নগ্ন ঈশ্বর – দুই
সমুদ্রে বৃষ্টি পড়ছে। প্রথমে ইলশে—গুঁড়ি, তারপরে জোরে। জোরে বৃষ্টি নামল। মাস্তুলের গা বেয়ে বৃষ্টি ডেক ভিজাল। এখন ফল্কা ভিজছে। গ্যালির ছাদ থেকে ব্রিজের ছাদ, চার্টরুমের ছাদ সব ভিজছে। কুয়াশা—ঘন ভাব বৃষ্টির। সেলিম ফোকসালে কাশছে। বৃষ্টি সমুদ্র এবং জাহাজ সেলিমের বুকের যন্ত্রণায় কাতর হল না। বৃষ্টি পড়ছে—পড়ছে। সমুদ্রে তরঙ্গ। জাহাজ নীল জলে নোনা রঙে সাঁতার কাটছে। সেলিম শরীরে কম্বল জড়াল তখন। ফোকসাল যখন খালি, বাংকে যখন কেউ নেই, জাহাজিরা যখন ডেকে দড়িদড়া টানছে তখন কম্বলের নিচে শুয়ে বিড়ি ধরানো যাক। সে বিড়ি ধরাল এবং কম্বলের নিচে বিড়ির ধোঁয়াকে ফুঁ দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। তারপর কম্বলটা দিয়ে গোটা ধোঁয়াকে চেপে ধরে দরজার দিকে তাকাল। কেউ নেই। কেউ সিঁড়ি ধরে নামছে না। সে নিশ্চিন্ত হল। অথচ পোর্টহোলের কাচে সমুদ্র এবং আকাশের প্রতিবিম্ব। সেলিম সে কাচে নিজের প্রতিবিম্বও দেখল। চোখ দুটো ওর পালক ওঠা মুরগির মতো। চোখ দুটো পোর্টহোলের কাচে আকাশ এবং সমুদ্রের মতো নীল হতে পারেনি। সাদাটে অথবা বরফ—ঘরের চার—পাঁচ মাসের বাসি গোস্তের মতো। সেলিম কাশির সঙ্গে রক্তের দলাটা কোঁত করে গিলে ফেলল এবার।
দুপুর থেকে শুনে আসছে—উপকূল দেখা যাচ্ছে। সকলে ডেকে চিৎকার করছে—কিনারা দেখা যাচ্ছে। সকলে উপরে হল্লা করছে। সেলিম কোনোরকমে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠছিল, সেও মাটি দেখবে, মাটি দেখে উত্তেজিত হবে, কিন্তু সিঁড়ির মুখেই সারেঙের ধমক, কোথায় যাচ্ছ মিঞা। মরণের দাওয়াই কানে বাঁধতে চাও? সেলিম ভয়ে ফের ফোকসালে নেমে এসেছিল। সে বাংকে শুয়ে সব যেন ধরতে পারছে—যেন কিছু সমুদ্রপাখি ফল্কায় বসে ভিজছে। পাখিরা ফল্কায় একদা বসতের মতো আশ্রয় নিয়েছে। উপকূল দেখে অথবা দ্বীপ দেখে ওরা উড়ছে। এমন ভেবে সেলিম কাশল। সমুদ্রপাখিরা হয়তো এতক্ষণে উড়ে গেছে। ওর জানার ইচ্ছা হল ওরা আকাশে উড়ছে, না দ্বীপের পাশাপাশি কোথাও উড়ছে। আর কেন জানি এই সময় বারবার ওর বিবির কথা মনে হচ্ছে। বিবির মুখে সুখের ইচ্ছা, শখের ইচ্ছা। সেলিমের শরীরে যন্ত্রণা, বুকে যন্ত্রণা। সে যেন বলতে চাইল—এবার আমরা ফিরব, বিবি। ছোট ঘরে তুই তোর খসমের মুখ দেখবি। জাহাজ এবং সমুদ্র উভয়ই আমাদের বিনাশ করতে পারেনি। আমি ফিরব, ফিরব। আমরা ফিরব। খতে এমন একটা প্রত্যয়ের কথা লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে সেলিমের।
দীর্ঘ সফর, নোনা পানীর অশ্লীল একঘেয়েমি এতদিন ওকে দেশে ফেরার জন্য মাতাল করতে পারেনি। সেলিম দুবার দুটো ওয়াচ করেছে, ফোকসালে এসে শুয়েছে, হাত—পা ছড়িয়ে, অশ্লীল চিন্তা করতে করতে সমুদ্রের বুকে ঘুম দিয়েছে; অথবা হিসাবের কড়ি গুণে—সফর শেষ হতে কত দেরি—এইসব ভেবে স্থান—কাল—পাত্রের কিংবা বন্দরের বেশ্যামেয়ের হিসাবের কড়ি গুণেছে। গুণতে গুণতে ওর একদিন কাশি উঠল। কাশি আর থামছে না। বিকেলে জ্বর এল। বন্দর থেকে বন্দর ঘুরে জ্বর বেড়েছে। শরীর ভেঙেছে। এক বন্দরে কাপ্তানের কাছে আর্জি পেশ করেছে—সাব, একবার হাসপাতালে যাব। কাশির দমকে আর বাঁচছি না। মনে হচ্ছে, মরে যাব।
এই নিয়ে অন্য ফোকসালে কথা হচ্ছিল। কথা হচ্ছিল, এ বন্দর নিয়ে পাঁচ বন্দর হবে অথচ সেলিম এখনও জাহাজেই আছে। সেই কবে ফ্রি—ম্যান্টেল বন্দরে ওকে ডাক্তার দেখানো হয়েছিল। ডাক্তার বলেছিল, আর নয়, আর জাহাজে রাখা চলবে না। বন্দরে নামিয়ে দিতে হবে। হাসপাতালে পাঠাতে হবে। এ—অবস্থায় জাহাজে রাখা নিরাপদ নয়।
সেলিম এখনও জাহাজেই আছে। সে কাশছে। কাশির সঙ্গে রক্ত উঠলেই কোঁত করে ঢোক গিলছে। কিছুদিন থেকে এটা ওর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সে সকলকে বলছে কাশির ব্যামোটা তেমন নয়। ওটা সেরে যাবে। কোম্পানি দামি দামি ওষুধ দিচ্ছে। দিচ্ছে বলেই এবং বাড়িয়ালা গা করছে না দেখে সেও বুঝেছে ওটা ধীরে ধীরে সেরে যাবে। কাশি যখন বেশি হয় তখন সেলিম অপরাধের কথা ভাবে। নিজের অপরাধের কথা। বিবিকে নিয়ে অথবা বন্দরে দেখা কোনো মেয়েকে নিয়ে বিছানায় পড়ে থেকে অশ্লীল ধারণায় অথবা অশ্লীল আবেগে মেখে শরীরে উত্তাপ সঞ্চয়ের বৃথা চেষ্টা না করলেই হত। অথচ রক্ত কম উঠলে ওষুধে কাজ করছে এমত ভেবে সে খুশি হয়। ওর ইচ্ছা ওর দুরারোগ্য রোগের কথা কেউ না জানুক, কেউ না ভাবুক সে দুরারোগ্য রোগে ভুগে মরে যাবে। অথচ প্রত্যয়ের ঘোরে এই ভেবে খুশি—সে ঘরে ফিরবেই। বিবি তার খসমের মুখ দেখে উজ্জ্বল হবেই। এ—শরীরে সে কিছুতেই সমুদ্রে অথবা বিদেশ বন্দরে রেখে যেতে চাইছে না। সে সকলকে শুধু জিজ্ঞেস করছে—জাহাজ কবে ফিরবে? কবে আমরা ঘরের বন্দর পাব?
জাহাজিরা কেউ বলেছে, সিডনি থেকে পুরানো লোহা নিয়ে জাহাজ যাবে জাপানে।
কেউ বলছে, গম নিয়ে তেলবাড়ি।
সেলিম এইসব খবরে বিষণ্ণ হয়েছে। খুব অসহায় ভঙ্গিতে পোর্টহোলে মুখ রেখে দিগন্তরেখায় নিজের দেশকে খুঁজেছে। কখনও অপলক সমুদ্র দেখেছে। জলের নীল বিস্তৃতি দেখেছে।
সেলিম স্থির করল কাপ্তানকে শেষবারের মতো বলবে, আমায় দেশে পাঠিয়ে দিন, মাস্টার। ঘরে ফিরে আমি বিবির কোলে মাথা রেখে মরব। জাহাজে আমি মরব না। বিদেশ—বন্দরে আমি মরব না। শুয়ে শুয়ে সেলিম এইসব ভেবে উত্তেজিত হতে থাকল।
তখন সিঁড়িতে শিস দিচ্ছে বিজন। সেলিম শুয়ে শুয়ে শুনছে। এ—কেবিন সে—কেবিন সে উঁকি মারল। এঞ্জিন—পরীদাররা ঘুমোচ্ছে। এনজিন—পরীদাররা (যারা চারটা—আটটার পরীদার) গল্প করছে। বিজন লক্ষ করল শিস দিতে দিতে, সতেরো মাস সফর ওদের ক্লান্ত করতে পারেনি। বিষণ্ণ করতে পারেনি। জাহাজটা আরও যদি সতেরো মাস সমুদ্রের নোনা জল ভাঙে, যদি আরও সতেরো মাস বন্দরে না ভিড়ায় তবু নিশ্চিন্ত নির্ভয়ে জাহাজ চালিয়ে যাবে। বিজন দ্বিতীয় সিঁড়ির মুখেই শুনল—সেলিম কাশছে। কাশির জন্য দম নিতে পারছে না। বিজন আর শিস দিল না। প্রতিদিনের মতো সে ফের সেলিমের জন্য কষ্ট পেতে থাকল। সে ফোকসালে ঢুকে বলল, একবার কাপ্তান সাহেবকে বল হাসপাতালে দিতে। এভাবে আর কতদিন বাংকে পড়ে থাকবি। রাতে জাহাজ বন্দর ধরবে।
সেলিম মুখের ওপর থেকে কম্বলটা সরাল। চোখ দুটোতে নোনা পানি অথবা আকাশের রঙ নয়, কালো রঙ নয়, অথবা বেতফলের মতো রঙও ধরতে নয়—অথচ আশ্চর্য এক রঙ ধরেছে যা দেখলে সকলের ভয় হবে। অথচ মায়া হবে। সকলের মনে হবে, সেলিম রহমানে রহিম হওয়ার জন্য শরীর স্থির করতে চাইছে। এবং বাংকের সঙ্গে মিশে গিয়ে অদৃশ্য হতে চাইছে।
বিজন বলল, বলিস তো আমরা সকলে মাস্তার দি’। সারেংকে বলি মাস্তার দিতে। এভাবে আর কতদিন ভুগবি। জ্বর কাশি—দেখে—শুনে তো ব্যাপারটা ভালো লাগছে না।
সেলিম সহসা উঠে বসল। তারপর আশ্চর্য রকমের স্নিগ্ধ এবং করুণাঘন মুখ করে হাসল। তারপর ফের দুঃখময় প্রকাশে বলল, বিজন রে, তোর মতো যদি একটু ইংরেজি বুলি জানতাম, তবে আমার সব হত। সারেঙ আর কাপ্তান কী বুদ্ধিই ধরেছে খোদাই জানে। তুই সকলকে বলে কয়ে মাস্তার দে। আমাকে দেশে পাঠিয়ে দিতে বল। দেশে ফিরে বাঁচি।
বিজন এই বাংকে বসে কী করে যেন বুঝল সেলিমের এই দুরারোগ্য রোগ নিয়ে জাহাজে ষড়যন্ত্র চলেছে। সে ভেবে অবাক হল কেন সে সারেংকে বলল না, ওকে এবার অন্য ঘরে না রেখে উপায় নেই, অথবা কেন যে মেজ মালোমকে ডেকে একবার চিকিৎসার সুব্যবস্থার কথা বলতে পারেনি এতদিন! সেও আজ পোর্টহোল দিয়ে সমুদ্র দেখল। তারপর উপকূল। উপকূলে পাখিরা ফিরে যাচ্ছে। সেলিমের মুখ পাণ্ডুর। জাহাজটা চলছে এবং সেলিমের শরীর নড়ছে। সেলিমকে দেখলে আত্মহননের কথা মনে হয়। বিজন বাংক থেকে ওঠার সময় সেলিমকে ফের লক্ষ্য করল, ওর কম্বলের ভিতর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। সে হাসল। সেলিমও হাসল। ওরা পরস্পর দুঃখটুকু ধরতে পেরে ফের দুজনই অন্যমনস্ক হতে চাইল। বিজন দরজা ধরে বের হচ্ছে। সারেং—এর ঘরে উঁকি মেরে সে দেখে, তিনি নেই। ফোকসালে নেই। নিশ্চয়ই মেজ মালোমের কেবিনে অথবা ফরোয়ার্ডপিকে আছেন। বিজন ডেকের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকল।
বন্দরে জাহাজ ভিড়বে বলে সারেং ডেক—কসপের নিকট দড়িদড়া সব বুঝে নিচ্ছে। বিজন ডেক অতিক্রম করে কসপের ঘরের দিকে যাচ্ছে। সে একবার দাঁড়াল। বড় মালোমের পোর্টহোলে উঁকি দিল। বড় মালোম কেবিনে নেই। বিজনের ইচ্ছা হল বড় মালোমকে বলতে—আপনার জাহাজে এমন একটা মারণ রোগ পুষে রাখছেন, সেলিমকে হাসপাতালে দেওয়া হবে না, দেশে পাঠানো হবে না, কোম্পানির টাকা বাঁচানো হবে, অন্যান্য জাহাজিরা পর্যন্ত নিরাপদ নয়—এমতাবস্থায়ও আপনারা চুরি করে মদ গিলতে পারছেন!—আশ্চর্য! সে ভেবে আশ্চর্য হল। সে হাঁটল।
সে সারেঙকে বলল, চাচা চোখ বুজে আর কতদিন থাকবেন?
সারেং ফিসফিস করে বলল, তোমার এত মাথাব্যথা কেন? বেশ তো আছ। সফর করছ। তোমার তো কোনো অসুবিধা করছে না কোম্পানি।
সেলিমের মুখ দিয়ে কফের সঙ্গে রক্ত উঠছে। আপনি জানেন এটা অন্যান্য জাহাজিদের পক্ষে কত ক্ষতিকর। তাছাড়া দেখছি সেলিম বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে। এ নিয়ে পাঁচ বন্দর হল অথচ কোনো বন্দরেই ওকে হাসপাতালে দেবার ব্যবস্থা করছেন না।
সব জানি বাপু। সব বুঝি বাপু। অথচ জেনেশুনেও চুপ করে আছি। বাড়িওয়ালার ইচ্ছা নয় সেলিম হাসপাতালে থাকুক। কোম্পানির অযথা এত খরচ করাতে বাড়িয়ালা রাজি হচ্ছে না।
তবে ওকে দেশে পাঠিয়ে দিন। দেশে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করুন।
দু—একজন করে তখন অন্য জাহাজিরাও ওর চারপাশে জড়ো হচ্ছে। ওরা শুনছে ওরা সারেং—এর মুখ দেখছে। বিজনকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। সেই লঘু পরিহাসজনিত অথবা হালকা সুরের শিস দেওয়া মুখ কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। সমুদ্রের উদার নীল বিস্তৃতিতে ওরা কয়েকজন কেমন অসহায়ের ভঙ্গিতে ডেকে পদচারণা করছে। এনজিনের শব্দ, সমুদ্রের তরল ঠান্ডা হাওয়া ওদের নিঃশব্দ এই ভাবটুকুকে নিদারুণ দুঃখময় করে তুলছে।
রাত্রিতে সব জাহাজিরা যখন একত্রিত হল, একমাত্র আটটা—বারোটার পরীদাররা যখন নিচে বয়লারে কয়লা মারছে, যখন ওরা সকলে শুনল, জাহাজ বন্দর ধরবে সকাল দশটায়—রাতে আর পাইলট—বোট আসছে না, ডেক—জাহাজিরা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে, তখন ওরা বিজনের ঘরে জড়ো হয়ে বলল, আমরা সকলে একযোগে বিদ্রোহ করব। আমরা সকলে জাহাজ চালাব না। কাপ্তান আসুক, ডেক—সারেং আসুক, কেউ আমাদের নড়াতে পারবে না। আমাদের কথা শুনলে আমরা ওদের কথা শুনব। সেলিমকে হাসপাতালে পাঠালে অথবা দেশে পাঠালে আমরা কাজে যাব। জাহাজ চালাব।
একজন বলল, জাহাজি বলে আমরা গোরু—ভেড়া নই।
অন্যজন বলল, জাহাজি বলে আমরা বিনা নোটিশে মরব তেমন দাসখত দেওয়া নেই।
অথচ দেবনাথ বলল, বিজন, এটা নিয়ে তোমার ক’সফর জাহাজে?
বিজন বিস্মিত হল। দেবনাথ ভালো ভাবেই জানে এটা ওর ক’নম্বর সফর। ভালো ভাবেই জানে প্রথম সফরে সে কোন কোম্পানির কোন জাহাজে কাজ করেছে। তবু দেবনাথ যখন এমন একটা প্রশ্ন করল এবং দেবনাথ যখন খুব জরুরি ভাবে ওকে প্রশ্নটা করেছে তখন একটা যথোচিত উত্তর দেওয়াই যুক্তিসংগত। সে বলল, তুমি তো জানো দেবনাথ—এটা আমার দু’নম্বর সফর।
এখনও তুমি ঠিক জাহাজি হওনি। তারপর কী ভেবে বিজনকে দেবনাথ অন্য ফোকসালে নিয়ে গেল। এখানে কেউ নেই, কেউ থাকে না। জাহাজিরা এখানে কাজে যাওয়ার আগে জামাকাপড় ছাড়ে। ঘরটা একেবারেই খালি। দেবনাথ ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। এবং বলল, তুমি এর মধ্যে থেকো না। শেষে সকলে বেঁচে যাবে, কেবল তুমি মারা পড়বে। কাপ্তান তোমার নলি খারাপ করে দেবে। তখন তোমার পিছনে ওরা কেউ দাঁড়াবে না। আমি ওদের ভালো করে চিনি।
বিজন কথা বলল না। চুপ করে দেবনাথের পরামর্শ শুনল। শেষে জবাব দিল, কিন্তু সেলিম যে মরে যাবে?
মরে যাবে তো তুমি কী করবে? তোমার উপর ট্যান্ডল আছে, সারেং আছে—ওরা দেখছে না, তুমি দেখে কী উপকারটা সেলিমের করবে? এটা মাত্র তোমার দু’সফর। অনেক দেখবে কিন্তু জাহাজে বিদ্রোহ করলে চলবে না।
তার জন্য কোনো প্রতিকারের দাবি আমরা তুলব না!
দেবনাথ খুব অভিজ্ঞ লোকের মতো বলল, বম্বের নৌবিদ্রোহের আমি আসামি। তাই তোমাকে এতগুলো কথা বললাম। তোমাকে মাস্তার দিতে বারণ করলাম। তা ছাড়া আমি এইসব জাতভাইদের চিনি। ওরা শেষ পর্যন্ত তোমার কথা কেউ বলবে না। ওরা ওদের জাতভাইদের কথা বলবে, সারেঙের কথাই শুনবে। মাঝখান থেকে তুমি ব্ল্যাক—লিস্টেড হবে।
বিজন আর কোনো কথা না বলে দরজা ঠেলে বের হয়ে এল। সে দেখল, সকলে ওর ঘরে তখনও পরামর্শ করছে। সকলে উদগ্রীব হয়ে আছে। বিজনকে দেখে ওরা বলল, চল, মাস্তার দি বোট ডেক—এ।
বিজন দেবনাথের কথাগুলো আর একবারের জন্য ভেবে নিল। আর একবারের জন্য সকলের মুখ দেখল। সকলের মুখ ভয়ানক হয়ে উঠেছে। বিজন বুঝতে পারল—এই সমস্ত মুখের ছবি মিথ্যা হবার নয়। ওরা কখনোই ওকে অন্ধকার পৃথিবীতে ঠেলে দেবে না। বিজন দৃঢ় গলায় কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখন সারেঙ নিচে নেমে এসে ডাকল, ইসকান্দার, সামসুদ্দিন, রহমান, শোভান। ওরা ধীরে ধীরে ঘর থেকে একান্ত বশংবদের মতো বের হয়ে যাচ্ছে। সারেং বলল, কাপ্তান তোমাদের সঙ্গে কথা বলবেন।
এই ঘটনায় বিজন খুব ভেঙে পড়ল। এবং অসহ্য উত্তেজনায় ভুগতে থাকল। প্রচণ্ড শীতের ভিতর সে ওর নিচের ঘরে পায়চারি করছে। দেবনাথ উপরের বাংকে শুয়ে নির্বিঘ্নে ঘুমোচ্ছে। পোর্টহোল দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছে বলে বিজন কাচটা বন্ধ করে দিল। সারেং—এর সেই রক্তচক্ষুর কথা মনে হল এবং ভাবল কত সহজে সব নাবিকদের নিয়ে সে উপরে উঠে গেল। সে এই ফোকসালে, এই ঠান্ডায় পায়চারি করতে করতে ধরতে পারছে। ধরতে পারছে—সারেং ওদের কী বলছে এবং কী বলে ওদের প্রত্যয়কে ভেঙে দিচ্ছে। সেলিম এখনও কাশছে তার ফোকসালে—ফোকসালের অন্য বাসিন্দা কোরাণ—শরীফ পাঠ করছে বাংকে। সে পায়চারি করতে করতে সব শুনল। জাহাজটা নোঙর ফেলে আছে বলে স্টিয়ারিং ইঞ্জিনে কোনো শব্দ নেই। সবাই কেমন নিঃসঙ্গ, সব কেমন নিঃশব্দ যেন। ডেক থেকে সারেং—এর কথা ভেসে আসছে। সকলকে সারেং জোর গলায় কথাগুলো বলল। বলে ওদের ভয়ংকর বিদ্রোহের প্রতিবিম্ব মুছে দিল। সারেং ওদের বলল, তোরা তো জানিস কলকাতা বন্দরে চল্লিশ হাজার নাবিক খোদা হাফেজ বলত, এখন কিছু কিছু লোক ঈশ্বর, ভগবান বলতে শুরু করেছে। তোরা যদি বাঙালিবাবুদের কথায় মাতিস, তোরা যদি জাহাজে বিদ্রোহ করিস তবে তোদের চল্লিশ হাজার চল্লিশে নামতে আর বেশি দেরি নেই।
একসময় কাপ্তান সারেঙকে ডেকে পাঠালেন।
ব্রিজ থেকে কাপ্তান বললেন, কী বলছে সব?
ভাঙা ভাঙা ইংরেজি এবং হিন্দিতে ডেক—সারেং বলতে থাকল, সব গুড, সাব। সব ঠিক হ্যায়। জাহাজি লোক ভেরি গুড, সাব। বাঙালি বাবুলোক নো গুড, সাব। বাঙালি বাবুলোক গিভস ট্রাবল। বাঙালি বিজন, ইয়েস বিজন তেইল রূপায়াকা খালাসি, ও তো সাব রিংলিডার আছে। দুটো—চারঠু ইংলিশ স্পিকিং আছে, সাব। প্যাসেন্টকে লিয়ে কুছ ফাইট দেনে মাংতা। লেকিং নাও অলরাইট, সাব। বিগ বিগ টক লেকিন নো জব। ভেরি লেজি বাগার। সারেঙ এই পর্যন্ত বলে পায়ের কাছে থুথু ফেলল। ফের মুখ তুলতেই দেখল বাড়িয়ালা নিজের কেবিনে ঢুকে গেছেন। কেবিনে পেয়ালা—পীরিচের শব্দ। নিচে অফিসার—গ্যালিতে চিফ কুক আগুন পোহাচ্ছে। সিঁড়ি ধরে নামবার সময় সে এখানেও থুথু ফেলল।
সমুদ্রে সূর্য উঠছে। একদল পাখি উড়ছে আকাশে। দূরে ইতস্তত জাহাজ নোঙর করা। অনেকগুলো বয়া অতিক্রম করে পাইলট—শিপ। অনেকগুলো জেলেডিঙি এই শীতের ভোরেও মাছ ধরতে বের হয়ে পড়েছে। আকাশ নীল, সমুদ্র নীল। জাহাজের চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বের হয়ে সমুদ্রে নেমে যাচ্ছে। ওরা সমুদ্র ধরে উপকূলে উঠে যাচ্ছে। উপকূলের স্কাই—স্ক্যাপারগুলো ম্যাচবাক্সের মতো মনে হচ্ছে। এইসব দেখার জন্য জাহাজিরা ডেকে দাঁড়াল। অথবা দড়িদড়া টানার জন্য ডেক থেকে টুইন—ডেকে নেমে যাচ্ছে। এখন ওরা দড়িদড়া টানছে। হাসিল নিচে নামিয়ে দিতে চাইছে। মেজ মালোম গলুইয়ে চলে এসেছেন। বড় মালোম ফরোয়ার্ড—পিকে চলে গেছেন। বিজন হাসিল কাঁধে বড় মালোমের পিছনে ছুটছে। তিনটে টাগবোট এসেছে, পাইলট এসেছেন। পাইলট ডেক থেকে বোট—ডেকে এবং ব্রিজে উঠে গেলেন।
বড় মালোম বললেন, গতকাল তুমি জাহাজিদের উত্তেজিত করেছিলে?
বিজন হাসিল পায়ের নিচে রেখে বলল, হ্যাঁ, স্যার। করেছিলাম।
আমি খুশি হয়েছি শুনে। বড় মালোম কসপকে স্টোর—রুমে যেতে বলে এ—কথাগুলো বিজনকে বললেন।
ওদের ভিতর আর কোনো কথা হল না। একজন জাহাজি ফরোয়ার্ড—পিকে উঠে গেছে। ওরা ওয়ারপিন ড্রাম ঘুরাচ্ছে, ওরা উইঞ্চ চালাচ্ছে। তারপর হাপিজ—হাড়িয়া এই ধরনের কিছু শব্দ। বিজন এবং অন্যান্য জাহাজিরা প্রায় আধঘণ্টা ধরে ফরোয়ার্ড পিকে কাজ করল, বিজন এবং অন্যান্য জাহাজিরা সেলিমের দুঃখ, বন্দরের জীবন এবং দেশে ফেরার অথবা জাহাজে প্রথম দিনের গল্প নিয়ে কিছু সময় মশকরা, কিছু কাঁচা খিস্তি করল। কাজ শেষ হলে নীল উর্দি ছেড়ে ওরা দাঁড়িয়ে থাকল ডেকে। কেউ নিচে নামল না। খাড়ি ধরে জাহাজ বন্দরে ঢুকছে। ওরা দাঁড়িয়ে বিভিন্ন দৃশ্য দেখল। সমুদ্রের খাড়ি ধরে জাহাজ বন্দরে ঢুকছে। দু’পাশে পাথরের পাহাড়; অতিকায় তিমি মাছের মতো কালো কালো সব পাথর। পাথরের পাহাড়। কুৎসিত এইসব পাথরের পাশে ছোট ছোট অনেক রকমের ফার—জাতীয় গাছ। পাতাগুলো শীতের হাওয়ায় কাঁপছে। নিচে সব নৌকো—বাইচ হচ্ছে। দু’পাশের জনতা চিৎকার করছে। এইসব দৃশ্যে ওরা সকলে মাটির গন্ধ নিতে চাইল এবং এই জনতার মতো উন্মত্ত হতে চাইল। এইসব দৃশ্য দেখে বিজন জাহাজি যন্ত্রণার উপশম খুঁজছে।
অথচ বিজন দীর্ঘ দু’সফরে প্রকৃত জাহাজির মতো বাঁচতে গিয়ে মাঝে মাঝে খুব বিব্রত হয়ে পড়ছে। পরিবারের কিছু সংস্কার, বিশেষত ধর্মের—সে কিছুতেই ছাড়তে পারছে না। এখনও বিফ গ্যালিতে এলে সে ভালোভাবে খেতে পারে না। দেবনাথের মতো গোমাংস—ভক্ষণে তৃপ্তি নেই। জাহাজিদের প্রচণ্ড রকমের ইতর জীবনকে সে গ্রহণ করতে পারছে না। অথচ এইসব ইচ্ছাগুলো তাকে মাঝে মাঝে টানে। তখন সে কাঁচা খিস্তি করে, শিস দেয়, অযথা ফোকসালে বসে রঙের টব বাজায় এবং কাপ্তান ও তাঁর পারিষদদের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করে।
বিজন একদা কিছু লেখাপড়া করেছিল অর্থাৎ গ্রামের বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ সমাপ্ত করেছিল। অন্য দশটা অসামাজিক ছেলে—ছোকরার মতো বাড়ি থেকে পালিয়ে জাহাজের খালাসিতে নাম লেখায়নি। বেঁচে থাকার জন্য এবং এই জীবনকে আরও দীর্ঘ করার জন্য এই জাহাজের কাজ, জাহাজি হওয়া। ‘হালিসহর’ এবং ‘ভদ্রা’র ট্রেনিং শেষ করেছে একদা, জাহাজের প্রথম সফরে দুনিয়া ঘুরেছে এবং ইংরেজি বুলিতে রপ্ত হয়েছে। জাহাজি হয়ে উপরি পাওনা হিসাবে চটপট পরিবেশকে মানিয়ে চলার স্বভাব এবং দেহজ আবেগধর্মিতার জন্য মানুষের ভালো করার সুকোমল বৃত্তির কিছু অধিকার সহজে পেয়ে গেছে। সেজন্য সেলিমকে কেন্দ্র করে একটি অশেষ দুঃখ ওকে এখনও মাঝে মাঝে উত্তেজিত করছে। খাড়ির সংকীর্ণতা এবং মানুষের এই আনন্দ সেই অশেষ দুঃখকে যেন আরও বাড়িয়ে দিল। সে বড় মালোমকে বলল, কতদিন থাকব এখানে স্যার? যেন তার জাহাজ ভালো লাগছে না।
বড় মালোম বললেন, বলতে পারছি না। ইঞ্জিন রুমে ইন্সপেকশান আছে।
সারেং বলল, সরফাই হবে জাহাজে। জাহাজ বন্দরে বসবে। ঠিক তখনই বিজন দেখল দুজন জাহাজি সেলিমকে ধরে ধরে বোট—ডেকে তুলছে।
কাপ্তানের সামনে দাঁড়িয়ে সেলিম বলল, সাব, আমাকে দেশে পাঠিয়ে দিন। সারেং ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথাটা অনুবাদ করে শোনাল।
কাপ্তান বললেন, আমিও তা চাইছি। হাসপাতালে দিলে ওরা সহজে ছাড়বে না। জাহাজ এখান থেকে তোমার দেশেই যাচ্ছে। এই বলতে গিয়েই দেখলেন কাশির সঙ্গে সেলিমের মুখে রক্ত। সকলের সামনে ধরা পড়ে যাবে ভয়ে সে এখানেও কফটা গিলে ফেলল। কাপ্তান উপলব্ধি করলেন। তাহলে অসুখটা অনেক দূর গড়িয়েছে। কোম্পানির ওষুধ এবং ইনজেকশন কোনো কাজে আসেনি। তিনি সারেংকে ডেকে বললেন, ওকে সকলের সঙ্গে রাখা চলবে না। ওকে ওপরে তুলে আনো এবং কোনো খালি কেবিনে ফেলে রাখ। ওর ভাতের থালা এবং মগ ভিন্ন করে দাও। তোমরা কেউ ওর জিনিসপত্র ব্যবহার করবে না। কাপ্তান সারেংকে অন্যত্র নিয়ে কথাগুলো বললেন। বললেন, সাবধান, কেউ যেন জানতে না পারে সেলিম খারাপ রোগে ভুগছে। যে ক’টা দিন বাঁচে এ—জাহাজেই বাঁচুক।
তারপর তিনি সেলিমের সামনে বললেন, জাহাজ বন্দরে ভিড়লেই তোমাকে কোম্পানির ভালো ডাক্তার দেখানো হবে। আশা করছি তুমি শীগগিরই ভালো হয়ে উঠবে। ‘ঈশ্বর তোমায় করুণা করুন’ এই বক্তব্যে তিনি স্বয়ং জেসাস—এর মতো চোখ বুজলেন।
বাড়িয়ালার এই পাদ্রিসুলভ চেহারাতে সারেং বিমুগ্ধ হল। পির—পয়গম্বরের মতো তিনি হয়তো কোনো ওক্তে সারেংকে দোয়া জানাবেন। সে এবারে বলল, সাব, ইউ ফাদার। ইউর শিপ, ইউর ম্যান, ইউ সি সাব এভরিথিং। সারেং এইসব বলে এই মুহূর্তে দোয়া ভিক্ষা করছে। অর্থাৎ সেলিমের প্রতি বিগলিত করুণার অংশীদার হতে চাইছে।
বিজন ডেকে কাজ করতে করতে সব দেখল। সে জাহাজ জেটিতে বাঁধতে দেখল। বন্দরের পথ ধরে সব শহরবাসীরা সামনের ঝুলন্ত ব্রিজের দিকে যাচ্ছে। কিছু টিনের শেড অতিক্রম করে মাঠ। সেখানে মেয়েপুরুষরা এই শীতেও ক্রিকেট খেলছে। সে দেখল সেলিমকে ডেকের উপর দিয়ে দুজন লোক সেই নিঃসঙ্গ কেবিনটায় নিয়ে যাচ্ছে। সেলিম সেখানে থাকবে, সেখানে খাবে, সেখানে শোবে। বিজন এও বুঝল যেন সেলিম আর বেশি দিন বাঁচবে না। জাহাজের ওই ঘরটাতেই অন্য দিন বিজন এবং অন্যান্য কয়েকজন জাহাজি মিলে কিছু পাথর, দুটো বড় গানি—ব্যাগ যত্ন করে এক কোণায় রেখে দিয়েছিল। জাহাজে মৃত্যু হলে সমুদ্রে এই সব পাথর এবং গানি—ব্যাগ দিয়ে সলিল—সমাধি দেওয়া হবে। দেহজ আবেগধর্মিতার জন্য ওর সুকোমল বৃত্তিরা ওকে ফের অশেষ যন্ত্রণাতে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। কাপ্তানের নিষেধ আছে বলে সে আর ঘরে ঢুকল না। পোর্টহোলের কাচ ফাঁক করে দেখল, সেলিম বাংকে শুয়ে সেই পাথর এবং গানি—ব্যাগগুলো দেখছে। শরীরটা ওর স্থির। সে এখন কফ চুরি করে গিলে খাচ্ছে না। এখন সে নিচের পাত্রে কফ ফেলছে। এবং সঙ্গে কিছু রক্ত পুঁজ ফেলছে। পোর্টহোল দিয়েই বিজন কথা বলল, বিকেলে ভাবছি কিনারায় যাব। তোর জন্য কিছু আনব কি?
কী আর আনবি। মুখে আমার বিস্বাদ শুধু।
কিছু কমলা, কিছু আপেল?
সে অনেক দাম। অত দামের ফল আনবি না। আমার টাকার বড় দরকার, বিজন। দেশে ফিরব। শরীরের চিকিৎসা আছে, বিবি আছে, বাচ্চা আছে। ওদের জন্য ঘর করতে হবে। জমি করতে হবে। ঘর জমি হলে জাহাজে আর সফর দেব না। জমি—জিরাত দেখে, বিবি বাচ্চা দেখে আল্লার ঘরে বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দেব।
বিজনের মুখে বিষণ্ণ হাসি। পোর্টহোলের কাচ বন্ধ করে দেবার সময় সে ইচ্ছে করেই সেলিমের শরীর থেকে জোর করে চোখ তুলে নিল। ওর খোঁচা খোঁচা দাড়ির ভিতর যে মুখ, যে মুখে একদা বসন্ত হয়েছিল, যে শরীর বাচ্চার জন্ম দিয়েছে—সেই মুখ, শরীর এবং দাড়ি, ওর চোখের সামনে মৃত অক্টোপাসের মতো পচা দুর্গন্ধময় ফুলো ফুলো শব হয়ে যাচ্ছে। সে জোর করে পোর্টহোলের কাচ বন্ধ করে দিল এবং ভয়ে চোখ বুজে ফেলল।
ভোর থেকেই সমুদ্র থেকে হাওয়া উঠে আসছে। ঠান্ডা হাওয়া। বিকেলে সে—হাওয়ার গতি আরও বাড়ল। প্রচণ্ড শীতে বিজন ওভারকোটের পকেটে হাত ঢোকাল এবং কোনোরকমে ম্যাচটা বের করে সিগারেট ধরাল। এখানে হয়তো আরও ঠান্ডা পড়বে, সে ভাবল। প্রচণ্ড শীত মাটির শেষ উত্তাপটুকু যেন শুষে নিচ্ছে। দূরে পাইন গাছগুলো থেকে পাতা ঝরছে। গাছগুলো ক্রমশ হালকা করছে শরীর। তারপর একদিন এই শীতের দৃশ্য প্রস্তরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রস্তরীভূত হবে যেন পাইন গাছগুলো। পাখিরা এদেশে থাকবে না। ওরা অন্য দেশে পালাবে। ওরা অন্য দেশে ঘর বাঁধবে। আর্শির মতো আকাশ। রোদের উত্তাপশূন্য হলদে রঙ জাহাজের উপর ছায়া ফেলে অনেক দূর চলে গেছে। পাইনের শাখা—প্রশাখায় পাখির বাসাগুলো ঝুলছে। রোদ সেখানেও যেন চুরি করে উত্তাপ দিচ্ছে। তারপর জেটি অতিক্রম করে পথ। সে পথের মানুষজন দেখতে নিচে নেমে গেল। একটি বাদাম গাছের নিচে দাঁড়াল। এখানে দুটো পথ। সে কোন পথে যাবে চিন্তা করল দাঁড়িয়ে।
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর বন্দর ধরলে এক অনন্য সুখের সন্ধান সে পায় এই মাটির স্পর্শে। বাদাম গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ মাটির স্পর্শ নিল। সামনে শুধু শহর। ইট কাঠ। মাটির কোনো গন্ধ নেই সেখানে। সেখানে শুধু যানবাহন, কিছু কৌরীপাইনের ছায়া, পথের দু’পাশে অথবা এভিন্যুর মোড়ে মোড়ে আলো জ্বলছে—কাচের ঘর, মাংসের দোকান, রেস্তোরাঁ, কাফে, পাব। কোথাও ডেইজি ফুলের প্রদর্শনী অথবা আরও পিছনে সমুদ্রের খাঁড়ির অভ্যন্তরে নৌকা—বাইচ। এইসব ভালো লাগলেও মাটির স্পর্শের মতো সুখপ্রদ নয় যেন এরা। তবু সে হাঁটছে। তবু এই মানুষের ভীড়ে, মাটির গন্ধের জন্যে হারিয়ে যেতে ভালো লাগছে। সে দেবনাথের সঙ্গে বের হয়নি। দেবনাথ জাহাজ থেকে নেমে প্রথমেই কোনো পাব অনুসন্ধান করবে, প্রথমে পেট ভরে অন্তত বিয়ার খাবে এবং কোনো পাব অথবা কুকুরের রেসে না গিয়ে এখন শুধু এইসব সুন্দরী রমণীদের ভিড়ে বিজনের হারিয়ে যাওয়া। সে এই ভিড়ে হারিয়ে যেতে চায়। কেমন এক অশ্লীল শরীরী চিন্তায় দু’দণ্ড সে ওদের সঙ্গে কথা বলে সুখ পায়। অথচ সে ওর দেহজ কামনাকে রূপ দেবার ভঙ্গিটুকু এখনও ইচ্ছে করে আবিষ্কার করেনি। মূলত সে ভালো ভাবের জাহাজি হয়ে বাঁচতে চায়।
সে একটা দোকানে ঢুকে কিছু ফল কিনল সেলিমের জন্যে। মেয়েটি ওর হাতে ফলের প্যাকেট দিয়ে মাথা নোয়াল এবং হাসল। বিজন একগুচ্ছ মিমোসা ফুল দেখেছিল মিসিসিপি নদীর তীরে, কোনো যুবতী ওকে ফুলের গুচ্ছটি দিয়েছিল, এ—মেয়ের হাসি সে—যুবতীকে, স্মৃতির কোঠায় এনে দিল।
সে ফলের দাম দিয়ে প্যাকেট হাতে রাস্তায় নেমে এল। ফেল্ট—হ্যাটটা আর একটু টেনে দিল কপালের উপর। এবং ওভারকোট টেনে পথের ভিড়, বিশেষ করে পথের সব ফুলের মতো মেয়েদের দেখতে দেখতে ঝুলন্ত ব্রিজের রেলিংয়ে এসে দাঁড়াল। সমুদ্র থেকে এখন তেমন জোরে হাওয়া উঠে আসছে না। সে এখানে দাঁড়িয়ে তা টের পেল। দুটো খোলা গাড়িতে পুরুষ—রমণীরা হাসতে হাসতে বন্দর থেকে শহরে উঠে যাচ্ছে। দুজন যুবক—যুবতী পরস্পর কোমর ধরে হাঁটছে। সে দেখল—ওরা দুজন নেমে যাচ্ছে এবং নিচে নেমে ব্রিজের থামের আড়ালে দাঁড়াল। সে স্পষ্ট দেখল ওরা রাস্তার উপরই প্রকাশ্য আলোতে কোমর জড়িয়ে চুমু খাচ্ছে। এইসব দেখে বিজন হাঁটতে পারছে না। সস্তায় কিছু মদ এবং সস্তায় যৌন সংযোগের তাড়নায় সে বিব্রত হয়ে পড়ল। নাইটিঙ্গেল ধরে রাত যাপনের ইচ্ছায় সে পীড়িত হতে থাকল। অথচ যেমন করে প্রতি বন্দরে এ—ইচ্ছার জন্ম হয়েছে এবং যেমন করে প্রতি বন্দরে এ—ইচ্ছার মৃত্যু—কামনা করেছে আজও তেমন ধারণার বশবর্তী হয়ে সে হাঁটতে থাকল। ভালো ভাবের জাহাজি হতে গিয়ে সে গোলাপি নেশা করে জাহাজে ফিরবে ভাবল।
সে জাহাজের সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে এল। সেলিমের ফোকসালের দরজা বন্ধ। দরজার সামনে সে দাঁড়াল। ডাকল—সেলিম, ঘুমিয়ে পড়েছিস?
সেলিম উঠে দরজা খুলছে। সে বাইরে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছে দরজা খুলতে সেলিমের খুব কষ্ট। তবু সেমিল দরজা খুলবে এবং ওকে একটু ওর পাশে বসতে বলবে। দু’দণ্ড গল্প করতে চাইবে। দেশের গল্প, জোত—জমির গল্প। বিবি—বাচ্চার গল্প। অথবা মাছ এবং বনমুরগি ধরার গল্প। অথবা বর্ষাকালে কোড়া পাখি ধরবার সময় ধানক্ষেতের আলে কেমন করে নৌকায় ঘাপটি মেরে পড়ে থাকতে হয় তার গল্প। তখন দেখলে মনে হবে সেলিম যেন এ—জাহাজেও কোড়া ধরছে। কোড়া পাখি শিকার করছে।
দরজা খুললে সে ফলগুলি সেলিমের হাতে দিয়ে বলল, তোর জন্যে এনেছি।
এতগুলো!
বিজন একটু হেসে বলল, ভয় নেই। এবারেও তোর কাছে টাকা চাইব না। আমি তোকে খেতে দিলাম।
বিজন বাইরে এসে দাঁড়ালে সেলিম বলল, কোনো খবর পেলি? জাহাজ কোথায় যাচ্ছে, কবে ছাড়ছে?
ঠিক কিছু বলা যাচ্ছে না। এজেন্ট—অফিস থেকে কোনো খবর আসেনি। বড়মালোম শুধু বললেন, জাহাজে সরফাই হবে। কাল সব সাহেব—সুবোরা আসবেন। এনজিন—রুমে মেরামতের কাজ আছে অনেক। জাহাজ এখানে কতদিন বসবে কাপ্তান নিজেও বলতে পারেন না।
এবার চুপি চুপি সেলিম বলল, জানিস, কাপ্তানকে আমি বললাম, সাব আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেন। দেশে গেলেই আমি ভালো হয়ে উঠব। কাপ্তান বললেন, সেজন্যেই তো তোমাকে হাসপাতালে দিচ্ছি না। একবার হাসপাতালে গেলে তোমাকে ওরা সহজে ছাড়তে চাইবে না। তার অনেক আগেই তুমি দেশে পৌঁছে যাবে।
বিজনের বলতে ইচ্ছা হল, তা ঠিকই যাবি। তার অনেক আগেই যাবি। সে বিরক্তিতে ফেটে পড়ল। সারেং এবং কাপ্তান মিলে সেলিমকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সে আর কোনো কথা বলতে পারল না সেলিমের সঙ্গে। সেলিমের বিষণ্ণ দৃষ্টি ওকে অত্যন্ত আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সে ডেকে এসে নামল। কী মানুষটা কী মানুষ হয়ে গেল, ভাবল, সে সিঁড়ি ধরে ফের উপরে উঠছে। সমস্ত জাহাজে অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতা জাহাজের উপরে এখন যেন কেউ জেগে নেই। কিছু কিছু জাহাজি বন্দরে নাইটিঙ্গেল ধরতে বের হয়ে গেছে—তাদের ফিরতে দেরি হবে। যারা শুধু নেশা করে ফিরবে তারা একটু বাদেই ফিরবে। বিজন গলুই ধরে হাঁটল। সে এখানে রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট ধরাল। অন্য জেটিতে কাজ হচ্ছে বলে তার কিছু শব্দ। নীল আর্শির মতো আকাশ। আকাশে নক্ষত্র জ্বলছে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আকাশ, নক্ষত্র, সমুদ্রগামী জাহাজের আলো অথবা গ্যালির পাশে ইঁদুরের ঘর দেখল। কাল ভোরে এ—জাহাজের মাল নামতে শুরু করবে। অন্ধকার রাত থেকে সব লোক উঠে আসবে ডেকে। ওরা কাজ করবে, গ্যালির আগুনে ওরা হাত—শরীর গরম করবে। আর তখন বাংকে পড়ে পড়ে দেশের কথা ভাবতে ভাবতে কাশবে সেলিম।
ভোরবেলায় বিজন এনজিন ঘরে নেমে গেল। তখন সমস্ত ফল্কায় কাজ হচ্ছে। উইঞ্চ—ড্রাইভার সিগারেট ধরাবার ফুরসত পাচ্ছে না। ক্রেন—মেশিন চালকেরা টুপি মাথায় নিচের ফল্কায় উঁকি মারছে। ফল্কায় সব কুলিদের কোলাহল। এজেন্ট—অফিস থেকে ক্লার্ক এসেছেন। তিনি ঘুরেঘুরে দেখছেন। মেজ মালোম দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছেন এক ফল্কা থেকে অন্য ফল্কায়। পাঁচ ফল্কায় পাঁচজন লোকের মুখে হাড়িয়া—হাপিজ শব্দ। মাল জাহাজ থেকে উঠছে, ফের বন্দরে নেমে যাচ্ছে।
এইসব দৃশ্যগুলো এখন জাহাজের ডেকে ঝুলছে।
গ্যালিতে ভাণ্ডারী নেই। বাটলারের ঘরে সে ক্রু—দের রসদ আনতে গেছে। ব্রিজে কাপ্তান পায়চারি করছেন, মেজ মিস্ত্রি নিচে নেমে গেছেন। বড় মিস্ত্রি এইমাত্র হাই তুলতে তুলতে টর্চ হাতে নিচে নামছেন। বন্দর থেকে সব কিনারার লোক উঠে আসছে। ওরা ডেক অতিক্রম করে এনজিন—রুমে নেমে গেল। বড় মিস্ত্রি ওদের নিয়ে সব এনজিন—রুমটা ঘুরলেন। বয়লারের ঘর দেখালেন। ছ’টা বয়লারের ট্যাংক—টপ, চক, টানেল পথ, কনডেনসার, এমনকি স্মোক—বক্সগুলো পর্যন্ত। তারপর ওরা বাংকারে বাংকারে ঘুরল। বিজন অন্ধকারে কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখল। ওরা উপরে উঠে যাচ্ছে। সে ওদের দেশীয় ইংরেজি কথাগুলো কিছু কিছু ধরতে পারছে। জাহাজ এখানে বসবে অনেক দিন—এমনই ওরা যেন বলল। যেন বলল, জাহাজে অনেক কাজ, জাহাজডুবি হয়নি—জাহাজিদের সৌভাগ্য।
বিজন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেটা পোর্টসাইডের বয়লারের নিচু অংশ। হাঁটু পর্যন্ত ছাই জমে আছে এখানে। নিচে কিছু পুরোনো বেলচে, শাবল, র্যাগ, স্লাইশ। কিছু ফায়ার—ব্রিজের প্লেট। ওপরের আলোটা নেই। এখানে অন্ধকার। সে এখান থেকে এনজিন—কসপের ঘরে উঠে গেল। ডেক—কসপের জন্য দুটো তামার প্লেট চাইল। তারপর সে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠতেই বন্দরের একজন শ্রমিক বলল, গুড মর্নিং, মিস্টার।
ইয়েস, গুড মর্নিং।
বিজন বুঝল লোকটি কাজের ফাঁকে ওর সঙ্গে একটু গল্প করতে চায়। লোকটি হয়তো সস্তায় সিগারেট কিনতে চায়।
লোকটি ফের বলল, ইয়ু গ্যান্ডিম্যান?
বিজন বলল, ইয়েস।
দেবনাথ গ্যান্ডিম্যান?
বিজন বলল, ইয়েস।
দেবনাথের সঙ্গেও ওর আলাপ হয়েছে দেখে বিস্মিত হল।
লোকটি ফের বলল, অল ড্যাড়িওয়ালা পাকিস্তানি?
লোকটি তবে এইসব খবরও রাখে। সে বলল, ইয়েস।
বিজন হেঁটে যাচ্ছে ডেক ধরে। শ্রমিকটি ওর পিছু পিছু এল। এবং পকেট থেকে একটি ইউক্যালিপটাসের বোতল বের করে বলল, ইটস ফর ইউ।
বিজন এবারেও আশ্চর্য হল। দামি এই অয়েলটুকু পেয়ে বিজন খুব খুশি হল। বলল, কাম অন। কত দাম দিতে হবে?
কোনো দাম নেই। আমাকে এক শিশি সরষের তেল দেবে। দেবনাথও দেবে বলেছে। তেলটা আমি মাথায় দিচ্ছি। ইন্ডিয়া থেকে জাহাজ এলেই আমি এ—তেলের জন্য ডেকে কাজ নিয়ে উঠে আসি। তেল সংগ্রহ করি এবং তেলটা মাথায় দি। রাতে আমার ভালো ঘুম হয়।
ওরা সেলিমের কেবিন অতিক্রম করার সময় সেলিম পোর্টহোলের ভিতর থেকে কয়েদির মতো উঁকি দিল। সেলিম বাংকে বসে পোর্টহোল দিয়ে এইসব মানুষদের কাজ দেখছে। হাড়িয়া—হাপিজের শব্দ শুনছে। ড্যারিক উঠতে নামতে দেখছে। এইমাত্র এই পথ দিয়ে বড় মালোম গেলেন। দুটো মেয়ে গেল—বোধ হয় বড় মিস্ত্রির ঘরে অথবা ছোট মিস্ত্রির বাংকে। সে এখানে বসে দূরের পাইন গাছ দেখতে পেল। এবং পোর্টহোলের কাচ পেরিয়ে বিজনকেও চলে যেতে দেখল।
শ্রমিকটি বলল, ম্যান ইজ সিক?
সে বলল, ইয়েস, সিক। টিবিতে ভুগছে।
টিবিতে ভুগছে! হাসপাতালে দিচ্ছে না! বড় আশ্চর্য! যেন শ্রমিকটি ঝুপ করে আকাশ থেকে পড়ল।
বড় আশ্চর্য! বিজন হাঁটতে থাকল। লোকটি ওর পাশাপাশি হাঁটছে। সে বলল ফের, এ নিয়ে পাঁচ বন্দর ঘোরা হল। কাপ্তান এতদিন হাসপাতালে দেবেন দেবেন করছিলেন, এখন শুনতে পাচ্ছি দেওয়া হবে না। জাহাজ দেশে ফিরবে। সেও দেশে ফিরবে।
এসব দেখেও তোমরা চুপ করে আছ!
বিজন দেখল লোকটি যেন এই মুহূর্তে বিদ্রোহ করে সকলকে জানাতে চাইছে, জাহাজে একজন জাহাজি টিবিতে ভুগছে অথচ ওকে হাসপাতালে দেওয়া হচ্ছে না, কাপ্তান কোম্পানির টাকা বাঁচাচ্ছে। আপনারা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদপত্র পেশ করুন।
শ্রমিকটিকে বেশ চিন্তিত দেখাল। পাশের অন্যান্য কুলিদের সে ঘটনাটা খুলে বলল। ওরা সকলে একত্র জমা হচ্ছে। ওরা এই নিয়ে জটলা পাকাতে চাইছে যেন। ওরা যেন বলতে চাইছে—তোমরা সেলর, তোমরা এইসব সমুদ্রগামী জাহাজগুলোকে বন্দর থেকে বন্দরে নিয়ে যাও, ঝড়ের দরিয়া পার করে জাহাজের কোম্পানির প্রতিপত্তি বাড়াও—আর তোমাদের চিকিৎসা হবে না, তোমাদের জন্যে হাসপাতালের বন্দোবস্ত থাকবে না, কোম্পানি বেইমানি করবে, তোমরা ভেড়ার মতো ঘাস খাবে—সে ঠিক কথা নয়। তোমরা বিদ্রোহ কর। সে বিদ্রোহে আমরা যোগদান করব। তোমাদের একতার অভাব, আমাদের একতা ইচ্ছা করলে ধার নিতে পারো। দেউলিয়া হবার ভয় নেই।
ভিতর থেকে লম্বা লোকটি বের হয়ে বিজনকে বলল, ইউ বেটার গো টু মিস্টার ট্রয়। তিনি সিম্যান ইউনিয়নের সেক্রেটারি। ঠিকানা—পাঁচ কলিন স্ট্রিট; স্টেশনের পাশ দিয়ে যে বড় এভিন্যুটা পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে সেখানে গিয়ে খোঁজ করবে। তাঁকে পেলে, ঘটনাটি খুলে বলবে। তিনিই সব ব্যবস্থা করবেন।
বিজন ওদের ধন্যবাদ জানাল। এবং কেবিনে ঢুকে লোকটিকে এক বোতল সরষের তেল দিয়ে বলল, ইউ হ্যাভ ডান এনাফ। আমি আজই মিঃ ট্রয়ের কাছে যাব।
অথচ সে দেবনাথের মুখ দেখে বুঝতে পেরেছিল—এইসব আবেগধর্মিতার লক্ষণগুলো ভালো নয়। সেলিমের উপকার করে তোর কী আখের হবে এমন ভাব দেবনাথের মুখে। সুতরাং স্পষ্টতই দেবনাথ যেতে রাজি হল না।
বিকেল। শীতের বিকেল। চারটে না বাজতেই শীতের সমুদ্রে অলস সূর্য উত্তাপের জ্বালায় ডুব দিচ্ছে। গাছগুলো নেড়া নেড়া। ইউক্যালিপটাসের পাতা খসে পড়ছে। আকাশ থেকে যেন শীতের তুষার ঝরছে। ঠান্ডা ঠান্ডা, হাত—পা জমে যাবে ভাব। বিজন হাতের দস্তানা টেনে দিল। টুপিতে কপাল ঢেকে দিল। তারপর ধীরে ধীরে গ্যাংওয়ে ধরে নেমে গেল। সমুদ্র থেকে শীতের হাওয়া ফের উঠে আসছে।
ইচ্ছা হল বন্দরে নেমে ট্যাক্সি করার। ইচ্ছা হল দু’ শিলিং—এর আপেল কেনার। এবং ইচ্ছা হল এভিন্যুর টিন—কাঠের ঘরের ভিতর ঢুকে দু দণ্ড জুয়া খেলার। তবু সেলিমের জন্য আপাতত হাঁটতে থাকল সে। ধীরে ধীরে হেঁটে গেল, ঝুলন্ত ব্রিজ অতিক্রম করতে পনেরো মিনিট, সিম্যান—মিশান বাঁয়ে ফেলে রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করতে অনধিক পনেরো মিনিট—তারপরই চড়াই পথে উঠতে গিয়ে কলিন স্ট্রিট মিলবে। নাম্বার ফাইভ কলিন স্ট্রিট। মনে মনে নম্বর মুখস্থ করার মতো উচ্চারণ করল কথাটা এবং দুটো সুন্দরী মেয়েকে রমণীয় হতে দেখে শিস দিয়েও ফেলল। এবং যদি ওরা প্রশ্ন করে ওর শিস শুনে, তুমি সিম্যান?
সে বলবে, ইয়েস।
যদি বলে, ইন্ডিয়া থেকে এলে?
সে বলবে, ইয়েস?
যদি বলে, তুমি গান জানো?
সে বলবে, ইয়েস।
তুমি ক্রিকেট খেতে পারো?
সে বলবে ইয়েস।
সুতরাং ওর গান, খেলা এবং এই শঠতা সবই ইয়েসের কোঠায় পড়বে।
বিজন নিজের মনেই হেসে ফেলল। সুন্দরী রমণীরা এখন ঝুলন্ত ব্রিজের উপরে উঠে যাচ্ছে। ব্রিজের রেলিং ধরে কিছু মেয়েপুরুষ গুঞ্জনে মশগুল। অথচ সুন্দরী রমণীরা ওকে দেখেও প্রশ্ন করল না। ওর শিস দেওয়ার অর্থকে ব্যতিক্রম বলে ভাবল না। সুতরাং সে জোরে জোরে হেঁটে ওদের পিছনে ফেলে নিচে নেমে একটি চলন্ত ফলের দোকান থেকে দু’শিলিং—এর আপেল কিনল। তারপর বুলফাইটের বিজয়ী মাটাডরের মতো এইসব সুন্দরী রমণীদের এবং সুন্দর পুরুষদের ভিড় ঠেলে বের হয়ে গেল। বের হয়ে যাচ্ছে। সে হাঁটছে। এখন যেন সহসা মনে হল সেলিম পীড়িত। সে বাংকে শুয়ে রক্ত তুলছে মুখে। দেশে একমাত্র পিসিমা বেঁচে আছেন, তাঁকে টাকা পাঠাতে হবে। আজও বয়স্কা সুন্দরী রমণীদের দেখলে সে তার মাকে স্মৃতির কোঠায় সংগ্রহ করতে পারে। সে সামনের বয়স্কা সুন্দরী রমণীকে প্রশ্ন করল উড ইউ হেলপ মি? আপনি কি আমাকে কলিন স্ট্রিটে যেতে সাহায্য করবেন?
বয়স্কা সুন্দরী রমণী বলল, তুমি কি স্ট্রেঞ্জার?
সে বলল, ইয়েস। আমি সেলর।
এ বন্দরে প্রথম এলে?
ইয়েস, এই প্রথম এসেছি।
ইওর কানট্রি?
বিজন দেশের নাম করল।
অল রাইট। তুমি এসো। তুমি গ্যান্ডিম্যান। তুমি ভালো লোক আছ এমন ভাব যেন বয়স্কা সুন্দরী রমণীর চোখে।
বিজন শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট পথে এগিয়ে গেল। সে দীর্ঘস্থায়ী আলাপে রাজি হল না। নতুবা এদের ভিন্ন ভিন্ন রকমের সংশয় আর দুঃসহ রকমের প্রশ্নের মুখে পড়ত—এখনও দুর্ভিক্ষ আছে? এখনও মহামারি হয়? এখনও সন্ন্যাসীরা গাঁজা খেতে খেতে ধর্মালোচনা করে? এখনও হিমালয়ের বুকে নাক জাগিয়ে সাধু মহান্তরা বরফের নিচে ঈশ্বর—উপাসনা করছেন?
প্রায়ই সে এইসব ক্ষেত্রে চটপট উত্তর দেবার ভঙ্গিতে সহজ হয়ে দাঁড়ায়। এবং কিছু বলে পরিত্রাণ পাবার চেষ্টা করে। সত্য—মিথ্যা—যে—কোনো প্রকার। এসব ক্ষেত্রে সে কখনও নিজেকে ছোট করবে না। নিজেকে, নিজের দেশকে ছোট করার ইচ্ছা তার কোনোদিন হয়নি।
একদা ভিক্টোরিয়া বন্দরে একজন ব্রেজিলিয়ান গার্ল বলেছিল, তোমার চোখ বড় গভীর, তোমার চোখ কবিতার মতো।
সে বলেছিল, আমি যে কবিতা লিখি।
একদা একটি চিলি—কন্যা বলেছিল, তোমার কোমর খুব সরু। তোমার এই দীর্ঘ কোমল চেহারা নাচিয়ের মতো।
সে বলেছিল, একদা আমি ব্যালেতে নাচতুম।
বিজন এইসব ভাবনার ভিতর এভিন্যু ধরে উপরে উঠে যাচ্ছে। রেল—স্টেশন অতিক্রম করে সে ডাইনে মোড় ঘুরল। এখানে সে কিছু ফুলের গাছ দেখল। মিমোসা—ফুলের গুচ্ছের মতো এইসব ফুলেরা গাছে ঝুলছে। যারা পথ ধরে যাচ্ছে, ফুলেরা তাদের শরীরের উপর ঝরে পড়েছে। বিজনের ব্লু—ব্ল্যাক কোটের রঙে জাফরি রঙ ধরাল। সে অনেকক্ষণ এইসব গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকল। চারিদিকে নিয়ন আলো, কাচের ঘরে আলো জ্বলছে। এই আলোর ভিড়ে এইসব শ্বেতাঙ্গ রমণীদের বিজনের বড় ভালো লাগল। ওর আর ইচ্ছে হচ্ছে না এক পা নড়তে। ওর ইচ্ছে নেই এখন কলিন স্ট্রিটের পাঁচ নম্বর বাড়িতে ঢুকে নীরস আলোচনায় ডুবে যেতে। তার চেয়ে বরং এই ভালো। বিদেশি এইসব ফুলের ভিড়ে দাঁড়িয়ে দু’দণ্ড সাগরের দুঃখকে ভুলে এই সুখ—দুঃখে ডুবে যাওয়া।
অথচ সে দাঁড়াতে পারল না। বন্দরে সেলিম, ওর কাশি, ওর নিরীহ মাছের মতো চোখ বিজনকে তাড়া দিচ্ছে। বিজন ফুটপাথ থেকে নেমে রাস্তা অতিক্রম করে বড় হলঘরটায় ঢুকে গেল। গায়ে পেতলের প্লেটে লেখা—পাঁচ, কলিন স্ট্রিট, পাথরের উপর খোদাই করা সাইনবোর্ড। লেখা আছে—জাহাজিরাও আপনার আমার মতো মানুষ।
এইসব বড় বড় হরফে বড় বড় কথা পড়তে পড়তে বিজন হলঘরে ঢুকে গেল। পাথরের দেয়ালে বড় বড় ছবি ঝুলছে। পায়ের নিচে মসৃণ পাথরের ওপর প্রতিবিম্ব ভাসছে। মসৃণ পাথরে ওর চেহারা আয়নার মতো ধরা পড়ছে। বিজন সন্তর্পণে হাঁটল। সন্তর্পণে পাথরের আর্শিতে নিজের মুখ দেখল, কারণ অন্য কোনো মুখ অথবা অন্য কোনো শব্দ এ—হলঘরে ভেসে উঠছে না। সে বিস্মিত হল। পাথরে দেয়ালে কিছু তৈলচিত্র। কিছু দামি আলো এবং এইমাত্র পালিশ—করা জুতোর রঙে এইসব দেয়াল, এইসব ছবি। সে একবার ভাবল বরং চলে যাওয়া যাক। বরং কাল দেবনাথকে বলেকয়ে একসঙ্গে আসা যাবে। এই নিঃসঙ্গ পুরীতে বিজন ভীত এবং বিহ্বল হয়ে পড়ল। অথচ সে এখন দেয়ালের কিছু কিছু তৈলচিত্র চিনতে পারছে—ওরা শেক্সপিয়ার, টলস্টয় এবং আরও সব মনীষীদের পাশে ট্যাগোর—জন্ম ১৮৬১… মৃত্যু ….. কী একটা সালের নাম। ট্যাগোর ………. তারপর জন্ম—মৃত্যুর কথা ভেবে ওর কিঞ্চিৎ সাহস জন্মাল। সে চারিদিকে চোখ তুলে একবার তাকাল। উত্তরের দিকে পাথরের দেয়ালের একটা দরজা স্বয়ং খুলে যাচ্ছে। এবং একজন প্রৌঢ় বের হয়ে আসছেন। তিনি যেন কোনো যক্ষপুরী থেকে উঠে আসছেন। সে তাকেই কোনোরকমে প্রশ্ন করল, মিঃ ট্রয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই। প্রশ্ন করে ট্যাগোরের ছবির প্রতি ফের নজর ফেলে নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে গৌরব বোধ করল।
ভদ্রলোক বললেন, দরজা ঠেলে ভিতরে যান। ওর স্টেনো এলবি আছেন। তাঁকে প্রশ্ন করুন। শেষে ভদ্রলোক ওকে গুডবাই ভঙ্গিতে বিদায় জানালেন।
বিজন একান্ত বশংবদের মতো দরজা ঠেলতেই ভিতর থেকে জবাব এল, কাম ইন, কাম ইন!
বিজন এই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কোনো মুখ দেখতে পাচ্ছে না অথচ অপ্রত্যাশিত মেহমানের মতো ডাক ওকে বিচলিত করছে। যেন সে দেয়াল—ঘেরা কোনো যক্ষপুরীতে এসে ঢুকেছে। সেখানে দেয়ালের ভিতর থেকে নারী—কণ্ঠের জবাব, কান ইন, কাম ইন। এবং সে ততক্ষণে ভিতরে ঢুকে গেছে বলেই দেখতে পেল মেয়েটি টেবিলের উপর ঝুঁকে কাজে ব্যস্ত। মেয়েটি একবার চোখ তুলে দেখছে না। দেখল না। কে এল কে গেল, সে দেখল না। সে হাত তুলে ইশারায় ওকে সামনের চেয়ারে বসতে বলছে। ছোট চিলতে করিডরের মতো এই একফালি ঘরে একটি টেবল সহ মেয়েটিকে খুব ভিন্নধর্মী বলে মনে হচ্ছে।
সে চেয়ারে বসে ইতস্তত দেয়ালে নজর দিতেই দেখল মেয়েটির দেয়ালের কীলকেও রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং—যেন উপস্থিত। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং স্মিত হাসিতে এইসব অতিথি অভ্যাগতদের আপ্যায়ন করছেন। ছবিটি হাতে আঁকা বলেই বিজনের মনে হল। কোনো ছবির যেন নকল। এইটুকু দেখে এবং ভেবে বিজনের বিচলিত ভাবটুকু কেটে গেল। সে বলল, মিঃ ট্রয় থাকলে দেখা করতাম।
এলবি চোখ তুলে বিজনকে দেখল। একজন সুপুরুষ বিদেশি যুবাকে দেখল। যুবাকে দেখে চোখেমুখে কোনোও ভাবান্তর নেই। বিজনকে দেখে লেজারে হিসাব কষছে এমন ভাব চোখে। চোখের পাতা পড়ছে না—দৃষ্টি এমন দৃঢ়, আত্মপ্রত্যয়ে গভীর। এই নির্লজ্জ ভাবটুকু বিজনের ভালো লাগল না। বস্তুত বিজন খুব আড়ষ্ট বোধ করছে।
তিনি তো নেই। তোমার কী দরকার আমাকে বলে যাও। তিনি এলে বলব।
বিজন বলল, প্রয়োজন আমার অনেক। তোমাকে আমার প্রয়োজনের কথা অনেকক্ষণ ধরে শুনতে হবে।
শুনব।
সব ঘটনাই মিঃ ট্রয়কে কিন্তু বলতে হবে।
এলবি হাসল। এলবি বিদেশি যুবাকে ফের কৌতূহলের চোখ নিয়ে দেখছে। এবং সেই পুরুষের মতো দৃষ্টি—যা বিজন সহ্য করতে পারছে না। সে এলবিকে সাধারণ যুবতীর মতো দেখে, খুশি হতে চাইল।
এলবি বলল, তুমি বল, আমি নোট করছি।
নিজের ভুলটুকু বুঝতে পেরে বিজনও হাসল।—তোমাকে নোট নিতে হবে না। মুখে বললেও চলবে। ঘটনা হচ্ছে পার্থ বন্দরে ….
এলবি এ—সময়ে বাধা দিল বিজনকে, জাহাজটার নাম বল। তোমরা কোন দেশের ক্রু, কোন দেশ থেকে এসেছ সব বলতে হবে।
জাহাজের নাম ‘এস এস টিবিড ব্যাংক’। আমরা ইন্ডিয়া থেকে এসেছি।
তারপর?
বিজন জাহাজের সব ঘটনা, সেলিমের বর্তমান অবস্থা, এমনকি সারেং এবং কাপ্তানের গোটা চক্রান্তের কথাও খুলে বলল। বিশেষ করে মেয়েটির স্বাভাবিক আগ্রহে সব খুলে বলতে পারল। এখন সে আর কোনো আড়ষ্টতায় ভুগছে না। এখন সে রবীন্দ্রনাথকে দেখে রীতিমতো উত্তেজিত হতে পারছে। সে এবার একটু ঝুঁকে বলল, এর একটা বিহিত করতেই হবে দয়া করে। নতুবা বেচারা বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে। বেচারার ঘরে বিবি আছে। ছোট একটি মেয়ে আছে। ওরা সব ওরই পথ চেয়ে বসে আছে।
এখন বিজনকে দেখলে কে বলবে, এ জাহাজি বিজন। কে বলবে এ বিজন কথায় কথায় শিস দেয়। কথায় কথায় মিথ্যা কথা বলে বিদেশি রমণীকুলে বাহবা নিতে চায়! বিজনের চোখ—মুখ মানুষের ভালো করার প্রবৃত্তিতে বস্তুতই সজল হয়ে উঠেছে এখন।
এলবি বলল, ও ঠিক আছে। মিঃ ট্রয় এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাকে এ নিয়ে ভাবতে হবে না। জাহাজিদের ভালো করাই আমাদের কাজ।
বিজন ওঠবার সময় ফের রবীন্দ্রনাথকে দেখল এবং অদম্য কৌতূহল চাপতে না পেরে বলল, আমরা ট্যাগোরের দেশ থেকে এসেছি। তোমরা ট্যাগোরের ভক্ত দেখছি। দেখি তোমরা এখন আমাদের জন্য কতটা কী করতে পার।
তুমি ভারতবর্ষের লোক? কিন্তু ভারতবর্ষ তো বিরাট দেশ। এখানে পাঁচ বছর আছি। ভারতবর্ষ থেকে আসা কিছু কিছু জাহাজিদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। অথচ দুর্ভাগ্য ওরা কবির ছবি দেখেও কোনো কৌতূহল প্রকাশ করেনি। বিশ্রী ধরনের পোশাক পরে এখানে এসেছে। চেয়ারে না বসে মেঝেতে বসে পড়েছে। শীতে দেখেছি ওরা ভয়ানকভাবে কাঁপত। শীতের গরম জামাকাপড় পর্যন্ত নেই।
বিজন বলল, ওরা এখনও আছে। জাহাজে গেলে তুমি ওদের এখনও দেখতে পাবে।
এলবি বলল, ভারতবর্ষের লোক ভাবতে তোমাকে কষ্ট হয়।
বিজন বলল, মাপ করবেন। যারা তখন ছিল এখনও আছে। তাদের জাহাজি জীবনের এক বিচিত্র অধ্যায় আছে। ওরা আসছে চট্টগ্রাম, নোয়াখালি, সন্দীপ অঞ্চল থেকে। ওরা অজ্ঞ। চাষি পরিবার থেকে আসছে।
বিজন ভাবল—এইসব জাহাজিদের জাতীয় পোশাকের প্রতি এলবির তীব্র ঘৃণা। বস্তুত লুঙ্গি এবং কাঁধে গামছা ফেলে এইসব জাহাজিদের বড় বড় এভিন্যু ধরে হাঁটা এবং নিজেদের ভারতবাসী বলে পরিচয় দেওয়া এলবির কাছে বিশ্বকবিরই যেন অবমাননা। সেজন্য বিজনের দুর্লভ ইংরেজি বলার কায়দা এবং উজ্জ্বল বিদেশি পোশাক, উপরন্তু কবির প্রতি শ্রদ্ধাটুকু এলবিকে বিজন সম্বন্ধে অভিভূত করেছে। বস্তুত এলবি ভারতবর্ষের দারিদ্র্যকে সহ্য করতে পারে না। আজও পারছে না। ওর চোখেমুখে এইসব যেন ধরা পড়ছে।
বিজন বলল, ওরা অজ্ঞ নিরক্ষর বলেই রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে ওদের কোনো কৌতূহল নেই।
এলবি সহসা বলল, বাবা কবিকে ইউরোপে দেখেছেন। তুমিও কবির দেশের লোক। তুমি কবিকে দেখেছ?
সহসা এই প্রশ্নে বিজন কিঞ্চিৎ বিব্রত হয়ে পড়ল। ওর জাহাজি মনটা ধীরে ধীরে ওর অস্তিত্বকে গ্রাস করছে। সে বলল, নিশ্চয়ই। নিমতলা থেকে বটতলা বেশি দূরে নয়। নিমতলার কাছেই জোড়াসাঁকো। আমার ছেলেবেলায় কত ও—পাড়ায় কত খেলতে গেছি। কতদিন আমরা কবিকে দেখে প্রণাম করেছি। তিনি তখন প্রায় অচল।
তুমি ওঁকে প্রণাম করেছ! তুমি ওঁকে স্পর্শ করতে পেরেছ!
বিজন বিনয়ের আধার হয়ে গেল। বিজন বলল, কবি আমাদের আশীর্বাদ করতেন। বলতেন ভালো ছেলে হবে, দেশের দুঃখ দূর করবে।
এলবি ফের আশ্চর্য এক শ্রদ্ধার ভঙ্গিতে বলল, তুমি ওকে স্পর্শ করতে পেরেছ, প্রণাম করতে পেরেছ!
বিজন দেখল এলবির চোখ দুটো শ্রদ্ধায় গভীর হয়ে উঠছে। এলবি একবার ঘাড় ফিরিয়ে রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখল, একবার বিজনকে দেখল। কবির খুব নিকটের একজন যুবাকে স্পর্শ করার প্রকট ইচ্ছায় সে হাত বাড়িয়ে দিল। যেন বলতে চাইছে—তুমি বি—জন, তুমি কবিকে স্পর্শ করেছ, তুমি কবির দেশের, ঘরের লোক। এলবির মনে এই ভাবগুলো কাজ করছে।
এলবি বলল, বাবা তখন ইউরোপে ছিলেন। বাবা কবিকে ইউরোপে দেখেছেন। বাবা মাকে এবং আমাকে বলতেন, হি ইজ এ সেইন্ট, জাস্ট অ্যাজ পিটার অর পল। বিজন সেই ঋষিপুরুষদের আশীর্বাদ পেয়েছে। এলবি বিজনের আরও ঘনিষ্ঠ হতে চাইল।
এলবি বলল, তোমরা আর কতদিন থাকবে এ—বন্দরে?
প্রায় মাস দুই। জাহাজ এখানে মাস দুই বসবে। ড্রাইডক হবে। মেরামত হবে।
সহসা এলবি বলে বসল, আমার একটা অনুরোধ তোমায় রক্ষা করতে হবে।
বিজন একটু অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। তবু সে বলল, বল; রাখব। যদি ক্ষমতায় কুলোয় নিশ্চয়ই রাখব।
তোমার কাছে আমি ট্যাগোরের কবিতা বাংলা—ভাষায় শুনতে চাই। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা। যখন থেকে ট্যাগোরের কবিতার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই তখন থেকে ইচ্ছা—তোমার দেশে যাব, ভারতবর্ষকে দেখব। কবির শান্তিনিকেতন দেখব। আমি এইজন্য প্রথম থেকেই টাকা জমিয়ে আসছি। কবির কবিতা বাংলা ভাষায় শুনব—কত দিনের ইচ্ছা আমার!
তার জন্য কী আছে—সেলিমের ঝামেলাটা চুকে যাক। তারপর একদিন তোমায় শোনানো যাবে।
এলবি চোখ বুজল। যেন রবীন্দ্রনাথকে, তাঁর দেশকে, বিজনকে অনুভব করার জন্যই চোখ বুজল। বিজন এই আবেগধর্মিতায় বিমুগ্ধ হল না। বরং পীড়িত হল। সাহিত্যের অ—আ—ক—খ সম্বন্ধে যার কোনো স্পৃহা নেই, তাকেই এই নিদারুণ সত্যে টেনে আনার কী যে অর্থ, বিজন বুঝতে পারল না। তবু সে ভাবল, হাতে অনেক দিন, পরে ভেবে যা কিছু একটা বলা যাবে।
বিজন এবার উঠতে চাইল এবং বলল, তোমার নামটা জানা হল না।
এলবি বলল, আমাকে সকলে এখানে এলবি বলেই জানে। পুরো নাম সিসিল এলবার্টি। মিস এলবার্টি বলেও ডাকতে পারো।
এলবি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিল, আমি তোমায় কবিতা শোনাব। ট্যাগোরের কবিতা।
বিজন ভাবল, আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল। সে উঠে পড়ল।
এ সময় এলবি ওর সামনে এসে দাঁড়াল এবং হ্যান্ডশেক করল। তারপর প্রশ্ন করল, জাহাজ তোমার কোন ডকে নোঙর ফেলেছে?
সাউথ—ওয়ার্ফে। বিজন এবার দৌড়ে পালাবার মতোই হলঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে গেল এবং দুঃসহ ভার থেকে যেন মুক্ত হল।
ডেকে তখন পুরোদমে কাজ চলছে। এনজিন রুমেও। এনজিন—রুমে বড় বড় প্লেট সব স্ক্র্যাপ করা হচ্ছে। বড় বড় সব অক্সিজেনের সিলেন্ডার নামানো হচ্ছে। ফল্কায় ফল্কায় কাজ; জাহাজিরা রঙ করছে ফানেলে, বোট—ডেকে। একজন দুজন করে সকলে উঁকি মেরে যাচ্ছে সেলিমের কেবিনে। বিজন গতকালের ঘটনার কথা কাউকে বলেনি, সে এ ব্যাপারে যথেষ্ট গোপনীয়তা রক্ষা করতে চায়। শুধু আজ সে কিনারার লোকেদের ডেকে সেলিমের অবস্থা দেখাচ্ছে। দেখাল—এইখানে সেই লোকটি থাকে, তাকে তোমরা দেখে যাও।
প্রচণ্ড শীত এবং হাওয়ার জন্য জাহাজিদের হাতে কাজ তেমন জমছে না। ওরা ফানেলের উপর ঝুলে অথবা বোটের উপর দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছিল। মাঝে মাঝে গ্যালিতে গিয়ে আগুনের উত্তাপ নিয়েছে। শক্ত হয়েছে ওরা এবং রাত্রির কোনো আকস্মিক যৌন ঘটনার কথা ফলাও করে বলে কোনো জাহাজি বাহবা নিতে চাইছে।
বিজন নিচে দাঁড়িয়ে ফানেলে যে রঙ করতে উঠে গেছে তার দড়িদড়া ঢিল দিয়ে অথবা শক্ত করে বেঁধে রেখে কাজে সাহায্য করছে। আকাশ তেমনি আর্শির মতো। বন্দরের পাইন গাছ থেকে তেমনি পাতা ঝরছে। এ শীতেও এনজিন—ট্যান্ডল পুরোনো কোট গায়ে লুঙ্গি পরে নিচে নেমে গেল। জেটি ধরে হাঁটতে থাকল। গতরাতেও এনজিন—ট্যান্ডল শীতে কাঁপতে কাঁপতে বন্দরে নেমে গেছে। শীতে কাঁপতে কাঁপতে বন্দরের পথ ধরে শহরে উঠে গেছে। পুরোনো বাজারে গিয়ে দু—শিলিং দাম দিয়ে পুরোনো জামাকাপড় কিনেছে। জাহাজিরা আফ্রিকার বন্দরে অথবা ফিজি দ্বীপে ওগুলো বিক্রি করবে। গতরাতে ফেরার পথে ট্যান্ডল শীতে যখন আর হাঁটতে পারছিল না, যখন সস্তায় যৌন সংযোগের দায়িত্ব পালন করে আর হাঁটতে পারছিল না, তখন বুড়ি মেমসাব গাড়ি থেকে এই বুড়ো ট্যান্ডলকে একটা দামি ওভারকোট দয়াপরবশ হয়ে ছুড়ে দিয়েছিল। ভোরে সে দামি ওভারকোটটা সকল জাহাজিদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। বলেছে—শীতে রাস্তায় কাঁপছিলাম, বুড়ি মেমসাব দিয়ে দিল। গতকাল এই ভারতীয় নাবিকদের কথাই দুঃখ করে বলছিল এলবি। বিজন ফানেলের নিচে দাঁড়িয়ে এনজিন—ট্যান্ডলকে শহরে উঠে যেতে দেখছে আর বিরক্তিতে ফেটে পড়ছে।
বিজন ফানেলের পাশ থেকে অন্য জাহাজিকে উদ্দেশ করে বলল, মকবুল, দেখলি এনজিন—ট্যান্ডলের কাণ্ড! আজও এই ভোরে শীতের ভিতর লুঙ্গি পরে বন্দরে নেমে গেল। দেশের জাত—মান সব ডুবাচ্ছে। তোরা কিছু বলতে পারিস না ওকে?
বিজন দেখল মকবুলের মুখেও এমত ইচ্ছা—শীতের রাতে নীলরঙের পায়জামা পরে ছেঁড়া কোট গায়ে বের হয়ে যাওয়া, পথে দাঁড়িয়ে শীতে কষ্ট পাওয়া এবং কোনো পুরুষ অথবা মহিলার দাক্ষিণ্য গ্রহণ করা। বিজন ভাবল, শীতের রাত, রাস্তায় বরফ পড়ছে, তবু নীল মার্কিন কাপড়ের জামা পায়জামা শরীরে এঁটে এইসব জাহাজিদের ভিড় কিনারায়। এইসব জাহাজিরা ভারতবর্ষ থেকে আসে। বড় গরিব, বড় নিঃস্ব। এইসব জাহাজিদের ইংরেজ কোম্পানির মালিকেরা কলকাতা বন্দর থেকে ধরে নিয়ে আসে। তাদের খেতে দেওয়া হয় বাসি গোরুর মাংস, ডাল, ভাত। মাঝে মাঝে বাঁধাকপির তরকারি দিয়ে কোম্পানি বদান্যতা দেখায়। এইসব জাহাজিরা বন্দরে লুঙ্গি পরে, ছেঁড়া ওভারকোট গায়ে শীতের রাতে ঘন আঁধারে বুড়ি মেমসাবদের খুঁজে বেড়ায়। দাম যত কমে হয়, জিনিস যত নীরস হয় ক্ষতি নেই, তবু যৌন সংযোগটুকু রক্ষা করতেই হবে। তখন বিদেশে এলবির মতো রমণীরা ভাবে ওরা অসভ্য, ওরা বর্বর। একদা পৃথিবীর সব বন্দরগুলোতে কলকাতা বন্দরের এইসব নাবিকেরা ঘুরে বেড়িয়েছে। পৃথিবীর সব বন্দরে বন্দরে ভারতবর্ষকে ওরা নোংরা নিঃস্ব প্রতিপন্ন করেছে। আজও করছে। অথচ বিজন ভাবল এর বিরুদ্ধে নালিশ নেই। যতদিন এরা থাকবে—এনজিন—ট্যান্ডলের মতো এইসব লোকগুলোও থাকবে।
বিজন এইসব ভেবে এত বিরক্ত এবং অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল যে কখন মকবুল ফলঞ্চার দড়িতে ঢিল দিতে বলেছে, কখন ইটন এসে ওর পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ওর অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করে হাসছে—বিজন তার কিছুই ধরতে পারেনি।
ইটন বলল, গুড মর্নিং।
বিজন বলল, ইয়েস, গুড মর্নিং।
তারপর ওরা সকলেই লক্ষ্য করল জাহাজে কেমন একটা চঞ্চলতা প্রকাশ পাচ্ছে। অনেকগুলো মোটরগাড়ি এসে বন্দরে থেমেছে। সব লম্বা চৌক মুখওয়ালা লোকেরা জাহাজে উঠে আসছে। ডেকের উপর সব জাহাজিরা, কিনারায় লোকগুলো হাত তুলে আকাশ দেখছে। ইটনও আকাশ দেখল, বিজনও আকাশ দেখল। দেখে বিস্মিত হচ্ছে। ইটনের মুখ রহস্যময় হয়ে উঠেছে, ইটন বলছে—কেমন, কাজ হল তো।
ফানেলের চূড়ায় ঝুলে মকবুল প্রশ্ন করল, আকাশে এরোপ্লেনটা কী লিখছে রে?
বিজন দেখল একটা এরোপ্লেন আকাশটাকে স্লেটের মতো ব্যবহার করছে। গ্যাস দিয়ে বড় বড় হরফে ভোরের খবর দিচ্ছে। ‘দি ডেইলি হেরাল্ড’—এর খবর। হয়তো উড়োজাহাজটা ভাড়া করা—কিংবা ওদেরই। বিজন দুটো বড় খবরের পর পড়ল : দি শিপ এস এস টিবিড ব্যাংক উইল বি ব্ল্যাক ব্যানড, ইফ সেলিম……
মকবুল ফানেল থেকে বিরক্ত করছে। মকবুল বারবার প্রশ্ন করছে—আকাশে জাহাজটা কী লিখছে রে? বিজন এইসব পড়ে অধীর হয়ে উঠছে। সে মকবুলকে বলল, সেলিমকে এক্ষুনি হাসপাতালে না দিলে জাহাজের সমস্ত কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। সিম্যান—ইউনিয়নের সেক্রেটারি এই হুমকি দিয়েছেন।
ইটন বলল, কাল রাতে এখান থেকে যারা কাজ করে ঘরে ফিরেছে তারাই ইউনিয়নে খবরটা পৌঁছে দিয়ে গেছে।
বিজন ভাবল, সব যেন মন্ত্রের মতো কাজ করল। জাহাজে খুবই লোকের ভিড়। সকলে কাজ থামিয়ে দিয়ে লেখাগুলি দেখছে। কোম্পানির এজেন্ট পর্যন্ত জাহাজে উঠে এসেছেন। মিঃ ট্রয় এবং আরও অনেক সব লোক। ক্লার্করা এসেছেন। ওরা প্রথমে ব্রিজে উঠে গেল। কাপ্তানের ঘরে ঢুকে গেল অনেকে। কাপ্তানকে খুবই বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। তিনি এই খবরে প্রথমে খুবই অধীর এবং উত্তেজিত হয়েছিলেন। দুই সারেংকে ডেকে প্রশ্ন করেছিলেন, কে এ—খবর ইউনিয়নে পৌঁছে দিয়েছে? কার এমন হিম্মত? সেলিমের দরজা কে খুলেছিল? ওর পোর্টহোল কেন বন্ধ ছিল না? এইসব প্রশ্নের শেষে তিনি দেখলেন স্বয়ং এজেন্ট এবং অন্যান্য সব দায়িত্বশীল কর্মচারীরা ওঁর কেবিনে ঢুকে যাচ্ছেন। তিনি কথা বলতে পারছিলেন না—এত উত্তেজিত। তবু এইসব দায়িত্বশীল কর্মচারীদের দেখে কেমন বিব্রত হয়ে পড়লেন। মিঃ ট্রয় নানারকম প্রশ্ন করে ওঁকে আরও বিব্রত করে তুলেছেন। বিজন, ইটন এবং মকবুল, পরে দেবনাথ পর্যন্ত ফানেলের গুঁড়িতে এসে সন্তর্পণে কাপ্তানের কেবিনের সব কথাবার্তা শুনছিল। ওরা শুনে বলল, শালা ঠিক জব্দ হয়েছে এতদিনে।
বিজন মনে মনে এলবিকে ধন্যবাদ জানাল। এলবির লম্বা চোখ এবং ডিমের মতো মুখের গঠন ওর চোখে এখন প্রীতির জোয়ারে ভাসছে। ওর কালো চুলে মনোরম গন্ধ, বিজন গতকাল তা টের পেয়েছে। গতকালের অসহিষ্ণু ভাবটুকু আর ওর ভিতর নেই। এলবিকে সে কৃতজ্ঞতা জানাতে পারলে খুশি হবে এমত ধারণায় বোট—ডেকে এবং নিচে ভিড়ের ভিতর এলবিকে খুঁজল। এবং খুঁজতে থাকল। অথচ এলবিকে যেই বোট—ডেকে আসতে দেখল, বিজন তাড়াতাড়ি মাস্তুলের আড়ালে আত্মগোপন করল।
এলবি, মিস এলবার্টি এবং সিসিল এলবার্টি—যে—কোনো নামেই ওকে ডাকা চলে। সে মাস্তুলের আড়াল থেকে যদি এই নামে ডাকে নিশ্চয়ই এলবির সাড়া পাবে। এলবি এখন দু’নম্বর বোটের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেও যেন কাপ্তানের ঘরের দিকে উঠে যাচ্ছে। বিজন সব দেখেও এলবিকে গুড মর্নিং বলতে পারল না, কৃতজ্ঞতা জানাতে পারল না। এলবির সঙ্গে যে কোনো পরিচয়ই এ—মুহূর্তে এ—জাহাজে মারাত্মক। কাপ্তান তাঁর বিরক্তি ভাবটুকু কলকাতা বন্দর পর্যন্ত পুষে রাখবেন। সারেং সেই ভাবটুকু কলকাতা পর্যন্ত জিইয়ে রাখবেন। তারপর এক শুভদিনে বিজনের নলিতে লাল দুটো দাগ পড়বে। বিজন ব্ল্যাক—লিস্টেড হবে।
সুতরাং সে এলবিকে দেখে আত্মগোপন না করে পারল না। তাই সে এলবিকে দেখেই এই মাস্তুলের আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। এলবি সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। সে যেন কোনো জাহাজিকে প্রশ্ন করছে, বি—জন, বি—জন কোথায় কাজ করছে?
বিজন আঁতকে উঠল। সে ধীরে ধীরে টুইন ডেকে নেমে গেল এবং দু’লাফে ফল্কা পার হয়ে সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে নিজের ফোকসালে ঢুকে দরজা বন্ধ করার আগে অন্য জাহাজিদের বলে দিল, কেউ ওকে যদি খোঁজ করে তবে যেন বলা হয় সে জাহাজে নেই। বন্দরে নেমে গেছে। তারপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাংকে বসে হাঁপাতে থাকল।
কী সর্বনাশ—বিজন ভাবল। বিজন নিজের ভুলের জন্য নিজেই ক্ষেপে গেল। গতকাল যা ওর সবচেয়ে বেশি বলা দরকার ছিল, এলবিকে তাই বলা হয়নি। ওর উচিত ছিল, এ খবর তোমাদের আমি পৌঁছে দিলাম এ কথা যেন জাহাজের কেউ না জানে। তবে আর গরিবের চাকরিটা থাকবে না। সেলিমের সঙ্গে তবে আমিও মরব। অথচ সেই কথাটাই এলবিকে বলা হয়নি।
এলবি এদিকে এসে দেবনাথকেও প্রশ্ন করল, বিজন কোথায়?
দেবনাথ ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, বিজন তো এখানেই ছিল। বলে ইতস্তত এদিক—ওদিক চোখ তুলে তাকাল। তারপর বলল, চল কেবিনে। বোধহয় সে সেখানেই আছে।
নীচে নামবার আগে এলবিকে নিয়ে দেবনাথ একবার ভিড়ে বিজনকে খুঁজে দেখল। তাকে ওরা সেখানে পেল না। সেলিম ভিড়ের ভিতর স্ট্রেচারে শুয়ে আছে। সেলিম কাঁদছে। সারেং বুঝ—প্রবোধ দিচ্ছে। বলছে, ভালো হয়ে গেলেই কোম্পানি তোকে দেশে পাঠিয়ে দেবে। কাঁদছিস কেন? ভালোর জন্যই তোকে হাসপাতালে দিচ্ছে।
বিজন এই বাংকে বসেও যেন টের পাচ্ছে—এইমাত্র সেলিমকে ধরাধরি করে নিচে জেটিতে নামানো হল। সেলিম কাঁদছে। সে বলছিল, বিবির কোলে মাথা রেখে মরব। সে বলেছিল, আমার দেশের মাটিতে আমার কবর হবে। সে এ—কথাগুলো বিজনকে বলেছিল। ওর খুব দুঃখ হচ্ছে এ সময়—সে কাছে থাকতে পারল না, বলতে পারল না—রোজ আমি যাব। বিকেলে যাব। তুই ভয় পাবি না। তুই ভালো হয়ে উঠবি—বলতে পারল না….তখন দরজাটা কে যেন ঠেলছে। সে এই বাংকে বসে দেবনাথের গলার শব্দ পেল। দেবনাথ বলছে—এই, দরজা খোল। দরজা বন্ধ করে ভিতরে কী করছিস?
বিজন দরজা খুলতেই এলবিকে দেখতে পেল। এলবি দেবনাথের একপাশে দাঁড়িয়ে হাসছে।
বিজন বলল, গুড মর্নিং।
তোমাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান।
কেন, এখানেই তো ছিলাম।
এখানেও খুঁজেছি।
বিজন বিব্রত হয়ে পড়ল।
এলবি ভিতরে ঢুকে বলল, ট্রয়কে কিন্তু সব কথাই খুলে বলতে পেরেছি।
বিজন ধন্যবাদ জানাল। তারপর বলল, বোসো।
ছোট ঘর, সোফা নেই। একটা ইজিচেয়ার আছে, কিন্তু পাতবার জায়গা নেই। ওরা তিনজন এমত কথায় হাসল।
এলবি বলল, আমি বেশিক্ষণ বসব না। হাতে অনেক কাজ। তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য দেরি হয়ে গেল। অ্যামবুলেন্স হয়তো এতক্ষণে চলে গেছে। সেলিমকে রয়েল হাসপাতালে রাখা হচ্ছে। আশা করছি বিকেলে ওকে দেখতে যাবে। যেতে অসুবিধা হলে, আমার ওখানে চলে যেও, সেখান থেকে আমি তোমায় নিয়ে যাব। বলে সে আর বসল না। তরতর করে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে গেল।
ওরা দুজন ফোকসালে বসে এলবির পায়ের শেষ শব্দটুকু পর্যন্ত মিলিয়ে যেতে শুনল। দেবনাথ আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল বিজনের। বলল, কী করে এ—মেয়েকে ধরলি?
বিজন গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ব্যস্ত। সুতরাং সে এ—ব্যাপারে আদৌ সাড়া দিল না। আদৌ মুখর হল না। সে জবাবে শুধু বলল, পথে আলাপ।
তারপর ওরা দুজনে চুপচাপ। গ্যালিতে মাংস সিদ্ধ হচ্ছে। ওরা সেই গন্ধ নিচে বসে পেল। ওরা দুজনে কথা বলল না, তখন এক এক করে সকলে এসে নিচে নামছে। যে যার হাত—মুখ ধুলো। থালা—মগ ধুলো। এবং ধীরে ধীরে উপরে উঠে গেল। ওরা ভোরের এই আকস্মিক ঘটনায় বিস্মিত হয়েছে, খেতে বসে সকলে এমত ভাব প্রকাশ করতে চাইল।
বিজন এই শীতের বিকেলে ডেকে এসে দাঁড়াল। ওর পোশাক এবং মুখের কমনীয়তায় শীতের রঙ অথবা সমুদ্রের রঙ। ওর শরীরের রঙে আশ্চর্য স্নিগ্ধতা। শীতের দেশে ঘুরে এবং সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় শরীরের রঙ কমনীয় হতে হতে কোনো এক ভোরে বিজন যেন বিদেশির মতো কথা বলতে শিখল।
সে রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে দেখল একটা সমুদ্রগামী জাহাজ বন্দরে এসে নোঙর ফেলেছে। সে ওদের ফানেলের রঙ দেখেই বুঝল ওটা আমেরিকান জাহাজ। সে বন্দর দেখে বুঝল ওরা এখানে ইস্পাত—জাতীয় দ্রব্য নামাবে। এবং হয়তো কোনো বিকেলে ভেড়ার মাংস অথবা ফলের রসদে বোঝাই হয়ে অন্য বন্দরে পাড়ি দেবে।
শেষে অন্যান্য অনেক জাহাজির মতো সেও সেলিমের রুগণ ফোকসাল অতিক্রম করে গ্যাংওয়ে ধরে বন্দরে নেমে গেল। সে হাঁটতে থাকল। একজন স্থায়ী বাসিন্দার মতো সে এই ঝরা পাইনের পথ ধরে শহরে উঠে যাচ্ছে। ঝুলন্ত সেতু অতিক্রম করে বন্দরের সিম্যান—মিশান বাঁয়ে ফেলে সে উঠে যাচ্ছে। সেই পাঁচ কলিন স্ট্রিট ও সেই মেয়ে এলবি। সে নির্দিষ্ট আস্তানায় উঠে যাওয়ার জন্য একটা ট্যাক্সি ডাকল। মোটরে বসে এলবি এবং ওর ইউনিয়নের হলঘর, ওর চিলতে ঘরটুকু…এলবি সুন্দরী, সে সুখে আছে…এলবির চোখ গভীর, আত্মপ্রত্যয়ে দৃঢ়….এলবিকে মনে মনে সুন্দরী বিদেশি রমণী অথচ আপনার মতো করে দেখার এক সবিশেষ কৌতূহলে সে পীড়িত হতে লাগল। এবং সহসাই স্মরণ করতে পারল—এলবি যদি বাতিকগ্রস্ত রুগির মতো ফের বলতে থাকে—তুমি ট্যাগোরের কানট্রি থেকে এসেছ, তুমি কবির কাছের লোক, তুমি কবিকে দেখেছ, সুতরাং তুমি কবির কবিতা আবৃত্তি করে শোনাও। তুমি আমাকে বাংলা ভাষা শেখাও। আমি মূল কবিতার রস পেতে চাই। তা হলে……তা হলে! সে শরীরের আড়ষ্টতায় এমত উচ্চারণ করে কেমন জড়বৎ বসে থাকল, সে ড্রাইভারকে বলতে পারল না তুমি বন্দরে চল, পাঁচ কলিন স্ট্রিট গিয়ে আমার দরকার নেই।
হলঘরের দরজায় বিজন এলবিকে দেখতে পেল। বিজন ট্যাক্সি থেকে নামল ফুটপাথে। এলবি সিঁড়ি ধরে নেমে আসছে। ওরা পরস্পর অভিবাদন জানাল, তারপর উভয়ে মোটরে চড়ে সেলিমকে দেখতে রয়েল হাসপাতালে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। শীতের সন্ধ্যা। এলবির হাতের দস্তানা লাল রঙের। মোজা বেগুনি রঙের। বব—করা ব্লন্ডচুলে দুটো প্রজাপতি—ক্লিপ। গলায় সরু সোনার চেনে পাথর বসানো। হলদে স্কার্ট, লাল জ্যাকেট শরীরে। শীতের সন্ধ্যায় এলবিকে এই পোশাকে অতীব তীক্ষ্ন মনে হল। শহরের বড় রাস্তা ধরে ওরা চলেছে। আপাতত ওরা কোনো কথা বলছে না। এলবি স্টিয়ারিং ধরেছে। বিজন শহর দেখছে। বড় রাস্তা, সুতরাং বড় বড় সব কাচ—মোড়া আসবাবপত্রের কুটিরশিল্পজাত দ্রব্যের, পোশাকের অথবা মোটরের দোকান। ভিন্ন ভিন্ন সব বিজ্ঞাপন ঝুলছে। এলবি দুটো—একটা কথা বলছে এখন। শহরের এইসব দোকানের এবং কোন মুল্লুক ধরে কীভাবে রয়েল হাসপাতালে যাচ্ছে এইসব খবর দিয়ে নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছে।
এলবি বলল, জাহাজ তবে অনেক দিন থাকল।
তা থাকল।
প্রায় দু’মাসের মতো হবে।
তা হবে।
পাশের পত্রিকাটা তুলে বিজনকে দেখাল। সামনে মোড় ঘুরতে হবে। নীল বাতি জ্বলছে না। সুতরাং এলবি দু’হাতেই পত্রিকাটা বিজনের হাতে তুলে দিল। —খবরটা পড়েছ?
আকাশে দেখেছি এবং পড়েছি। আচ্ছা এলবি,….বিজন একটা প্রশ্ন তুলে ধরার ইচ্ছায় ঘাড়টা বাঁকাল।—আচ্ছা এলবি….তোমাদের ভিতর থেকে কেউ তো বলেনি এ—ঘটনার সঙ্গে আমি যুক্ত? পত্রিকায় তেমন খবর নেই তো! বিজন পত্রিকাটা ধীরে ধীরে নিজের কোলের কাছে নিয়ে এল। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবটুকু পড়ল। এবং এলবির মুখ দেখে যেন বুঝতে পারছে তার আকস্মিক আড়ষ্টতায় এলবি পীড়িত হচ্ছে।
এলবির কঠিন মুখ সহসা নানা রঙে ক্রমশ নরম হচ্ছে।—বিজন, তুমি পাকা জাহাজি হওনি। তুমি দেখছি মিঃ ট্রয়কে খুব কাঁচা লোক ভেবেছ। পত্রিকা পড়ে নিশ্চয়ই বুঝতে পারলে এ—ব্যাপারে আমরা কিনারার কুলি লোকেদের উপর বেশি নির্ভর করেছি। কথা কী জানো, এখানকার মতো এত জোরালো ইউনিয়ন পৃথিবীর কম বন্দরেই আছে। পাঁচ কলিন স্ট্রিটে পাঁচ বছর থেকে আছি। এ—ব্যাপারে আমি অভিজ্ঞ। তোমাকে জড়ালে কাপ্তান অন্য বন্দরে তোমাকে ছেড়ে কথা বলবে ভেবেছ?
ওদের মোটর হাসপাতালের দরজায় এসে থামল। মোটর পার্ক করে পার্কবোর্ডে নাম লিখে ওরা সদর দরজা অতিক্রম করে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে।
বিজন দেখল, দুটো বিশাল বৃত্তের মতো বাগান দু’পাশে রেখে ওরা উঠে যাচ্ছে। এলবি ব্যাগ থেকে ডায়েরি বের করে সিট—নম্বর এবং ব্লক—নম্বর দেখে নিল। তারপর নম্বর মিলিয়ে ওরা একসময় সেলিমের বিছানার পাশে পৌঁছে গেল।
এলবি বলল, গুড ইভনিং। তোমাকে এখন ভালো দেখাচ্ছে।
বিজন সেলিমের বিছানার পাশে বসে ওর চুলে হাত দিয়ে বলল, এত ভেঙে পড়েছিস কেন? আমি রোজ বিকেলে তোকে দেখতে আসব। জাহাজ এখানে অনেক দিন থাকবে। আশা করি ততদিনে তুই ভালো হয়ে উঠবি।
সেলিম পাশ ফিরে শুল। ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। বুকে কষ্ট, হাতে পায়ে যন্ত্রণা। সেলিম বড় বড় চোখে এলবিকে দেখছে। এলবি কিছু ফল এনেছিল সঙ্গে। সেলিমের টেবিলে ফলগুলো রাখল। সেলিম বড় বড় চোখে এলবিকে দেখছে। সেলিম কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েছে এমন ভাব ওর চোখে মুখে। অথচ এইসব যন্ত্রণার ভিতরও সেলিম হাসল। একজন ডাক্তার, দুজন নার্স ওর পাশে এসে এখন দাঁড়িয়েছে। ওরা ওর শরীরে ওষুধ প্রয়োগ করল। ওরা সেলিমকে বাঁচবার জন্য উৎসাহিত করল।
এলবি একজন সিস্টারকে প্রশ্ন করল, কাল নিশ্চয়ই প্লেট নেওয়া হচ্ছে?
আজ রাতেই হবে। মিঃ ট্রয় সব ব্যবস্থা করে গেছেন।
এলবি সিস্টারের প্রতি মাথা নোয়াল। মেনি থ্যাংকস।
ওরা উঠে পড়ল। সব ভিজিটারের শেষে ওরা প্রশস্ত পথ ধরে বড় বড় সব চত্বর পার হয়ে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে, ফের সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে হাসপাতালের সদর দরজায় এসে হাজির হল। এলবি বলল, চল, একটু ঘুরে আসি। একটু ইউনিভার্সিটির সামনের পার্কটায় বসব। একটু গল্প করব। রাত ঘন হলে তোমাকে জাহাজে পৌঁছে দিয়ে বাড়িতে ফিরে যাব।
মোটরের ভিতর বসে বিজন প্রশ্ন করল, সেলিম শীগগিরই ভালো হয়ে উঠবে—কী বল?
নিশ্চয়ই। খুব জোর দিয়েই যেন এলবি কথাটা বলল। সেলিম ভালো হয়ে উঠলে, তুমি আমি সেলিম জীলঙে যাব। সেখানে আমার বাবা মা থাকেন। বাবা তোমাকে পেলে কিছুতেই ছাড়তে চাইবেন না। তোমাকে পাশে বসিয়ে কেবল ট্যাগোরের কবিতা শুনতে চাইবেন। আমাদের পরিবারের সকলের ‘গীতাঞ্জলি’র কবিতা মুখস্থ। বলে এলবি মোটরে স্টার্ট দিল এবং জোরে জোরে বিশুদ্ধ সংগীতের মতো কবিতা উচ্চারণ করল :
“When the warriors came out first from
their Master’s hall, where had they hid
their power? Where were their aromour
and their arms?
They looked poor and helpless, and
the arrows were showered upon them
on the day they came out from their
master’s hall.
When the warriors marched back
again to their master’s hall where did
they hide their power?
They had dropped the sword and
dropped the bow and the arrow ; peace
was on the their foreheads, and they had
left the fruits of their life behind them
on the day they marched back again to
their master’s hall.”
কবিতা আবৃত্তি করার সময় আবার সেই ভাবটুকু এলবির মুখে—তুমি কবির দেশের ছেলে, তুমি কবিকে দেখেছ, প্রণাম করেছ, তোমার ঘনিষ্ঠ হয়ে কবিতা আবৃত্তিতে অশেষ আনন্দ। তখন মোটর চলছে। তখনও এলবি কবিতা আবৃত্তির সঙ্গে মোটর চালাচ্ছে। শহরের সব ছোট—বড় দোকান, রোশনাই আলো, থিয়েটার হল অতিক্রম করে ওরা পশ্চিমের দিকে চলেছে। এলবি ফের বিশুদ্ধ জগতের বাসিন্দা হয়ে যেন প্রতিধ্বনি করল—পিস ওয়াজ অন দেয়ার ফোরহেডস। অথচ বিজনের কপালে এখন নিষ্ঠুরতার চিহ্ন। সে এলবির এই সাহিত্য—প্রীতিতে পীড়িত হচ্ছে। যেন বলার ইচ্ছা—আমি বাপু জাহাজি মানুষ, আমার ইতস্তত মিথ্যা বলার নিদারুণ অভ্যাস আছে। সাহিত্য—প্রীতি কোনো কালে ছিল না আমার, এখনও নেই।
এলবি বিজনের দিকে মুখ না তুলেই বলল, আমরা এসে গেছি। আমরা এখানে বেশিক্ষণ বসব না। জলপাই গাছের নিচে বসে তুমি কবির কবিতা বল। আমি শুনি।
বিজন অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। সে বলতে চাইল—আমি কবির কবিতা আবৃত্তি করতে পারব না। জাহাজি মানুষের কবিতা কণ্ঠস্থ করে লাভ নেই। এই নীরস জীবনে সততার আশ্রয়ে বাঁচা নিরর্থক। তবু এলবি ওকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এলবিকে সে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করছে। এলবি যেখানে বসল, সে সেখানেই বসে পড়ল। এলবির প্রতি বিদ্রুপের ইচ্ছায় অথবা মাতাল হওয়ার ইচ্ছায় নিরন্তর সে কঠিন। এলবি এখন কোনো কথা বলছে না। এলবি ঘন হয়ে বসল। এলবি বস্তুত বিজনকে কবির প্রতীকীতে অনন্য করে রাখতে চাইল।
বিজন মরিয়া হয়ে শিশু বয়সের পড়া কোনো কবিতার কথা মনে করতে পারল। (দশম শ্রেণীতে কবির কবিতা সে কিছু পড়েছে।—কিন্তু এখন বিধির বিধানে তাও মনে করতে পারছে না। তা ছাড়া ঘটনাটা এমন শীঘ্র ঘটবে সে তাও ভাবতে পারেনি।) সে আবৃত্তি করল। ওর কণ্ঠ মসৃণ বলে কবিতা আবৃত্তির বিশুদ্ধ ভঙ্গিটুকু এলবিকে আপ্লুত করল।
বিজন টেনে টেনে আবৃত্তি করছে—
”পাখী সব করে রব রাতি পোহাইল
কাননে কুসুম-কলি সকলি ফুটিল।
রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।”
ওরা পরস্পর কথা বলতে পারছে না। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে ওরা উভয়ে যেন গম্ভীর এবং ঘন। উভয়ে যেন রবীন্দ্রনাথের মতো বিশুদ্ধ ইচ্ছায় পরস্পর মহৎ ভাবটুকু রক্ষা করছে।
বিজন এলবির কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রতীকীতে বাঁচবার ইচ্ছায় এও বলল, মোটরে যে কবিতা আমাকে শোনালে এ—কবিতা তারই মূল ভাষা।
বিজন ভাবল—বন্দরে আমি এলবির চোখে রবীন্দ্রনাথ হয়ে বাঁচব।
তারপর এলবির মোটর থেকে একসময় বিজন জাহাজে উঠে ফোকসালে ঢুকে দেখল, দেবনাথ বাংকে ঘুমিয়ে আছে। অন্যান্য কেবিনেও বিশেষ সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ভয়ানক শীতে সব জাহাজিরা কম্বল মুড়ি দিয়ে জাহাজে ঘুমোচ্ছে। সে ফোকসালে দাঁড়িয়ে কিছু কাশির শব্দ শুনল। দু—একজন জাহাজির আলাপ শুনল। এই শীতে উপরে উঠে হাত—মুখ ধুতে ইচ্ছা হল না। কোনোরকমে লকার থেকে খাবারটা বের করে খেয়ে নিল। তারপর ঠান্ডা জলে কুলকুচা করে পোর্টহোলে মুখ ধুলো এবং বাংকে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার ইচ্ছায় হাত—পা সটান করে দিল। অথচ ঘুম এল না। ঘুম আসছে না। বিজন অন্য ফোকসালে ফের কিছু জাহাজির আলাপ শুনছে। এখন হয়তো এলবি ঘরে ফিরে অন্য কবিতা আবৃত্তি করছে। এই বাংকেও সে এলবির কাছে মিথ্যার মুখোশের জন্য ছটফট করছে। অথচ সে স্পষ্ট হলে এই সাময়িক মানসিক অস্থিরতার গ্লানিকে ধৈর্য ধরে লালন করতে হত না; এই করে সে এক মিথ্যার জন্য হাজার মিথ্যায় জড়িয়ে পড়ছে।
ওর ইচ্ছা হল একবার দেবনাথকে ঘটনাটা খুলে বলে। সাহিত্য—প্রীতি এবং স্পৃহা দেবনাথের যথেষ্ট আছে। বরং সে দেবনাথকেই সঙ্গে নেবে। অথবা দেবনাথকে প্রশ্ন করে জানবে—ওর কাছে কবির কোনো বই অথবা কোনো কবিতা কণ্ঠস্থ….যদি থাকে তবে…তবে…সে নিঃসংশয় হতে পারছে না তবু। দেবনাথ! দেবনাথ! সে যেন ডেকেই উঠল। মনে মনে ওর এই ডাক এবং এলবির সরল বিশ্বাস, দুটো চোখের ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে ওর চোখে জ্বালা। ওর ঘুম আসছে না। এলবি ‘পাখীসব করে রব’ ইংরেজি হরফে লিখে নিতে চেয়েছিল। সে হয়তো এইসব মুখস্থ করে অন্য কোথাও আবৃত্তি….কিংবা বাহবা….কিন্তু বিজন বলেছে তখন শরীরটা ভালো নেই। আবার কাল হবে। আবার সে ছলনাকে কেন্দ্র করে বাঁচতে চাইল। এলবির ঘনিষ্ঠতা, সঙ্গ এবং দু’দণ্ডের আলাপ থেকে বিচ্ছেদের নিঃসঙ্গতায় সে বাঁচতে চাইল না। বিশেষত এই বিদেশিনীর কাছে স্পষ্ট হওয়ার দরুন কোনো পরাভবকে স্বীকার করার দরুন কোনো গ্লানিকে সহ্য করতে পারত না। অপমানবোধ বিজনের তীব্র। সেজন্য এই মিথ্যার মুখোশে আপাতত সে জাহাজি। সে খুশি।
ভোরবেলায় জাহাজে অনেক কাজ। সালফার নামানো হচ্ছে। হাড়িয়া—হাপিজ হচ্ছে ফল্কায় ফল্কায়। ভোরে আজ সূর্য উঠল না। আকাশ মুখ গোমড়া করে আছে। সমুদ্রের বাতাস পর্যন্ত। বন্দরের পাইন গাছে কোনো পাখি বসে নেই। শীতের জন্য ওরা অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে। শীতের জন্য এইসব জাহাজিরা হি হি করে কাঁপছে। ওরা সাবান—জল নিয়ে আজ ছুটে ছুটে কাজ করতে পারছে না, ওরা স্থাণুর মতো নীল উর্দির ভিতর গুটিয়ে আসছে। ওরা পুরানো জামা—কাপড় সব আফ্রিকার বন্দরে বিক্রি করে এখন পস্তাচ্ছে। শীতের কষ্ট ভয়ানক কষ্ট।
পাশের জাহাজে কীসের যেন শোরগোল। পাশের জাহাজের নাবিকরা পোর্ট—সাইডের ডেকে জড়ো হয়েছে। ওরা রেলিংয়ের উপর ঝুঁকছে। ওদের সকলের চোখ বন্দরের জলের উপর। এই জাহাজের নাবিকরা ঘটনাটা ধরতে না পেরে গলুই—এ জড়ো হয়েছে। মেজ মালোম অন্য জাহাজিদের ডেকে ঘটনার কথা জানতে চাইলেন। পাশ থেকে কে একজন যেন বলল, পাশের জাহাজের তিন নম্বর মিস্ত্রি জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনাটা তারপর আরও বিস্তৃত হল। বন্দরের সব লোক চারপাশে জড়ো হয়েছে। এ—শীতেও কিছু লোক জলে নেমে অনুসন্ধান করছে তিন নম্বর মিস্ত্রিকে অথচ মিস্ত্রিকে পাওয়া যাচ্ছে না। ইংলন্ডে ওর স্ত্রী এডালট্রি কেসে জড়িয়ে পড়েছে—এই খবরটা এখন জাহাজিদের মুখে মুখে।
ভোরের এইসব সাত—পাঁচ ঘটনায় বিজন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। ওর মনে নেই এবং মনে পড়ছে না—গতকাল এক রমণীয় পরিবেশে কোনো এক সুন্দরী যুবতীর পাশে মরিয়া হয়ে নকল কবির অভিনয় করেছে। মনে পড়ছে না আজও এমন ঘটতে পারে। একজন জাহাজির আত্মহত্যা এবং সালফেটের গন্ধ এই প্রচণ্ড শীত ওকে ওর অস্তিত্ব সম্বন্ধে বিলকুল বিপরীত ধারণার বশবর্তী করেছে। সে ভাবল মৃত্যুই শ্রেয়, মৃত্যুই শ্রেষ্ঠ। পিস ওয়াজ অন দেয়ার ফোরহেডস—সে এ—কথাও ভাবল। সেলিমের কপালে শান্তির রেখা ফুটে উঠেছে হয়তো। এলবির সেই মুখ—সেখানেও একদিন শান্তির রেখা নামবে—কেউ বাদ যাবে না। কবিতা আবৃত্তির সময় এলবির সেই গভীর দৃষ্টি, সেই দৃঢ় অথচ প্রীতিপূর্ণ চোখ সে রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে নিঃস্ব পাইনের আঁধারে সহসা যেন দেখল। এলবি তাকে ভালোবাসতে চায়। রবীন্দ্রনাথের মতো করে ভালোবাসতে চায়। বিজন যেন এখন কবির প্রতীকীতে বাঁচবার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়ে উঠল। সে ডাকল—দেবনাথ, দেবনাথ, নিচে এসো কথা আছে। বিকেলের কথা রাখার জন্য সে নিচে সিঁড়ি ধরে ফোকসালে ঢুকে গেল। —তুমি তো অনেক বই এনেছ সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের কোনো বই আছে তোমার কাছে? এইসব বলার ইচ্ছা হল।
সে দেবনাথের কাছেই একটি কবিতার সংকলন পেয়ে গেল। সে তিক্ত বিস্বাদে বইটির পাতা উলটাচ্ছে। সে বারবার করে একই কবিতা পড়ল। পড়ে মুখস্থ করল। সে পড়ল।
”জড়ায় আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই
ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে”
বিকেলে মোটর নিয়ে এলবি বন্দরে হাজির। বন্দরে সে বিজনের জন্য অপেক্ষা করছে। কিনারার শ্রমিকরা এখন জাহাজের কাজ ছেড়ে বাড়ি ফিরছে। ওরা সকলে এলবিকে অভিবাদন জানাল। কোয়ার্টার মাস্টার তখন খবর দিয়ে পাঠিয়েছে বিজনকে। বিজন একবার গলুই—এ উঠে উঁকি দিয়ে এলবিকে দেখল। সে আবার আবৃত্তি করল সিঁড়ি ধরে নামার সময়। সে একবার সেলিমের হাসপাতালের দৃশ্যে, পরে এই কবিতার সুরে এবং আরও পরে পোশাকের ভিতর ঢুকে গিয়ে অম্লান থাকার ইচ্ছায় শিস দিতে থাকল।
নিচে নেমে ওরা উভয়ে পরস্পরকে অভিবাদন জানাল। বিজন মনে মনে কবিতা আবৃত্তি করল—সেই নির্দিষ্ট কবিতা, সেই সুরে, সেই নিঃস্ব অথচ ভরা কোটালের মতো আবেগধর্মিতায়। অথচ এলবিকে জানতে দিল না মনে মনে সে এখন কবিতা আওড়াচ্ছে। মনে মনে সে এখন কবিতার মতোই বিশুদ্ধ ভাব নিয়ে বেঁচে আছে। সে সেলিমের পাশে বিশুদ্ধ ভাব নিয়ে বসবে। সে সেলিমের মাথায় হাত দিয়ে বিশুদ্ধ শান্তি দেবে। বলবে, তুই ভালো হয়ে উঠবি। বলবে নার্সকে, প্লেট কী বলছে? আর কত দিন সেলিমকে এখানে থাকতে হবে?
গাড়িতে এলবি রাস্তার নাম, জায়গার নাম তারপর আরও কতরকমের কথা—রাজনীতি থেকে খেলাধুলো, এমনকি রয়েল হাসপাতালে দুজন ভারতীয় মেয়ে নার্স ট্রেনিং—এ আসছে এ খবরও দিল এলবি। ওর বাবা পার্থে যাচ্ছেন। মা এবং বাবা হয়তো যাওয়ার পথে একবার এখানে এসেও যেতে পারেন। কারণ এলবি বিজন সম্বন্ধে বিস্তারিত লিখে দিয়েছে। সুতরাং বাবা আসছেন, মা আসছেন।
এলবি গাড়ি চালাবার সময় একবার হাতের ঘড়ি দেখল। যেন আজ হাতে কিছুটা সময় বেশি আছে। খুব বিশেষ তাড়া নেই কাজের। গাড়ির গতি সাধারণ। এলবি খুব খুশি খুশি হয়ে কথা বলছিল। বলছিল, আশা করি সেলিমের ভালো খবরই আমরা পাব।
ওরা হাসপাতালে কিন্তু শুনল অন্য কথা। মিঃ ট্রয় সেলিমের কাছে এলবির নামে একটা চিঠি রেখে গেছেন। এলবি চিঠিটা পড়ল। এলবিকে এখন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। বিষণ্ণতা বিজনেও সংক্রমিত হল।
এলবি বলল, সেলিমের মেজর অপারেশন হবে। বাঁদিকের ফুসফুসটা কাটা ছেঁড়া করবে। এলবি এইসব কথা হাসপাতালের সিঁড়ি ধরে নামার সময় বিজনকে শোনাল।
বিজন বিছানায় বসে সেলিমের সঙ্গে রঙ্গতামাসা করেছিল। দেশে ফিরলে সেলিম বিবিকে প্রথম কোন জাহাজি বন্ধুর গল্প শোনাবে, প্রশ্ন করে বিজন জানতে চেয়েছিল আরও অনেক সব কথা বিজন যেন মনে করতে পারছে না।
আরও দু—একজন জাহাজি ওর পাশে বসে ছিল। সারেং বলে পাঠিয়েছেন তিনি কাল এসে দেখে যাবেন। বিজন সেলিমের বিছানায় শেষ সময়টুকু পর্যন্ত কাটাতে পেরে খুশি। তারপর ভিজিটারদের শেষ ঘণ্টা পড়ল। সিঁড়ি ধরে নামবার সময় সেলিমের অস্ত্রোপচারের কথা শুনল। এবং এই শুনে বিজনের কেমন অন্যমনস্কতা বাড়ছে। এলবি গাড়িতে বসে লক্ষ্য করছে ভয়ানক দুশ্চিন্তায় বিজন খুব ভেঙে পড়ছে। এলবির এখন বিজনকে আশ্বস্ত করা দরকার।
বিজন বলল, সেলিম আমার সঙ্গে দু’সফর ধরে কাজ করছে। দু’সফর ধরে ওর সঙ্গে মেলামেশা, কখন যে আমরা এত ঘনিষ্ঠ হয়েছি জানি না। এখন বুঝতে পারছি ওর অভাবটা জাহাজে আমার কত বড় হয়ে বাজছে।
তারপর ওরা এইসব স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ আলোয় অথবা মনের আরও সব নীল ইচ্ছায় প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে তারপর সেই কবিতার জগতে ফিরে আসা, কবিতার জগতে ডুবে যাওয়া, ইতিহাসের মৃত নায়কের মুখের মতো ছবি হয়ে বসে থাকা এবং অবশেষে মুখোমুখি চুপচাপ বসে থাকা। এমন একদিন হয়নি, অনেক দিন হয়েছে। এরা পরস্পরকে কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছে। এলবি বিজনকে বাড়ি নিয়ে গেছে। ওর হাতের আঁকা ছবি দেখিয়েছে। তারপর কোনো রেস্টুরেন্টে অথবা নীল আকাশের নিচে বসে সেলিমের অস্ত্রোপচারের দিনের কথা ভেবে বিষণ্ণ হয়েছে।
একদিন এলবি বলল, বাবা, মা কাল আসছেন।
জীলঙ এখান থেকে কত দূর? প্রশ্ন করেছিল বিজন।
খুব বেশি দূর নয়।
কীসে ওঁরা আসবেন?
ট্রেনে আসা যায়। বাবা মোটরে আসছেন। খুব প্লেজান্ট জার্নি। তারপর একটু থেমে এলবি আবার বলল, ওঁদের সঙ্গে আলাপে তুমি খুশি হবে।
আমার সঙ্গে আলাপে ওঁরা খুশি হবেন তো?
এলবি হাসল।
দু’দিন পর এলবি ওর বাবা—মার সঙ্গে বিজনকে পরিচয় করিয়ে দিল। ওঁরা বিজনকে বললেন, আমাদের পরম সৌভাগ্য তোমাকে আমাদের ভিতর পেয়েছি। পরম সৌভাগ্য, এলবি এ সময় খবর দিয়ে তোমার কথা জানিয়েছে। আমরা সকলেই কবির খুব ভক্ত। তুমি তাঁর দেশের লোক। তুমি ওঁর স্পর্শ লাভ করেছ—এবং আমরা তোমার সঙ্গলাভ করেছি ভেবে খুশি।
এলবির বাবার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে বিজন সত্যি খুশি। ভদ্রলোক অমায়িক। ভদ্রলোক প্রাণোচ্ছল অথচ কথাবার্তায় খুব সংযত। বিজনের মুখ থেকে কবির কবিতা শোনার একান্ত ইচ্ছা ওঁদের। বিজন পর পর কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করল।
ওঁরা খুশি হয়ে বললেন, তুমি আমাদের কথা দাও ডিনারে একদিন উপস্থিত থাকবে। আমরা খুব আনন্দিত হব তোমার উপস্থিতিতে।
দিন স্থির করুন, আসব।
কিন্তু একটা কথা, মিঃ চার্লটন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। একটা সিগারেট ধরালেন এবং পাশে এসে বললেন, আমরা তোমাকে চাইনিজ ডিশ দেব। খুব মনোরম খেতে। কিন্তু…।
এলবি এবার আর একটু খুলে বলল। বাবা চিনে অনেক দিন ছিলেন। এমব্যাসিতে কাজ করতেন। সুতরাং বাবা কোনো ভদ্রলোককে ডিনার—পার্টিতে নিমন্ত্রণ করলেই তাঁকে চাইনিজ ডিস দিতে ভালোবাসেন।
চার্লটন আবার আরম্ভ করলেন, কীন্তু কথা হচ্ছে ট্যাগোরের দেশের ছেলে তুমি বলতে গেলে ঘরের ছেলে। সুতরাং ট্যাগোর কী খেতেন এবং খেতে ভালোবাসতেন নিশ্চয়ই তোমার জানা আছে। মেনুতে ট্যাগের ডিশও একটা থাকবে কী বল? তার প্রিপারেশনের ভার তোমার উপর। কী কী লাগবে বলে দাও, আমি সব সংগ্রহ করে রাখব। আগামী রবিবার ছুটির দিনে আমরা এখানে ফের আসব। এবার তিনি থামলেন। পাশে মিসেস চার্লটন উল বুনতে বুনতে লাফিয়ে উঠলেন, বড় চমৎকার হবে। এলবির পিসিকে বললে হয়। তারপর আরও দু—একজনের নাম তিনি বলে গেলেন।
বিজন বলল, রান্নাতে আমি অভ্যস্ত নই। দেবনাথ বলে একজন জাহাজি আছে, সেও বাঙালি, সে ভালো রাঁধতে জানে। ওকে নিয়ে আসব।
এলবি টেবিলের উপর খাতা রেখে বলল, কী কী সংগ্রহ করতে হবে বল।
কিছুই দরকার হবে না। কারণ মশলাপাতি তুমি এখানে কোথাও খুঁজে পাবে না। সরষের তেলও বোধহয় নেই। দেবনাথকেই বলব সব সংগ্রহ করতে, পারো তো কিছু ডিম, মাংস এবং ভেজিটেবল সংগ্রহ করে রেখ। তাতেই চলবে।
এলবি দীর্ঘদিন পর আজ সকলকে পিয়ানো শোনাল। বিজনের মনে হল, এলবি উলের পোশাক পরে আছে। এলবির সাদা স্কার্ট এবং সাদা জ্যাকেট থেকে সে রঙ যেন চুঁইয়ে পড়ছে। বাইরে শীতের ঠান্ডায় যেন তুষার ঝরছে। ওরা তিনজন আগুনের পাশে বসে উত্তাপ নিচ্ছে। মাঝে মাঝে মিসেস চার্লটন উনুনে কাঠ গুঁজে দিচ্ছেন। মিঃ চার্লটন চীনদেশের গল্প করছেন এখন। সে—দেশের রীতিনীতির গল্প করছেন। এলবি এখন আর পিয়ানো বাজাচ্ছে না। চেয়ারে বসে সেও বিদেশের গল্প শুনছে। সহসা এইসব কথার ভিতর বিজন যেন দেখল ওরা সকলে একই পরিবারভুক্ত লোক হয়ে শীতের রাতে উনুনের পাশে আগুন পোহাচ্ছে। মনে হল বাংলাদেশেরই কোনো পরিবারের ভিতর বসে সে যেন ঠাকুমার গল্প শুনছে।
নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে দেবনাথ এবং বিজন সকাল সকাল জাহাজ থেকে নেমে গেল। ছুটির দিন। এই শীতের ভিতরও শহরের সব যুবক—যুবতী ছুটি ভোগ করতে দলে দলে বের হয়ে পড়েছে। ওরা সব রেস্তোরাঁয়, পাব—এ অথবা পার্কে কিংবা শহরতলিতে ছড়িয়ে পড়ছে। দেবনাথ এবং বিজন হেঁটে যেতে যেতে সব টের পাচ্ছে। ওদের হাতে ছোট নীল ব্যাগ। ট্যাগোর ডিশের জন্য যাবতীয় দ্রব্য সংগ্রহ করা ওতে। ওরা গল্প করতে করতে অথবা অযথা উচ্ছল হতে হতে হাঁটছে।
ওরা বন্দর ফেলে, জনসন রোড ধরে ছোট পাহাড়টায় উঠে গেল। এখানে ছোট ছোট কাঠের ঘর—নীল অথবা হলুদ রঙের। দরজায় নীল রঙের পালিশ। বাড়ির সংলগ্ন ছোট ফুলের বাগান, সবজির বাগান। প্রচণ্ড শীতের জন্য বাগানে কোনো ফুল অথবা সবজির চিহ্ন নেই। গোলাপেরা শুধু কুঁড়ি মেলার চেষ্টা করছে। ওরা দ—এর মতো পথে, কখনও সিঁড়ি ভেঙে, কখনও ঘুরে ঘুরে এলবির ছোট নীল আস্তানায় গিয়ে হাজির হল। প্রথমেই ছোট কাঠের দরজা।
সংকীর্ণ ফুটপাতের বাঁ—পাশের থামটায় লেখা ‘শান্তির নীড়’ তামার প্লেটে খুব চকচক করছে। সদর দরজার উপর আইভিলতার গুচ্ছ। পাতা নেই। শুধু লতাগুলো দুলছে। ভিতরে বাঁ—পাশে মুরগির ঘর। ডানপাশে ফুলের বাগান। ‘এল’ অক্ষরে পথ। পথের দু’পাশে নানা রকমের সামুদ্রিক পাথর। অন্য পাশে কোমর সমান কাঠের রেলিংয়ে কিছু নীল প্রজাপতি বসে আছে; মিঃ চার্লটন এবং মিসেস চার্লটন বের হয়ে এসে ওদের অভিবাদন জানালেন। বললেন, গতকালই আমরা এসে গেছি।
এলবিও সেজেগুজে বের হল। যেন ফুলের মতো এই শীতের হালকা রোদে ফুটে উঠল। এলবি ওদের ভিতরে নিয়ে গেল। বিজন দেবনাথের সঙ্গে ওঁদের পরিচয় করিয়ে দিল। এলবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেবনাথকে সমস্ত বাড়িটা দেখাল। এই ওর বাড়ি এখানে সে থাকে, ওই ওর ঘর—এখানে সে রাঁধে, এই ওর ঈজেল—এখানে সে ছবি আঁকে। দেবনাথ সব ঘুরে ঘুরে দেখল। এলবির একটি বিশেষ রুচি আছে এ বোধ ওর এখন জন্মাচ্ছে। ঘরে সব বড় বড় ক্যানভাস। নানা রঙের ছবি।
ওরা এসে পাশের ঘরটায় বসল। মিঃ চার্লটন কতকগুলো ছোট ছোট কাঠি এনে পাশে রাখলেন। মসৃণ করার জন্য কিছু শিরিষ কাগজ। তিনি সকলকে কাঠিগুলো দেখালেন—এগুলো রাইস—স্টিক। তারপর দু—আঙুলের ফাঁকে কাঠি চেপে ধরার কায়দা—কানুন শেখাতে থাকলেন দেবনাথ এবং বিজনকে। দেখালেন, কী করে স্টিক ধরতে হয়, কী করে মুখে ভাত তুলতে হয়। একটা খালি চিনেমাটির বাসনও রাখলেন সকলের সামনে। ছোটখাটো একটা ডেমনস্ট্রেশন দিলেন।
দেবনাথ এইসব দেখে বিরক্ত হচ্ছিল। সে ঘড়ি দেখল। এখন দশটা বাজে। এখনও এলবি টেবিল সাজাচ্ছে। কখন রান্না হবে এবং কখন খাওয়া হবে এই ভেবে সে উষ্মা প্রকাশ করল।
একটি ঘরকেই এলবি কাঠের পার্টিশন দিয়ে দু’ভাগ করে নিয়েছে। এ—ঘর থেকে সে—ঘরে যাবার একটি মাত্র খোলা পথ। একটিমাত্র দরজা। দরজায় পাল্লা নেই। দরজায় চাইনিজ সিল্কের দামি পর্দা। পর্দা সরালেই ঘরটা স্পষ্ট। পর্দা সরালেই ধবধবে বিছানা স্পষ্ট। দেবনাথ পর্দা সরিয়ে সব দেখল। বারান্দার দক্ষিণ দিকে চিলতে রান্নার জায়গা। পরে বাথরুম, পাশে ছোট একটি লনের মতো জায়গা। সেখানে গরমের দিনে ইজিচেয়ার নিয়ে বসা যায়। সেখানে একটি ভাঙা ঈজেল এখনও রেলিং—এর সংলগ্ন হয়ে পড়ে আছে। ছুটির দিনে এলবি সেখানে ছবি আঁকে।
ওরা উঁচু জায়গায় বসে বন্দর দেখল। বন্দরের জাহাজ দেখল। এখানে বসে অসীম সমুদ্রের বিস্তৃতি চোখে পড়ছে। পাহাড়ের নিচে সারি সারি ছবির মতো ঘর, ছবির মতো মানুষেরা হাঁটছে। দেবনাথ চারপাশটা চোখ মেলে দেখল।
দেবনাথ ফের ঘড়ি দেখে বাংলাতে বিজনকে বলল, ওরা কি আমাদের নিমন্ত্রণ করে খালি—পেটে রাখার ব্যবস্থা করছে নাকি। এখন বাজে সাড়ে দশটা অথচ রান্নার কোনো আয়োজনই করছে না।
বিজন বলল এলবিকে, সব জোগাড় আছে তো? অর্থাৎ এই কথা বলে বিজন রান্নার প্রসঙ্গে আসতে চাইল।
এলবি ফুলদানিতে কিছু সংগ্রহ—করা ফুল ভরে দিল। তারপর বিবাহিত রমণী—সুলভ চোখে বিজনকে দেখল এবং বলল, সবই এনেছি। তোমাকে ভাবতে হবে না। রান্নাঘরে ঠিক আমরা এগারোটায় ঢুকব। এবং আশা করছি ঠিক বারোটায় রান্না শেষ করতে পারব। ট্যাগোর—ডিশের কী কী মেনু হবে? এলবি দেবনাথকে প্রশ্ন করল।
দেবনাথ বলল, মেনু বেশি করতে হলে অনেক সময়ের দরকার হবে। বস্তুত দেবনাথ ডিমের ঝোল অথবা মাংসের ঝোলই ভালো রান্না করতে পারে। মাংসের ঝোল করতে বেশি দেরি হবে বলে সে বলল, রাইস এবং এগ—কারি।
এলবি বলল, রাইস তো চাইনীজ ডিশেও থাকবে। সুতরাং একমাত্র এগকারি।
একসময় দেবনাথ এবং মিঃ চার্লটন রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। দেবনাথ সঙ্গে করে গুঁড়ো মশলা এনেছে। এলবি দেবনাথকে সিদ্ধ ডিমের কৌটা খুলে বড় বড় কিছু ডিম বের করে দিল। মিসেস চার্লটন এবং বিজন ওঁদের সকলকে কাজে সাহায্য করলেন। গ্যাসের উনুনে আতপ চালের ভাত হল। এই ভাত রান্নার কৌশলটুকু আয়ত্ত করে মিঃ চার্লটন এখন গৌরব বোধ করছেন। তিনি ভাত রান্নার সময় গল্প করছিলেন—কোথায়, কখন এবং কী কৌশলে তিনি এই দুর্লভ বিদ্যা আয়ত্ত করেছেন। বারবারই সেই চাইনিজ মহিলাটিকে তিনি ধন্যবাদ জানালেন। জানালেন ভদ্রমহিলা খুবই আন্তরিক।
এলবি কৌটা খুলে কিছু কর্ন—বিফ বের করে দিল। মিসেস চার্লটন ময়দার ডেলা গোল করে সেই কর্ণ—বিফ ভিতরে ভরে দিচ্ছেন। সেগুলো জলে সিদ্ধ করে নেওয়া হয়েছে। এ—সময় ভয়ানক উৎকট গন্ধে বিজন ঘরে থাকতে না পেরে বাগানে চলে এল এবং অনেকক্ষণ ধরে একা একা পায়চারী করল।
এক ঘণ্টার ভিতরেই রান্না সব হয়ে গেল। রাতে ছোট একটি ভেড়ার বাচ্চা রোস্ট করে রাখা হয়েছিল। এখন শুধু ওটাকে ফের চর্বি মাখিয়ে গরম করে নেওয়া হল। গ্রিন পিজ সিদ্ধ করে নেওয়া হয়েছে। কিছু স্যালাড, স্যান্ডউইচ। ইতিমধ্যে মিঃ ট্রয় এসে গেছেন, টনি এসে গেছে, এলবির পিসিও এসে পড়লেন। এবং অন্যান্য আরও দু—একজন অপরিচিত ব্যক্তি, যাঁরা সকলেই মিঃ চার্লটন অথবা মিসেস চার্লটনের বন্ধু পর্যায়ে। ওঁরা ঘরে ঢুকে সকলকে অভিবাদন জানালেন এবং পরিচিত হলেন।
খাবার টেবিলে ওঁরা সকলে সকলকে সাহায্য করলেন। খেতে বসার আগে এলবি বলল, আমরা ভগবানের পৃথিবীতে নিত্য দুটো আহার্য গ্রহণের সময় সকলে প্রার্থনা করব। বেচারি সেলিম আরোগ্য লাভ করুক। সকলে দাঁড়ালেন এবং মিনিট দুই কাল সেলিমের নিরাময়ের জন্য অধোবদনে থাকলেন। তাঁরা সকলে প্রার্থনা করছেন। এলবিকে যথার্থই এখন বাঙালি আটপৌরে গৃহিণীর মতো মনে হচ্ছে।
খেতে বসেই খুব উৎসাহের সঙ্গে চার্লটন ভোজ্যদ্রব্যের ফিরিস্তি দিলেন প্রথম। কিছু রাইস—স্টিক পরস্পর পরস্পরকে দিলেন। প্রথমেই চীনেমাটির বাসনে কিছু ভাত এবং আধসিদ্ধ মাংসপুর, একটু গোলমরিচের গুঁড়ো চার্লটন সকলকে পরিবেশন করলেন। এবং কাঠির সাহায্যে সকলকে খেতে অনুরোধ করলেন।
এইসব আধসিদ্ধ মাংসপুর, ভাত কাঠির সাহায্যে মুখে তুলতে গিয়ে বিজন ওয়াক তুলতে তুলতে বলে ফেলল, যথার্থই চমৎকার আপনার এই চাইনিজ ভোজ্যদ্রব্য। সঙ্গে সঙ্গে মিঃ চার্লটন মেয়েকে লক্ষ্য করে বললেন, বলেছি না, ওরা তারিফ করবে। চীন ভারতবর্ষ পাশাপাশি দেশ। সংস্কৃতিতে সভ্যতায় ওরা প্রায় এক।
দেবনাথ কান্নি মেরে মিঃ চার্লটনকে দেখল। ইচ্ছে হল ডিশের সবগুলো ভোজ্যদ্রব্য চার্লটনের মুখে ছুড়ে দেয়। অথচ সেও বলল, ভেরি নাইস।
দেবনাথ এবার ট্যাগোর ডিশের এগকারি সকলকে পরিবেশন করল। সে জানত লঙ্কার গুঁড়োটা একটু বেশিই পড়েছে। সে জানত ঝাল খেয়ে ওদের জিভ টাটাবে। সে বিদ্রুপ করে বলল, ট্যাগোর ঝাল একটু বেশি খেতেন।
খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝাল চার্লটনের মাথায় উঠে গেল। চার্লটনের মাথায় টাক। তিনি তালুতে ঠান্ডা হাত রাখলেন। ঝাল খেয়ে অন্য সকলের ঠোঁট কুঞ্চিত হচ্ছে প্রসারিত হচ্ছে। সকলে জল খেলেন প্রচুর। এবং গাদা গাদা চিনি খেলেন। চোখ সকলের ভারী হয়ে উঠেছে, লাল হয়ে উঠেছে। ওঁরা তবু কোনোরকমে উচ্চারণ করলেন, গ্র্যান্ড। ট্যাগোর ডিশ গ্র্যান্ড।
দেবনাথ এবং বিজন ভাতের সঙ্গে ডিমের ঝোল বেশ তৃপ্তি করেই খেল। ওরাও বলল, ট্যাগোর ডিশ গ্র্যান্ড। তারপর ওরা কাঠি দিয়ে ভাত খাওয়ার চেষ্টা করল। কিছু খেল, কিছু নষ্ট হল। তারপর স্যান্ডউইচ, গ্রিন পিজ এবং ল্যাম্ব—রোস্ট খেয়ে ওরা খুশি হতে পারছে। ওদের ওখন সেই ত্রাহি—ত্রাহি ভাবটুকু নেই। শেষে কফি খেয়ে ওরা সকলে তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল। সকলের মুখ দেখে মনে হবে এখন এইমাত্র টেবিলে বড় রকমের একটা ঝড় বয়ে গেছে।
বিকেলে স্টেশন—ওয়াগনে মিঃ এবং মিসেস চার্লটন জীলঙের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। মিঃ ট্রয় ও অন্যান্য দু—একজন আগেই চলে গেছেন। এলবির পিসি গেলেন এইমাত্র। যাওয়ার আগে দেবনাথ এবং বিজনকে ওঁর ঘরে একদিন নিমন্ত্রণ করে গেলেন।
এরপর এলবি বিজন এবং দেবনাথকে নিয়ে হাসপাতালে গেল। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে ওরা তিনজন যখন গাড়িতে উঠতে যাবে তখন দেবনাথ বলল, এবার আমি যাই। জাহাজে আমার একটু দরকার আছে।
গাড়ির ভিতর এলবিকে আজ একটু উচ্ছল বলে মনে হল। এলবি বলল, দেখবে সেলিম ভালো হয়ে উঠবে। ওকে আজকে খুব ভালো দেখাচ্ছিল। সে নিজে এখন হাঁটাচলা করছে। এখন অপারেশন হলে বাঁচি।
বিজন বলল, আমিও আশা করছি আমরা একসঙ্গে দেশে ফিরতে পারব। একসঙ্গে ফিরতে পারলে খুবই আনন্দের ব্যাপার ঘটবে।
এলবি কথা বলল না। এলবি সন্তর্পণে ওর মুখ দেখল। বিজনের মুখে যেন এখন আর কোনো যন্ত্রণার ছবি নেই। যেন সে এমত ঘটনায় যথার্থই আনন্দিত হবে। এলবি স্টিয়ারিং—এ বসে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল।
ওরা আবার জাফরি—কাটা আলো এবং পাতার ছায়ায় এসে বসল। বিকেল থেকে ঠান্ডা হাওয়া বইছে না। ওরা আজ পাশাপাশি বসল না। ওরা মুখোমুখি বসল। এলবি আজ ইচ্ছা করেই পর পর চার—পাঁচটি কবিতা শোনাল বিজনকে। আর বিজনকে বাংলা কবিতা আবৃত্তি করার জন্য কোনো অনুরোধ করল না, এমনকী বিজন কতটা আগ্রহ নিয়ে শুনছে তাও লক্ষ্য করল না। এবং এই কবিতা আবৃত্তির সময়েই এলবির একটু মদ খেতে ইচ্ছে হল। বলল, তুমি একটু মদ খাবে, বিজন?
সে রাতে উভয়ে মদ খেয়েছিল। অথচ পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়নি। পরস্পর গোলাপি নেশায় উন্মত্ত হয়নি। তবু কেন জানি বিজন ঘাস থেকে উঠতে পারছিল না। সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওর দস্তানা খুলে যাচ্ছে। পেটের ভিতর এক দুরন্ত যন্ত্রণায় সে অস্থির হয়ে উঠেছে। সে বলল, এলবি, আমি আর পারছি না।
এলবি সমস্ত শক্তি দিয়ে বিজনকে তুলে ধরল এবং ধীরে ধীরে মোটরের ভিতর এনে শুইয়ে দিল। তারপর বাড়ি ফিরে বিজনকে নিজের খাটে শুইয়ে দিল এবং ফোন তুলে ডায়াল করল। বলল, ক্যারল আছেন? ডঃ ক্যারল। প্লিজ ফাইভ বাই এইট নটিংহিল। পেশেন্ট সিরিয়াস।
ডাক্তার বিজনকে দেখেছিলেন এবং বলেছিলেন, কনস্টিপেশনের জন্য এমন হয়েছে। ভয়ের কিছু নেই। দু’দিনেই ভালো হয়ে উঠবে। দু’রকমের পিল থাকল। এখন একটা খাইয়ে দিলেই ব্যথাটা কমে আসবে। পেটে একটু গরম জলের সেঁক দিতে পারেন।
ডাক্তারবাবু চলে গেছেন। এলবি বিজনকে বলে দু’মিনিটের জন্য বাইরে গেছে। বিজন যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে দেয়ালের সব ছবি দেখল। বড় বড় সব ক্যানভাসে নানা রঙের ছবি। কবির ছবি দেয়ালে। হলুদ রঙের দেয়াল। এলবির হাতে আঁকা কবির এই ছবি যেন বিজনকে বিদ্রুপ করছে। যেন বলছে বাহবা, যা হোক তোমরা আমাকে নিয়ে তামাসা করলে। বিজন এই যন্ত্রণার ভিতরও প্রথম দিনের কথা ভেবে অনুতপ্ত। বস্তুত সে সঙ্গসুখে অধীর হয়ে ওর প্রথম দিনের ইচ্ছাকৃত তামাসার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিল।
এলবি ঘরে ফিরেই বিজনের কপালে হাত রেখে উত্তাপ দেখল। তারপর জল এনে পিল খাইয়ে দিয়ে হট—ওয়াটার ব্যাগে পেটে সেঁক দিতে থাকল। অধীর আগ্রহে সারারাত জেগে ওর পাশে বসে থাকল। ভোর রাতের দিকে যন্ত্রণা থেকে বিজন যেন মুক্তি পেল। বিজন পাশ ফিরে এলবির সেই আন্তরিক এবং প্রীতিপূর্ণ চোখের দিকে চেয়ে বলল, এলবি, তোমাকে খুব কষ্ট দিলাম।
এলবি ওর কপালে হাত রাখল শুধু। কোনো কথা বলল না। বিজন ওর চোখ দেখেই বুঝল, বুঝতে পারছে এ মুহূর্তে ওকে নিরাময় করে তোলার কী আকুল ইচ্ছা এলবির চোখে।
ভোরের দিকে বিজন ঘুমিয়ে পড়েছে। সুতরাং ঘুম ভাঙতে ওর দেরি হল। জানালার রোদ ওর বিছানায় এসে নেমেছে। এলবি বাইরের ঘরে আছে। কাকে যেন ফোন করল এইমাত্র। বিজন বিছানায় শুয়ে সব ধরতে পারছে—এলবি জাহাজে ফোন করে কাপ্তানের সঙ্গে কথা বলছে, ওর অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর দিচ্ছে এবং সঙ্গে চার—পাঁচদিনের ছুটি মঞ্জুর করার জন্য ফোনে আবেদন পেশ করছে। এলবি এ—ঘরে এসে দাঁড়ালে বিজন ভাবল, কী দরকার আর থেকে। শরীর আমার ভালো হয়ে গেছে। বেশ সুস্থ বোধ করছি। বরং আজ জাহাজে চলি। কিন্তু এলবির মুখের দিকে চেয়ে বলতে পারল না কথাগুলো। চোখে ওর সারারাত অনিদ্রার অবসাদ। শরীরে ক্লান্তি। এলবি ওর কপালে হাত রেখে বলল, খুব ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলে যাহোক।
তাই নাকি!
তা নয়তো কী! একটু মদ খেলে তো, অমনি ঘাসে লুটিয়ে পড়লে।
তুমি তো জানো এলবি, ওটা মদের জন্য হয়নি। ওটা জাহাজে কাজ করার পর থেকেই হচ্ছে। মাঝে মাঝেই হত, কিন্তু এমন কঠিন হত না।
একটু থেমে বিজন বলল, বরং এখন জাহাজে চলি।
তুমি কি পাগল, বিজন। ক্যারল তোমাকে পুরা পাঁচদিন বিশ্রাম নিতে বলেছেন। কাপ্তানকে এইমাত্র খবর দিলাম। তিনি খুব ভালো মানুষের মতো বললেন, সেজন্য কী আছে। নিশ্চয়ই ও চার—পাঁচদিন ছুটি পাবে।
তুমি তো ছুটি নিলে। কিন্তু এখানে থাকার অর্থই হচ্ছে তোমাকে অসুবিধায় ফেলা।
আমার কোনো অসুবিধা হবে না। পাশের ঘরে আমি থাকব। যখন যা দরকার আমাকে বলবে।
বিজন পুরো পাঁচ রাতই ওই ঘরে থাকল।
পাঁচ রাত ওরা পাশাপাশি ভিন্ন ঘরে শুয়ে জানালায় রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখতে দেখতে অথবা কবিতা আবৃত্তি করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ত। অথবা ঘুমিয়ে পড়ার ভান করত। এলবি বালিশের নিচে দুটো হাত সন্তর্পণে ঢুকিয়ে কী যেন বারবার খুঁজত। কী যেন বালিশের নিচে ওর হারিয়ে গেছে। কখনও এলবি রাতের প্রজাপতিদের বিছানার চারপাশে দেখত। ওর প্রতীক্ষার জগতে সেইসব প্রজাপতিরা উড়ে উড়ে একদা অবসন্ন হত এবং সকালের দিকে ওরা ঘুমিয়ে পড়ত। কোনো কোনো রাতে এলবি এই শীতেও জানালা খুলে রাতের প্রজাপতিদের শরীর থেকে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। এই ঘন রাতে এবং শীতের রাতেও ওর শরীর মধুর এক উত্তেজনায় অধীর হয়েছে। বাঙালি এক নাবিকের শরীরে কবির যুবা শরীরী বৃত্তিকে স্পর্শ করার ইচ্ছায় এলবি সহসা কাতর হত। আর বিজন নিজেকে রবীন্দ্রনাথের অনুগামী ভেবে মেকি সাধুর অভিনয় করে গেল। পর্দার আড়ালটুকু ওদের দুজনকে সেজন্য পরস্পর মহৎ করে রাখল। জাহাজে ফিরে এসে বিজন প্রথম রাতে অনিদ্রায়, দ্বিতীয় রাতে অসহিষ্ণুতায় ভুগে সারাদিন কাজ করার অজুহাতে ডেক—এ পড়ে থাকল। দু’দিন এলবি ইউনিয়নের কাজে শহর ছেড়ে অন্যত্র থাকছে মিঃ ট্রয়ের সঙ্গে। দুদিন দেখাসাক্ষাতের কোনো সুযোগ নেই। বিকেল কাটছে হাসপাতালে। পরবর্তী সময়টুকু আর কিছুতেই কাটতে চাইছে না। খুব নিঃসঙ্গ ভাব জাহাজে। কেউ থাকছে না। বন্দরে নেমে সকলে গলির আঁধারে হারিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। এইসব দেখে সে আর পারছে না; সংযম না আত্মরক্ষায় সে তাও বুঝতে পারছে না।
বস্তুত বিজন এক অহেতুক ঈর্ষায় পীড়িত হচ্ছে। মিঃ ট্রয়কে কেন্দ্র করে এই ঈর্ষার জন্ম। বিজন প্রতি মুহূর্তে নিঃসঙ্গ জাহাজি যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল। এলবির অনুপস্থিতি যন্ত্রণার গ্রাসকে কঠোর করে তুলল। নিদারুণ জাহাজি যন্ত্রণায় সে দেবনাথের সঙ্গে গোপনে সস্তায় একটু মদ এবং সস্তায় একটু যৌন সংযোগ—রক্ষার্থে বদ্ধপরিকর হল। কিন্তু মুখের ভাবটুকু সকল সময়ের জন্য সরল নিঃস্বার্থ এবং যৌন জীবনে নিষ্পাপ, যেন এই মহৎ পৃথিবীতে অশ্লীল হবার মতো কিছুই নেই। বিজন দেবনাথের সঙ্গে হেঁটে যেতে যেতে বলল, আর কত দূর তোমার রাতের আস্তানা?
অথচ বিজন রাতের আস্তানায় দর করতে গিয়ে দেখল যুবতী সব সময়ের জন্য চোখ দুটো কোটরাগত করে রেখেছে। প্রতিদিনের যৌন অত্যাচারে গালে অশ্লীল টোল। নগ্ন চেহারাতে জাদুকরের লাঠির মতো ভেল্কি। এবং সমস্ত শরীরে কীসের যেন দাগ! যেন অত্যাচারের অশ্লীল উল্কি পরে নিত্য জাহাজি যন্ত্রণার সাক্ষী থেকেছে। পাশাপাশি দুটো চোখ—এলবির চোখ, এলবির প্রীতিপূর্ণ চোখ……সে পারল না। সে নগ্ন হয়ে নাচতে পারল না রাতের আস্তানায়। মদের গোলাপি নেশা ছুটে গেলে সে যথাসম্ভব সত্বর ছুটে পালাল।
সে জাহাজে ফিরে দেখল ডেক খালি। কোনো জাহাজির সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ডেকের উপর ইতস্তত কিছু আলো জ্বলছে। একটা বেড়াল এ শীতে অফিসার—গ্যালিতে খাবার খুঁজছে। বিড়ালটা শীতে কষ্ট পাচ্ছে এবং ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদছে। সে আরও এগিয়ে গেল। সে শুনল ডেক—ভাণ্ডারী মদ খেয়ে নিচে হল্লা করছে। নিচে নেমে দেখল সকল জাহাজিদের দরজা বন্ধ। যে দু—একজন জাহাজি এখনও ফেরেনি তারা আর এ—রাতে ফিরবে না। সে ধীরে ধীরে নিজের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেবনাথ আগে ফিরে এসেছে। ফোকসালের ভিতরে লকারের শব্দ। বুঝি দেবনাথ লকার খুলছে। বুঝি দেবনাথ বাংকে বসে খাচ্ছে। বিজন দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে বলল, আমি পারিনি, দেবনাথ—আমি পারিনি। মেয়েটির শরীর দেখে আমার করুণা হল।
এই করুণার কথা ভেবে যখন সে ক্ষতবিক্ষত তখন দেবনাথ খেতে খেতে বলছে—এলবি এসে এই বাংকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে গেছে তোমার জন্য।
তুমি কী বললে?
বললুম রাতের আস্তানায় গেছে।
দেবনাথ! সে চিৎকার করে উঠল। ইচ্ছা হল দেবনাথের গলা টিপে ধরতে। বিজন লক্ষ্য করল, দেবনাথ দুজনের ভাত একাই গিলছে। ওর নেশা এখনও প্রকট। সেজন্য দেবনাথের হাত কাঁপছে। এবং গোল গোল চোখে সে বিজনকে দেখছে।
বললাম তুমি এলবিকে ঠকিয়েছ। তুমি রবীন্দ্রনাথের নামে ‘পাখী সব করে রব’ শুনিয়েছ। বললাম তুমি পূর্ববঙ্গের ছেলে, বললাম দেশ বিভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে এসেছ। কোনো এক কলোনিতে পিসিমার বাড়িতে থাক। তোমার বাড়ি বটতলায় নয়। সুতরাং বটতলা থেকে নিমতলা কাছেও নয়। আর কিছু বলল না দেবনাথ। ফের ভাত খাচ্ছে। অথবা বললে যেন এরকম শোনাত—বিজন, আমি ঈর্ষার তাড়নায় ভুগছি। তুমি এমন প্রীতিপূর্ণ চোখের স্নেহচ্ছায়ায় বন্দরের দিনগুলো কাটাবে, তুমি বস্তুত রবীন্দ্রনাথের মতো বাঁচতে চাইবে, সে আমার সহ্য নয়। সে বলল, কবির প্রতীকী হয়ে তুমি এলবির কাছে বেঁচে আছ, আর আমি কোটরাগত চোখে জাহাজি হয়ে বেঁচে আছি, আমি ঈর্ষার তাড়নায় ভুগছি—আমি পারিনি, আমি পারিনি। ঈর্ষার তাড়নায় আমি একটু বেফাঁস হয়েছি।
বিজন বাংকে শুয়ে পড়ল। কোট—প্যান্ট পরেই শুয়ে আজ যথার্থ জাহাজি কায়দায় রাত যাপন করল।
সকালে জাহাজের কাজ বলতে তার, দেয়াল রঙ করা, দেয়াল সাবান—জলে পরিষ্কার করা—সে সব কাজগুলো আজ নিখুঁতভাবে করল। সে ইচ্ছা করেই এলবিকে ভাবল না। সে ইচ্ছা করেই কাঁচা খিস্তি করল আজ। ভোরবেলায় দেবনাথ ওর পাশে দাঁড়ালে, বলল, আমাকে ছোট করে কী লাভ হল, দেবনাথ?
দেবনাথ ওর দুটো হাত ধরে বলল, বিজন, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার বড় ভুল হয়েছে। গত রাতে টাকার অভাবে মেয়েটাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারিনি। মাথা গরম। বাধ্য হয়ে সস্তায় গলা পর্যন্ত মদ গিলে জাহাজে ফিরেছিলাম।
মাতাল হয়ে জাহাজে ফিরেছি। তোমার বাংকে এলবিকে দেখেই ধৈর্য ধরতে পারিনি। আমি ওকে টেনে তুলেছিলুম। এলবি বিরক্ত হয়ে তাকাতেই তোমাকে দুশমন বলে ভেবেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর, বিজন। বলে দেবনাথ যথার্থই ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে ওর পাশে দাঁড়াল।
বিকেলে বিজন হাসপাতালে গেল। সেলিমের অস্ত্রোপচার হয়ে গেছে। সেলিম ভালো হয়ে উঠছে। সেলিম ফের জাহাজের জাহাজি হয়ে একই সঙ্গে হয়তো ঘরে ফিরতে পারবে। এইসব ভাবনায় দেবনাথ এবং বিজন পথ চলছিল। দেবনাথ বলল, এলবির কাছে তোর একবার যাওয়া উচিত।
কোন মুখে যাব, বল।
আমার বড় ভুল হয়ে গেল, বিজন।
ওরা পরস্পর তাকাল। ওরা পরস্পর হাত ধরে হাসপাতালে উঠে গেল।
সিঁড়ি ধরে উঠবার সময় ভাবল, এলবি যদি আসে, এই হাসপাতালে এলবি যদি ওর জন্য অপেক্ষা করে, যদি বলে—বিজন, তুমি কি যথার্থই রবীন্দ্রনাথের নামে ‘পাখী সব করে রব’ শুনিয়েছ, তুমি কি যথার্থই কবিকে নিয়ে তামাসা করেছ তখন, তখন সে কী উত্তর দেবে! এইসব ভেবে বিজন, হাসপাতালে ভয়ে ভয়ে, সিঁড়ি ধরে উঠতে থাকল। এবং যখন দেখল সেলিমের বিছানার পাশে কেউ বসে নেই তখন সে এক অহেতুক আনন্দে কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা পেল।
সেলিমের শরীরে এখনও রক্ত দেওয়া হচ্ছে। সেলিম এত দুর্বল যে, কথা বলতে পারছে না। ওরা ওর পাশে বসল এবং বেঁচে থাকার জন্য উৎসাহিত করল।
বন্দরে বিজন এলবিকে এড়িয়ে বাঁচতে চাইল। সামনে পড়লেই ধরা পড়বে অথবা কলিন স্ট্রিট ধরে হাঁটলেই সাক্ষাতের সম্ভাবনা। সে সেজন্য জাহাজ থেকে কম নামল, বন্দর ধরে শহরে উঠল না এবং বড় বড় পথ ধরে পায়চারি করল না। সে শুধু বিকেলে হাসপাতালে গেল। এবং একদিন সেলিম বলল, সেলিম তখন ভালো হয়ে উঠছে, সেলিম তখন কথা বলতে পারছে—বলল, এলবি রোজ ভোরে আসেন।
জাহাজে সারাদিন কাজের পর যখন ক্লান্ত হয়ে বিজন রেলিংয়ে এসে ভর করে দাঁড়াত তখন ওর মনে পড়ত নটিংহিলের সেই ছোট্ট কাঠের ঘর, সেই ছোট অক্ষরে লেখা ‘শান্তির নীড়’, সেই ইজিচেয়ারটা এবং পাশের ভাঙা ঈজেলটার কথা। মনে পড়ত ওর কবিতা—আবৃত্তির কথা। এলবি ‘গীতাঞ্জলি’র সব কবিতা যেন ওকে বারবার শুনিয়েছে। সে যেন এখন এই রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে সব কবিতাই স্পষ্ট মনে করতে পারছে। ওর একান্ত ইচ্ছা—এলবি যদি আসত, যদি সে ওর সামনে দাঁড়িয়ে সব অভিযোগ করত, যদি বলত, তুমি কবিতার মতো না বেঁচে জাহাজির মতো বাঁচলে! অথচ সে এল না। একদিন গেল, দু’দিন গেল, দু’সপ্তাহ গেল, অথচ সে এল না। পাইন গাছগুলো তখন পাতা মেলতে শুরু করেছে। পাখিরা সব আবার ফিরে এসেছে, গাছে গাছে তারা কোলাহল করছে। বসন্তের আগমনে এই ধরণি যেন উচ্ছল যুবার মতো অথবা গর্ভবতী তরুণীর মতো বয়সি হতে চাইছে। অথচ এলবির আর দেখা নেই।
বন্দরে যতদিন যেতে থাকল তত বিজন এলবির কাছে নিজেকে অপরাধী সাব্যস্ত করল। তত সে ভেঙে পড়ল। তত সে নিঃসঙ্গবোধে পীড়িত হতে থাকল। জাহাজ ছেড়ে দেবে ক’দিন পর। সেলিম ভালো হয়ে উঠছে। যে সেতুবন্ধটি গড়ে উঠেছিল সেলিমকে কেন্দ্র করে, সেলিম জাহাজে ফিরে এলে সেটুকুও শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু কোনো এক ভোরে জাহাজে খবর এল, কাপ্তান হাসপাতালের সঙ্গে সংযোগ—রক্ষা করছেন—ডেক—এ ফের উদ্বেগ উত্তেজনা, সারেং ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যান্য জাহাজিরাও ব্রিজের নিচে অপেক্ষা করছে—জাহাজের সবাই বোটডেকে মাস্তারে দাঁড়িয়ে আছে—তখন কাপ্তান বলছেন ব্রিজ থেকে, সেলিম ইজ ডেড—সেলিম মৃত।
বিকালে সব জাহাজিরা জাহাজ থেকে নেমে গেল। ওরা হাসপাতালের দরজায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মৃত নাবিকের শরীর নিয়ে যাত্রার ইচ্ছায় উন্মুখ হয়ে থাকল। ওদের অবয়বের ইচ্ছা যেন এই আমরা এই সন্ধ্যায় সকলে কবরভূমিতে নেমে যাচ্ছি। আমরা নেমে যাচ্ছি, আমরা নেমে যাব। আমরা মরে যাচ্ছি, আমরা মরে যাব।
শহরবাসীরা নাবিকের শবযাত্রার পথে ভিড় করল। একদল বিদেশি লোক জাহাজি পোশাকে কোনো নাবিকের মৃতদেহ নিয়ে সৈনিকের মতো পা ফেলে হাঁটছে। জানালায় যুবতী আর্শির আলোতে সেই শবযাত্রীদের দেখে মুখ ঘোরাল। কিছু স্বজাতীয় দেখল সেই শবানুগমন—এলবি কফিনের বাঁপাশে পথ দেখিয়ে চলছে। মিঃ ট্রয় এবং কিছু জাহাজি শ্রমিক কফিনের আগে আগে চলছে। ভারতীয় নাবিকেরা পিছনে। বিজন সকলের পিছনে। ওরা নিঃশব্দে পথ অতিক্রম করছে। ওরা সকলে শহর অতিক্রম করে ক্রমে পাহাড়ের উৎরাইয়ে নেমে গেল। ওরা সকলে আজ কোনো কথা বলল না। কত নিঃসঙ্গ, কত নিঃশব্দ এই যাত্রা! ওরা পরস্পর অপরিচিতের মতো ব্যবহার করল, যেন অথবা, এই শোকাবহ ঘটনায় ওরা পরস্পর সাময়িক বেদনায় আত্মনিষ্ঠ। এলবি পর্যন্ত কোনো কথা বলে বিজনকে কিংবা অন্যান্য জাহাজিদের সমবেদনা জানাল না। এলবি চোখ তুলে বিজনকে দেখল না। অথবা না—দেখার ইচ্ছায় সর্বদা কফিনের আগে আগে পথ দেখিয়ে চলেছে। অথবা এলবির প্রত্যয় এমনভাবে ভেঙে গেছে যে, সে বিজনকে ফের উৎসাহ দিয়ে বলতে পারল না, সেলিম দেখবে ভালো হয়ে উঠবে।
কবরভূমির সদর দরজা দিয়ে ওরা ভিতরে ঢুকে গেল। বিজন ছোট বড় সব বেদি দেখতে পেল। গির্জার মতো ছোট—বড় কবরের দেয়াল দেখতে পেল। অনেক সুখ—দুঃখর এপিটাফ চোখে পড়ল। সেলিম এখন কফিনে শুয়ে আছে। সেলিমের স্ত্রী এখন হয়তো দরজায় বসে মেয়েটাকে আদর করছে। অথবা মেয়েকে খসমের খবর দিয়ে সুখ পাচ্ছে। সেলিমের কবর এখানেই হল। সে বিবির কোলে মাথা রেখে মরতে পারল না। এইসব ভেবে বিজনের অশেষ দুঃখ। তবু একবার এলবিকে বলার ইচ্ছা—কিছু, বলার ইচ্ছা—শোকাবহ ঘটনার কথা বলে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করার ইচ্ছা—ওর সেই কবিতা—আবৃত্তির ইচ্ছা—পিস ওয়াজ অন হিজ ফোরহেড।
সেলিমের কবরের উপর প্রথম এলবিই মাটি দিল। সকলের শেষে বিজন মাটি দিতে গিয়ে অসহায় মানুষের মতো কেঁদে উঠল। এই মাটিটুকু দিয়ে সে আজ কত অসহায়, কত নিঃসঙ্গ এমতভাব প্রকাশ করল। এলবি পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বিজন শেষ মাটিটুকু কবরের উপর চাপড়ে চাপড়ে দিচ্ছে এবং কাঁদছে। সে যেন এই মাটির স্পর্শ ছেড়ে উঠতে পারছে না। উপরে আলো জ্বলছে। শীতের কুয়াশা আলোর ডুমটাকে অস্পষ্ট করে রেখেছে। সকলে একে একে কবর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সকলেই যেন এই মৃত্যুতে দুঃসহ এক যাতনায় পরস্পর কথা বলতে পারছে না। পরস্পর সান্ত্বনা দিতে পারছে না। সকলেই মাথা নিচু করে পাহাড়ের ঢাল ধরে চড়াইয়ে উঠে যাচ্ছে।
এলবি ডাকল, বিজন, ওঠ। সেলিমকে বহু চেষ্টায়ও বাঁচানো গেল না। মৃত্যুরই জয় হল। প্রভুকে ওর কথা বল। ওর আত্মার শান্তি কামনা কর।
এলবি বিজনকে টেনে তুলল। ওরা পরস্পর তাকাল। তারপর হাত ধরে কবরভূমি ফেলে পাহাড়ের চড়াই ভেঙে সমুদ্রের ধারে এসে বসল। এলবিই বিজনকে এই অসীম সমুদ্রের আঁধারে বসতে অনুরোধ করল।
অন্য তীরে সব বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজ। ওরা এপারে নির্জন জায়গায় বসে শোকটুকু ভুলতে চাইল। এলবি বিজনকে এই মৃত্যুশোক ভুলে যেতে অনুরোধ করল। এলবি ভিন্ন ভিন্ন রকমের কথা বলে বিজনের শেষ দুঃখটুকু মুছে দিতে চাইল—মুছে দেবার ইচ্ছায় ওকে শেষ পর্যন্ত নটিংহিলের ছোট কাঠের ঘরে নিয়ে এসে বলল, এ ঘর তোমার। তুমি এখানে থেকে যাও। যেন আরও বলতে চাইল—তোমার জাহাজি নিঃসঙ্গতাটুকু আমি, আমি—সব দিয়ে ভরে তুলব।
বিজন মনে মনে ভাবল—মূলত আমি নষ্টচরিত্রের মানুষ। তুমি আমায় ঘরে রেখে শান্তি পাবে না। বিশেষত কবির প্রতীকী হয়ে দীর্ঘ দিন আমি বাঁচতে পারব না। আমার জাহাজি চরিত্র আমাকে সমুদ্রের মতো অশান্ত করে রেখেছে। বন্দরে বন্দরে চরিত্র নষ্ট করে বেড়াতে না পারলে আমার জাহাজি চরিত্রের শান্তি নেই।
বিজন বলল, আশা করেছিলাম তুমি একদিন অন্তত অভিযোগ করতেও জাহাজে আসবে।
এলবি বলল, ভোরে সেলিমকে দেখে, সারাদিন অফিসে কাজ করে বিকেল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত পার্কে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।
বস্তুত উভয়ে এক দুর্বিনীত অভিমানে পরস্পরের নিকট ঘনিষ্ঠ হয়ে অভিযোগ করতে পারেনি। এলবি জলপাই গাছের নিচে বসে যত আশাহত হয়েছে তত এক ক্ষুব্ধ আক্রোশে ঘরে ফিরে মাতাল হওয়ার ইচ্ছায় জানালায় প্রজাপতি গুনেছে। যখন একান্ত উত্তেজনায় স্থির থাকতে পারেনি তখন রবীন্দ্রনাথের ছবির নিজে বসে একের পর এক কবিতা উচ্চারণ করে এক অশেষ আনন্দে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। অথবা ঈশ্বরের মতো ইচ্ছায় বিজনকে কবিতার মতো সুস্থ করে তোলার প্রবৃত্তিতে এলবি প্রতিদিন ছটফট করত। রবীন্দ্রনাথের নামে ‘পাখী সব করে রব’ এবং জাহাজিদের রাতের আস্তানা উভয়ই নষ্ট চরিত্রের লক্ষণ জেনেও সে ঠিক থাকতে পারেনি। বিজনকে রমণীয় স্মৃতির অন্তরে বাঁচিয়ে রাখার প্রেরণায় সে গর্ভবতী হতে চাইল।
এলবি বলল, তিনমাস ধরে তোমাকে পেয়ে কোনো নাচঘরে যেতে ভুলে গেছি। তুমি এমত আমায় আপনার করে রেখেছ।
এলবি যেন মনে মনে বিজনকে অনুরোধ জানাল, বিজন, তুমি যদি নষ্ট চরিত্রের মানুষ হতে চাও তবে আমায়ও নষ্ট চরিত্রের করে রেখে যাও। আমি আর এমনভাবে বাঁচতে পারছি না। দেয়ালে কবির ছবি, আমরা নিচে বসে এমত ভাবছি আমরা পরস্পর প্রীতির সম্পর্কে বাঁচছি—তুমি আমার আরও ঘন হয়ে বসো, আমার এতদিনের যৌন আদর্শকে ভেঙে দাও ; তোমার হাতে আমি নষ্ট চরিত্রের হয়ে বাঁচি। তোমার স্পর্শে কবির স্পর্শ এমত ভাব নিয়ে বাঁচি। এলবি ফের বলল, তুমি থেকে যাও, বিজন। বাকিটুকু বলতে পারল না। বাকিটুকু এলবির চোখে ধরা পড়ল—এ পৃথিবীতে বিজন ব্যতীত এলবি নিঃসঙ্গ যন্ত্রণায় দীর্ঘদিন ভুগবে। এ পৃথিবীতে ভারতবর্ষের এক রূপকথার মতো যুবকের ঘন গভীর প্রীতির সম্পর্কে এলবিকে দীর্ঘকাল আচ্ছন্ন করে রাখবে।
বিজন ইজিচেয়ারে শুয়ে থাকল। কোনো কথা বলল না। এলবি দাঁড়াল। ওর পাশে এসে দাঁড়াল। ঘন হয়ে দাঁড়াল এবং বিজনের শীর্ণ ঠোঁটে ধীরে ধীরে নুয়ে চুমু খেল। বিজন এই ঘটনায় এতটুকু উত্তেজিত হল না বরং সে কেমন ঠান্ডা হতে হতে একসময় ইজিচেয়ারের সঙ্গে যেন মিশে গেল। বস্তুত বিজন কবির প্রতীকীতে বাঁচতে গিয়ে মৃত্যুর মতো শিথিলতায় অথবা কবির প্রতি ঠান্ডা ঈর্ষায় এই ঘন চুম্বনে কোনো যৌন উত্তেজনা পেল না। বরং সে এলবির প্রতি করুণাঘন হল। এলবির মাথা—হাত বুলিয়ে ঈশ্বরের মতো বলল, আবার যদি এ বন্দরে আসি, তোমার ঘরে আসব। জাহাজি মানুষের মতো আসব। বস্তুত বিজন নিজের সহজ সত্তায় এলবির ঘরে বাঁচবার ইচ্ছায় উঠে দাঁড়াল।
বিজন বলল, কাল ভোরে আমাদের জাহাজ ছেড়ে দিচ্ছে। তুমি ভোরে যেও।
এলবি উত্তর দিতে পারল না। সে খাটে পড়ে বালিকাসুলভ কান্নায় ভেঙে পড়ল।
বিজন বুঝল এ সময় কোনো কথা বলে এই আশাহত বিদেশিনীকে সান্ত্বনা দেওয়া যাবে না। সে সেজন্য অনেকক্ষণ ওর পাশে বসে থাকল এবং ওকে কাঁদতে দিল।
অনেকক্ষণ পর যখন বিজন দেখছে এলবি আর কাঁদছে না, বিছানায় মুখ গুঁজে পড়ে আছে, তখন ওর হাত ধরে টেনে তুলল এবং বলল, চল, জাহাজে তুমি আমায় পৌঁছে দেবে।
গাড়িতে বসে বিজন ভাবল সেলিম এবং তুমি উভয়ে আমার আত্মার আত্মীয়। দুজনকেই আমি এ বন্দরে ফেলে যাচ্ছি। হয়তো পৃথিবীর অন্য কোনো এক বন্দরে আমার জাহাজ ভিড়বে। সেখানে সেলিমের মতো কোনো পাইনের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ব। তুমি তোমার জানালায় সেদিন আত্মার গভীরে যে অজ্ঞাত দুঃখের স্পর্শটুকু পাবে—সে আমারই। তখন তুমি জানালায় বসে এই সমুদ্রকে দেখে কবির কবিতা আবৃত্তি কোরো। সে কবিতার ভিতর আমরা, এইসব মৃত নাবিকেরা ঈশ্বরকে খুঁজব।
বিজন বলল, এলবি, তুমি আমার সঙ্গে কথা বল। এভাবে চুপচাপ গাড়ি চালালে আমার খুব কষ্ট হয়।
এলবি কথা বলার পরিবর্তে ধীরে ধীরে কবিতা আবৃত্তির সময় দেখল এই শহরের পথের সব আলোগুলো এখনও জেগে আছে। ইতস্তত দুটো—একটা মোটর ওদের অতিক্রম করে বের হয়ে যাচ্ছে। পথের মোড়ে মোড়ে পুলিশের বুটের শব্দ। পুলিশ টহল দিচ্ছে। দোকানের শো—কেসে আলো জ্বলছে না। এলবি এই ঘন রাতে বিজনকে কোনো কথাই বলতে পারল না—সে ভেঙে পড়ছে। তাই ধীরে ধীরে শেষ প্রিয় কবিতাটি সে আবৃত্তি করে বিজনকে বিদায় জানাল—
‘‘Art thou aboard on this stromy night
on the journey of love, my friend? The
sky groans like one in despair.
I have no sleep to-night. Ever and
again I open my door and look out on
the darkness, my friend!
I can see nothing before me. I
Wonder where lies thy path!
By what dim shore of the ink-black
river, by what far edge of the frowning
forest, through what mazy depth of
gloom art thou threading thy course
to come to me, my friend?”
