দুঃস্বপ্ন – নয়
বিনু, তুই এ—ছবিটা চিনতে পারিস?
বিনু ছবিটার ওপর ঝুঁকে দেখল। তারপর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তারপর চোখ বুজে কী ভাবল, বেশ কিছু সময় চোখ বুজে থাকলে সোমা ভাবল, বিনু হয়তো খুঁজে পেয়েছে। ওর মুখে হাসি দেখা দেবে, সে বলবে, ইউরেকা, এবং এ—ভাবে যখন দেখল বিনু চোখ বুজেই আছে খুলছে না, খুলবে কিনা তাও ঠিক নেই, তখন সোমা না বলে পারল না, কিরে চিনতে পেরেছিস?
বিনুর মনে হল, কেউ তাকে ডাকছে। সে চোখ খুলে বলল, কেউ আমাকে ডাকছে?
কে আবার ডাকবে! আমি বললাম, বিনু চিনতে পেরেছিস?
অঃ তুই। আচ্ছা, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না।
তা হলে দে। বলেই সোমা উঠে দাঁড়াবে ভাবল।
ছবিটার জন্যে এখানে ছুটে এসেছিস!
সে তুই বুঝবি না!
আচ্ছা এ—ছবিটার সঙ্গে কী সেই মানুষটার মিল আছে?
হুবহু এক।
কী যে মিস করলাম!
মিস করলি মানে!
তোকে দেখছিল, আমরা দেখলাম না, তোকে কে এত দেখছিল! মিস করলাম না!
এখন আজে—বাজে কথা রাখ। কী করি বলত!
তোর আবার কী করার আছে! সুন্দরী মেয়েদের অনেকেই দেখে থাকে। তোকেও দেখেছে। অঞ্জনের খোঁজখবর করতে পারলি?
না।
তোর যে কী হয়েছে! অবশ্য এমন হয়েছে আজকাল। সব মানুষই পাগল হয়ে যাচ্ছে। বিভীষিকা! আমাদের বাড়িতেই দেখ না, একটা আতঙ্ক সব সময়। কখন খবর আসবে, রমু হাসপাতালে, অথবা সে কী বলতে গিয়েও থেমে গেল। বলল, না থাক। ও—সব ভাবলে মাথা ঠিক থাকে না। আমার মতে এখন কারও সঙ্গে কথা বলা ঠিক না। চুপচাপ থাকা ভালো। মাও বোধহয় কিছু দেখতে পায়। রমুরা সবুজ মাঠে শুয়ে আছে দেখতে পায়।
সোমা বলল, চিনতে পারলি না?
না।
তবে যাচ্ছি।
বোস। গরিবের বাড়িতে একটু চা খেয়ে যা।
সোমা কী ভেবে বলল, তাড়াতাড়ি। আমি বসব না।
কোথায় যাবি?
দেখি, আর কেউ চিনতে পারে কি না!
কেউ চিনতে পারবে না। অনর্থক ঘুরে মরবি।
কিন্তু আমার কী মনে হয় জানিস, অঞ্জন আর এ লোকটি একই ব্যক্তি। জায়গায় জায়গায় নাম ভাঁড়াচ্ছে।
তা হতে পারে।
সে আবার কবে আসবে লিখেছে?
কবে আসবে কিছু লেখেনি।
বেশ ফাজিল ছোকরা।
মানে!
মানে, আমার যা মনে হয়, বড়লোকের এমন সুন্দরী বউ দেখেই একটু মসকরা করছে। আর এমন সুন্দর মেয়ের স্বামীকে কেউ মেরে ফেলতে পারে না।
তুই কী আজেবাজে বকছিস!
আজেবাজে নারে। আমি তো মানুষ চিনি। সবাই তো তোদের মতো জায়গায় যেতে চায়। যেতে ভালোবাসে। যেতে না পারলে আক্রোশ হয়। তখন সব ভেঙে চুরমার করে দিতে চায়। কিন্তু একবার পৌঁছে গেলে, আর মায়াবী ছবির মতো তোর মুখ দেখে ফেললে কেউ আর নিষ্ঠুরতার কথা ভাবতে পারে না। মনীষের কিছু হবে না। তোরা অনর্থক উদবিগ্ন হচ্ছিস!
সোমার ইচ্ছা হচ্ছিল, ভোর রাতের ঘটনা খুলে বলে। সব খুলে বললে, বিনু বুঝতে পারবে, কেন সে এমন অসহায় বোধ করছে। কিন্তু বিনুকে সে আর কিছু বলতে উৎসাহ পেল না। কারণ বিনু খুব সিরিয়াস না এ—ব্যাপারে। চারপাশে এমন হচ্ছে, বড়লোকের শখের ব্যাপার, একটু ভয় পাওয়া। ওদের গায়ে তো কেউ হাত দিচ্ছে না, এটা পাড়ার কোনো ফাজিল ছোকরার কাজই হবে, কারণ বিনুর কথাবার্তায় মনে হয় ফাজিল ছোকরাটি সোমার জন্য ঘুমোতে পারে না। বড় বড় শ্বাস উঠে আসে। এমন একটা দুঃসময়ে ভয় পাইয়ে দিতে পারলে বেশ মজা। এবং এ—ভাবে এক চিঠি, সুতরাং সোমার এ—সব ভয় বিনু খুব তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভেবে নিচ্ছে।
সোমা বলল, যাই রে।
চা এসেছে। চা না খেয়ে যাবি!
শুধু চা।
শুধু চা—ই দেওয়া হচ্ছে।
সোমা চা খেতে খেতে বলল, সবকিছুই বিনু হালকাভাবে নিলি?
না নিলে ভীষণ দুঃখ পেতে হয়।
তাহলে সবই তুই ভুলে গেছিস?
দুম করে সোমা এমন কথা তুলে ফেলবে সে ভাবতে পারেনি। বিনু বলল, ও—বয়সে এমন হয়। ওটা কিছু না।
চার বছরে তুমি অনেক বড় হয়ে গেছ ভাবছ।
সত্যি অনেক বড়। চার বছরে কত কিছু জেনে ফেলেছি। তুই কিন্তু আজও চোখে কাজল দিলি না। কাজল দিলে তোকে বড় ভালো লাগত।
সোমা ওকে এখন তুমি তুমি করছে। বিনু সোমাকে এখনও তুই—তুকারি করছে।
সোমা বলল, কে যেন আমাকে বলেছে, সোমা তুমি কাজল পোরো না, কাজল পরলে আমার ভালো লাগে না।
সে কে!
কখনও মনে করতে পারি, কখনও পারি না। একসময় মনে হয়, যাদের ভালো লাগত, তারা সবাই আমাকে এ—কথাটা বলেছে।
তা হলে তুই বলছিস, আমাকে তোর ভালো লাগত না!
কী জানি, বুঝতে পারি না।
আমি তোকে কাজল পরতে বলতাম। কাজল পরলে তোকে খুব মায়াবী দেখাত।
সোমা বলল, কাজল না পরলে আমাকে খুব ইননোসেন্ট দেখায়, কে যেন বলত!
আমরা কেউ ইননোসেন্ট নই সোমা।
এখন মনে হচ্ছে।
অথচ দ্যাখ, কলেজ লনে আমরা কত সব বড় বড় আদর্শের কথা বলতাম!
সবাই না।
সবাইর মনে কিন্তু একটা স্বপ্ন ছিল। যেন, পৃথিবী এক আশ্চর্য জায়গা, যাও, বড় হও, ধর্মপ্রচার করো।
এখনও তো তাই আছে।
ঠিক বলছিস তাই আছে!
মনে তো হয়।
তবে তাকে খুঁজছিস কেন?
তাকে মানে?
এই যে কাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিস। অঞ্জন না কী নাম!
কী যে বাজে বকিস না! আবার সোমা তুই—তুকারিতে ফিরে এল। চিঠি দিয়ে যে ভয় দেখিয়েছে, সে তো সেই লোকটা।
তোর কী মনে হয়, কফি—হাউসের লোকটাই অঞ্জন হবে।
হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।
যদি খুঁজে পাস, কী করবি?
সোমা এ—কথার জবাব দিতে পারল না। সত্যি তো খুঁজে পেলে কী করবে! সে তো এটা ভাবেনি। সে তো ভেবেছে, যে লোকটা ওর দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিল, যে চোখ দুটো ভীষণ চোখ, এবং ছবির চোখের সঙ্গে হুবহু এক, আর নাম লেখা আছে অনিমেষ, সেই কী অঞ্জন, সে কি সেই, যাদের সে ভাবত, পৃথিবীতে তারা অনেক বড় হবে। সে ভাবত, সে থাকবে, ওদের পাশে। এখন যদি খুঁজে পায়, তবে তার সঙ্গে সে কতদূর যেতে পারবে! সোমা বিনুকে কোনো জবাব দিতে পারল না।
বিনু বলল, একটা কথা বলব সোমা?
কী কথা?
আমি জানতাম, তুই কিছু জবাব দিতে পারবি না। তুই বড় হতে হতে অনেক কিছু চেয়েছিলি—মনে হয় সব পাসনি।
সে তো সবাই চায়, কেউ পায় না।
তোর না পাওয়াটা একটু বেশি।
তা বলে, তুই কী বোঝাতে চাস!
এ—ভাবে আর কাউকে খুঁজিস না। এতে বিড়ম্বনা বাড়বে।
সোমা মনে মনে রাগ করতে পারত। সে রাগ করল না। সে জানে বিনু আন্তরিকভাবেই সব বলে যাচ্ছে। সোমার মতো মেয়ের এ—ভাবে ঘুরে বেড়ানো ঠিক না। সোমা বলল, আমার যে কী হয়েছে।
—কিছুই হয়নি। আসলে তুমি ভয় পেয়ে গেছ। ভিতরে ভিতরে মনীষের কাজকর্ম তুমি অনেকদিন থেকেই অপছন্দ করছ। তুমি দেখতে পাচ্ছ, যা তুমি ঘৃণা করতে, এখন মনীষ তাই করছে। যার বিরুদ্ধে লড়বে বলে তুমি মনে মনে অনেক স্বপ্ন দেখেছ, ঠিক সেই পাপ মনীষ করছে।
না। মনীষ কোনো পাপ করেনি।
এমন কথায় কি তুমি রাগ করছ!
রাগ, নিশ্চয়ই। তুমি কী বলতে চাও এ—সব।
ভুল হলে ক্ষমা করে দেবে! বিনুর চোখ দুটো কেমন ছলছল করতে থাকল। সে কেমন থেমে থেমে বলল, আসলে আমারও মাথা ঠিক নেই, রমুর জন্য আমাদের সব গণ্ডগোল হয়ে গেছে। কত আশা ওকে নিয়ে। সে এখন বাড়ি আসে না। পুলিশ ওকে খুঁজছে। যেখানে পাবে, শেষ করে দেবে।
সোমা কেন যে বিনুর দিকে সহজভাবে আর তাকাতে পারছে না। বিনুর সেই চঞ্চল চোখ দুটো আর খুঁজে পাচ্ছে না। আসলে বিনুই কী কখনও তাকে বলেছিল, কাজল পরলে তোমাকে ভালো লাগে না, বিনু আর মনে করতে পারছে না কথাটা, উলটো কথা বলছে, এ—ভাবে যা হয়ে থাকে মাথা গণ্ডগোল হয়ে যায়, যার কথা মনে হয়, সেই শয়তান ব্যক্তির কথা মনে হয়, বাবার তেলেভাজা খাবার নিদারুণ ইচ্ছার কথা মনে হয়, এবং সারাক্ষণ যেন বাবা সেই লোকটার ভয়ে হে হে করে হেসে যাচ্ছে। কান্না পেলেও কাঁদতে পারছে না, বিনুই কী তখন বলেছিল, আমাদের এ—সমাজ বদলে দিতে হবে। না অশোক, না সেই নিতাই! কে? কে বলেছিল! এবং সে এখন কিছুই মনে রাখতে পারছে না, এবং সেই চোখ দুটো, অথবা অঞ্জন, অথবা কাগজের ছবি সব মিলে কেমন সত্যি ওর মাথাটা গণ্ডগোল করে দিচ্ছে। ভোর রাতে সে কাকে যে দেখল গাড়ি বারান্দার ছাদে। সে সম্পর্কে বিনুকে আর কেন জানি কিছু বলতে ইচ্ছা হল না। সে উঠে পড়ল। সে বিনুকে বলতে পারল না, মনীষ পাকা কাজ করছে। কোথায় যে তার অহংকারে লাগছে। বলতে পারলে যেন হালকা বোধ করত।
সে গাড়িতে এবার কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘুরে বেড়াল। যেমন সে বিনুদের বাড়ি থেকে বের হয়ে, সোজা মাণিকতলা, তারপর বড় রাস্তা ধরে কাঁকুড়গাছি, উল্টোডাঙা, লেক—টাউন, দমদম পার্ক পার হয়ে যাচ্ছে এবং জোরে গাড়ি চালাতে ইচ্ছা হচ্ছে। অথচ সে ঠিক বুঝতে পারছে না কিছু। এমন সুন্দর বাড়িটা কেন যে ক্রমে একটা রহস্যময় বাড়ি হয়ে যাচ্ছে। এখন তো মনীষ বাড়ি নেই। সে ভয়ে হয়তো দু—একদিনের ভিতর বাড়ি ছেড়েও দিতে পারে। যেমন ভয় পেয়ে অনেকে, দিল্লি অথবা এলাহাবাদ, কেউ আবার পুণা, অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতের কোনো নিরিবিলি জায়গায়, আত্মগোপন করে থাকছে। এবং যেভাবে মনীষ ত্রাসের ভিতর পড়ে গেল, সেও ঠিক পালাবে শেষ পর্যন্ত। সে গেলে তাকেও যেতে হবে, কিন্তু সেই লোকটাকে তো কলকাতার বাইরে গেলে পাওয়া যাবে না, সে তো কথা আছে, বড় মাঠে আসে। বুড়ো মানুষটাকে আগুন জ্বালাবার জন্য খড়কুটো সংগ্রহ করে দেয়।
ওর চুল উড়ছিল। সে খুব দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছে না। ওর পাশ দিয়ে বাসগুলো বেশ জোরে বের হয়ে যাচ্ছে। এমনকি, সব গাড়ি ওকে ফেলে সামনে চলে যাচ্ছে। সে কিছু ভাবছে না। সে দেখছে চারপাশে সব বাড়ি ঘর, এবং বড় বড় ইলেকট্রিক পোস্ট, অথবা কখনও বিজ্ঞাপনের বড় বড় ছবি, সে এ—ভাবে কেন যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আসলে সে বোধহয় ঘুরে বেড়াচ্ছে না, সে নিজের ভিতর ডুবে যেতে চাইছে, এবং অন্যমনস্ক হলে ভীষণ কেলেঙ্কারি, একটা ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সে তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। অঞ্জন বলে সে কাউকে চেনে না, অঞ্জন বলে তার কেউ জানা নেই, সে অহেতুক ঘুরে মরছে। তার চেয়ে বরং সে ভাবল, বিকেলে, ভালো একটা ছবি দেখবে, মিডনাইট কাউ বয়, খুব আশ্চর্য ছবি, এমন ছবিতে বসে থাকলে, অহেতুক সে ভাবে না। ছবিটার নাম সে শুনেছে, বেশিদিন থাকছে না। টাইগারে হচ্ছে। টাইগার হলটা বাজে। সেখানে সে যেতে পারে না। সে যে কী করে। সে বড় বড় সব হাউসে ছবি দেখে থাকে। সাধারণ ছবি—ঘরগুলো সম্পর্কে আজকাল কোনো খবর রাখে না। কিন্তু টাইগার ভীষণ বাজে ব্যাপার। সে একবার লুকিয়ে, কে কে সঙ্গে ছিল, বোধহয় নিতাই, অবনী এবং অন্য অনেকে। বিনু ছিল না, মনীষও ছিল না, এটা সে স্পষ্ট মনে করতে পারছে। দলটা ভারী ছিল। একমাত্র মেয়ে সোমা। ওর প্রতি সবাই মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিল এটা মনে আছে। সেখানে কী অঞ্জন নামে কেউ ছিল! যে একবার এসেই চলে গেছে, আর আসেনি। ওর উজ্জ্বল চোখ দুটো কেবল সে মনে করে রেখেছে। মনের ভিতর চোখ দুটো এতদিন আত্মগোপন করেছিল, কফি—হাউসে তাকে দেখার পর আবার সে ভেসে উঠেছে!
কী যে হয় তারপর। কপাল ঘামতে থাকে। সে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতরে হাওয়া ঢুকছে। চুল ফুরফুর করে উড়ছিল। সে খুব ধীরে ধীরে গাড়ি চালাচ্ছে। সাদা রঙের গাড়ি, আর ভেতরে একমাত্র যুবতী সোমা। চুল এলোমেলো। খোঁপা বাধা নেই। খোলা। উদাসীনতা চোখে মুখে। কী অঞ্জনকে যথার্থই খুঁজে বেড়াচ্ছে, না মনের ভিতর এমন একজন মানুষ থাকে, যে রাজার মতো, যাকে সবসময় ঠিক খুঁজে পাওয়া যায় না—এবং এ—ভাবে কী যে হয়ে যায়, সোমার সুন্দর চোখে এক অপার্থিব করুণা ভেসে ওঠে। চারপাশে এত সব গরিব মানুষেরা রাস্তায় শুয়ে থাকে, ওর মনে হয়, এটা একধরনের পাশবিকতা, এ—ভাবে এদের চোখের ওপর গাড়ি চালিয়ে যাওয়া সত্যিই বড় বেমানান। সে সোজা বাড়ির দিকে গাড়ি চালিয়ে দিল। চারপাশের এমন সব দৃশ্য ওর কেমন অসহ্য লাগছে।
অথচ বাড়ি ঢুকেও সে কেমন শান্তি পাচ্ছিল না। সে সোজা সিঁড়ি ধরে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল না। গাড়ি সদরে এলেই গেট ধীরে ধীরে খুলে গেল। সে সাধারণত গাড়ি সদরে রেখেই সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে যায়। রসুল অথবা রাম অবতার সেলাম দেয়। গাড়ির দরজা খুলে দিলে সে বের হয়ে আসে। আজ একেবারে অন্যরকমের। সে সোজা গাড়ি ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। নিজেই গ্যারেজ করল গাড়ি। চারপাশে কী যেন খুঁজল। বোধহয় সে ও—পাশের গ্যারেজ দেখছে। গ্যারেজ বন্ধ। গাড়ি ভিতরে আছে না বাইরে, সে বুঝতে পারছে না। রসুলকে সে বলল, সাব ফিরেছে?
না দিদিমণি।
এখনও কেন ফিরল না! তারপর আর কিছু বলল না সোমা। সে ঘড়িতে সময় দেখল, বারোটা বেজে গেছে। ওরা একটায় খায়। একসঙ্গে খায়। কলেজ বন্ধ বলে সোমাকে এখন আর আগে খেতে হয় না। মনীষ অপিস থেকে টিফিনে ফিরে এলে একসঙ্গে খায়। সে হয়তো অপিসে আজ যাবে না। হয়তো শরীরটা ভালো নেই বলে ফোনেই সব কাজটা সেরে নেবে। দরকারি সইটই—এর জন্য ফাইল পাঠিয়ে দিতে বলবে।
সোমার ধারণা, মনীষ এক্ষুনি এসে যাবে। বরং এ—ফাঁকে স্নান সেরে ফেললে হয়। কিন্তু সিঁড়ির মুখে ওঠার সময় মনে হল ওদিকে একটা ফুলের টব কাত হয়ে পড়ে আছে। বিশ্রী লাগল। মনটা তিক্ত হয়ে গেল। বাগানের মালিরা কী যে করে। এখানে সদানন্দ কাজ করে, এই সব ফুলের টব সদানন্দের দেখাশোনা করার কথা। এ—ভাবে কিছু অবহেলায় পড়ে থাকলে ওর মাথাটা কেমন গরম হয়ে যায়। কিন্তু মনীষ ফেরেনি, সে না ফেরা পর্যন্ত ওর ভিতরের চিন্তাটা যাচ্ছে না। কাঠের সিঁড়ি বলে শব্দ হয়। সিঁড়ি ধরে কেউ উঠে গেলেই টের পাওয়া যায়। একসময় এই কাঠের সিঁড়িটার জন্য ভীষণ রাগ ছিল সোমার! কেমন পুরোনো সাবেকি ব্যাপার? সে, যা কিছু পুরোনো সাবেকি ব্যাপার সব সেকেলে ভেবে থাকে। কাঠের সিঁড়িটা না থাকলেই যেন ভালো হত।
কিন্তু এখন সে তেমন ভাবে না। এটা না হলেই খারাপ হত। কাঠের সিঁড়িটায় কেউ পা দিলেই বোঝা যায়, কেউ উঠে আসছে। যদি অঞ্জন অথবা অন্য কেউ উঠে আসে তবে ঠিক টের পাওয়া যাবে। শব্দ শুনলেই টের পাবে কেউ উঠে আসছে। আর এ—কাঠের সিঁড়িতে উঠে আসে মনোরমা। মনোরমা উঠে এলে টের পাওয়া যায় মনোরমা উঠে আসছে। রসুল উঠে এলেও টের পাওয়া যায়, রসুল উঠে আসছে, ওদের পায়ের শব্দ এক—এক রকম। আর উঠে আসতে পারে কারখানার বড় বাবু। সে লোকটা মনীষের সব। লোকটা মনীষকে পাতালে নেমে যাবার সোজা রাস্তাটা দেখিয়ে দিয়েছে। কাঠের সিঁড়িতে ওর পায়ের শব্দ একেবারে আলাদা। কেমন ঘষটে ঘষটে একটা শব্দ। একটানা, উঠছে তো উঠছে। বাতে পঙ্গু হলে মানুষ যেমন হয়, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে, শব্দটাও তেমন যেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সারা বাড়িতে বলে দেয়, খোঁড়া লোকটা এখন কাঠের সিঁড়ি ভাঙছে। আর কারও উঠে আসার নিয়ম নেই। কেউ ওখানে পা দিতে পারে না। আর পারে অসিত। অসিত উঠে এলেও সোমা টের পায় অসিত উঠে আসছে। সুতরাং এ—সব শব্দ বাদে অন্য কোনো শব্দ হলেই মনীষ সাবধান হয়ে যেতে পারবে। সিঁড়িটা না থাকলে মনীষের পক্ষে এটা সম্ভব হত না।
সোমা এখন বাথরুমে। সে নানাবর্ণের সব সুগন্ধ জলে গুলে নিয়েছে। সে মুখে এবং হাতে পায়ে সুগন্ধ ছড়িয়ে বেশ খোলামেলা আয়নার সামনে বসে রয়েছে। এই কাঠের সিঁড়িটা যা হোক একটা কানের কাজ করছে। মনীষের হয়ে বলে দিচ্ছে কে আসছে, এমন বিশ্বস্ত কাঠের সিঁড়ি। এখন আর তাকে সে সেকেলে অথবা পুরোনো আসবাবপত্রের মতো ভাবতে পারে না। বরং এ—বাড়িতে রসুল, রাম অবতারের মতো, বিশ্বাসী সৎ, ওরা নিদারুণভাবে গেটে থাকছে। যদিও সোমা জানে, যাদের আসার কথা, তারা গেট দিয়ে আসে না। গেট দিয়ে এলেও কেউ তাদের আটকাতে পারে না। সে কাগজে এমন কত খবর পড়েছে। ওর কেমন এই বাথরুমে দাঁড়িয়ে এসব ভাবতে কষ্ট হচ্ছে, আসলে সোমার বোধহয় পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রিয় এমন একটি সুন্দর জায়গা। প্রায় চারপাশে লালবর্ণের কাজ করা পাথর বসানো দেয়ালে, আর দেয়াল জুড়ে আয়না। হেঁটে বেড়ালে বেশ লাগে। একটা শোবার ঘর এখানে ঢুকে যেতে পারে। আসলে সোমা এখানে এলেই নিজেকে চিনে ফেলতে পারে। সে তার শরীর চারপাশ থেকে তখন আয়নায় দেখতে পায়। শরীরে কী আছে, এবং সুন্দর স্তন, জঙ্ঘা কী যে পুষ্ট আর মনোরম, সে নিজের ছবিতে নিজেই কেমন তন্ময় হয়ে যায়—সেখানে দুটো মাত্র চোখ, এবং সহসা সে এটা কী দেখে ফেলছে, আয়নায় ওর, মাঝে মাঝে সেই চোখ দুটো, হুবহু, সেই পত্রিকার মুখ, হুবহু এক, এগিয়ে আসছে, এগিয়ে আসছে। সোমা চিৎকার করে উঠল, মনীষ, সে আসছে, সে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখ ঘোলা হয়ে গেল। সে চারপাশে অন্ধকার দেখতে থাকল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
