রাধি
ধড়মড় করে উঠে বসলো বিছানায়।কাল ভেবেছিল স্বপ্ন,আজ বুঝলো স্বপ্ন নয়।সেই এক গলা সেই এক গান-” প্রভাত সময়ে শচীর আঙিনার মাঝে,গৌর চাঁদ নাচিয়া বেড়ায় রে….”
অবিন্যস্ত পায়ে তাড়াতাড়ি ব্যালকনিতে এসে মুখ বাড়িয়ে দেখে মধ্যবয়সী একটি মানুষ নির্লিপ্ত ঔদাসীন্যে খঞ্জনী বাজিয়ে গাইতে গাইতে চলে যাচ্ছে। না,এতো সে নয়।কতবার ভেবেছে…
গাঁয়ের সবাই রাধি বলে ডাকলেও সে বলতো রাধারানী।যেতে আসতে কতটুকুই বা দেখা হতো!তাও যখন মৃদু হেসে বলতো কেমন আছো রাধারানী ?বুকের ভেতরটা যেন কেমন হয়ে উঠতো। তরুণী মনের ভালোলাগার রংটুকু বুঝতে মহীনেরও কোন অসুবিধা হতো না।বৈষ্ণব বাড়ির ছেলে মহীন প্রভাতী টহল, পালাকীর্তন করে যা পায় ,কোনমতে চলে যায়। একদিন বিকেলে পুকুর থেকে হাঁসগুলি তাড়িয়ে ওঠানোর সময় রাধি পা হড়কে পড়ে গেল পুকুরের জলে।হাবুডুবু খাচ্ছিল। মহীন ঠাকুর আসছিল , পুকুরের জলে কেউ ডুবে যাচ্ছে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে..জল থেকে তোলার সময় দেখে ভয়ে চোখ বন্ধ।দুহাতে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে চোখ খোলো রাধারানী ।ভয় নেই।ভয় যে নাই রাধিও বুঝেছিলো বৈকি! কিন্তু দুচোখ বন্ধ করে সে যে তখন মাতোয়ারা কদম ফুলের গন্ধে ! মহীনের স্পর্শ তখন তার হৃদয়ে এক অনাস্বাদিত পুলকের সঞ্চার করেছিল। একটু একটু করে ফুটে উঠছিল সে।ভয় আর আনন্দের এক মিশ্র অনুভূতি তে ভেসে যাচ্ছিল তখন যে!
আর মহীন ! তার সামনে বন্ধ দুটি চোখ তো নয় যেন দুটি মুদিত পদ্মকলি আলোর স্পর্শে ফুটে ওঠার অপেক্ষায়।তা সেই আলোর স্পর্শ নেমে এসেছিল বৈকি!দুটি চোখের পাতার ওপরে।আহঃ সেদিনের কথা মনে এলেই আজ এই মধ্যবয়সেও মুখখানি রাঙা হয়ে ওঠে রাধির । না সে তো এখন রানীমা। গোপালপুরের রাজাবাবুর ধর্মপত্নী সে।
কাজের ব্যস্ততার মাঝেই তার মন আজ বারবার ফিরে যাচ্ছে পিছন পানে।তারপর যখনই দেখা হতো মৃদু হাসির আহ্বান দেখেছে মহীন ঠাকুরের মুখে।ভীরুবুকে অবোধ আশা!রাধির সই কুশী মানে কুসুম মহীন ঠাকুরের কথা জেনে গেছিলো,তাই সে রাধিকে বলেছিলো ,-দেখ আজ হোক কাল হোক তোর বিয়ে হবেই।এখনই না হয় মহীন ঠাকুর কে বল তোর বাবাকে বলতে।-বাবা কি রাজি হবে?একদিন পড়ন্ত বিকেলে দেখা ,মহীন হয়তো মৃদু হেসে পাশ কাটিয়ে চলেই যেত।রাধি ডাকলো তাকে।
রাধির লজ্জারাঙা মুখে খুশীর ছোঁয়া।বলে-“আমার বাবার সঙ্গে কথা বলবে না?”
-“কিসের কথা?
-কেন !আমাদের বিয়ের!
-সে কি করে হবে! তোমার বাবা রাজি হবে কেন?
-তাহলে কি আমরা দুজন দুজনকে পাবো না!
-কি পাবার কথা বলছো রাধারানী!
-যা পাইনি!তোমাকে।
-না পাওয়ার মাঝেও যে কত পাওয়া লুকিয়ে থাকে বোঝা যায় না।সে পাওনা যে আমি পেয়ে গেছি ! যা পাওনি ভাবছো তা হয়তো তোমার অগোচরেই রয়ে গেছে!
-তোমার ইচ্ছে থাকলে উপায় হতো হয়তো! সব মানুষই তো স্থূল চাওয়া – পাওয়ার হিসেবেই প্রাপ্তির পরিমান নির্ধারণ করে থাকে ।স্থূল দেহে আছি একথা সত্য কিন্তু আমার যে কিছুই নেই রাধারানী আত্মসম্মানটুকু ছাড়া!সেটুকু হারাই কি করে,বলতে পারো! বুকের ভেতর স্বপ্নকে, রূপকথা কে আছড়ে ফেলা যায় না। তুমি যে আমার স্বপ্নময় রূপকথা রানী!হয়তো সেজন্যই স্বপ্ন টুকু ছাড়া আর সব কিছুকে এড়িয়ে থাকতে চাই।
-রূপকথার নায়ক নায়িকার মিলন না হলে ভগবানও দুঃখ পান। আমিই বা কেমন করে বাঁচবো!
-না রানী ,আমি তোমাকে দুর্বল ভাবি না।আর তোমার জন্য আমার মনে একটা অন্যরকম অনুভবের ক্ষেত্র রয়েছে।সে অনুভব টুকু আমার একান্ত আপনার ধন।তুমি তোমার সংবেদনশীলতা দিয়ে বিচার করে দেখোতো ,কিছুই কী পাওনি!
-আমি কিছুই বুঝতে চাই না।
-রাজরানি হবে তুমি। আমি চালচুলো হীন বৈষ্ণব মানুষ।কোনোমতেই দুঃখের রাস্তায় টেনে আনতে পারবো না তোমায় ।তোমার জীবন নষ্ট করার কোন অধিকার আমার নেই।থাকতে পারেনা।……..
পদ্মপুকুরে রাধি পদ্ম ফুল তুলতে ব্যস্ত।দেখে কুশী আসছে দৌড়াতে দৌড়াতে ।কাছে এসে বলে তুই এখানে দেখগে তোর মহীন ঠাকুর চলে যাচ্ছে!দুজন মিলে দৌড়ে গিয়ে দেখে দুহাতে দুটি থলিতে তার যথা সর্বস্ব নিয়ে মহীন চলে যাচ্ছে।ছুটে এসে পথ আটকায় রাধি। মহীন গম্ভীরভাবে বলে-“বাড়ি যাও রাধারানী, আমি চালচুলো হীন বৈষ্ণব মানুষ।রাজরানী হবে তুমি! বাড়ি যাও।”
হাসি পায় ,রাজরানি হয়েছে বৈকি!অগাধ সম্পত্তির মালিক তার স্বামীকে রাজাবাবুই তো বলে সবাই। রানীকে ত্রুটিহীনভাবে সক্রিয় থাকতে হয় সর্বদা।পান থেকে চূণ খসার উপায় নেই!রানিই বটে!
রাধি সেদিন কিছু না বলে এক দৌড়ে বাড়ী চলে এসেছিলো। মা উঠোনে ধান মেলতে মেলতে রাধিকে দেখে কাছে এসে বলল,-“মুখখানি অমন দেখাচ্ছে কেন মা ?কি হয়েছে!”
কিছুই বলতে পারে নি,মায়ের বুকে মুখ রেখে শুধুই ফুলে ফুলে কেঁদেছিলো সেদিন।মা আর কিছুই জিজ্ঞেস করে নি।হয়তো কিছু অনুমান করেছিলো।শুধু বলেছিলো,-“এত অল্পেই ভেঙে পড়লে কি চলে মা!মেয়ে হয়ে জন্মেছো, কত ঝড় ই না সামলাতে হবে!”
ঝড় কি তখনই কি কিছু কম সামলাতে হয়েছিল বুকের ভেতর ! কতদিন যে….
বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার।এখন তো পুরো জীবনটাই তার ঝোড়ো হাওয়া।দু তিনটে দিন কেমন করে যে কেটে গেল।আজ বিকেলে ফিরছিল মন্দির থেকে,দেখে সেই মানুষটি !
“জীবন পুরের পথিক আমি কোন দেশেই সাকিন নাই।কোথাও আমার মনের খবর পেলাম না…”
গাইতে গাইতে চলে যাচ্ছে।
রাধির মনে হয় এ গান তো সে আগেও শুনেছে,মহীন গাইতো! কিন্তু সে তো এত বয়স্ক হবে না।-“অকূল গাঙে ভাসলাম আমি কূলের আশা ছাড়ি।তবু কোথাও আমার মনের খবর পেলাম না।”
চকিতে কি মনে হতে হেসে ফেলে।আরে বয়স তো তারও বেড়েছে। ইনিই হয়তো সেই মহীন ঠাকুর। ভাবলেন ডাকবেন কি না! না আজ থাক।
মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে কেটে গেল আরও কয়েকটা দিন।রাজাবাবু কাকভোরে বেরিয়ে গেছেন।শহরে গেছেন,জমি সংক্রান্ত মামলায়।দু একদিন সেখানে থাকতেও হতে পারে।
আজ সকালে ব্যালকনিতে উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাধারানী,ভাবে আজ ডেকে দেখবে সে সত্যিই মহীন কিনা! কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল মনে নেই,কিন্তু কই তাকে তো দেখা গেলো না।কেমন একটা অস্থিরতায় পেয়ে বসলো যেন।কতোদিন…..
কতোদিন আগে দেখেছিলো তাকে!
সারাটাদিন কাজে তার মন ছিলো না।কাজ ই বা তার কত টুকু! রাজাবাবু বাড়িতে থাকলে না হয় অন্য কথা!
হঠাৎ কানে ভেসে আসে সেই চেনা গান ,চেনা গলায়।যেমন ছিল তেমনি বেরিয়ে আসে সে ।দেখে আসছে….
কিজানি যদি না হয়
দুজনেরই মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে পলকেই।
-রাধারানী যে!একবারের কত বদলে গেছো।বাড়িটার দিকে একবার
তাকিয়ে বলে ওঠে,বলেছিলাম না রাজরানী হবে তুমি।
-ভালো আছো তো ঠাকুর!
-রাধামাধবের কৃপায় দিন কেটে যাচ্ছে। তোমাকে এমন সুখে থাকতে দেখে মনে আমার ভরে গেল যে গো।
– হ্যাঁ ভারি সুখেই আছি আমি।
-আজ তাহলে আসি রাধারানী।
-ভেতরে এসো একটু কিছু মুখে দিয়ে যাও।
ভেতরে নিয়ে গিয়ে তড়িঘড়ি জলখাবারের ব্যবস্থা করে রাধারানী। খেতে খেতে অনেক গল্প হয়।কত কথা! একবুক কথা যে রাধারানীর ! আজ যেন সব বাঁধ ভেঙে গেছে তার।মনের অর্গল খুলে প্রাণ ভরে কথা বলে যায়।
যাবার সময় বলে ওঠে,- সময় পেলে আবার এসো।
মন তার খুশি তে ভরপুর। অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখা মিলেছে মহীনের।তার কথা ভাবতে ভাবতে ভুলে যায় আজই রাজাবাবুর ফিরে আসার কথা।
রাজাবাবু ফিরে এসে অবধি একটাও কথা বলেনি রাধারানী র সঙ্গে।মুখ তার অসম্ভব রকমের গম্ভীর।রাধারানী ভেবে পায় না কি হয়েছে! গোমস্তা একবার কিছু বলতে এসে জোর ধমক খেয়ে ফিরে গেল।
রাধারানীর দিকে তাকিয়ে বলে,বাপের বাড়ি থেকে কদিন ঘুরে এসো।সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
একসপ্তাহ বাপের বাড়িতে থেকেফিরে এসে শুনলো এখানে নাকি ভারী গোলমেলে সব ব্যাপার হয়েছে।পরিত্যক্ত একটা কুয়ো তে নাকি একটা অচেনা লোকের লাশ পাওয়া গেছে।তাই নিয়ে এ কদিন রাজাবাবু খুব ব্যস্ত ছিলেন।
