Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

অসিত এসে দেখল, মনীষ শুয়ে আছে। সোমা পাশে চিন্তিত মুখে বসে রয়েছে। এবং অসিতকে দেখেই সোমা প্রাণ পেল যেন। বলল, আসুন। কী বিপদ দেখুন।

অসিত কথা না বলে মনীষের শিয়রে গিয়ে বসল। কী, কোথায় কষ্ট হচ্ছে?

মনীষ চিত হয়ে শুয়ে আছে। সে মাথা ঘোরাল না। কেমন চুপচাপ ছাদ দেখছে। হলুদ রঙের ছাদ এবং এটা বেডরুম নয়। এখানে সবাই আসতে পারে। এখানেও দুটো খাট আছে দুজনের। এখানে অসিত কেমন একটা নিরীহ গোছের ছবি দেখতে পাচ্ছে। গোটা বাড়িটা ভয়ে কেমন চুপচাপ।

সে বলল, কোথায়? এখানে? সে বুকে হাত রাখল।

বুকটা কেমন করছে অসিত।

এখানে লাগছে?

না।

সে চিন্তিত মুখে বলল, ওকে কাল একবার ভালো করে দেখতে হবে। এখন ঘুমের ওষুধ দিয়ে গেলাম।

সোমা ভাবল সেই চিঠিটা ওকে দেখাবে কিনা। চিঠিটা পাবার পরই ওর এমন হয়েছে। অসিতবাবু ঘরের লোক। ওর ছেলেবেলার বন্ধু। সুতরাং সে মনীষকে না বলেই চিঠিটা দেখাবে ভাবল। বলল, কী যে করি। ওকে কে একজন থ্রেটনিং চিঠি দিয়ে গেছে। ওটা পাবার পর থেকেই ওর এমন হয়েছে।

অসিত বলল, আপনাদের আপত্তি না থাকলে চিঠিটা দেখাতে পারেন।

আপত্তি থাকলে বলব কেন?

চিঠিটা লকার খুলে আনার সময় অসিত বলল, পুলিশে খবর দিয়েছেন?

পুলিশে খবর দেব কিনা ভাবছি।

কেন? অসুবিধা কী?

ওর ভয়—এতে ঝামেলা আরও বাড়ে। কাজের কাজ কিছু হয় না।

অসিত চিঠিটা পড়ে কেমন নিজেও বিব্রত বোধ করল। যা চিঠি এতে কার যে অপরাধ সে যেন ঠিক বুঝতে পারছে না। এগুলো যদি সত্যি হয়, তবে মনীষের স্বপক্ষে বলার কিছু নেই।

সে সোমাকে চিঠিটা ফিরিয়ে দেবার সময় একবার মনীষের খাটের দিকে তাকাল। মনীষকে কেমন বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। সে সোমাকে বলল, চিঠিটা পড়ে মনে হয় কোনো মধ্যযুগীয় নাইট রাতের আঁধারে পাপ অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে।

সোমা বলল, কেন যে হচ্ছে এমন!

মনীষ বলল, আর কাজ করা যাবে না। দেশের বেকারি বাড়বে।

ওর দিকে তাকিয়ে অসিত হাসল। তুই এখন ঘুমো।

আর কী ঘুম আসে! বলে সে পাশ ফিরে শুল। সে ভাবছিল সোমার কথা বলবে কিনা। কিন্তু পারিবারিক প্রেস্টিজ, সে কিছু বলল না। সোমা অঞ্জন অঞ্জন বলে মূর্ছা গিয়েছিল, সে কথা বললে যেন মনে হবে সব ব্যাপারটার সঙ্গে সোমা জড়িত।

অসিতই বলল, ওকে খুঁজে পেলেন?

কাকে?

ঐ যে বলেছিলেন খুব পরিচিত কাকে একবার দেখে মনে করতে পারছিলেন না কোথায় তাকে দেখেছেন?

তাঁকে খুঁজে পেয়েছি। সে ঠাট্টার সুরে বলল।

তাহলে আপনার অসুখ সেরে গেল বলতে হবে।

কীসের অসুখ?

এই যে মানুষের মাঝে মাঝে অসুখ হয়। সে চিনতে পারে না, বুঝতে পারে না কী করছে। তবু করে যায়, খুঁজে যায়।

মনীষ আর পারল না। সে উঠে এল। তুই একটু বুঝিয়ে যা সোমাকে। সোমা বড় ছেলেমানুষ। চারপাশে এত যে দরিদ্র আর অন্নহীন মানুষ আছে তাতে আমরা কী করতে পারি?

কিছু পারি বইকি।

আপনি বলুন—আমরা পারি না? ইচ্ছা করলে পারি না?

অসিত! কী বলছিস আজে—বাজে! তুই যদি টাকা কুড়িয়ে না নিস, তবে অন্য কেউ এসে নিয়ে যাবে। টাকা পড়ে থাকবে না।

অসিত বলল, আমি জানি না, বুঝিও না এসব। তবে এ—ভাবে বেশিদিন চলে না। কলকাতার চারপাশে নজর দিলে যা চোখে পড়ে, সাধারণ মানুষের মাথা ঠিক থাকার কথা না। যদি কেউ এখন মনে করে থাকে, আর যখন কিছু করণীয় নেই, সব হাতের বাইরে, তখন মধ্যযুগীয় নাইট হয়ে যাওয়াই ভালো, যেখানেই পাপ সেখানেই ওদের তরবারি ঝলসে উঠবে।

তুই কী মনে করিস, ভয় দেখিয়ে আমাদের কাজ গুটিয়ে দিতে পারবে?

অসিত আবার হাসল। তুই উঠে এসেছিস কেন? শুয়ে থাক। উত্তেজনা এ—সময় খারাপ।

আমার ঘুম আসবে না অসিত।

সোমা বলল, লক্ষ্মী মনীষ, তুমি যা বলবে শুয়ে শুয়ে বল, আমরা শুনছি।

মনীষ বলল, আমরা যে—ভাবেই টাকা কামাই, ওতে করে তো দশটা লোকও কাজ পাচ্ছে। ওটা না করলে ওরাও কাজ পাবে না, খেতে পাবে না।

ঠিক আছে, তোর সঙ্গে এ—ব্যাপারে পরে আমি আলোচনা করব। এখন আর কোনো কথা নয়।

কথা বললে সে আরও উত্তেজিত হবে। এবং এতে খারাপ হবে। ওর যা মনে হচ্ছে—হার্ট ওর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। চিঠি পাওয়ার পরই হার্ট কারও দুর্বল হয়ে যায়। এবং ভয়ে সে মরে যায়। মনীষ ভয়ে মরে যাবে, স্বভাব ওর যাবে না। এ—সব তর্ক বৃথা। সোমাকে স্বপক্ষে সে টেনে নিতে পারত, কিন্তু কথায় কথা বাড়ে, সে ডাক্তার মানুষ, সে সমাজ—সংস্কারক নয়। সে রুগির যাতে ভালো হয় তাই করবে। এবং সেইমতো উপদেশ দিয়ে গেল সোমাকে।

অসিত যাবার সময় সোমাকে বলল, আপনার সেই ভয়টা গেছে তো?

কোন ভয়? ভয় কোথায় আবার!

এই যে রাস্তায় গরিব দুঃখী মানুষ অথবা ভিখারি মানুষ দেখলে আপনার ভয় হত। মনে হত ওরা হাজার লক্ষ হলেই ছুটে আসবে। যা কিছু সুন্দর, যাকে আপনারা এখন শিল্প বলছেন, একে একে ভেঙে তছনছ করে নতুন সমাজ তৈরি করবে।

এভাবে আমরা চললে, ওরা আজ হোক কাল হোক আসবেই। বলে সে সিঁড়ির দরজার কাছে এল। ওর মুখে অদ্ভুত কমনীয়তা। সে ডাক্তার মানুষ। মনীষ শুয়ে আছে। মনোরমা এখানে নেই। রসুল নিচে জেগে আছে। সে সারারাতই জেগে থাকবে। অসিত বলল, ভয় নেই কোনো। কাল এসে সব চেক করে যাব। আমার যা মনে হচ্ছে চিঠি পেয়ে এটা হয়েছে।

অসিত চলে গেলে সোমার মনে হল, এই এক ভয় নিরন্তর এখন কাজ করবে। তবু ওর কেন জানি মনে হল, সে যা চায় তা পায় না। কে সেই মানুষ? ওর বড় ইচ্ছা হচ্ছিল সেই মানুষটাকে দেখবে। সে ভিতরে ঢুকে দেখল মনীষ ঘুমিয়ে পড়েছে। মনীষ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। দামি ইটালিয়ান সিল্ক এবং চোখে কাজল দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেল। যেখানে রসুল আছে, সেখানে গেল। সে রসুলকে বলল, চিঠি দিয়ে কোনদিকে গেছে বলতে পারিস?

রসুল সদর খুলে দিল ভালো করে। দিদিমণিকে দেখেই আদাব দিল। বাইরে এসে ঠিক যেখানে অজস্র বোগেনভেলিয়ার গাছ একটা ঝোপের মতো সৃষ্টি করেছে সেখানে দাঁড়াল। ঐ দিকে নেমে গেছে।

ওটা তো মাঠ।

হ্যাঁ, তিনি মাঠের অন্ধকারেই নেমে গেছেন।

ও—মাঠের গাছগুলোর ছায়ায় যারা রাত কাটায় তুই তাদের কাউকে চিনিস?

না দিদিমণি।

আমার সঙ্গে আয়।

এত রাতে!

আয় না।

সদর খোলা থাকবে?

থাকুক।

কিন্তু তিনি যে বলেছেন সারারাত জেগে পাহারা দিতে।

কিচ্ছু হবে না। তুই আয়, আমি বলছি আসতে।

রসুল একটা পাগড়ি বাঁধল মাথায়। সে কোমরে বড় একটা ভোজালি ঝুলিয়ে ওর সঙ্গ নিল।

তিনি যদি রাগ করেন। রসুল কেমন আমতা আমতা করল।

তিনি ঘুমোচ্ছেন।

ওরা সদর খুলে ফের বন্ধ করে দিল। মনীষের অযথা ভয়। যারা আজ চিঠি দিয়ে সাবধান করে যায়, তারা সে রাতে আসে না। শোধরাবার একটা সময় দেয়। সে জানে মনীষ কোনোদিন আর শোধরাবে না। ওর অসুখ করবে। অসুখ নিয়েই সে বড় একটা অসুখের ব্যবসা চালিয়ে যাবে এই দেশে। দেশের মানুষকে সব নেড়ামাথা করে দিয়ে মনীষ নিজে কষ্ট পাবে।

সোমা দেখল গাছের নিচে অন্ধকার, বড় প্রশস্ত পথ। শোরুমে ইতস্তত আলো জ্বলছে। কিছু রাতের পোকা উড়ছিল। দু—একজন মানুষের সাড়া পাচ্ছে সে। সোমা রসুলকে নিয়ে বড় মাঠে ঢুকে গেল। এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে বরং ভয়। মাঠে অজস্র গাছ, এবং গাছের নিচে কারা চুপচাপ শীতের রাতে জেগে আছে মনে হল। কাছে গেলে অবাক, দেখলে সব কাতারে কাতারে মানুষ, ওদের পোশাক ময়লা, ছেঁড়া, শুকনো ঘাসের ওপর ছেঁড়া কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। ওরা কী গভীর ঘুম যাচ্ছে! দুঃখ বেদনা আছে মুখে। ফাঁক ফোকরে যে সামান্য আলো বড় রাজপথ থেকে ভেসে আসছে তাতে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। সকাল হলে এরাই এই বড় শহরে, অথবা রেল—ব্রিজের মাথায়, কখনও সূর্য অস্ত গেলে, বড় লাল বাড়িটার দিকে কেন জানি প্রার্থনার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। সে রসুলকে বলল, তুই চলে যা। আমি এই মাঠে এক একা ঘুরব। আজ সে আসবে।

রসুল জানে মাথা খারাপ আছে দিদিমণির। সে কাছে থাকলে চিৎকার করতে পারে। বাড়ি গেলে বলতে পারে, রসুল তুমি বিদায় হও। কর্তাসাহেব যতই হামবড়া ভাব দেখান—এই দিদিমণির কাছে একেবারে বাচ্চা শিশুটি। কী যে করে রেখেছে! সে বলল, আচ্ছা যাচ্ছি।

বস্তুত সে গেল না। সে দূরে অস্পষ্ট আলোর ভিতর দাঁড়িয়ে দেখল দিদিমণি একা একা মাঠে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে।

সোমা দেখল বেশ জ্যোৎস্না উঠেছে। শেষ রাত এখন। এখন রাতে এ ভাবে একটা মাঠে পায়চারি করা ঠিক না। কিন্তু সোমা জানে, রসুল পাশে ঠিক কোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তাকে পাহারা দিচ্ছে। এবং সে রসুলকে যে—ভাবে জানে, তাতে রসুল সোমার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে পারে যে—কোনো ভাবে। সে বেশ নিশ্চিন্তে হেঁটে যাচ্ছে। কী যে সে খুঁজছে, মাঝে মাঝে ভুলে যায়। আসলে সে তাকেই খুঁজতে এসেছে। যদি সে এই মাঠে নেমে এসে থাকে, তবে ঠিক কোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং সোমার জন্য অপেক্ষা করবে। এটা কেন হয়, সে বোঝে না। সেই চোখ দুটো কী যে মায়াবী। হয়তো ওরা সেদিন বাড়ি ফিরে গেলে, সব খোঁজখবর নিয়েছে গোপনে। এবং সে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেখেছে, সদরে রসুল, হয়তো তাকে টপকে যাবার ক্ষমতা মানুষটার নেই। চিঠি দিয়ে চলে গেছে।

মানুষটার সঙ্গে তার খুব দেখা হওয়া দরকার। যেমন সে দেখা হলে বলতে পারত, এটা একটা মানুষের কঠিন অসুখ। সেই প্রথমদিন থেকে, যেদিন থেকে মানুষ দলবদ্ধভাবে বাস করতে শিখল, সেদিন থেকে মানুষের লোভ এ—ভাবে মানুষকে তাড়না করছে। যেটা হাজার হাজার বছরের অসুখ তাকে তুমি কী করে দু দণ্ডের ভিতর আরোগ্য করবে।

আর তখনই দলে দলে মাঠের ভিতর কারা আগুন জ্বেলে দিয়েছে। শেষ রাতে এ—সব মাঠে যারা গাছের নিচে শুয়ে থাকে, শীতে তাদের ঘুম আসে না। ওরা বিকেলে ঘাসপাতা সংগ্রহ করে রাখে। শেষ রাতে যখন হাত পা বরফ হয়ে যায়, শীত নিদারুণভাবে কষ্ট দেয়, এবং মনে হয় মরে যাবে, তখন এরা আগুন জ্বেলে সকালের রোদের জন্য অপেক্ষা করে। সোমার কিন্তু মনে হল, মানুষটা চিঠি দিয়ে বেশিদূর যেতে পারেনি। কারণ মানুষটা তো জানে, এ—বাড়িতে সোমা দত্ত আছে, সে ছিল সোমা গাঙ্গুলি, উদ্বাস্তু মেয়ে সোমা গাঙ্গুলি কী করে যে সোমা দত্ত হয়ে গেল, এবং কিছু ছবি সে মনে করতে পারে, স্মৃতির মতো খেলা করে বেড়ায়, সেই কবে যেন তাকে তার মা কোথায় নিয়ে গিয়েছিল, বোধহয় এটা বাবার মৃত্যুর পর। সেই লোকটা—কেমন চুপচাপ ভালোমানুষের মুখ করে ওর বড় বৈঠকখানায় বসেছিল, কী সদাশয় মানুষ, বাবার বিনিময়ে লোকটা লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়েছে, সোমার এটা তখন মনে হয়নি, পরে সে সবটা জেনেছে মার কাছ থেকে, এবং মা যখন লোকটার রক্ষিতা হয়ে গেল, বাবা তখন আত্মহত্যা না করে বোধহয় পারেননি।

সব সে মনে করতে পারে না। এই শীতের রাতেও সে কেমন শীত অনুভব করছে না। মাথার ওপর বড় আকাশ আর অজস্র নক্ষত্র, সব রাস্তার আলো এসে মাঠে পড়েছে। এখানে পাশাপাশি সব বড় বড় গাছ, পাশেই একটা বড় হাসপাতাল। দুটো একটা অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে। যার কিছু দূর হেঁটে গেলে দুর্গের র‍্যামপার্ট। সে সেদিকে গেল না। সে গাছের ছায়ায় ছায়ায় হেঁটে গেল। আগুনের দিকে হেঁটে গেল। ওখানে হয়তো সে আছে। সে কে? সে অঞ্জন! অঞ্জন বলে কে আছে তার! কাল একবার বিনয়ের কাছে যেতে হবে, বিনয় যদি বলতে পারে, কলেজ—জীবনে অঞ্জন বলে কোনো বন্ধু যদি থেকে থাকে। সে এমন একটা নাম শুনে মূর্ছা গেল! ভাবতে পারছে না এমন কেন হল! সহসা কী হল মনের ভিতর অঞ্জন বলে কোনো যুবক অথবা কিশোর অথবা বালকের মুখ আবিষ্কার করে ফেলেছিল, যে ছিল তার কাছে রাজার মতো। ওর মা এবং বাবাকে যা কিছুর বিনিময়ে ছোট হতে হয়েছে, সব কিছুর বদলা নেবার মতো এক মানুষ সে। সে শিশু বয়সে, কিংবা আরও বড় হয়ে বুঝতে পারত, ওর এমন একজন মানুষের দরকার যে মধ্যরাতে নাইটদের মতো পাপ অন্বেষণ করে বেড়াবে, সেই যে লোকটা, দুটো চোখ যার শয়তানের মতো ঘোরাফেরা করত, এবং মাকে দেখলেই চোখ দুটো জ্বলে উঠত, তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের অনিবার্যতা ভাবলে সে স্থির থাকতে পারত না। সোমা ভাবত, একদিন—না—একদিন সে আসবেই।

কিন্তু সোমা সেই আগুনের পাশে গেলে দেখল, মাত্র একজন বুড়ো মতো লোক বসে আছে। শীতে হাত পা চোখ সাদা হয়ে গেছে। পাশে নানারকমের পোঁটলা—পুঁটলি, ভাঙা টিনের বাক্স, মগ, পুরনো টিনের কৌটা, সে বেশ এই নিয়ে আগুন পোয়াচ্ছে। এমন একজন দেবীর মতো সহসা মানুষের ছবি দেখে, চোখের পলক ফেলতে পারল না। হয়তো বনদেবী—টেবি হবে, অথবা এই মহানগরীর দেবী, যে রাতে বুড়ো মানুষটার কষ্টের কথা ভেবে না—এসে থাকতে পারেনি। সে বলল, মা—জননী!

সোমা বলল, খুব শীত না!

খুব মা—জননী।

কোথায় থাক?

এই ফুটপাতে মা—জননী।

তোমার কষ্ট হয় না?

কষ্ট! ওর মুখ এত ছোট, আর এত রেখা মুখে এবং এত বেশি শীর্ণ যে বোঝাই যায় না, কষ্টের কথা শুনে হাসছে, কী অবাক হচ্ছে, অথবা কষ্টের কথা শুনে কেঁদে ফেলছে। দাঁত না থাকলে বোধহয় মানুষের মুখ শিশুর মতো হয়ে যায়। সোমা পাশে বসে দুটো একটা পাতা আগুনে ফেলে দিতে থাকল।

তোমার নাম কী?

আমার নাম! ভুলে গেছি!

ভুলে গেছ মানে!

বিশ—বছরের ওপর মা জননী, আমার কী নাম কেউ জিজ্ঞেস করে না। কেউ ডাকে না আমার নামে। আমি যে কী এখন জানি না।

সোমা ওর কথা সব বুঝতে পারছে না, কথা বললে থুথু ছড়াচ্ছে।

সোমা সামান্য সরে বসল। আগুন জ্বলছে, এবং এমন একটা নিরিবিলি মাঠে, কেউ শেষ রাতে ঘুমোতে না পেরে আগুন জ্বেলে জ্বেলে বসে থাকবে ভাবা যায় না। এবং এ—ভাবে দূরে দূরে সে দেখল পর পর গাছের নীচে আগুন, অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, সব মশালের আগুন, ধীরে ধীরে এত বড় শহরের ধার্মিক নাগরিকদের অজ্ঞাতে এটা জ্বলে উঠছে। সকাল হলে, ট্রাম বাস চললে কেউ টেরই পায় না, গাছের নীচে, অথবা ওদের কিছু নির্দিষ্ট জায়গা আছে, সেখানে ওরা শীত থেকে বাঁচবার জন্য আগুন জ্বালায়।

সোমা বলল, এখানে আগুন পোহাতে কেউ আসে নি?

বুড়ো লোকটা কি দেখল সোমার চোখে। বলল, দুটি ছোড়া আসত। চোখে—মুখে বদজাতি, ওরা আমার পাতাগুলো একসঙ্গে আগুনে ফেলে দিত। দাউদাউ করে জ্বলেই নিভে যেত আগুন। আবার শীত। আমি এখন লাঠি নিয়ে বসে থাকি। ওরা আসতে সাহস পায় না।

সোমা বলল, তাহলে কেউ আসে না আগুন পোহাতে?

আসে। সে আসে।

সে আসে!

সে আসে। কি নাম জানি না। সন্ধ্যার পর সে আমাকে, কিছু খড়কুটো দিয়ে যায়। কখনও খাবার।

কখন আসে?

ঠিক থাকে না। দুদিন তিনদিনের খড়কুটো দেয়। খাবার পাঠিয়ে দেয় কখনও। সে নিজেও আমার সঙ্গে খাবার ভাগ করে খায়।

দেখতে কেমন?

খুব ভাল। চোখ বড় বড়। লম্বা মানুষ, কালো রঙের প্যান্ট পরতে ভালবাসে। সাদা হাফশার্ট।

চোখে কেমন একটা মায়া আছে তার, তাই না?

খুব। সে এলেই আমার আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়!

আজ সে এসেছিল?

এই কিছুক্ষণ আগে সে এসেছিল। সে ডেকে আমাকে উঠতে বলে দিল। শরীরে হাত দিয়ে বুঝেছিল, ঠাণ্ডায় মরে যাব, সে আগুন জ্বেলে বসে থাকতে বলল, শীতে আমার মরে যাবার কথা। আগুন জ্বেলে রাখলে শীতে আমি মরে যাব না। সে এমন বলল।

তুমি ওর নাম জান না?

না।

নাম বলে না?

না।

সোমা কেমন আশ্চর্য হয়ে যায়। পৃথিবীতে এমনও মানুষ আছে। সে এক হাতে গায়ের চাদরটা কাঁধে তুলে নিল। এখন মনে হচ্ছে সত্যি ভীষণ হিম ঠাণ্ডা। সে গলায় চাদর জড়িয়ে দিল। হাত পা ওরও যেন ক্রমে অবশ হয়ে যাবে, শীতে খোলা আকাশের নীচে বসে থাকলে এমন হবারই কথা। সাদা জ্যোৎস্না ক্রমে মরে আসছে। বোধহয় নদীতে একটা জাহাজ নোঙর তুলে তখন সমুদ্রে যাবে বলে সিটি দিচ্ছে। এবং দূরে দূরে, এই যেমন নদীর ওপারে সব চটকলের চিমনি থেকেও সাইরেন বাজছে। চারটা বেজেছে। সে ঘড়ি দেখে বুঝল, ঠিক তাই। রসুল কোথায়? সে পিছন ফিরে দেখল, একটু দূরে মাঠের ভিতর রসুল ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে আর বসবে না ভাবল, যেন কী একটি সূত্র পেয়ে গেছে, তাকে সে ঠিক খুঁজে পাবে না। না পেলে শান্তি পাবে না, এই সেই লোক হবে, যে কফি—হাউসে অনেকক্ষণ ওর দিকে তাকিয়েছিল। ওর নাম কি অঞ্জন!

সোমা বলল, একটা কথা তুমি আমার হয়ে ওকে বলবে?

কি কথা মা—জননী?

ওর নাম অঞ্জন কিনা জানবে তো!

আমি তো কারো নাম জিজ্ঞাসা করি না মা—জননী।

কেন কর না?

নাম মানুষের একটাই থাকে।

সে আবার কেমন?

নাম মানুষের দুটো হয় না।

সে কেমন?

না মানে সে মানুষ, আর কিছু নয়।

তাকে তুমি নাম জিজ্ঞাসা করেছিলে কোনোদিন?

না।

তবে একবার বলতে আপত্তি কী?

আপনি মা—জননী, ওর নাম বললেই কী চিনবেন?

চিনব না কেন? অঞ্জন বলে কেউ আছে কিনা জানতে চাই।

কেন আপনার এমন জানতে ইচ্ছা হয় মা—জননী?

সে যে আমাকে খুঁজছে।

সে না আপনি?

সে একই কথা।

আচ্ছা এবার দেখা হলে বলব।

বলবে কিন্তু। সোমা উঠে দাঁড়াল।

আপনি আবার কবে আসবেন?

আসব।

আসার সময় কিছু খড়কুটো নিয়ে আসবেন। ওর অনেক কাজ। কিছু কাজ আপনি করে দিলে, সে বেশি আমাদের জন্য সময় পাবে।

বুড়ো লোকটার কথা খুব স্পষ্ট নয়। সোমা সব না বুঝলেও মোটামুটি কথাবার্তা বলে বুঝেছে, এখানে কেউ আসে। বুড়ো লোকটা নিজের সম্পর্কে কিছু বলেনি। সে বুড়োমানুষ এই পর্যন্ত বলেছে। না বললেও কোনো ক্ষতি ছিল না, বুড়ো মানুষের রকমফের আছে, তার যেন তাও নেই। সে একেবারেই বুড়ো। বুড়ো হলে যা হয়। শীত করে, মানুষের অবহেলা তখন বাড়ে। বুড়ো হলেই নদীর পাড়ে বসে থাকতে হয়। কেউ আসবে কথা থাকে।

বুড়ো মানুষটা তাকে এসব বলতে পারত। কিন্তু সে তা না বলে, কিছু খড়কুটো আনতে বলছে! খড়কুটো আনলে লোকটা আরও বেশি কাজ করার সময় পাবে।

সোমা কেমন ঝোঁকের মাথায় হাঁটছে। এই বড় শহরের মাঠে, রাত শেষ হতে থাকলে একটা আশ্চর্য নিঃসঙ্গতা দেখা দেয়। সোমা দেখতে পাচ্ছে, ঘাসের জলে ওর চটি ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। এবং ওপরের নক্ষত্রেরা একে একে আকাশ থেকে কেমন ক্রমে লুপ্ত হয়ে গেল। ওরা ক্রমে সেই অবলুপ্তির পথে, সোমা বোধহয় টের পাচ্ছে অজস্র শিশিরকণা হয়ে এইসব ঘাসে ঘাসে অথবা কোনো কুটিরের মাথায় ঝরে পড়ছে। কুটিরে কী অঞ্জন থাকে!

এই যে এক কথা, অঞ্জন, অঞ্জন, কে সে? কেন সে মনে করতে পারছে না, কে আসে এই মাঠে, সেই মানুষটা কী আসে, অথবা সে কী জানে, কাছাকাছি জায়গায় সোমা থাকে, সে কী কোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সোমাকে দেখতে ভালোবাসে।

আবার মনে হয় অকারণ খোঁজা। এত রাতে ও—ভাবে ওর বের হয়ে আসা উচিত হয়নি। মাথা ঠিকঠাক আছে তো! কেমন সে নিজের কাছেই বোকা হয়ে গেল, সে এটা কী করছে! গোপনে এ—ভাবে চলে আসা ঠিক হয়নি! ছিঃ মনীষ জেগে গেলে কী ভাববে। মাঝে মাঝে এ—জন্য মনে হয় মাথার ভিতরটা কেমন করছে। কেন যে সে কফি—হাউসে মরতে গিয়েছিল।

একটু পা চালিয়ে হেঁটে গেল। সে এখন দেখতে পাচ্ছে, দুটো একটা শেষ রাতের ট্রাম বড় শহরের ওপর দিয়ে কেমন মায়াবী হরিণের মতো চলে যাচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে অজস্র ঠান্ডায়, এক শীতকাতুরে বুড়ো তখনও একটু একটু করে আগুন জ্বেলে যাচ্ছে বাঁচবে বলে। আর সেই সব মহামহিম নাইটগণ পাপ অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে।

ওরা টের পেয়েছে, এরা থাকলে, পৃথিবীতে পাপ বেড়ে যায়। মধ্য রাতে ওরা চলে আসে। অথবা দুপুরে, কোনো শিমুল গাছে ফুল ফুটলে বোঝা যায় সকালে সেই মহামহিম নাইটগণ, গাছের নিচে আগুন জ্বেলেছিল, এবং এ—পথেই তারা পাপ অন্বেষণে চলে গেছে।

এ—সব যে কেন মনে হয় সোমার। সে দেখল, একটু দূরে রসুল। সে পরেছিল খাকি শার্ট। ওর পায়ে বুট জুতো, এবং সে প্রায় সিপাইর মতো মুখে একটা হামবড়া ভাব নিয়ে হাঁটছে। সে আছে, ভয় নেই, কার এমন হিম্মত আছে, কী যে বিশ্বাসী মুখ রসুলের। ওর বয়স খুব বেশি নয়, চল্লিশও বোধ হয় হয়নি, ওর কী মনে হয় না সোমার শরীরে তাপ আছে, ওর কী বিশ্বাস হয় না, সোমার অনেক কিছু ইচ্ছা হয়। এমন একা মাঠে মানুষ এত বিশ্বাসী থাকে কী করে! এবং এসব মনে হলেই সে বুঝতে পারে পৃথিবীতে কিছু—না—কিছু সবাই ভালো কাজ করতে চায়। সবার লোভ একরকমের না। মনীষ কেন যে এমন হয় না, অথবা অঞ্জন কে! সে যে কেন মূর্ছা গেল!

সদরে এসে মনে হল, গাড়ি বারান্দার ওপরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এখন কাক জ্যোৎস্না। চারপাশের আলো নেভানো। কেবল সদরে আলো জ্বালা থাকে, মনে হল তার মনীষ হয়তো জেগে গেছে। জেগে গিয়ে বিছানায় দেখতে না পেলে ভেবে থাকে, বাথরুমে গেছে। অবশ্য সে খুব কুঁড়ে লোক, বিছানা থেকে উঠে দেখার ইচ্ছা হয় না ভিতর থেকে দরজা বন্ধ আছে কিনা, এটা ওর স্বভাব, শুয়ে শুয়ে সব ভেবে ফেলবে, এবং আবার ঘুমোবার চেষ্টা করবে।

কিন্তু সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় সে দেখল মনোরমা দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দায় উঠে এলেই মনোরমা আলো জ্বেলে দিল। আলো না জ্বাললেও হয়তো হত। সে ঠিক উঠে যেতে পারত। চারপাশে সকাল হবার আগে যেমন রোজ পাখিরা ডাকে, কীটপতঙ্গের আওয়াজ পাওয়া যায়, এবং যা শুনলে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবা যায় সকাল হয়ে যাচ্ছে, তেমনি সব শব্দ, বাগানে, আতাফল গাছটার পাশে এবং মনে হয় সকাল হবে বলেই মনীষ হয়তো গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আর তারপরই যা মনে হল, এটা শীতকাল, শীতকালের এমন ঠান্ডায় মনীষ কিছুতেই গাড়ি বারান্দায় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, ওর ভিতরটা এমন মনে হতেই কেমন কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল, তারপর আর যা সে ভাবতে পারে, হয়তো সে লক্ষ্য রাখছে, কোথায় যায় সোমা, কখন আসে, এবং অলক্ষ্যে এসব হলেই চেপে যাবার কথা।

সোমা নানাভাবে ভাবছিল, সে কেন গেল, অথবা সেই মাঠে কে আসে, গাড়ি বারান্দায় কে দাঁড়িয়েছিল, যে কেউ আসতে পারে—যা সময়, কোনো নাইট কী আবার অলক্ষ্যে এমন একটা বাড়ির ভিতর পাপ অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে। সে এমন ভেবেই নিজের মনে হেসে দিল। কীসব আজেবাজে চিন্তা। আসলে মনীষই দাঁড়িয়েছিল। হয়তো মনোরমার মুখে শুনেছে, রসুলকে নিয়ে দিদিমণি কোথায় বের হয়ে গেল, গাড়ি নেয়নি। পাশাপাশি ওর কোনো বান্ধবীর কাছে, বিপদের কথা জানাতে যেতে পারে, অথবা ওর মায়ের কাছে, সে ঘুমিয়েছিল বলে সোমা ডাকেনি। এবং এ—সব ভাবতে ভাবতে সে একসময় মনোরমাকে বলল, দাদাবাবু কখন জেগেছে রে!

উনি তো জাগেননি। সেই থেকে ঘুমোচ্ছে।

মানে!

ঘুমোচ্ছে। আমার ঘুম এল না। আপনার জন্য ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকলাম।

তুই জানিস না?

কি জানি না?

ও উঠেছে। গাড়ি বারান্দায় ছাদে দাঁড়িয়েছিল!

কখন!

এক্ষুনি। ভিতরে ঢোকাবার সময় দেখলাম।

কী বলছেন দিদিমণি!

সোমা ভিতরে ঢুকে অবাক। মনীষ শুয়ে আছে। ঘুমোচ্ছে। ঘুমের ওষুধ ভীষণ কাজ দিয়েছে। সে, কী দেখল তবে! ওর মনে হল, মনীষই দাঁড়িয়েছিল, ওকে ঢুকতে দেখে ফের এসে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমের ভান করছে। সে এবার পাশে বসল। মাথায় ওর হাত রাখল। ওর চুল ঘন। এবং নুয়ে যখন দেখল, না এটা অভিনয়ের মুখ নয়, সত্যি সত্যি ঘুমোচ্ছে, তখন কেমন সে গুম হয়ে গেল।

মনোরমা বলল, লোকটা কেমন দেখতে?

মনোরমার এত উৎসাহ সোমার ভালো লাগছিল না। সেতো মনোরমাকে জানে। সে বলেই ভুল করেছে। এখন মনোরমা কথায় কথায় এটা কতদূর যে নিয়ে যাবে!

সোমা ধমকের সুরে বলল, চুপ করতো! কিছু ভালো লাগছে না।

তাতো ভালো না লাগবারই কথা দিদিমণি! কী যে হবে! ঐ তো শুনলাম, মাঠের ধারে দুজন ছেলেকে কারা মেরে ফেলে গেছে!

কবে?

কবে আবার, দু তিনদিন আগে।

সোমা বলল, তাতে তোমার কী?

বা আমাদের কিছু নয়। যখন তখন যাকে তাকে মেরে ফেলবে! বিচার নেই!

সোমা আর কথা বাড়াল না। সে ভাবল বলে দেবে, তুমি বাপু আমাদের কথা দু কান করবে না। তোমার যা স্বভাব। তুমি এ—সব কথা দু কান করলেই দাদাবাবুর কানে উঠবে। মানুষটা ভয়ে এমনিতে ঘুমোতে পারছে না, আর এ—সব শুনলে একটা ফ্যাসাদ হয়ে যাবে। সোমা এবার খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, কী দেখতে কী দেখেছি!

তা বলে কী একটা ভালো মানুষ খুন হয়!

হয় না?

কী করে হয়। আঁধারেও যে দিদিমণি বেড়ালকে বেড়ালই মনে হয়।

তুই চালাক বলে মনে হয়। তোর মতো সবাই অত চালাক নাও হতে পারে।

মনে হল না, মনোরমা খুব একটা বিশ্বাস করছে। ওর ধারণা, যা দিনকাল, যেভাবে চিঠি দিয়ে গেছে, ঠিক একটা কিছু হবে। এবং কারও ক্ষমতা নেই দাদাবাবুকে রক্ষা করতে পারে। এই যে চারপাশে এখন এত নিরাপত্তা, দাদাবাবুর বালিশের নিচে কী একটা থাকে, কিন্তু দাদাবাবু জানে না, ওরা এমন লোক যে, কী করে কখন মনোরমাকেই ফুসলে ফাসলে হাত করে ফেলবে, এবং দাদাবাবু তখন দেখবে, ওর সামনে মনোরমা বীরাঙ্গনা হয়ে গেছে। ওরা কীভাবে কী করবে কেউ বলতে পারে না, আর তখন কী না দিদিমণি সব উড়িয়ে দিচ্ছে!

সোমা দেখল, মনোরমা নিচে নেমে গেল। ঠিক নেমে গেল, না, এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে কিছু খুঁজছে বোঝা গেল না।

আর সোমা নিজেও অবাক, কেমন নিশ্চিন্তে, বসে রয়েছে। ঘুরে ফিরে দেখা দরকার। ওটা মানুষ, না তার ছায়া, না কোনো মরীচিকা, অথবা চোখের ভুল, সে যে কী করবে এখন বুঝতে পারছে না। কেবল নিচে নেমে রসুলকে ডেকে পাঠাল। রসুল এলে বলল, কেউ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে?

নাতো।

খুঁজে দ্যাখ তো। মনে হয় কেউ দাঁড়িয়েছিল। ওর কানে যেন কথাটা না ওঠে।

কখন দেখলেন?

যখন ঢুকলাম।

কোথায়?

গাড়ি বারান্দার ছাদে। রসুল আর সোমা যেতে যেতে কথা বলছিল। সকাল হয়ে গেছে। এখন ঘরের দরজা জানালা খুলে দেওয়া যায়। রোদ আসবে। অথবা শীতের বাতাস বয়ে গেলে ফুল ফুটে থাকার কথা, কিন্তু কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। সব ফাঁকা।

আমি তো কিছু দেখলাম না।

হয়তো লক্ষ্য করনি।

দাদাবাবুর ঘর থেকে আলো এসে পড়ছিল।

তা আলো আর মানুষ কখনও এক হয় রসুল!

তা অবশ্য হয় না।

ওরা এ—ভাবে বাগানের ভিতর ঢুকে গেল। বাগানটা খুব বড় নয়। ছোট। জ্যোৎস্নারাতে বড় ইউকালিপটাস গাছের নিচে মাঝরাতে দুজনে ওরা কত যে চুপচাপ বসে থেকেছে! চারপাশে উঁচু পাঁচিল। মাধবীলতার ছায়া কোথাও ঘন। লালবর্ণের গোলাপ কোথাও ফুটে আছে। শীতে গোলাপের পাপড়ি ভারী হয়। কুয়াশার জলে পাপড়িগুলো কেমন কুমারী মেয়ের মতো পবিত্র থাকে। সে দেখল, না, কোথাও সে নেই। সেই গাড়ি বারান্দার কাছে যে মানুষটা দাঁড়িয়েছিল, কেমন ভোজবাজির মতো বাড়ি থেকে উধাও। সোমার ভীষণ শীত করছে। ভিতরে ওর ভয় আদৌ ছিল না। অথচ সে নিজেই কেমন তখন শীতকাতুরে ভীতু মুখ করে ওপরে উঠে গেল। জানালায় রোদ এলে দাঁড়িয়ে থাকল। একটু পরেই কাগজ আসবে। রেডিয়ো ভয়ে খোলা হয় না। কাগজটাও আজ থেকে লুকিয়ে রাখতে হবে। সে কাগজটা না খুলেই ভাবল, ক উইকেট ডাউন?

সে জবাব দিল, একটাও না। ঈশ্বর, যেন একটিও না হয়।

কিন্তু খুলে দেখল, বহরমপুরে তিন, ডেবরাতে চার, কলকাতা এবং তার চারপাশে চোদ্দ। সে কাগজটা বন্ধ করতে গিয়েও পারল না। একটা ছবি ছাপা হয়েছে। ওকে পুলিশ খুঁজছে। ছবিটায় চোখ দুটো, কফি—হাউসের চোখ দুটো আরও কী যেন…সে বোধহয় ফের সংজ্ঞা হারাত। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি জানালা ধরে ফেলল।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *