Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty » Page 21

রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty

ব্রেকফাস্টের পর দোতলায় উঠে চৌধুরিজি আর জানকী দেবীকে সেখানে ডাকিয়ে এনে, ভাদুড়িমশাই যখন তাঁর গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগ থেকে কানহাইয়ার সোনার মুকুট, বধূবরণের সোনার নেকলেস আর হিরের নেকলেসটি একে-একে তাঁদের হাতে তুলে দেন, তখন দেখলুম, বিস্ময়ে তাঁদের চোখের পলক পড়ছে না। মহার্ঘ অলঙ্কারগুলি যে সত্যিই শেষ পর্যন্ত ফিরে পাওয়া যাবে, অন্তত চৌধুরিজি সে-কথা ভাবতেই পারেননি। পারলে তাঁর চোয়াল অতটাই ঝুলে পড়ত কি না, তাতে আমার সন্দেহ আছে। হাতের কাছে ক্যামেরা থাকলে তাঁর সেই সময়কার মুখশ্রীর একটা ছবি নিশ্চয়, তুলে রাখতুম।

বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা কাটবার পরে অস্ফুট গলায় তিনি প্রশ্ন করলেন, “এটা কী করে সম্ভব হল, ভাদুড়িসাব?”

মৃদু হেসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “জিনিসগুলো ফেরত পেয়েছেন, তা-ই কি যথেষ্ট নয়? কী করে পাওয়া গেল, তা জেনে আপনার কী হবে?”

“কে চোরি করেছিল সেটাও জানতে পারি না?”

“হাজারিলাল।”

“হাজারিলাল!” সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে দাঁতে দাঁত ঘষে চৌধুরিজি বললেন, “হারামজাদ গেল কুথায়? আমি তার গলা টিপে মারব।”

জানকী দেবী বললেন, “আরে বুদ্ধ, হাজারিলালের বিচার পরে হবে, আভি তো ভাদুড়িদাদার কথা শুন্।”

চৌধুরিজি ধপ করে ফের সোফায় বসে পড়ে বললেন, “বিচার আবার কী, আমি ওকে খুনই করব।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেটা আর সম্ভব হবে না, তাকে আমি ছেড়ে দিয়েছি!”

চৌধুরিজি অবাক হয়ে বললেন, “ছেড়ে দিয়েছেন? কেন?”

“ছেড়ে না-দিলে দুটো কাজ করতে হত।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এক, আপনার হাতে তাকে তুলে দিতে হত। তা দিলে যে কী হত, সে তো আপনি নিজের মুখেই জানিয়ে দিলেন। আপনি তাকে গলা টিপে মারতেন। ফলে আবার একটা খুনের মামলার জড়িয়ে পড়তেন আপনি। অর্থাৎ হাজারিলালেরও প্রাণটা যেত, আবার আপনার পক্ষেও তার পরিণাম মোটেই ভাল হত না। এটা বুঝতে পেরেছিলুম বলেই আপনার হাতে তাকে তুলে দিইনি। দুই, পুলিশের হাতেও তাকে তুলে দেওয়া যেত। তাতে সে প্রাণে বাঁচত বটে, কিন্তু এই নিয়ে একটা মামলা তো হতই, আর মামলা হলেই এমন সব কথা ফাঁস হয়ে যেত যে, আপনি ঘোর লজ্জার মধ্যে পড়তেন। ভেবেচিন্তে দেখলুম যে, সেটাও ঠিক হবে না। তার চেয়ে বরং ওকে ছেড়ে দেওয়াই ভাল।”

“কেন, মামলা হলে আমার লজ্জা কী ছিল?”

“ছিল না?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “চৌধুরিজি, আপনার বয়স হয়েছে, কিন্তু বুদ্ধি বিশেষ পাকেনি। তা ছাড়া অনেক কথাই আপনার জানা নেই। আপনাদের বহু রিয়া যে হাজারিলালের কাছে গাড়ি চালানো শিখত, এটা আপনি জানেন তো?”

“হাঁ হাঁ, সেটা কেন জানব না? সেটা তো সবাই জানে।”

“কিন্তু এটা আপনি জানেন না যে, ড্রাইভিং শিখবার কোনও দরকারই ওর নেই।”

“কেন নেই?”

“এইজন্যে নেই যে, ড্রাইভিংটা রিয়া খুব ভালই জানে। বম্বে পুলিশের মোটর ভেহিকল্স ডিপার্টমেন্ট আজ থেকে তিন বছর আগেই ওর নামে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করেছে।”

চৌধুরিজি আর জানকী দেবীর চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছিল, কোনও কিছুই তাঁরা যেন ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না। কয়েকটা মুহূর্ত একেবারে নির্বাক হয়ে বসে রইলেন তাঁরা। তারপর, যেন খুবই কষ্ট করে চৌধুরিজি বললেন, “ইয়ে সচ্ হ্যায়?”

“বিলকুল সচ্।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মামলা হলে এ-সব কথা হাজারিলালই ফাঁস করত। চুরির জন্যে তো আর ফাঁসি হয় না, বড়জোর বছর কয়েকের জেল হয়। এ-কথা সে ভালই জানে। ফলে আদালতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এটাও সে জানিয়ে দিত যে, চুরির ব্যাপারে আপনাদের পুত্রবধূ রিয়া তাকে আগাগোড়া সাহায্য করেছে। হাজারিলাল চোর। কিন্তু চৌধুরিবাড়ির বহুই যে এ-ব্যাপারে তার অ্যাকমপ্লিস, এটা প্রকাশ পেলে কি আপনারা লজ্জায় পড়ে যেতেন না?”

“ইয়ে ভি সচ্ হ্যায়?”

“বিলকুল সচ্।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সচ্ বলেই হাজারিলালকে আমি ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু একই সঙ্গে একটা কথা আপনাদের জেনে রাখা দরকার।”

চৌধুরিজিকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে, তিনি একেবারে ভেঙে পড়েছেন। একটা দাপুটে দাম্ভিক মানুষের ভিতর থেকে যে শেষ পর্যন্ত এই রকমের একটা বিধ্বস্ত চেহারা বেরিয়ে আসবে, এটা আমি ভাবতে পারিনি। কথা বলতেও সম্ভবত তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। ম্লান হেসে আস্তে-আস্তে বললেন, “আখুন ও শেষ হয় নাই ভাদুড়িসাব? আরও খারাপ খবর শুনাবেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না চৌধুরিজি, এটা খারাপ খবর নয়। বরং বলতে পারি, আন্ডার দ্য সারকমস্ট্যান্সেস, এটাই সবচেয়ে ভাল খবর। রিয়ার কোনও দোষ নেই।”

শুনে চৌধুরিজির আদৌ কোনও ভাবান্তর হল না। এতক্ষণ মুখ নিচু করে বসে ছিলেন, এবারে মুখ তুলে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন বটে, কিন্তু গলায় যতটা তিক্তটা ঢেলে দেওয়া যায়, সেটা ঢেলে দিয়ে বললেন, “সে আমার বেটাকে বদমাসি করে গাড়িচাপা দিল, চোরের শাগির্দ হয়ে বাড়ির জিনিস বাইরে পাচার করল, তবু বলছেন তার দোষ নাই? এ তো ভারী আজিব কথা শুনালেন ভাদুড়িসাব!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজব কথা নয়, চৌধুরিজি। আমি যা বলছি, ঠিকই বলছি। রিয়ার সত্যি কোনও দোষ নেই। একটা কথা জিজ্ঞেস করি। সে কোন পরিবারের মেয়ে, তার বাবা কীভাবে টাকা রোজগার করে, সে-সব আপনি জানেন?”

“তা জানব না কেন?” চৌধুরিজি বললেন, “মালিকের টাকা চোরি করে ওর বাবা নোকরি থেকে বরখাস্তু হয়েছিল। পিছে নিজের বাড়ির ভিতর জুয়ার আড্ডা বসিয়েছিল, সেটা ভি জানি। লেকিন বহুর তাতে কী দোষ হল? সে তো…।”

“বাস বাস,” চৌধুরিজির কথায় বাধা দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার কথা আমি বুঝতে পেরেছি, আর-কিছু আপনাকে বলতে হবে না। চওড়া-বুকের একজন মানুষের মুখে যেমন কথা মানায়, ঠিক তেমন কথাই আপনি বলেছেন। স্ত্রীরত্নং দুস্কুলাদপি গৃহ্নীয়াৎ। ঠিক, ঠিক, এই কথাটাই তো আপনার মুখে আমি শুনতে চেয়েছিলুম। এখন বলি, ওর বাপ যে অতি নচ্ছার, এটা জেনেই যে ওকে আপনি পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, রিয়া কি তা জানে?”

“না। সেটা আমি বহুকে বলিনি।”

“বললে বোধহয় ভাল করতেন।”

“এ-কথা কেন বলছেন?”

“এইজন্যে বলছি যে, রিয়াকে তা হলে আর ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতে হত না। হাজারিলাল ওর বাপের কথা জানে। আমার ধারণা, রিয়াকে ও ব্ল্যাকমেল করত। ভয় দেখিয়ে বলত যে, রিয়া যদি ওর কথা-মতন না চলে তো তার বাপের বাড়ির জুয়ার আড্ডার কথা ও ফাঁস করে দেবে।”

“কিন্তু ড্রাইভিং জেনেও রিয়া সেটা না-জানবার ভান করেছিল কেন?” প্রশ্নটা সদানন্দবাবুর। “সেটাও করেছিল হাজারিলালের ভয়ে। আমার অন্তত সেই রকমই মনে হয়। … চৌধুরিজি, হাজারিলালকে এ-বাড়ির কাজে কে ঢুকিয়েছিল?”

“বহু।” চৌধুরিজি বললেন, “লাস্ট জুলাইয়ে একদিন গিরিডিতে মার্কেটিং করতে গিয়েছিল। ফিরে এসে আমাকে বলল, ‘পিতাজি, আমি গাড়ি চালাতে শিখব।’ তো আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। বাড়িতে তো ড্রাইভারের কুছু কমতি নাই, যাকে তুমার পসন্দ হয়, সে-ই তোমাকে শিখলাবে।’ তাতে বহু বলল, ‘না, পিতাজি, গিরিডিতে একটা লোকের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তার কাছে আমি শিখতে চাই।’ তো তা-ই হল। হাজারিলাল এখানকার কাজে ভর্তি হয়ে গেল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রিয়া এ ব্যাপারে যা-কিছু বলেছে, সবই হাজারিলালের শেখানো কথা।” জানকী দেবী বললেন, “কেন যে সে হাজারিলালকে এই বাড়িতে এনে ঢুকিয়েছিল, সেটা বুঝলাম। সবই সে ভয়ে ভয়ে করত। সে যে খুবই বাজে বাড়ির মেয়ে আর তার বাপ যে একটা জুয়ার আড্ডা চালায়, শ্বশুরবাড়িতে সেটা ফাঁস হয়ে যাবার ভয়ে সে এই কাজ করেছে। কিন্তু ভাদুড়িদাদা, যতই ভয় পাক, নিজের স্বামীকে সে গাড়ি চাপা দিয়ে মারতে গিয়েছিল কেন? অমন জঘন্য কাজ কেউ করে?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, অমন কাজ কেউ করে না। ব্লাকমেলড হয়েও করে না। কিন্তু রিয়া করেছিল। স্বামীর উপরে তার রেগে যাবার কোনও কারণ নেই। তবু করেছিল।”

“কেন করেছিল?”

“উত্তরটা খুবই সহজ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “রিয়া তখন রিয়া ছিল না।” চৌধুরিজি বললেন, “তার মানে?”

“মানে আর কিছুই নয়, শি ওয়জ আন্ডার আ হিপনোটিক স্পেল। গ্যারাজ থেকে গাড়িটা বার হবার পরে খানিকটা এগিয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে দাঁড়িয়ে যায়। আমার ধারণা, হাজারিলাল ঠিক তখনই হিপনোটাইজ করে রিয়াকে। সেই অবস্থায় ফুল স্পিডে গাড়ি ব্যাক করতে বলে। কিন্তু তার পরিণাম যে কী হবে, রিয়া তা জানত না। জানবার মতন অবস্থাই তখন তার ছিল না।”

“ইয়ে ভি সচ্ বাত?” প্রশ্নটা চৌধুরিজির।

“বিলকুল সচ্।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “হাজারিলালকে আপনি শুধু চোট্টা ভাববেন না, চৌধুরিজি, হি ইজ আ গ্রেট হিপনোটিস্ট। বিশ্বাস না হয়, আমার এই বন্ধুদের জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। এঁরা দুজনেই তাঁর এই ক্ষমতার কথা জানেন।”

“বহুর তা হলে কুনো দোষ নাই?”

“একেবারেই নেই।”

দেখলুম জানকী দেবীর মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। মস্ত একটা নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “বাঁচালেন ভাদুড়িদাদা, আমার তো আর কিছু নেই, শুধু এই বাপের বাড়িটাই আছে। বাড়িটাকে আপনি বাঁচিয়ে দিয়েছেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার বাপের বাড়ির বিপদ কিন্তু পুরোপুরি কাটেনি, বেহেনজি। আপনার ছোট ভাই যে থানায় গিয়ে সারেন্ডার করেছেন, সেটা আপনি জানেন?”

জানকী দেবী বললেন, “জানি। তার নামে ওয়ারেন্ট বেরোবার পর পালিয়ে আমার কাছে চলে গিয়েছিল। আমিই তাকে পুলিশে হাওলা করে দিয়েছি। তাকে ছাড়িয়ে আনবার জন্যে এখন লাখ দশেক টাকা দরকার। লখনউতে আমার এখনও একটা প্রপার্টি আছে। ভাবছি সেটা বেচে দেব। মেয়েদের জন্যে আর-একটা ইশকুল করবার কথা ভাবছিলাম। সেটা আর হল না।”

চৌধুরিজি বললেন, “কী বেপার? রঘুবীরের কী হল?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এক ক্লায়েন্টের হয়ে শেয়ার কিনবার কথা ছিল। সেই টাকা দিয়ে আর- একজনের ক্লেম মেটাতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন। লাখ-দশেক টাকার ফারাক। সেটা কভার করতে পারছেন না।”

চৌধুরিজি বললেন, “তার নিজের তো কিছু শেয়ার আছে। সেটা বেচে দিলেও কভার করতে পারবে না?”

জানকী দেবী বললেন, “না ভাইয়া, তাতেও হবে না শুনলাম। তা ছাড়া সেটা বেচলে নুকসান। কিউকি শেয়ারের দাম এখুন চড়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া, সেটা আবার তার নিজের নামেও নাই, তার বউয়ের নামে আছে। সে বেচতে দিবে না। তাই ভাবছিলাম যে, লখনউয়ের হজরতগঞ্জে আমার নামে যে মকানটা আছে, সেটা বেচে দিব।”

“তোমাকে কুছু করতে হবে না, বড়িদিদি।” চৌধুরিজি বললেন, “তিন সাল আগে ভি একবার এইরকম করেছিল, তখন তুমি তাকে বাঁচিয়েছিল। এবারে আমাকে সামলাতে দাও। কিন্তু দুটা সিনেমা হলের একটা যদি বেচি, তো ছে-সাত লাখের বেশি পাওয়া যাবে না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি একটা কথা বলতে পারি?”

“বলুন।”

“মুলচাঁদ লোহিয়াকে যদি বেচেন তো দশ কেন, আরও দু-তিন লাখ বেশি পেয়ে যাবেন। রাজি?” চৌধুরিজি এক মুহূর্ত চিন্তা করে বললেন, “সে যে ওটা কিনতে চায়, তা আমি জানি, ভাদুড়িসাব। ঠারেঠোরে একবার সে-কথা বলেওছিল। কিন্তু এখুন তার সাথে আমার রিলেশান ভাল নাই, বাতচিত ভি হয় না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হয় না, কিন্তু এখন আবার হবে। আমি যদি তাকে খবর পাঠাই তো সে আজই এখানে চলে আসবে। তখন তার সাথে আপনি কথাবার্তা বলে নেবেন।”

“আপনি তাকে চিনেন?”

“কেন চিনব না?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “যেমন আপনি, তেমন ওরাও আমার ক্লায়েন্ট। তা আমরা তো আজ রাত্তিরের গাড়িতে কলকাতা ফিরছি। দুপুরের খাওয়ার পরে আপনি আমাদের গিরিডি পৌঁছে দিন। মুলচাঁদকে গৌতমের বাড়ি থেকে ফোন করে সন্ধে নাগাদ আপনার এখানে চলে আসতে বলব। আমার বিশ্বাস, টাকাটা পেতে আপনার কোনও অসুবিধে হবে না।”

জানকী দেবী বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞাসা করি ভাদুড়িদাদা, নিরামিষ খেতে কি আপনাদের খুব অসুবিধা হবে?”

“কিছুমাত্র না।”

“তা হলে আজ আর গেস্ট হাউসে না খেয়ে দুপুরের খাওয়াটা আমাদের বাড়িতে বসে আমাদের সঙ্গে খান।”

তা-ই খাওয়া হল। পরিবেশন করতে-করতে চৌধুরানি বললেন, “বহুর মুখে আজ অনেক দিন বাদে আবার হাসি দেখলাম।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না-হাসবার তো কোনও কারণ নেই। ওর অসুখ তো সেরে গেছে।” চৌধুরিজি নিজেই তাঁর কনটেসা চালিয়ে গৌতমের বাড়িতে পৌঁছে দিলেন আমাদের। কিন্তু গৌতমের অনুরোধ সত্ত্বেও উপরে উঠলেন না। শুধু ফিরবার আগে ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে খুবই কুণ্ঠিতভাবে বললেন, “আপনার ঋণ শোধ করবার সাধ্য আমার নেই। এর মধ্যে সামান্য কিছু রইল।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কত রইল?”

“বিশ হাজার।”

প্যাকেট থেকে গুনে-গুনে খান কয়েক নোট বার করে নিয়ে তারপর প্যাকেটটা চৌধুরিজির হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কলকাতা-গিরিডি-কলকাতা তিনজনের ফার্স্ট ক্লাস রেল-ফেয়ারটা আমি নিয়ে নিলুম। সেইসঙ্গে পাঁচশো টাকা নিচ্ছি গৌতমকে দেবার জন্য। ওর এখান থেকে বোম্বাই আর ব্যাঙ্গালোরে বিস্তর ফোন করেছি। বাকি টাকা বড়িদিদিকে দিয়ে দেবেন। বলবেন, ওটা ভাদুড়িদাদার উপহার, টাকাটা তিনি যেন তাঁর ইস্কুলের কাজে লাগিয়ে দেন। …ও হ্যাঁ, আর একটা কথা বলি, রঘুনন্দনকে যত তাড়াতাড়ি পারেন, কলকাতায় নিয়ে যান। আর দেরি করবেন না।”

চৌধূরিজি চলে যাবার পর দোতলায় উঠে ভাদুড়িমশাই প্রথমেই ফোন করলেন মুলচাঁদ লোহিয়াকে। তারপর কথা শেষ করে রিসিভার নামিয়ে রেখে বললেন, “বাব্বা, এতক্ষণে কাজ মিটল। এবারে একটু চায়ের কথা বলো হে, গৌতম।”

বললুম, “একটা ব্যাপার কিন্তু এখনও পরিষ্কার হয়নি, ভাদুড়িমশাই।”

“কোন ব্যাপারটা?”

“মেসেজের ব্যাপারটা। ওর মধ্যে কি রিয়াকে বলা হয়েছিল যে, রাত তিনটের সময় দোতলা থেকে ওইখানে হিরের নেকলেসটা ফেলে দিতে হবে?”

“কারেক্ট।”

“কিন্তু সেই মেসেজটাকে ডিসাইফার করলেন কীভাবে?”

ভাদুড়িমশাই অবাক হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর বললেন, “ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ার পরেও সেটা বুঝলেন না? ধন্যি লোক মশাই আপনি। সাধে কি বলি যে, দিনে-দিনে আপনি একটি বাঁধাকপিতে পরিণত হচ্ছেন? আসুন বুঝিয়ে দিচ্ছি। কাগজে লেখা ছিল:

DRPDMNDNC
KLCSNDSMP
LCTHRCLCK

এখন এটাকে এইভাবে ভাগ করে ফেলুন :

DRP/DMND/
NCKLC/SND/
SM/PLC/THR/
CLCK

এখন এর মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার কি চোখে পড়ছে আপনার?”

বললুম, “কী চোখে পড়বে?”

“আরে মশাই, সবই যে কনসোন্যান্ট, তাও চোখে পড়ছে না? এর মধ্যে একটাও ভাওয়েল নেই। আর ওই যাকে সেমি-ভাওয়েল বলা হয়, সেই ওয়াই-বর্ণটিকেও এখানে ব্যবহার করা হয়নি। তা এবারে সেগুলিকে জায়গামতো ব্যবহার করুন। ঠিকঠাক ব্যবহার করলে মেসেজটা কী দাঁড়াবে জানেন? Drop diamond necklace Sunday same place three o’clock. আর সেম প্লেস বলতে যে বুগেনভিলিয়ার ঝাড়টার কথা বোঝানো হচ্ছে, সে তো ওখান থেকে সদানন্দবাবু ওই যে হিরের আংটিটা পেয়েছিলেন, তাতেই আমি বুঝে গেছি।”

সদানন্দবাবুর তুলনা হয় না। চায়ের সঙ্গে যে খাবারের প্লেট এসেছিল, তা থেকে আস্ত একটা গুলাবজামুন মুখে পুরে, গালের মধ্যে বার কয় এ-পাশ ও পাশ করে, পেটের মধ্যে সেটাকে চালান করে দিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে অম্লানবদনে বললেন, “ছিঃ, কিরণবাবু, এ তো খুবই সহজ ব্যাপার। আপনার কিন্তু বোঝা উচিত ছিল, মশাই।”

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21
Pages ( 21 of 21 ): « পূর্ববর্তী1 ... 1920 21

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *