দুঃস্বপ্ন – পাঁচ
কে যেন হেঁকে যাচ্ছিল তখন, গ্রামে গ্রামে আজ নতুন দিনের ফসল উঠছে, যে যার ফসল ঘরে তুলে নিন।
সোমা গাড়ি চালাতে চালাতে সেই হাঁক শুনতে পেল। কে হাঁকছে। সে গাড়ি চালাতে চালাতে লক্ষ্য করল না, কেউ হাঁকছে না। রাস্তার মানুষের ভিতর তেমন কেউ মানুষ নেই যে এমন হাঁকতে পারে। সবাই বাড়ি যাবার জন্য ছুটছে। কোনো দিকে তাকাচ্ছে না। চারপাশে কী হচ্ছে দেখছে না। বাড়ি পৌঁছে গেলেই যেন রক্ষা। তার তাকে কিছুতে পাবে না। সোমা এ—সময় মনে মনে না হেসে পারল না। আটটা না বাজতেই আবার গাড়ি—বারান্দায়, ফুটপাথে, গাছের নিচে সব অসহায় মানুষদের শুয়ে পড়ার দৃশ্য। সোমার মনে হল, সেইসব জায়গায় মানুষটা এখন অদৃশ্য হয়ে আছে, এবং হাঁকছে, যে যার ফসল ঘরে তুলে নাও।
সে একবার কুলু উপত্যকাতে বেড়াতে গিয়েছিল। কলকাতা থেকে সোমা মোটরে যেতে যেতে কত সরাইখানা, নদী, মাঠ, পাহাড় দেখেছে। দেখেছে মাথার ওপর নীল আকাশ আর অজস্র পাখি এবং শীতের রোদ। সেই রোদে কত হাজার লক্ষ অসহায় মানুষের মুখ। দেখলে মনে হবে যেন কতদিন ওরা কিছু খায়নি। সোমার তখন আর উপত্যকার ফুল ফল নজরে আসেনি। বাবার মুখ মনে হয়েছে। বাবার আত্মহত্যার পরের মুখ। অসৎ মানুষের পাল্লায় পড়ে বাবা আত্মহত্যা করেছিলেন। যেন বাবার মুখে সোমা পড়তে পেরেছিল, এমন এক সমাজে আমরা আছি সোমা, যেখানে আমাকে চুরি করে তেলেভাজা খেতেই হয়। তুই আর কী করবি।
সোমা যেতে যেতে চারপাশে লক্ষ্য রাখছে। খুব ধীরে ধীরে গাড়ি চালাচ্ছে। কলকাতায় জোরে সে কখনও গাড়ি চালাতে পারে না। পায়ে হেঁটে গেলে বুঝি আগে চলে যাওয়া যায়। ফলে যত মানুষ আছে তাদের মুখ দেখতে দেখতে যাচ্ছে। আবছা তাদের মুখ। আবছা বলেই সে যেন বুঝতে পারে—মানুষেরা কত উদ্বিগ্ন। ওর মায়া হয়।
বাড়ি ফিরতে বেশ রাত করে ফেলেছিল সোমা। সে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে যাচ্ছিল। মনীষ ব্যালকনিতে পায়চারি করছিল—এবং ভীষণ উদ্বিগ্ন সে। সোমা এখনও ফিরছে না। রসুল সোমার সঙ্গে যায়নি। একা বের হয়ে গেছে। তখনই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। মনীষ বলল, ওকে সামান্য আঘাত দেবার জন্য যেন বলল, ওকে পেলে?
না।
গাড়িতে চড়ে ওসব মানুষের নাগাল পাওয়া যায় না সোমা।
মনীষ সোমাকে ঠাট্টা করছিল অথবা বিদ্রুপ। সোমা গায়ে মাখল না। মনীষ স্ত্রীর কাছে গেল। বলল, সোমা তুমি কী পাগল হয়ে যাচ্ছ?
সোমা সোজা তাকাল মনীষের দিকে।
আমার তাই মনে হচ্ছে। তোমার কী হয়েছে বল? তুমি এমন করলে আমি বাঁচি কী করে!
আমার তো কিছু হয়নি মনীষ। তুমি অনর্থক চিন্তা করছ।
যদি তুমি তাকে খুঁজে পাও, তবে কী করবে?
কিছুই করব না।
তবে তাকে খোঁজার কী দরকার এত?
সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।
সোমা! মনীষ চিৎকার করে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, কাল থেকে আর বের হবে না। বলে দিলাম।
সোমা এ—কথা শুনে কী ভাবল মুখ দেখে বোঝা গেল না। সে যেমন অন্যান্য দিন স্নান করে রেকর্ড—প্লেয়ার নিয়ে বসে তেমনি বসেছিল। এবং গত রাতে যে—সব রেকর্ড বাজিয়েছে একা একা, সে সব বাজাল। সে মনীষের সঙ্গে কথা বলতে পর্যন্ত পারছে না। মানুষটার মুখ তাকে এত বেশি হন্ট করছে।
খাবার পর অন্তত মনীষ ভেবেছিল সোমা সহজ হবে। সে রাগ করলে খায় না। না খেয়ে শুয়ে থাকে। কিন্তু আজ মনীষ ডাকতেই সে খাবার টেবিলে গিয়ে বসল। বেশ পেট ভরে খেল। পেট ভরে খেলে মনীষের মনে হয় সোমার কোনো রাগ থাকে না। সে একটা দামি চাদর সোমাকে জড়িয়ে দিল। বলল, চল তুমি গান গাইবে, আমি শুনব।
সোমা বস্তুত সেই গানগুলিই ফিরিয়ে ফিরিয়ে গাইল, গোলাপ ফুল ফুটিয়ে আছে….।
মনীষ জানে সোমার এই গান সেই এক মানুষকে উদ্দেশ্য করে গাওয়া। সে যেন এ—সব গান মনীষকে শোনাচ্ছে না, সেই নিবেদিত প্রাণকে শোনাচ্ছে। মনীষ ভিতরে ভিতরে ভয়ংকর উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। তবু কিছু করতে পারছে না। সোমা যখন নীল চোখে তাকায় তখন মনীষের সব রাগ দুঃখ কেমন গলে যায়। মনীষ ওকে জড়িয়ে ধরল। সোমা কিছু বলছে না। ওকে শুইয়ে দিচ্ছে আস্তে আস্তে। সোমা কিছু বলছে না। মনীষ বলছে, এ—ভাবে ভালো লাগছে না। আজ তুমি লাল রঙের গাউন পরো। লাল রঙের নাইটি পরে এল সোমা। নিচে কোনো বাস নেই। সেই এক মোমের মতো নরম হাত—পা। সোমা হাত—পা বিস্তার করে দিল। মনীষ কেমন কুকুরের মতো শুঁকে শুঁকে ওর শরীরের দিকে এগুচ্ছে। অন্তস্তলে ডুব দেওয়া মাত্রই সোমা আর্তনাদ করে উঠল, মনীষ, চারপাশে কারা ঘিরে ফেলেছে বাড়িটা দ্যাখো। ওরা আমাদের পুড়িয়ে মারবে। বলেই মনীষকে শরীর থেকে ঠেলে ফেলে দিল সোমা।
মনীষের মুখে এ—শীতের রাতেও ঘাম। সে স্ত্রীকে জোর করে সাপ্টে ধরল ফের। সোমা এলোপাথাড়ি হাত—পা ছুঁড়ছে। না, না। আমি পারব না। আমাদের ওরা আজ হোক কাল হোক পুড়িয়ে মারবে। তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। আমাদের ওরা কোনোদিন ক্ষমা করবে না।
কিন্তু মনীষ শুনছে না। কী যেন এক অমানুষিক লোভ ওকে তাড়া করে ফিরছে। আজ তিনদিন সোমা ওকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, নানারকমের অজুহাত সোমা দাঁড় করায়। সে কিছু শুনবে না। জোর করে বাঘ যেমন শিকার নিয়ে পালায় তেমনি সে সোমাকে পাঁজাকোলে করে নিজের খাটের দিকে এগুচ্ছে। আর সোমা, এক অবোধ বালিকার মতো হাত—পা ছুঁড়ে বাধা দিচ্ছে। ওর নাইটি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে। বলছে, মনীষ, ওরা এসে গেছে। ওরা আমাদের পুড়িয়ে মারতে এসে গেছে।
মনীষ কিছু শুনল না। সে তার স্ত্রীকে উলঙ্গ করে ফেলে রাখল। বলল, তুমি উঠবে না। উঠলে আমি তোমাকে হত্যা করব। মনীষ ওকে এবার যথার্থই ভয় দেখাল। উত্তেজনায় ওর হাত—পা কাঁপছে। কে এমন মানুষ, যে আমার সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে! একেবারে উঠবে না। আমি তোমার পাশে শোব। তোমাকে ধর্ষণ করব।
সোমা শক্ত হয়ে থাকল। কিন্তু মনীষের যতটা ইচ্ছা ছিল আজ ওকে ছিন্নভিন্ন করে দেবার, নীল চোখ দেখে সে আর তা করতে পারল না। শিয়রে বসে থাকল। এবং সহসা দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল, বল তোমার কী হয়েছে। খুলে বল। আমি তোমার জন্য সব করব।
সোমা পাশ ফিরে শুল। ঘরে আর কেউ আছে সোমার যেন মনে নেই। মনীষ বলল, তুমি উঠে দেখো কেউ আমাদের বাড়ির চারপাশে নেই। কেউ আমাদের পুড়িয়েও মারতে আসছে না।
সোমা ঘুমিয়ে পড়েছে।
মনীষ একা একা একটা মৃদু আলো জ্বালিয়ে পায়চারি করতে থাকল। তার ঘুম আসছিল না। গত রাতে সোমা যেমন শীতের রাতে ব্যালকনিতে চুপচাপ বসেছিল, আজ সে তেমনি নিজে সেখানে চলে গেছে। তার ভিতর সোমা কী করে যেন এক মৃত্যুভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। সকালের কাগজ পড়ার পর সেই মৃত্যুভয় তাকে অনেকক্ষণ কাজের ভিতর ডুবতে দেয় না, তবু সে সারাক্ষণ কাজ—পাগলা মানুষের মতো অফিসে থাকে। আজ এখন সেই মৃত্যুভয় ওকে এমন জড়িয়ে ধরেছে যে একা একা ব্যালকনিতে পায়চারি করতে সে ভয় পেল। ওর কেন জানি মনে হল সত্যি কারা চারপাশে, মাঠ ঘাট অথবা গ্রাম থেকে মশাল জ্বালিয়ে শহরের দিকে উঠে আসছে। হাতে ওদের মশাল। এবং বর্শার ফলাতে মানুষের মৃত্যু নাচছে। ওর মনে হল ওরা সব অন্নহীন ভূমিহীন মানুষ। সে তাদের সর্বস্ব কেড়ে নেবার যে ষড়যন্ত্র করেছিল, একা পেয়ে তাকে বর্শায় গেঁথে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ সোমার কেমন ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল শিয়রে কেউ বসে রয়েছে। তাকে ডাকছে। ওর প্রথম মনে হয়েছিল সেই মানুষটা তার শিয়রে বসে রয়েছে। তাকে ডাকছে। বলছে, ওঠ, চল, আমরা নতুন ফসল তুলতে যাই। এসো দ্যাখো, চারপাশে মানুষের ভিতর কী উল্লাস! স্বাধীন মানুষের কী আনন্দ! কিন্তু চোখ মেলে তাকালে দেখল, মনীষ হাঁটু গেড়ে বসে আছে পাশে। ওকে ভয়ার্ত কণ্ঠে ডাকছে—সোমা ওঠ।
সে উঠে বসল।
দ্যাখো একটা চিঠি। উড়োচিঠি।
কৈ দেখি।
এই দ্যাখো। বলে সে একটা চিঠি দেখালে।
কে দিল তোমাকে?
কে দিল জানি না। রসুল বলল, একটা লোক ওর দরজায় কড়া নেড়ে দিয়ে গেল।
সদর খোলা ছিল?
না। সদর খোলা ছিল না।
সোমা অবাক হয়ে গেল। দেখতে কেমন? রসুল ওর মুখ দেখেছে?
রসুলকে ডাকব?
না না। এখন থাক। চিঠিটা পড়।
মনীষ ভয়ে চিঠি পড়তে পারল না। তুমি পড়। আমার গলা শুকিয়ে উঠছে।
সোমা আলোর নিচে চিঠি রেখে পড়তে গিয়ে কেমন ভীত হয়ে পড়ল। সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা। এমন যার হস্তাক্ষর, সে নিজে না কত সুন্দর। সে পড়ল, পড়তে পড়তে গলা শুকিয়ে গেল তার। সব খুঁটিনাটি তথ্য দেওয়া। এত খবর ওরা কী করে রাখে! শেষে লেখা, গণ—আদালতে আপনার বিচার হওয়া দরকার। আপনিই বলুন, যেভাবে আপনার ব্যবসা হাজার মানুষকে জাহান্নমে ঠেলে দিচ্ছে তার কী শাস্তি?
সোমা বলল, আমি জানি সে আসবে।
সোমা! মনীষ আর্তনাদ করে বলল, তুমি কী বলছ!
কী বলব বল? এমনই তো হবার কথা। আমাদের আইন তোমার এই ভেজাল ব্যবসা রুখতে পারছে?
তার জন্য জুলুম? ভয় দেখাবে?
আর কী করা। সোমা হাসতে থাকল। আমি তোমাকে ভালোবাসি মনীষ। আমার বাবা লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করল! কী সামান্য ছাপোষা মানুষ ছিলেন তিনি। রসুলকে তাড়াতাড়ি ডাকো। অনেক কথা জিজ্ঞাসা করার আছে।
রসুল এলে বলল, মানুষটা দেখতে কেমন রে?
রসুল বলল, বড় ভালোমানুষ। সে এসে ডাকল আমাকে, বলল, রসুল ভালো আছ?
তুই কী বললি?
বললাম, ভালো আছি কর্তা।
কর্তা বলছ কেন? আমার নাম অঞ্জন। তুমি আমাকে অঞ্জন বলেই ডাকবে।
নাম অঞ্জন বলল। অঞ্জন নাম তার! বলতে বলতে সোমা কেমন মূর্ছা গেল।
আমাকে তার নাম বলতে বারণ করেছে দিদিমণি। এই, এই, কী হল! দাদাবাবু কী হল?
কিছু না।
ডাক্তার ডাকি?
না। মনীষ, সোমাকে শুইয়ে দিল। আর শোয়ানোর সময়ই মনে হল তার সেই ছিন্ন—ভিন্ন নাইটি ওর গায়ে। রসুল এমন পোশাকে দিদিমণিকে কখনও দেখেনি। কিন্তু মানুষটার কথাবার্তায় কী জাদু আছে! সে একেবারে তার কথায় মুগ্ধ হয়ে গেল! এবং সেটুকু না বলাতেই রসুলকে ডেকে এনেছে ওরা যে ঘরে বসে, সে ঘরে। সে কী করে জানবে, দুজনেরই তখন মূর্ছা যাবার মতো চেহারা। সে বলতে বলতে সব দেখছিল আর অবাক হয়ে যাচ্ছিল। মনীষ তাড়াতাড়ি বলল তুই বাইরে দাঁড়া। ওর চোখে—মুখে জল দিচ্ছি।
মনীষ এখন অঝোরে ঘামছে। এটা যে শীতের রাত মনেই হচ্ছে না। সে পর্দা তুলে বাইরে এসে বলল, রিভলবারটা ঠিক আছে তো?
সব ঠিক আছে দাদাবাবু। কিন্তু ও তো রিভলবারের মানুষ নয়। ওর চোখ—মুখ দেখলে আপনারও মায়া হবে।
রাখ তোর মায়া। বলে সে এক ধমক লাগাল। তারপর ঘরে ঢুকে দ্রুত পালটে ফেলল সোমার পোশাক। ওর চোখে—মুখে জল দিল সামান্য এবং চোখ খুললে বলল, তুমি ওকে চিনতে পারনি।
সোমা বলল, না।
