শব্দ
আমরা সত্যিই বড় অদ্ভুত। সকাল থেকে রাত, বছরের পর বছর, যতই পি- si না কেনো আবার সেটাকেই আঁকড়ে ধরে তার মধ্যে থেকেই ভালোবাসার রসদ খুঁজে বের করি। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে বলতে শুনেছি, “ঘেন্না ধরে গেল এই সংসারে।” কিন্তু ছেড়ে যাতে তাকেই আবার মন চায় না। কী অদ্ভুত তাই না?
কিন্তু, এই সংসার বলতে আমরা সবসময় আমাদের আশেপাশের মানুষগুলোর কথাই খালি ভাবি কিন্তু আরো একজন সদস্য সেখান থাকে।
যে থাকে আমাদের সঙ্গে, আমাদের মধ্যে। সেটা হল আমাদের কথা, আমাদের শব্দ- আমাদের মনের চেতনা।
শব্দের মধ্যেই সব আছে। রাগ আছে, দুঃখ আছে, হাসি আছে, আনন্দ আছে, ভয় আছে, আছে ভালোবাসা। একটা শব্দ বা শব্দ জুড়ে কিছু কথা; তা যেমন আমার, তেমন তোমারও। আমি খালি বলে গেলাম, তাতেই তো সেটা শেষ নয়। যাকে বললাম বা যার জন্য বললাম; সেই শব্দগুলো তাকেও সমানভাবে ভাবায়। আর সেখান থেকেই শুরু হয় শব্দের সংসার।
সত্য দুই প্রকার, এক – যেটা মানুষ তার পঞ্চইন্দ্রীয় দিয়ে বুঝতে পারে আর দ্বিতীয়টি হলো অতি সূক্ষ একটা অনুভূতি যা নিজের মধ্যে থাকা শক্তি দিয়ে মানুষ বুঝতে পারে। প্রথমটিকে বলে বিজ্ঞান আর দ্বিতীয় বিষয় টি হলো বেদ – যা বিভিন্ন প্রকার সংকলিত জ্ঞান কে বোঝায়। উপনিষদ এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী বেদ কথাটির মূল অর্থ হলো জ্ঞান আর গৌণ অর্থ হলো শব্দ। এই শব্দকে বেদ ব্যাখ্যা করছে অনন্তপুরুষের এক বাঙময়ী মূর্তি হিসাবে — যার নাম হলো শব্দব্রহ্ম l বেদের অনেক আগে, সৃষ্টির আদিকাল থেকেই এই ব্রহ্ম এর উপস্থিতি। বিশেষ বিশেষ ভাষা এবং মনের ভাবকে অবলম্বন করেই এর প্রকাশ। প্রতিটি কল্পের আদিতে ভগবান অনাদি বেদ উচ্চারণ করেন অর্থাৎ কোন শব্দ কোন অর্থ বোঝাবে তা প্রথম ভগবান স্থির করেন এবং পরবর্তীতে জীব বা মানুষ তার প্রসার ঘটিয়ে থাকে।
সকাল থেকে রাত অবধি কত কথাই তো বলি, কত ধরনের শব্দ কত রকম ভাবে ব্যবহার করি কিন্তু তার সিংহভাগটাই ভুলে যাই । কিন্তু কিছু কথা থাকে, শব্দের বোল থাকে যা আমাদের ভাবনাটাকে বাঁচিয়ে রাখে।
একটা ছোট্ট শব্দকেও অনেক রকম করে বলা যায়। একটা ছোট্ট শব্দ একদিকে যেমন অনেক আনন্দ এনে দিতে পারে তেমনি আবার মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু শেষও করে দিতে পারে।
কথা বলার সময় যে শব্দ আমরা ব্যবহার করি, তারমধ্যে একদিকে যেমন ফুটে ওঠে মানুষের চরিত্র, মানসিক অবস্থিতি, সময়ের ব্যবহার; অন্যদিকে তেমনই তৈরী করে একটা ভালো লাগা বা না লাগার পরিবেশ। এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের কথা আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা শুনতে চাই। কারণ তাদের ব্যবহৃত শব্দ আর বলার ভঙ্গিমা আমাদের তার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। কথকের শব্দের সঙ্গে শ্রোতার ভাবের, চিন্তা, চেতনার একটা যোগসূত্র তৈরি হয়। যেখান থেকে আবার শ্রোতা হয়ে ওঠেন কথক।
শব্দের পর শব্দ মিশে একটা বুনন তৈরী হতে থাকে। হতে পারে সেই বুনন কখনো হালকা, কখনও দৃঢ় কিন্তু মিশে থাকে একটা মায়া, তৈরি করে একটা সম্পর্ক, একটা শব্দের সংসার।
সেই বুনন হালকা হতে পারে কিন্তু তা বাঁধার সময়, আমাদের একটু সতর্ক থাকতে হয় যাতে সেটা পাতলা হয়ে ছিঁড়ে না যায়। তাই একে অত্যন্ত যত্ন করে রাখতে হয়, ভালোবেসে ব্যবহার করতে হয়। সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ শব্দকে ব্যবহার করেছে মনের কথাকে বোঝানোর জন্য, ভালোবাসার জন্য। যত সময় যাচ্ছে মাঝে মাঝে তা যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
যে শব্দের প্রকাশ আছে তার একটা পরিচয় আছে কিন্তু যার প্রকাশ নেই তার আছে এক অদ্ভুত গভীরতা । বেশীরভাগ সময় আমরা সেই গভীরতার নাগাল খুঁজে পাই না। তাতে ডুব দিতেও বড় ভয় হয়। যখন মনের মানুষটি তার মাথাটা আমাদের বুকের মধ্যে রাখে, যখন তার চোখ থেকে বেরানো জলের প্রথম বিন্দুটা ঠোঁটে এসে পরে কিম্বা অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফেরা বাবাকে যখন তার ছোট্ট মেয়েটা জড়িয়ে ধরে, সেখানেও এক অস্ফুট শব্দ কাজ করে। যার কোন আওয়াজ নেই, আছে এক গভীর নীরবতা। কবি নজরুলের শেষ বয়সের ছবি দেখলে মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে পরে। তার সেই চোখের বা মনের ভাষা বোঝার সাধ্য আমাদের নেই। সেই আওয়াজ শোনার কানও আমাদের নেই।
শব্দের, যত্ন নেওয়া আমাদের খুব প্রয়োজন। যত্ন করে বুনতে যেমন হবে তেমন ভালোবেসে গুছিয়েও আমাদেরই রাখতে হবে। অভিমানগুলোকে বুঝতে হবে। শব্দের এই সংসার কিন্তু ভীষণ জীবন্ত। তা অনুরণীত হতে থাকে আমাদের কানে, আমাদের মনে এমনকি আমাদের চলে যাওয়ার পরেও। শব্দ কিন্তু কোন প্রাণহীন জড় বস্তু নয় বরং আমাদের থেকে আরো সজীব, আরো প্রাণবন্ত।
