ভবিতব্য
মিতার সাথে যে আবার দেখা হবে দীপঙ্কর ভাবেনি কখনোই, যদিও দেখা না হওয়ার সম্ভাবনাটাই যে অবধারিত হয়ে উঠবে এমনটাও তো ঠিক নয়। তবুও জানিনা কেন যেন মিতার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে। বছর পাঁচেক হলো দীপঙ্কর কলকাতাতেই রয়েছে তবুও কখনোই মিতার কথা তার মনে হয়নি।
মিতার সঙ্গে হঠাৎ করেই দেখা হয়ে গেলো, বড়ো রাস্তার মোড়ে । মিতা ওর মেয়ের কাছে যাবে বলে বাজারে এসেছিল। উফফ কতদিন পর! আশ্চর্য হয়ে গেল দীপঙ্কর,মিতার চেহারার পরিবর্তন দেখে। সে এসেছিল পেনশনের টাকা তুলতে। মিতাও আশ্চর্য হলো বৈকি! দীপঙ্কর বছর পাঁচেক কলকাতাতেই আছে শুনে ম্লান হাসি হাসলো। এদিক সেদিক তাকিয়ে বসার মতো কোথাও কিছু একটা দেখতে না পেয়ে দীপঙ্কর বলল-‘ চলো কোথাও একটু বসা যাক, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী কথা বলা যায়!’ একটু এগোতেই একটা ভদ্রগোছের রেস্টুরেন্ট দেখে সেখানে ঢুকে পড়ল। সেখানে বসেই মিতার সব কথা শুনল। যদিও অনেকটাই ওর জানা ছিল, অজানা যতটুকু ছিল তা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল মিতার কথায়। মিতা দীপঙ্করকে জিজ্ঞাসা করল-‘ গান করেন এখনো?’ গানের কথা উঠতেই দীপঙ্করের মনের ভেতর কত কথাই না ভেসে উঠলো। গানটা দীপঙ্কর ভালোই করতো, সর্বোপরি ওর গলার স্বরটি ছিল ভারি মিষ্টি। যেকোন সুরের গান অবলীলায় খেলাতে পারতো, ঠিক যেমন করে পায়ের বলকে সব বাধা অতিক্রম করে অবধারিত ভাবে ঢুকিয়ে দিতে পারতো গোলপোষ্টের মধ্যে।
মিতাকে দেখে মনে হচ্ছিলো মিতার মনেও এরকম একটা কিছু চলছে, মিতা বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল অতীতের কথায়। দীপঙ্কর বুঝতে পারছিল ওর কষ্টটা কোথায়! কত কিছুই তো অন্যরকম হতে পারতো, হলো কই!
পুরানো দিনগুলির কথা কেবলই মনে পড়তে লাগলো।
‘তোর কী হলো বলতো! তোকে নিয়ে এলাম তোর পছন্দ ভালো বলে, আর তুই কথা দিয়ে দিলি একেবারে! ওই তো রোগাপটকা মেয়ে, সত্যি বলতে কী আমার ভালোই লাগে নি। ‘
মনোজের কথা শুনে সেদিন দীপঙ্করের কেমন মনে হলো। টাকা পয়সার অভাব নেই শুধু বললে ভুল বলা হবে , অঢেল পয়সা কিন্তু লেখা পড়া সেরকম করে নি মনোজ। বাবার ব্যবসা দেখছে সেই কবে থেকে।দীপঙ্কর যেমন পড়াশোনায় তেমনই চৌকশ ফুটবল খেলায়। সপ্রতিভ কথাবার্তা
মিষ্টি হাসির সাথে কথা বলে সবার মন জয় করে নেবার একটা অদ্ভূত ক্ষমতা ছিল তার। আর এর সাথে ছিল তার গান। দীপঙ্করের গান শুনে মুগ্ধ হতোনা এমন লোক কমই ছিল সেসময়। আজও এই সত্তরেও তার গলায় সুর খেলে অবলীলায়।
বন্ধুর মেয়ে পছন্দ করার ব্যাপারে তাই সেদিন তার উপরেই বাড়ীসুদ্ধ সকলের ছিল অগাধ আস্থা।দীপঙ্কর বলেছিল -‘দেখ বিয়ের আগে সবাই এরকম থাকে। বিয়ের পর চেহারা ফিরে যেতে সময় লাগবে না।’
যাই হোক, বিয়ের ব্যাপারে বেশ কয়েকবারই মেয়ের বাড়ী যাতায়াত করতে হলো দীপঙ্করকেই।
ওনাদেরও ভীষণ আস্থা দীপুর ওপর।
মেয়ে দেখতে গিয়ে তখন পরিচয় হয় তার বোনের সঙ্গে। দিদির একেবারে বিপরীত। চেহারাতে তো বটেই অন্য অনেক ব্যাপারেও ছিল অনুভূতি সম্পন্ন। গান শুনিয়েছিল সেদিন,পরপর বেশ কয়েকটা। তাকে দেখিয়ে মনোজ বললো দীপঙ্কর খুব ভালো গান করে। ‘ এই দীপু, গা না তোর গান শুনিয়ে দে।’ দীপুও তো কম যায় না! একটা কেন, পরপর তিনটে গান শুনিয়েছিল সেদিন ওদের অনুরোধে। তার গান শুনে মিতা তো মুগ্ধ হয়ে গেছিলো।
দীপঙ্করের প্রতি একটা অদ্ভূত আকর্ষণ তৈরী হয়েছিলো তার মনে। দীপঙ্করও কী সরে থাকতে পেরেছিল সেদিন!
বৌদির বোন ঝুমুরের সঙ্গে প্রেম চলতে চলতে হঠাৎ করেই একটা পারিবারিক টানাপোড়েন তৈরী হলে, ওদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। বাড়ীর লোকের কথায় ঝুমুর বেঁকে বসল। দীপঙ্করের সাথে দেখা করা তো দূরে থাক তার চিঠি ফিরিয়ে দিতেও পিছপা হয় নি পর্যন্ত ।
সেই অবুঝ আকুলতার মুখে মিতার প্রতি আকর্ষণ, বোধ হয় অসম্ভব কিছু ছিল না।
যাতায়াতে ঘনিষ্ঠতা যে বাড়বে এতে আশ্চর্যের কী আছে! যখন তখন চলে যেত মিতাদের বাড়ীতে। তখন কেমন জানি তার মনে হতো মিতাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। কতদিন এরকমও হয়েছে বাড়ীর সবাই কোথাও যাবে, মিতা একা থাকতে পারবে না বলে খবর পাঠিয়েছে। আর দীপঙ্কর তো অপেক্ষাতেই থাকতো , এরকম খবর পেলে তৎক্ষণাৎ পৌঁছে যেত। মিতা তখন পুরোপুরি তার বলেই মনে করত। দুজনে দুজনের জন্য পাগল হয়ে উঠত। আদরের বন্যা বইয়ে দিত দীপঙ্কর। মিতাও যেন তুলতুলে নরম সোহাগী বিড়ালের মতো মুখ ঘষতে থাকতো তার বুকে।সেই উন্মাদনার মধ্যে অপেক্ষা করছিল দীপঙ্কর, কখন বিয়ের প্রস্তাব আসবে।
এমন সময় ওর দিদির সন্তান সম্ভাবনা হলে দিদির বাড়ী এলো। দীপঙ্করও তখন আহ্লাদে আটখানা! যখন খুশি যেতে পারবে। বন্ধুর বাড়ী বলে কথা! প্রায় প্রতিদিনই যেতে থাকল। ভাবল বন্ধু যদি বুঝেই থাকে, বুঝবে ক্ষতি তো কিছু নেই। প্রথম প্রথম সব ঠিকঠাক চললেও পরের দিকে মনোজ যেন ঠিক দীপঙ্করকে পছন্দ করছে না বলেই মনে হতে থাকলো। দীপঙ্কর মাঝে মাঝেই গিয়ে শুনতো ওরা কোথাও বেরিয়েছে। কেমন যেন মনে হতো। ওর জন্য আসছে আর ও মনোজের সঙ্গে বেড়াতে চলে যাচ্ছে!
ওর দিদি দীপঙ্করের সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিলে, দীপঙ্কর রাজি হতে পারলো না। কারণ তখন নানাদিক থেকে শুনছিলো ওর জামাইবাবু মনোজ, ওর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। অনেকদিন ধরেই দীপঙ্করের মনেও এমনই একটা সন্দেহ দানা বাঁধছিল ক্রমশ । স্ত্রীকে নিয়ে ওর সন্তুষ্টি যে বড়ো একটা ছিল না সেটা তো জানতোই। দীপঙ্কর প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলো মিতার কথা মন থেকে মুছে ফেলতে।
এদিকে ঝুমুরের সঙ্গেও তখন সব গোলমাল মিটে গেলে, দীপঙ্কর আবার ঝুমুরের সাথে মেতে উঠলো, আদরে আবদারে সোহাগে যতনে তখন সে ঝুমুর নামক রত্নের রক্ষণাবেক্ষণে ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
মিতা তখন পুরোপুরি দীপঙ্করের থেকে বিচ্ছিন্ন। মনোজ মানে জামাইবাবুই তখন ওর হর্তা কর্তা বিধাতা। বিশেষতঃ বাবা মারা যাওয়ার কারণে দিদি ওকে কাছেই রেখে দিয়েছিল। মা তো ছোটবেলাতেই গেছেন। কী কুক্ষণেই না বোনকে রাখলো! প্রথম প্রথম কিছু না বুঝলেও একসময় যে বুঝতে পারবে সেটাই স্বাভাবিক। বুঝলো যখন, তখন গড়াতে গড়াতে অনেক দূর পৌঁছে গেছে।
ওর দিদির তো মাথায় বাজ! দিদির ক্রমাগত তাগিদের ফলে মিতার বিয়ের ব্যবস্থা পাকা হলো। জামাইবাবুর ব্যবসার অন্যতম বেতনভুক কর্মচারী, বয়সে মিতার থেকে প্রায় বারো তেরো বছরের বড়ো। তাছাড়া কাজের জন্য মাসের বেশীর ভাগ দিনই বাড়ীর বাইরে থাকতে বাধ্য হয়। মনোজ তখন
মিতার জন্য কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে ফেলল। ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে নিজেও কলকাতায় এসে থাকতে লাগল। পুরো ব্যবসা কলকাতায় এনে ফেলল।
আগেও ছিল, এখন মিতাকে নিয়ে উদ্দাম খেলায় মেতে উঠতে কোন বাধাই রইলো না আর।সবকিছু ঠিক মতোই চলছিলো, তবুও মিতা সন্তানের মা হতে চায়। বলে ‘ আমার বড়ো ইচ্ছে মা হবার!’ ‘এখন কী! এখন তো ভোগের সময়, ভোগ করে নাও।’ অবশ্য মিতার ভোগের জন্য কিছু করতে বাকী রাখে নি ওর জামাইবাবু। ভোগসুখের প্রাচুর্য দানকারী জামাইবাবু এত সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। অনেক গুলো দিন পেরিয়ে গেল। মা হবার প্রবল ইচ্ছে ওর, স্বামী সব জেনে বুঝেই চোখ বন্ধ করে থাকতো। মিতা স্বামীকে বলে-‘আমি মা হতে চাই! আমাদের সন্তান হওয়া দরকার।’ স্বামীর তো ইচ্ছে আছেই।বলল-‘সে তো ঠিকই, বাচ্চা হওয়া দরকার তো আছেই।’ উনিও চাইলেন তবে মনের মধ্যে সন্দেহ বাচ্চার বাবা সেই হবে তো!
ওর প্রেগনাণ্ট হবার কথা জানতে পেরে মনোজ গুম হয়ে থাকল। কিছু না বলেই সেদিন চলে গেল। মিতা জামাইবাবুকে চেনে ভালো করে। একমাসের মাথায় মিতার স্বামী রাস্তায় গাড়ী চাপা পড়লো। কী করবে এখন! আতান্তরে পড়ে দিশা খুঁজে পেল না মিতা। জামাইবাবুই ভরসা শেষ মেশ।
এখন তো অবাধে মিতাকে ভোগ করতে থাকে। সব কিছু সহ্য করে মুখ বুজে পড়ে থাকা অসহ্য লাগলেও কিছু করার নেই। বাপের বাড়ি বলতে দাদা বৌদি ছাড়া কেউ নেই,তারা তো মিতার সঙ্গে সম্পর্ক টাই পারলে অস্বীকার করে! আর দিদি যে ওকে শত্রু ভাববে তাতে আর আশ্চর্য কী! কি জানি কেন মিতার গর্ভস্থ সন্তানের কোন ক্ষতি কিন্তু করতে চায় নি মনোজ! নিজের স্ত্রী বা সন্তানের জন্যও কোনদিন অভাব রাখেনি কোন কিছুরই।
মেয়েটা জন্মালো যখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো ! কিছুদিনের জন্য রেহাই মিলেছিল ঠিকই, তবে এবারে মিতার সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য অনেক করলো। মিতার সেবা যত্ন করার ব্যাপারে মনোজ কোন ত্রুটি রাখলো না । যথারীতি মেয়ে বড়ো হতে লাগলো।একটু বড়ো হতেই বলল-‘চলো, মেয়েটাকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করে দি। ‘ ‘সে কি ও এখন ছোট, আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে কী করে? ‘
‘ঠিক পারবে! তাছাড়া না পারলে আমাদেরই বা চলে কী করে! ‘ ভালো না লাগলেও মেনে নিতে বাধ্য হয় কেননা যে বিলাসিতার জীবনে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তা থেকে বেরিয়ে আসা বড়ো সহজ নয়। তাছাড়া মেয়েটাকে মানুষ করে তুলতে হবে। সেও তো অনেক খরচের ব্যাপার! মেয়েটাকে ভালো একটা স্কুলে ভর্তি করে হোস্টেলে রেখে এলো।
মিতা মনোজের হাতের পুতুল হয়ে গেল। উদ্দাম ভোগের নেশায় পাগল হয়ে উঠেছিল মনোজ। মিতার সবরকম প্রয়োজন সে অকাতরে মিটিয়ে যেত।
মিতার সঙ্গে সম্পর্ক যেমনই থাকুক তবুও সবকিছুরই শেষ হয় একদিন ,কোথাও না কোথাও থামতেই হয়! সময় তো আর থেমে থাকে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাজের জন্যই হোক কিংবা মনোজের ছেলে বড়ো হয়ে উঠছিল বলেই হোক মনোজ মিতার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে থাকলো ক্রমশ। মিতার জন্য ভালোবাসাও জন্মে গেছিল ততদিনে,তাই মিতার ভবিষ্যতর জন্য বেশ কিছু টাকা সে মিতার নামে রেখে দিয়েছিল।
মাঝখানে পেরিয়ে গেছে আরো কয়েকটা বছর। মেয়েটা বারো ক্লাস পাশ করে নার্সিং ট্রেনিং করছিল। পাশ করে গেছে। পোস্টিং হয়ে গেছে ।মাকে নিয়ে যাবে সাথে করে। মিতার শরীর বড়ো ভালো নেই।
কালের প্রকোপে মনোজও আর সেরকম নেই। যৌবনের যথেচ্ছ অনাচার অত্যাচারের ফল পাচ্ছে এখন। বাড়ীর বাইরে বের হতে পারে না । ছেলের হাতেই ব্যবসা পত্তর সব তুলে দিয়েছে।
সেও তো কম দিন হলো না।আজ ভেবেই বা কী হবে! কথা শেষ হয়ে গেছিলো অনেকক্ষণ তবুও উঠতে পারে নি। দীপঙ্করের তখন মনে হয়েছিল, -‘সেদিন কী আমার কিছুই করার ছিল না! কী জানি সেদিন আমিও বোধহয় স্বার্থপরের মতো পাশ কাটিয়ে গেছিলাম।’
আসলে ঝুমুরের সঙ্গেও সব গোলমাল মিটে গেছিল বলেই বোধহয় মিতাকে বিপদের মধ্যে দেখেও চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল! না হলে মিতার জীবনটা তো অন্যরকম হতো। সেই অন্যায়ের ফলেই হয়তো জীবনে চলার পথে ঝুমুরকেও পেল না! বেরিয়ে এসেছিলো রেস্টুরেন্ট থেকে। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিলো বুক ঠেলে। একটু লজ্জাই পেয়েছিল সেদিন। মিতাও আর দেরি করতে পারে নি। সজল চোখে ‘আসছি’ বলে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করেছিল । হতভম্ব দীপঙ্কর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো মিতার চলে যাওয়া। দেখলো পার হয়ে যাওয়া ইতিহাসের শেষ অধ্যায়টুকু।
