Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty » Page 2

রাত তখন তিনটে || Nirendranath Chakravarty

পরশু বিকেলে যতীন বাগচি রোডে গিয়েছিলুম। ভাদুড়িমশাইয়ের ইচ্ছে ছিল পরদিনই আমরা গিরিডি রওনা হই। পরে নিজের মত পালটে বলেন, “না মশাই, তা হবার নয়। যে-কাজে ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় এসেছি, সেটা মিটেছে, কিন্তু ক্লায়েন্টকে তার একটা রিপোর্ট দিতে হবে। কৌশিক সেটা লিখে উঠতে পারবে না, ওর অন্য কাজ রয়েছে। ঠিক আছে, আমিই কাল ওটা লিখে ফেলে বিকেলের দিকে কুরিয়ার সার্ভিসের আপিসে পৌঁছে দিচ্ছি, তারপর পরশু সকালের ট্রেনে যাত্ৰা করব।”

বলেছিলুম, “পরশু সকালের ট্রেনে মানে কোন ট্রেন?”

“কেন, ডিলাক্স!”

“ও ট্রেন কিন্তু গিরিডি পর্যন্ত যাবে না, মধুপুরে নেমে গাড়ি পালটাতে হবে। সে বড় হাঙ্গামার ব্যাপার। তার চেয়ে বরং কাল রাত্তিরের দানাপুর এক্সপ্রেসে চলুন। তাতে গিরিডির জন্যে আলাদা ডিব্বা থাকে। মধুপুরে সেটা কেটে নিয়ে ব্রাঞ্চ লাইনের গাড়ির সঙ্গে জুড়ে দেবে। ঘুমের কোনও ব্যাঘাত হবে না, ভোর ছ’টাতেই গিরিডি পৌঁছে যাব।”

“কথাটা মন্দ বলেননি,” ভাদুড়িমশাই বলেছিলেন, “কিন্তু রিজার্ভেশনের জন্যে আবার একে-ওকে ধরতে হবে। না মশাই, ও সব ঝঞ্ঝাটের দরকার নেই, পরশু সকালের ট্রেনেই চলুন। দিব্যি গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। আর হ্যাঁ, মধুপুরে নেমে কী হবে না হবে, তা নিয়ে চিন্তা করবেন না। ওখান থেকে গিরিডির ডিসট্যান্স তো এমন-কিছু নয়, ওইটুকু পথ পাড়ি দেবার যা-হোক একটা ব্যবস্থা ঠিকই হয়ে যাবে অখন।”

কাল সকালে সদানন্দবাবু এসেছিলেন। খবরের কাগজের হেডলাইনের উপরে চোখ বুলোলেন, বাজার-দর যে ক্রমেই বাড়ছে তা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করলেন, তাঁর পালিতা কন্যা কমলির জন্যে যে একজন অঙ্কের মাস্টার না রাখলেই নয়, সে-কথা জানালেন, তারপর দুধ-চিনি ছাড়া চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “আপনারা কাল খুব হাসাহাসি করলেন বটে, তবে আমার কথাটা তাই বলে যেন উড়িয়ে দেবেন না।”

আমি তখন আমার নতুন একটা বইয়ের প্রুফ দেখছি। প্রুফ থেকে চোখ তুলে বললুম “কোন কথাটা?”

“ওই যে আমি জিজ্ঞেস করলুম, কলেজের ফাংশানে যাঁকে হিপনোটাইজ করে বেড়াল বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাঁর হাতে-পায়ে লোম গজিয়ে গেসল কি না, আর আপনারাও অমনি হো-হো করে হেসে উঠলেন। যেন ভারী মজার কথা বলেছি। কেন, হিপনোটাইজ করে একটা মানুষকে কি কেউ কখনও বেড়াল বানিয়ে দেয়নি?”

বুঝলুম, যা করতে বসেছি, তা আর হবে না। প্রুফের বান্ডিল সরিয়ে রেখে বললুম, “দিয়েছে নাকি?”

“বেড়াল না-বানাক, কুমির বানিয়েছে। এ আমার স্বচক্ষে দেখা।”

“বলেন কী মশাই, জলজ্যান্ত একটা মানুষকে কুমির বানিয়ে দেওয়া হল, এই ঘটনা আপনি ঘটতে দেখেছেন?”

“ঘটতে কী করে দেখব, এ হল দেড়শো বছর আগের ব্যাপার, তখন তো আমার জন্মই হয়নি, তা হলে আর দেখব কী করে? তবে হ্যাঁ, কুমিরটাকে দেখেছি।”

“তা-ই বলুন।” সদানন্দবাবুর কথা শুনে হেসে বলি, “তা মশাই, আমাদের চিড়িয়াখানায় তো অনেকগুলো বাঘ রয়েছে, তার একটাকে দেখিয়ে কেউ যদি আপনাকে বলে যে, ওটা আগে মানুষ ছিল, কিন্তু হিপনোটাইজ করে ওটাকে বাঘ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আপনি বিশ্বাস করবেন?”

চেয়ারটাকে পিছনে ঠেলে দিয়ে ভদ্রলোক যেভাবে উঠে দাঁড়ালেন, তাতে বুঝলুম যে, তিনি বিলক্ষণ রেগে গিয়েছেন। বললেন, “অর্থাৎ আমার কথাটা আপনি বিশ্বাস করলেন না, এই তো?”

সদানন্দবাবু একে বয়োজ্যেষ্ঠ, তায় উপকারী প্রতিবেশী, তাই শশব্যস্ত হয়ে বললুম, “আরে, কে বলল বিশ্বাস করিনি? কিন্তু কেমন কুমির, কোথাকার কুমির, সব খুলে বলবেন তো। বসুন বসুন, ঠাণ্ডা হয়ে সবটা বলুন দিকি। এটা কি অ্যালিগেটর, না ক্রোকোডাইল?”

ভদ্রলোক রেগেও যান ঝপ করে, আবার ঠাণ্ডা হতেও দেরি হয় না। চেয়ারে বসে বললেন, “তার মানে?”

“মুখটা আমাদের কার্তিকবাবুর মতো ছুঁচলো, নাকি রমণীমোহনবাবুর মতন থ্যাবড়া?”

এ-পাড়ার কার্তিকবাবু আর রমণীমোহনবাবুর উপরে ভদ্রলোক যে মোটেই প্রসন্ন নন, সেটা জানতুম বলেই এই রকমের তুলনা দেওয়া। সদানন্দবাবু তাতে স্পষ্টতই খুশি হলেন। হো-হো করে হাসলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন, “ও-সব অ্যালিগেশন-ট্যালিগেশন জানি না মশাই, কুমির ইজ কুমির। আমরা যে তারকেশ্বরের ওদিককার লোক সেটা জানেন তো? আমার ঠাকুর্দার বাবা সেখান থেকে কলকাতায় চলে আসেন। কিন্তু তাই বলে যে পৈতৃক ভিটের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক একেবারে ঘুচে গিয়েছিল তা নয়। অনেককাল অবশ্য ওদিকে আর যাওয়া হয় না, তবে কিনা আমার ছেলেবেলাতে মাঝেমধ্যে গিয়েছি। সেই সময়ে একবার নদীর ধারে বেড়াতে গিয়ে কুমিরটাকে দেখতে পাই। ব্যাটা তখন নদীর চড়ায় শুয়ে রোদ পোয়াচ্ছিল। তা আমার বাবা বললেন যে, ওটা কুমির নয়, মানুষ। মানুষ কী করে কুমির হয়ে গেল, সেই ব্যাপারটাও তখন বাবার মুখেই শুনেছিলুম।”

খুবই মামুলি গল্প। সদানন্দবাবুর প্রপিতামহের আমলে নাকি ওদিকে এমন একজন মন্ত্রসিদ্ধ মানুষ ছিল, ইচ্ছে করলেই যে কিনা কুমিরের রূপ ধারণ করতে পারত। এই কুমির হবার মন্ত্রটা সে এক সাধুর কাছে শেখে। সাধু তাকে দু’ শিশি জল দিয়েছিলেন। একটা শিশির জল কালো, অন্যটার নীল। সাধু বলেছিলেন, ‘মন্তরটা পড়ে নিয়ে এই কালো জল দু’ ফোটা যদি নিজের গায়ে ছেটাস তো তৎক্ষণাৎ তুই কুমির হয়ে যাবি। কিন্তু তারপরে যদি না কেউ ওই নীল জলের দু’ ফোঁটা তোর গায়ে ছেটায়, তা হলে কিন্তু কুমির থেকে তুই আর মানুষ হতে পারবি না।’ তা বাড়ি ফেরার পরে বউকে এই কথাটা সে খুব জাঁক করে বলেছিল। বউ বিশ্বাস করেনি। তখন বউয়ের হাতে নীল জলের শিশিটা তুলে দিয়ে সেই নীল জল ছিটিয়ে কীভাবে তাকে আবার মানুষ করে তুলতে হবে সেটা বাতলে দিয়ে সে বলে, ‘এই দ্যাখো আমি কুমির হতে পারি কি না।’ বলে নিজের গায়ে কালো জল ছিটিয়ে সে কুমির হয়ে যায়। বউ তাতে এতই ভয় পেয়ে গেল যে, নীল জল ছেটাবার কথাটা আর তার মনেই রইল না। জলের শিশি উলটে ফেলে দিয়ে দুদ্দাড় করে সে ঘর ছেড়ে পালাল। এদিকে লোকটা দেখল মহা বিপদ, জলের শিশি উলটে পড়ে গেছে, তার আর মানুষ হবার উপায় নেই। তার চেয়েও ভয়ের কথা, গাঁয়ের লোকেরা এক্ষুনি তো ছুটে এসে তাকে পেটাতে শুরু করবে। সেও তাই আর দেরি না করে, ঘরবাড়ি ছেড়ে, বন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে মাটি আঁচড়াতে-আঁচড়াতে সড়সড় করে গিয়ে নদীর মধ্যে নেমে পড়ল।

গল্প শেষ করে সদানন্দবাবু বললেন, “বুঝলেন মশাই, আমার ছেলেবেলায় সেই তেনাকেই আমি দেখেছিলুম। আমাদের নদীতে কক্ষনো কুমির আসে না। কিন্তু ইনি বোধহয় ঘরবাড়ির মায়া কাটাতে পারেননি, তাই না এসে পারেন না। মাঝেমধ্যেই এসে ভুশ করে ভেসে ওঠেন।…কী, বিশ্বাস হল তো?”

হেসে বললুম, “না হয়ে উপায় আছে?”

উত্তর শুনে সদানন্দবাবুর ভুরু কুঁচকে গেল। সন্দিগ্ধ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তার মানে বিশ্বাস হয়নি, কেমন?”

“না ঠিক তা নয়,” আমতা-আমতা করে বললুম, “সবটা না-হলেও অনেকটা হয়েছে। এই যেমন ছেলেবেলায় নদীর ধারে বেড়াতে গিয়ে আপনি যে একটা কুমিরকে রোদ পোয়াতে দেখেছিলেন, সেটা বিশ্বাস হয়েছে। তারপর আপনার বাবা যে আপনাকে বলেছিলেন, ওটা কুমির নয়, মানুষ, তাও বিশ্বাস হয়েছে। তবে কিনা তাঁর গপ্পোটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না।”

সদানন্দবাবুর ভুরু এখনও বেঁকেই আছে, সিধে হয়নি। সেই অবস্থাতেই বললেন, “কেন, পারচেন না কেন?”

কাঁহাতক আর মন জুগিয়ে কথা বলা যায়। বললুম, “দেখুন মশাই, একটা লোক কুমির হয়ে গেল, একটা লোক বাঘ হয়ে গেল, একটা মেয়ে পাখি হয়ে গেল, একটা ছেলে বাঁদর হয়ে গেল, আমাদের গাঁ-গঞ্জে এই রকমের হাজার-হাজার গপ্পো ছড়িয়ে রয়েছে। গাঁয়ের এক বউয়ের গপ্পো শুনেছিলুম, খান্ডার শাশুড়ির হাতে পড়ে, উঠতে-বসতে গঞ্জনা শুনতে-শুনতে সে নাকি নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে শুশুক হয়ে গিয়েছিল। তা এ-সব গপ্পো গপ্পোই। যেমন কিনা আপনিও একটা গপ্পো শুনিয়ে দিলেন। কী, না নিজের গায়ে মন্তর-পড়া জল ছিটিয়ে একটা মানুষ কুমির হয়ে গেল। এ-সব গপ্পো শুনতে হয়, কিন্তু বিশ্বাস করতে হয় না। আর তা ছাড়া, কথা তো হচ্ছিল হিপনোটিজম নিয়ে। তার সঙ্গে এ-সব মন্তর-টত্তরের সম্পর্ক কী?”

লেকচারটা লম্বা হয়ে গিয়েছিল। শেষ করে দেখলুম, সদানন্দবাবু ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণ কোনও কথাই বললেন, না। তারপর আস্তে-আস্তে বললেন, “যাচ্চলে। আমি তো জানতুম, ও দুটো একই ব্যাপার!”

এ হল কাল সকালের কথা। দুপুরে যথারীতি অফিসে গিয়েছিলুম। ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, দিন কয়েকের জন্য ছুটি নেওয়া সম্ভব হবে কি না। দিন কয়েক বলতে যে ঠিক ক’দিন বোঝায়, ঈশ্বর জানেন। সাত দিনের ছুটি নিয়েছি। আশা করি তার মধ্যেই কাজ শেষ হবে। কাজটা যে কী, তা অবশ্য জানি না। সন্ধের দিকে ভাদুড়িমশাইকে ফোন করে সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে তিনি হেসে বলেছেন, “কাজ আবার কী, ধরে নিন ছুটি কাটাতে যাচ্ছি।”

“কোথায় থাকব কিছু ঠিক হয়েছে?”

“ও-সব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। ট্রেন ছাড়বার মিনিট পনেরো আগে হাওড়া স্টেশনের বড় ঘড়িটার নীচে দাঁড়িয়ে থাকবেন, মনে আছে তো?”

“তা আছে।” আমি বললুম, “একা-একা দাঁড়িয়ে থাকতে ভাল লাগে না। আপনারও কিন্তু ঠিক-সময়ে আসা চাই।”

তা ঠিক সময়েই ভাদুড়িমশাই হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিলেন। বরং ট্র্যাফিক জ্যামে খানিকক্ষণের জন্যে আটকে যাওয়ার ফলে আমারই একটু দেরি হয়ে যায়। টিকিট অবশ্য কাটাই ছিল, তবু জোরে-জোরে পা চালিয়ে গিয়ে ট্রেনে উঠতে হয়। কোন ট্রেনে যাচ্ছি, সে তো বলা হয়ে গেছে। আপ ডিলাক্স। যে-কথাটা বলা হয়নি, সেটা এই যে, এ-যাত্রায় সদানন্দবাবুও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন।

এটা একেবারে হঠাৎ ঠিক হয়। প্রতিবেশী হিসেবে সদানন্দবাবুর কোনও তুলনাই নেই। সন্ধের সময় ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে ওই যে ফোনে আমার কথা হল, তার খানিক বাদে সদানন্দবাবু আমাদের বাড়িতে খবর করতে আসেন যে, আমি যখন কলকাতায় থাকব না, তখন সাংসারিক কোনও ব্যাপারে তাঁর সাহায্যের কোনও দরকার হবে কি না। তা যে হবে না, এই কথাটা জেনে নিশ্চিন্ত হয়ে তিনি বিদায় নিচ্ছিলেন, হঠাৎ দরজার কাছ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে বলেন, “ভাদুড়িমশাই যখন সঙ্গে আছেন, তখন আর আপনাকে নিয়ে কোনও দুর্ভাবনা নেই। তবু বলি, বিপদ যে কখন কোন দিক দিয়ে আসে, তা তো আর আগের থেকে টের পাওয়া যায় না, তাই একটু সাবধানে থাকবেন মশাই।”

হেসে বলি, “দুর মশাই, বিপদ আবার কীসের!”

“সে কী, রহস্য উদঘাটন করতে যাচ্ছেন, তাতে বিপদ নেই?”

“আমরা তো রহস্য উদঘাটন করতে যাচ্ছি না।”

“তা হলে কেন যাচ্ছেন?”

“স্রেফ ছুটি কাটাতে যাচ্ছি।”

শুনে ঝাড়া এক মিনিট সদানন্দবাবু আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। তারপর বাকশক্তি ফিরে পেয়ে একগাল হেসে বলেন, “ছুটি কাটাতে? বাঃ বাঃ, এ তো খুবই ভাল কথা। তা হলে তো মশাই আমিও আপনাদের সঙ্গে যেতে পারি।—অবশ্য আমি যদি যাই তো আমাদের বাজারই বা কে করে দেবে? হরিণঘাটার দুধই বা কে এনে দেবে?”

ছেলেপুলের মা বাসন্তী কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলে, “ওসব নিয়ে ভাববেন না বোসমশাই। মন যখন চাইছে, তখন চলে যান। আমরা তো রইলুম, আপনাদের হাট-বাজার সব আমরাই সামলে দেব। আর ছেলে তো এখন ছুটি নিয়ে কলকাতায় রয়েছে। দরকার হলে রাত্তিরটা সেই আপনাদের বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারবে।”

বাকি ছিল কুসুমবালা দেবী অর্থাৎ মিসেস বসুর অনুমতি পাওয়া। তা রাত্তিরবেলায় বাসন্তীর কাছে শুনলুম, সদানন্দবাবুর ‘বেটার হাফ’ নাকি এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছেন। কী একটা কাজে যেন বাসন্তীকে একবার ও বাড়িতে যেতে হয়েছিল। ফিরে এসে হাসতে-হাসতে বলল, “সদানন্দবাবু বাইরে যেতে চান শুনে কুসুমদি কী বললেন জানো?”

“কী বললেন?”

“বললেন, গেলে তো হাড় জুড়োয়। তা মাত্তর এক হপ্তার জন্যে যাচ্ছে কেন, অন্তত একটা মাস কাটিয়ে আসুক। রিটায়ার করার পর থেকে এই যে অষ্টপ্রহর চোখের সামনে ঘুরঘুর করছেন, কুসুমদির এ নাকি সহ্য হয় না।”

সুতরাং সদানন্দবাবুও আমাদের সঙ্গে চলেছেন। তাতে এই একটা সুবিধে হয়েছে যে, চায়ের জন্যে আমাদের আর হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতে হচ্ছে না। বিরাট দুটো ফ্লাস্ক রয়েছে সদানন্দবাবুর সঙ্গে। একটায় ভাদুড়িমশাইয়ের জন্যে দুধ-চিনি মেশানো চা, অন্যটায় আমার জন্যে স্রেফ হালকা লিকার। কয়েক প্যাকেট বিস্কুট আনতেও ভোলেননি। কষ্ট করে আবার এ-সব আনতে গেলেন কেন,’ ভদ্ৰতা করে এই কথাটা বলতে যাওয়ায় সদানন্দবাবু বললেন, “বলেন কী মশাই, আমি তো লুচি, আলুর দম আর কিছু মিষ্টিও আনতে চেয়েছিলুম। তা সময় পেলুম কোথায়?”

জিজ্ঞেস করলুম, “মর্নিং ওয়াক করবার সময় পেয়েছিলেন তো?”

“তা পেয়েছিলুম। কিন্তু জামাকাপড় গোছগাছ করতেই আটটা বেজে গেল, লুচি ভাজবার সময়টা আর পাওয়া গেল না। দেখি, ব্যান্ডেলে তো কিছুক্ষণের জন্যে দাঁড়াবে, তখন যদি কিছু পুরি ভাজিয়ে নিতে পারি।”

ভাদুড়িমশাই জানলার ধারে বসে কাগজ পড়ছিলেন। মুখ তুলে হেসে বললেন, “ব্যান্ডেল এ-লাইনে পাচ্ছেন কোথায়? আমরা কর্ড লাইন দিয়ে যাচ্ছি না? আপাতত চা-বিস্কুট চলুক। দেড় ঘন্টার মধ্যে বর্ধমানে পৌঁছচ্ছি। সেখানে রেলওয়ে কেটারিংয়ের লোক খাবারের অর্ডার নিতে আসবে।”

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *