Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

বিনু প্রথমে অশোককে ফোন করে বলল, সুধীরকে নিয়ে শিগগির চলে আয়। সোমাদের বাড়িতে চলে আয়। মনীষ খুন হয়েছে।

ও—পাশ থেকে কথা বলার আগ্রহ ছিল, কিন্তু বিনুর এক ধমক। —যা বলছি কর। এসে সব শুনতে পাবি।

অশোক বের হয়ে সুধীরের খোঁজে গেল। সুধীর সকালে বাড়ি থাকে না। রোববার, বাড়ি না থাকারই কথা। সকালের দিকে ক্লাবে আড্ডা দেবার স্বভাব। ক্লাবে গিয়ে দেখল সেখানেও নেই। ক্লাবের একটা ছেলে বলল, বীরেনবাবুদের বাড়িতে গেছে। ও—পাশের গলিতে ঢুকে একটা নীল রঙের সাইনবোর্ড দেখবেন, তার পাশের বাড়িটা বীরেনবাবুদের। এবং এ—ভাবে, অশোক ঠিকঠাক পেয়ে গেল সুধীরকে। সুধীরকে সে সঙ্গে নিয়ে বের হয়ে পড়ল। কিছু বলছে না, সুধীর সব শুনলে নাও যেতে পারে। ও যা স্বভাবের মানুষ! কিন্তু সোমার এমন বিপদে সে স্থির থাকতে পারছে না। সোমার বিয়ের পর মনে মনে সে সোমা অসুখী হোক চাইছিল, মনীষের কিছু একটা হয়ে যাক, কিছু একটা হয়ে গেলে, সোমা ওর কাছে আবার ঘুর ঘুর করতে পারে অথবা অসম্মান করে সোমার ওপর প্রতিশোধ নেওয়া যাবে, কিন্তু এমন একটা ঘটনা ঘটে যাবার পর সে নিজেই ভারি দুঃখী লোক হয়ে গেছে! আসলে বিপদটা তার নিজের যেন। সে ট্যাক্সিতে উঠে বলল, মনীষ খুন হয়েছে!

সুধীর বলল, কী বলছিস যা তা!

সত্যি বলছি।

কোথায় খুন হয়েছে!

জানি না।

কখন খুন হয়েছে!

জানি না। বিনু সোমাদের বাড়িতে। সে তোকে নিয়ে যেতে বলেছে।

সুধীর বলল, আমি এ—সব খুন—টুনের সঙ্গে জড়াতে চাই না। আমাকে নামিয়ে দে। ও—সব আমার সহ্য হয় না। সহসা খুন—টুন ভালো ব্যাপার নয় এমন বুঝে বলে ফেলল।

অশোক বলল, তুই কী বলছিস!

সুধীর বলল, আগে বলবি তো। দিনকাল যা যাচ্ছে, এখন এ—সবে কেউ মাথা গলায়!

সোমার কথা ভাব!

ধুস সোমা। বড়লোক খুন—টুন হবে বেশি কী! সোমা আবার একটা বিয়ে করে নেবে। আমাকে ছাড়, আমি যাব না।

অশোক বলল ঠিক আছে। তুই নেমে যা। আমাকে যেতেই হবে।

এবং ট্যাক্সি কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে থামলে অশোক বলল, বিনু একা সব দিক সামলাতে পারবে না, বোধহয় এ—জন্য তোকে নিয়ে যেতে বলেছিল।

সুধীর কী ভাবল। এ—ভাবে নেমে যাওয়াও যেন ঠিক হচ্ছে না। অশোকের ওপর রাগ হচ্ছিল খুব। খুন—টুনের ব্যাপারে জড়ালে শেষ পর্যন্ত কী হয় তার জানা আছে। কার দায় কোথায় গড়ায় কে জানে। ওর এ—ব্যাপারে খুব অভিজ্ঞতা হয়েছে। রাস্তায় কে মেরে গেল, আর কেউ রাস্তা ধরে চলে গেল, পুলিশ তাকেই তুলে নিল, সে একবার এ—ভাবে থানায় চলে গিয়েছিল। তার মা বাবা থেকে চোদ্দ গুষ্টির কথা জেনে ছেড়েছিল। মারধোর করেনি এই যা রক্ষে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে ভেবে ফেলে, অশোক এবং বিনু যাচ্ছে, অশোক ঠিক বিনুকে বলবে, বিনু ভাববে, সুধীর কাপুরুষ, সোমা হয়তো কোনোদিন তার কথা আর ভাববে না। সোমার কথা ভেবে বলল, চল।

অশোক বলল, অসুবিধা হলে থাক।

সুধীর বলল, বুঝিস না কেন? আমরা ছা—পোষা লোক। কোর্ট—কাছারি করতে পারি না।

এখানে কোর্ট—কাছারির কী হল!

ট্যাক্সি যাচ্ছে। একটু জোরে চালাতে বলেছে অশোক। এবং সুধীর শেষ পর্যন্ত কিন্তু বরং অশোকের চেয়ে বেশি করিতকর্মা মানুষ হিসেবে প্রায় সোমাদের বিশাল বাড়ির সদর দরজায় নেমে একেবারে লাফিয়ে লাফিয়ে ঢুকে গেল। কোর্ট—কাছারি কথাটা তার মনে থাকল না। এবং নিঝুম এই বাড়িতে পুলিশের এক গাড়ি। কালো রঙের পুলিশের গাড়ি। মৃতদেহ শনাক্ত করার কথা। মনীষের ব্যবহারিক সব, এই যেমন সুটকেস, মানি ব্যাগ ডাইরি সব দেখানো হচ্ছে। সোমা সকাল বেলাটায় বোধহয় সংজ্ঞা হারানো অবস্থায় কাটিয়েছে। এখনও ঠিক হুঁশ নেই তার। তবু দেখে দেখে বুঝে নিচ্ছে সবই মনীষের, তারপর ওদের যেতে হবে গাড়িতে। দুটো গাড়ি বিনু ঠিকঠাক করতে বলেছে। একটা গাড়িতে অশোক, সুধীর এবং অসিতবাবু। একটা গাড়িতে মনোরমা, রসুল, বিনু, সোমা। সামনে পুলিশের গাড়ি। এবং শীতের সকালে রোদ বেশ, ছুটির দিন বলে চৌরঙ্গি পাড়ায় ভিড় নেই। সকালে সব ছেলেমেয়েরা নিত্যদিনের মতো খেলা করছে। এবং গাছে গাছে তেমনি বাতাস, আর সেই বুড়ো লোকটা আগুন জ্বেলে ঠিক বসে রয়েছে। পুলিশের রিপোর্টে তার সব বর্ণনা থাকবে। সোমাকে সবই খুলে বলতে হবে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত।

কখনও মনে হয় ওরা মিছিল করে যাচ্ছে। আগে পুলিশের গাড়ি, পরে সোমাদের গাড়ি, পেছনে অশোকদের গাড়ি। ওদের দুটো গাড়িই দামি। বড়লোক খুন—টুন হলে এমনি হয়ে থাকে। অবশ্য পুলিশ থেকে এটা খুনের ঘটনা বলতে পারছে না। আবার আত্মহত্যার ঘটনাও বলতে পারছে না। ট্রেনে কাটাও বলতে পারছে না। ট্রেনে কাটা পড়েছে। প্রথম শ্রেণীর রিজারভেশান দূরপাল্লার গাড়ি। এবং ব্যান্ডেল ছাড়তে না ছাড়তেই ঠিক মগরার গুমটি ঘরের কাছে লাশ পাওয়া গেছে। তার যেহেতু পকেটে ছোট্ট ডাইরি ছিল, খোঁজখবর নিতে সময় লাগেনি। মনীষ দত্ত যে মর্গে চালান যাবে এবং লাশের পাশে ডোম হোমরাজ সাহনি দাঁড়িয়ে আছে, পুলিশের গাড়িতে কাক, এ—সব বিনু সোমার মুখ দেখতে দেখতে মনে করতে পারল। সোমাকে সে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছে।

ওরা বেশ বড় বাড়িটার সদর গেটে ঢুকে গেল। তারপর আরও ভিতরে। একদল পুলিশ দূরের মাঠে প্যারেড করছে, ঠিক প্যারেড না করলেও প্যারেডের মতো মনে হয়, কারণ ওরা প্যারেড করে বের হয়ে গেছে। এবং গাড়িতে একদল সাদা ইউনিফর্ম পরা পুলিশ বের হয়ে গেল, আর মোটর বাইকের শব্দ, সার্জেন্ট, সাব—ইন্সপেক্টর এবং আরও বড় অফিসারদের ওরা দেখতে পেল করিডোর দিয়ে যাচ্ছে! ওদের গাড়ি এবং সোমাকে দেখেই পুলিশের চোখ যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। ওরা বুঝতে পারছে একজন বড়লোকের বউ এসেছে স্বামীকে শনাক্ত করতে। ওরা যে যার সিটে অথবা গাড়িতে বসে থাকতে পারছিল না। খুন—টুন হওয়া মানুষের বউ এত লম্বা এবং চাকচিক্যময় অথবা সুন্দরী হতে নেই।

এবং এ—সময়ে বিনু দেখল, দুজন অফিসার, সে একজনকে চেনে মনে হল। কিন্তু এইসব পোশাকে সঠিক বোঝা যায় না। সে সাহস পেল না কিছু বলতে। অফিসারটিই বলল, তুই বিনয় না। আমাদের ক্লাসের বিনু। আমি তোদের সবাইকে চিনি।

বিনু বলল, আমিও চিনি। লাশটা তোর….

অজিতেশ বলল, তোরা কার লাশ দেখতে এসেছিস! সে খুব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।

মনীষের।

মানে মনীষ দত্ত।

মনীষ দত্ত মানে সোমা গাঙ্গুলীর স্বামী।

হ্যাঁ।

লাশ মনীষ দত্তের! দেখতে হয়! আমি তো আর দশটা লাশের মতোই চটের থলে দিয়ে বেঁধে রাখতে বলেছি। খুব আগলি সিন হবে। সোমা কী সহ্য করতে পারবে!

তুই দেখিসনি!

ভোর রাতে এসেছে। এখনও যাইনি। দেখে লাভ নেই! মরা মানুষ দেখতে ভালো লাগে না। তবু দেখতে হয়। কাজকর্ম চালাতে হলে কাজ করতেই হয়। সোমা কোথায়।

পাশের ঘরে আছে।

অজিতেশ ওর জুনিয়র অফিসারকে ডেকে বলল, হোমরাজকে ডেকে পাঠান।

হোমরাজ এলে বলল, রঘুবাবুকে বল একটা সাদা চাদর দিতে। আর তুই দেখবি, লাশের মুখটা শুধু যেন বের করা থাকে। যেন শুয়ে আছে মতো। চাদরটা ভালোভাবে গুঁজে রাখবি। বাতাসে উড়ে—টুড়ে গেলে নাড়ি—ভুঁড়ি দেখে ফেললে আর একটা দুর্ঘটনা হতে পারে। বুঝলি, অজিতেশ বিনুর দিকে তাকিয়ে বলল, পেটের ভিতর যে এতসব নিয়ে আমরা ঘোরাফেরা করি বুঝতে পারি না। ট্রেনে কাটা লাশ—টাস দেখলে এটা হয়। নিয়ম একেবারে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া। অথবা মর্গে। তবে বড়লোকের ব্যাপার তো। সোজা এখানেই।

অশোক দেখল, দূরে করিডোরে বিনু কার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ওরা এলে বিনু ওদের পরিচয় করিয়ে দিল। চিনতে পারছিস তো!

খুব। অশোক বলল।

সুধীর বলল, তুই যে আমাদের মনে রেখেছিস!

আরে যা! আয় চা খাবি।

বিনু বলল, সোমার সঙ্গে পরিচয় করবি না?

অজিতেশ বলল, না। সোমা এখন নিজের ভেতর নেই। খুব খারাপ লাগছে সোমার জন্য। বলেই অজিতেশ তিনজনের দিকেই তাকাল, তোদের কী মনে হয়?

বিনু বুঝতে না পেরে বলল, কী ব্যাপারে!

এই যে মনীষ ট্রেনে কাটা পড়ল, আসলে এটা আত্মহত্যা না খুন না অন্য কিছু!

সে তো তোরা বলতে পারবি।

অজিতেশ হাসতে হাসতে বলল, অনেক সময় পুলিশের চেয়ে যারা চারপাশে থাকে তারা ভালো জানে। তারা ভালো বলতে পারে।

সুধীর মনে মনে গজগজ করতে থাকল। এবারে ঠ্যালা সামলাও।

অজিতেশ বলল, আয়। আমার এটা ঘর। এখানে বসি, কোনো অসুবিধা হলে বলবি। একটু চা খা। ওদিকে ঠিকঠাক করুক; তারপর আমরা একসঙ্গে যাব।

ওরা তারপর একসঙ্গে বের হল। সোমাকে নিয়ে যাওয়া হল। সরু মতো গলি। দুদিকে উঁচু বাড়ি, এবং অন্ধকার মতো জায়গায় শ্যাওলা ধরা মতো ঘরের তালা খুলে ফেলা হল। অন্ধকার ঘর। দিনের বেলাতেও আলো আসে না। একটা আলো জ্বেলে দেওয়া হল। হোমরাজ কোর্তা পরে আছে। ছেঁড়া পেন্টালুন। কালো লম্বা দস্যুর মতো মানুষ। ছেঁড়া চটি এবং চুল রুক্ষ, কোঁকড়ানো, মাথাটা ফেট্টি বাঁধা। লম্বা গোঁফ দু গালে ঝুলে পড়েছে। দেখলেই মনে হবে জ্যান্ত যম, যমের মতো পাহারাদার লাশকাটা ঘরে। সে বলল, এই যে বাবু। ওই যে মেমসাব। স্যার দেখুন কী চোখ মুখ। গোটা শরীর চাদরে ঢাকা চটে বাঁধা এখন নেই। খোলামেলা। কাছে যেতে সাহস পাচ্ছে না কেউ। মনোরমা ধরে রেখেছে সোমাকে। সোমা উপুড় হয়ে পড়ে যেতে পারে। চারপাশে ওরা পাহারাদারের মতো। যেন সোমা উপুড় হয়ে পড়লেই কে পড়তে দিচ্ছে। সোমা দেখে হাহাকার করে উঠল।

ব্যাস হয়ে গেছে। এই তবে মনীষ দত্ত। এখন আর কিছু করণীয় নেই। পুলিশের করণীয় কাজ আছে তারপরও। তারপর মর্গে। মর্গ থেকে খালাস পেতে আরও সময়। ওরা এখন ফিরে যাবে।

বিনু বলল, পুলিশ কিনারা করতে পারবে কিছু।

অজিতেশ বলল, পুলিশের পক্ষে আমারই তদন্ত করার ভার। তবে পুলিশ কিছু করতে পারবে না। এখন তো হামেশা এ—সব হচ্ছে।

তার মানে! আমাদের বন্ধু। তুই ওকে চিনতিস। তুই একটা এর কিনারা করতে পারবি না।

হয় না। কিনারা হয় না। তবে চেষ্টা করা হবে।

বিনু, সোমাকে নিয়ে চলে যেতে বলল অশোককে। সুধীর বিনুর সঙ্গে থাকবে। অজিতেশের সঙ্গে কথাবার্তা সেরে যেতে হবে।

এবং কথাবার্তা হওয়ার পর অজিতেশ বলল, আমাদের একদিন বসতে হবে। তুই যা যা বললি শুনলাম। দুটো চোখ সোমাকে বিভ্রান্ত করছে। দু—একদিন না গেলে সোমাকে কিছু বলা যাবে না। এখন সোমা ঠিক ঠিক জবাব দিতে পারবে না। সময় দিতে হবে। এমনকী একটা রহস্য আছে বুঝতে পারিনি। আচ্ছা চিঠিটা পাওয়া যাবে তো।

কোন চিঠিটা?

ঐ যে মনীষকে ভয় দেখিয়ে একটা লাল কালিতে চিঠি দিয়েছিল।

অঃ। কিন্তু ওটা তো সাদা চোখেই বোঝা যায় ছেলেছোকরাদের কাজ। দেশ উদ্ধার করবে বলে যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের কাজ।

অজিতেশ ওর চেয়ারে বসে একটা চুরুট টানছিল। ওর টেবিলটা ভীষণ বড়। এ—পাশে শুধু বিনু আর সুধীর বসে রয়েছে। করিডোরে পুলিশের বুটের শব্দ। মাঝে মাঝে সৈন্য—সামন্ত নিয়ে ফিরে আসার মতো পুলিশের গাড়ি ফিরে আসছে। অজিতেশ কাগজে কী সব লিখে দিচ্ছে, আর আবার গাড়ি উধাও হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে একজন ছোটোখাটো অফিসার ঢুকে নির্দেশ নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। এরই ফাঁকে ফাঁকে কথাবার্তা চালাচ্ছে ওরা। মনীষের মৃতদেহ এখন চটের ভিতর পুরে হোমরাজ একটা ভাঙা হাতল গাড়িতে ঠেলেঠুলে তুলে দিচ্ছে। এর পাকস্থলী বের হয়ে পড়েছে। সেটা ঠেলেঠুলে একপাশে রেখে দিচ্ছে আর তখন সোমা যাচ্ছে গাড়িতে। ওর মুখে রক্তশূন্যতা, বিবর্ণ, চুলে আর বাহার নেই। একদিনেই তাকে অনেক বয়স্ক করে দিয়েছে।

অজিতেশ বলল, সেদিন কফি—হাউসেই প্রথম লোকটাকে দেখে?

সোমা তো তাই বলছে।

আগে কোথায় দেখেছে মনে করতে পারে না!

না। অনেক চেষ্টা করেও পারেনি।

ভারি ইন্টারেস্টিং! সে ফাঁকে ফাঁকে কিছু নোট নিচ্ছিল। সুধীরের ভালো লাগছিল না। যা হবার হয়ে গেছে। এ—সব কেসের কিনারা হয় না। অনর্থক এ—ভাবে বিনু নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে।

অজিতেশ বলল, আমার চিঠিটা দরকার।

দেব। বিনু বলল, সোমা নিশ্চয় ওটা তোকে দেবে।

যদি থাকে। সুধীর কথাটা যোগ করল।

থাকবে না কেন?

মনীষ কোথায় রেখেছে, যদি রাখে, যদি সোমাকে না বলে কোথাও রেখে দেয়, অথবা রাগে ছিঁড়ে ফেলতে পারে…এসব হলে সোমা চিঠি দেবে কী করে!

তা ঠিক। অজিতেশ কিছুক্ষণ কী ভাবল।

সুধীর ভাবল, আহাম্মুকি। সে নিজেও জড়িয়ে যাচ্ছে। এ—সব ব্যাপারে যত চুপচাপ থাকা যায় তত মঙ্গল।

অজিতেশ বলল, সোমা সেদিন কী বই দেখেছিল?

বিনু বলল, বোধহয় এ—সময়ের যুব বিদ্রোহের ওপর কোনো বই। বড় পরিচালকের নাম বলে সে বলল, এমনই যেন বলেছিল।

চিঠিটা সম্পর্কে যাতে কোনো ভয় না থাকে সেজন্য বিনু সোমাকে অন্য কথা বলেছে। প্রেমটেমের ব্যাপার অথবা ফাজিল ছোকরার কাজ এমন বলেছে। এখন সে খুব জোর দিয়ে সহজ মনে যা ভেবেছিল তাই বলল। চিঠিটা যে—ভাবেই হোক দিতে হবে অজিতেশের কাছে।

অজিতেশ বলল, দশ তারিখের সকালে তুই ফ্রি আছিস!

সকাল কটায়?

এই নটা নাগাদ।

ফ্রি।

আমার এখানে চলে আয়। এখানে চা খাবি। তারপর তুই আমি সোমার বাড়িতে যাব। আগে থেকে সোমাকে কিছু বলতে হবে না।

দশ তারিখের সকালে বিনু এবং অজিতেশ একটা ট্যাক্সিতে সোমার বাড়িতে হাজির। তখন দশটা বেজে গেছে। সোমা সারা সকাল শুয়ে আছে। বিছানা থেকে উঠছে না। আচমকা বিনু এবং অজিতেশ আসায় সে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। সে হেঁটে যাচ্ছে পার্লারের দিকে। রাতে একা ভয়ে ঘুমোতে পারে না অথবা খুব কেঁদেছে, চোখের নিচটা ফুলে গেছে সেজন্য। সে একটা সুন্দর জ্যাকেট গায়ে দিয়েছিল, ওর আসার ভিতরই এমন একটা তন্ময়তা আছে যে অজিতেশ অবাক হয়ে অনেকক্ষণ তাকে দেখল। তারপর কেমন সহসা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, সোমা, তোমাদের শোবার ঘরটা একবার আমার দেখা দরকার।

সোমা বলল, একটু দেরি কর। সে বেল টিপল।

অজিতেশ বলল, এখুনি দেখা দরকার।

সোমা বলল, আমার শোবার ঘরে কিছু বাজে ছবি আছে, ওগুলো মনীষ এনে রেখেছিল, ওগুলো তোমার দেখা ঠিক না।

ওসব অনেক দেখেছি, সয়ে গেছে। ওজন্য ঘাবড়াবার কিছু নেই।

তবু কেমন বে—আব্রু ব্যাপার, এটা বাইরের লোক কেউ দেখুক সে চায় না। শোবার ঘরে এসব ছবি না হলে মনীষের লীলা খেলা জমত না। অজিতেশ ওসব দেখলে টের পাবে মনীষ দত্ত সোমা দত্তকে খুব নিত। সে এটা চায় না বলেই নিজের বোকামির জন্য ভিতরে ভিতরে রেগে যাচ্ছে। এমন একটা শোকের সময় মাথা ঠিক রাখা দায়। মনোরমার উচিত ছিল ছবিগুলো সরিয়ে নেওয়া। পুলিশ যে—কোনো সময় যা কিছু দেখে যেতে পারে। এবং যখন অজিতেশ দেখতে চাইছে, অজিতেশকে খুব ভালো লোক মনে হল না। চালাক ধূর্ত। পুলিশে কাজ করলেই এটা হয়! সে বলল, চল। সে বুঝতে পারল, পৃথিবীতে সে আর কিছু আজ থেকে গোপন রাখতে পারবে না।

শোবার ঘরটা খুবই বড়। বড় হলঘরের মতো ব্যাপার। দুটো বড় খাট। দুটো ছোট মেহগনি কাঠের পুরোনো টেবিল। কাচের বাতিদান। ছাদে ঝুলছে কাচের ঝালর। রকমারি কাঠের কাজ দেয়ালে। এবং মীনা করা দেয়ালের বর্ডার। নীল হলুদ রঙের মেঝে। মনে হয় দামি পাথর বসানো, এবং খুব সন্তর্পণে হাঁটতে হয়। এত মসৃণ মেঝে যে পা সহজেই পিছলে যাবার কথা থাকে। ওরা সন্তর্পণে হাঁটছিল। অজিতেশ নানা কারণে বহু বড়লোকের শোবার ঘর দেখেছে। এতবড় আয়না, মাথা সমান জাপানি ঝালরে ঢাকা আয়না। দুদিকে এমনভাবে স্ক্রীনের মতো বাঁধা যে দড়ি ধরে টান দিলে থিয়েটারের স্ক্রিন উঠে যাবার মতো উঠে যায়। অজিতেশ সেই সিল্কের দড়ি ধরে টান দিল। না এটা স্ক্রিনই। তারপর সে মুখ উঁচু করে দেখল। টেবিলের চকচকে কাঠের উপরে যে সিল্কের ঢাকনা সবই এত দামি যে সে আর দেয়াল দেখার অবকাশ পাচ্ছে না। এবং তারপরই সব ছবি, দেয়ালে অজস্র ছবি। রঙবেরঙের, পৃথিবীর যাবতীয় পুরুষ রমণীর সহবাসের ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি। ছবিগুলো খুব বড় শিল্পীর আঁকা। ন্যুড অথচ কোথায় যে এইসব ছবিতে একটা বিরাট মহত্ত্ব রয়ে গেছে, যার জন্য একসময় অজিতেশ না ভেবে পারল না, মনীষ দত্তের রুচি ছিল।

সে বলল, সোমা তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।

সোমা পাশে পাশে হাঁটতে পারছে না, সে ঠিক ঘরের মাঝখানে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়েছিল। ওর আস্তে কথা অজিতেশ শুনতে পায়নি। কাছে এসে বলল, তোমাকে চিঠিটা দিতে হবে।

কীসের চিঠি?

মনীষকে যে চিঠিতে থ্রেটনিঙ করেছিল।

সোমা বলল, দিচ্ছি।

অজিতেশ বলল, আর একটা কাজ করতে হবে!

কী কাজ!

কাল আমরা সবাই আসব।

বিনু বলল, সবাই বলতে কী বোঝাতে চাইছিস!

সোমার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা সবাই। কিছু হিল্লে করা যায় কিনা। জটিল ব্যাপার। মনীষ ভয় পেয়ে পাগল হয়ে যেত। পাগল যে হয়ে যায়নি তাই বা কে বলবে! সেজন্য ওর আত্মহত্যা করা স্বাভাবিক। যাই হোক। আমরা সবাই। আমি, বিনু, সুধীর, অশোক, অসিতবাবু এবং তুমি। বড় টেবিলটা থেকে আয়না খুলে নেবে। সাতটা চেয়ার। ঘরে আর কিছু থাকবে না।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *