সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক
নীলাম্বর ব্যানার্জি অর্থাৎ নীহারিকার পরম আদরের আর ভক্তি-ভালোবাসা এবং সমীহর ‘নীলুদা’ তাঁর মেদবহুল প্রৌঢ় শরীরটি নিয়েও গাড়ি থেকে নেমেই দুমদাম পা ফেলতে ফেলতে বাড়ির মধ্যে ঢুকে এসে হাঁক পাড়লেন, কই? কই রে নীহার! তোর সেই বীরপুরুষ পুত্রটি কই? অ্যাঁ? একবার দেখে চক্ষু সার্থক করতে এলাম।
পেটেণ্ট বাজখাঁই গলা, যেটা শুধু দোতলায় কেন, দোতলার ছাদ ভেদ করে তিনতলা পর্যন্ত উঠে যায়। এবং যেটা শুনলেই বোঝা যায়, স্বরের ওই বাজখাঁই ভাবটি কিছুটা তৈরী করাই।…নিজেকে ভালো করে জাহির করতে এও একটা চেষ্টা মানুষের। ‘আমার আবির্ভাব মাত্রই পরিমণ্ডল আমার সম্পর্কে সচকিত হয়ে উঠুক।’…
তা হলোই সচকিত।…নীহারিকা কোনদিক থেকে যেন ত্রস্তেব্যস্তে ছুটে এলো ‘নীলুদার গলা না?’ বলে।
তিনতলায় সত্যব্রত আর নয়নতারা পরস্পর তাকাতাকি করলেন। এই মানুষটাকে তাঁরা প্রীতির চক্ষেই দেখেন। কারণ, মানুষটা বড়লোক হয়েও উন্নাসিক নয়, বরং বেশ মাই-ডিয়ারি ভাব। এবং এনাদের সম্পর্কে আত্মীয়স্বজন ও গুরুজন’ এই গোছের বোধেরও প্রকাশ আছে। হয়তো এমনও হয় এনাদের কাছে এসে বসে পড়ে ঘণ্টা কাটিয়ে দেন। যেটা নীহারিকার দু-চক্ষের বিষ। নীহারিকার একান্ত ‘নিজজনেরা’ও যে কী জন্যে এ বাড়িতে এসেই সত্যব্রত আর নয়নতারার খোঁজ করে তা বুঝে উঠতে পারে না নীহারিকা। এতো কিসের সৌজন্য রে বাবা!…
নীহারিকা তাই তাড়াতাড়ি ঘাঁটি আগলাতে আসে। বলা তো যায় না। নয়নতারা যদি দোতলায় নাতির কাছে এসে বসে থাকেন মায়া দেখাতে, হয়তো এক্ষুণি আগবাড়িয়ে এগিয়ে এসে আপ্যায়িত করতে বসবেন, “কী বাবা? কতোদিন পরে? অনেকদিন আসোনি বাবা!’
নীহারিকার ভাই, অথচ উনি এমন সৌজন্য দেখাতে আসবেন, যেন ওনারি সাতকালের কেউ। তা নীহারিকার দিকে যে কেউই আসুক, এটাই নাকি, ওনাদের পাবনার সহবৎ সৌজন্য….নীহারিকার দু’চক্ষের বিষ।
নীহারিকা ভিজে হাতটা আঁচলে মুছতে মুছতে কৃতার্থমন্যের মতো ছুটে আসছিল ‘নীলুদার গলা না?’ বলে। সামনেই এসে দাঁড়ালো নীলুদার ড্রাইভার ননী। হাতে একটা সুদৃশ্য বেতের বাস্কেট। এটা নীহারিকার পরিচিত, নীলুদার গাড়িতে মজুত থাকে। নীলুদা আসার আগে কোনো কোনোখানে গাড়ি থামিয়ে এটাকে ভর্তি করে নেয় এবং এখানে সেগুলি উজাড় করে দেয়!…এবং সঙ্গে সঙ্গে বলেন ‘এই নীহার, আমার ঝুড়িটায় নজর দিবি না খবরদার। ভাবিসনি ওটা সমেতই তোকে ‘প্রেজেন্টো’ করা হচ্ছে।’
তা সেসব প্রেজেন্টের বস্তুগুলি সবসময়ই উচ্চমানের। কখনো উৎকৃষ্ট ন্যাংড়া হিমসাগর আম, কখনো অতি পুষ্ট মর্তমানের ছড়া এবং লিচুর বোঝা। কখনো বা নিউমার্কেটি আপেলের সম্ভার। ফল না হলে নিদেনপক্ষে সন্দেশের বাক্স, ‘কেক’-এর বাক্স!
আজ দেখা যাচ্ছে বাস্কেট উপছোন আপেল। আর ভারী একটা আঙুরের থোলো।
এটা বোধহয় রোগী দেখতে আসার কানুনমাফিক।
‘বীরপুরুষ’ অর্থে তো মাথা ফাটিয়ে আসা বাপ্পা। এই নামকরণটি কিন্তু বাপ্পার এখনকার মাথা ফাটানো বাবদই নয়, ছেলেবেলা থেকেই ‘নীলুমামা’ বাপ্পাকে বীরপুরুষ নামে ডাকেন। সেই ওর ‘বীরপুরুষ’ কবিতা আবৃত্তির সূত্রে।
বছর পাঁচ-ছয়ের বাপ্পা যখন তার দেবশিশুসদৃশ মূর্তিটি নিয়ে ঝপ করে মাথায় একটা গামছা কী তোয়ালে দিয়ে পাগড়ি বানিয়ে নিয়ে মহোৎসাহে আবৃত্তি করতে করতে বলতো— ‘কতো লোকের মাথা পড়লো কাটা!’…তখন তার বীরত্বব্যঞ্জক ভঙ্গী দেখে সবাই হেসে গড়াতো। আর নীলুমামা?…হঠাৎ নিজের গলাটা দু-হাতে চেপে ধরে আর্তনাদ করতেন, “ওহো হো, মাথাটা কোথায় ছিটকে গেল গো? একটা মাত্তর মাথা যে আমার গো! সেটাও গেল!’ তখন উপস্থিত আসরে হাসির বান ডাকতো।
তদবধি ওই বীরপুরুষ।
সেই বাপ্পার চেহারা কী হয়ে গেছে! দেখে দেখে চোখে জল আসে নীহারিকার
নীলু ব্যানার্জির বাজখাঁই স্বর বাপ্পার কানেও পৌঁছলো বৈকি। আর পৌঁছনো মাত্রই মুখটা একটু বিকৃত করলো।…যদিও বহুকালের মধ্যেই দেখাসাক্ষাৎ নেই, তবু লোকটার ওপর কেমন যেন একটা বিতৃষ্ণার ভাব পোষণ করে বাপ্পা।…এবং সে বিতৃষ্ণা আরো বাড়ে, যখন মনে পড়ে যায়, ছেলেবেলায় এই লোকটাকে দেখলেই আহ্লাদে আটখানা হতো বাপ্পা। হ্যাঁ, তিন ভাইবোনই হতো। …
হয়তো নীহারিকার নীলুদা আসামাত্রই বাড়িতে একটা উৎসবের মতো সাড়া পড়ে যেতো বলে, হয়তো বা মা অতো খুশী হতো বলে, এবং অবশ্যই তার সঙ্গে যুক্ত হতো, নীলুমামার আনা উপাদেয় খাদ্যসম্ভার।
বড় হয়ে হয়তো এটাই রাগের কারণ হয়ে গেছে। নিজের ওপর নিজের রাগ। ইস! কী হ্যাংলাই ছিলাম! মা যখন আহ্লাদে ভাসা গলায় বলে উঠতো, ‘এই বাপ্পা, শিলু, টুসকি, দ্যাখ তোদের নীলুমামা কী কাণ্ড করেছে। কতো জিনিস এনেছে—’ তখন মনে হতো, উঃ,
কতোক্ষণে মা ওগুলো বার করে আমাদের দেবে।
ছেলেবেলার সেই স্মৃতি বড় হবার পর যেন মনকে কষাঘাত করেছে!…হয়তো সকলের এমন হয় না। হয়তো বাপ্পার ভাইবোনেরা এখনো নীলুমামাকে আসতে দেখলে উৎফুল্ল হয়। বাপ্পার মনের গড়ন আলাদা।
বাপ্পার বিশেষ করে খারাপ লাগে মার ওই কৃতার্থমন্য ভাব, আর মুখেচোখে ঝলসে ওঠা আলাদা একটা আলো।
সে আলো আজও ফুটলো।
নীহারিকা ননীর হাত থেকে বাস্কেটটা নিয়ে ফলগুলো অন্য একটা ডালায় ঢেলে, ননীকে বললো, নাও বাবা ননীগোপাল, তোমার বাবুর আসল দামী জিনিসটি ফেরত নাও।
ফিরিয়ে দিল বাস্কেটটা।
ননীর সঙ্গে কথা বলার মধ্যেও যেন আদেখলে ভাব নীহারিকার। এটা আজকাল টুসকিও ধরতে পারে।
নীহারিকা ছেলের কাছে ছুটে এলো। এই বাপ্পা, দ্যাখ কে এসেছে! তোর অ্যাকসিডেন্ট শুনে—উঃ, এতো বড় একঝুড়ি কী ভালো ভালো ফল এনেছে! আবার কেকও!…কী রে বাবা, এমন অসময়ে ঘুমিয়ে পড়লি না কী? অ বাপ্পা।
নীলুদা সামনের একটা চেয়ারে জাঁকিয়ে বসেন। মৃদু হেসে তেমনি বাজখাঁই গলাতেই বলেন, ওরে নীহার, এ যে দেখছি জেগে ঘুম। এ তোর ওই মিহি ডাকে ভাঙবে না।…বলি ওহে বীরপুরুষ, আমার যে বেশ মনে হচ্ছে জেগে ঘুম। বেলা সাড়ে দশটায় ঘুম কী রে? চোখ খোল, চোখ খোল।….ওরে বাপ! দ্যাখ শকুনিমামাও নয়, কংসমামাও নয়, কালনেমি মামাও নয়, নেহাৎই নিরীহ গোবেচারী নীলুমামা।
এরপর আর বাপ্পার ঘুমের ভান চলে না। সে চোখ খুলে গম্ভীরভাবে বলে, গলার আওয়াজ শুনলে নিশ্চয় গোবেচারী মনে হয় না।
নীলুমামা হা হা করে হেসে ওঠেন, আরে বাবা; জানিস না শূন্য কলসীর শব্দ বেশী! গুণ বলতে তো কিছু নেই যে লোকে একটু মান্য সমীহ করবে? তাই গলার জোরেই তো মাথাটা ফাটালি কার সঙ্গে যুদ্ধ করে?
নীহারিকা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ওমা! যুদ্ধ হতে যাবে কেন? পড়ে গিয়ে তো—
নীলুমামা মুচকি হাসি হেসে বলেন, সেটা বুঝি তোর ওই বীরপুরুষ বেটার চ্যালারা ওই বলে বুঝিয়েছে। আরে বাবা—যে পথটি বেছে নিয়েছেন তোর পুত্তুরটি, সে পথে আছেই এসব ফাইট। হচ্ছিলটা কী? কাকে টাইট্ দিতে গিয়ে ফাইট? জমির মালিক? না নতুন দখলীদার?
বাপ্পার ভুরুটা কুঁচকে ওঠে। যদিও ভুরুর ওপর পর্যন্তই মাথায় বাঁধা ফেট্টিটা নেমে এসেছে। এমনিতেই কুঁচকে আছে।
বললো, আপনি তো দেখছি সব খবরই রাখেন, তবে আর জিগ্যেস করছেন কেন? অতি সপ্রতিভ নীলুমামা হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে যান। মুখে একটা কালো ছায়া এসে পড়ে। বলেন, সবটাই কী আর জানা যায় বাবা? তোমাদের সব কতোরকম মন্ত্রগুপ্তি। …তবে রাস্তাটা ভালো ধরিসনি বাবা! এ রাস্তায় তোদের মতো অনেস্ট ছেলেদের মুশকিল!
বাপ্পা ভেবেছিল লোকটাকে অবজ্ঞা করে ঘর থেকে ভাগাবে। বাপ্পার চোখের আড়ালে মা যতো ইচ্ছে গদগদ হয় হোকগে, বাপ্পার ব্যাপারে কাউকে নাক গলাতে আসতে দেবে না। কিন্তু এখন হঠাৎ একটু সচকিত হয়ে বলে ওঠে, এ কথার মানে?
নীলুমামা তেমনি গম্ভীরভাবেই বলেন, মানে হচ্ছে তুই—আর তোদের মতো ছেলেরা তো দুর্নীতির সঙ্গে, অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করে চলতে পারবি না। অথচ তোদের পার্টির নিয়মটি হচ্ছে ‘কর্তাভজা’।
আপনি এতো সব জানলেন কোন সূত্রে?
নীলুমামা বলেন, ওরে বাবা, সূত্রটুত্র কিছু না। এ দুনিয়ায় চোখ-কান খোলা রেখে চলতে জানলে, অনেক কিছুই জানা যায়। তোর জন্যে আমার দুঃখ হয় বীরপুরুষ। যতো দিন যাবে, দেখবি তোদের কর্তারা তোদের মূল আদর্শ থেকে কতো দূরে সরে এসেছে। দিনে দিনে আরো কত সরে চলেছে। অথচ তোরা সেই মূলটাকে মনেপ্রাণে আঁকড়ে ধরে বসে আছিস!
বাপ্পা হঠাৎ বালিশে ঠেস দিয়ে উঠে বসে বলে, ‘মার্কসিজম’ সম্পর্কে আপনার কিছু পড়াশুনো আছে?
পড়াশুনো?
হঠাৎ নীলুমামা নিজস্ব স্টাইলে দরাজ হাসি হেসে ওঠেন, পড়াশুনো? তোর নীলুমামা? ক্ষেপেছিস? এ ব্যাটাও দেশের বেশীর ভাগ লোকের মতোই না পড়ে পণ্ডিত, সবজান্তা। সব নিয়েই কথা কইতে যেতে পারি। আর সব ব্যাপারেই একটা ফতোয়া জারি করতে পারি।
ওঃ। ভালো। বলে বাপ্পা আবার শুয়ে পড়ে।
নীলুদাকে বাপ্পার কাছে রেখে নীহারিকাকে চলে যেতে হয়েছিল আতিথ্যের আয়োজন করতে, মনের মধ্যে রীতিমত অস্বস্তি নিয়ে। শে ছেলে কারুর মানমর্যাদা রেখে তো কথা বলতে জানে না। হয়তো নীলুদার মুখের ওপর তুচ্ছতাচ্ছিল্যভাবে কিছু বলে বসবে।…এই তো ঠাকুর্দাকেও তো কাল কীভাবে বললো, বরাবরই দেখি—যা বোঝেন না, তা নিয়ে কথা বলতে আসেন!
তবু সত্যব্রত একটু হেসে বলেছিলেন, ‘একটা কথা তো বুঝি রে ভাই, ‘দেশ’ নিয়ে যদি কিছু চিন্তা করতে ইচ্ছে হয়, তার প্রথম শর্ত হচ্ছে নিজের দেশকে জানা, আর তাকে ভালোবাসা।…দেশকে ভালোবাসতে না পারলে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে না পারলে, দেশের ভালোটা তুমি করবে কোন শক্তিতে?’
তা অবিনয়ী ছেলেটা আর কথা না বলে, পাশ ফিরে শুয়েছিল।
কিন্তু তাতে কিছু এসে যায়নি নীহারিকার। ‘ওনার মান্য থাকলো আর গেল, সে নিয়ে মাথাব্যথা কিসের? বিরোধী পক্ষটি তো তাঁর নিজেরও নাতি। সেখানে নীহারিকার কোনো দায় নেই।
কিন্তু এক্ষেত্রে?
নীলুদার মুখের সামনে যদি পাশ ফিরে শোয় নির্বুদ্ধি ছেলেটা! ভেবেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছিলো নীহারিকার। নিজে সামনে থাকলে তবু পরিস্থিতিকে কিছুটা সামাল দিতে চেষ্টা করা যায়।…কিন্তু এক্ষেত্রেও যে নিরুপায়।…নীলুদার আপ্যায়নের ভারটি তো আর শুধু টুসকরি ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না!
যাক! এখন ওই গলাখোলা হা হা হাসিটা শুনে বেচারীর ধড়ে প্রাণ এলো!
কিন্তু ইত্যবসরে যে নীলুদা আবার সাপের ল্যাজে পা দিয়ে বসে আছেন তা কী জানে ছাই নীহারিকা?
আসলে ওই ছেলেটা সম্পর্কে নীলু ব্যানার্জির ঠিকমতো সমীহ বোধ নেই। তিনি সেই ছোট ছেলেটাই ভাবছেন। তাই আবার বলে বসেছেন, যাই বলিস বাবু, সেকালের নেতারা তাদের চেলাচামুণ্ডাদের মধ্যে দেশাত্মবোধের ভাব এনে দিতে পেরেছিলেন। সেকালে যাঁরা রাজনীতিতে এসেছেন ‘দেশ’ কে ভালোবেসে। কিন্তু একালে?
বাপ্পা আবার উঠে বসেছে। নীরস বিরস গলায় বলেছে, ‘দেশ’ বলতে আপনি কী বোঝেন?
যাঃ বাবাঃ। ‘দেশ’ বলতে কী বুঝি কী রে? দেশ! তার মানে জন্মভূমি! তার মানে আমাদের এই ভারতবর্ষ! যার ইয়ে আকাশে বাতালে প্রবাহিত হয়ে চলেছে, ভারতীয় মুনিঋষিদের ইয়ে অধ্যাত্মসাধনার চেতনা। যার মধ্যে হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য। যার মধ্যে—
এই সময় বাপ্পাই হঠাৎ বেশ সোচ্চারে হেসে উঠে বলেছে, নীলুমামা। আজকাল শুনেছি যাত্রাটাত্রা করায় কোনো নিন্দে নেই। আপনার প্রতিভা আছে। কোনো যাত্রাদলে নাম লেখালে আপনি নাম করতে পারবেন।
নীহারিকা আবার ছেলের উচ্চহাসি শুনতে পেল যেটা নাকি বহুদিনই দুর্লভ হয়ে গেছে। নীহারিকা ভাবলো, আজ কার মুখ দেশে উঠেছিল!
নীহারিকা টেবিলে খাবার সাজিয়ে বলল, টুসকি, তোদের নীলুমামাকে ডেকে আন। বলগে মার চা হয়ে গেছে!…আর শোন—এই আঙুর ক’টা দাদাকে দিগে যা, বলগে নীলুমামা এনেছে।
টুসকি শঙ্কিতভাবে বলে, দাদাকে আঙুর? দাদা এসব শৌখিন জিনিস খায়?
নীহারিকা বিগলিত গলায় বলে, খাবে—খাবে। দেখিস, আজ কিছু বলবে না। আজ খুব মন ভালো আছে। যা চট করে। দিয়েই মামাকে ডেকে আন।
ডেকে আনতে হলো না। ‘মামা’ নিজেই নেমে এসেছেন। একবার টেবিলের দিকে আর একবার নীহারিকার আহ্লাদে ভাসা মুখের দিকে তাকিয়ে ঈষৎ থমকান। তারপরই নীরস বিরস গলায় বলেন, তুই এতো কষ্ট করে এতো সব—আমার কিন্তু একটু জরুরি কাজ আছে রে। চলি!
এ আবার কী। দু-দুটো উচ্চহাসির পর এটা কী? নীহারিকা যেন হঠাৎ সাপের ছোবল খায়।
নীলুদার মুখের দিকে তাকায়। সে মুখ থমথমে অন্ধকার।…ছেলেটার সেই হাসি কী তবে ব্যঙ্গহাসি?
নির্ঘাৎ তাই।
নীহারিকার সর্বশরীর হিম হয়ে আসে। তবু কষ্টে মুখে হাসি আনবার চেষ্টা করে বলে, ‘চলি’ মানে? বাঃ। আমি বলে তোমার জন্যে—
নীলুদা তবু দরজামুখো হয়ে বলেন, কী করবো, উপায় নেই রে। একদম ভুলে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ে গেল। মিথ্যে খাটুনি হলো তোর।
নীহারিকার চোখের সামনেটা গভীর অন্ধকারে ডুবে যায়। নীহারিকার পায়ের তলার মাটি ধসে যায়। ওর মনে হয় ওর জীবন থেকে ‘নীলুদা’ নামটি বোধহয় মুছে গেল এবার! আর পারলো না। হঠাৎ রুদ্ধ কণ্ঠে ‘নীলুদা’ বলে ডেকে ওঠে, স্রেফ যাকে বলে ‘ভ্যাক্’ করে, সেইভাবে কেঁদে ফেললো।
নীলাম্বর ব্যানার্জি নামের রীতিমতো ঘুঘু ঘোড়েল লোকটি একবার তাঁর চিরদিনের একটু বিশেষ স্নেহের পাত্রীটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে ডিসিশান নিয়ে নিলেন। আরে ধ্যেৎ! চিরকেলে কথা, কুকুরের কামড় হাঁটুর নীচে। ব্যস। আচমকা আবার সেই দরাজ হাসিটি হেসে বলে উঠলেন, কী? খুব একখানা রাম ঘাবড়ানো ঘাবড়ে দিলাম তো? ছ্যা ছ্যা। এখনো তুই সেই ছোটবেলার মতো ছিঁচকাঁদুনী আছিস? টুসকি, তোর এই মা-টাকে এতোকালেও একটু মানুষ করে তুলতে পারলি না? কোনো কর্মের নয়।…এইসব সযত্নরচিত সুখাদ্য ফেলে তোদের নীলুমামা সত্যি নড়বে ভাবলি?…হুঁঃ। অতো বুদ্ধু পাসনি।…তোর দাদা বললো, ‘মামা, আপনি খুব ভালো অ্যাকটিং করতে পারেন দেখছি। যাত্রাদলে নাম লেখালে ‘নাম’ করতে পারবেন।’…তো ভাবলাম, একটু পরীক্ষা দিয়ে দেখি। তো দেখছি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট।…
অতঃপর নীলাম্বর ব্যানার্জি বেশ খানিকক্ষণ ধরে তারিয়ে তারিয়ে নীহারিকার চটজলদি অবদান ‘মোগলাই পরোটা’, বেসমের গোলায় ডোবানো পার্শে মাছ ভাজা এবং ‘আলু, পিঁয়াজ, চিঁড়ে’ ভাজা খেলেন?
এবং তার ওপর হঠাৎ সত্যব্রত নেমে আসায়, তাঁর সঙ্গে বহুক্ষণ বাক্যালাপ চালিয়ে তবে প্রস্থান করেন।
হ্যাঁ, ভেবে দেখলেন এটাই হচ্ছে উচিত চাল। ওই অর্বাচীনটার কথায় ‘অপমানবোধ করে একবার চলে গেলে, আর আসা শক্ত। তার মানে একটি মলয় বাতাসের জানলাকে জন্মের শোধ ছিট্কিনি লাগিয়ে ফেলা।
পিসির মেয়ে নীহারিকার সঙ্গে কী কোনোরকম অসঙ্গত সম্পর্ক আছে নীলাম্বরের? যার সঙ্গে নাকি বয়েসের ব্যবধান দশ-বারো বছরের। না, তেমন সম্পর্ক আছে বললে অন্যায় বলা হবে।…এ যেন একটা কৌতুকমিশ্রিত ‘প্রেম প্রেম’ ভাব। নীহারিকার দিক থেকেই যতো আকুলতা ব্যাকুলতা, কৃতার্থমন্যতা। নীলু ব্যানার্জির দিকে অবশ্য ততোটা নয়। খানিকটা মমতা এবং করুণার বশে আরোপিতই।
দোতলা থেকে নামবার সময় ভাবতে ভাবতে আসছিলেন। জরুরি কাজের অছিলা দেখিয়ে চলে তো যাবেনই। আবার যাবার সময় এই কথাটিও বলে যাবেন, ‘তোর যদি কখনো নীলুদাকে দেখতে ইচ্ছে করে নীহার, একটু জানাস, ননীকে দিয়ে গাড়িটা পাঠিয়ে দেবো।’
তার মানেই নীলুর ‘এই শেষ’।
কিন্তু নীলু ব্যানার্জি নিজেকে কী আশ্চর্য কৌশলে মুহূর্তে সামলে নিলেন।
পরিতোষ করে খেয়ে এবং অকারণেই অনেকখানিটা সময় খরচ করে চলে গেলেন নীলু।…প্রাণটা ভরাট হয়ে থাকবার কথা। কিন্তু, মাঝখানে ওই আলপিনটা যে অনবরতই বিধতে থাকে নীহারিকার চেতনার মধ্যে।…ওই কথাটা বললো কেন নীলুদা টুসকিকে? তোর দাদা বললো, ‘যাত্রাদলে নাম লেখালে আপনি ‘নাম’ করতে পারবেন মামা।’
এরকম কতা বলতে গেল কেন বাপ্পা? কী সূত্রে?
মনের মধ্যে বেশীক্ষণ রাখতে পারে না কথাটা নীহারিকা। টুসকিকে বলেই ফেলে। প্রশ্ন করে, ‘কেন’ বল তো?
টুসকি ভেবেচিন্তে বলে, হয়তো নীলুমামা খুব হাত-পা নাড়ছিল, বড় বড় কথা বলছি, তাই। আজ দাদার মুডটা ভালো আছে বোধহয়। ঠাট্টা করে বলেছে।
কিন্তু তাই কী?
প্রথমটায় নীলুদার যে মুখচ্ছবি দেখলো নীহারিকা…সেটাই অভিনয়? পরবর্তীটা আসল?…নাকি উল্টো? বুক উথলে কান্না আসে নীহারিকার। জগতে এই একটা মানুষ নীহারিকাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে।…কোনো প্রতিদান চায় না, শুধু দিয়েই খুশী। সেই সম্পর্কটুকুর ওপর কি শনির দৃষ্টি পড়তে চললো?
ছেলে কি নীহারিকাকে ‘সন্দেহ’ করে? ভেবেই হঠাৎ খুব রাগ আসে নীহারিকার। কেন? কী জন্যে? কী অসঙ্গত ব্যবহার করেছে যে করে? নীলুদা তার থেকে দশ-বারো বছরের বড় দাদা না? নাকি আট-দশ? ঠিক মনে নেই। তবে নীহারিকা যখন ফ্রক পরে বেড়াতো নীলুদা নীহারিকার মাকে বলতো না, ‘বুঝলে পিসি, তোমার এই মেয়েটার ফুলো ফুলো গাল দুটো দেখলেই কষে টিপে দিতে ইচ্ছে করে।’ বলতো এবং দিতোও।
নীহারিকা বলতো, আঃ নীলুদা, ভালো হবে না বলছি।
নীলু বলতো, মন্দই হোক না। দেখি সেটা কেমন
সেই নীলুদা কত বড় হয়ে গেছে। বিয়ে থাওয়া ঘরসংসার। কতো বড়লোকও হয়েছে, তবু নীহারিকাকে মনে রেখেছে, এটা কম ভাগ্যের কথা?’…
হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা যাদের সন্দেহ হবার কথা তাদের তো কই তেমন ভাব দেখি না। আদিত্য তো নয়ই, আমার শ্বশুর-শাশুড়িও তো ওকে দেখে বেশ হৃষ্টই হন। এই তো আজই তো শ্বশুরমশাই নিজেই চঠি ফটফটিয়ে তিনতলা থেকে নেমে এসে বললেন, ‘এই যে নীলাম্বর! ভালো আছো তো বাবা? অনেকক্ষণ থেকে গলা পাচ্ছি—মনটা চঞ্চল হচ্ছে।’
নীলুদা বললো, “তিনতলা থেকে আমার গলা পাচ্ছিলেন?”
তো শ্বশুরমশাই তখন হেসে বললেন, ‘এই যে এখন লজ্জা ত্যাগ করে কানে গহনা পরে বেড়াচ্ছি।’
নীলুদা তো খুব উৎসাহ দেখালো। বললো, ‘এতোদিন এ লজ্জা ত্যাগ করলে, অনেক ভালো হতো। বললো, আপনার সঙ্গে গল্প করে খুব ভালো লাগলো।’
আমি তো অস্বস্তিতে মরছিলাম, এই বুঝি বলে বসেন, ‘গহনাটি মেয়ে করে দিয়েছে।’ কী ভাগ্যি সেকথা বললেন না। যাক তবু নীলুদা ওনার সঙ্গে অতোক্ষণ কথা বলায়, আমি স্বস্তি পেলাম। তক্ষুণি যদি চলে যেতো, মনের মধ্যে আরো পিন ফুটতো।…গিন্নীটিও তো নেমে এলেন। ‘বাবা-বাছা’ করে আত্মীয়তা করলেন। যাই হোক, ওনাদের মনে যদি ‘সন্দেহ’ থাকতো, এমন প্রাণ খুলে কথা বলতেন?…আমার ছেলেটিই অন্যরকম। ‘গুরুজন’কে অপমান অপদস্থ করতেই যেন ওর আহ্লাদ।
সত্যব্রত গাঙ্গুলীও তাঁর কুটুম্ব ছেলেটির কাছে এই আক্ষেপই করছিলেন, বুঝলে বাবা নীলাম্বর, সেকালের শিক্ষাদীক্ষা আর একালের শিক্ষাদীক্ষায় আকাশ-পাতাল তফাৎ। সেকালের শিক্ষা ছেলেদেরকে নম্রতার শিক্ষা দিতো, ভব্যতার শিক্ষা দিতো, চরিত্র গঠনের শিক্ষা দিতো, শ্রদ্ধেয়কে শ্রদ্ধা করবার, গুরুজনকে সম্মান করবার, আর সর্বোপরি নীতিবোধের শিক্ষা দিতো, একালে ওসব সেকেলে গাঁইয়ামি বলে বাতিল হয়ে গেছে। একালের শিক্ষা হচ্ছে, কী ছেলে কী মেয়ে নির্বিশেষে কেবলমাত্র কৃতী হবার শিক্ষা। কেবলমাত্র ‘কেরিয়ার’ গড়ে তোলার শিক্ষা! একালের শিক্ষায় ঔদ্ধত্বই হচ্ছে স্মার্টনেস’। আত্মস্বাতন্ত্র্যই হচ্ছে আধুনিকতা।…আর রাজনীতি? সেকালের রাজনীতির শিক্ষা ছিল, মানুষের মধ্যে ‘মনুষ্যত্ববোধটি’ জাগ্রত করবার, মানুষকে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করবার, দেশের মানুষকে আপনজন বলে ভালোবাসতে পারবার। আর একালের রাজনীতির শিক্ষা হচ্ছে, মানুষের মধ্যে থেকে ‘মনুষ্যত্ববোধ’ নামের জিনিসটিকে নিংড়ে বার করে দূর করে ফেলে দেবার। ‘দেশাত্মবোধ’ শব্দটিকে অজানা অপরিচিত করে রাখবার, এবং নীতি-দুর্নীতির বালাই থোড়াই কেয়ার করে, কেবলমাত্র আত্মস্বার্থটি বজায় রাখবার।…একালের রাজনীতি এই অভাগা দেশটাকে হৃদয়ের দিক থেকে একেবারে দেউলে করে ছেড়েছে।… এ যুগের জন, অনায়াসেই অন্য সব উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করে নিজের দেশকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারে, অন্য দেশে গিয়ে নিজেদের দোষ-ত্রুটি-দৈন্য নিয়ে ফলাও করে নিন্দে করতে পারে। …কোনো বিদেশী এসে আমাদের দৈন্য-দুর্দশার ছবি এঁকে একজিবিশন দিলে, তাকে মাথায় করে নাচতে পারে।…আর দেশের সব তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ ছেলেরা সুযোগ পেলেই দেশকে ত্যাগ করে, সুখসুবিধের দেশে গিয়ে, সেখানের নাগরিকত্ব নিয়ে সুখ-স্বচ্ছন্দে ঘরকন্না করতে পারে। আপন দেশকে উন্নত করে তোলার চেষ্টামাত্র না করে, তাকে অবজ্ঞায়, ত্যাগ করতে দ্বিধামাত্র হয় না আমাদের ছেলেদের!…নেতারা এদিকে তাকিয়েও দেখছেন না। তাঁরা কেবল আপন আপন ঘর গোছাচ্ছেন, গদি সামলাচ্ছেন, আর যাদেরকে হাতের মুঠোয় পাচ্ছেন, তাদেরকে টাইট দেবার চেষ্টা করছেন। সরকার সদ্য পাশ করা তরুণ ডাক্তারদের গ্রামে যেতে বাধ্য করবার জন্যে আইন তৈরী করছেন, যেতে না চাইলে শাস্তিবিধান করছেন, অথচ তাকিয়ে দেখছেন না তাদেরকে যেখানে পাঠানো হচ্ছে, সেখানে ডাক্তারী করবার মতো ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুও আছে কিনা!
গল্প করবার সুযোগ পেয়ে, আর একটি ভদ্র শ্রোতা পেয়ে, হঠাৎ যেন আবেগে উদাত্ত হয়ে উঠেছিলেন সত্যব্রত। …
নীলুদা চলে যাবার সময় নীহারিকা ঠোঁট ফুলিয়ে বলেছিল, বাবাঃ! বুড়ো ভদ্দরলোকের সঙ্গে এতো গপপো!…আমার সঙ্গে কটা কথাই বা হলো? …
নীলাম্বর ব্যানার্জি একটু হেসে বলেছিলেন, আমরা হচ্ছি ওল্ড স্কুলের ছাত্র, বুঝলি? গুরুজনকে তার প্রাপ্যটি দিতে হয়, সেটাই শিখেছি। তাছাড়া ওনার সঙ্গে আমার মতের খুব মিল।
তাই দেখলাম।…তুমি যে আবার এতো সব ভাবনাভাব তা তো সাতজন্মে জানতাম না। চিরদিনই জানি মজলিশি স্ফূর্তিবাজ মানুষ! আমোদ-আহ্লাদ, খাওয়া-মাখা, হাসি-খুশী, হৈ-চৈ এই নিয়েই থাকো।
নীলাম্বর একটু হেসে বলেছিলেন, মানুষ জাতটা তো ‘ওয়ান রুম ফ্ল্যাট’ নয় রে। তার এই ছোট্ট খাঁচাখানার মধ্যে অনেক ঘর, অনেক কুঠুরী।…
তা শুনে কী বিশেষ স্বস্তি পেয়েছিল নীহারিকা? না বাবা, সেই চিরচেনা নীলুদাই ভালো।
কিন্তু নীলাম্বর ব্যানার্জি নিজের ওই ‘ওয়ান রুমটি’ ছাড়া অন্য ঘর দরজা খুলে বসে সবসময়? তা তো নয়। আজ সে বড় একটা আঘাত পেয়ে বড় আহত হয়েছিল।
বাপ্পা নামের ওই ছেলেটাকে ছোট্ট থেকেই সে সত্যি বিশেষ একটু ভালোবাসতেন! নিজের তো সব কটাই মেয়ে। ‘ছেলে’ জিনিসটিকে মনে হয় একটা দামী জিনিস। তাছাড়া— ছোট থেকেই ছেলেটার দীপ্ত উজ্জ্বল চেহারা, বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি, চটপটে কথাবার্তা রীতিমতো আকর্ষণীয়ই ছিল।…সেই ছেলেটা যখন চিরাচরিত বাঁধা রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা ধরলো, তখন থেকেই নীলাম্বর একটু ক্ষুব্ধ। তবু ভাবতেন, হয়তো সাময়িক খেয়াল।…তবে সেই ‘নীলুমামা’ বলে বিগলিত হওয়া ছেলেটা যে ভিতরে ভিতরে এতোটা ইস্পাত হয়ে উঠেছে তা ভাবেননি। ভাবেননি বলেই নিঃশঙ্ক চিত্তে, ভালোবাসার মনটি মেলে ধরে বলেছিলেন, তোর জন্যে আমার দুঃখ হয় বীরপুরুষ!…কিন্তু সেই নিঃশঙ্কতার ওপর যে একটি সাপের ছোবল পড়বে তা কে জানতো? সেই ছোবলের আঘাতেই আহত নীলাম্বরের মনের ভিতরকার অন্য একটি ঘরের দরজা খুলে পড়েছিল।
তারকের মায়ের মনিব বিপুল ঘোষাল, তাঁর এলাকায় বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। এখন উৎসবের সমারোহ। বাড়িতে লোকের বিরাম নেই। অবিরতই আসছে ফুলের তোড়া, ফুলের মালা নিয়ে। আসছে মিষ্টির বাক্স হাতে নিয়ে।…রমরমা ব্যাপার চলছে ক’দিন। এমন কি তারকের মাকেও বলা হয়েছে, ‘ও তারকের মা, তোমার তারককে পরশু এখানে খেতে আসতে বোলো। বোলো গিন্নীমার নেমন্তন্ন।’
সেই কথাই বলতে আসে তারকের মা এ বাড়িতে। অর্থাৎ তার পুরোনো মনিবের বাড়িতে। নীহারিকা তাকে কাছে বসিয়ে চা খাওয়ায়, সমীহভাবে কথা বলে। সেই ‘বাসনমাজুনি’ তারকের মা তো নেই এখন। এখন সে বড় গাছে নৌকো বেঁধেছে!
সে যাক, তারকের কাছে কথাটা পাড়ে তার মা। বলে, দেখলি তো আমাদের ‘ঘোড়াইচণ্ডী’ কী জাগ্রতো দেবী। বাবুকে জিতিয়ে দিলো কিনা?
তারক মুচকি হেসে বলে, তোর ও ‘ঘোড়াইচণ্ডী’ বাহুল্য মাত্র। তোর মনিব যে পার্টির তার জেতা ঠেকায় কে? লোক তো এখন আর মানুষকে ভোট দেয় না। ভোট দেয় চিহ্নকে। চোখ বুজে বসে থাকলেও তো জিততো তোর মনিব।
তোকে কে বলেছে এ কথা?
কেউ বলতে হয় না। বোধবুদ্ধি থাকলেই জানা যায়।
তবু তো গিন্নী আমায় চুপিচুপি বলেছে, এই ‘বিজয় উৎসব’ না কী যেন, তার ডামাডোলটি মিটে যাক, আবার একদিন আমায় দু’দিনের ছুটি দেবে, আর অনেক করে পুজো দেবে মা চণ্ডীর নামে!
তা সে তো দেবেই। মানত করেছিল যখন।
তা তুই তাহলে আসিস পরশু! সেদিন নাকি বিস্তর লোক যাবে।…প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে।
ধ্যাৎ। কী পরিচয়ে যাবো?
ওমা। কেন? আমার পরিচয়েই যাবি। তাতে তোর মান যাবে?
আরে বাবা, তা নয়। তুমি তো আর গেটে দাঁড়িয়ে থাকবে না? ওসব বড়মানুষের বাড়ির ব্যাপার। নিশ্চয় দেউড়িতে পুলিশ পাহারা থাকবে। আর সব্বাইকে ধরে ধরে জিগ্যেস করবে, তুমি কে হে?
তা তাতেই বা তোর ভয়টা কী? তুই কী চোর-ডাকাত?
পুলিশ ইচ্ছে করলে ‘চোর’ বলে ধরতেও পারে। ওদের মর্জি।…আমার আর ওই বিস্তর জনের সঙ্গে খেয়ে যেয়ে কাজ নেই।
মা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলে, গিন্নীমা বললো, আগ্রহে করে!
বলবি, হ্যাঁ, বলেছি ছেলেকে। তারপর কী আবার খোঁজ করতে বসবে, ‘ও তারকের মা, তোমার ছেলে এসেছিল? খেয়েছিল?’
তারকের মা মুচকি হেসে বলে, তা করতেও পারে। এখন গিন্নীর কাছে তোর মার খুব খাতির। আরো একটি মনস্কামনা আছে, তার জন্যেও মানত করবে মা চণ্ডীর কাছে।
কী মনস্কামনা?
তা জানি না। বলে রেখেছে চুপিচুপি।…
তারপর তারকের মা আক্ষেপের গলায় বলে ওঠে, আমাদের এ বাড়ির বড়খোকার তো আমার মনিবের ওখেনে যাওয়া আসা ছিল। তো এই সময়ই মাতা ফাইটে বিছনায় পড়ে রইলো। ওখেনে কতো ঘটাপটা। ভালো থাকলে তো যেতো নিয্যস!
তারক বললো, বড়দাবাবুর বিষয় নিয্যস কিছু বলতে পারা যায় না মা। উনি এক অন্য জগতের জীব। হয়তো ওমুখোই হতো না আর।
তো হ্যাঁরে, আচে কেমন?
তারক মাথা নাড়ে, ভালো না। এখন ডাক্তার বলছে, ঘাটা গোলমেলে হয়ে উঠেছে। বোধহয় হাসপাতালে রাখতে হবে, অপারেশন করতে হতে পারে।
ওমা। বলিস কী? তবে যে বলেছিলি, তেমন কিছু না?
তখন তাই মনে হয়েছিল।
হ্যারে, একটু দেকতে যাবো?
তারক শিউরে উঠে বলে, সর্বনাশ। অমন চিন্তাও করিসনি।
কেন রে?
বললুম তো গোলমেলে ব্যাপার, ওনার এখন মেজারের ঠিক নাই।… রাতদিন চুপচাপ পড়ে ভাবছে। বইটইও পড়তে দেখি না। সর্বদা ‘ক্ষেপ্ত’ ভাব। বাড়ির লোক তা তটস্থ! মাথাটা না বিগড়ে যায় এই ভাবনা আমার।
তারক একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে।
তারকের মা আর একবার বলে, তালে যাবিনি ওখেনে পরশু? মনটা কেমন করতেচে রে।
তারক অগ্রাহ্যভরে বলে, একদিন একপাত নেমন্তন্ন খেয়ে কী তোর তারকের স্বর্গলাভ হবে? অ্যাঁ?
মায়ের প্রাণটা যে কী, তা বুঝবি কেমন করে?
বুঝে কাজ নাই আমার। ওসব ভিড়ভাট্টা আমার সহ্য হয় না। তোমার তারক ঢের ভালো জিনিস খায় মা। তুমিই খেও ভালো করে, তালেই হবে। গিন্নীর পেয়ারের লোক হয়ে উঠছ।
হাসতে থাকে তারক।
বাপ্পাকে আজ হাসপাতালে যেতে হবে।
কী নিরুপায় অবস্থায় পড়ে গেল বাপ্পা। মনে একতিল শান্তি নেই।…মাথার ক্ষত সারছে না, সম্প্রতি আবার অল্প অল্প জ্বর দেখা দিচ্ছে রোজ।…
অদৃষ্টের ফের, সেই বিরক্তিকর নীলুমামার গাড়িতেই নিয়ে যাওয়া হবে তাকে। নীলুমামাই এসে বেপোট অবস্থার হাল ধরেছেন। কারণ, বাপ্পার বাবা একটু বিপজ্জনক অবস্থায় পড়লেই চোখে সর্ষেফুল দেখেন। আর মা জানেন অকূলে ভগবানের জায়গায় ‘নীলুদা’!
নীলুদা প্রথমেই বলেছিলেন, হাসপাতাল? ছেলেটাকে জবাই করতে চাস না কি? আজকাল হাসপাতালের কী হাল হয়েছে, কাগজে পড়িস না? আমার জানা এক ভালো ডাক্তারের একটা প্রাইভেট নার্সিংহোম আছে, সেখানে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
বাপ্পা বলেছিল, মা, তোমার নীলুদাকে বলো, দয়া করে যেন আমার ওপর নাক গলাতে না আসেন।…কাগজে তো অনেক কিছুই পড়ছ। তা বলে হাসপাতালগুলো কী খালি পড়ে আছে? ভিড়ে তো আলপিন গলে না। তারা মানুষ নয়? আমার জন্যে নার্সিংহোমের ব্যবস্থা করতে বসলে, আমি কিন্তু এই অবস্থাতেই পালাবো।
হ্যাঁ, অহরহ সেই চিন্তাই তো তাড়না করে মারছে বাপ্পাকে। এই বেপোট অবস্থায় পড়ে গিয়ে সংসারের লোকের ‘আহা উহু’ তার কাছে বিষতুল্য লাগছে। মন কেবলই বলছে, পালা। বাপ্পা পালা! কিন্তু শরীরে কুলোচ্ছে না। তাছাড়া ‘পালিয়ে গিয়ে ফুটপাথে পড়ে মরে বেওয়ারিশ মড়া বলবো’ এমন ইচ্ছে অবশ্যই নেই। জীবনে কতো কাজ করবার আছে। অথচ—এই অবস্থা নিয়ে পার্টি অফিসে গিয়ে উঠলেও যে সেখানে জামাইআদর জুটবে, এমন আশা নেই। বাপ্পা কে? বাপ্পাদিত্য গাঙ্গুলী। একটা তৃণখণ্ড মাত্র। পার্টির ক’জন তার নাম জানে? তবু বাপ্পা জানে আমি একটা মহান কিছুর লক্ষ্যে যুদ্ধে এগিয়ে-চলা পদাতিক সৈনিকদের একজন।…কিন্তু হঠাৎ এ কী বিড়ম্বনায় পড়ে গেল বাপ্পা! যা তার দু-চক্ষের বিষ, আপনজনের ‘আহা আহা আর স্নেহবিগলিত সেবা, তাই সহ্য করতে হচ্ছে।…
হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা আমায় সেদিন পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল কে কে? অনীশ আর দিব্যেন্দু না? কতোদিন যেন হয়ে গেল। দেয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকিয়ে তারিখটা মনে মনে হিসেব করে নিল। ছাব্বিশ দিন হয়ে গেছে। তারা কই কেউ—
সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ধিক্কার দিলো বাপ্পা, কী আশ্চর্য! আমি সাধারণেদের মতো ‘সৌজন্য দর্শনের’ প্রত্যাশা করছি?…তবু—মনটা কেমন যেন খচখচ করতে থাকে। ওদিকের খবরও
তো আর জানা হচ্ছে না।
ঠিক এই সময় টুসকি এসে যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিল।…
খুব সব বন্ধু জুটিয়েছিস বটে দাদা! তোর ‘হাফ-লাশ’ হয়ে ‘যাওয়া (আধমরাকে টুসকি হাফ-লাশ বলে) শরীরটাকে চ্যাংদোলা করে এনে ফেলে দিয়ে সেই যে পিটান দিল, আর একবার উঁকি দিতেও এলো না, ‘বন্ধুটা বাঁচলো কী মরলো’ দেখতে।
বাপ্পা খুব রেগে উঠে বললো, কে বলেছে ওরা আমার প্রাণের বন্ধু? একসঙ্গে কাজ করি, এই পর্যন্ত।
তা তাই যদি হয়, বলতে হবে সহকর্মী। তাদেরও তো, একটু মায়ামমতা—‘সরি’, ওগুলো তো তোদের কাছে বাতিল শব্দ, দায়িত্ববোধও থাকবে?
আচ্ছা। এবার তাহলে আপনি একটি নীতিবোধের পাঠশালা খুলুন ম্যাডাম। জনগণকে দায়িত্ব কর্তব্য শেখানোর ক্লাস নিন। যা পালা। কিছু ভালো লাগছে না আমার।
টুসকি হঠাৎ কাঁদো কাঁদো হয়ে গিয়ে বলে, আর আমাদেরই যেন খুব ভালো লাগছে! এ তো তবু বাড়ির মধ্যে রয়েছিস, সবসময় দেখতে পাচ্ছি। জ্বালাতন করবার সুযোগ পাচ্ছি। কতোদিন তো তোকে ভালো করে দেখিইনি দাদা!
বাপ্পা হাত বাড়িয়ে টুসকির মাথার বেণীটার একটায় টান দিয়ে বলে ওঠে, ওঃ। তার মানে আমার মাথা ফাটাটা তোর লাভের খাতায় উঠেছিল?
টুসকি জলভরা চোখেই একটু হেসে ফেলে বলে, তা মিথ্যে বলবো না, হয়েছিল একটু। ডাক্তার তো তখন বলেছিল, ভাবনার কিছু নেই, এমন কিছু না। এখন না কি বলছে অপারেশন করতে হবে। কী খারাপ যে লাগছে!…
বাপ্পা তাকিয়ে দেখে।
এই মেয়েটা বলছে, ‘কতোদিন তোকে ভালো করে দেখিইনি দাদা।’ বাপ্পাই কী এদের দেখেছে ভালো করে, দীর্ঘদিনের মধ্যে? এই সংসারের খবরটবর কিছু জানে বাপ্পা? এদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে জড়িত আছে সে?…কিন্তু কোনোদিনই কী ছিল তা বাপ্পা? বরাবরই তার মনটা যেন বাড়িছাড়া। মাকে মনে হয়েছে, বড়ো বেশী ন্যাকা। বাবাকে মনে হয়েছে ‘রাবিশ’। শিলাদিত্যটাকে ‘কিস্যু না’ আর এই মেয়েটাকে ‘আহ্লাদী পুতুল’। তবু এটার ওপর খুব স্নেহ ছিল। কিন্তু স্নেহ-ভালোবাসা প্রকাশ করাটা তাদের শাস্ত্রে ‘খেলোমি’। তাই কখনো কখনো ওকে ডেকে কথা কইতে ইচ্ছে হলেও কয়নি। ভয় হয়েছে, তাহলেই হয়তো ‘পেয়ে বসবে’। তাহলেই তাকে ‘অতি সাধারণের’ দলে ধরে নেবে। আজ মনটা কেমন করে এলো।
কিন্তু কী কথাই বা বলবে? বললো, এই, কখন যাবার কথা রে?
শুনছি তো বিকেল চারটেয়। নীলুমামা গাড়ি নিয়ে আসবেন। বাবা আজ আর অফিস যাচ্ছে না!
সেই তোদের ওই ‘মহানুভব নীলুমামার’ কবলে পড়ে যেতে হলো, এতেই ভীষণ খারাপ লাগছে।
টুসকি আস্তে বললো, উনি কিন্তু তোকে খুব ভালোবাসেন দাদা।
ধন্যবাদ।
টুসকি আস্তে বলে, আগেকার কথা মনে পড়ে তোর দাদা? কতো সুখেই ছিলাম আমরা। দাদু সেজেগুজে গটগট করে কোর্টে যেতো, দিদা রান্নাটান্না করতো, আমরা ক্যারম খেলতাম, ‘মজার অঙ্ক’ নিয়ে খেলা করতাম। কী ভালোই ছিলাম!
বাপ্পা এসব কথায় প্রশ্রয় দেবে না। ‘অন প্রিন্সিপল’ দেবে না, তাই ব্যঙ্গের গলায় বলে ওঠে, তারও আগে তো আরো ভালো ছিলি। যখন ইস্কুলে যেতে হতো না। হাঁটি হাঁটি পা পা করতিস!
তোর সবতাতেই ঠাট্টা। মরছি আমি নিজের জ্বালায়।
তোর আবার কী জ্বালা হলো? পাড়ার মস্তানদের সঙ্গে প্রেমট্রেম করছিস বুঝি?
ধ্যাৎ। ভালো হবে না বলছি দাদা।
আহা, এতোদিনে এসব কিছু করে উঠতে পারিসনি? তবে আর করলি কী?
টুসকি কৃতার্থ হয়। দাদা তার সঙ্গে এভাবে কথা কইছে। ভাবাই যায় না।
টুসকি বলে, ওসবের মধ্যে আমি নেই।
বলে, কিন্তু বুকটা কেঁপে ওঠে। যুধাজিতের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু যুধাজিৎ কী আর টুসকির আছে?
বাপ্পা বললো, ছোটবাবু কোথায়?
ওর যে আবার এই সময় একজামিন চলছে।
একজামিন? এ সময় ওর কী একজামিন?
কী জানি বাবা। এম. এ’র পর বাবা বলেছিল, এম এড্টা পড়ে নে, তা না করে সাংবাদিকতা পড়তে গেল। এদিকে আবার না কি ‘বিজনেস ম্যানেজমেন্টও’ পড়েছে। সব কথা খুলে বলে না। তবে ওর একটা বন্ধু হঠাৎ বিজনেস করে লাল হয়ে যাচ্ছে দেখে ও—
ওঃ। হঠাৎ ‘লাল’। বুঝলাম। এসব বন্ধুকে পাচ্ছে কোথায়?
পড়তো একসঙ্গে।
ভালো। তাহলে ছোটবাবুও লাল হোক।…যা, আমার ঘুম পাচ্ছে।
ওমা। ঘুমোবি কী? মা তোর ভাত আনছে। বারোটা বাজে। খেয়ে একটু ঘুমিয়ে জিরিয়ে তারপর তো আবার রওনা দিতে হবে। দাদা রে। ভাল লাগছে না। কিছু ভাল লাগছে না।
বাপ্পারও কী টুসকির মতোই অবস্থা নয়? নিরুপায় হয়ে বাড়িতে পড়ে থাকতে অবশ্য খুবই খারাপ লাগছিল। তবু কেমন একটা ভালো লাগা ভালো লাগা ভাব তো ছিল।
এই যে সন্ধে হলেই বাবা অফিস থেকে ফিরেই এ ঘরে এসে বলে ওঠেন, ‘কী রে, আজ কেমন আছিস?’ ওই যে দাদু সকালবেলা এসে বসেন খবরের কাগজ দু’খানা হাতে নিয়ে এবং বাপ্পার সঙ্গে দেশের দশের নানা কথার আলোচনা করেন, একজন বয়স্ক ‘বন্ধুর’ সঙ্গে কথা বলার মতো। এই যে টুসকিটা যখন তখন এসে আবোল তাবোল বকে যায়, এগুলো যেন আজ বেশ দামী মনে হচ্ছে।
তারক এসে হাজির হলো। বাপ্পার খাটের সামনে ওর স্পেশাল ছোট খাবার টেবিলটা পাতলো। খাবার জলের গেলাস রাখলো ডিশ চাপা দিয়ে। একটা চেয়ার বিছানার কাছে টেনে এনে তার পিঠে ছোট একটা তোয়ালে রাখলো, তারপর বললো হাতমুখ ধোবেন তো ধুয়ে নিন।
এতোদিন বাপ্পা নিজেই নীচের তলায় নেমে খাবার টেবিলে গিয়ে বসেছে। আর টুসকি হেসে হেসে বলেছে, ভাগ্যিস মাথাটা ফাটিয়েছিলি, তাই তোর সঙ্গে একসঙ্গে খেতে বসতে পারছি। কতোকাল এমন ঘটনা ঘটেনি। তুই বা কোথায়, আমরা বা কোথায়!
নীহারিকা রেগে বলেছে, মেয়ের কী কথার ছিরি! মাথা ফাটাটা ‘ভাগ্যিস’।
তা এক হিসেবে। আমার মতে যদি কিছু ভাঙতেই হয়, ঠ্যাঙ ভাঙার থেকে মাথাটা ভাঙা ভালো। ঠ্যাঙ ভাঙলে তো বাবা নট নড়ন চড়ন হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে হতো!
তখন এইরকমই বলতো। কারণ তখন ডাক্তার বলেছিল, ‘তেমন কিছু না।’ কিন্তু হঠাৎ অল্প জ্বর দেখা দেওয়ায়, আশঙ্কিত হলো হয়তো ‘তেমন, কিছু।
অতঃপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এবং শেষ পর্যন্ত অপারেশনের চিন্তা।
বাপ্পাকে একবারে পেড়ে ফেলেছে। অথচ বাপ্পার প্রতি মুহূর্ত মনে হচ্ছে, ‘পালাই। পালাই।’
নীহারিকা ডাকলো, তারক, আয় একবার। থালাটা নিয়ে যা।
ভাতের থালা তরকারির বাটি ইত্যাদি একা আনতে পারে না নীহারিকা, তার পিঠে কোমরে ব্যথা।
বাপ্পা হঠাৎ বলে উঠলো, তারককে আর মাকেই সবসময় কাজটাজ করতে দেখি। সেই মেয়েটা কী করে?
কোন মেয়েটা?
আঃ। সেই ‘আবলুশ কাঠটা’। ইয়ে—কাজল! তাকে তো একটা কাজ করতে দেখি না।
টুসকি হেসে গড়িয়ে পড়ে।
কাজল? তাকে খুঁজছিস? এই একমাসের মধ্যে তোর খেয়াল হয়নি, তাকে দেখতে পাচ্ছিস না?
বাপ্পা বিরক্তস্বরে বলে, কে কখন কোথায় থাকে, কী করে আমি জানি? নেই বুঝি?
‘নেই’ বললে কিছুই বলা হয় না রে দাদা! তুইও বলে গেলি তিন-চার দিনের জন্যে কোথায় যাচ্ছিস, তারকবাবুও বললেন, “তবে আমিও এই সময় দেশে ঘুরে আসি—’
দেশে! তারকের আবার দেশ আছে না কী?
আমরাও তাই ভেবে অবাক হয়েছিলাম। তো তারকের মা তো দেশেটেশে যেতো! মায়ের যদি একটা দেশ থাকে, ছেলেরও আছে। তো সেই মহাসুযোগে, একদিন মা আর আমি ইয়ে একটু বেরিয়েছি, সেই ফাঁকে আমার অনেক কিছু শাড়িজামা জিনিসপত্তর হাতিয়ে কাজলবালা হাওয়া।
য্যাঃ। হাতিয়ে? এতোদিনের লোক! ও তো অনেকদিন আছে।
ওই তো, পৃথিবীতে কাউকে বিশ্বাস নেই রে দাদা। তো—হি-হি—হঠাৎ পাশের বাড়ির গিন্নী সেদিন বললেন, কাজল নাকি যাত্রাদলের হিরোইন হতে গেছে। যার সঙ্গে ভেগেছে, সে ওকে ওই লোভ দেখিয়েছিল আর কী! হি হি। কাজল হবে ‘হিরোইন’। স্রেফ চুনকাম করতে হবে সর্বাঙ্গে।
থাক। আর ওই পচা কথা শুনতে চাই না।
বাপ্পা উঠে মুখটা ধুয়ে আসে পাশের বারান্দায় রাখা বালতির জলে। পুরোনো ধাঁচের বাড়ি, অ্যাটাচড্ বাথরুমের ব্যবস্থা নেই।
কতোবারই বলা হয়, বাড়িটার একটু সংস্কারের দরকার। সে আর হয়ে ওঠে না। নীহারিকা মাঝে মাঝেই আক্ষেপ করে, আমার জীবনে আর কিছু হবে না। অথচ মনে ভাবতাম ছেলেরা বড় হয়ে উঠলে, কৃতী হয়ে উঠলে, আমার দিন কেনা হয়ে যাবে। বড়টিই হয়ে গেল অন্যরকম।
তারক এলো, নীহারিকা এলো।
এবং দেখা গেল একে একে এসে বসলেন আদিত্য ও সত্যব্রত এবং নয়নতারা।
আহারের আয়োজনেও অনেক বাহুল্য!
বাপ্পা বলে ওঠে, এর মানে? এতো সব কী?
কী আবার!
নীহারিকা বলে, একটু এটা ওটা করতে ইচ্ছে হলো। খা না ধীরেসুস্থে।
অসম্ভব। তোলো, তোলো। সব তোলো। তারক, একটা থালা আন্।
খা না বাবা! এই তো এখন হাসপাতালের ভাত খেতে চললি। কী জুটবে তা কে জানে! নীহারিকার কণ্ঠস্বরই অশ্রুসজল।
আর যেটা না কি বাপ্পার সবথেকে বিরক্তিকর। অতএব গলার স্বরে সেই বিরক্তি ঝরে পড়ে, ওঃ। তাই একদিনেই ফাঁসির খাওয়া খেয়ে নিতে হবে?
দুর্গা! দুর্গা!
নয়নতারা বলে ওঠেন, তোর মুখে কিছু আটকায় না বাপ! মায়ের প্রাণটা বোঝস না? ঢের বুঝেছি বাবা। তোমাদের ওই ‘প্রাণের’ জ্বালায় আমার প্রাণ পালাই পালাই করে। তারপর চারিদিক তাকিয়ে বলে, তোমরা যেভাবে ‘সিন’ করে আমার খাওয়া দেখতে বসেছ। মনে হচ্ছে এটাই যেন বাপ্পা গাঙ্গুলীর শেষ খাওয়া!
নয়নতারা আবার অস্ফুটে ‘দুর্গা দুর্গা’ করে ওঠেন।
সত্যব্রত একটু হেসে বলেন, এ পৃথিবীতে এসে কতোদিকে কতো অত্যাচার সইতে হয় ভাই। একটু আধটু স্নেহের অত্যাচার না হয় সইলেই।
সেটাই সবথেকে মারাত্মক অত্যাচার।
বলে বাপ্পা তারকের আনা একটা ছোট থালায় অনেক কিছু তুলে রেখে ভাতে হাত দেয়।
না, আজ আর কারো দুপুরের বিশ্রাম নেই। অস্থিরতা সকলের মধ্যেই।
এ বাড়ি থেকে কেউ কোনোদিন হাসপাতালে যায়নি।
সত্যব্রতর মায়ের মৃত্যু ঘটেছিল বটে এ বাড়িতে। কিন্তু সে তো গাছের ডালে আলগা হয়ে লেগে থাকা একটা শুকনো পাতার ঝরে যাওয়া! সে মৃত্যুতে শুধু শ্রাদ্ধেই সমারোহ হয়েছিল, মৃত্যুকে নিয়ে নয়।
কে জানে এখন সংসার কোন্ পথে আবর্তিত হয়!
বাড়ির একটা ছেলে হাসপাতালে যাচ্ছে, এ যেন এদের কাছে একটা বিরাট ঘটনা।
অথচ সেদিন নীলাম্বর বলে গেছেন, তোরা এমন ঘাবড়াচ্ছিস কেন বল্ তো? আজকাল তো হসপিটাল, নার্সিংহোম এসব লোকের জলভাত। কথায় কথায় যায়। একটা ব্ৰণ পাকলেও নার্সিংহোমে ভর্তি হতে যায়। এ অপারেশন একটা ব্যাপারই নয়। আজকালের অপারেশনের খবর জানছিস তো? একজনের মুণ্ডুটা আর একজনের ধরে জুড়ে দিচ্ছে। একজনের কিডনি আর একজনের ভেতরে সেট করে দিচ্ছে। খোল নলচে সব বদলে দিচ্ছে অপারেশনের কায়দায়।
তবু যাত্রাকালে সে আশ্বাসবাণী কোনো কাজে লাগে না।
নীলুমামা গাড়ি নিয়ে আসেন। ননী এবং তারক রোগীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গাড়িতে তোলে। বাড়ির ডাক্তার ‘অজিত ডাক্তার’ সঙ্গে ওঠেন।…
ওঠে আদিত্য আর শিলাদিত্য।
নীলুমামা তো অবশ্যই। তিনিই তো কর্ণধার। পাড়ের কাণ্ডারী!…তাঁকে তো আর এড়ানো যায় না।…কী অসহ্য এইটা!…
বাপ্পা অনুভব করে এদিকে ওদিকে ‘ফোঁস ফোঁস’। মা, টুসকি, নয়নতারা। আদিত্য তো ঘনঘন রুমাল বার করে নাক মুছছে। এমনকি সত্যব্রত পর্যন্ত অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, আমি আর গাড়িতে ভিড় বাড়ালাম না।
নয়নতারা বললেন, তদের তো ‘ঠাকুর-দেবতা নাই”, তবু মনে মনে একবার ভগবান স্মরণ কর দাদা! মনে বল আসে।
বাপ্পা হঠাৎ জোর গলায় হেসে উঠে বলে, তোমরা সবাই মিলে এমন একখানা সিন করছ, যেন এটা হতভাগা বাপ্পার শ্মশানযাত্রা। ওঃ। গাড়ি ছাড়া হোক।
মনে মনে বলে, ‘পালাতে হবে। পালাতে হবে।’ এই সব ল্যাৎপেতে স্যাঁতসেঁতে মায়ার বন্ধন-টন্ধনের জালে আটকা পড়লে আর রক্ষে নেই।
