রাত তখন তিনটে
গেস্ট হাউসে বেডরুম মোট তিনটে। প্রতিটি বেডরুমে পাশাপাশি দুটি করে সিঙ্গল খাট, তাতে রাবার ফোমের গদির উপরে বিছানা পাতা। ঘরের এক কোণে একটি রাইটিং টেবিল, অন্যদিকে ড্রেসিং টেবিল, ওয়ার্ডরোব। একটা আর্মচেয়ারও রয়েছে। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা একেবার নিখুঁত। ঘরগুলো যে এয়ারকন্ডিশনড, সদানন্দবাবু প্রথমে সেটা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “নভেম্বরের গোড়াতেই হঠাৎ এত ঠান্ডা পড়ে গেল কেন বলুন তো?” কারণটা তাঁকে বুঝিয়ে বলতে একগাল হেসে বললেন, “এ তো দেখছি রাজকীয় ব্যাপার মশাই। আমাদের জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিস কোম্পানির সায়েবরা ঠিক এই রকমের ঠাণ্ডা ঘরে বসতেন!”
রাত্তিরের খাওয়ার পাট চুকে যাবার পরে ড্রইংরুমে বসে খানিকক্ষণ গল্প হল। তারপর ভাদুড়িমশাই বললেন, “দুটো বেডরুমেই আমাদের কুলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার দরকার কী। গেস্ট-হাউসে যখন অন্য কোনও অতিথি নেই, তখন তিনটে ঘরই নিয়ে নেওয়া যাক। কে কোন ঘরে শোবেন, ঠিক করে ফেলুন। আজ আর রাত জাগতে চাইছি না, চটপট শুয়ে পড়ব।”
তিনটে বেডরুমের মধ্যে দুটো সামনের দিকে, একটা পিছনে। সদানন্দবাবু বললেন, “আমি মশাই পিছন দিকের ঘরটায় শোব। তার কারণ…”
“কারণটা আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই,” সদানন্দবাবুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাই হাসতে-হাসতে বললেন, “পিছনের ঘরটাকেই আপনার সবচেয়ে নিরাপদ মনে হচ্ছে, তাই না? ভাবছেন যে, ডাকাত যদি আসেই তো সামনের ঘরে যাদের পাবে, তাদের ঘাড়েই কোপ বসাবে, কেমন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “না না, ডাকাতের কথা আমি মোটেই ভাবছিলুম না।”
তা যে সত্যিই ভাবছিলেন না, ঘন্টা কয়েক বাদে সেটা বুঝতে পারি। সে-কথায় একটু পরে আসছি।
সামনের দিকের বেডরুম দুটো সমান মাপের নয়। পশ্চিম দিকের ঘরটা বেশ বড়। সেটা ভাদুড়িমশাইকে ছেড়ে দিয়ে আমি পুবের ঘরটায় এসে ঢুকেছি। ভেবেছিলুম ট্রেন জার্নি করে এসেছি, খাটের উপরে লম্বা হওয়া মাত্র দু’ চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসবে। তা কিন্তু এল না। পরশু বিকেল থেকে এখন পর্যন্ত যা-যা ঘটেছে, সেইসব কথাই মাথার মধ্যে পাক খেতে লাগল।
পরশু বিকেলে যতীন বাগচি রোডে অরুণ সান্যালদের ফ্ল্যাটে বসে আড্ডা হচ্ছিল। আড্ডা যখন ভাঙার মুখে, সেই সময়ে পাশের ঘরে একটা ফোন আসে। ফোনে কথা বলে ভাদুড়িমশাই এসে জানান যে, দিন কয়েকের জন্যে তাঁকে গিরিডি যেতে হবে। এ দুটো ব্যাপার নিশ্চয় কাকতালীয় নয়। ফোন কে করেছিল, জানি না। তবে যে-ই করে থাকুক, সে-ই যে ভাদুড়িমশাইকে গিরিডি আসতে বলেছে, এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটা কিছু কাজের সূত্রেই তাঁর আসা। তা ছাড়া আজ বিকেলে এই গেস্ট-হাউসের ড্রইংরুমে বসে যখন কথাবার্তা হচ্ছিল, তখন তো তিনি বলেই ফেললেন যে, এখানে থাকা-না থাকার ব্যাপারটা তাঁর উপরে নির্ভর করছে না, নির্ভর করছে কাজের উপরে।
অর্থাৎ কাজ একটা আছেই। কিন্তু সেটা কী কাজ? ভাদুড়িমশাইয়ের কথাবার্তার ধরন থেকে এখনও পর্যন্ত যেটুকু আঁচ করতে পেরেছি, তাতে মনে হয়, তাঁর নিজেরও সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনও ধারণা নেই।
দুটো ব্যাপারে একটু খটকা লাগছে। গৌতমকে তিনি যে ফোন নম্বরটা দিলেন, সেটা যে রামাশ্রয় চৌধুরির ফোন-নম্বর, ভাদুড়িমশাই তা জানতেন। তিনি নিজেই সে-কথা বললেনও। অথচ মধুপুর থেকে গিরিডি আসার পথে গৌতম যখন রামাশ্রয় চৌধুরির পুত্রবধূর অসুখ ও তাঁর ব্যাবসা-বাণিজ্য নিয়ে কথা বলছিল, ভাদুড়িমশাই তখন ঘুণাক্ষরেও এমন আভাস দেননি যে, ওই নামের কাউকে তিনি জানেন।
রামাশ্রয় চৌধুরির মুশকিলটা যে কী, সেটাও জানা হল না। কথাটা একবার উঠেছিল বটে, কিন্তু গৌতম আর ভাদুড়িমশাই পথের উপর থেকে মোষ তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রসঙ্গটা তখনকার মতো চাপা পড়ে যায়। ভাদুড়িমশাই যে প্রশ্নটাকে আর নতুন করে তুললেন না, সেটা লক্ষ করেছি।
ভাবতে-ভাবতে যখন বুঝতে পারি যে, চোখ দুটো আস্তে-আস্তে ঘুমে জড়িয়ে আসছে, রাত তখন বোধহয় বারোটার কম হবে না। ঠিক সেই সময়েই আমার ঘরের দরজায় টোকা পড়ে।
প্রথমে মনে হয়েছিল স্বপ্ন দেখছি। পরে বুঝলুম, তা নয়। সত্যিই কেউ ঘরের দরজায় টোকা মারছে। চাপা গলায় আমার নাম ধরে যেন কেউ ডাকলও। বেড-সুইচটা যে কোথায় সেটা খেয়াল করে দেখিনি। বিস্তর হাতড়ে তবে সেটার হদিশ পাওয়া গেল। আলো জ্বেলে বললুম, “কে?”
চাপা গলায় জবাব এল, “আমি সদানন্দ। দরজাটা একবার খুলুন তো মশাই।”
দরজা খুলে দেখি, গায়ে জল ঢেলে দিলে অতিশয় দজ্জাল বেড়ালও যেমন জব্দ হয়ে যায়, ভদ্রলোকের অবস্থা একেবারে সেইরকম। বললুম, “কী ব্যাপার? এত রাত্তিরে?”
কথাটার জবাব না-দিয়েই আমার পাশ কাটিয়ে সদানন্দবাবু সুড়ুত করে আমার ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন, তারপর যে-খাটটার আমি দখল নিয়েছি, তার পাশের খাটটার উপরে ধপাস করে বসে পড়ে সেই রকমের চাপা গলায় বললেন, “বাকি রাতটা যদি আমি এখানে কাটাই তো আপনার আপত্তি হবে?”
লক্ষ করে দেখলুম, ভদ্রলোকের কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম ফুটেছে। মুখ-চোখও কেমন যেন শুকনো মনে হল। বললুম, “আপত্তি হবে কেন, স্বচ্ছন্দে এখানে আপনি থাকতে পারেন। কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো? শরীর খারাপ লাগছে?”
ভদ্রলোক খুব আস্তে-আস্তে তাঁর মাথাটা দু’দিকে নাড়লেন। অর্থাৎ তাঁর শরীর খারাপ লাগছে না।
“তা হলে?”
“ঘোস্ট! ও ঘরে ঘোস্ট আছে।”
হেসে ফেলে বললুম, “দূর মশাই, শেষকাল কিনা গোস্টের জন্যে আপনাকে ঘর ছাড়তে হল? ঠিক আছে, আমার যখন ভূতের ভয় নেই, তখন আমিই বরং ও-ঘরে যাচ্ছি।”
তড়াক করে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে সদানন্দবাবু ফ্যাসফেসে গলায় বললেন, “যাবেন না মশাই, যাবেন না! সত্যিই ও-ঘরে ভূত রয়েছে!”
“কী করে বুঝলেন?”
সাইড টেবিলে এক জগ জল আর একটা গেলাশ রয়েছে। কাচের জগ থেকে গেলাশে জল ঢেলে ঢকঢক করে পুরো এক গেলাশ জল খেয়ে ফেললেন ভদ্রলোক। তারপর বালিশের ঢাকনা দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললেন, “আছে। তা নইলে আলোটা ওইরকম করছে কেন?”
“আলোটা কী করছে?”
“নতুন জায়গা, তাই আলো নেবাইনি।…মানে অন্য সব আলো নিবিয়ে দিয়েছিলুম বটে, কিন্তু ডান দিকের…না না, ডানদিকের নয়, ঘরে ঢুকলে যে-দিকটা বাঁয়ে পড়ে, সেই দিকের একটা নিয়ন-বাতি জ্বালাই ছিল। ওই অবস্থায় আমি ঘুমিয়েও পড়েছিলুম। হঠাৎ ঘট ঘট ঘট ঘট করে একটা শব্দ হতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তখন চোখ খুলে দেখি, তাজ্জব ব্যাপার, যে-আলো জ্বেলে রেখে আমি শুয়েছিলুম, সেটা জ্বলছে নিবছে…জ্বলছে নিবছে… জ্বলছে-নিবছে!
“আর তাতেই আপনি বুঝে ফেললেন যে, ওটা ভূতের কাণ্ড? ধন্যি লোক আপনি, মশাই। নিয়ন-বাতির গ্যাস ফুরিয়ে গেলে যে ওইরকম হয়, তা আপনি জানেন না?”
শুকনো গলায় সদানন্দবাবু বললেন, “আর ওই ঘট-ঘট-ঘট-ঘট শব্দটা?”
বললুম, “ওটা আমিও শুনেছি। নিশ্চয়ই হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গিয়েছিল। তাই জেনারেটর চালিয়ে দিয়েছিল চৌকিদার। ওটা জেনারেটরের শব্দ। কারেন্ট ফিরে এসেছে, তাই জেনারেটরও বন্ধ হয়ে গেছে। যান, ঘরে ফিরে যান, যে লাইটটা বিগড়ে গিয়েছে, সেটা নিবিয়ে দিয়ে আর একটা লাইট জ্বেলে নিন।”
এত কথার পরেও কিন্তু নিজের ঘরে ফিরতে সদানন্দবাবুর বিশেষ উৎসাহ দেখা গেল না। বললেন, “দেখুন মশাই, চোর-ডাকাতকে আমি ভয় পাই না, কিন্তু ঘোস্টের ব্যাপারটা অন্য রকম। কেন, আমি যদি এ-ঘরেই থাকি তো ক্ষতি কী?”
বললুম, “ঠিক আছে, তা হলে এক কাজ করা যাক। আপনি এখানেই থাকুন, আর আমি বরং আপনার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ি।”
শুনে সদানন্দবাবু আমার জামাটাকে খিমচে ধরে বললেন, “ওব্বাবা, বলেন কী, আপনি ও ঘরে চলে যাবেন আর বাকি-রাতটা এখানে আমাকে একলা থাকতে হবে?”
“কেন, তাতে আপনার ভয় কীসের? এ-ঘরে তো আর ওই ‘জ্বলছে…নিবছে… জ্বলছে…নিবছে’ হচ্ছে না। তবে?”
উত্তরে সদানন্দবাবু যা বললেন, আসল ব্যাপারটা তাতে বেরিয়ে পড়ল। “দেখুন মশাই, আমাকে ভিতু বলুন আর যা-ই বলুন, এ-ঘরে আমার পক্ষে একলা রাত কাটানো সম্ভব নয়।”
“তা তো বুঝলুম, কিন্তু কেন? আটকাচ্ছেটা কোথায়?”
সদানন্দবাবুর গলা আবার সেই খাদে নেমে এল। ফিসফিস করে বললেন, “আটকাচ্ছে বেলগাছে। সামনেই যে একটা বেলগাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে, এখানে ঢুকতেই সেটা আমার চোখে পড়েছিল, বুঝলেন? সেই জন্যেই তো সামনের ঘর দুটোর একটাতেও থাকতে চাইনি।”
হেসে বললুম, “এদিকে আবার পিছনের ঘরে ঢুকেও রেহাই নেই। সেখানেও ওই জ্বলছে…নিভছে…জ্বলছে নিভছে! ঠিক আছে, আপনি তা হলে শুয়ে পড়ুন।”
“আর আপনি?”
“আমি বরং পাহারায় থাকি, যাতে বেলগাছ থেকে নেমে কেউ আবার এই ঘরের মধ্যে ঢুকে না পড়ে।”
গায়ের উপর চাদর টেনে নিতে-নিতে সদানন্দবাবু বললেন, “ঠাট্টা করবেন না, মশাই। বেল ইজ এ গুড ফ্রুট, বাট বেলগাছ ইজ এ ব্যাড ট্রি। ভেরি ভেরি ব্যাড।”
মিনিট খানেক বাদেই তাঁর নাসিকাগর্জন শুনতে পাই। তাতে বুঝতে পারি, ভদ্রলোক এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আলো নিবিয়ে দিয়ে আমিও এবার আমার বিছানায় টান হই। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম এসে যায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে পাশের বিছানার দিকে তাকিয়ে অবশ্য সদানন্দবাবুকে দেখতে পাইনি। বাইরে বেরিয়ে দেখি, পিছনের দিকের সেই ঘর থেকে তিনি বেরিয়ে আসছেন। ঠাট্টা করে বলি, “সে কী মশাই, আবার ওই ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকেছিলেন? আপনার তো দেখছি দারুণ সাহস!’
সদানন্দবাবু তাতে গম্ভীর হয়ে বললেন, “ঠাট্টা করবেন না, মশাই, ঠাট্টা করবেন না। আপনি কি ভাবছেন যে, সত্যি-সত্যি কাল রাত্তিরে আমি ভয় পেয়ে আপনার ঘরে গিয়ে ঢুকেছিলুম?”
বললুম, “ভয় পাননি? তা হলে গিয়েছিলেন কেন?”
“ওই আপনাকে একটু কম্পানি দেবার জন্যে,” নির্বিকার গলায় সদানন্দবাবু বললেন, “শুয়ে-শুয়ে কলকাতার কথা ভাবছিলুম, ঘুম আসছিল না, হঠাৎ মনে হল, চাটুজ্যেমশাই একলা রয়েছেন, যাই, তাঁর সঙ্গে একটু গল্প করে আসা যাক।…তা এইমাত্তর ঘুম ভাঙল বুঝি?”
“হ্যাঁ। জানেনই তো, সাতটার আগে আমার ঘুম ভাঙে না।”
“ও,” সদানন্দবাবু দাঁতের সঙ্গে জিভ ঠেকিয়ে একটা আক্ষেপের শব্দ করে বললেন, “তা হলে তো এখানকার গ্লোরিয়াস ভোরবেলাটাই আপনার দেখা হয়নি। আমার মশাই মর্নিং ওয়াকও শেষ হয়ে গেছে। পুরো তিন মাইল হেঁটে এলুম।
“তিন মাইলই যে হেঁটেছেন, সেটা বুঝলেন কী করে?”
“সে তো মশাই খুব সিম্পল ব্যাপার।” সদানন্দবাবু হেসে বললেন, “আমাদের গোলদিঘিতে তিনটে পাক মারলেই যে এক মাইল হাঁটা হয়,সেটা জানেন তো?”
“এইরকম একটা কথা শুনেছি বটে।”
“রোজ সকালে সেই গোলদিঘিতে গিয়ে আমি ন’টা পাক মারি। তা হলে ক’মাইল হাঁটা হল?”
“তিন মাইল!”
“বাঃ, অঙ্কে তো আপনার দেকচি দারুণ মাথা। তো সেই তিন মাইল হাঁটতে আমার এক ঘন্টা লাগে। এখানে তো আর গোলদিঘি নেই, তাই বাগানের পাশে ওই যে মস্ত চৌবাচ্চাটা…মানে ওই যেটায় জল নেই বলে শুকিয়ে খটখট করছে…”
“আপনি কি সুইমিং পুলটার কথা বলছেন?”
সদানন্দবাবু হেসে বললেন, “ওই একই হল। তা সেই চৌবাচ্চাটাকে পাক মেরে-মেরে পুরো এক ঘন্টা হেঁটেছি, মশাই। কী, তিন মাইলের হিসেবটা মিলল?”
বললুম, “তা মিলেছে। ভাদুড়িমশাই কোথায়?”
তৎক্ষণাৎ আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না সদানন্দবাবু। দু’ চোখ বন্ধ করে, দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে তারপর বললেন, “তাঁর কথা আর বলবেন না, চাটুজ্যেমশাই, তিনি নমস্য ব্যক্তি। আমার মর্নিং ওয়াক তখনও শেষ হয়নি, সেই অবস্থায় দেখলুম দৌড়তে দৌড়তে তিনি গেট পেরিয়ে গেস্ট হাউসের হাতায় এসে ঢুকছেন। গায়ে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি, পরনে একটা হাফ প্যান্ট, কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। দেখে তো আমি অবাক। জিজ্ঞেস করলুম, কোথায় গিয়েছিলেন মশাই? তাতে একগাল হেসে কী বললেন জানেন?”
“কী বললেন?”
“বললেন যে, রাস্তায় তো এখন ভিড়ভাট্টা নেই, তাই মাইল পাঁচেক দৌড়ে এলুম।”
“আপনার যেমন মর্নিং ওয়াক, ওঁর তেমনি জগিং। একটা দিনও বাদ যায় না। তা এখন তিনি কী করছেন?”
“তা তো বলতে পারব না।”
হেসে বললুম, “সম্ভবত যোগ-ব্যায়াম করছেন।”
বলতে না বলতে দরজা খুলে ভাদুড়িমশাই তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আমার শেষ কথাটা তাঁর কানে গিয়ে থাকবে। বললেন, “ব্যায়াম অনেক আগেই শেষ হয়েছে। দাড়ি কামিয়ে স্নানটাও সেরে নিলুম।”
গেস্ট-হাউসের মাঝখানে যে মস্ত হল, কাঠের ফোল্ডিং পার্টিশন দিয়ে সেটাকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সামনের দিকটা ড্রইং রুম, পিছনে মস্ত বড় ডাইনিং টেবিল ঘিরে খান দশেক চেয়ার পাতা। ড্রইং রুমে বসে কথা বলতে-বলতেই দেখছিলুম যে, খানসামাটি বেশ কিছুক্ষণ ধরে ডাইনিং টেবিলের উপরে প্লেট গেলাশ ছুরি কাঁটা ইত্যাদি খুব যত্ন করে সাজিয়ে চলেছে। কাজের সূত্রে বাইরে গিয়ে নানা সময়ে সরকারি আর বেসরকারি বাংলো কিংবা গেস্ট হাউসে থাকতে হয়েছে। তখন এই একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি যে, দলের মধ্যে কোন মানুষটির গুরুত্ব যে সবচেয়ে বেশি, এ-সব জায়গায় বেয়ারা, বাবুর্চি, খানসামা আর চৌকিদারেরা সেটা খুব চটপট বুঝে যায়। এই খানসামাটিও এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি, কিন্তু ভাদুড়িমশাই যে তাঁর ঘর থেকে বেরিয়েছেন, এটা দেখবামাত্র সে ডাইনিং টেবিল থেকে এদিকে চলে এসে লম্বা একটা সেলাম ঠুকে বলল, “গুড মর্নিং স্যার, ব্রেকফাস্ট লাগিয়ে দেব?”
ভাদুড়িমশাই আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা রেডি?”
বললুম, “সদানন্দবাবু রেডি, তবে আমার এখনও চোখ-মুখ ধোয়া হয়নি। কিন্তু আপনারা গিয়ে বসে পড়ুন, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নিচ্ছি।”
ব্রেকফাস্ট শেষ হবার খানিক বাদে এল গৌতম। বলল, “আমি বসব না মেসোমশাই, একটা জরুরি কল রয়েছে, শুধু দুটো খবর দিতে এলুম। এক নম্বর খবর, যথাস্থানে ফোন করেছিলুম, তবে আমার পরিচয় দিইনি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুদ্ধির কাজ করেছ। তুমি ওদের ডাক্তার, তাই আমারই তোমাকে বলে দেওয়া উচিত ছিল যে, যতক্ষণ না ছবিটা একটু পরিষ্কার হচ্ছে, ততক্ষণ তোমার নেপথ্যে থাকাই উচিত হবে। কিন্তু উনি আসছেন তো?”
“ঠিক দশটাতেই আসছেন।”
“আর দ্বিতীয় খবর?”
“আজ দুপুরে আপনারা আমাদের ওখানে খাচ্ছেন। মা খুব করে বলে দিয়েছেন।”
গৌতম চলে গেল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনারা স্নান করে নিন। তারপর ড্রইং রুমে চলে আসুন।”
ঠিক দশটার সময়েই একটা কনটেসা এসে গেস্ট-হাউসের সামনে থামল। ড্রাইভারের পাশের আসনে যে আধবুড়ো খয়াটে চেহারার লোকটি বসে ছিল, তড়িঘড়ি সে গিয়ে পিছনের দরজা খুলে দিতেই একজন দীর্ঘকায় পুরুষ খুবই ধীরেসুস্থে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। দেখে মনে হল, ভদ্রলোকের বয়স নেহাত কম হবে না। স্বাস্থ্য এককালে ভাল ছিল, এখন ঝরে গেছে। মজবুত কাঠামোটা অবশ্য ভেঙে পড়েনি। চোখে-মুখে যে একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ রয়েছে, সেটা কারও নজর এড়ায় না।
সদানন্দবাবু চাপা গলায় বললেন, “রামাশ্রয় চৌধুরি।”
