ভালবাসার নিউরন (neuron) স্রোত
আজ রাত পেরোলে -ই মহালয়া। বিছানায় শুয়ে শচীন্দ্রনাথ এপাশ ওপাশ করতে থাকেন । কিছুতেই ঘুম আসছে না ।কিছুদিন হল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ভাল করে হাঁটতে পারছেন না । ডাক্তার দেখিয়েছেন। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা দিয়েছেন ডাক্তার বাবু । এখনও রিপোর্ট সব হাতে পাননি । মন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। রিটায়ারমেন্টের পরে দশ বছর কেটে গেছে । কখনো এমনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েননি। কাল মহালয়া । কত কথা তাঁর মনে পড়ছে ,বিছানায় শুয়ে ,শুয়ে । ছোট বেলার কথা … তাঁর মস্তিষ্কে স্মৃতিগুলো যেন উথালি পাথালি করছে । দেখতে পেলেন কিশোর বয়সে এবং যৌবনের প্রারম্ভে মহালয়া উপলক্ষে , সকলে মিলে পিকনিক, খাওয়া দাওয়া হত ।কখনও বাড়ির ছাদে এবং বড় হয়ে ক্লাবে চলত । তারপর শোনা হত রেডিও- তে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডিপাট – মাতৃপুজার আহ্বান ধ্বনিত হত আপামর বাঙালির হৃদয়ে । সমস্ত মানুষ জেগে উঠত সেই প্রভাতে ।
চাকরি শুরুর প্রথম দিকে ,পুজোর সময় বাড়ি ফেরার আয়োজন শুরু হয়ে যেত দুমাস আগে থেকে । পুজোর আগের দিন , সারা রাত জেগে ট্রেন থেকে নামতেন বর্ধমান স্টেশনে । সেখানে ট্রেন বদল করে হাওড়া স্টেশন। কোন পরিশ্রমই স্পর্শ করত না । নিশাচরের মত , সারারাত জেগে ,বাড়ি ফেরার এক অদম্য আকর্ষণে সব কষ্ট ভুলিয়ে দিত ।
কিশোর বেলার অনুভূতি যেন সেদিনের কথা , বারে বারে ফিরে আসছে । দেখতে পেলেন বুবুনকে। সে যেন লাজুক চোখে দেখছে । কতদিন তার অপেক্ষায় কেটে গেছে দিন রাত্রি । শুধু দুজোড়া চোখ একে অপরকে দেখার জন্য কেটে গেছে কত সময় ! তিনি যেন দেখতে পাচ্ছেন – এইতো বুবুন এগিয়ে আসছে ওঁর দিকে । শাড়ি পরা , দুবেণি ঝুলিয়ে বই খাতা নিয়ে চলেছে স্কুলে । কোনদিন কথা বলার সাহস হয়ে ওঠেনি । অদম্য কৌতুহল আর দেখবার আকর্ষণে সময় পেরিয়ে যেত । শচীন্দ্রনাথের মনে হল , আজ বুবুন কখনও কি ভাবে, সেই সময়ের কথা ! কখনো কি চেনা পথে যেতে যেতে মনে হয় একটি কিশোরের প্রতিক্ষার কথা ! তিনি দেখতে পেলেন, এইতো বুবুন এগিয়ে আসছে । এখনও সুন্দরী আছে, এখনও চোখে কৌতুহল আছে, এখনও সেই চোখে আবেদন আছে ।
শচীন্দ্রনাথ দেখতে পেলেন- তাঁর বিছানার কাছে এগিয়ে এসেছেন তাঁর শাশুড়ি মা । তিনি স্মিত হাস্যে চেয়ে আছেন ওঁর দিকে । শচীন্দ্রনাথ হেসে বললেন – কেমন আছেন এখন ? এতোদিন কোথায় ছিলেন?তিনি কিছু বললেন, বলতে বলতে কোথায় চলে গেলেন। তিনি ভাবলেন এত রাত্রে – কোথায় গেলেন তিনি ! তাঁর মনে পড়ল , তিনি তো দুবছর আগে কালীপুজোর রাত্রে চলে গেছেন, ইহলোক ত্যাগ করেছেন। তবে এখন কোথা থেকে এলেন , কোথায় চলে গেলেন? কিছুই বুঝতে পারছেন না। তিনি তো সত্যিই এসেছিলেন। চুপ করে ভাবছেন। কত সময় কেটে গেল- তারপর দেখলেন একটা মানুষ ওঁর ঘরে ঢুকে পড়েছেন । তাকে চেনেন না । লোকটি বলল – আপনার চা খাওয়ার কাপটা আমাকে দিনতো। শচীন্দ্রনাথ তার নাম জানতে চাইলেন, তুমি কে ,কী তোমার নাম লোকটি কিছু বললনা । একটু পরে আবার বলল – আপনার কাপটি দিন । ঐ রাস্তার কুকুর গুলোর গায়ে ছুড়ে মারব। শচীন্দ্রনাথ ঠিক মত বুঝতে পারলেন না । কেন কুকুরের গায়ে কাপ মারতে চাইছে । শচীন্দ্রনাথ উঠে ব্যালকনির দেওয়ালে ভর করে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন – তুমি এখন যাও । তিনি গোঙাচ্ছেন , নিজের কানে শুনতে পাচ্ছেন তাঁর গোঙানির আওয়াজ। কিন্তু তাঁর আওয়াজ ঠিক মত বেরোচ্ছে না । কেউ কোথাও নেই। হঠাৎই স্ত্রীকে দেখে ডাকলেন। কিন্তু স্ত্রী বললেন – এখন রাত একটা বেজে গেছে । আমি এখন ঘুমোতে যাব , বলে অন্য একটা ঘরে ঢুকে গেলেন । শচীন্দ্রনাথ চিৎকার করে বলে উঠলেন- আমি এখন যাব না । তোমরা ফিরে যাও । কিন্তু তাঁর কোন কথা বেরোচ্ছে না । কেউ শুনতে পাচ্ছে না কেন ?
কিছুক্ষণ পরে সেই লোকটা কোথায় চলে গেছে , আর দেখতে পেলেন না । মনে মনে ভাবলেন এরা হঠাৎই এল বা কোথা থেকে আর চলে গেল কোথায় । আবার গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন । আবার দেখতে পেলেন মুখের কাছে সেজদার মুখটা । সেজদা তো অনেকটাই বয়সে বড় । সেজদাকে দেখে মনে হল বয়স অনেকটা কমে গেছে । অনেকটা সুস্থ ও সবল লাগছে । সেজদা হাসি হাসি মুখে বলল – তুই এখনও ঘুমোসনি? কত রাত হল , শুয়ে পড় এবার। ভোর হলে মহালয়া শুনতে হবে তো । চারিদিকে তখন পটকা ফুটছে, মাইক চলছে, রাত জেগে খাওয়া দাওয়া চলছে । বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে বেজে উঠবে আর একটু পরেই । দেখিসনি, আমাদের বিলের পাশে কেমন কাশ ফুল ফুটে আছে ! হওয়াতে সব কোমর দুলিয়ে নাচছে,এক সঙ্গে সব মাথা নুয়ে পড়ছে । শচীন্দ্রনাথ বললেন – তোমাকে তো অনেকদিন হল দেখতে পাইনি । তোমার শরীর ভাল আছে তো । একটু পরেই সেজদা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল । শচীন্দ্রনাথ চোখ বুজে ভাবতে লাগলেন। হঠাৎ মনে পড়ে গেল- সেজদা তো আর নেই। গত বছরই তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে । শচীন্দ্রনাথ স্ত্রীকে উচ্চ স্বরে ডাকতে লাগলেন। কোন সাড়া পাওয়া গেল না । কেউ কি ঘরে নেই? কোথাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, মাইক বাজছে ,ওখানে আছে? রাত ভোর হয়ে এল । মনে মনে কোন হিসাব মিলাতে পারছেন না। উঠে বসলেন । তারপর ধীরে ধীরে বাথরুমে গেলেন । বাথরুমের আলো জ্বালাতেই নিজের মুখ আয়নায় দেখে চমকে উঠলেন। তাঁর শরীরে পরিপূর্ণ বার্ধক্য দেখা যাচ্ছে । মুখের চামড়া ,গলার ত্বক কুৎসিত দেখতে লাগছে । সব ঝুলে পড়েছে । নিজেকে দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। তারপর আলো সব নিভে গেল । বেরিয়ে এসে ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকলেন । এক গ্লাস জল ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে দিলেন।
কিছুক্ষণ পরেই আবার দেখলেন ওঁর বন্ধু সুকান্তকে ।সুকান্ত ওঁর প্রথম জীবনের সহকর্মী । সুকান্তকে দেখে খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন । বললেন- কত যুগ হল তোকে দেখিনি । কিন্তু তুই এতোদিন কোথায় ছিলি? সুকান্ত কী যে বলছে বুঝতে পারলেন না । সুকান্তকে দুচোখ ভরে দেখছেন। কী সুন্দর দেখতে লাগছে ওকে।দুজনে একসঙ্গে কত কাজ করেছেন! একবার দুই বন্ধু মিলে কোম্পানির অনেক টাকা লাভ করিয়ে দিয়েছিলেন । একটা ইনোভেশন করে উৎপাদনের ফুয়েল খরচ কমিয়ে লাভ করতে সক্ষম হয় ওঁদের উদ্যোগ। কোম্পানি দুজনকে পুরস্কৃত করেছিল।
কিন্তু এখনই তো সুকান্ত ছিল ! এখন কোথায় হারিয়ে গেল । পর্দার ছবির মত সব যেন সরে সরে যাচ্ছে । সব কিছুই ছবির মত । হঠাৎ কী মনে হল মাকে দেখে বললেন- আমাকে একটা বালিশ দাও , মা । তিনি শুনতে পেলেন কি না বোঝা গেল না । পাশের বাড়ির একজন পরিচিত মানুষ কোথা থেকে একটা বালিশ নিয়ে এলেন । বালিশটা দেখে মনে হল, মলিন এবং ধূসর। বালিশটা দড়ি দিয়ে বাঁধা । শচীন্দ্রনাথ পরিচিত মানুষটিকে বললেন – এই বালিশ আমাকে কেন দিচ্ছেন?এইটি তো দেখে মনে হচ্ছে শ্মশানের পরিত্যক্ত বালিশ। এ বালিশে আমার কোন প্রয়োজন নেই । আপনি দয়া করে নিয়ে যান ।
এবার উনি উঠে বসলেন। কেবল ভাবছেন, এতো সময় ধরে এতো মানুষের সঙ্গে দেখা হল , তারা সব কোথায় হারিয়ে গেল !
ততক্ষণে মাইকে বেজে উঠেছে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে – আশ্বিনের শারদ প্রাতে … জেগে উঠেছে আলোর মঞ্জিল …..
মহালয়া শুরু হয়ে গেছে , তিনি কান পেতে রইলন।
