Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty » Page 13

রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty

মেজর ভার্মার বাড়িটি বড় নয়, কিন্তু দেখতে যেন টুরিস্ট ডিপার্টমেন্টের বিজ্ঞাপনের ছবির মতো। সামনে এক-ফালি লন, তার সবুজ ঘন ঘাস একেবারে সমান করে ছাঁটা। ফুলগাছের মধ্যে গোলাপই বেশি। বড় গাছ বলতে শুধু একটি গুম্মোর। কিন্তু গৃহকর্তার মিলিটারি মর্জির কথাটা তারও সম্ভবত অজানা নয়, ফলে উল্টোপাল্টাভাবে ডালপালা না ছড়িয়ে সেও দেখলুম সিধে উপরে উঠে গিয়ে তাঁর পত্রপল্লবকে একটি গোলপাতার ছাতার মতন সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ভাদুড়িমশাই যে বিনা নোটিসে হঠাৎ এইভাবে তাঁর বাড়িতে এসে হাজির হবেন, মেজর ভার্মার মুখচোখ দেখেই আন্দাজ করেছিলুম যে, এটা তিনি আশাই করেননি। বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা কেটে যাবার পরে এগিয়ে এসে ভাদুড়িমশাইয়ের পিঠে একটা বিশাল থাপ্পড় বসিয়ে সহাস্য জিজ্ঞাসা করলেন, “আরে চারু! কী ব্যাপার? হঠাৎ এদিকে? কোনও কাজ ছিল?”

“সব বলছি, সব।” ভাদুড়িমশাই পকেট থেকে এক চিলতে একটা কাগজ বার করে মেজর ভার্মার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “তার আগে এই নম্বরে বোম্বাইয়ে একটা পার্টিকুলার পার্সন কল বুক করো তো। তারপর তোমার বউকে বলো যে, অনেকদিন তাঁর হাতের রান্না খাওয়া হয়নি, আজ এখান থেকে দুপুরের খাওয়া না খেয়ে আমরা নড়ছি না।”

আমরা গিয়ে ড্রইংরুমে বসলুম। মেজর ভার্মা ফোন তুলে বোম্বাইয়ের কল বুক করলেন। বাইরের ঘরে কথাবার্তা শুনে মিসেস ভার্মাও ইতিমধ্যে ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। তিনি দেখলুম দারুশ খুশি। কাজের লোকটিকে ডেকে তক্ষুনি চায়ের ফরমাশ দিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “যাক, অ্যাদ্দিনে বাদে তা হলে আমাদের কথা মনে পড়ল।”

মেজর ভার্মা যে তাঁর বন্ধু, আর তাঁর সঙ্গেই যে তিনি দেখা করতে যাচ্ছেন, মধুপুরে আসবার পথে ভাদুড়িমশাই সে-কথা বলেছিলেন বটে, কিন্তু তার বেশি আর কিছুই বলেননি। এখন এঁদের কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারলুম যে, এঁরা তাঁর ব্যাঙ্গালোরের বন্ধু। কলকাতার পাট তুলে দিয়ে ভাদুড়িমশাই প্রথম যখন ব্যাঙ্গালোরে যান, তখনই এঁদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, তারপর মেজর ভার্মা যতদিন না রিটায়ার করে সেখান থেকে চলে আসেন, বন্ধুত্বের সম্পর্কটা ততদিন পর্যন্ত অটুট ছিল। চা খেতে-খেতে তো বটেই, দুপুরে খাবার টেবিলে বসেও দেখলুম পুরনো সেই দিনগুলি নিয়েই গল্প চলছে। ভাগ্যিস তারই মধ্যে বম্বের লাইনটা এসে গেল, তা নইলে বোধহয় আমাদের মধুপুর না-ছাড়া অব্দি ব্যাঙ্গালোরের গল্প শেষ হত না।

হাল-ফ্যাশানে খাবার ঘর আর বসবার ঘর বলে আলাদা কিছু নেই, একই ঘরের মাঝ বরাবর একটা পর্দা ঝুলিয়ে আর নয়তো কাঠের একটা হালকা ফোল্ডিং পার্টিশানের ব্যবস্থা করে একদিকে রাখা হয় খাবার ব্যবস্থা, অন্যদিকে বসবার। সোফা কাম বেডের মতো এ হল লিভিং কাম ডাইনিং। ফলে, খাবার টেবিল থেকে ড্রইং রুমে উঠে গিয়ে ভাদুড়িমশাই ফোন ধরলেন বটে, কিন্তু ফোনে তিনি যে নির্দেশ পাঠালেন, তা শুনতে কোনও অসুবিধেই আমার হল না। কয়েক মিনিট ধরে একতরফা যে কথা শুনলুম, তা এইরকম।

“দিস ইজ ফাইভ জিরো ডাবল এইট। রিপিট ফাইভ জিরো ডাবল এইট। একজনের সম্পর্কে কিছু খবর চাই।”

“বলছি। রঘুবীর চৌধুরি। শেয়ার কেনাবেচার কাজ করে।”

“হ্যাঁ। ব্রোকার হিসেবে মোটামুটি পরিচিত। আর্থিক অবস্থাটা জানা দরকার।”

“আরে না, সে-সব কিছু নয়। শেয়ার মার্কেটের হাড়হদ্দ জানে, এমন কিছু লোকের সঙ্গে তোমার পরিচয় নেই? জাস্ট গেট ইন টাচ উইথ দেম অ্যান্ড ট্রাই টু ডিগ আপ অ্যাজ ম্যাচ অ্যাজ ইউ ক্যান।”

“যত তাড়াতাড়ি পারো। হয় আজ রাত্তিরেই ফের ফোন করব, কিংবা কাল সকালে। গুড লাক।” কথা শেষ হয়ে গিয়েছিল। রিসিভারটা ক্রেডলের উপরে নামিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাই খাবার টেবিলে ফিরে এলেন। মেজর ভার্মা ডাক্তার বটে, কিন্তু ক্যান্টনমেন্টের কেতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন, সুতরাং উপর পড়া হয়ে কিছু জিজ্ঞেস করা তাঁর স্বভাবে নেই। তাঁর গিন্নি অবশ্য অতসব কেতার ধার ধারেন না। তাই চিনামাটির বৌল থেকে ভাদুড়িমশাইয়ের প্লেটে চামচ দিয়ে দু’টুকরো মাংস তুলে দিতে-দিতে তিনি বললেন, “ব্যাপার কী বলুন তো মিঃ ভাদুড়ি? বললেন তো ছুটি কাটাবার জন্যে গিরিডিতে এসেছেন, কিন্তু এই নাকি তার নমুনা? নিশ্চয় কোনও ঘোরালো ব্যাপার। তাই না?”

“তা আমি কী করে বলব?”

“বা রে, আপনি বলবেন না তো কে বলবে?”

“আপনার কর্তা হয়তো বলতে পারেন।” ভাদুড়িমশাই মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে মেজর ভার্মাার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওহে অজয়, তোমার গিন্নির কাছ থেকে তো কিছুই লুকিয়ে রাখবার জো নেই, আমি যে এদিকে একটা কাজ নিয়ে এসেছি, তা উনি ঠিক ধরে ফেলেছেন। জিজ্ঞেস করছেন কাজটা ঘোরালো কি না। তা তোমার কী মনে হয়?”

মেজর ভার্মা মাংস শেষ করে দইয়ের বাটি টেনে নিয়েছিলেন। সেই অবস্থায়, মুখ না তুলেই বললেন, “আমার আবার কী মনে হবে। আমি তো কিছুই জানি না।”

“ওরে ভাই, জানাব বলেই তো এসেছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে তোমার সবটা জানবার দরকার নেই, খানিক-খানিক জানলেই চলবে। এদিকে তোমার ক’বছর হল?”

“এই ধরো বছর দশেক।”

“এর মধ্যে রামাশ্রয় চৌধুরি বলে কারও সম্পর্কে কিছু শুনেছ?”

মেজর ভার্মা চামচে করে যে দই তুলেছিলেন সেটা আর মুখ পর্যন্ত উঠল না, চামচটাকে আবার বাটির মধ্যে নামিয়ে রেখে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “রামাশ্রয় চৌধুরি? ইউ মিন মহেশমুণ্ডার…।”

“হ্যাঁ,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মহেশমুণ্ডার ল্যান্ডলর্ড কাম বিজনেসম্যান। কিছু শুনেছ তাঁর সম্পর্কে?”

“না শুনে উপায় আছে? কেন, তাঁর হয়ে কোনও কাজ করতে এসেছ নাকি?”

“তাতে তোমার আপত্তি আছে?”

মেজর ভার্মা তক্ষুনি কিছু বললেন না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আমি কেন আপত্তি করব? ইট্স অল আপ টু ইউ। তবে বন্ধু হিসেবে তোমাকে আমার সতর্ক করে দেওয়া দরকার। জাস্ট ওয়াচ আউট। লোকটার বিশেষ সুনাম নেই।”

মনে পড়ল গিরিডির এস.পি. সুরেশ প্রসাদও এই একই কথা বলেছিলেন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “দ্যাখো অজয়, আমি ইনভেস্টিগেশানের কাজ করি। আমার মক্কেলরা সবাই ধর্মপুত্তুর হবে, এতটা আশা করা ঠিক নয়। তা আমি করিও না। আর তা ছাড়া, চৌধুরিজিই যে আমার মক্কেল, তা-ই বা আমি বলতে পারছি কোথায়। তবে হ্যাঁ, আছি আপাতত তাঁর বাড়িতে, অন্নগ্রহণও তাঁর করছি, কিন্তু তাঁর যেটা প্রবলেম তার যে কোনও সুরাহা করে উঠতে পারব, এমন আমার মনে হয় না।”

খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। মিসেস ভার্মা বললেন, “আপনারা বরং ওদিকে গিয়ে বসুন। কফি দেব তো?”

সদানন্দবাবু বললেন, “এঁরা খেতে পারেন, আমি খাব না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার জন্যে ব্ল্যাক কফি, সম্ভবত কিরণবাবুর জন্যেও তাই। অজয় তোমার?”

মেজর ভার্মা বললেন, “নলিনী জানে, আমি দুধ-চিনি ছাড়া কফি খাই না। কিন্তু চলো, ওদিকে গিয়ে গল্প করা যাক।”

ডাইনিং টেবিল থেকে উঠে আমরা পার্টিশানের অন্য দিকে ড্রইং রুমে চলে এলুম। মেজর ভার্মা একটা সিগার ধরলেন। তারপর বললেন, “চারু, ইউ আর আ গ্রেট ট্রাবল শুটার। কিন্তু তোমার কথা শুনে হচ্ছে যে, এক্ষেত্রে তুমি একটা অসুবিধের মধ্যে পড়ে গেছ। সেটা কী?”

“অসুবিধে আর কিছুই নয়,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা নিয়ে আমাকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে, উপর-উপর দেখতে গেলে সেটা বার্গলারির ব্যাপার। বাট দ্যাট’স ওনলি দ্য টিপ অব অ্যান আইসবার্গ। রহস্যের চোদ্দো আনা রয়েছে জলের তলায়।”

“এ-কথা কেন বলছ?”

“কয়েকটা লক্ষণ চোখে পড়েছে। তার সূত্র ধরে এগোনো দরকার। কিন্তু এগোতে খুব একটা ভরসা পাচ্ছি না।”

“কেন?”

কফি এসে গিয়েছিল। ট্রে থেকে কালো কফির একটা পেয়ালা তুলে নিয়ে ভাদুড়িমশাই খুব আলতো করে তাতে চমুক দিলেন। তারপর পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে বললেন, “মনে হচ্ছে, এটা নেহাতই একটা বার্গলারির ব্যাপার নয়, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়তে পারে।”

মেজর ভার্মা অবাক হয়ে বললেন, “সাপ তো আগেও কতবার বেরিয়েছে। কই, তখন তো তুমি এমন ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওনি।”

“বাঃ, বুড়ো হচ্ছি না?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বয়স কি কম হল নাকি? এখন যদি না ভয় পাই, তো আর কবে পাব?”

শুনে মেজর ভার্মার মুখে খানিকক্ষণ কোনও কথাই সরল না। তারপর হো-হো করে তিনি হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে চেঁচিয়ে ডাকলেন তাঁর স্ত্রীকে। “নলিনী, নলিনী, উড ইউ মাইন্ড কামিং হিয়ার ফর আ মিনিট?”

পাশের ঘর থেকে মিসেস ভার্মা ছুটে এসে বললেন, “কী ব্যাপার?”

মেজর ভার্মার হাসি তখনও থামেনি। বললেন, “সারপ্রাইজ সারপ্রাইজ। ইভন আওয়ার চারু হ্যাজ স্টার্টেড গ্রোইং ওলড!”

মিসেস ভার্মা ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সত্যি?”

মেজর ভার্মা বললেন, “শুধু যে বুড়ো হচ্ছে, তা নয়, আমরা তো জানতুম যে, অন্তত এই একটা লোকের ভয়ডর বলে কিছু নেই, তো আজকাল নাকি ও ভয়ও পাচ্ছে!”

মিসেস ভার্মা বললেন, “তা-ই নাকি মিঃ ভাদুড়ি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুড়ো হচ্ছি ঠিকই। তা নইলে আর পাঁচ মাইল জগিং করেই হাঁপিয়ে পড়ব কেন? আর হ্যাঁ, একটু-আধটু ভয়ও পাচ্ছি আজকাল। অন্তত মহেশমুণ্ডার এই কেসটা যে একটু ভয় ধরিয়ে দিয়েছে, সেটা অস্বীকার করব না। ভয়টা অবশ্য আমার নিজের জন্যে নয়।”

“তা হলে কার জন্যে?” প্রশ্নটা মেজর ভার্মার।

“আমার ক্লায়েন্টের জন্যে।”

“অর্থাৎ রামাশ্রয় চৌধুরির জন্যে, কেমন?”

“না, এই তদন্তের কাজে রামাশ্রয় চৌধুরি আমাকে লাগাননি। তিনি লাগালে তাঁর জন্যে ভয় পাওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারত।”

“তা হলে কে লাগিয়েছেন?”

“জানকী দেবীর কথা মনে পড়ে অজয়?”

“হুইচ জানকী দেবী?” ভুরু কুঁচকে মেজর ভার্মা জিজ্ঞেস করলেন, “আওয়ার জানকী দেবী অব ব্যাঙ্গালোর?”

“বাঃ, মনে আছে দেখছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তিনিই আমাকে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। আর ওই যে ভয়ের কথা হচ্ছিল, সেটাও তাঁরই জন্যে। তুমি বোধ হয় জানো না, অজয়, রামাশ্রয় চৌধুরির তিনি দিদি।”

মেজর ভার্মা বললেন, “বটে? তা তাঁর জন্যেই বা তোমার ভয়টা কীসের?”

“তাও তো বলেছি। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে পড়ার ভয়। যদি একটা ফ্যামিলি স্ক্যান্ডাল বেরিয়ে পড়ে, তিনি না অস্বস্তিতে পড়ে যান। রামাশ্রয় চৌধুরি তো দু’কান কাটা লোক। তাঁর সুনাম নেই যে, দুর্নামের ভয় থাকবে। কিন্তু জানকী দেবীর সম্পর্কে তো তেমন কথা বলা যাচ্ছে না। ভদ্রমহিলার দেওররা তাঁকে বিষ খাইয়ে মারবার চেষ্টা করেছিল। তারপর থেকে তাঁর শ্বশুরবাড়ি বলতে কিছু নেই। এদিকে বাপের বাড়ির ছবিটাও বিশেষ উজ্জ্বল নয়। বাইজিকে খুন করিয়ে বাপকে জেলে যেতে হয়েছিল, সেই জেলের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। এদিকে ভাই তো প্রকাশ্যেই বলে বেড়ায় যে, সে তিন-তিনটে খুন করেছে, কিন্তু এঁদে ব্যারিস্টার লাগিয়েছিল বলে আইন তাকে ছুঁতে পারেনি। তা এইরকমের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে যে ভদ্রমহিলা মাথা উঁচু করে বেরিয়ে এসেছেন, নিজের কাজের ভিতর দিয়ে গড়ে তুলেছেন একটা অন্য রকমের ইমেজ, তাঁর কথাটা আমাকে একবার ভেবে দেখতে হবে না?”

মেজর ভার্মার সিগার নিবে গিয়েছিল। নতুন করে তিনি আবার তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন। চুপচাপ সিগার টানলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “দ্যাখো চারু, তোমাকে আমি অনেক কাল ধরে চিনি। আমার ধারণা, যেটা সত্য, সেটাই তুমি খুঁজে বার করতে চেষ্টা করো। সত্য যে সব সময়ে প্রিয় হয় না, তাও তোমার খুব ভালই জানা আছে। এ-ক্ষেত্রে হয়তো হবে না। কিছু মানুষ, যাদের তুমি ভালবাসো, শ্রদ্ধা করো, দে মে গেট হার্ট। কিন্তু তাই বলে যদি তুমি পিছিয়ে যাও তো নিজের কাছেই তুমি ছোট হয়ে যাবে। আর তা ছাড়া, যতই অপ্রিয় হোক, যা সত্য, জানকী দেবী যে সেটাকে সহজভাবে নিতে পারবেন না, এটাই বা তুমি ভাবছ কেন?”

মিসেস ভার্মা বললেন, “ইউ বেটার ডু ওয়ান থিং, মিঃ ভাদুড়ি। জানকী দেবীকে একটা ফোন করে বলুন যে, আপনার ইনভেস্টিগেশানের ফলে হয়তো এমন দু-একটা তথ্য বেরিয়ে পড়তে পারে, যা কারও পক্ষেই খুব স্বস্তিজনক হবে না। অ্যান্ড দেন লেট হার ডিসাইড হোয়েদার ইউ শুভ কনটিনিউ অর নট।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “অমন তথ্য যে বেরিয়ে পড়বেই, তা কিন্তু আমি বলিনি।”

“বাট দেয়ার ইজ আ পসিবিলিটি, অ্যান্ড আ ডিসটিংক্ট ওয়ান অ্যাট দ্যাট। ঠিক বলছি?”

“তা ঠিক। সম্ভাবনা একটা আছেই।”

“তা হলে ফোন করে ওঁকে সেটা জানিয়ে রাখাই ভাল।”

“নলিনী ঠিকই বলছে, চারু।” মেজর ভার্মা বললেন, “জানকী দেবীর বাঙ্গালোরের ফোন-নম্বরটা তোমার কাছে থাকে তো দাও। লাইন যে পাবই, তা বলছি না, তবে একটা চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে কী কাণ্ড, অত ব্যস্ত হবার কিছু নেই। ফোন অবশ্য একটা করতেই হবে, মিসেস ভার্মা সেটা ঠিক কথাই বলেছেন, তবে এখন নয়, রাত্তিরের দিকে একবার চেষ্টা করে দেখব। …আর হ্যাঁ, তুমিও ভুল বলোনি অজয়, এখন যদি পিছিয়ে যাই তো নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাব। যা-ই হোক, সেটা পরের কথা। ভদ্রমহিলা কী বলেন, আগে তো সেটা দেখা যাক।”

মেজর ভার্মা বললেন, “আমার বিশ্বাস জানকী দেবী তোমাকে তদন্ত চালিয়ে যেতে বলবেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওহো, একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, রামাশ্রয় চৌধুরির ছেলে রঘুনন্দনকে তুমি চেনো?”

“পরিচয় নেই,” মেজর ভার্মা বললেন, “তবে নাম শুনেছি। এও শুনেছি যে, কী একটা অ্যাকসিডেন্ট করে নাকি মাস-তিনেক হল শয্যাশায়ী হয়ে আছে। ছোট জায়গা তো, সবই কানে আসে।”

‘কী রকমের অ্যাকসিডেন্ট, কেউ কিছু বলেছে?”

“তাও বলেছে বই কী। রাত্তিরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিল, হাইওয়ের উপরে একটা ট্রাকের সঙ্গে হেড-অন কলিশন হয়। মরেই যেত। বরাতজোরে বেঁচে গেছে। চিকিৎসাটা অবশ্য ঠিকমতো হয়নি।”

“এ-কথা কেন বলছ?”

মেজর ভার্মা হেসে বললেন, “তুমি ভাবছ আমাকে কল দেয়নি বলে বলছি? না চারু, তা নয় আমি এখন আর অপারেশন করি না। কিন্তু পাটনায় তো নাম-করা সার্জনের কিছু অভাব নেই, সেখান থেকে কাউকে আনিয়ে নিল না কেন? তা ছাড়া গিরিডিতে গৌতম লাহিড়ি রয়েছে, বয়েস কম হলেও তার হাত খুব পরিষ্কার। তা শুনছি তাকেও নাকি ডাকেনি।”

“তা হলে কাকে দিয়ে অপারেশন করাল?”

“সেটাই তো স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার!” মেজর ভার্মা বললেন, “বড়লোকের একমাত্র সন্তান, অর্থবল লোকবল কোনওটারই কিছু অভাব নেই, অথচ একটা হাতুড়ে ডাক্তারকে দিয়ে অপারেশন করানো হয়েছে।”

“এটা কবেকার ঘটনা?”

মেজর ভার্মা একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “যদ্দুর মনে পড়ছে, অগস্ট মাসের। ফার্স্ট উইক অব অগস্ট, টু বি মোর প্রিসাইজ। এটা এইজন্যে বলতে পারলুম যে, অগস্টের আট তারিখ থেকে বাদবাকি মাসটা আমি মধুপুরে ছিলুম না। আমি আর নলিনী ওই সময়টা আমাদের বড় ছেলের কাছে দিল্লিতে ছিলুম।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাস, আজ আর কিছু জিজ্ঞেস করবার নেই। থ্যাঙ্কিউ ফর এভরিথিং। তিনটে বেজে গেছে, এবারে উঠতে হবে।”

সদানন্দবাবু বললেন, “অ্যাঁ, এখুনি উঠবেন? তিনটের সময় যে আমি এককাপ চা খাই মশাই। সেটা এখান থেকেই খেয়ে গেলে হত না?”

মিসেস ভার্মা বললেন, “আরে কী কাণ্ড। বসুন, বসুন, চা খেয়ে তবে উঠবেন।”

চা খেয়ে উঠতে-উঠতে সাড়ে তিনটে বাজল। গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সদানন্দবাবুর এই একটা মস্ত গুণ দেখছি যে, দরকারের কথা জানাতে কোনও সংকোচ বোধ করেন না।”

সদানন্দবাবু একগাল হেসে বললেন, “বাঃ, উনি তো আপনার বুজুম ফ্রেন্ড। তা হলে আবার সংকোচ হবে কেন?”

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *