সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক
আর পারা যাচ্ছে না বাবা! অহরহ মনের মধ্যে ধ্বনিত হয়ে চলা এই আর্তনাদটি হঠাৎ মুখ ফসকে মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়ে গেল। গেল প্রায় অজ্ঞাতসারেই। বলে ফেলে নিজেই যেন নিজের স্বরে চমকে গেল। তা বাইরে যখন ছিটকে এসে পড়েছে, তার দায় পোহাতে হবে বৈকি। মনের মধ্যে আর্তনাদের ঝড় তোলো, প্রতিবাদের ঝড় তোলো, অবৈধ চিন্তা, হিংস চিন্তা, বেআইনি চিন্তা, অসঙ্গত চিত্তা যা কিছু নিয়েই নিরুচ্চার উচ্চারণে মুখরিত হও, তার কোনো দায় নেই, ওজন নেই, কিন্তু যে মুহূর্তে? ভিতরের ঝড় বাইরে এসে আছড়ে পড়ে, সেই মুহূর্তেই তার ওজন থাকে, দায় থাকে।
বাপ্পার ওই অহরহ ভেবে চলা কথাটা যেই মুখ ফসকে বাইরে বেরিয়ে এল, সঙ্গে সঙ্গে পাশের বেড়-এর ভদ্রলোক চকিত হয়ে বলে উঠলেন, কিছু বলছেন?
বাপ্পা সচকিত হলো, লজ্জিতও হলো। এভাবে উদ্ঘাটিত হওয়া বাপ্পার পক্ষে রীতিমত অস্বস্তিকর। কিন্তু জানে এখন ‘না কিছু বলছি না’ বললেও ভদ্রলোক সহজে রেহাই দেবেন না। জানতে চাইবেন, কোথাও যন্ত্রণাবোধ করছেন না কি? নার্সকে ডেকে দেব না কি?
ভারী পরোপকারী লোক।
তাই বাপ্পা আলগাভাবে বলে, না, এই বিছানায় পড়ে থেকে থেকে আর পারা যাচ্ছে না। তাই বলছি।
ভদ্রলোক প্রায় অবাক হয়ে বলে ওঠেন, আপনি এই দশ দিন হলো এসেছেন না? হ্যাঁ, দশ দিনই তো!
তাই হবে বোধহয়।
এর মধ্যেই আপনি বলছেন, আর পারা যাচ্ছে না।’ আমি কতদিন আছি জানেন? তিনটি মাস। থ্রী মাহুস।
কথায় জোর দেবার জন্যে, বাংলা শব্দটির পরই দ্বিতীয়বার সেটি ইংরেজিতে তর্জমা করা ভদ্রলোকের একটি মুদ্রা দোষ। বাপ্পা অবশ্য সাধ্যপক্ষে ওনার গাড্ডায় পড়তে চায় না। তার কার গাড্ডাতেই বা পড়তে যায়? টুসকি তো কখনো কখনো বলে ওঠে, ‘দুটো কথা কইলেও কী তোর ইমেজ নষ্ট হয়ে যায় দাদা? কথা বলতে পয়সা তো লাগে না। একেই বলে কিপটে স্বভাব।’
দাদা যদি ভুরু কোঁচকায়, আহত হয়ে চলে যায়। আর দাদা যদি ক্ষ্যামাঘেন্না করে দুটো কথা কয় তাহলে টুসকি সেই সুযোগে দু’শো কথা করে নে। …এ ভদ্রলোকেরও প্রায় সেই স্বভাব। ডেকে ডেকে কথা বলেন, বাপ্পা হুঁ হাঁ দিয়ে সারে। একদম পাশের লোক, কতো আর এড়ানো যায়?
তবে এইরকম সময়ই বাপ্পার মনে হয় ‘জেনারেল ওয়ার্ডেই থাকব’ বলে জেদ করাটা বোধহয় একটু ভুল সিদ্ধান্তই হয়ে গেছে। এই প্রায় অসহা জায়গায় পড়ে থাকতে থাকতে মনে হয়, মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বোধহয় একটু ‘নির্জনতা’। নিজেকে নিয়ে একা থাকার একটি পরিবেশ। তার দাম দিতে বোধহয় একটু মান খাটো করাও চলতো। কিন্তু আর তো সেকথা বলা যায় না! মা তো বার বার বলছে, ‘এখানে তোর খুব অসুবিধে হচ্ছে। একটা আলাদা ঘরের ব্যবস্থার জন্যে বলি না রে?’
যদিও সেই আলাদা ব্যবস্থাটি খুব সহজপ্রাপ্য নয়। টাকা দেব বললেই যে পাওয়া যাবে তা তো নয়। ঘর খালি থাকা চাই। তবে হ্যাঁ, নীলুমামা এ ইশারাও দিয়েছিলেন, ‘সে আমি ম্যানেজ করে ফেলতে পারবো। ওর জন্যে চিন্তা নেইরে।’ আর ঠিক এই কারণেই বাপ্পা দোদুল্যমান মনকে একটা শক্ত জায়গায় স্থির করে আটকে রেখেছে। আলাদা একটা ঘর থাকলে, প্রাইভেসি থাকতো, থাকতো বই পড়তে পারার সুবিধে। কেউ দেখা করতে এলে স্বস্তিবোধ। তবু—একবার যখন ‘না’ বলেছে তখন আর ‘হ্যাঁ’ বলা চলে না। তাও হয়তো চলতো—যদি সেটা ওই নীলুমামার মাধ্যমে না হোত! লোকটাকে যে কেন এমন দু’চক্ষের বিষ লাগে এখন, ভেবে পায় না বাপ্পা। তিনিও যে সেটা না বোঝেন তা নয়, এবং নিজেকে যথেষ্টই গুটিয়ে রাখবার চেষ্টা করেন, তবু স্বভাবটা তো একেবারে বদলাতে পারেন না। তাঁর স্বভাবের গোড়ার কথাই যে হচ্ছে, কেউ কোনো অসুবিধেয় পড়েছে শুনলেই বলে উঠবেন ‘নো প্রবলেম। দেখি আমি কী করতে পারি।’
পাশের ভদ্রলোক তো নীলুমামায় মোহিত। নীলুমামা তাঁর সঙ্গেও আত্মীয়সুলভ ভঙ্গিতে কথা বলেন। ডাক্তার কী বলছে, কতটা ইমপ্রুভ করছে, এই সব প্রশ্ন।
চলে যাবার পর ভদ্রলোক বলে ওঠেন, ‘আপনার মামার মতো হৃদয়বান লোক আমি কমই দেখেছি।’
ভদ্রলোকের নামটাম জানে না বাপ্পা, শুধু পদবীটা জেনেছে ‘পাঠক’। শুনে হঠাৎই ভেবেছিল এই ধরনের পদবীর মূল উৎস কী? এদের পূর্বপুরুষদের পেশাটা কী ছিল ভাগবত-টাগবত পাঠ করে বেড়ানো? গ্রামে গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে কতরকম যে অদ্ভুত অদ্ভুত পদবী কানে আসে। বাপ্পার ওই একটা ছেলেমানুষী স্বভাব, তক্ষুণি তার মূল উৎস চিন্তা করতে চেষ্টা করে। এইতো যেখান থেকে মাথা ফাটিয়ে এলো, সেখানে দু’টো লোককে দেখেছিল, তাদের পদবি হচ্ছে ‘সেনাপতি’ আর ‘সেপাই’। এদের পূর্বপুরুষরা নির্ঘাত কোনো এককালে কোনো রাজাটাজার সেনাবাহিনীতে ছিল! ভেবেছিল বাপ্পা।
এঁর ব্যাপারেও ভেবেছিল, বোধহয় কথক পাঠক গোছের কিছু ছিল এরা আগে। লোকটার বয়েস বোঝা শক্ত। এমন একটা পাকসিটে মার্কা চেহারা, মনে হয় চল্লিশ ও হতে পারে পঞ্চাশও হতে পারে। চল্লিশের কম হওয়াও অসম্ভব নয়। তবে ত্রিশ বছরের বাপ্পার সঙ্গে বেশ গায়ে পড়া মাইডিয়ারি ভাবে কথা বলবার চেষ্টা করে থাকেন ভদ্রলোক।
এখনো তেমনি বললেন, দশদিনেই আপনি বলছেন ‘পারা যাচ্ছে না’? আর আমি কতদিন আছি জানেন? তিনটি মাস।…এবং বক্তব্যকে আরো জোরালো করতে ইংরেজিতে তর্জমা করে আর একবার বলেন।
আর ‘হুঁ হাঁ’ করে সেরে নেওয়া স্বভাব বাপ্পা হঠাৎ স্বভাবছাড়াভাবে চমকে প্রশ্ন করে তিন মাস!
সেই তো, তিন মাসের ওপর আরো দু’টো দিন জোড়া দিন।…তাও এখন শুনছি, আরো অনেক সময় নেবে। যদিও বেশি দিন পড়ে থাকলে অনেক প্রবলেমও আছে।
বাপ্পা লক্ষ্য করে দেখেছে, ভদ্রলোকের পায়ে প্লাস্টার করা নেই। এমনকি কোনো ব্যান্ডেজও নেই। অথচ বিছানা থেকে নামতেও দেখা যায় না। তার মানে নেমে দাঁড়াবার সামর্থ্য নেই।
বাপ্পা যা করে না আবার তাই করে বসল। খাল কেটে কুমির আনল। অর্থাৎ আবার নিজে থেকে একটা প্রশ্ন করে ফেলল, কী হয়েছে?
ব্যস, খুলে গেল বাঁধের মুখ।
আর বলবেন না মশাই। কপালের ফের। কিছুর মধ্যে কিছু না, ট্রাম থেকে নেমে রাস্তা ক্রশ করছি, একটা ধর্মের ষাঁড় পাগলা হয়ে ঊর্ধ্বমুখী ছুটে আসতে গিয়ে পিঠে মারল এক গোঁত্তা। একদম মেরুদণ্ডে। একদম স্পাইনাল কর্ডে!
ধর্মের ষাঁড়! বাপ্পা প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকায়।
কী? ধর্মের ষাঁড় মানে জানেন না? অ্যাঁ? রাস্তায় দেখেননি কখনো?
বাপ্পা যখন কুমিরকে এনে বসেছে তখন তার হ্যাপা সামলাতেই হবে। তাই আস্তে মাথা নাড়ে।
দেখেননি? রাস্তায় ষাঁড়, গরু, মোষ, কুকুর, ছাগল এসব দেখেননি কখনো? তাজ্জব কী বাৎ।
বাপ্পা একটু বেজার গলায় বলে, তা দেখব না কেন? কিন্তু ‘ধর্মের ষাঁড়টি কী বস্তু?
কী মুশকিল! বাঙালির ছেলে এটা জানেন না? বলি লোকে মা-বাপের শ্রাদ্ধে বৃষোৎসর্গ করে তা জানেন তো? কী ব্যাপার? মুখ দেখে মনে হচ্ছে তাও বোধহয় শোনেননি কখনো। তবে আর কী বলব? ও একটা শাস্ত্রীয় ব্যাপার। একটা ষাঁড়কে দেগে দিয়ে ওই পরলোকগতের স্বর্গ কামনায় পথে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে ব্যাটা ইচ্ছেমতো চড়ে বেড়ায়, তাকে কেউ মারতে ধরতে পারে না। ধর্মের নামে উৎসর্গ তো। যথেচ্ছ বিচরণের স্বাধীনতা থাকে তার, আর কোনো কাজকর্মের দায়ও নেই, শাসনও নেই, তাই বেদম গোঁয়ার হয়।
ভদ্রলোক একটু রহস্যময় হেসে বলেন, তো মানুষের মধ্যেও তেমন জীবের অভাব নেই। আমরাও তাকে ওই নামেই চিহ্নিত করি। যে যাক, এই তো মশাই ব্যাপার। অজ্ঞান, অচৈতন্য লোকটাকে রাস্তা থেকে লোকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে দিয়েছিল। অতঃপর হাতের ব্যাগ থেকে ঠিকানা-টিকানা পেয়ে বাড়িতে খবর! পরে জানলাম শিরদাঁড়াটা ফেটে আটফাটা হয়ে গেছে। বুঝুন ব্যাপার। শরীরের আসল জায়পাটাই খতম।…মাস দুই লোহার ফ্রেমের মধ্যে পুরো বডিটাকে আটক রেখেছিল, এখন ক্রেপ ব্যান্ডেজ দিয়ে মাদুর গোটানোর মতো আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পাটিসাপ্টা বানিয়ে রেখেছে।
অভাগার কপালখানা দেখুন। লরীর ধাক্কা নয়, মোটর গাড়ির ধাক্কা নয়, ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট নয় যে একটা প্রেস্টিজ থাকবে। কিনা ষাঁড়ের গুঁতো। লোকের কাছে বলতে লজ্জা। প্রেস্টিজ বলে কিছু থাকে না।
বাপ্পা হঠাৎ হেসে ফেলে।
ভদ্রলোকের বলার ভঙ্গিতে না হেসে পারে না।
আপনি হাসছেন? তা শুধু আপনিই বা কেন? এ আক্ষেপ শুনে সবাই হেসেছে। এভ্রিম্যান। কিন্তু আমার মানসিক অবস্থাটা কেউ ভেবে দেখে? এমনিতে তো নেহাৎই হরিপদ কেরানির জীবন, বিশ বছর ধরে কর্মস্থলে ওই ষাঁড়ের গুঁতোই খেয়ে চলেছি। তো জীবনে একটা বিশেষ ঘটনা ঘটলো, তাতেও তাই! যদি মরে যেতাম তাহলে লোকে শুনতো মুকুন্দ পাঠক নামের হতভাগাটা মরলো কিনা ষাঁড়ের গুঁতো খেয়ে! তা মরলে অবশ্য ভালই হতো! ব্যাচিলার মানুষ, মা-বাপও নেই, মরলে কার কী এসে যেত? এ এখন কী অবস্থা হয়—
ব্যাচিলার মানুষ!
শুনে যেন একটু ছেদ্দা এল বাপ্পার! কেন কে জানে।
মুকুন্দ পাঠক অবশ্য ওই সব ছেদ্দা অছেদ্দার ধার ধারেন বলে মনে হয় না, তিনি কথা চালিয়েই যান। বলেন, এখন এই ভাঙাচোরা দেহটায় কতটা কী ফিট হবে কে জানে। হয়তো সংসারের গলগ্রহ হয়ে থাকতে হবে। ভাই-ভাজের সংসার বৈ তো নয়।
ওপাশ থেকে কে একজন বলে ওঠে, ও মুকুন্দবাবু, ‘ভাবিতে উচিত ছিল প্রতিজ্ঞা যখন’। ‘বে-থা’ করে সংসার করেননি যখন তখন শেষ জীবনে তো পরের গলগ্রহ হতেই হবে। মা-বাপ তো চিরকালের নয়।
মুকুন্দবাবু নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, তখন অনেক বড় বড় চিন্তা ছিল ব্রাদার। ভাবতাম কম রোজগার, কেন মিথ্যে জঞ্জাল বাড়াই, একা থাকবো, খাবো, মাখবো, বেড়াবো, স্বাধীন জীবনযাপন করবো। রোগ-ব্যাধি হলে হসপিটাল আছে। রোগব্যাধি হলে যে নরককুণ্ডু থাকবে তা কে জানতো?…তো এই আপনি মশাই কী যেন নাম আপনার? কেন মরতে এখানে এসেছেন। আপনাকে তো দেখলে মনে হয় খুব ভালো ঘরের আদরের ছেলে। আপনি—
বাপ্পা বলে ওঠে, লোককে দেখেই আপনি বুঝে ফেলেন, সে কীরকম ঘরের ছেলে? আদরের না অনাদরের?
তা পারা যায় বৈকি ভায়া! আপনাকে যাঁরা দেখতে টেখতে আসেন রীতিমতো রেসপেকটেবল বলেই মনে হয়। তাছাড়া আমি শুনেছি আপনার মা আপনাকে আলাদা কেবিনে থাকার জন্যে বারবার বলেছেন। তবে আপনি কেন এই অসহ্য অবস্থায়—
বাপ্পা হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠে বলে, এত হাজার হাজার লোক যা সহ্য করতে পারছে তা সেটা আমিই বা সহ্য করতে পারবো না কেন?
মুকুন্দ পাঠক তার পাকসিটে মার্কা মুখে একটু রহস্যের ব্যঞ্জনা মাখিয়ে বলেন, ওসব আদর্শের বুলি একসময় আমরাও কপচেছি ব্রাদার। সে সব মোহভঙ্গ হয়ে গেছে। তবে হ্যাঁ, আলাদা কেবিনে থাকলেও, এর থেকে এমন কিছু স্বর্গীয় অবস্থা পেতেন তা মনে হয় না। আসলে সবই তো ‘স্বরাজ পাওয়া’। এ টু জেড। ‘ক’ থেকে ‘চন্দ্রবিন্দু’ পর্যন্ত। কে কার কড়ি ধারে।…ওই একটা জিনিস এনে দিয়েছিল বটে গান্ধিজি। স্বরাজ! তো সেটাই ভাঙিয়ে এযাবৎ খেয়ে চলেছি আমরা সবাই। আর তারপর যাঁরা এলেন? অনেক বিগ্ বিগ্ কথা শোনালেন, অনেক স্বপ্ন দেখালেন, নতুন পৃথিবী গড়ে দেবেন প্রমিস করলেন? তাঁরা এখন—
ওধারের ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ওই শুরু হলো মুকুন্দবাবুর পাঁচালি —
কী? শুনে আপনার গায়ে ফোসকা পড়ছে বুঝি? হা হা হা। পড়তো মশাই, আমারও একদিন তাই পড়তো। লোকের সঙ্গে তাল ঠুকে লড়তে যেতাম। এখন দেখতে দেখতে চোখের কাজল মুছে ফর্সা।…হ্যান করেঙ্গা ত্যান্ করেঙ্গা। সবাইকে সমান করে দেঙ্গা। মানুষে মানুষে আর ফারাক থাকবে না। আজ আমরা সবাই সর্বহারা, আগামীকালে সবাই একসঙ্গে ‘সর্বস্ব’ পাবো।…তারপর? দেখছেন তো? না কি দেখছেন না? কেমন সমান সমান ভাগ? যারা ‘কনটেসা’ গাড়ি চেপে ভেপু বাজিয়ে রাস্তা দাপিয়ে বেড়াবার তারা তাই বেড়াচ্ছে, যারা বুলেটপ্রুফ গাড়ি চড়বার তারা তাই চড়ছে, আর যারা ষাঁড়ের গুঁতো খাবার, তারা তাই খাচ্ছে। হাসপাতালে এসে কুকুরে চাটা থালায় খেতে বাধ্য হচ্ছে।
মুকুন্দবাবু আপনি থামবেন? ওপাশ থেকে সেই কণ্ঠস্বর তড়পে ওঠে, আপনার ওই একঘেয়ে কথা শুনতে শুনতে কান পচে গেল আমাদের। যখনি কোনো নতুন মক্কেল পাবেন, তখনি আপনি ওই একঘেয়ে পাঁচালি গাইতে বসবেন! অসহ্য!
মুকুন্দবাবু চারখানা খাট ডিঙোনো চোখে সেই ভদ্রলোকের দিকে ভস্ম করার ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলে ওঠেন, হসপিটাল কারো পিতৃপুরুষের জায়গা নয় যে শুধু আপনার মনের মতো কথাগুলিই বলা হবে! আপনাদের বুঝি জায়গাটা স্বর্গতুল্য মনে হয়? অতি উত্তম! অনন্তকাল স্বর্গবাস করুন। আমার এখানটা নরককুণ্ড ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। বলি কোনো সভ্য দেশে কেউ ভাবতে পারবে, হসপিটালে একটা বেড-এ দু’ধরনের দুটো রোগী। হ্যাঁ, একটা বেড-এ দুটো পেসেন্ট। কেউ ভাবতে পারবে দোতলায় তিনতলায় পেসেন্টের ধারে পাশে নেড়িকুত্তা ঘুরে বেড়ায়, পেসেন্টের খাবার টেনে নেয়, খাওয়ার পর থালাটা চেটে সাফ করে। গড় জানে সেটা আর মাজা হয় কিনা। হয়তো ভাবে সাফ তো হয়েই গেছে। …বলুন? আর কোথাও ভাবতে পারবে, মেটার্নিটি থেকে সদ্যোজাত শিশুকে শেয়াল কুকুরে টেনে নিয়ে যায়? হসপিটালের কম্পাউন্ডে শুয়োর চড়ে বেড়ায়? মুরগী প্রতিপালন হয়?…পেসেন্টের বরাদ্দ খাদ্য থেকে সরিয়ে ‘কর্তা’রা বখরা করে নেন…হসপিটালের দরকারি ওষুধপত্র মায় তুলো ব্যাণ্ডেজ পর্যন্ত পাচার হয়ে বাইরে বিক্রী হয়? এতো কিছুই না বলতে বসলে মহাভারত।…বলুন আমাদের এই সোনার দেশটিতে ছাড়া অন্য কোনো সভ্য দেশে হতে পারে এসব জিনিস? আমাদের হয়। অথচ, আমাদের কর্তারা আকাশে উড়ে উড়ে বড় বড় দেশে গিয়ে বড়মুখ করে বড় বড় বুলি ছাড়েন। আর নিজেদের সাত গুষ্ঠির ছানাপোনা পর্যন্ত যার যখন একটু মাথাটিও ধরবে তাকে চিকিৎসা করতে ‘ওদেশে’ পাঠান। হুঁ, ওদেশের ট্রিটমেন্ট না হলে দীনের বন্ধু দীনবন্ধু দাদাদের মন ওঠে না।
সেই নাছোড়বান্দা লোকটি আবার বলে ওঠেন, এক কথা কত হাজার বার রিপিট করেছেন মুকুন্দবাবু?
হাজার? হাজারবার কেন, কালোকে কালো বলতে হলে লক্ষ বার বলা যায়, কোটি বার বলা যায়। বলতে হবে—চোখের ঠুলি খসে পড়লে, আপনাদেরও একদিন বলতে হবে। তবে যদি গন্ডারের চামড়ার ঠুলি হয় তো আলাদা কথা।
কী? কী বললেন? মুখ সামলে কথা বলবেন মুকুন্দবাবু।
মুকুন্দবাবুও সতেজে বলে ওঠেন, কেন মুখ সামলাবো? হক্ কথা বলতে ভয়টা কী? কোন কথাটা মিথ্যে বলা হয়েছে বলুন তো শুনি।
বোঝা যাচ্ছে দু’জনেই কলহপ্রেমী। বিশেষ করে ওই চারখানা খাটের ওপারের লোকটি। তিনি এখন অন্য পথ ধরেন, ব্যঙ্গের সুরে বলেন, এতই যদি তো এই হতভাগাদের সঙ্গে নরককুণ্ডে পড়ে আছেন কেন মশাই? যান না, নার্সিং হোমে চলে যান না? ভালো ভালো নার্সিং হোমের তো অভাব নেই। ‘বেলভিউতেও চলে যেতে পারেন। ক্যালকাটা নার্সিং হোমে যেতেই বা বারণ করছে কে? আমরা আপনার বকবকানি থেকে রেহাই পেয়ে বাঁচি। হাড়ে বাতাস লাগে।
হঠাৎ মুকুন্দবাবুর সেই পাকসিটে মুখটাও কেমন যেন হয়ে যায়। ভাঙামতো গলায় বলে ওঠেন, কী? আমি চলে গেলে আপনাদের হাড়ে বাতাস লাগে? ওঃ। এতটা বুঝতে পারিনি। কী করবো বলুন, হাঁটার ক্ষমতা থাকলে আপনাদের রেহাই দিয়ে বিদেয় হয়ে যেতুম। বলেই গুম হয়ে যান।
নিজে নিজে পাশ ফেরার ক্ষমতা নেই, ক্ষমতার মধ্যে শরীরের আধখানা ঢাকা দেওয়া চাদরটা টেনে মুখ পর্যন্ত ঢেকে ফেলা যায়।
দুটো বয়স্ক লোকের অকারণ এই রকম ঝগড়া কোঁদল দেখে অবাক হয়ে যায় বাপ্পা! পরিবেশই কী মানুষকে এইভাবে বিকৃত করে? তাই করে নিশ্চয়। না হলে বাপ্পা হেন ছেলে হঠাৎ এমন একখানা কাণ্ড করে বসে? সে কিনা ওই অদূরবর্তী লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আপনিও তো আচ্ছা। হচ্ছিল আমার সঙ্গে কথা, আপনি হঠাৎ তার মধ্যে নাক গলাতে এলেন যে?
লোকটা বোধহয় হঠাৎ এই আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত ছিল না, তাই একটু থতমত খেয়ে যায়। তবে সামলেও নেয়। গম্ভীরভাবে বলে, আপনি তো ছেলেমানুষ, মাত্র ক’দিন হলো এসেছেন, আরো থাকলে বুঝতে পারবেন ওই একঘেয়ে বকবকানি কী বিরক্তিকর! ভাগ্যের মার খেয়েই পড়ে থাকতে হচ্ছে আমাদের। উপায় কী? উনি কেবলই বলেন, হাঁটবার ক্ষমতা থাকলে কেটে পড়তেন। বলি পারলে যেতেন কোথায়? বাড়িতে তো শুনি দাদা-বৌদির সংসার। তারা নিয়ে যাবার জন্যে গা করছে? হসপিটাল থেকে তো ছেড়ে দিতে চাইছে, নিয়ে যাবার জন্যে প্রেসার দিচ্ছে। তাঁরা আর এ মুখো হচ্ছেন না।
বলে ভদ্রলোক একটি বিড়ি ধরান।
বাপ্পা কিছুক্ষণ কেমন বিহ্বলভাবে তাকিয়ে থাকে। আর তারপরই হঠাৎ তার মাথার মধ্যে একটা কথা পাক খেতে থাকে, হাঁটবার ক্ষমতা থাকলে সটকান দিতাম।…হাঁটবার ক্ষমতা থাকলে…যেখানে পথ-কুকুরদের অবারিত দ্বার, সেখানে মানুষ সম্পর্কে পাহারা কী খুব বেশি কড়া?
নীলুদা বললেন, ছেলেকে রাজি করাতে পারলি না নীরু?
নীহারিকাকে তিনি তার সংক্ষিপ্ত ডাকনামেও ডাকেন মাঝে মাঝে।
নীহারিকা হতাশ গলায় বলল, কই আর? কালও তো বলতে চেষ্টা করছিলাম, উল্টে বলল কী জানো নীলুদা, রোজ রোজ দেখতে আসার কী আছে? এক্ষুণি মারা যেতে পারে এমন রোগী তো নয়। তবে কী ভাগ্যিস দুদিন থেকে এই দুপুরের ভাতটা নিয়ে যাওয়ায় রাজি করাতে পেরেছি। তারক নিয়ে গিয়ে খাইয়ে আসছে। যা অখাদ্য খাদ্য ওখানের। তাই হয়তো—কিংবা আমার খোসামোদে—
নীলুদা বললেন, তাও ভালো। তবে কী একখানা ব্যাটার জন্ম দিয়েছিলি বাবা! ইস্পাত।
নীহারিকা কাঁদোকাঁদো হয়, ওই তো। আমার ভাগ্যটাই ওই। সন্নিসি বৈরাগী হয়ে যায় তারও মানে বুঝি। যুগে যুগে তাদের মায়েরা এইভাবে জ্বলেছে। কিন্তু এ কী এক উটকো ব্যাপার।
নীলুদা বলেন, এ হিসেবে এদের মনটাও প্রায় সেই রকমই। কট্টরপন্থী। আদর্শে কঠোর। তবে সেই আদর্শটি যে ক্রমেই ভুলভুলাইয়ার পথে নিয়ে যায়। সেটাই মুশকিল। যখন দেশ পরাধীন ছিল আর দেশকে স্বাধীন করবার জন্যে লড়াই ছিল, তখনকার রাজনীতি আর এখনকার রাজনীতি আকাশপাতাল তফাৎ। তখন একটাই শ্লোগান ছিল ‘বন্দেমাতরম্!’ তার মধ্যে দলাদলি ছিল না। তা সে যার পথ যে রকমই হোক। মন্ত্র এক। ‘বন্দেমাতরম।’ এ যুগে আর কেউ ‘দেশ’কে মা বলে? ভুলেও না। ওসব সেকেলে হয়ে গেছে। অথচ সেই কম বয়সে যখন পথে দল বেঁধে গেয়ে যাওয়াদের মুখে সেই গান শুনেছি ‘বঙ্গ আমার জননী আমার ধাত্রী আমার, আমার দেশ’! গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে উঠেছে। আর এই আমাদের সোনার বাংলাকে নিয়ে কত গান কত ভালোবাসা ভাব?… ‘ও আমার সোনার বাংলা’—তারপর গিয়ে সেই ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’… আবার সেই ‘কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল সে আমাদের বাংলা দেশ! আমাদেরই বাংলা রে—’। আমাদের প্রভাসকাকা গাইতেন—মনে নেই?
নীহারিকা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ও নীলুদা, তোমার এত সব মনে আছে?
মনে কী আর সবসময় থাকে রে? হঠাৎ একটা কোনো কারণে আলোড়ন উঠলেই— আসলে ছেলেবেলার স্মৃতি তো ভোলা যায় না? সে একেবারে পাথরে খোদাই ব্যাপার। তো দ্যাখ, আমাদের এলাকাড়িতে ‘বাংলাদেশ’ নামটা থেকেই আমাদের অধিকার চলে গেছে। আমরা আর অধিকার বলে গেয়ে উঠতে পারব না ‘ও আমাদের বাংলাদেশ, আমাদেরই বাংলা রে—’। সে যাক তার জন্যে এখানে এখন আর কারো মাথাব্যথা নেই।… একসময় মনেপ্রাণে শেখানো হয়েছে—’আমাদের প্রাণের দেশ রাশিয়া, আমাদের প্রাণের দেশ চীন। চীনের চেয়ারম্যান আমার চেয়ারম্যান’। তারপর কতই তো দেখলি? বন্দেমাতরম কোথায় তলিয়ে গেল, এল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। আর শ্লোগান এলো ‘এ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ লড়াই রুটির লড়াই’! আর এখন? এখন শুধু দু’ চোখ মেলে দেখে যা সারাদেশ জুড়ে শুধু গদির লড়াই। আর কোনো শুভ চিন্তাটিন্তা নেই। ‘দেশজননী’ শব্দটব্দ নেই।… এখন তো আবার দ্যাখ আমাদের বাঙালির প্রাণের কলকাতার বারো আনা চলে যাচ্ছে অবাঙালিদের হাতে।…এই পথ হারানো চোরাবালিতে পা ফেলছে, ওই তোর ছেলেটার মতো কত কত ছেলে।…তাদের সামনে যে আদর্শ দেখানো হয়েছিল সে সব এখন ফক্কিকারি। অথচ অনেস্ট ছেলেগুলো সেই আদর্শর জন্যেই সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে চলেছে।…দেশটাকে দেখলে আর আগের কথা ভাবলে এত দুঃখ হয় রে!
নীহারিকা আবার বিমুগ্ধ গলায় বলে, তুমি এত ভাবো নীলুদা? অথচ দেখে মনে হয় তুমি যেন হালকা হাওয়ায় গা ভাসিয়ে জীবন কাটিয়ে দিয়ে চলেছ।
নীলুদা একটু হেসে বলেন, সেটাও মিথ্যে নয়, হয়তো তাই কাটিয়ে এসেছি। কারণ ওটাই আমার জীবনদানি। ‘সিরিয়াসনেস’ আমার ধাতে সয় না। তবু মন বলে তো একটা জিনিস আছে? এই যে—যখন বাবার কথা মনে পড়ে? মনে হয় না কী একখানা মানুষ ছিলেন! কী রকম এক সেকেন্ডে একটা বড় ব্যাপারের ডিসিশান নিতে পারতেন।…পাড়াপড়শি আত্মীয়-স্বজন সবাই আসতো বাবার কাছে পরামর্শ নিতে। খুব একটা বড়লোকও ছিলেন না, আসলে হচ্ছে পার্শোন্যালিটি।…বাবার মধ্যেও ‘দেশভক্তি’ দেখেছি। সে একটা অন্য জিনিস। যেন দেশ জিনিসটি সত্যিই ঠাকুর দেবতার মতো। তখন হয়তো সব ভালো বুঝতাম না, এখন মাঝে মাঝে যখন মনে পড়ে, বুঝি, চারিত্রিক বল জিনিসটা কী জিনিস। তোর নীলুদা অবশ্যই চিরকাল হালকা হাওয়ায় ভাসতেই ভালোবাসে। কিন্তু ওই গভীরতাকে তো শ্রদ্ধা না করে পারা যায় না। তোর বাপ্পাকেও তাই আমি মনে মনে শ্রদ্ধা করি নীরু। ওর পথটা হয়তো ওর পক্ষে আর শুভকর নয়, কারণ যারা পথ দেখাতে নেমেছিল তারাই পথভ্রষ্ট হয়ে বসেছে। অথচ ওর সততা ওকে শিখিয়েছে শুধু ‘ফলো’ করতে। হঠাৎ যেদিন নিজের মনের মধ্যে প্রশ্ন উঠবে, সেদিন বড় একটা ধাক্কা খাবে এই ভয়।
নীহারিকা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, তুমি এত সব ভাবো। আমাকে কত বোঝালে। বাড়িতে এসব কোনো কথাই নেই। এই মানুষটি জানেন শুধু অফিস আর নিজের এক ধরনের জেদ আর ছোটছেলে আর মেয়ে? তারা তো আমায় মনিষ্যি বলে গণ্যই করে না। যা কিছু জিগ্যেস করতে যাব, হয় ঠাট্টা করবে, নয়তো বলবে ও তুমি বুঝবে না।
নীলুদা হঠাৎ বলে ওঠেন, তোর শ্বশুরমশাই কিন্তু একটা মানুষের মতো মানুষ। অনেকটা আমার বাবার ধরনের।
নীহারিকা অবশ্য নীলুদার এ কথায় তেমন উৎসাহ দেখায় না। সেই মানুষের মতো মানুষটি তো এখনো তাঁর ‘পাবনার বাড়িতেই পড়ে আছেন। নীহারিকাদের থেকে যেন বহু দূরে। তবে নীহারিকাও সেই দূরত্ব ভেদ করতে সচেষ্ট ছিল না কোনোদিনই। মনে হতো এঁরা ওঁদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে থাকতেই ভালোবাসেন যখন থাকুন তাই। অতএব আর ওঁদের কথায় কাজ নেই। এখন নীহারিকা ইচ্ছে করে প্রসঙ্গ পালটায়। বলে ওঠে, আচ্ছা নীলুদা, এত লোকের সঙ্গে তোমার জানাশোনা, ভাগ্নীটার একটা পাত্তর-টাত্তর খুঁজবে তো?
ভাগ্নী, মানে আমাদের টুসকি?
নীলাম্বর হঠাৎ স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হেসে ওঠেন। বলেন, আজকালকার মেয়েদের জন্যেও কী গার্জেনদের পাত্র খুঁজে বেড়াতে হয় না কীরে? গার্জেনদের সে খাটুনিটা তো তারা বাঁচায়। পাত্তরটাকে একদিন ধরে এনে বলে, এই ‘গড় করো’ এঁরা হচ্ছেন আমার মা-বাবা!’ তারপর নিজেও হেঁট হয়ে যুগলে গড় করে বলে, “মা, বাবাকে কিন্তু একদিন এদের বাড়ি যেতে হবে।’
ইস নীলুদা। তুমি ওদের ভাষাটাও রপ্ত করে ফেলেছ দেখছি।
ওই ওইরকমই তো দেখিশুনি। তবে এখন তো দেখি ‘লাভ ম্যারেজ’ও ধারে কাটে না, ভারেই কাটে। বাপের সেই পকেট ফর্সা করে দান সামগ্রী খাট, আলমারি, ফ্রীজ, টি. ভি. সবই ধরে দিতে হয় বিবাহ সভায়, ‘নিরিমিষ্যি’ যৌতুক বলে। তো সে জন্যে তো বাপ প্রস্তুতই থাকে। কিন্তু ওই ফাষ্ট চ্যাপ্টারটা! পাত্র যোগাড়! ওটা এখনো যোগাড় করে উঠতে পারেনি তোর মেয়ে?
নীহারিকা বলে ওঠে, তুমিও যেমন নীলুদা। এ বাড়ির ধারাটি কী তেমনি দেখছ?
বাড়ির ধারা? বাড়ির ধারা ধরে আজকাল সবাই চলছে দেখছিস বুঝি? আসলে ওতে মা-বাপের রিস্ক কম। পরে মেয়ে রাতদিন মা-বাপকে খোঁটা দিতে পারে না, আহা কী নিধিই জুটিয়েছিল আমার জন্যে?…এই যেমন তুই এখনো চন্দ্রবিন্দু হয়ে যাওয়া মা-বাপকে সর্বদা মনে মনে দুষিস।’
নীহারিকা হেসে ফেলে। বলে, হ্যাঁ। দুষি। বলেছি তোমায়!
আহা ও কী আর বলে বোঝাতে হয় রে? যার চোখ থাকে সে ঠিকই বুঝে নেয়। বলে নীলুদা হাহা করে হেসে ওঠেন। আর ঠিক এইসময় বাইরের দরজায় কড়া নাড়া ওঠে।…
নীহারিকা বলে, ওই বোধহয় তারক ফিরল হাসপাতাল থেকে।
সময়টি বড় নিশ্চিন্ততার ছিল।
আদিত্য অফিসে, শিলাদিত্যও সম্প্রতি কিসে যেন অ্যাপ্রেন্টিসে ঢুকেছে, সহনে পাক না পাক অফিসটাইমে নেয়ে খেয়ে বেরোচ্ছে। টুসকি কলেজে। তারক রান্নাবান্না,সারছিল। অতঃপর তারক বড়াদাবাবুর ভাত নিয়ে বেরিয়েছে।
তৎপরেই নীলুদার আবির্ভাব।
নীলুদাকে দেখলেই যেন মনটা ভরে যায় নীহারিকার। যাবে না? কে তার সঙ্গে এমন করে এতক্ষণ ধরে ছেদ্দা ভালোবাসার সঙ্গে গল্প করে? কে বলে, এই নীরু, যদি মনে মনে
শাপমুন্যি না দিস তো বলি আর এক কাপ চা হয় না?
সবটাই লীলা।
আমিই যাই। যদি অন্য কেউ হয়।
জানে নীরু এতে কৃতকৃতার্থই হবে। তবু বলে।
ওই বোধহয় তারক ফিরল, বলে দরজা খুলতে যেতে যেতে বলে নীহারিকা, দেখি, বাবু কতটুকু কী খেলেন। এমন দুষ্টু ছেলে—দু’খানা মাছ বেশি দিলে বলে এত কেন? ফিরিয়ে নিয়ে যা। নয়তো বাসে যেতে যেতে নিজে খেয়ে নিগে!’…পাঁচজনের সামনে না কি ভালো খেতে লজ্জা করে।
কথাটা বলে নেয়। তারকের সামনে তো আবার এক বিষয়ে ভেবেচিন্তে নিক্তির ওজনে কথা বলতে হবে। কোনটা যে কী ভাবে নেবে। অমনি ওর প্রাণের বড়দাবাবুকে লাগিয়ে দেবে।
আর একবার কড়া নড়ে ওঠে অসহিষ্ণুভাবে।
নীহারিকা চেঁচিয়ে বলে, যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। ওঃ যেন ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছে।
নীলুদা হঠাৎ বলেন, এই. তুই থাক। আমিই যাই। যদি অন্য কেউ হয়।
নাঃ বাবা! এ আমার তারকচন্দ্রের মার্কামারা কড়া নাড়া, বলেই নীহারিকা ছুটে চলে যায়। এবং দরজা থেকেই তার গলার স্বর শোনা যায়, খেয়েছে ভালো করে? নাকি রাগ দেখিয়েছে?
উত্তর শোনা যায় না।
নীহারিকা আবার বলতে বলতে চলে আসে, কীরে বাবা, জবাবটা দিবি তো? তুইও যেন তালেবর লাটসাহেব হয়ে গেছিস।
এখন তারকের গলা শোনা গেল, এবং দেখাও গেল তাকে। সদর দরজার দিকের প্যাসেজটা পার হয়ে এসে হাতের টিফিন ক্যারিয়ারটাকে ঠক করে মাটিতে বসিয়ে রেখে কেমন একটা কঠোর কঠিন অমোঘ গলায় বলে উঠল, বড়দাবাবু হাসপাতালে নাই।
কী? কী বললি? কী বললি?
তারক আরো কঠিন গলায় বলল, যা দেখে এলুম তাই বলছি। কাল রাত থেকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না তাঁরে।
ঠিক এই সময় তিনতলার সিঁড়ির মাথা থেকে একটি ভাঙা ভাঙা গলা বলে উঠল, তারক, বড়খোকার সনে এলি? আজ অ্যাতো দেরি ক্যান?
ডাক্তার এসেই দেখে মুখ গম্ভীর করে বললেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হস্পিটালে রিমুভ করুন। এখনি একটা ই. সি. জি. দরকার। তাছাড়া, হ্যাঁ যত তাড়াতাড়ি পারেন।
কাকে বললেন?
কার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন?
সত্যব্রত গাঙ্গুলীর দিকে তাকিয়ে?
নাঃ তা নয়। সত্যব্রত গাঙ্গুলী অবশ্য সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, পাথরের পুতুলের মতো। দাঁড়িয়েছিল শিলাদিত্যও। সেও প্রায় একই অবস্থায়। কারণ এইমাত্রই বাড়ি ফিরেছে সে!
তবু ডাক্তার তাকালেন তার নীলুমামার দিকেই। কারণ এই লোকটাই তাঁকে নিয়ে এসেছে।
খাটের ধার থেকে একটা নারীকণ্ঠ, প্রায় চিৎকার—আবার হাসপাতাল!
নীলু মৃদু গম্ভীর তিরস্কারের গলায় বললেন, আঃ! নীহার!
নীহার।
তার মানে এই দণ্ডে হাসপাতালে পাঠানোর দরকারটা নীহারকে নয়।
নীলু শিলাদিত্যর দিকে একবার তাকিয়ে ইশারায় তাকে নিজের সঙ্গে আসতে বলে, ডাক্তারের পিছু পিছু এগিয়ে এসে, কিছু প্রয়োজনীয় কতাবার্তা বলে নেন। এখন এই রাত ন’টার সময় হঠাৎ গিয়ে পড়ে কোন হাসপাতালের হৃদয় দরজা সহজে খোলানো যাবে?
ডাক্তার মানে বাড়িরই চেনা ডাক্তার, কী ভেবে বললেন, আচ্ছা আমি সঙ্গে যাচ্ছি চলুন।
তার মানে মানুষের মধ্যে থেকে ‘মনুষ্যত্ব’ জিনিসটা একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি।
তা যায়নি তো নিশ্চয়ই।
না হলে আদিত্যর অফিসের লোকেরাই বা নিজেদের খরচে ট্যাক্সি করে সযত্নে তাকে বাড়িতে এনে পৌঁছে দিল কেন?
এবং বারবার নীহার ও তার নীলুদাকে অনুযোগ করতে লাগল কেন তারা, ওঁর যখন হার্টের অবস্থা এরকম, তখন হঠাৎ টেলিফোনে ওরকম একটা খবর দেওয়া ঠিক হয়নি।
কিন্তু আদিত্য গাঙ্গুলী নামের লোকটার হার্টের অবস্থা ‘এরকম’ তা আবার কে জানতো? তার সবথেকে নিকটতম জনই তো সর্বদা তাকে ‘হার্টলেস’ বলেই অভিহিত করে আসছে জীবনভোর।
