Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty » Page 17

রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty

মহেশমুণ্ডায় বলে এসেছি এ-বেলায় আর ফিরব না। এদিকে বেশ খিদে পেয়ে গিয়েছিল। মুলচাঁদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গৌতমদের বাড়িতে যাবার পথে একটা মিষ্টির দোকানে ঢুকে তাই কিছু পুরি ভাজিয়ে খেয়ে নেওয়া গেল। খেতে-খেতে সদানন্দবাবু বললেন, “কলকাতায় তো কাঁচকলা আর গাঁদাল পাতার ঝোলও হজম হতে চায় না, মশাই, অথচ এখানে যা খাচ্ছি, তা-ই দিব্যি হজম হয়ে যাচ্ছে।

গৌতমদের বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে দেড়টা বেজে গেল। চেম্বার বন্ধ করে গৌতম তখন দোতলায় উঠবার উপক্রম করছে। ভাদুড়িমশাইকে দেখে সিঁড়ির মাঝপথ থেকে নেমে এসে জিজ্ঞেস করল, “কাজ হল কিছু?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যতটা হবে ভেবেছিলুম, তার চেয়ে বেশিই হয়েছে। কিন্তু তোমার খবর কী? মহেশমুণ্ডায় গিয়েছিলে?”

“ওখান থেকে বেরিয়ে এসেই মহেশমুণ্ডায় গিয়েছিলুম। রিয়ার একটা সেট-ব্যাক হয়েছে মনে হল। প্রচণ্ড ডিপ্রেসড। এমন কী, আমার সঙ্গেও ভাল করে কথা বলল না। যা-কিছু জিজ্ঞেস করি, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। পাটনা কি কলকাতায় নিয়ে গিয়ে নাম-করা কোনও সাইকিয়াট্রিস্টকে দেখাতে পারলে ভাল হত।”

“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “চেম্বারটা খুলে দিয়ে তুমি দোতলায় গিয়ে বিশ্রাম নাও, আমি একটা ফোন করে তারপর উপরে যাচ্ছি।”

“কিন্তু আপনাদের তো যদ্দুর বুঝতে পারছি এখনও দুপুরের খাওয়া হয়নি।”

“না, না, আমরা খেয়ে নিয়েছি, ও নিয়ে ভেবো না।”

গৌতম আর কথা বাড়াল না। চেম্বারের দরজা খুলে দিয়ে দোতলায় উঠে গেল।

ভাদুড়িমশাই ডায়াল ঘুরিয়ে বোম্বাইয়ে ফোন করলেন। আবার সেই একতরফা কথাবার্তা। যেটুকু শুনলুম, এখানে তুলে দিচ্ছি। “দিস ইজ ফাইভ জিরো ডাবল এইট। রিপিট ফাইভ জিরো ডাবল এইট। আর কিছু খবর পাওয়া গেল?”

“হোয়াট? রেজিস্ট্রেশন ক্যানসেলড? ব্যাপার কী?”

“পুলিশ কোনও খোঁজই পাচ্ছে না? অ্যাবসকন্ডিং?”

“থ্যাঙ্কস। নাউ অ্যাবাউট দ্যাট কনভিকূট। তার কোনও খবর পেলে?”

“সামনের ডিসেম্বরে রিলিজ্ড হবার কথা, কিন্তু ফর গুড কনডাকট পুরো একটা বছর মকুব হয়ে গিয়ে গত ডিসেম্বরেই ছাড়া পেয়ে যায়, এই তো? ওয়েল, আই গেসড অ্যাজ মাচ। এখন আর-একটা খবর চাই।”
“না, এটা না-করে দিয়ে ছুটি পাচ্ছ না। ছুটিটা বরং এর পরে নাও। দিস ইজ এক্সট্রিমলি আর্জেন্ট। হাতের কাছে কাগজ পেন্সিল আছে?”
“লিখে নাও। রিয়া সিং। ডটার অব পীতাম্বর সিং অব বান্দ্রা। একটাই মাত্র খবর জানতে চাই, হোয়েদার শি ক্যান ড্রাইভ আ কার অর নট, আন্ড হোয়েদার শি হ্যাড আ লাইসেন্স ফর ড্রাইভিং। বম্বে.. পুলিশে এখন মোটর ভেহিক্স ডিপার্টমেন্টের চার্জে কে আছেন, জানো নিশ্চয়?”“লিখে নাও। রিয়া সিং। ডটার অব পীতাম্বর সিং অব বান্দ্রা। একটাই মাত্র খবর জানতে চাই, হোয়েদার শি ক্যান ড্রাইভ আ কার অর নট, আন্ড হোয়েদার শি হ্যাড আ লাইসেন্স ফর ড্রাইভিং। বম্বে.. পুলিশে এখন মোটর ভেহিক্স ডিপার্টমেন্টের চার্জে কে আছেন, জানো নিশ্চয়?”
“ওয়েল, দ্যাটস অল ফর টুডে। কাল সকালে তোমাকে ফোন করব। বিটুইন নাইন অ্যান্ড টেন। গুড লাক।”

রিসিভারটিকে ক্রেডলের উপরে নামিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বম্বে থেকে কী খবর আসবে, সেটা আন্দাজ করতে পারছি, তবে কিনা ব্যাপারটা এত সেনসিটিভ যে, একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিত হওয়া দরকার।”

বললুম, “খবর তো যা বুঝলুম কাল সকালেই পেয়ে যাচ্ছেন।”

“হ্যাঁ, যদি অবশ্য লাইনটা ঠিক থাকে। টেলিফোনের যা ব্যাপার। একটা অবশ্য সুবিধে আছে। কাল রবিবার। লাইন খুব একটা বিজি থাকবে না। …চলুন, উপরে যাওয়া যাক।”

দোতলায় ড্রইংরুমে গৌতম আমাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। আমরা গিয়ে ঢুকতে সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বলল, “বসুন বসুন। একটু চা দিতে বলি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা এখন এক কাপ চা পেলে মন্দ হয় না। সদানন্দবাবু, আপনার কি থার্ড কাপ হয়ে গেছে নাকি?”

সদানন্দবাবু বললেন, “এইটে হবে। এরপরে কিন্তু চা খেতে বলবেন না।”

কাজের লোকটিকে ডেকে চায়ের ফরমাশ দিয়ে গৌতম বলল, “তা আপনার কাজ কত দূর এগোল?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অঙ্কের উত্তর তো কালই পেয়ে গেছি। এখন ঠিকঠাক প্রসেসে সেটা লিখে ফেলতে হবে। এর মধ্যে একটাই শুধু মুশকিল হল। ভেবেছিলুম যে, এখানকার কাজ মিটিয়ে সোমবার সকালে কলকাতায় ফিরতে পারব। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না। ফিরতে-ফিরতে মঙ্গলবার হয়ে যাবে।”

বললুম, “অঙ্কের উত্তরটা আমাদের বলবেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অঙ্ক বলা যায়, ধাঁধাও বলা যায়। তা সেই ধাঁধাও আবার একটা নয়, দুটো। প্রথমটা হল অ্যাকসিডেন্টের ধাঁধা, আর দ্বিতীয়টা চুরির। …ওহে গৌতম, সোমবার রাত্তিরে তোমাদের এখান থেকেই খাওয়ার পাট চুকিয়ে নিয়ে দানাপুর এক্সপ্রেস ধরব ভাবছি, তা ফার্স্ট ক্লাসের তিনটে বার্থের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে তো?”

“খুব পারব,” গৌতম হেসে বলল, “রেলের লোকেদের কি অসুখ-বিসুখ হয় না নাকি? তাঁদের মধ্যেও আমার বিস্তর পেশেন্ট রয়েছে। সুতরাং নিশ্চিন্ত থাকুন।”

সদানন্দবাবু বললেন, “অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারটা কী বুঝলেন?”

“যেটুকু যা বুঝেছি, তা যে আপনি বুঝতে পারেননি, তাতে আমি খুব-একটা আশ্চর্য হচ্ছি না। “ ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর কিরণবাবুও যে ব্যাপারটা ধরতে পারবেন না, তা আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল।”

গৌতম বলল, “বুঝতে কিন্তু আমিও পারিনি, মেসোমশাই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটাই হচ্ছে দুঃখের কথা। কিরণবাবু না হয় ইদানীং একটি বাঁধাকপিতে পরিণত হয়েছেন, তাও ফ্রেশ বাঁধাকপি নন, চালানি মাল। কিন্তু তোমার তো এখনও ও-সব হবার বয়েস হয়নি, বাবা। তা হলে তোমার এই অবস্থা কেন? বলি, অগস্ট মাসে কোন গাড়িটার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল, সেটা জানো তো? নাকি তাও জানো না?”

গৌতম বলল, “তা কেন জানব না? সেই ফিয়াট গাড়িটা নিয়েই তো আপনারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন।”

“বাঃ, বেশ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “রোজ সেই গাড়িটা চালিয়ে আমরা তোমার এখানে আসছি, ফলে সেটা রোজই তোমার চোখে পড়ছে। কিন্তু মজা কী জানো, একটা ব্যাপার তবু তুমি খেয়াল করে দেখছ না।…সদানন্দবাবুর দোষ নেই, তাঁর শরীর মজবুত আছে ঠিকই, কিন্তু ছানি কাটাবার পরেও তিনি আর সেই আগের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাননি। আর কিরণবাবুর কথা যত কম বলা যায়, ততই ভাল। ওঁর অবস্থা হয়েছে সেই পুত্তলিকার মতো, যে কিনা চক্ষু থাকা সত্ত্বেও কিছু দেখতে পায় না। কিন্তু তোমার সম্পর্কে তো তেমন কথা বলা যাচ্ছে না। তুমি উঠতি বয়েসের চালাক-চতুর ছেলে, তোমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। অথচ গণ্ডগোলটা তুমিও দেখছি ধরতে পারোনি।”

বললুম, “ঠাট্টাবিদ্রূপ করবার সময় কি ফুরিয়ে যাচ্ছে ভাদুড়িমশাই? ফিরতি-ট্রেনে সারাটা পথ ও-সবের সময় পাবেন। গণ্ডগোলটা কোথায়, দয়া করে সেটা এখন একটু বুঝিয়ে বলুন দেখি।”

প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করলেন ভাদুড়িমশাই। ঠোটের ফাঁকে সেটাকে ঝুলিয়ে রেখে ধীরেসুস্থে তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন। নিঃশব্দে ধোঁয়া টানলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “প্রথম গণ্ডগোলটা যে কী, তা আমরা সবাই জানি। অ্যাকসিডেন্টের সময় আর জায়গা নিয়ে গণ্ডগোল। চৌধুরিজি বলছেন, অ্যাকসিডেন্টটা তেসরা সেপ্টেমবর ঘটেছে। কোথায় ঘটেছে? না হাইওয়ের উপরে। অথচ, গৌতম, মেজর ভার্মা আর মুকুন্দবাবুর বক্তব্য, এটা অগস্ট মাসে ঘটেছিল। আমার ধারণা, এঁদের কথাটাই সত্যি। একটা জায়গায় অবশ্য গৌতমের কথার সঙ্গে মুকুন্দবাবুর কথা মিলছে না। গৌতম বলছে, অ্যাকসিডেন্টটা অগস্টমাসের রাত্তিরে ঘটেছিল, আর মুকুন্দবাবু বলছেন, ঘটনাটা অগস্টমাসেই ঘটেছিল বটে, তবে রাত্তিরে নয়, বিকেলবেলায়।”

গৌতম বলল, “আমি শোনা কথা বলছি, মেসোমশাই। ঘটনাটা যে অগস্ট মাসের তাতে সন্দেহ নেই, তবে ঠিক কখন ঘটেছিল, আমার চেয়ে মুকুন্দবাবুই সেটা ভাল বলতে পারবেন। হতে পারে ওটা বিকেলেই ঘটেছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমারও তা-ই ধারণা। এখন প্রশ্ন, রাত্তিরেই হোক আর বিকেলেই হোক, অগস্টমাসের এই যে ঘটনা, এটা ঘটেছিল ঠিক কোন জায়গায়। চৌধুরিজি বলছেন, হাইওয়ের উপরে। কিন্তু ওখানে অমন কোনও অ্যাক্সিডেন্ট যে ওই সময়ে হয়েছিল, পুলিশের খাতায় তার কোনও উল্লেখই নেই। হতে পারে যে, ব্যাপারটা পুলিশের নজরে আসেনি। তারা নাকে সর্ষের তেল ঢেলে ঘুমোচ্ছিল। কিন্তু, পুলিশের নজরে না-এলেই যে এ-সব ব্যাপার চুকেবুকে যায়, তাও তো নয়। যিনি অ্যাগ্রিভড পার্টি, এ-সব ক্ষেত্রে তিনি নিজেই গরজ করে থানায় এসে নালিশ করে পুলিশের খাতায় ব্যাপারটাকে রেকর্ড করিয়ে রাখেন। এটা তিনি এই জন্যে করেন যে, পুলিশের খাতায় অ্যাকসিডেন্টের রেকর্ড না-থাকলে ইনসুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে কমপেনসেশন আদায় করা তো দূরের কথা, ওটা ক্লেম পর্যন্ত করা চলে না। চৌধুরিজির এটা না-জানবার কথা নয়। অথচ তা সত্ত্বেও তিনি পুলিশকে এই অ্যকসিডেন্টের কথাটা জানাননি।”

সদানন্দবাবু বললেন, “সেটা জানাননি পুলিশের উপর তাঁর কোনও বিশ্বাস নেই বলে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এদিকে আবার তিনি নিজেও খুব বিশ্বাসযোগ্য মানুষ নন। অ্যাকসিডেন্টটা কবে হয়েছিল তা নিয়ে কি তিনি আমাদের সত্যি কথা বলেছেন? বলেননি। তো আমার ধারণা, অ্যাকসিডেন্টটা কোথায় হয়েছিল, তা নিয়েও তিনি সত্যি কথা বলছেন না।”

বললুম, “ওটা কোথায় হয়েছিল বলে আপনার মনে হয়?”

ভাদুড়িমশাই এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, যেন আমাকে নয়, আমাকে ভেদ করে পিছনের দেওয়ালটাকে তিনি দেখছেন। তারপর চোখ নামিয়ে নিয়ে, অনেকটা আত্মগতভাবে আস্তে-আস্তে বললেন, “অ্যাকসিডেন্টটা সম্ভবত এমন কোনও জায়গায় হয়েছিল, যার কথা তিনি পুলিশকে জানাতে চান না।”

সদানন্দবাবুর একটা বিশেষত্ব এই যে, কোন্ কথাটা কোথায় বলা উচিত তা নিয়ে তিনি কোনও ভাবনাচিন্তার ধার ধারেন না, কিছু একটা তাঁর মনে হলেই হল, পটাং করে সেটা তাঁর বলা-ই চাই। ফলে যে-কথাটা আমিও ভাবছিলুম, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছিলুম না, দিব্যি সেটা তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল। বললেন, “বুঝতে পেরেছি, ও-সব ধানবাদ-ফানবাদ হাইওয়ে-টাইওয়ে বাজে কথা, ব্যাটা নিশ্চয়ই কুপল্লিতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট বাধিয়ে বসেছিল। যেমন বাপ, তেমনি ব্যাটা! দুটোই তো লুজ-ক্যারেকটার!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, না, কুপল্লি কেন, দুর্ঘটনাটা সুপল্লিতেও হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সে কথা আপাতত থাক। এবারে বরং গাড়িটার কথা ভাবুন।”

বললুম, “গাড়িটা নিয়ে কী ভাবব?”

“বাঃ, ভুলে গেলেন? গাড়ির ব্যাপারে একটা গণ্ডগোলের কথা বলছিলুম না?”

“কীসের গণ্ডগোল?”

“সেটা আপনাদের তিনজনের একজনেরও চোখে পড়েনি। কিন্তু গণ্ডগোল একটা রয়েছে।”

“বেশ তো, গণ্ডগোলটা কী, সেটা তা হলে বুঝিয়ে বলুন।”

“বলছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তার আগে গৌতমকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। ওহে গৌতম, অ্যাকসিডেন্টের খবরটা তো আমরা তোমার কাছেই প্রথম পেয়েছিলুম, তা তখন তুমি কী বলেছিলে?”

“চৌধুরিজির কাছে যা শুনেছিলুম, তা-ই বলেছি। হাইওয়ের উপরে একটা ট্রাকের সঙ্গে নাকি ধাক্কা লাগে।”

“কী রকম ধাক্কা?”

“ট্রাকটা উলটো দিক থেকে আসছিল। রঘুনন্দন সেটাকে কাটাতে গিয়েছিল, কিন্তু পারেনি। তাঁর গাড়ির চাকা স্কিড করে যায়।”

“যেতেই পারে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অগস্ট মাস। বৃষ্টি হয়েছিল নিশ্চয়। পিছল পথে চাকা স্কিড করল। ফলে লাগল ধাক্কা। ফলে হেড-অন কলিশন না হোক, গাড়ির সামনের দিকটা নিশ্চয় খুব ড্যামেজড হয়ে থাকবে।”

“তা তো হয়েছিলই।”

“ঠিক আছে। এবারে তার পরের ঘটনার কথা ভাবো। ভাঙা গাড়িটা চৌধুরিজি মেরামত করিয়ে নিলেন। যে-সব অংশ মেরামত করা হল, সেখানে রংও করিয়ে নিলেন নতুন করে। ভাগ্যিস শুধু সেখানেই ওই যাকে প্যাঁচ-ওয়ার্ক বলে, তা-ই করিয়েছিলেন, পুরো গাড়িটা রং করাননি। তা যদি করতেন, গণ্ডগোলটা তা হলে আমারও চোখে পড়ত না।”

বললুম, “কী বলতে চাইছেন, একটু পরিষ্কার করে বলুন তো।”

“বলতে চাইছি যে, ফিয়াট গাড়িটার সামনের দিকে রঙের প্যাচ-ওয়ার্ক আদৌ করা হয়নি। সেটা করা হয়েছে গাড়ির পিছন-দিকে। তার মানে গাড়িটা সামনের দিকে নয়, পিছনের দিকে ড্যামেজড হয়েছিল, ফলে সেই দিকটায় রিপেয়ার ওয়ার্ক করে তারপর রং ধরানো হয়। রং-মিস্ত্রির হাত খুব পাকা নয়, প্যাচ-ওয়ার্কের রংটাকে সে তাই গাড়ির বাদবাকি অংশের রঙের সঙ্গে ভাল করে মিলিয়ে দিতে পারেনি।”

“এটা আপনি প্রথম কখন বুঝতে পারেন?” প্রশ্নটা গৌতমের।

“বুধবার সকালেই ব্যাপারটা প্রথম আমার চোখে পড়ে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “চোখে পড়তেই সন্দেহ হয়, অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারটা আমাদের যা বলা হচ্ছে, তা সত্যি নয়। গাড়িটা সামনের দিকে ধাক্কা খায়নি, ধাক্কা খেয়েছে পিছনের দিকে।”

বললুম, “গাড়িটা অবশ্য সামনের দিকেও ইতিমধ্যে ধাক্কা খেয়েছে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা খাক না, যত খুশি থাক। গেস্ট হাউসের সামনে যেমন ধাক্কা মারা হল, তেমনি আজও আবার হয়তো কেউ সামনের দিক থেকে এটাকে আর-একটা ধাক্কা মারবে। মারুক, কিন্তু যেটা অগস্ট মাসে ঘটেছিল, তাতে যে এই ফিয়াট গাড়ি পিছনে ধাক্কা খেয়েছিল, সামনে নয়, তা তো আমি টের পেয়ে গেছি। এখন আর ধাক্কা মেরে এ-গাড়ির সামনের দিকটা তুবড়ে দিয়ে কোনও লাভ হবে না।”

গৌতম বলল, “অগস্টের সেই অ্যাকসিডেন্টে গাড়ির কোন দিকটা ড্যামেজড হয়েছিল, সামনের দিকটা, না পিছনের দিকটা, ডাজ ইট রিয়েলি মেক এনি ডিফারেন্স?”

“অফ কোর্স ইট ডাজ। কিন্তু সেই ডিফারেন্সটা যে কী, সেটাই ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।” আবার একটা সিগারেট ধরালেন ভাদুড়িমশাই। কিছুক্ষণ ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “একটা সম্ভাবনার কথা অবশ্য ভেবেছি। বাট হাউ ক্যান দ্যাট বি পসিবল। তা হলে তো মানুষের উপরে, তার স্নেহ মায়া প্রেম প্রীতি কোনও কিছুর উপরেই আর আস্থা রাখা চলে না।”

বললুম, “গেস্ট হাউসের সামনে ওই যে গাড়িতে একটা ধাক্কা লাগল, ওটা কিন্তু একটা জেনুইন অ্যাক্সিডেন্টও হতে পারে মশাই। পারে না?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ, তাও হতে পারে বই কী।….কিন্তু না, আর নয়। গৌতম, ক’টা বাজে দ্যাখো তো।”

“সাড়ে পাঁচটা।”

“ওরে বাবা, সাড়ে পাঁচটা? তা হলে তো উঠে পড়তে হচ্ছে। চলুন কিরণবাবু, রওনা হওয়া যাক।”

“বিকেলের চাটা খেয়ে যাবেন না মেসোমশাই?” গৌতম বলল, “কতক্ষণই বা লাগবে।”

“না হে, আজ আর বসছি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল সকালে তুমি তোমার পেশেন্টকে দেখতে আসছ তো?”

“সে তো রোজ সকালেই একবার গিয়ে দেখে আসতে হচ্ছে।”

“ভেরি গুড়, তা হলে একটা কাজ করো।” পকেট থেকে এক চিলতে কাগজ বার করে সেটা গৌতমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেই সময়ে ফাঁক বুঝে এটা ওর ঘরের মধ্যে ফেলে দিয়ো। শুধু খেয়াল রেখো, ব্যাপারটা যেন ও বুঝতে না পারে।”

“কী ব্যাপার বলুন তো?”

“ভয় নেই। নাথিং আন-এথিক্যাল। যা করা হচ্ছে, তা ওর ভালর জন্যেই করা হচ্ছে।”

নীচে নেমে গাড়িতে উঠে পড়লুম আমরা। স্টার্ট দেবার আগে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা করতে বলেছি, তা কিন্তু কোরো গৌতম। ঘরের মেঝের যে-কোনও জায়গায় কাগজের চিলতেটা ফেলে দিয়ো। ইট’স রিয়েলি ভেরি ইম্পট্যান্ট।”

এটা যে কাল রাতের সেই মেসেজ-লেখা কাগজের টুকরো, এক পলক দেখেই তা আমি বুঝতে পেরেছিলুম।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *