রাত তখন তিনটে
রামাশ্রয় চৌধুরির গায়ের রং তামাটে। এককালে সম্ভবত গোধূমবর্ণের পুরুষ ছিলেন, রোদে জ্বলে গিয়ে সেটাই এখন তাম্রবর্ণে পরিণত হয়েছে। দৈর্ঘ্য ছ’ ফুটের কম হবে না, দু’এক ইঞ্চি বেশি হওয়াই সম্ভব। মাথায় কদমছাট সাদা চুল। নাকের নীচে ধপধপে সাদা কাবলি বেড়ালের লেজের ডগার মতো বেশ পুষ্ট একজোড়া গোঁফ। দেখলেই হাত বোলাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু চোখের দিকে নজর পড়বামাত্র ইচ্ছেটা উবে যায়। এই বয়সের মানুষের এমন ঝকঝকে, কঠিন ও ধারালো চোখ বড়-একটা দেখা যায় না। শরীরে মেদ নেই, হাড়গোড় দিয়ে বেশ মস্ত একটা কাঠোমো বানিয়ে যৎসামান্য মাংস ও চামড়া দিয়ে সেটাকে ঢেকে দিলে যেমন দেখাবে, সেই রকমের চেহারা। তবে গাড়ি থেকে নেমে যে-রকম সটান ভঙ্গিতে গেস্ট-হাউসের বারান্দায় উঠে এলেন, তাতে বুঝলুম, কাঠামোটায় এখনও ঘুণ ধরেনি, সেটা বেশ মজবুতই রয়েছে।
খয়া চেহারার লোকটিও তাঁর সঙ্গে বারান্দায় উঠে এসেছিল। তার হাত থেকে লাঠি ও পানের ডিবে নিয়ে রামাশ্রয় চৌধুরি বললেন, “এবারে তোমরা যেতে পারো। এখন দশটা বাজে। বারোটার আগে আর এদিকে আসবার দরকার নেই। একটা গাড়িতে তো হবে না, তখন আর-একটা গাড়ি নিয়ে এসো। আব যাও।”
যতক্ষণ না গাড়িটা গেস্ট হাউসের গেট পার হয়ে বেরিয়ে গেল, ততক্ষণ একেবারে একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন রামাশ্রয় চৌধুরি। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “লোক চিনতে আমার সাধারণত ভুল হয় না। আপনিই তো মিঃ ভাদুড়ি?”
“হ্যাঁ।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “লোক চিনতে এবারও আপনার ভুল হয়নি। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে তো কথা হবে না, চৌধুরিজি, ভিতরে আসুন।”
সবাই এসে ড্রইং রুমে বসা গেল। ডিবে খুলে একটা পানের খিলি মুখে পুরে রামাশ্রয় চৌধুরি বললেন, “আপনাকে তো চিনতে পারলুম, মিস্টার ভাদুড়ি। কিন্তু…” বাঁ হাতের তর্জনীটা আমাদের দিকে তুলে, “এঁরা কারা?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার বন্ধু। আপনার বাঁ-দিকের সোফায় যিনি বসে আছেন, তিনি মিস্টার কিরণ চ্যাটার্জি, জার্নালিস্ট। ওই মানে আপনারা যাঁদের পত্রকার বলেন। আর তাঁর বাঁ-দিকের সোফায় যাঁকে দেখছেন, তিনি হলেন…”
বাক্যটা শেষ হবার আগেই সদানন্দবাবু বললেন, “আমি সদানন্দ বসু। জেঙ্কিনস অ্যান্ড জেঙ্কিনস কোম্পানির শিপিং ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতুম, এখন রিটায়ার করেছি। মিস্টার চ্যাটার্জি আমার নেবার। মিস্টার ভাদুড়িও আমাকে খুব ভালবাসেন। কী বলব স্যার, উনি একটা মার্ডার-কেস থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।”
রামাশ্রয় চৌধুরির ধারালো চোখে অল্প-একটু কৌতুকের হাসি যে মাত্র এক লহমার জন্যে ফুটেই আবার মিলিয়ে গেল, সেটা লক্ষ করেছিলুম। গম্ভীর গলায় সদানন্দবাবুকে তিনি বললেন, “বাস বাস, ওতেই হবে। তা মার্ডারটা কি আপনি সত্যি করেছিলেন নাকি?”
“অ্যাঁ, মার্ডার?” সদানন্দবাবু আঁতকে উঠে বললেন, “না, না, আমি কাউকে মার্ডার করিনি। ও একটা মিথ্যে মামলা!”
“তবে আর মিস্টার ভাদুড়ির ক্রেডিট কী? আমি কিন্তু খুন করেছি।”
“অ্যাঁ, খুন করেছেন? মানে মার্ডার? বলেন কী?”
“হ্যাঁ, সচ বাত। আপনি অবাক হচ্ছেন কেন? সম্পত্তি রাখতে গেলে খুন-জখম করতে হয়। আমিও করেছি। একটা নয়, তিনটে। তাও আমার ফাঁসি হল না, জেলও হল না। গুপ্তাসাব আমাকে ছাড়িয়ে আনলেন। আদালতে প্রমাণ করে ছাড়লেন যে, খুনটা যখন হয়, আমি তখন ডেহরি-অন-শোনে আমার ভাতিজার বাড়িতে ছিলুম। তো সেইটা হল ক্রেডিট।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তা হলে আর এ-যাত্রায় আমাকে ডাকলেন কেন? গুপ্তাসাবকে ডাকলেই তো হত।”
চৌধুরিজি একটুও বিব্রত হলেন না। বললেন, “এটা যদি মার্ডার কেস হত, তো গুপ্তাসাবকেই ডাকতুম। ওই রকমের জবরদস্ত ক্রিমিন্যাল লইয়ার তো দুটা মিলবে না। কিন্তু, ভাদুড়িসাব, এটা মার্ডার-কেস নয়, এটা দুসরা কিসিমের প্রবলেম।”
“আপনার ধারণা, এটা আমি সল্ভ করতে পারব?”
“তাও আমি জানি না। আমার বড়ি দিদি জানে। সে-ই আমাকে জানাল, আপনি গিরিডিতে আসতে রাজি হয়েছেন। তবে কবে আসবেন, কোথায় উঠবেন, সে-সব জানায়নি। সেটা কাল রাত্তিরে জানলুম। একটা ফোন এল, তাতে আমাকে বলা হল, আমি যদি আজ সকাল দশটায় এখানে আসি তো আপনার সঙ্গে দেখা হবে। তো ব্যস্, আমি চলে এলুম।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি এসেছেন, দেখাও হল, এবারে বলুন প্রবলেমটা কী!”
রামাশ্রয় চৌধুরি তাঁর ডিবে থেকে আর-একটা খিলি মুখের মধ্যে চালান করলেন। চোখ বুজে সেটা চিবোলেন কিছুক্ষণ; তারপর চোখ খুলে, ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু বাঁ হাতের তর্জনীটাকে ঠিক সেই আগের মতোই আমাদের দিকে নির্দেশ করে বললেন, “সেটা কি এঁদের সামনে বলা ঠিক হবে?”
বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে সদানন্দবাবুর পাঁজরে একটা খোঁচা মেরেছিলুম। তাতে তিনি চমকে উঠে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী হল, মশাই, খোঁচা মারলেন কেন?” অর্থাৎ ইঙ্গিতটা ধরতে পারলেন না। অগত্যা আমি সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বললুম, “আপনারা কথা বলুন, ভাদুড়িমশাই, আমার একটু কাজ আছে, ঘরে গিয়ে ততক্ষণে বরং কাজটা সেরে নিচ্ছি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিচ্ছু কাজ নেই। যেখানে আপনি বসে আছেন সেইখানেই আপনি বসে থাকুন।…সদানন্দবাবু, আপনাকেও উঠে যেতে হবে না।” তারপর রামাশ্রয় চৌধুরির দিকে তাকিয়ে বললেন, “চৌধুরিজি, আপনার কেসটা আমি এখনও হাতে নিইনি। তার আগে কয়েকটা কথা আপনার জানা দরকার। এঁরা দুজনেই আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমাকে যা বলতে চান, তা এঁদের সামনেই স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন। তা যদি বলেন, একমাত্র তা হলেই আপনার কেসটা আমি নেব।”
রামাশ্রয় চৌধুরির চোখে কি সেই কৌতুকের হাসিটা এক লহমার জন্যে আবার ঝিলিক দিয়ে গেল? ভাদুড়িমশাইয়ের চোখে চোখ রেখে তিনি বললেন, “অগর হাম্ নেহি বোলেঙ্গে তো…”
“তো আপকো ওয়াপস যানে পড়েগা। আপনার কেসটা আমি নেব না।”
চৌধুরিজি এবার স্পষ্ট হাসলেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মাফ কিজিয়েগা চাটার্জিসাব, মাফ কিজিয়েগা বোসসাব, আপনারা বসুন। আপনাদের উঠতে হবে না। আপনারা যখন ভাদুড়িসাবের বন্ধু, তখন আমার ভি বন্ধু। তো ঠিক আছে, যা বলবার, সেটা আপনাদের সামনেই বলছি। তা এখন শুধু আমাদের বাড়ির লোকজনদের কথাটা জানাই। যেটা প্রবলেম, সেটা পরে আরও সময় নিয়ে বলা যাবে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “পরে মানে কখন?”
“বিকেলবেলায়। আমাদের বাড়িতে বসে। বারোটার সময় গাড়ি আসতে বললুম, তখন আপনাদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে যাব।”
“কেন, এখানেই তো দিব্যি আছি।”
“খারাপ আছেন, তা কি আমি বলেছি? সোফা আছে, পালং আছে, বিস্তারা ভি গদিবালা আছে, কামরা ভি ঠান্ডা আছে, খারাপ কেন থাকবেন? তোফা আছেন। কিন্তু এটা ভাল দেখায় না।”
“কী ভাল দেখায় না?”
“কাম করতে এলেন আমার, আর থাকলেন অন্য মকানে। লোকে তো এটা জানবে। জানলে আমার কী হবে, সেটা ভাবুন।”
“কী হবে?”
“বদনাম হবে। লোকে বলবে, চৌধুরি-বাড়ির মেহমান আজকাল অন্য জায়গায় থাকছে।”
“এই ব্যাপার?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, আপনার বাড়িতেই তা হলে উঠব। তবে এক্ষুনি নয়, বিকেলবেলায়। এখন আর তাড়াহুড়ো করে জায়গা পালটাতে ইচ্ছে করছে না। বিকেলবেলায় গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন!”
“এখন যে যেতে পারবেন না, এটা আমার আন্দাজ ছিল। তা বিকেলে কখন পাঠাব?”
“এই ধরুন চারটে নাগাদ। গাড়ি এলেই আমরা ওখানে চলে যাব।…নিন, এখন যা বলছিলেন বলুন।”
রামাশ্রয় চৌধুরি অতঃপর যা বললেন, তার থেকে তাঁদের পশ্চাৎপট, পারিবারিক বিন্যাস ও আর্থিক অবস্থার একটা আন্দাজ পাওয়া গেল। এঁদের জমিদারির পত্তন হয়েছিল এঁর প্রপিতামহের আমলে। পিতামহের আমলে সেটা আয়তনে আরও বৃদ্ধি পায়। পিতা ছিলেন অমিতাচারী, উচ্ছৃঙ্খল। তাঁর বদ খেয়ালের অন্ত ছিল না। মানুষটি খুব নিষ্ঠুরও ছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী এক জমিদারের বাইজিকে অনেক টাকার লোভ দেখিয়েও নিজের কবজায় আনতে না পেরে তাকে লোক লাগিয়ে খুন করান। এই নিয়ে যে মামলা হয়, সেটা দশ বছর চলেছিল। খুনির ফাঁসি হয়, রামাশ্রয়ের পিতৃদেবের সাত বছরের কারাদণ্ড। মেয়াদ শেষ হবার আগেই তিনি মারা যান। খুনের মামলার খরচ চালাতে জমিজমার বারো-আনাই ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। যে চার আনা রক্ষা পেয়েছিল, তাও নেহাত কম নয়। কিন্তু জমির ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেবার ফলে সেটাও খুব আইনসম্মতভাবে রাখা যায়নি। অনেকটাই বেআইনিভাবে রাখতে হয়েছে। রামাশ্রয় সেজন্য বিন্দুমাত্র লজ্জিত নন। খোলাখুলি বললেন, “বেনামিতে জমি কি একা আমি রেখেছি? সবাই রেখেছে। তো সবাই সেটা ছুপাতে চায়, আমি চাই না। কেন ছুপাব? ধরা পড়বার ভয়ে? কে ধরবে? যে ধরতে আসবে, সে ঘুষ খাবে না? তার লালচ নাই? কুত্তা যদি কামড়াতে আসে তো তাকে হাড্ডি ছুড়ে দিতে হয়, ভাদুড়িসাব। কুত্তাগুলানের সামনে দো-চারঠো হাড্ডি ছুড়ে দিয়ে আমি বলি, লে, এবারে হাড্ডি লিয়ে ভেগে যা। তারা ভেগে যায়।”
চৌধুরিরা তিন ভাই। রামাশ্রয় বড়। বংশানুক্রমিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইন এদিকে দায়ভাগ নয়, মিতাক্ষরা। এটা অনেকটা ল অব প্রাইমোজেনিচারের মতো। ফলে, জমিদারির যেটুকু যা অবশিষ্ট ছিল, তিন ভাইয়ের মধ্যে সেটা ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়নি, মিতাক্ষরা আইনে তার পুরো মালিকানা রামাশ্রয়ের হাতে এসে যায়। নগদ টাকাকড়ি আর সোনাদানা যা ছিল, সেটা অবশ্য নিজেদের মধ্যে তাঁরা সমান তিন ভাগে ভাগ করে নেন। মেজো ভাই রামানুজ গৌহাটিতে তেজারতি কারবার করেন। ছোট ভাই রঘুবীর আছেন বোম্বাইয়ে। তাঁর ব্যাবসা শেয়ার কেনাবেচার।
রামাশ্রয় চৌধুরির কদমছাঁট সাদা চুল আর নাকের নীচের সাদা গোঁফজোড়া দেখে মনে হয়েছিল, ভদ্রলোকের বয়স পঁয়ষট্টি তো হবেই, সত্তর হওয়াও বিচিত্র নয়। আসলে নাকি পঁচপাওন। অর্থাৎ পঞ্চান্ন। বারো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। সে-বউ বয়ঃপ্রাপ্ত হবার আগেই মারা যায়। পয়সা থাকলে মেয়েমানুষের অভাব হয় না, সুতরাং বউ মারা গেলেও তাঁর শারীরিক ক্ষুধা নিবৃত্তির পথে কোনও ব্যাঘাত ঘটেনি। কিছু কুসঙ্গীও সেই সময়ে জুটে যায়। তাদের নিয়ে তাঁর সময় এমন চমৎকার কেটে যাচ্ছিল যে, চৌধুরিজি আর নতুন করে বিয়ে করবার কথা ভাবছিলেনই না।
কিন্তু মুশকিল বাধিয়ে দিলেন দিদি। “ওই যে লোকটাকে দেখলেন না,” চৌধুরিজি বললেন, “ওর উমর কত, বলতে পারবেন?”
বললুন, “কার কথা বলছেন?”
“বাঃ, ওই যে চুহার মতো লোকটা আমার সাথ-সাথ এখানে এল, তাকে দেখলেন না?”
“মানে ওই যিনি পানের ডিবে আর লাঠিটা আপনার হাতে ধরিয়ে দিলেন, তার কথা বলছেন?”
“হ্যাঁ, তো আর কার কথা বলব? বহোত বদমাস আদমি। ওই আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।”
সদানন্দবাবু এতক্ষণ হাঁ করে চৌধুরিজির কথা শুনছিলেন। এবারে সোফার মধ্যে পা দুটো তুলে নিয়ে জোড়াসন হয়ে বসে বললেন, “ফাঁসিয়ে দিয়েছে! তার মানে?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আপনি ভাবছেন ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দিয়েছে? তা নয়, এটা আসলে চৌধুরিজিকে কোনও একটা ব্যাপারে জব্দ করে দেবার ব্যাপার। …কী চৌধুরিজি, ঠিক বলেছি?”
চৌধুরিজি বললেন, “বিলকুল ঠিক বলেছেন। ওই ব্যাটা মুকুন্দ আমাকে জব্দ করে ছাড়ল। তো যা বলছিলুম। ওর উমর কত, কেউ আন্দাজ করতে পারবেন?”
বললুম, “কত আর বয়স হবে, বছর পঞ্চাশ।”
“আসি!” চৌধুরিজি বললেন, “আমার দাদার টাইমে মুনিম ছিল। দাদা বুঝলেন তো? পিতাজি পিতাজি। তো এখন আমার মুনিম। লেকিন এত যে বুঢ়া হয়েছে, তা কি বুঝতে পারলেন? পারলেন না।”
“সে তো আপনার বয়সও বুঝতে পারিনি।”
“কী করে পারবেন? আমি পঁচপাওনে বুড্ঢা হয়ে গেলাম, আর মুকুন্দ সেখানে আসিতেও য্যায়সা পঁচাশ।”
সদানন্দবাবু বললেন, “খুব মর্নিং ওয়াক করেন বোধহয়?”
“কুছু করে না।” চৌধুরিজি বললেন, “সুবাসে সামতক সির্ফ মতলব ভাঁজে। বহোত্ বদমাস আদমি।”
“তা তো বুঝলুম। কিন্তু আপনাকে উনি জব্দ করলেন কীভাবে?”
“আমাকে জব্দ করবার তো একটাই উপায়। মুকুন্দ সেটাই করল। বড়িদিদির কাছে নালিশ ঠুকে দিল।” চৌধুরিজি বললেন, “দিদি এখন বাঙ্গালোরে থাকে। তখন মেরঠে থাকত। সেখানে খত লিখে মুকুন্দ জানাল যে, খোকাবাবু শরাব পি কর চুর হয়ে থাকছে আর ইয়ারদোস্ত নিয়ে মাইফেল বসাচ্ছে, কাম-কাজ কুছু দেখছে না, গরমিন্টের খাজনা-উজনা দিচ্ছে না, এইরকম যদি চলে তো সব লাটে উঠে যাবে। বাস, খত পেয়ে মেরঠ থেকে দিদি চলে এল, আর সেই যে এল, আমার শাদির বন্দোবস্ত না-করে ফিরল না।”
রামাশ্রয় চৌধুরির এই দ্বিতীয় বিয়েটা হয় তাঁর তিরিশ বছর বয়সে। বিয়ের এক বছর বাদে একটি ছেলে হয়। সেই ছেলের বয়স এখন চব্বিশ। ছেলে হবার পরে তিনি পুরনো বদভ্যাসগুলি থেকে মুক্ত হন ও পুরোপুরি সংসারী হয়ে ওঠেন। কিছু জমিজমা হাতে রাখেন, কিছুটা বিক্রি করে দিয়ে নামেন ব্যাবসায়। তাতে ফুলে-ফেঁপে উঠতে বিশেষ দেরি হয় না। এখন তিনি যে একটা কোল্ড স্টোরেজ, দুটো সিনেমা হল ও গোটা পাঁচেক ট্রাকের মালিক, সে-খবর তো মধুপুর থেকে গিরিডি আসবার পথে কাল বিকেলেই আমরা গৌতমের কাছে পেয়েছি। ভদ্রলোকের কতাবার্তা আর চালচলনে অবশ্য এখনও সেই জামিদারি ভাবটাই রয়ে গেছে।
প্রথম স্ত্রী মৃত্যু ও দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহের মধ্যবর্তী সময়ে যে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করেছিলেন, এই ‘পঁচপাওন’ বছর বয়সেও যে ভিতরে-ভিতরে তার প্রতি একটা চোরা টান তাঁর রয়েই গেছে, সেটাও তিনি গোপন করবার চেষ্টা করলেন না। “দিদির কথা শুনে তো তা হলে আপনার লাভই হয়েছে,” – ভাদুড়িমশাইয়ের এই কথা শুনে অবাক হয়ে খানিকক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন রামাশ্রয় চৌধুরি। তারপর বললেন, “নাফা হয়েছে বলবেন না। বলুন, একটা লেড়কা হয়েছে আর কিছু টাকা হয়েছে। তো আমি যখন ইয়ারদোস্তদের নিয়ে মাইফেল বসাচ্ছিলুম, বাইজি নাচাচ্ছিলুম আর শরাবি হয়ে মারদাঙ্গা করছিলুম, সেটা কি একটা নুকসানের ব্যাপার হচ্ছিল? ওই যে বললাম না, ওই শালা মুকুন্দ আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।”
হেসে বললুম, “লোকটা যখন এতই পাজি, তখন ওকে বরখাস্ত করে দিলেই তো হয়।”
চৌধুরিজি বললেন, “সে তো হর রোজ করছি। লেকিন বরখাস্ত করলেও উ শালা যাবে না, আমার সঙ্গে সেঁটে থাকবে। যেখানে যাব, সাথ সাথ যাবে। যেতে না দিলে দিদির কাছে খত লিখবে। বহোত বদমাস আদমি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দিদি আপনার চেয়ে কত বড়?”
“দিদির উমর করিব যাট হোবে।”
“তাঁকে আপনি খুব ভয় করেন?”
উত্তরে চৌধুরিজি তাঁর দু’হাত দু’কানের লতিতে ছুঁইয়ে শুধু একটি কথাই বললেন, “বাপ রে।”
বাইরে গাড়ির আওয়াজ হতে তাকিয়ে দেখলুম, গেস্ট হাউসের গাড়িবারান্দার নীচে দু’দুটো গাড়ি এসে দাঁড়াল। একটা চৌধুরিজির কনটেসা, অন্যটা ফিয়াট।
চৌধুরিজি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “ভেবেছিলুম, আপনাদের একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে যাব কিন্তু এখন তো আপনি যাবেন না। বিকাল চারটেয় গাড়ি পাঠিয়ে দেব।… কিন্তু তারই বা দরকার কী, ফিয়াটটা এখানে রেখে যাচ্ছি। আপনাদের কাজে লাগতে পারে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার সমস্যাটা কী, সেটা কিন্তু কিছুই জানা গেল না।”
চৌধুরিজি বললেন, “বিকালে আসুন, তখন জানবেন। গাড়িটা তো রেখে গেলাম, এখন একটু ঘুরে বেড়ান।”
“কোথায় আর ঘুরব।”
“কেন,” চৌধুরিজির চোখে আবার সেই কৌতুকের হাসিটা ঝিকিয়ে উঠেই মিলিয়ে গেল, “ডাক্তারবাবুর মকানে দাওয়াত খেতে যাবেন না? সেইজন্যেই তো এখন আমার ওখানে যেতে পারলেন না, আটকে গেলেন।”
“সে-খবরও পেয়ে গেছেন?”
ডিবে খুলে আর-একটা খিলি মুখের মধ্যে চালান করলেন চৌধুরিজি। তারপর বললেন, “সব খবর আমার কাছে পৌঁছে যায়, ভাদুড়িসাব। কাল আপনারা কখন মধুপুরে এলেন, সেখান থেকে কে আপনাদের নিয়ে এল, পথের মধ্যে গাড়ি থামিয়ে কোন দুকানে চা খেলেন, সব আমি জানি। কাল রাত্তিরে যে আমাকে ফোন করেছিল, সে তার নাম বলেনি। তো সেইজন্যে কি সেটা আমি জানতে পারব না?”
কনটেসায় উঠে রামাশ্রয় চৌধুরি চলে গেলেন। আমরা আবার ড্রয়িং রুমে এসে বসলুম। ভাদুড়িমশাই আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেমন বুঝলেন?”
আমি বললুম, “অতিশয় ধুরন্ধর লোক, সে তো বোঝাই যাচ্ছে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “লুজ ক্যারেকটার।”
