সামাজিক গুণ
“হ্যালো”
“ভাই তেরে পাশ কৌনসা কলেজ কে অপশন আয়া”
“চণ্ডীগড় আউর কাটরা। তেড়ে পাশ?”
“মেরে ইধার তো কলসে স্টার্ট হায়। হাম দোনো কো এক সাথ হো জায়ে তো মজা আ জায়গা।”
“কিপিং ফিঙ্গার ক্রস”
“বহুত টেনশন হো রাহা হ্যায় ভাই, দেখতে হায় কিয়া হোতা হয়। গুড নাইট ভাই” বলে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে ফোনটা কেটে দেয় বিজন।
নিটের ফল প্রকাশের পর এখন শুরু হয়েছে কাউন্সেলিং পক্রিয়া। কোন ছাত্র কোন কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাবে তার জন্য চলছে প্রস্তুতি। বাচ্চাদের সাথে সাথে অভিভাবক দের কাছেও, একটা বড় চিন্তার বিষয়। বিজন এবং juben এই বছরের নিট পরীক্ষার্থী। একজন পরীক্ষা দিয়েছে কলকাতা থেকে অন্যজন জম্মু থেকে।
পরের দিন সকালে সময়ের আগেই বিজন উপস্থিত হলো কাউন্সেলিং প্রসেস এর সম্মুখীন হতে। বিভিন্ন পদ্ধতির পর বিজন এর কাছে দুটো কলেজের অফার দিলো কর্তৃপক্ষ একটি রায়গঞ্জে এবং অন্যটি হলো ধানবাদে। বিজনের কাছে দুটো প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য বলে মনে হলেও, সে জিজ্ঞাসা করলো “মুঝে চণ্ডীগড় যা কাটরা মিল জায়গা?” কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে বলল, “চণ্ডীগড় is not possible but we can offer for Katra”। বিজন সঙ্গে সঙ্গে বলে বসলো ” স্যার, I would prefer for Katra location, please”. Counselling রত আধিকারিকেরা আর কোনো অতিরিক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করে “ok” বলে নির্দিষ্ট ফর্মে স্বাক্ষর করে দিলেন।
ঘর থেকে বাইরে এসে একগাল হাসি নিয়ে বাবার গলাটা জড়িয়ে ধরে বিজন। পুরো ব্যাপারটা বাবা – মা কে জানায় সে। তাঁরাও কোনও অমত করলেন না আর তাছাড়া অমত করলেও আর নতুন করে কোন পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না। বিজন, সঙ্গে সঙ্গে তার এই সিলেকশন এর কথাটা ফোন করে জানালো juben কে। দুই বন্ধুর একসাথে কাটরা মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ হয়ে গেলো ডাক্তারি পড়ার।
বছর চারেক আগে প্রথম দেখা হয়েছিল জুবেন আর বিজনের, শ্রীনগরে।
একদিন রাতে ডিনার টেবিলে বসে বরুণ বাবু বললেন –
” আচ্ছা, প্রতিবার তো আমরা পুজোটা কলকাতাতে কাটাই, এবার যদি একটু ঘুরতে যাই, তাহলে কেমন হয় ?”
“দারুণ হবে, বাবা। ” , বলে উঠলো বিজন।
” পুজোতে কলকাতা ছেড়ে বাইরে? কোনো মতেই না। বছরের একটা দিন অঞ্জলী না দিলে হয়? আর যেই শাড়ি গুলো কিনে ফেলেছি, সেগুলোর কি হবে?” বলে উঠলো গোপা।
” মা, একবার অঞ্জলী না দিলে কিচ্ছু হবে না, চলোনা pls। এবার তো আবার পুজোর আগে পরীক্ষাও শেষ হয়ে যাবে। “
” দেখো, সব সময় তো আর এরকম ছুটি পরে না। ২ তারিখ শুক্রবার – ছুটি, সোম থেকে বৃহস্পতি পুজোর ছুটি। শুক্রবার টা ছুটি নিলে, প্রায় ১০ দিন। অনেকদিন ধরে তোমারও ইচ্ছে, তাই ভাবছি এবার কাশ্মীরটা ঘুরেই আসি। ” একটু মুচকি হেসে বলল বরুণ বাবু।
” মা, তুমি আর না বলো না প্লিজ। কাশ্মীর…কাশ্মীর … কাশ্মীর”, এঁটো হাতটা মাথার উপর আস্ফালন করতে চেঁচাতে লাগলো বিজন।
গোপা কাশ্মীর যাওয়ার প্রস্তাবে একটু ঢোক গিলে, মুচকে হেঁসে নীচু স্বরে আমতা আমতা করে বলল, ” ঠিক আছে, তোমরা দুজনেই যখন …। “
” ওঃ, আমরা দুজনে! তাহলে আমি আর বাবু ঘুরে আসি, তুমি বাড়িতেই থাকো। কি বল বাবু?”
সকলে মিলে হো হো করে হাসতে লাগলো।
খাওয়া দাওয়া শেষে, বরুণ টিকিট বুক করতে বসে এবং টিকিট হয় ২রা অক্টোবর সকাল ৬:৪৫ এর ফ্লাইটে। ফ্লাইট ওড়া তিন মাস বাকি থাকলেও, উত্তেজনার পারদ কিন্তু চড়তে শুরু করে দিয়েছিল, সঙ্গে শুরু হলো প্ল্যান ।
যথারীতি সময় মতো কাশ্মীর ট্রিপ শুরু হলো। বেতাব ভ্যালি, গুলমার্গ, সোনমার্গ, আরু ভ্যালি ইত্যাদি সব কিছু করে তারা উপস্থিত হয় শ্রীনগরে। সেখানে একটা রাত হাউস বোটে কাটিয়ে পরের দিন একটু ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যেবেলায় ফেরা।
ট্যুর অপারেটর মীর, সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল আর সেই মতো ট্যাক্সি থেকে নেমে তারা উপস্থিত হলো গেট নম্বর আট এ। ট্যাক্সি থেকে নামতেই একটা লোক এসে জিজ্ঞাসা করলো, “আপ মিঃ বরুণ, ফ্রম কলকাতা”। ” ইয়েস” বলার সময়টুকু পর্যন্ত না দিয়ে চটপট বাক্স গুলো একটা ছোট ডিঙি নৌকায় তুলে দিল। সেই নৌকা করে তারা উপস্থিত হলো একটা হাউস বোটের পাশে। একটা অত্যন্ত সুন্দর সাজানো গোছানো সুন্দর নৌকা। বোটে উঠতে গিয়ে সবচেয়ে আগে চোখে পড়ল অসম্ভব সুন্দর কাঠের নক্সার দিকে। বোটের দরজা টা খুলতেই দেখা গেলো কাশ্মীরি আসবাব আর কার্পেটে মোড়া একটা সুসজ্জিত ড্রয়িং রুম, কেবিনটাও অত্যন্ত সাজানো গোছানো, পরিষ্কার টিপ – টপ। বোট এর ছোট্ট কাঠের ডেক থেকে চারিদিকের সূর্যের আলো মাখা পাহাড় গুলো খুব সুন্দর দেখতে লাগছিল।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বোটের মালিক হামিদ সাব এসে উপস্থিত হলেন । বিজন বাবুর কাশ্মীর ভ্রমণ এবং ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। হামিদ সাব এর নাতিও তাদের সাথে বোটে এসে দাঁড়িয়েছে। তার বয়স বিজনের কাছাকাছি বলে বোধ হয়। পরনে একটা সাদা রঙের কাশ্মীরি কুর্তা এবং দেখতে যথেষ্ট সুন্দর। নিজে থেকেই এসে পরিচয় দিলো, জুবেন। বরুণ জানতে পারলো সেও তারই মতো ক্লাস নাইন এ পরে, এখানকার একটি সরকারি স্কুলে। বরুণ আর জুবেন নিজেদের মধ্যে দু – এক কথা চালাচালি করতে শুরু করলো। ” আপ লোগ বাত কিজিয়ে, ম্যায় অর বরুণ বাহার ব্যাঠ কে, বাত করতে হ্যায়”, বলে বিজনের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে বাইরের দিকে গিয়ে বসে juben।
লাঞ্চ, বিকালে নৌকা বিহার, শপিং, এমনকি রাতের ডিনার এও বিজন এবং জুবেন একে অপরের সঙ্গ দিতে থাকলো। পরের দিন সকাল বেলায় জুবেন সঙ্গে করে সবাইকে নিয়ে গেলো শ্রীনগর এর সাইট সিন করাতে। এমনকি ফেরার সময় পর্য্যন্ত জুভেন এলো বিদায় জানাতে। ফ্লাইটে উঠে বিজন বলল “জানো বাবা, juben ফিজিক্স এ খুব ভালো। আমাকে জাস্ট গল্প করতে করতে কিছু ট্রিক্স এমন বলে দিলো, জাস্ট ফাটাফাটি। আমরা এখন খুব ভালো বন্ধু।”
সময়ের সাথে পা ফেলে চলতে চলতে, বীজন এবার উচ্চ মাধ্যমিক দিল এবং তার সাথে নিট পরীক্ষা। রেজাল্ট বেরোলে দেখা গেলো বিজন এবং juben মেডিক্যাল এ পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে।
এরপর আর বার চারেক দেখা হয়েছে দুজনের। কিন্তু কোন্ অমোঘ আকর্ষণ, দু-হাজার কিলোমিটার দূরের এই দুই প্রাণকে একবিন্দুতে নিয়ে এসে ফেলেছিল কে জানে! ছেলেবেলায় গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত যায়, মিশে যায় রক্তের মধ্যেও। দুটো মানুষের মন আর চিন্তা ভাবনা যদি একই পংক্তিতে এসে মেশে তাহলে সেখানে কোন কিছুই যে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, সেকথা বলাই বাহুল্য।
যাই হোক, juben এবং বিজন একই সাথে পড়াশোনা শুরু করলো কাটরা মেডিক্যাল কলেজে।
দিন কয়েক যেতে না যেতেই, একদিন ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ তীব্র গোলযোগের আওয়াজ পাওয়া গেলো। কিছু বোঝা ওঠার আগেই ক্লাসের জানালা – দরজার উপর মুহুর্মুহু ইট বৃষ্টি হতে শুরু করলো। বিভিন্ন স্লোগানে কলেজের চত্বর মুখরিত হয়ে উঠল। প্রফেসর সবাই কে শান্ত থাকতে এবং ভয় পাওয়ার কিছু নেই এই সান্ত্বনা দিয়ে, পরিস্থিতি দেখতে বাইরে চলে গেলেন। ক্লাসে প্রায় ৮০ জন ছাত্র, সকলে ভীত, সন্ত্রস্ত হয়ে কোনোমতে নিজদের আরাল করতে ব্যস্ত হয়ে পরে। প্রায় ঘণ্টা খানেক পর বাইরের আওয়াজ কিছুটা কম হলে এবং পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর প্রফেসর ফিরে এসে সবাইকে বাড়ি চলে যেতে বললেন। ছাত্ররা কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলো ” কি হয়েছে স্যার?” প্রফেসর বললেন, “তোমরা এখন যাও, পরে সব জানতে পারবে। তোমাদের জানানো হবে কলেজ আবার কবে থেকে নরমাল ভাবে শুরু হবে।” ছাত্র ছাত্রীরা আর কোনো প্রশ্ন না করে ধীরে ধীরে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলো, বাইরে তখন চারিদিকে কাঁচ আর ইটের ছড়াছড়ি, কলেজ ভর্তি পুলিশ। Juben, বিজন কে বলল “চল, আজ মেরে ঘর পে, হোস্টেল mei রহনে কা জরুরত নহি।” বিজন আর কোন আপত্তি না করে চলে যায় জুবেনের সাথে।
বাড়ি ফিরে খবরে তারা জানতে পারে একদল দুষ্কৃতী কলেজ ভাঙচুর করেছে এবং তাদের দাবি যে ওই কলেজে কেবল মাত্র ট্রাস্ট পরিচালিত নির্দিষ্ট বর্ণের ছাত্রদের পড়তে দিতে হবে, কারণ এই কলেজটি তারাই পরিচালনা করে। আগামী তিনদিন পরে ম্যানেজমেন্ট কমিটির বৈঠক তারপরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে, জানানো হয়। এই কলেজে ৮০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০ জন ছিল সংখ্যা ঐ ট্রাস্ট সম্প্রদায়ভুক্ত বাকিরা ছিল অন্য সম্প্রদায়ের। ট্রাস্টের লোকেরা অনড় থাকায়, তিনদিন পর পরিচালন সমিতি এবছরের মতো কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সব কলেজে ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ, এখন আর নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। নতুন করে আর অন্য কলেজে তাই পড়ার সুযোগও আর নেই।
ধর্ম সম্পর্কে যেটুকু তথ্য পেয়েছি এবং পড়ে যতটুকু তত্ব বুঝেছি তাতে মনে হয় কোন ধর্মই অন্য ধর্মকে ভুল বা খারাপ বলে না । কিন্তু এটা সত্যি যে প্রত্যেক ধর্ম নিজের শ্রেষ্ঠ্বত্ব প্রমাণ করতে সচেষ্ট থাকে। আর এই ধারণাকেই খুব সুন্দর এবং সুচারু ভাবে কাজে লাগান কিছু সুযোগ সন্ধানী । আর সেই সুযোগ সন্ধানীর সাথে কোনো ভাবে যদি রাষ্ট্র ব্যবস্থা জুড়ে যায়, তাহলে তো পোয়া বারো, তখন সবটাই সামাজিক স্বার্থ। আসলে সামাজিক স্বার্থ কেবলমাত্র একটা ছাতা, যার নীচে লুকিয়ে থাকে চূড়ান্ত ব্যক্তি স্বার্থ।
