সমকাল, সমাজ ও মানবমুক্তি: পরমানন্দের কাব্যদর্শন
সমকাল মানুষের চিন্তা, চেতনা ও সৃজনপ্রক্রিয়াকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সাহিত্য, বিশেষত কবিতা, সময়ের অভিজ্ঞতাকে নান্দনিক রূপে ধারণ করে। ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে সৃষ্ট কালজয়ী কাব্যসমূহে সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতা ও মানসিকতার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতায় পরমানন্দ সরস্বতী (পূর্বাশ্রমের নাম শ্রী মৃনাল কান্তি দাশ) এই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হলেও তাঁর কাব্যে আধ্যাত্মিকতা ও সমাজসচেতনতার এক অভিনব সমন্বয় দেখা যায়। তাঁকে কেবল সাধক-কবি বা প্রেমের কবি হিসেবে চিহ্নিত করলে তাঁর কাব্যমানসের সামাজিক ভিত্তি আড়াল হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে তাঁর কাব্যের অন্তঃসার জুড়ে রয়েছে এক গভীর সমাজদর্শন যার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ, মানবিক মর্যাদা, ইতিহাস চেতনা এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ।
পরমানন্দ সরস্বতীর জন্ম ১৯১৫ সালের ১৫ জুলাই, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। কৈশোর ও যৌবনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, সাম্রাজ্যবাদী সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট এবং চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁর সংবেদনশীল মনে গভীর রেখাপাত করে। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে মানুষের দুর্দশা ও দুঃসহ বেদনা তাঁর কোমল হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করে। শৈশব থেকে যৌবন—দুই বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর ভাবনা, বোধ ও কবিতার ভেতর এক গভীর মানবিক সুরের জন্ম দিয়েছিল। আধ্যাত্মিক জীবনবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে গঠিত তাঁর কাব্যচিন্তা বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র মাত্রা সংযোজন করেছে। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতায় যখন জীবনানন্দ দাশ অস্তিত্বসঙ্কট ও নিঃসঙ্গতার অনুভবকে গভীরতর করেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় গণমানুষের সংগ্রামকে কাব্যের বিষয় করে তোলেন এবং বিষ্ণু দে ইতিহাসচেতনা ও মননশীল আধুনিকতার দিকটি উন্মোচন করেন, তখন পরমানন্দ সরস্বতী আধ্যাত্মিক মানবতাবাদ ও সমাজসচেতনতাকে একত্রিত করে এক স্বতন্ত্র কাব্যভুবন নির্মাণ করেন। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই তাঁর কাব্যচিন্তা বাংলা আধুনিক কবিতার ধারায় একটি স্বকীয় অবস্থান অধিকার করে।
পরমানন্দের সমাজভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে বাংলা তথা ভারতের সমাজজীবনে যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল তার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর কবিতায়। ‘আকাশ’ শীর্ষক কবিতায় তিনি লেখেন—
“বিবর্ণ, পাণ্ডুর দিন রুক্ষ রৌদ্রে পড়ে ঝরে ঝরে,
হে আকাশ, নীল-রাত হেমন্তের নক্ষত্রের জল
নিবিড় ঘুমের মতো ঝরে কোথা পৃথিবীর প’রে—
কোথাও উধাও সেই সুন্দর সকাল।”
‘বিবর্ণ, পাণ্ডুর দিন’—উল্লেখের মধ্য দিয়ে কবি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত দিনগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। ‘কোথাও উধাও সেই সুন্দর সকাল’–এই পঙতির মাধ্যমে কবি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসে, তার ইঙ্গিত প্রতীকের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন। পরমানন্দ সরস্বতীর একটি ব্যক্তিগত পত্র থেকে তাঁর মানবমুখী জীবনদর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়। কবি লিখছেন, “শৈশব থেকে এক স্বপ্ন দেখছি এই পৃথিবীর মানুষের ঘরে ঘরে আনন্দের দীপ জ্বলুক, মুছে নিক বেদনার অন্ধকার –সুন্দর হোক, শান্তির হোক সকলের জীবন, মাটির ঘরে নেমে আসুক স্বর্গ…”
মানুষের ঘরে ঘরে আনন্দের দীপ জ্বালানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর জীবনসাধনা। মানুষের ঘরে ঘরে আনন্দ, শান্তি ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা তাঁর সমাজচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।
পরমানন্দ সর্বার্থে একজন সমাজসচেতন কবি ছিলেন। তাঁর জীবনসাধনা ও আধ্যাত্মসাধনার মূল কেন্দ্রে ছিল ‘মানুষ’। তিনি সমাজকে কোনো বিমূর্ত কাঠামো হিসেবে দেখেননি; সমাজ মানে মানুষ—দুঃখী, বঞ্চিত, সংগ্রামী মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, কবিতার কাজ শুধু নান্দনিক তৃপ্তি দেওয়া নয়; বরং মানুষের জীবনবোধকে জাগ্রত করা। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজের প্রকৃত রূপান্তর ঘটতে পারে মানুষের অন্তর্লোকের পরিবর্তনের মাধ্যমে। পরমানন্দ আত্মমুক্তিকেই তাঁর জীবনের একমাত্র অভীষ্ট বল গণ্য করেন নি, সর্বমানবের কল্যাণ সাধনই ছিল তাঁর জীবন সাধনা। তিনি বলেছেন, ‘শুধু নিজের সুখের চিন্তা যে করে, সে বড় হীন মানুষ –সে শুধু আসে যায়, অন্ধকারে হারিয়ে যায় একদিন। যে আন্তরিক ভাবে বহুর কল্যাণ চিন্তা করে না, সে বহুর মধ্যে বাঁচে না–সে বাঁচার গৌরব কোথায়? নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দিলে, নিজেকে নবভাবে পূর্ণ করে পাওয়া যায়।’ কবি-সন্নাসী পরমানন্দ এটা বিশ্বাস করতেন যে একক ব্যক্তির চেষ্টায় সমাজের ব্যাপক কল্যাণ সাধিত হয় না। এরজন্য প্রয়োজন সব মানুষের সমবেত প্রচেষ্টা। এটাই মানুষের পূর্ণতার সাধনা। তাই তিনি বলেন, ‘শুধু আমার দেশ, আমার জাতি বড় হোক, সুখে থাকুক — তা আমি চাই না। জগতের সমস্ত মানুষ,পশু, পাখি, বৃক্ষলতা প্রভৃতির সুস্থ, সুন্দর প্রকাশ হোক, সার্বিক কল্যাণ হোক–এই আমি চাই। সর্বাত্মক কল্যাণ ছাড়া কারও কল্যাণ হতে পারে না।’ তাই তাঁর সমাজদর্শন সার্বিক কল্যাণের সার্বজনীন আকাঙ্ক্ষায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সমাজচিন্তা মানবতাবাদী ও কল্যাণকামী। পরমানন্দ সরস্বতীর সমাজচিন্তায় ‘মানবমুক্তি’ একটি মৌলিক ধারণা। তাঁর কাছে মুক্তি কেবল ব্যক্তিগত মোক্ষলাভ নয়; বরং মানুষের সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, হিংসা ও বিভেদের ঊর্ধ্বে উত্তরণ। তাই তাঁর কাব্যে আত্মজাগরণ ও সমাজজাগরণ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত হয়ে উঠেছে। মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর না হলে সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়—এই বিশ্বাস থেকেই তিনি মানবমুক্তিকে নৈতিক ও আত্মিক মুক্তির সমন্বিত রূপ হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে সত্যিকারের মুক্তি মানে এমন এক মানবসমাজ, যেখানে ব্যক্তি ও সমষ্টির কল্যাণ একসূত্রে গাঁথা।
সমকাল যখন অনিশ্চয়তা, ধ্বংস ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ে বিপর্যস্ত, তখন কবি কেবল রোমান্টিক আবেগে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সংগ্রামী চেতনার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘দিগন্ত’ কাব্যগ্রন্থের ‘বিরোধ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“কোথা হতে এলো জন-সমুদ্রে ঝড়
আকাশ দীর্ণ পুড়ে ছাই প্রান্তর
পিশাচ আলোয় মৃত্যুর বিভীষিকা
ললাটে অনেক লাঞ্ছনা লিখা
হে কবি-কিশোর দৈব দুর্বিপাক লও তলোয়ার
লেখনীটি তোলা থাক।”
এখানে কবি প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ভাষা ব্যবহার করেছেন। ‘লেখনী’ ও ‘তলোয়ার’-এর দ্বৈত প্রতীক কাব্য ও কর্মের সমন্বিত রূপকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, কাব্য তাঁর কাছে নিছক রোমান্টিক বিলাস নয়; বরং তা সামাজিক প্রতিরোধ ও নৈতিক জাগরণের হাতিয়ার। এখানে কবির দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও সংগ্ৰামী মনোভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কবি সমাজকে সুন্দর করে তুলতে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। পরমানন্দের কাব্যদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর প্রতীকচেতনা ও নন্দনভাবনা। তাঁর কবিতায় ‘আকাশ’, ‘আলো’, ‘অন্ধকার’, ‘দীপ’, ‘ভোর’ প্রভৃতি প্রতীক বারবার ফিরে এসেছে। এসব প্রতীক কখনো মানবমনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, কখনো নৈতিক জাগরণ, আবার কখনো সামাজিক মুক্তির ইঙ্গিত বহন করে। তাঁর ভাষা গীতিধর্মী ও আবেগঘন হলেও তার অন্তরালে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য নিহিত থাকে। প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও মানবপ্রেমের সম্মিলনে তাঁর কবিতায় এক স্বতন্ত্র নন্দনভুবনের সৃষ্টি হয়েছে।
পরমানন্দের সমাজচিন্তার একটি অন্যতম ভিত্তি তাঁর গভীর ইতিহাসচেতনা। তিনি সমাজবাস্তবতাকে কখনো বিচ্ছিন্ন বর্তমানের প্রেক্ষিতে দেখেননি; বরং ইতিহাসের অবিরাম স্রোতের মধ্যে তার ব্যাখ্যা খুঁজেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে মানবসভ্যতার উত্থান-পতন, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা নৈতিক অবক্ষয়—এসব কেবল সাময়িক বিচ্যুতি নয়; এগুলো মানবচরিত্রের চিরন্তন পুনরাবৃত্ত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। সমকালীন ইতিহাসের রূপকার ছিলেন কবি পরমানন্দ। চল্লিশ দশকের মারণযজ্ঞের কথা তিনি কবিতায় লিখে রেখেছেন—
“মৃত্যু-শকুনি শূন্যে মেলেছে পাখা। / চৌদিকে বাজে ঝঞ্ঝার করতাল— / পুরোনো দিনের ব্যর্থ পরিক্রমা, / ফুরিয়েছে আজ যত ফসলের কাল।” (দিনান্ত : আকাশ) ভাঙনমুখর সময়ের বিধ্বস্ত ছবি ফুটে উঠেছে এখানে। চল্লিশের দশকের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের বিপর্যস্ত রূপ উদ্ভাসিত হয়েছে। বিশ্ব-মহাসমরের দামামায় পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ তখন ভীত-সন্ত্রস্ত। মৃত্যুদূতেরা মানুষের দরজায় মুহুমুহু কড়া নাড়ছে, কিন্তু—
“উৎসব শেষ মৃত পাণ্ডুর চাঁদ / আহত নগরী— শূন্য সরাইখানা / অন্ধকারেতে থেকে থেকে শোনা যায় / শোনা যায় কার সকরুণ কান্না।” (দিনান্ত : আকাশ)
আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এই ‘সকরুণ কান্না’ পীড়িত মানবজাতির কান্না; ‘আহত নগরী’র রূপকে সমকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকেই রূপায়িত করেছেন পরমানন্দ। ইতিহাসকে তিনি কোনো মৃত অতীত হিসেবে দেখেননি; বরং মানবচরিত্রের অন্তর্লীন প্রবণতার ধারাবাহিক প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাই সমকালীন বিপর্যয়ও তাঁর কাছে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—তা বৃহত্তর মানবিক ও নৈতিক সংকটেরই অংশ। পরমানন্দ ইতিহাসকে কেবল ঘটনাপুঞ্জ হিসেবে দেখেননি; তিনি ইতিহাসের অন্তর্নিহিত নৈতিক শিক্ষা অনুসন্ধান করেছেন। তাই যুদ্ধ, ধ্বংস কিংবা সামাজিক অবক্ষয়ের বর্ণনা তাঁর কবিতায় নিছক সময়ের দলিল হয়ে ওঠেনি; বরং মানবসভ্যতার আত্মসমালোচনার ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই ইতিহাসসচেতন দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর সামাজিক চেতনাকে তাৎক্ষণিক আবেগ বা প্রতিক্রিয়ার সীমা অতিক্রম করে এক গভীর দার্শনিক স্তরে উন্নীত করেছে।
সন্ন্যাস গ্রহণের পর পরমানন্দের জীবনযাত্রায় আধ্যাত্মিকতার প্রবল প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু এই আধ্যাত্মিকতা সমাজবিমুখ নয়। সংসার বিবাগী হয়েও পরমানন্দ জগৎ সংসার সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন না। মানুষের দুঃখ-বেদনা, দেশের অন্নাভাব, অসাস্থ্য, অশিক্ষা তাঁর দৃষ্টি এড়ায় নি। বরং তাঁর জীবন দর্শনে আধ্যাত্মিক চেতনা মানবকল্যাণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর ধারণা ছিল নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি ছাড়া সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই তিনি ব্যক্তিমানুষের অন্তরজাগরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পরমানন্দ বলেছেন আত্ম-সর্বস্ব হয়ে বাঁচার মধ্যে কোন সার্থকতা নেই। এতে যেমন আত্মিক কল্যাণ হয় না, তেমনি হয় না সামাজিক কল্যাণ। সমাজদরদী, মানবপ্রেমিক কবি পরমানন্দ তাঁর ‘আহিতাগ্নি’ কাব্যগ্ৰন্থের একটি কবিতায় লিখছেন:
‘বিদ্যা রূপ ধন মানে
প্রেম নাহি খিলে
প্রেম হয় আপনার
আপনারে দিলে।’
তিনি বলেছেন, ‘দুদিনের সংসারে সোনার বাতি হয়ে জ্বলবে। শুধু ছাই, ধূলিমুষ্টিতে যেন পূর্ণ না হয় জীবন-পাত্র। নিজের সুখটাকে বড় করে দেখা, ভাল খাওয়া, ভাল পরার চিন্তা অপরাধ।বহুর কল্যাণের জন্য নিজের সুখকে বলি দেবে, মহানিশার অন্ধকারে সত্যের আলো জ্বেলে রাখবে।’ ভারতীয় সনাতন ভাবধারার বহুজনের কল্যাণের আদর্শ যাতে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মনে উদ্বোধিত হয় সেজন্য কবি-সন্নাসী পরমানন্দ পশ্চিম বঙ্গ ও আসামের বিভিন্ন স্থানে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আশ্রমগুলো কেবল ধর্মীয় সাধনার কেন্দ্র ছিল না; সেগুলো মানবসেবা, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সহমর্মিতার ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করত। এর মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিক জীবনবোধকে সমাজকল্যাণের বাস্তব কর্মধারার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে কেবল সমাজসংস্কারক নয়, আত্মসংস্কারের পথপ্রদর্শক হিসেবেও চিহ্নিত করে।
পরমানন্দ সরস্বতীর কবিতায় কোন রাজনৈতিক ভাষ্য নেই কিন্তু স্বদেশ, সমাজ ও সমকালকে তিনি উপেক্ষা করেননি। সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করেননি কোনভাবেই। সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা স্বীকার করে কবি লিখছেন, “কবিতা হবে শুধু সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্খার উদ্দেশ্যহীন তীব্র, তীক্ষ্ণ অনুভূতির অভিব্যক্তি,–চিত্রল প্রকৃতির বর্ণনা, –গানের মত সরস সুন্দর প্রাণের কথামালা, কতকগুলি ভাব ও রসের কথা–যা নিজেকে অভিনব রূপে ব্যক্ত করবে, প্রকাশ করবে–সমকালীন সমাজজীবনের সমস্যার দেবে নিখুঁত নির্ভুল রূপ–কোন পথ দেখাবে না তা নয়। কবিতার কাছেও আমরা কিছু পেতে চাই—শুধু তৃপ্তি নয়, কবিতা দেবে আলো, দেবে অভয় দুঃখ, বেদনা, অন্ধকার কবলিত মানবাত্মাকে জ্যোতির্ময় উত্তরাধিকার।” তাঁর মতে, কবিতা কেবল রোমান্টিক অনুভূতির প্রকাশ নয়; এটি আলোকবর্তিকা। কবিতা শুধু তৃপ্তি দেবে না, কবিতা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করবে, তমসাচ্ছন্ন মানবাত্মাকে আলোর দিশা দেখাবে। এই বক্তব্যে কবিতার সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা সুস্পষ্ট। কবিদের সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে পরমানন্দ সচেতন ছিলেন। বর্তমান সময়েও পরমানন্দের এই কাব্যভাবনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বর্তমান সময়ে যখন ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও সামাজিক বিভাজন মানবিক মূল্যবোধকে ক্রমশ সংকুচিত করছে, তখন পরমানন্দের কাব্যচিন্তা মানুষকে সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও অন্তর্জাগরণের শিক্ষা দেয়। এই কারণেই তাঁর কবিতার সামাজিক তাৎপর্য আজও অক্ষুণ্ণ। তাঁর কাব্যচিন্তা কেবল তাঁর সময়েই সীমাবদ্ধ নয়; তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
পরমানন্দ সরস্বতীর সমাজদর্শনের একটি সীমাবদ্ধতা হলো, তিনি সামাজিক সংকটের সমাধান প্রধানত নৈতিক ও আত্মিক জাগরণের মধ্যে অনুসন্ধান করেছেন। ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য, শ্রেণিশোষণ বা রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কিত প্রশ্ন তাঁর কাব্যচিন্তায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। এই কারণে তাঁর মানবমুক্তির ধারণা অনেক সময় আদর্শবাদী বলে মনে হতে পারে। তবে এই সীমাবদ্ধতা তাঁর কাব্যচিন্তার গুরুত্বকে খর্ব করে না; বরং এটিই তাঁর স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করে। কারণ তিনি সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি হিসেবে মানুষের অন্তর্লোকের রূপান্তরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন এবং মানবকল্যাণের প্রশ্নকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন।
সবশেষে বলা যায়, পরমানন্দ সরস্বতীর কাব্যদর্শন মানবিকতা, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর কবিতা ছিল সমাজসচেতন আত্মার ভাষা—যার উদ্দেশ্য মানুষের অন্তরে আলো জ্বালানো। তিনি কেবল সন্ন্যাসী কবি নন; তিনি এক মানবতাবাদী সমাজচিন্তক, যিনি বিশ্বাস করতেন—সত্যিকারের পরিবর্তন শুরু হয় মানুষের অন্তর থেকে, আর সেই অন্তরজাগরণেই সমাজের মুক্তি নিহিত। এই কারণেই পরমানন্দ সরস্বতীর কাব্যদর্শন বাংলা সাহিত্যে কেবল আধ্যাত্মিক কাব্যধারার অংশ নয়; তা মানবমুক্তি ও সামাজিক পুনর্জাগরণের এক গভীর জীবনদর্শন হিসেবেও মূল্যবান। তাঁর কবিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের অন্তর্লোক আলোকিত না হলে সমাজের মুক্তিও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তথ্যসূত্র:
১. পত্রসাহিত্যে শ্রীপরমানন্দ (সম্পা. সুনীলেন্দ্র চৌধুরী)। সারস্বত সংস্কৃতি সংস্থা, কলকাতা।
২. সরস্বতী, পরমানন্দ। পরমানন্দ কাব্যসমগ্র। সারস্বত সংস্কৃতি সংস্থা, কলকাতা ২০০৫।
৩. ভট্টাচার্য, জগদীশ। হে মহাজীবন: স্মরণ অর্ঘ্য। কলকাতা: সারস্বত সংস্কৃতি সংস্থা।
৪. চক্রবর্তী, ডঃ অভিজিৎ, ‘বিশ শতকের চল্লিশের উত্তাল প্রেক্ষিত: কবি পরমানন্দ সরস্বতী’, IRJIMS,Vol-1, I
ssue IX, October, 2015.
