Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty » Page 9

রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty

চৌধুরিবাড়িতে পৌঁছতে-পৌঁছতে একটা বেজে গিয়েছিল। গেস্ট হাউসের সামনে গাড়ি রেখে ভিতরে ঢুকতেই একজন লোক এসে সেলাম ঠুকে জিজ্ঞেস করল, খানা এখুনি লাগিয়ে দেওয়া হবে কি না।

ভাদুড়িমশাই আর সদানন্দবাবু ভোরবেলাতেই স্নান সেরে নিয়েছিলেন। কিন্তু আমি তখনও স্নান করিনি। বললুম, “আধ ঘন্টা বাদে আমরা খেতে বসব।”

গৌতমদের বাড়ি থেকে রওনা হবার পরেই ভাদুড়িমশাই একটু ঝিম মেরে গিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তিনি আর মুখ খোলেননি। দুপুরের খাওয়ার পর্ব বলতে গেলে প্রায় নিঃশব্দে সমাধা হল। একে তো আজ সদানন্দবাবুর মর্নিং ওয়াকটা হয়নি, তার উপরে আবার পরেশনাথ পাহাড়ের কাছের সেই ফাঁড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তার ধারের একটা দোকানে বসে জিলিপি আর কচুরি সহযোগে ব্রেকফাস্ট সারা ইস্তক ভদ্রলোক ঘোর অশান্তির মধ্যে রয়েছেন। কিন্তু গৌতমের কাছ থেকে এক দাগ করে কার্মোজাইম মিকশ্চার খেয়ে এলেই বুদ্ধির কাজ হত, এই মন্তব্যের পরেও ভাদুড়িমশাইয়ের কাছ থেকে কোনও উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া না-পাওয়ায় তাঁকে চুপ করে যেতে হয়। বুঝতে পারছিলুম, ভাদুড়িমশাই একটু অন্যমনস্ক। কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে ভাবছেন নিশ্চয়, নইলে এমন নির্বাক থাকতেন না।

উপরে এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করলুম, “কী ভাবছেন বলুন তো?”

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “কী আর ভাবব বলুন। যেখান থেকে চুরি হয়েছে, সেই দোতলায় মোট পাঁচজন লোক রাত্রিবাস করে। তার মধ্যে একজন তো বুডটি মৌসি। দু’জনকে নাকি প্রশ্ন করে কোনও লাভ হবে না, তারা অসুস্থ। বাকি রইলেন কর্তা-গিন্নি। তার মধ্যে কর্তাটি যে মিথ্যুক, সেটা ইতিমধ্যেই টের পেয়েছি। এখন যেমন দেবা, দেবীটিও যে সেইরকম হবেন না, তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই ভাবছি যে, কেসটা না নিলেই হত।”

“তা হলে নিলেন কেন?”

“নিতে হল এই জন্যে যে, বাঙ্গালোর থেকে সেদিন যিনি ফোন করেছিলেন তাঁর নাম জানকী দেবী।”

কিছুই বুঝতে পারলুম না। ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা বলতে তিনি ম্লান হেসে বললেন, “যতীন বাগচি রোডের ফ্ল্যাটে বসে এই যে সেদিন হিপনোটিজম নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন যে ফোনটা আসে, সেটা ব্যাঙ্গালোর থেকে এসেছিল ঠিকই, তবে আমাদের আপিস থেকে আসেনি, জানকী দেবী সরাসরি তাঁর ব্যাঙ্গালোরের বাড়ি থেকে ফোন করেছিলেন।”

বললুম, “চৌধুরিজির দিদিও ব্যাঙ্গালোরে থাকেন বলছিলেন না?”

এতক্ষণে হাসি ফুটল ভাদুড়িমশাইয়ের মুখে। বললেন, “যাক, বুদ্ধিটা তা হলে শেষপর্যন্ত খুলেছে। এই জানকী দেবীই হচ্ছেন চৌধুরি ব্রাদার্সের বড় বোন। মশাই, নিমগাছে কখনও আম ফলতে দেখেছেন?”

সদানন্দবাবু বললেন, “কী যে বলেন, তা-ই কখনও সম্ভব? তবে হ্যাঁ, মন্তর-টন্তর হলে অবশ্য আলাদা কথা।”

বললুম, “দেখুন মশাই, ইউ হ্যাভ এগেন বিন স্পিকিং ইন রিল্স। স্পষ্ট করে ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাচ্চলে, তা-ই তো বলছি, এর মধ্যে আবার রিডলটা দেখলেন কোথায়? নাহয় চোর-ডাকাত আর গুন্ডা-বদমাশের পিছন-পিছন ঘুরে বেড়াই। তাই বলে কি যৎসামান্য তুলনাও টানতে পারব না?”

“বুঝেছি।” আমি বললুম, “জানকী দেবী হচ্ছেন নিমগাছে আমফল। কেমন?”

“বিলক্ষণ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তুলনাটা যে কেন দিলুম, এবারে সেটা বুঝিয়ে বলি। ভদ্রমহিলা কার মেয়ে? না এমন এক জমিদার বাপের মেয়ে, লোক লাগিয়ে বাইজিকে খুন করিয়ে যে জেলে গিয়েছিল। কার বোন? না, তিন-তিনটে খুন করেও তাকে যে জেল খাটতে হয়নি, প্রথম সাক্ষাৎকারেই এই কথাটা যে কিনা বেশ জাঁক করে আমাদের বলেছে। বাকি দুটো ভাইয়ের একটা নাকি তেজারতি কারবার করে, আর অন্যটা আছে শেয়ার মার্কেটে। যদি শুনি যে, সে দুটোও জালিয়াত কিংবা দাঙ্গাবাজ, তবে আমি অবাক হব না। বরং জানকী দেবী যে এই পরিবারেরই মেয়ে, এই কথাটা আমি যত ভাবছি, তত অবাক হচ্ছি।”

বললুম, “হিরেডিটির উপরে এত জোর দিচ্ছেন কেন, ইনভায়রনমেন্ট বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। এ-সব পরিবারের মেয়েদের খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। জানকী দেবীরও হয়তো হয়েছিল। আর যে-পরিবারে হয়েছিল, সেখানকার পরিবেশ হয়তো এখানকার তুলনায় অনেক ভাল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার অনুমানের প্রথম দিকটা কারেক্ট। ভদ্রমহিলার নিজের মুখেই শুনেছি যে, বারো বছর বয়েসে তাঁর বিয়ে হয়। অনুমানের দ্বিতীয় দিকটা কিন্তু টোটালি ইনকারেক্ট। মেরঠের ওদিকে যে জমিদার বাড়িতে তাঁর বিয়ে হয়েছিল, সেখানকার পরিবেশ এখানকার চাইতেও খারাপ। রামাশ্রয় চৌধুরির যে নারীঘটিত দুর্বলতার জন্যে আমাদের সদানন্দবাবু তাঁকে ‘লুজ ক্যারেকটার’ আখ্যা দিয়েছেন, সেটা তো তাদের আছেই, তার উপরে আবার নারীনিগ্রহেও তাদের জুড়ি নেই। লিভার পচিয়ে তাঁর পতিদেবতা যখন মারা যান, জানকী দেবীর বয়স তখন তেত্রিশ-চৌত্রিশের বেশি হবে না। এদিকে রামাশ্রয়ও যে গোল্লায় যেতে বসেছে, ভদ্রমহিলা সে-খবর আগেই পেয়েছিলেন, স্বামীর শ্রাদ্ধশান্তি ঢুকে যাবার পরে আর তাই দেরি করেননি, এখানে এসে ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে তারপর তিনি মেরঠে ফেরেন। কিন্তু সেখানে আর তাঁর থাকা হয় না। ফিরে যাবার পরে মাত্র মাস তিনেকের মধ্যেই তাঁকে শ্বশুরবাড়ির আশ্রয় একেবারে চিরকালের মতো ছেড়ে আসতে হয়।”

“কেন?”

“যেহেতু তাঁকে বিষ খাইয়ে মারবার চেষ্টা হয়েছিল।”

সদানন্দবাবু আঁতকে উঠে বললেন, “অ্যাঁ, বিষ?”

আমি বললুম, “জমিজমার লোভে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পঁয়ত্রিশ বিঘের একটা আমবাগান আর গয়নাগাটির লোভে। জানকী দেবীর শ্বশুরমশাই ওই বাগানটা তাঁর নামে লিখে দিয়েছিলেন। তা ছাড়া বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া গয়নাগাটিও নেহাত কম নয়। ভদ্রমহিলা নিঃসন্তান। তাই ঠিক করেছিলেন, মেরঠে ফিরে বাগান আর গয়নাগাটি বিক্রি করে সেই টাকায় তিনি মেয়েদের জন্যে একটা ইশকুল করে দেবেন। দেওরদের সে-কথা বলেও থাকবেন। তা নইলে আর ভাবিজির লস্‌সিতে তারা বিষ মেশাবে কেন?”

বললুম, “এ সব কথা আপনি কোথায় শুনলেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “জানকী দেবীর কাছেই শুনেছি। বরাতজোরে সে-যাত্রা তিনি রক্ষা পেয়ে যান। লস্‌সি খেয়ে যে মাথা ঘুরছে, এটা বুঝবার পরে আর এক মুহূর্ত দেরি করেননি, তৎক্ষণাৎ নীচে নেমে রাস্তা থেকে একটা টাঙ্গা ধরে পড়িমরি হাসপাতালে ছোটেন। স্টম্যাক পাম্পের ব্যবস্থাটা সেখানে সঙ্গে-সঙ্গে হয়েছিল, তা নইলে আর ভদ্রমহিলাকে বাঁচতে হত না।”

সদানন্দবাবু বললেন, “মহীয়সী মহিলা!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কথাটা মোটেই হাল্কাভাবে বলবেন না মশাই। সত্যিই মহীয়সী। নিজের বলতে যা কিছু-ছিল, সব বেচে সেই টাকার একটা অংশ দিয়ে মেরঠের বস্তিপাড়ার মেয়েদের জন্য একটা ইশকুল খুললেন, আর বাকি টাকা দিয়ে গড়ে তুললেন একটা বৃত্তিশিক্ষার কেন্দ্র। গরিব মেয়েরা সেখানে গিয়ে নানারকম হাতের কাজ শেখে। বছর দশেক হল ব্যাঙ্গালোরেও ওই ধরনের একটা সেন্টার চলাচ্ছেন। জমিদার বাড়ির মেয়ে, জমিদার-বাড়ির বউ, অথচ যা কিছু করছেন, সব গরিব ঘরের মেয়ে-বউদের জন্যে। কথায় কথায় একদিন আমাকে বলেছিলেন যে, দুটো জিনিস মেয়েদের চাই-ই চাই। তাদের লেখাপড়াও করা চাই, আবার যা-হোক কিছু রোজগারও করা চাই। তা নইলে তাদের দাসত্ব কিছুতেই ঘুচবে না।”

জিজ্ঞেস করলুম, “ভদ্রমহিলার নিজের লেখাপড়া কদ্দুর?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সেটাই তো সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, কিরণবাবু। জানকী দেবীর বর্ণপরিচয়টা পর্যন্ত হয়নি, একেবারে টোটালি নিরক্ষর বলতে যা বোঝায়, তা-ই। সে-কথা গোপন করবার কোনও চেষ্টাও অবশ্য করেন না। প্রথম যেদিন আমার কাছে আসেন, খোলাখুলি বলেছিলেন যে, নিজের জীবনটা অন্ধকারের মধ্যে কেটেছে বলেই অন্ধকারের জ্বালাটা তিনি বুঝতে পারেন, আর তাই অন্যদের জীবন থেকে যতটা সম্ভব এটা না-ঘুচিয়ে তাঁর শান্তি নেই।”

“ভদ্রমহিলা ব্যাঙ্গালোরেই থাকেন?”

“কখনও ব্যাঙ্গালোরে থাকেন, কখনও মেরঠে। তবে টানা কোথাও বেশিদিন থাকেন না।”

“আপনার সঙ্গে পরিচয় হল কীভাবে?”

“খুব সহজেই হল। ব্যাঙ্গালোরে আমাদের আপিসটা তো দেখেছেন। তারই একতলায় এঁদের ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের কাজ চলছে। তা সে-কথা থাক। এখন একটা প্রশ্ন করি। এইরকমের একজন মহিলা যদি একটা কাজের দায়িত্ব নিতে বলেন, তা হলে সেটা না নিয়ে পারা যায়?”

সদানন্দবাবু বললেন, “অসম্ভব। অন্তত আমি হলে তো না-নিয়ে পারতুম না।”

একটা ব্যাপারে আমার একটু খটকা লাগছিল। জানকীদেবীর বিয়ে হয়েছিল মেরঠে। সুতরাং সেখানে যে তিনি ইশকুল আর ট্রেনিং সেন্টার খুলেছেন, সেটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু নতুন একটা ট্রেনিং সেন্টার খুলতে গিয়ে, এত জায়গা থাকতে হঠাৎ ব্যাঙ্গালোরকে বেছে নিলেন কেন? ওটা তো গিরিডিতেও খোলা যেত। ভাদুড়িমশাইকে এ নিয়ে প্রশ্ন করতে তিনি বললেন, “কারণটা আর কিছুই নয়। ব্যাঙ্গালোরের এক ইনডাস্ট্রিয়ালিস্টের মেরঠেও একটা কারখানা রয়েছে। কাজের সূত্রে মাঝে-মাঝেই তাঁকে তাই মেরঠে যেতে হত। একবার গিয়ে জানকী দেবীর ওই ট্রেনিং সেন্টারটা দেখে তিনি এত ইমপ্রেসড হন যে, সঙ্গে-সঙ্গে কথা দেন, ব্যাঙ্গালোরে যদি ওইরকমের একটা ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার খোলা হয় তো তার জন্যে যত টাকাই লাগুক তিনি দিয়ে দেবেন। ভদ্রলোক জমিও দেবেন বলেছিলেন। কিন্তু সেটার ব্যবস্থা আর করে যেতে পারেননি। টাকাটা দিয়েছিলেন। তারপর জমির দানপত্রের দলিল তৈরি হবার আগেই তিনি মারা যান।”

“সেন্টারের কাজকর্ম তাই ভাড়াবাড়িতে চালাতে হচ্ছে?”

“এখন তাই চালাতে হচ্ছে বটে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু খুব বেশিদিন আর চালাতে হবে না। তার কারণ, ওঁর কাজের ধরন দেখে সরকারও খুব বেশি। শুনলুম, সেন্টারের নামে খাসমহলের দশকাঠা জমি তাঁরা গিফট করে দিচ্ছেন। বাড়ি করবার জন্যে একটা মোটা অঙ্কের টাকাও নাকি পাওয়া যাবে। তা যদি পাওয়া যায়, তা হলে আর ভাড়াভাড়িতে সেন্টার চালাতে হবে কেন? আসলে, কথাটা কী জানেন কিরণবাবু, যেমন মেরঠে তেমন ব্যাঙ্গালোরেও সি ইজ আ ওয়াইডলি রেসপেকটেড লেডি। সবাই ওঁকে মান্যি করে, ভালবাসে। অ্যান্ড এভরিওয়ান ইজ সো ইগার টু ডু সামথিং ফর হার, অ্যান্ড আই’ম নো একসেপশন। আর তাই ফোন করে সেদিন যখন বললেন যে, ভাইটা বড্ড ঝঞ্ঝাটে পড়েছে মিস্টার ভাদুড়ি, আপনি ওর ব্যাপারটা একটু দেখুন, তখন আর ‘না’ বলতে পারলুম না।

বললুম, “কিন্তু ভাইটি যে কী চিজ, ভদ্রমহিলা কি তা জানেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “জানেন না এমন কথা আপনি ভাবছেন কেন? রামাশ্রয় চৌধুরিই তো কাল বললেন যে, দ্বিতীয় বিয়ের আগে পর্যন্ত তিনি যে খুব উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করতেন, ঠাকুর্দার আমলের বুড়ো মুনিম মুকুন্দবাবুই সে-কথা তাঁর বড়িদিদিকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।”

“কিন্তু ভাইয়ের প্রতি তাঁর টান তাতে কমেনি, কেমন?”

“কিছুমাত্র না। কমলে কি আর মেরঠ থেকে একেবারে সঙ্গে-সঙ্গেই তিনি এখানে ছুটে আসতেন? কিরণবাবু, এই কথাটা মনে রাখুন যে, জানকী দেবীর নিজেরও তখন সময় মোটেই ভাল যাচ্ছিল না। তার মাত্র অল্পকাল আগেই তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়ে গিয়েছে তাঁর দেওরদের চক্রান্ত। অথচ, ভাই যে উচ্ছন্নে যেতে বসেছে, এই খবর পাবামাত্র তিনি মেরঠ থেকে সেই যে এখানে চলে এলেন, নতুন করে আবার তাকে সংসারী না-করা পর্যন্ত এখান থেকে নড়লেন না। অন্য ভাইদের কথা জানি না, তবে রামাশ্রয় চৌধুরিকে যে তিনি সত্যিই খুব স্নেহ করেন, তাতে সন্দেহ নেই।”

সদানন্দবাবু বললেন, “আমি মশাই বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান, আমার ভাইও নেই, বোনও নেই, তাই ভাই-বোনের সম্পর্ক নিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। তবে পিঠোপিঠি ভাইবোনদের মধ্যে খুব যে একটা টানের সম্পর্ক থাকে, সে আমার ওয়াইফকে দেখেই বুঝতে পারি। কী বলব মশাই, আমার শালাটি অতি নচ্ছার, জামাইষষ্ঠী বলে যে একটা ব্যাপার আছে, শ্বশুরমশাই গত হবার পর থেকে সে তো ভুলেই গেচি, ও বাড়িতে গেলে এক কাপ চা পর্যন্ত অফার করে না, অথচ ভাইফোঁটার দিনে সেই হাড়কঞ্জুষ ভাইয়ের জন্যেই আমার ওয়াইফ তাঁর বেতো-শরীর নিয়ে এমন আহ্লাদ করে পঞ্চান্ন ব্যঞ্জন রাঁধতে বসে যান যে, রাগে আমার সর্বাঙ্গ একেবারে রি-রি করতে থাকে।”

আমি যে হাসি চাপতে না পেরে কাশতে শুরু করে দিয়েছি, ভাদুড়িমশাই সেটা বুঝতে পেরে বললেন, “হাসবেন না, কিরণবাবু, হাসবেন না। সদানন্দবাবু রেগে গিয়ে বলছেন বটে, কিন্তু কথাটা তাই বলে মিথ্যে নয়। ওই হচ্ছে বোনেদের স্বভাব। ভাইয়ের কোনও দোষই তাদের চোখে পড়ে না, পড়লেও সেটা তারা এক-কথায় ক্ষমা করে দেয়। জানকী দেবী যে রামাশ্রয়কে এত ভালবাসেন, তাঁর তাবৎ দোষের কথা জেনেও তাঁকে এত স্নেহ করেন, তার অবশ্য আরও একটা কারণ আছে। তাঁর তো মাত্র একটা ভাই নয়, তিনটে ভাই। কিন্তু আর দুটো-ভাই তো এখানে থাকে না। একজন থাকে গৌহাটিতে, একজন থাকে বোম্বাইয়ে। মহেশমুণ্ডায় থাকেন একমাত্র রামাশ্রয়। অর্থাৎ বাপের বাড়ির সঙ্গে জানকী দেবীর যে যোগসূত্র, তা এক রামাশ্রয়ই ধরে রেখেছেন। জানকী দেবীর তো শ্বশুরবাড়ি বলতে এখন আর কিছু নেই, তবে বাপের বাড়ি একটা আছে বটে। রামাশ্রয় সেই পিতৃগৃহের প্রতীক। বড়িদিদি তাঁকে ভাল না বেসে পারেন?”

বললুম, “তা তো বুঝতে পারছি, কিন্তু ভাইয়ের চরিত্র কি তাতে পুরোপুরি শুধরেছে?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “মনে তো হয় না। তবে ‘পঁচপাওন’ বছরের এই প্রৌঢ়টি যে তার দিদিকে এখনও একটু ভয় পান, সেটা ঠিক। সত্যি বলতে কী, যদ্দুর বুঝতে পারছি, তাতে মনে হয়, বুড়ো মুনিম মুকুন্দবাবুকেও রামাশ্রয় বিশেষ ঘাঁটাতে চান না।”

“কেন ঘাঁটাবেন? রামাশ্রয় খুব ভালই জানেন যে, দিদির সঙ্গে মুকুন্দবাবুর একটা লাইন রয়েছে। মুকুন্দবাবুই তো খত লিখে দিদিকে আনিয়ে রামাশ্রয় চৌধুরির ফূর্তিফার্তার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল।”

সদানন্দবাবু বললেন, “চৌধুরিজিকে তার জন্যে খুব আনহ্যাপি মনে হল মশাই। কথায় কথায় সেটা তো বলেও ফেললেন।”

জিজ্ঞেস করলুম, “কী বললেন?”

“বাঃ, ওই যে বললেন, মাইফেল বসিয়ে আর বাই নাচিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন বটে, তবে সেটাও খুব ‘নুকসানে’র জীবন ছিল না। কী, বলেননি এই কথা?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “শাবাশ সদানন্দবাবু, কথাটা আপনার মনে আছে দেখছি। তবে কথায়-কথায় কাল ওই যে একটা অকাজের কথা উঠে পড়েছিল সেটা মনে আছে?”

সদানন্দবাবু বললেন, “আছে বই কী।”

“কিন্তু অকাজটা কী সেটা জিজ্ঞেস করে আর উত্তর পাওয়া গেল না। তাতে মনে হয়, লোকটার ফূর্তিফার্তা করবার পুরনো অভ্যাসটা এখনও যায়নি। তবে কিনা এখন যা-কিছু করেন, লুকিয়ে চুরিয়ে করেন, প্রকাশ্যে আর সে-সব করবার সাহস নেই। অন্তত হুঁশিয়ার থাকেন যে, কথাটা আবার মুকুন্দবাবুর মারফতে না বড়িদিদির কানে পৌঁছে যায়।”

বললুম, “মুকুন্দবাবু কি জানেন যে, জানকী দেবীর অনুরোধেই আপনি এখানে এসেছেন, নইলে আসতেন না?”

“তা কী করে বলব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে জানাই সম্ভব। এদিকে আবার গৌতমের ধারণা, মুকুন্দবাবুকে একটু কালটিভেট করলে ভাল হয়। আমাদের কাজের তাতে কদ্দুর কী সুবিধে হবে, সেটা অবশ্য এখুনি বুঝতে পারছি না।”

সদানন্দবাবু বললেন, “লোকটাকে একটু বাজিয়ে দেখতে দোষ কী?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাজাতে যদি হয়ই, তবে আর দেরি করা ঠিক হবে না। আজ বিকেলের মধ্যেই লোকটির সঙ্গে একটু জমিয়ে নিতে হবে। কথাটা কেন বলছি, বুঝতে পারছেন?”

বললুম, “কেন?”

“কারণ এখন লাইন মোটামুটি ক্লিয়ার। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে, চৌধুরিজি হয় অসুস্থ কিংবা বাইরে গেছেন।”

“কী করে বুঝলেন?”

“আরে মশাই, একটার সময় আমরা ফিরেছি, আর এখন প্রায় চারটে বাজতে চলল। এই সময়ে তো তাঁর বাড়িতেই থাকবার কথা। অন্তত একবার এসে আমাদের খবর নেবারও কথা। তা তিনি নেননি। তাতে মনে হয়, চৌধুরিজি সম্ভবত অসুস্থ। কিংবা এমনও হতে পারে যে, তিনি বাড়িতেই নেই।”

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শেষ হতে না হতেই ঘরের মধ্যে ছায়া পড়ল। মুখ তুলে দেখি, মুকুন্দবাবু বড়ই কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে দরজার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখাচোখি হতে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “আসতে পারি?”

বললুম, “আসুন, আসুন। কী খবর?”

“হঠাৎ একটা কাজ পড়ল, তাই রাজাবাবুকে আসানসোল যেতে হয়েছে। আজ আর ফিরবেন না। কাজ মিটিয়ে কাল দুপুরবেলায় ফিরবেন। আপনাদের কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিন্দুমাত্র না। কিন্তু আজ বিকেলে যে মিসেস চৌধুরির সঙ্গে আমাদের দেখা করার কথা ছিল?”

“সেটা হবে।” মুকুন্দবাবু বললেন, “চৌধুরানি আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। আপনারা চা খান, আরাম করুন। বিকাল পাঁচটায় আমি এসে আপনাদের তাঁর কাছে নিয়ে যাব।”

মুকুন্দবাবু চলে যাবার পরে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চৌধুরিজি এঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, চুহা-মতন আদমি। ঠিকই বলেছিলেন। লোকটা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এল, অথচ পায়ের শব্দটা পর্যন্ত পেলুম না।”

সদানন্দবাবু বললেন, “কারেক্ট ডেসক্রিপশন। মুখখানা কীরকম ছুঁচলো দেখলেন? জাস্ট লাইক এ মাউস!”

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *