কালবৈশাখী রাতের ঘটনা
আনন্দ বাবুর বাড়ি হুগলি জেলার রামহাটি তলায়। চাকরি করেন কলকাতায়। প্রতিদিন হরিপাল থেকে ট্রেনে করে হাওড়ায় যান।সেখান থেকে বাসে করে কলকাতায় তার গন্তব্যস্থলে যান। বৈশাখ মাসের এক সন্ধ্যা। প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড়ে সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়। বেশ কিছু গাছও বিভিন্ন জায়গায় পড়ে। ফলে ট্রেনের গোলমাল। সেই কারণে যে ট্রেনটি করে হরিপালে আসেন সেই ট্রেনটি তিনি ধরতে পারেন নি। একে দুর্যোগে রাত, তার ওপর ট্রেনের গোলমাল। ট্রেনের উঠার সময় তার মনে হয়েছিল যখন তিনি হরিপালে পৌঁছাবেন তখন কোন আর গাড়ি পাবেন না তবুও ঈশ্বরের ওপর ভরসা করে ট্রেনে চাপলেন। নামলেন যখন, তখন ঘড়িতে দেখলেন রাত বারোটা। এত রাত্রে তাকে নিয়ে যাবার জন্য কেউ বসে নেই একথা ভালো মতই জানতেন তিনি তাই শুরু করলেন হাঁটা। হাতে একটি টর্চ। বৃষ্টি থেমে গেলেও হালকা হাওয়া বইছে। চারদিক ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। গা ছমছম পরিবেশ। ভুতে অতটা বিশ্বাস করেন না তিনি, ফলে ভূতের ভয় নেই তার। ঈশ্বরের নাম করতে করতে বেশ জোরেই হেঁটে চলেছেন। হাঁটতে হাঁটতে রাত যখন একটার কাছাকাছি তখন এসে উপস্থিত হলেন ডাকাতিয়া পোলের কাছে। জাস্ট পোলটি পেরিয়েছেন এমন সময় উপস্থিত হল দুইজন লোক। যাদের চোখ দুটো লাল , কপালে সিঁদুরের টিপ , মাথায় লাল কাপড় বাঁধা ও হাতে লাঠি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ওরা ডাকাত। ডাকাত দুজনের মধ্যে একজন আনন্দ বাবুকে জিজ্ঞাসা করল “কে তুমি, এত রাতে কোথায় যাবে ?” আনন্দ বাবু শুকনো গলায় বলে উঠলেন “আমি রামহাটি তলায় যাব। ট্রেনের গোলমালের জন্য বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে।” ডাকাত দুজন আনন্দ বাবুকে সর্দারের কাছে ধরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলে, তখন তিনি কাতরভাবে তাদের বললেন “আমার কাছে যা টাকা-পয়সা আছে তা তোমরা নিয়ে যাও আর আমাকে যেতে দাও।” ডাকাতরা তাঁর কথা না শুনে তাঁর হাত দুটো দুজনে ধরে সর্দারের কাছে জোরপূর্বক নিয়ে গেল। ডাকাত সর্দার তখন কালীপুজো করছে। কালী পুজো করা মানেই সেই দিন তারা ডাকাতি করতে যাবে। পুজো শেষ হতেই সর্দারের চোখ পড়ল আনন্দ বাবুর দিকে। জিজ্ঞাসা করল “কে এই লোকটি ?” যারা তাঁকে ধরে এনেছিল তারা উত্তর দিল “এর বাড়ি রামহাটি তলায়।ট্রেনের গোলমালের কারনে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে। হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল তাই আপনার কাছে ধরে নিয়ে এসেছি।” সর্দার তখন বলল “ধরে যখন নিয়ে এসেছিস তবে এও আমাদের সাথে ডাকাতি করতে যাবে। একে আমাদের সাজে সাজিয়ে দে।” এই কথা বলা মাত্রই আনন্দ বাবুকে সিঁদুরের লাল টিপ পড়িয়ে দিল। হাতে ধরিয়ে দিল বোমের বস্তা। সর্দার সবার সামনে, পিছনে বাকিরা হাতে নানা অস্ত্র নিয়ে যেতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে রামহাটিতলা যখন পেরিয়েছেন, আনন্দ বাবু একদম শেষে ছিলেন , তখন তিনি ভাবছেন কিভাবে এদের কাছ থেকে পালাবেন। মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। যে দুটো ডাকাত তাঁকে ধরেছিল তাদের সাথেই পিছনে পিছনে হাঁটছিলেন। তখন আনন্দ বাবু ওই দুটো ডাকাতকে বলল “এই বস্তাটা একবার ধরবে, আমি প্রস্রাব করতে যাব। অনেকক্ষণ প্রস্রাব করা হয়নি, তোমরা এগিয়ে চলো, আমি ছুটে গিয়ে তোমাদের ধরে ফেলব।” প্রথমে ডাকাত দুজন কিছুতেই বিশ্বাস করছিল না। কিন্তু বারবার বলার পর একজন ডাকাত বলল “দাও।” সে কিছুক্ষণ আনন্দ বাবুর জন্য অপেক্ষা করে কিন্তু দেরি হচ্ছে দেখে সে আনন্দ বাবুকে বলল “আমি এগিয়ে যাচ্ছি তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো।” আনন্দবাবু তখন মাঠ ছাপিয়ে সোজা ছুটতে থাকেন। ছুটতে ছুটতে অবশেষে বাড়ি পৌঁছান। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলেন পাশের গ্রামে ডাকাতি হয়েছে। বুদ্ধির জোরেই আনন্দ বাবু ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন ।
