Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » হেঁসেল থেকে সাহিত্যে: বাঙালির ভোজন সংস্কৃতির অনন্ত যাত্রা || Jashobanta Roy

হেঁসেল থেকে সাহিত্যে: বাঙালির ভোজন সংস্কৃতির অনন্ত যাত্রা || Jashobanta Roy

অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তার ভোজনপ্রীতি ও খাদ্যসংস্কৃতি। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে যেমন একটি সমাজের জীবনযাত্রা, বিশ্বাস, অর্থনীতি ও মানসিকতার ছবি ধরা পড়ে, তেমনি খাদ্যও সেই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সাহিত্যে বারবার ফিরে আসে। তাই বাংলা সাহিত্যের প্রায় গোড়া থেকেই বাঙালির খাদ্যাভ্যাস, রন্ধনবৈচিত্র্য, আতিথেয়তা, ভোজনবিলাস এবং খাদ্যকে ঘিরে সামাজিকতার নানা ছবি ছড়িয়ে আছে। ভাষাবিদ সুকুমার সেন তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের সংস্কৃতির বিবর্তনধারা অনুধাবন করলে বুঝতে দেরী হয় না যে অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় বঙ্গভূমিতে খাদ্যের প্রকারভেদ সর্বাধিক বিচিত্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের প্রায় গোড়া থেকেই বিচিত্র খাদ্য বস্তুর উল্লেখ পাই যা অন্য কোন অঞ্চলের সাহিত্যে মেলে না।”

বাঙালির কাছে খাবার কখনোই শুধু ক্ষুধা নিবারণের বস্তু নয়। খাবার মানে আনন্দ, আতিথেয়তা, উৎসব, আপনজনকে কাছে টেনে নেওয়া। আবার খাবার কখনো অভাবের স্মৃতি, কখনো প্রাচুর্যের পরিচয়, কখনো শৈশবের দুপুর, কখনো মায়ের হাতের স্বাদ। তাই বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির ইতিহাস আসলে বাঙালির জীবনযাপনেরই এক বিকল্প ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় দলিল ছড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যে।

চর্যাপদ থেকে মঙ্গলকাব্য, কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে বৈষ্ণব সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ থেকে সুকুমার রায়, শরৎচন্দ্র থেকে সৈয়দ মুজতবা আলী—বাংলা সাহিত্যে খাবার কখনো নিছক খাবার হয়ে থাকেনি। কোথাও তা সমাজের দলিল, কোথাও চরিত্রের পরিচয়, কোথাও হাস্যরস, কোথাও স্মৃতি, কোথাও ধর্মীয় ও সামাজিক আচারের অংশ, আবার কোথাও নিখাদ রসনাবিলাস।

‘ভেতো বাঙালি’ কথাটির পেছনে রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ধান বাংলার অন্যতম প্রধান কৃষিজ উৎপাদন এবং নদী-খাল-বিলবহুল এই ভূখণ্ডের জলবায়ু ও কৃষিনির্ভর জীবন ভাতকে স্বাভাবিকভাবেই প্রধান খাদ্যে পরিণত করেছে। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙালির ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, “ইতিহাসের ঊষাকাল হইতেই ধান যে-দেশের প্রথম ও প্রধান উৎপন্ন বস্তু, সে-দেশে প্রধান খাদ্যই হইবে ভাত তাহাতে আশ্চর্য হবার কিছু নাই।”

বাংলা সাহিত্যের আদিপর্বের চর্যাপদেই ভাতের উল্লেখ পাই—“হাড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী।” হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ অতিথি আসে—এই সামান্য পঙক্তির মধ্যেই ধরা পড়েছে একদিকে খাদ্যাভাব, অন্যদিকে বাঙালির চিরন্তন আতিথেয়তার ছবি। কয়েক শতক পরে ভারতচন্দ্রের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।” অর্থাৎ ভাত শুধু খাদ্য নয়, হয়ে ওঠে নিরাপত্তা, প্রাচুর্য ও কল্যাণের প্রতীক। ধর্ম-বর্ণ-আঞ্চলিকতার সীমানা পেরিয়ে দুধ-ভাত আজও বাঙালির শুভকামনার অন্যতম চিরন্তন প্রতীক।

বাঙালির খাদ্যরুচির আরেক স্বাতন্ত্র্য তার তেতোপ্রেমে। শুক্তো বা তেতো বাঙালির রান্নায় এমন একটি পদ, যার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। চৈতন্যচরিতামৃত থেকে মুকুন্দরামের রচনা—বিভিন্ন সাহিত্যে এর উল্লেখ রয়েছে। কৃষ্ণদাস কবিরাজ মহাপ্রভুর ভোজনের প্রসঙ্গে লিখেছেন—

“সামুদ্রিক শাক আর বিবিধপ্রকার
পটল কুষ্মাণ্ড বড়ি মানকচু আর
রাইমরিচ শুক্তো দিয়া কন্দ মূল ফলে
অমৃতনিন্দক পঞ্চবিধ তিক্ত ঝোলে।”

অন্য এক পদে শিব গৌরীকে বলেন—
‘‘আজি গৌরি রান্ধিয়া দিবেক মনোমত
নিম শিম বেগুণে রান্ধিয়া দিবে তিত
সুকুতা শীতের কালে বড়ই মধুর
কম্মাণ্ড বার্তাকু দিয়া রান্ধিবে প্রচুর
ঘৃতে ভাজি শুকতাতে ফেলহ ফুলবড়ি
চোয়া চোয়া করিয়া ভাজহ পলাকড়ি।”

তেতো দিয়ে আহার শুরু করার এই রীতি বাঙালির স্বাদবোধের এক অনন্য পরিচয়।

ভাতের মতোই মাছ বাঙালির খাদ্যপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নদী, খাল, বিল ও জলাভূমিতে সমৃদ্ধ বাংলায় মাছ ছিল সহজলভ্য খাদ্য; ফলে মৎস্যপ্রেমের শিকড় প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার গভীরে। নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায়, “বারিবহুল, নদনদী-খালবিল বহুল … বাঙলায় মৎস্য অন্যতম প্রধান খাদ্যবস্তু রূপে পরিগণিত হইবে, ইহা কিছু আশ্চর্য নয়।” সেই মাছের তালিকায় রুই, কাতলা, কই, মাগুর, চিতল, চিংড়ি থেকে ইলিশ—অসংখ্য নাম। অঞ্চলভেদে রান্নার ধরনও বদলেছে; কিন্তু মাছ বাঙালির পাতে ও সাহিত্যে সমান গুরুত্বে থেকেছে।

মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর রচনায় পাওয়া যায়—

“ঘৃতে ভাজাপলা কড়ি, উনটা শাকে ফুলবড়ি
চিংড়ি কাঁঠালবীচি দিয়া”; আবার “ভাজে চিতলের কোল রোহিত মৎস্যের ঝোল
মান বড়ি মরিচে ভূষিত।”

দ্বিজ বংশীদাসের ‘মনসামঙ্গল’এ কই, কাতল, মাগুর, চিতল, ইলিশ, বাচা, ভাঙ্গনা, শউল—নানা মাছের বিচিত্র রান্নার বর্ণনা রয়েছে। তিনি লিখছেন –

“বড় বড় কই মৎস্য, ঘন ঘন আঞ্জি
জিরা লঙ্গ মাখিয়া তুলি তৈলে ভাজি।
কাতলের কোল ভাজে, মাগুরের চাকি।
চিতলের কোল ভাজে রসবাস মাখি
ইলিশ তলিত করে, বাচা ও ভাঙ্গনা।
শউলের খণ্ড ভাজে আর শউল পোনা।।”

বরিশালের বিজয় গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’এও রোহিত, মাগুর, চিংড়ি, কৈ প্রভৃতি মাছ নানা মশলা ও সবজির সঙ্গে রান্নার উল্লেখ পাওয়া যায়। বাঙালির মৎস্যপ্রীতি প্রসঙ্গে উনিশ শতকের খাদ্যরসিক কবি ঈশ্বর গুপ্ত যা লিখে গেছেন তা একবারে যথার্থ কথা।

“ ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালি সকল
ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল”।

এসব বর্ণনা শুধু রসনাবিলাসের দলিল নয়; এগুলি আমাদের জানায় তৎকালীন বাংলার খাদ্যসম্পদ ও রন্ধনপ্রণালীর কথাও।

মাছের প্রসঙ্গ উঠলে শেষ পর্যন্ত বাঙালির মন যেন ইলিশে গিয়ে থামে। রসরাজ অমৃতলাল বসু লিখেছেন—

“কাঁচা ইলিশের ঝোল কাঁচা লঙ্কা চিরে
ভুলিবে না খেয়েছে যে বসে পদ্মাতীরে।”

সর্ষে দিয়ে ইলিশের প্রসঙ্গে তাঁর রসিক উচ্চারণ—

“সর্ষে-বাটা দিয়ে তাতে মাখাইয়া দধি
আ মরি আহার হবে রেঁধে খাও যদি।”

আর বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘গোলাপ কেন কালো’ উপন্যাসে ইলিশের ভাজা, সর্ষেতে ভাপানো, কলাপাতায় পোড়া পাতুরি, কচি কুমড়োর সঙ্গে ঝোল, ল্যাজা-মুড়োর অম্বল—একটির পর একটি পদের বর্ণনা দিয়েছেন। ইলিশকে তিনি বলেছিলেন “জলের উজ্জ্বল শস্য”। খাদ্যের প্রতি এই নান্দনিক আবেগই ইলিশকে কেবল একটি মাছের পরিচয় ছাড়িয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ করে তুলেছে।

তবে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি শুধু মাছনির্ভর নয়। আমিষের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মাংস। চর্যাপদে আছে—“আপনা মাংসে হরিণা বৈরী।” ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল-এ কচি ছাগ ও মৃগমাংসের ঝোল, কালিয়া, দোল্মা, কাবাব প্রভৃতি রান্নার উল্লেখ আছে—

“কচি ছাগ মৃগ মাংসে ঝোল ঝোল রসা
কালিয়া দোল্মা বাঘা সেক্চি সমসা।”

বিজয়গুপ্ত তাঁর মনসামঙ্গল-এ লিখেছেন,

“মাংসতে দিবার জন্য ভাজে নারিকেল,
ছাইল খসাইয়া রান্ধে বুইড়া খাসীর তেল”।

অর্থাৎ আমিষ ও নিরামিষ—দুই ধারাই বাঙালির হেঁসেল ও রসনায় পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে।

বাঙালির ভোজনবোধ শুধু উপকরণের বৈচিত্র্যে নয়, স্বাদের বৈচিত্র্যেও অনন্য। সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন, “আমরা তেতো, নোনা, ঝাল, টক, মিষ্টি—এই পাঁচ রস দিয়ে ভোজন সমাপন করি।” শংকর আরও একটি স্বাদ যোগ করে বলেছেন—ঝাল, নোনতা, মিষ্টি, তিক্ত, অম্ল ও কষায়। শুক্তোর তেতো, ডালের নোনতা, মাছের ঝাল, অম্বলের টক এবং শেষে মিষ্টির মাধুর্য—বাঙালির ভোজন যেন একটি পূর্ণাঙ্গ রসনানাট্য।

তবে ভোজনের শেষে এসে বাঙালির রসনায় যে অধ্যায়টি সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সেটি মিষ্টির অধ্যায়। আমিষ বা নিরামিষ যা-ই খাওয়া হোক, শেষ পাতে মিষ্টিমুখ না হলে বাঙালির খাওয়া যেন অসম্পূর্ণ। মিষ্টি শুধু খাদ্য নয়, সামাজিকতার ভাষাও। জন্ম, বিবাহ, পরীক্ষায় সাফল্য, চাকরি, নতুন বাড়ি, পূজা কিংবা অন্য কোনো শুভ সংবাদ—প্রায় প্রতিটি আনন্দের সঙ্গে মিষ্টি জড়িয়ে আছে।

মাছের মতো মিষ্টি পদও বাঙালির সেকালে শুধু নয়, আজও প্রিয়। দ্বিজ বংশীদাস তাঁর মনসামঙ্গল কাব্যে সনকার মিষ্টান্নপাকের এক সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন—

“কত যত ব্যঞ্জন যে নাহি লেখা জোখা।
পরমান্ন পিষ্টক যে রান্ধিছে সনকা।
ঘৃত পোয়া চন্দ্রকাইট আর দুগ্ধপুলি।
আইল বড়া ভাজিলেক ঘৃতের মিশালি।
জাতি পুলি ক্ষীর পুলি চিতলোটী আর।
মনোহরা রান্ধিলেক অনেক প্রকার”।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ কবিবর ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে তাঁর সময়ের মিষ্টান্ন পাক নিয়ে লিখেছেন —

“অম্বল রাধিয়া রামা আরম্ভিলা পিঠা।
বড়া হলো আশিকা পিয়ুষী পুরি পুলি
ছুটি রুটি রাম রোট মুগের শামুলী।
কলাবড়া ঘিওর পাঁপর ভাজা পুলি
সুধা রুচি মুচি মুচি লুচি কতগুলি।
পিঠা হৈল পরে পরমান্ন আরম্ভিল” ইত্যাদি ইত্যাদি।

শ্রী চৈতন্যের মিষ্টান্নের প্রতি অনুরাগের কথা কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত গ্ৰন্থে লিখেছেন –

“ঘৃত দধি সর নবনী পিষ্টক
নানাবিধ শর্করা সন্দেশ কদলক”।

রবীন্দ্রনাথের শৈশবের খাদ্যকল্পনাও বাঙালির মিষ্টিপ্রেমকে অন্য মাত্রা দিয়েছে—

“আমসত্ত্ব দুধে ফেলি
তাহাতে কদলি দলি
সন্দেশ মাখিয়া লও তাতে…”।

তাঁর ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায় “সন্দেশ পান্তোয়া” যেমন ভোজের আনন্দের অংশ, তেমনি ‘নৌকাডুবি’-তে কমলার রান্না করা রুইয়ের মুড়ো রমেশের বিস্ময় জাগায়। এইভাবে খাদ্য প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে তাঁর ছোটগল্প, উপন্যাস এবং কবিতায়। খাদ্য এখানে নিছক আহার নয়; তা চরিত্র, সম্পর্ক, স্নেহ ও আতিথেয়তার ভাষা।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে খাবার আবার হাস্যরসেরও অসাধারণ উপাদান। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদার ভোজনপ্রিয়তা তার অন্যতম উদাহরণ—“সের-দুই মাংসের সঙ্গে ডজন খানেক কাটলেট তো খেলই—এর পরে প্লেট-ফ্লেটসুদ্ধ খেতে আরম্ভ করবে এমনি আমার মনে হল।” শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু ও সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনাতেও খাদ্য কখনো চরিত্র, কখনো পরিবেশ, কখনো স্মৃতি, আবার কখনো রসবোধের বাহন হয়েছে।

সময়ের সঙ্গে বাঙালির হেঁসেল অবশ্যই বদলেছে। দেশভাগ, নগরায়ণ, অভিবাসন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের পারস্পরিক সংযোগ বাঙালির খাদ্যতালিকায় এনেছে নতুন বৈচিত্র্য। ঐতিহ্যবাহী ভাত-মাছ, শুক্তো, পিঠে-পায়েস, সন্দেশের পাশাপাশি মুঘলাই, চাইনিজ, কন্টিনেন্টাল, ফাস্ট ফুড কিংবা নানা ধরনের ফিউশন রান্নাও আজ বাঙালির খাদ্যজগতে জায়গা করে নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রান্নার ভিডিও, ফুড-ব্লগ এবং রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি সেই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করেছে। তবু আধুনিকতার এই প্রবল স্রোতের মধ্যেও উৎসবের পিঠে, শীতের নলেন গুড়, বর্ষার খিচুড়ি, সর্ষের ইলিশ কিংবা মায়ের হাতের রান্না বাঙালিকে তার শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে আনে।

তাই ‘বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি’ কোনো একরৈখিক বিষয় নয়। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, রাঢ় ও পূর্ববঙ্গ, শহর ও গ্রাম, নানা সম্প্রদায় ও পারিবারিক ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এই বহুস্বরিক খাদ্যজগৎ। কোথাও সর্ষের তেল ও ইলিশ, কোথাও শুঁটকি, কোথাও পোস্ত, কোথাও মাংসের বিশেষ রান্না, কোথাও পিঠাপুলি—এই বৈচিত্র্যই বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির প্রকৃত সৌন্দর্য। বাংলা সাহিত্য সেই বহুত্বের বহু কিছুই সংরক্ষণ করে রেখেছে।

চর্যাপদের হাঁড়ির ভাত থেকে ভারতচন্দ্রের দুধে-ভাত, মঙ্গলকাব্যের মাছ-মাংস থেকে রাজকীয় ভোজ, চৈতন্যসাহিত্যের শুক্তো ও পিষ্টক থেকে রবীন্দ্রনাথের আমসত্ত্ব-দুধ-সন্দেশ, টেনিদার অমিত ভোজন থেকে বুদ্ধদেব বসুর “জলের উজ্জ্বল শস্য” ইলিশ—শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালির খাবার সাহিত্যের পাতায় নিজের আসন করে নিয়েছে।

এই দীর্ঘ যাত্রায় রান্না বদলেছে, উপকরণ বদলেছে, রন্ধনপ্রণালী বদলেছে; বদলেছে জীবনযাত্রা, সমাজ ও সময়। এসেছে বিশ্বায়ন, বদলেছে হেঁসেল। কিন্তু খাবারকে ঘিরে বাঙালির আবেগের মূল সুরটি বদলায়নি। কারণ খাবার মানে শুধু আহার নয়—খাবার মানে স্মৃতি, সম্পর্ক, আতিথেয়তা, উৎসব এবং পরিচয়। একটি পুরোনো রান্নার গন্ধ ফিরিয়ে আনে শৈশব, একটি মাছের পদ মনে করিয়ে দেয় নদীর পাড়, একটি মিষ্টি হয়ে ওঠে কোনো শুভদিনের স্মারক, আর মায়ের হাতের রান্না হয়ে ওঠে জীবনের অমূল্য সম্পদ।

তাই বাঙালির ভোজনসংস্কৃতির ইতিহাস আসলে তার আত্মপরিচয়েরও ইতিহাস। হেঁসেলে যে খাবারের জন্ম, তা পাতে এসে পরিণত হয় আনন্দে; পাত থেকে প্রবেশ করে সাহিত্যে; আর সাহিত্য থেকে বেঁচে থাকে স্মৃতিতে। হেঁসেল থেকে পাতে, পাত থেকে সাহিত্যে, সাহিত্য থেকে স্মৃতিতে—বাঙালির ভোজনের এই যাত্রা তাই সত্যিই অনন্ত।

ঋণ স্বীকার:

১। অংশুমান চক্রবর্তী, ‘বাংলা সাহিত্যে খাবার’, “জাগো বাংলা”, ১৬ অক্টোবর, ২০২২।
২। নিরুপমা রহমান, ‘হেঁসেল থেকে হৃদয়: বাঙালির স্বাদ আর সাধের মেলবন্ধন’, “কালি ও কলম”, সেপ্টেম্বর, ২০২২।
৩। আলপনা ঘোষ, ‘রসে বশে বঙ্গ সাহিত্য’, ‘অপার বাংলা”, অক্টোবর সংখ্যা, ২০২১।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *