউ নাকি?
যুধাজিৎ বলে, সন্দেহ হচ্ছে।
ও মা! কী সর্বনেশে কথা। শীগগির একবার খোঁজ নে!
তাই ভাবছি।
ভাবছি আবার কী! তাড়াতাড়িই খোঁজ নেওয়া উচিত। তারা না হয় তো ভালো। তবে হলে—
যুধাজিৎ হঠাৎ একটু হাসির মতো করে বলে, আচ্ছা মা এই যে তুমি বললে, তারা না হলেই ভালো! কিন্তু যাদের হয়েছে, তাদের তো সেই একই কষ্ট! অথচ—
বনছায়া একটু থমকান। তারপর একটু হেসেই বলেন, আমাদের মনটা তো এমনি গণ্ডিবদ্ধই রে জিতু। সেখানে যতটুকু ধরবার ততটুকুই ধরে। গণ্ডি ছাড়িয়ে বাড়াতে বসলে কী আর সংসার করা হতো মানুষের? প্রতিদিন কত কত দুর্ঘটনা ঘটছে। খবরে শুধু হতাহতের সংখ্যা দেখা হয়। ওই নিহতরা যখন চেনা না হয় তখন লোকে খায়দায় নিত্যকাজ করে চলে। অচেনা অজানা নিহতদের জন্যে শোক করতে বসলে কাউকেই আর বেঁচে থাকতে হতো না বাবা!…আমাদের এই ছোট গণ্ডির মধ্যেকার সুখদুঃখের ভারই কী কম? তাই তো বয়ে ওঠা যায় না। অচেনাদের জন্যে একবার ‘আহা’ করা ছাড়া আর বেশি কে করে বল?
ও মা। কী সর্বনেশে কথা! শীগগির একবার খোঁজ নে। তা হ্যাঁরে ওদের কোনো ছেলে হাসপাতালে ছিল না কি? জানতিস কিছু?
যুধাজিৎ একটু থেমে বলে, কবে যেন একদিন শিলাদিত্যর সঙ্গে রাস্তার দেখা হয়েছিল, কথায় কথায় বলেছিল, তার পার্টিপ্রেমী দাদা নাকি কী কাজে কোথায় কোন্ অজ গাঁয়ে গিয়ে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে এসেছে।
ও মা! তা দেখতেটেখতে যাসনি?
দেখ মা, শিলাদিত্য তেমন সিরিয়াসলি বলেওনি। বরং যেন ঠাট্টার ভাবে বলেছিল, পড়ে গিয়ে কী লাঠি খেয়ে তা কে জানে? জমিজমার বর্গাদারি নিয়ে কী যেন করতে গেছল। সেখানে মাথা ফাটাফাটি কিছু আশ্চর্য ব্যাপার নয়। তারপর আর তেমন খেয়াল হয়নি। তবে বিশেষ সন্দেহ হচ্ছে নামটা দেখে।
হ্যাঁ! তাই দেখছি। বাপ্পাদিত্য, শিলাদিত্য! ভাইয়ে ভাইয়ে মিলিয়ে রাখার মতোই।
তবে একেবারে একই নামের লোক থাকেও বিস্তর।
বনছায়া আস্তে বলেন, আহা যেন তাই হয়। যেন অন্য লোকেদের ব্যাপারই হয়।
যুধাজিৎ ঈষৎ হাসে, আচ্ছা মা অন্য লোকেদের বিপদ হলে কিছু এসে যায় না কী বল? যা শত্রু পরে পরে! অ্যাঁ।
বনছায়া একটু থমকান, ছেলের এই পরিহাসটুকু পরিপাক করে নিয়ে গম্ভীর হাস্যে বলেন, বিশ্বসুদ্ধ জনের সুখদুঃখুর বোঝা বইতে পারি এমন শক্তি কোথায় বাবা? তাহলে তো রোজ সকালে খবরের কাগজ খুলে শোকাচ্ছন্ন হয়ে বসে আহারনিদ্রা সংসার করা বন্ধ হয়ে যায়। দৈনিক কত লোক দুর্ঘটনায় পড়ছে আর হতাহত হচ্ছে তার হিসেব রাখতে পারবি?
সব্জির ডালাটা নিয়ে দুর্গার কাছে নামিয়ে রেখে কী দিয়ে কী রান্না হবে সেই আলোচনার নিমগ্ন হন।
যুধাজিৎ একুট তাকিয়ে দেখে। অনেক দিনের মতো আর একবার ভাবে মাকে শুধু বোকাশোকা ভালো মানুষই ভাবি। কিন্তু মার নিজস্ব এক ধরনের জীবনদর্শন আছে, সেখানে মাকে যুক্তিতে হারানো যায় না!
কিন্তু চেনাচেনা মনে হলে তো আর শুধুই ‘আহা’ করে বসে থাকা যায় না?…অতএব গিয়ে হাজির হতে হয়।
তা টুসকির কপাল, কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে দরজা খুলে দিতে গেল কিনা এ বাড়ির অতিথি মেয়েটাই।
আপনি এখানে?
যুধাজিৎ একটু অবাক হয়ে তাকাল। কারণ দরজায় কড়া নাড়ামাত্রই দরজাটা যে খুলে দিল, তাকে এখানে দেখবার কথা নয়।
পাপিয়া একটু হেসে বলল, কেন, আপনি জানতেন না এ বাড়ির সঙ্গে আমার একটা নিকট সম্পর্ক আছে?
সম্পর্ক একটা আছে জানতো বুধাজিৎ। কিন্তু সেটা কী খুব নিকট? জ্যেঠিমার বাপের বাড়ি না ওই রকম কী যেন একটা না? তবে সে কথা বলল না। শুধু বলল, জানতাম। তবে দেখা হয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা নিয়ে আসিনি।
সংসারে সর্বদাই তো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে। এখানের ঘটনা আপনি জানেন?
যুধাজিৎ আস্তে বলল, দেখুন, অনেকদিন আসাটাসা হয়নি—
ওখানেও হয়নি।
তা ঠিক। নানা ধান্ধায় দিন যাচ্ছে। আজ সকালে হঠাৎ খবরের কাগজে একটা খবর দেখে কীরকম যেন সন্দেহ হলো—
সন্দেহ সত্যি!
তাহলে শিলাদিত্যর দাদাই হাসপাতাল থেকে—
হ্যাঁ।
কোনো খবর পাওয়া যায়নি?
এখনো পর্যন্ত তো না।
ওর বাবা কেমন আছেন?
আছেন ইনটেনসিভ কেয়ারে। আসুন ভেতরে।
শিলাদিত্য নেই?
আর বলবেন না। বেচারা শিলুদার অবস্থা দেখে মায়া হয়। একদিকে বাবার অসুখ, একদিকে দাদা হারানো, তার সঙ্গে মায়েরও শরীর খারাপ। দেখেশুনে আমি তো ক’দিন এবাড়িতে রয়েই গেছি। বড়মাকে নিয়ে এসেছিলাম সেদিন।
বলেই একটু থেমে বলল, ‘বড়মা’, মানে আমার জ্যেঠিমা, এ বাড়ির মেয়ে, তা জানেন তো? টুসকিদের পিসি
তা জানি।…একটু হাসল যুধাজিৎ।
মনে মনে ভাবল, বললে বলেই মেনে নিলাম। তোমাদের এইসব সম্পর্কের জটিল জাল ভেদ করতে পারি, এমন ক্ষমতা নেই।
বাড়িতে ঢুকে আসতে আসতেই সন্ধ্যাতারা গলা বাড়িয়ে বলে উঠল, কে এল রে পাপিয়া? তারক এলো বুঝি?
তারক। ইস। বড়মা তুমি যে এই চারদিন ধরে কেবলই তারকের স্বপ্ন দেখছ! সেই মহাপ্রভুটিও তাঁর বড়দাবাবুর মতোই নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন মনে হচ্ছে।
সন্ধ্যাতারা হতাশ গলায় বলে, ছেলেটার আসলে কী সে তো এখনো রহস্য। ভগবান জানেন স্বেচ্ছায় উধাও, না কেউ কিছু করেছে।
যুধাজিৎ এগিয়ে এসে একটা প্রণাম করে।
সন্ধ্যাতারা তার চিবুক স্পর্শ করে বলেন, থাক বাবা থাক! ভালো থাকো। মা ভালো আছেন?
ছিলেন। আজ সকালে কাগজটা পড়ার পর থেকে আর ভালো নেই। আমায় তো ঠেলেই পাঠালেন, যাবি তো দেরি করছিস কেন? যা!
সন্ধ্যাতারা বলে, ভারি সুন্দর মানুষ। তাই ছেলেও এতো সুন্দর। এসো বাবা! বসবে এসো। হ্যাঁরে পাপু, টুসকি কোথায় রে?
এই যে একটু আগে লন্ডী থেকে কাপড় না কী যেন আনতে গেল। এসে যাবে। ওই তারক বিহনে এখন অনেক কাজ বেড়ে গেছে তো!
যুধাজিৎ ভিতরে এসে বসে পড়ে বলে, দেখুন এ বাড়ির বড় ছেলেটি সম্পর্কে মনে হচ্ছে ততটা দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কেউ কিছু করেছে এমন বোধ হয় না। খুব সম্ভব নিজেই—
পাপিয়া আস্তে মাথা নাড়ে, ব্যাপারটা সেইদিকেই টার্ন দিচ্ছে। হসপিটালে খোঁজ নিতে গিয়ে ওয়ার্ডের সব পেশেন্টকে জেরা করে করে দেখা গেছে, বাপ্পাদা নাকি বলতো, অসহ্য! এভাবে বন্দী হয়ে থাকা যায় না।…আবার আর এক অচল অনড় পেশেন্ট নাকি একদিন খুব জোরগলায় বলেছিল, ‘আমার যদি পা থাকতো, তাহলে এই নরককুণ্ডে একদিনও থাকতাম না।’ তো বাপ্পাদার মাথাটাই জখমি। পা-টা তো—একটু হাসলো পাপিয়া
যুধাজিৎ বলল নরককুণ্ড!
ওরা তো তাই বলছিল। অথচ বাপ্পাদার জেদ, সাধারণ সবাই যেভাবে থাকতে পারে সেভাবে থাকতে পারব না কেন? আমার অবস্থা আছে বলেই আমি আলাদা কোনো ফেসিলিটি নেব? কক্ষণো না। তো শুনলাম, যে রাত থেকে নিখোঁজ, সেইদিনই নাকি ওই রকম সব আলোচনা তুঙ্গে উঠেছিল। তাতেই মনে হচ্ছে, কেটে পড়া। কট্টর আদর্শবাদী লোকগুলোকে নিয়ে সংসারে খুব জ্বালা, তাই না? কারোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না।
যুধাজিৎ একটু তাকিয়ে বলে, আমার জীবনদর্শন তাই। কট্টর হয়ে স্রেফ ‘একঘরে’ হয়ে থাকা এবং সংসারের আপনজনেদের দুঃখের কারণ হওয়া। তার থেকে বরং কট্টরমিটা কিছুটা কমিয়ে—
এই সময় সন্ধ্যাতারা চা আর খাবার নিয়ে এসে হাজির হয়।
যুধাজিৎ খুব অস্বস্তির গলায় বলে, এই দেখুন, কী মুশকিল! সেই আপনি চা টা করে— আমাদের বাঙালি বাড়ির এই এক অদ্ভূত অন্যায় ধারা চির প্রচলিত। বাড়িতে অসুখ-বিসুখ, কী বিপদ-টিপদের সময়েও অতিথি সৎকারটি পুরোদস্তুর করা চাই। আমি কিন্তু এনাকে বলেছিলাম বারণ করে আসতে। দেখুন তো এখন—
পাপিয়া হেসে ফেলে বলে, বারণ করলেই যেন শুনতেন বড়মা!
সন্ধ্যাতারা তাড়াতাড়ি বলে, এ আর এমন কী বাবা! ঘরের ছেলের মতোই দিয়েছি। শিলু এলে তাকেও তো চা খাবার দেব? নাকি দেব না? তাকে কি অতিথি সৎকার বলা হবে?
আপনি এখন এখানেই আছেন?
থাকছি বাবা ক’দিন। এখানে যা অবস্থা। তারকটা সুদ্ধু বেপাত্তা। বৌদির শরীরও খারাপ। ওদিকে দাদার জন্যে মা-বাবা সর্বদাই কাঁটা হয়ে আছেন। ফেলে যাই কী করে?
পাপিয়া বলে ওঠে, যাবেই বা কেন? শুধু শ্বশুরবাড়িতেই ডিউটি দিতে হয়? যে বাড়িতে জন্মেছ, তার প্রতি কোনো ডিউটি নেই? শুধু কুটুম্বের মতন আদর খাওয়ার বিধি? ভেরি ব্যাঙ্।
সন্ধ্যাতারা হেসে ফেলে বলে, শুনছো তো বাবা, মেয়ের বাক্যি? সবসময় সক্কলের ন্যায্য অন্যায্য বিচার করে চলে।
যুধাজিৎ একটু হেসে বলে, ভেরি গুড।
সন্ধ্যাতারা বলে, আজ তুমি এলে, বাড়িতে একটু হাসির আলো দেখা গেল। সর্বদা একটা দম আটকানো বুক চাপা ভাব। আমি তো বলছি রাতদিন ঠাকুরকে ডাকছি। তিনি কি আর মুখ তুলে চাইবেন না?
যুধাজিৎ চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ওই সরল বিশ্বাসে উদ্ভাসিত মুখটার দিকে তাকায়, তাকায় পাপিয়ার দিকেও। এবং বলে ওঠে, আপনাদের ঠাকুর সম্পর্কে আমার অবশ্য তেমন ‘ভক্তি ভাব’ নেই পিসিমা। মুখ তোলা না তোলার ব্যাপারটা তাঁর মনমর্জি।
এই দেখো। তুমিও এই পাপুটার মতো কথা বলছ। না বাবা, তেমন অন্তর থেকে ডাকলে—
হঠাৎ আবার দরজার কড়া নড়ে উঠল।
পাপিয়া যেতে যাচ্ছিল, যুধাজিৎ তাড়াতাড়ি বলল, আপনি থাকুন।…আমি দেখছি।
খুলে দিল দরজাটা।
আর দরজায় দাঁড়ানো জন, চমকে এবং প্রায় ঘাবড়ে বলে উঠল, ‘আপনি!’
ইস্। কী বেপোট অবস্থা!
লন্ড্রীর ফেরৎ কাপড়ের বান্ডিলটি রীতিমতোই দৃশ্যমান। এসব কাজ কবে আবার করেছে টুসকি? কাজল ছিল, তারক ছিল ও যাবৎ! আর পড়বি তো পড়বি এই মানুষটার সামনে!
ছি ছি।
যুধাজিৎ কিন্তু অবলীলায় ‘দিন’ বলে ফস করে ওর হাত থেকে বান্ডিলটা টেনে নেয়।
কী আশ্চর্য! আপনি কেন? ইস।
আপনি অনেকক্ষণ রয়েছেন, শেষটুকু লাঘব করার পুণ্যটুকু অর্জন করি।
কখন এসেছেন?
তা অনেকক্ষণ! সৎকার পর্ব হয়ে গেছে।
সৎকার পর্ব!
বাঃ! মানে আবার কী, অতিথি সৎকার। যেটা নাকি সংসারের যে-কোনো অবস্থাতেই অবশ্যকরণীয়।
এগিয়ে ভেতরে আসে।
আর টুসকি দেখে মঞ্চে পাপিয়া। দেখেই রাগে মাথা জ্বলে ওঠে টুসকির
ওঃ। তার মানে বেশ অনেকক্ষণ ধরেই আড্ডা হয়েছে। টুসকি তো গোড়াতেই লন্ড্রীতে যায়নি। গিয়েছিল, পাড়ার এক বান্ধবীর বাড়ি। বেরোনো তো হচ্ছে না ক’দিন।
পাপিয়ার দিকে একটা তিক্ত দৃষ্টি হেনে ঘরের মধ্যে চলে যায় সে, কাচানো কাপড়গুলো নিয়ে।
যদিও পিসিমা এসে থাকায়, টুসকি হাতে চাঁদ পেয়েছে। নচেৎ এই গোলমেলে সমরে তারকবিহীন বাড়িতে টুসকির কী দুরবস্তা হতো, ভাবা যায় না! মা তো অঙ্গ ঢেলে পড়ে আছেন। নীলুমানা যখন এসে খবরাখবর দেন, তখনি যা ওঠেন একটু। পিসিমা তো—বিপদতারিণীর মূর্তিতেই সংসারটাকে কী নিপুণভাবে কায়দা করে ফেলেছেন। দেখে কে বলবে, বছরের পর বছর উনি এ-বাড়ির রান্নাঘরের ছায়াও মাড়াননি!
আশ্চর্য, নয়নতারাও মেয়ে এসে সংসারের কেন্দ্রবিন্দুতে বসার যেন একটা শক্ত অবলম্বন পেয়েছেন। তিনিও রান্নাঘরের ধারেকাছে এটাওটা করছেন। যা নাকি নীহারিকার এলাকায় ভাবাই যায় না।
এলাকাটা অবশ্য নীহারিকারও থাকে না, থাকে তারকের।
এত বিষাদাচ্ছন্ন অবস্থাতেও হঠাৎ যেন সংসারটাকে ‘বাড়ি বাড়ি’ ভাব লাগে টুসকির, যখন দেখে রান্নাঘরের দরজায় নয়নতারা বঁটি পেতে বসে কুটনো কুটছেন আর ভিতরে সন্ধ্যাতারা রান্নার ব্যস্ত।
পাপিয়াটাও থেকে গেছে ক’দিন। বলেছে, বড়মা যে আবার আমায় না দেখলে চক্ষে অন্ধকার দেখেন। থেকেই যাই মামারবাড়িতে দু’দশ দিন। ছুটি রয়েছে যখন।
আসলে এই ডাক্তারি পড়া মেয়েটা এদের এই অবস্থার মধ্যে ভিতরে ভিতরে একটা দায়িত্ব অনুভব করছে। তবে মুখে সেটা বলছে না!
টুসকির সুবিধে এই পাপিয়ার উপস্থিতি যেন বাড়িতে একটা পুরুষ ছেলের উপস্থিতি তুল্য। হাসপাতালে খবর নিতে যাওয়া, ওষুধপত্রের দরকার হলে কিনে আনা, এসব অবলীলায় করে এবং নীলুমামার সঙ্গেও একান্ত সহজ। সর্বোপরি হচ্ছে নীহারিকাকে খাওয়ানো।
‘আমার খাবার ইচ্ছে নেই’ বলে কাঠ কবুল নীহারিকাকে পাপিয়া প্রায় ধমকেই খাওয়াচ্ছে! যেটা টুসকির পক্ষে অসম্ভব ছিল।…মা না খেয়ে পড়ে থাকলে দাদু দিদারও তো যম যন্ত্রণা। এক কথায় ওই দুটো মানুষ থাকায় টুসকি যেন বর্তে গেছে।
কিন্তু তাই বলে পাপিয়া টুসকির অনুপস্থিতিতে তার প্রেমিকরে সঙ্গে জমিয়ে বসবে?
পাপিয়াকে বাবা বোঝাও ভার।
ছোড়দাটা তো সর্বদা ওনার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি হেনে তাকিয়ে থাকে।…অথচ সেদিন হাসপাতালে বাপ্পাকে দেখতে গিয়ে পাপিয়ার চোখে দেখেছে কী গভীর দৃষ্টি!
আর এই যুধাজিৎ নামের হ্যাংলাটা।
এলি তো ঠিক সেই সময়েই। যখন টুসকি বাড়ি নেই। ওকে খবরটা দিল কে? ছোড়দা নিশ্চয়।
কিন্তু টুসকিকে দরজা খুলে দেবার সময় ওই হ্যাংলাটার চোখেমুখে যে একটা আলো ফুটে উঠেছিল, সেটারও তো একটা মানে আছে? সঙ্গে সঙ্গে টুসকির হাতের বোঝাটাও টেনে নিল কত সহজে
ঘর থেকে বেরোতে একটু দেরি করে টুসকি। নিজেকে ঠিক করে নিতে
যদিও বাড়িতে এখন বিপদ, দুশ্চিন্তা, তবু–একটি তরুণীচিত্ত আপন চিন্তায় আবর্তিত না হয়ে পারে না!
নাঃ। ক’দিন দেখে শুনে তো মনে হচ্ছিল ওই পাপিয়াটা বাপ্পাদিত্য নামে দুর্লভ রত্নটির দিকেই ঝুঁকে বসে আছে। তাহলে মন্দের ভালো।…দুর্লভেরই সাধনা কর তুই বসে বসে।
যদিও তাতে ছোড়দা হতভাগাটার একটু কষ্ট হবে।… যাকগে—ও একটা নেহাৎই তরলচিত্ত লোক। কাউকে জুটিয়ে নেবেই।
কিন্তু টুসকি নিজে?
টুসকি কী কখনো মনে মনে ভাবতে পারছে—ওই মানুষটার সঙ্গে ভবিষ্যৎ জীবনটাকে জড়াবে? টুসকির মধ্যে যে এখনো ভয়ের বাসা!…জাতপাতের গণ্ডি অতিক্রম করে কী ওকে এ-বাড়িতে গ্রহণ করা হবে?
অবশ্য তার আগে ভাল করে দেখতে হবে পাপিয়ার দিকে হ্যাংলাটা কোন চোখে তাকায়।
