Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

শান্তিবাবু দরজায় কেউ কড়া নাড়লেই কেমন হয়ে যায়। অবিবাহিত মানুষ। মা আছেন। আর একটা চাকর। তিন তলার ফ্ল্যাট। ইতিহাসের অধ্যাপক। ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসটা বোধহয় খুব ভালো পড়া ছিল না, হলে একটা লিস্ট টানিয়ে দিতেই এত ভয় পাবার কথা না। প্রথমে নামটা দেখে ভেবেছিল, ভুল, ছাত্ররা তাকে ভীষণ ভালোবাসে, কিন্তু চোখ মেলে ফেরতাকালে বুঝেছিল, না ভুল নয়, ওরা ঠিকই ওর নাম লিখেছে, তবে ভালোবাসে বলে, একেবারে শেষে বোধহয় নামটা রেখেছে।

কড়া তখনও নড়ছে। এই এগারোটায় কে আসবে? হুট করে দরজা খোলার নিয়ম নেই। চাকরটাও সেয়ানা হয়ে গেছে। সে যে ভয়ে ভয়ে আছে, চাকরটা বুঝে ফেলেছে। সে দরজায় খট করে কড়া নাড়ার শব্দ পেলেই দৌড়ে আসে। দরজা খোলার আকুলতা। আগে দরজা ভেঙে ফেললেও ওর সাড়া পাওয়া যেত না। যেন জোর করে পাঠাতে হত। এখন আর সে—সব নেই, একেবারে কান খাড়া। এবং দরজা খোলার কথা বলেই বোধহয় বাবুর মুখ শুকিয়ে যায়, আর চাকরটি তাতে বেশ মজা পেয়ে যায়। শান্তিবাবু এখন নানাভাবে চেষ্টা করছে, মুখ স্বাভাবিক রাখার। যেন ওটা কিছু নয়, যেমন আগে কড়া নাড়ার শব্দ শুনে সে অনায়াসে চুরুট টানতে পারত, কপাল ঘামত না, এখনও তেমনি চোখ মুখ করতে গিয়ে বুঝতে পারে সে, বোকা বোকা মুখ। এ—মুখের মানে হয় না।

চাকরটা বলল, খুলব বাবু?

খুলবি!

অনেকক্ষণ থেকে কড়া নাড়ছে।

তা নাড়ুক। দ্যাখ না কে?

একজন বাবু মতো মানুষ।

সঙ্গে আর কেউ নেই তো?

না।

সঙ্গে কিছু নেই তো?

না।

বয়স কেমন?

আপনাদের বয়সি।

তা বল। বলেই শান্তিবাবু দরজায় এসে হোল দিয়ে মানুষটাকে দেখল। মানুষটাকে সে চিনতে পারল আর সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে বলল। হ্যাল্লো। তুমি! কী খবর! হঠাৎ আমার এমন সৌভাগ্য!

মনীষ ঢুকেই বলল, দরজা বন্ধ করে দাও।

মানে!

মানে, তুমি কিছু জানো না!

সে যেন কিছু জানে না, এমন মুখে তাকাল।

মনীষ বলল, শুনলাম তোমার লিস্ট তৈরি!

ও একটা ঝুলিয়েছে। ওটা কিছু না।

তুমি কলেজে বের হচ্ছ?

তা হব না কেন। মা, দ্যাখো কে এসেছে!

মনীষ বুঝতে পারল না, লিস্ট টানিয়ে দিলে মুখ কেউ এমন করে রাখতে পারে।—সে ওর পেছনে পেছনে ভিতরে ঢুকে গেল। শান্তিবাবু দরজা বন্ধ করে দেবে ভাবল, কিন্তু ফিরে দেখল, বাড়ির ছোকরা চাকরটা আগেই দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। সে আর দাঁড়াল না। ভিতরে ঢুকে বসার ঘরটার চারপাশটা দেখল। ভালো করে দেখল সে। এখানে যদি ওরা এসে আগেই লুকিয়ে থাকে। মনীষ ফিসফিস করে বলল, ক’দিন আগে!

তা আজ ন দিন হবে।

ন দিনের ভিতর কোনো এটেমপট হয়নি!

না। সময় লাগবে। সতেরো জনের লিস্ট। যার নাম প্রথমে আছে তার আগে যাবার কথা।

তার কোনো ঠিক নেই। সে তারপর কী ভাবল। শরীরে একটা কী রকমের কষ্ট। এমন কষ্ট, অথচ সে বুঝতে পারছে না, কষ্ট কেন। সে বুঝল, ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। বোধহয় গলা শুকিয়ে গেছে। সে শান্তিকে দেখে কেমন একটু সাহস পাচ্ছে। নিজের কষ্টের কথা বলতে পারছে না। এটা আর কিছু নয়, জলের জন্য কষ্ট। সে এতক্ষণে বুঝতে পারল, ওর ভীষণ জল তেষ্টা পেয়েছে। সে বলল, আমি জল খাব।

শান্তি জলের জন্য ছোকরা চাকরটাকে ডাকল। বলল, ক্ষেত্র, বাবুকে শরবত করে দাও।

শরবত খেলে জল তেষ্টা যায় না। আমি জল খাব শান্তি।

এখন জল খাবে কী শরবত, এ—নিয়ে শান্তির মাথা ঘামাবার কথা না। সে বুঝতে পারছে না, মনীষ হঠাৎ এখানে কেন। ওর কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হবার কথা না মনীষের। মনীষ এ—জন্য ছুটে আসেনি। সে বলল, তোমার দিকে কোনো গণ্ডগোল নেই। পাড়াটা ভালো।

মনীষ জল খেল। জল না খেলে বোধহয় সে ভালো করে কথাই বলতে পারত না। চোখে মুখে ভীষণ আতঙ্ক। শান্তিবাবু মনীষের জল খাওয়া দেখে এটা বুঝতে পারছে। সে ফের বলল, সোমা কেমন আছে? ওর কিছু হয়নি তো?

ওর কিছু হতে যাবে কেন! মনীষ বুঝতে পারল না সোমার কথা এ—সময় আসে কী করে! পৃথিবীর সবাই যদি সোমার জন্য ভাবে তবে সে ভাববে কখন। সে জল খেয়ে যেন কিছুটা সাহস পেয়েছে। এখন সে সহজভাবে কথা বলতে পারছে। সে বলল, তোমার খবরটা পেয়ে কেমন মন খারাপ লাগছিল। ছুটে এলাম।

তা যদি হয়েই যায়, কী করা!

কিন্তু তোমার অপরাধ কী?

ওরা তো অপরাধের কথা জানায় না।

কেউ কেউ শুনেছি অপরাধের কথা জানিয়ে চিঠি দেয়। সে যে এমন একটা চিঠি পেয়েছে তা বলল না। কেউ পেয়েছে, এমন ভাবে কথা বলল। আসলে ওরা এখন দুজন, দেশের কে কোথায় কখন কীভাবে চিঠি পেয়েছে এবং তার ফলাফল সম্পর্কে কথা বলতে উৎসাহী। যদিও শান্তি খুব একটা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য দেখাচ্ছে। এটা একটা রোমান্টিক ব্যাপার। কিছু তো করতে হবে। দেশ উদ্ধারের কাজটা যদি গান্ধী না করে যেতেন, তবে বোধহয় এমনটা হত না। ওদের হাতে আর কোনো কাজ নেই। কিছু লোক খুন করে ওরা শোষণ বন্ধ করবে ভাবছে।

তুমি শোষণের কে? মনীষ পায়ের ওপর পা রেখে কথা বলছে। সে একটা চুরুট ধরাল, চুরুট ধরালে মুখে যে আতঙ্কের ছাপ আছে সেটা মুছে যায়। মনীষের চুরুট মুখে চেহারা অন্য রকমের। বরং ওকে তখন খুব চিন্তাশীল মানুষ দেখায়। সে বলল, কী যে এ—সব হচ্ছে!

এটা চলবে। আজ তো আঠারো উনিশটা গেছে।

পত্রিকা তুমি পড়!

না পড়লে শান্তি পাই না।

সোমা আমাকে পড়তে দেয় না। পত্রিকা এলে লুকিয়ে রাখে।

তুমি না পড়ে থাকতে পারো!

পারি না। লুকিয়ে যে আনাব তার উপায় নেই।

কেন আজকাল অফিসে যাচ্ছ না?

শরীরটা ভালো নেই। বাড়িতেই সব করছি।

দেখবে নাকি পত্রিকাটা?

মনীষ কী বলবে ভেবে পেল না। সে বলল, তুমি কি কাগজ পড়তে পছন্দ কর?

স্টেটসম্যান। এটাতে সঠিক খবর পাওয়া যায়।

একটু দেখলে হত।

এখন শান্তি কাগজটা খুঁজছে। আসলে কাগজটা সেও লুকিয়ে রাখে। একা পড়তে ওরও বোধহয় ভয় হয়। কোনোরকমে কিছুটা পড়েই রেখে দেবার স্বভাব। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে ভালো লাগে না। সে পত্রিকা খুলেই একটা খবর শুধু খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু খবরের শিরোনাম দেখলেই সে কেন সে সবটা পড়তে সাহস পায় না, শিরোনামটা পড়েই সে রেখে দেয়। তারপর সে ভাবে, স্পেনের গৃহযুদ্ধের ওপর একটা বড় রকমের বক্তৃতা দেওয়া যাক। সে জানালায় দাঁড়িয়ে, কিছু পাহাড়—জঙ্গলের ছবি দেখতে পায়, একটা ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছে কারা দেখতে পায়, তখন মনে হয়, ব্রিজ উড়িয়ে দিলে দুটো—চারটে লাশ পড়বে, মরে থাকবে জঙ্গলের ভিতর, এবং এ নিয়মেই বিপ্লব সব জায়গায় হয়েছে। সে খানিকক্ষণ পায়চারি করতে থাকে, তারপর মনে হয় মৃত্যু একসময় হবেই, সে এ—জন্য বড় বেশি ভাবছে। এক কাপ চা দিতে বলে, সে আবার পত্রিকাটা খুলে পড়বে ভাবে, না, থাক, চা আসুক, চা খেতে খেতে পড়া যাবে। এবং এভাবে সে সেই একটা শিরোনামার সংবাদ যখন শেষ করে ফেলে তখন ঘড়িতে দশটা বাজে। কাগজ আসে সকাল সাতটায়। একটা শিরোনামা শেষ করতে ওর হয়ে যায় দশটা। সে একটা খবরই তারপর সারাদিন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পড়ে। পড়তে পড়তে মুখস্থ হয়ে যায়। নানাভাবে সে দেখতে চায় মৃত্যুগুলোর সঙ্গে ওর জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটুকু। যেমন বিজ্ঞান কলেজের একজন অধ্যাপকের গলা কেটে দেওয়া হয়েছে, সবটা কাটাতে পারেনি, ঘাড়ে রেজার চালিয়েছে। ঘাড়ে রেজার চালাতে কতটা গভীর ক্ষত হতে পারে, একটা না দুটো, কবার, এবং সে যদি এমন একটা সমস্যার সম্মুখীন হয় তবে কীভাবে সে ওদের সঙ্গে যুঝবে, ওর তো ইচ্ছা, সে সময়ই দেবে না। ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেবে, না তার চেয়ে পেছন দিক থেকে লাথি, সে এ—ভাবে বসে থাকবে যাতে করে ওর গলাটা কেউ কাছে না পায়। সব হত্যাই এ ভাবে যখন হচ্ছে তখন একটা পাতলা লোহার চাদরে মোড়া বর্ম জামার নিচে থাকলে কেমন হয়, কোনো বিজ্ঞাপনদাতা এমন একটা বিজ্ঞাপনও কেন যে দিচ্ছে না, মধ্যযুগীয় নাইটদের মতো সে তবে বর্মের পোশাক পরে থাকত। সে মাঝে মাঝে পত্রিকার ভিতর বোধহয় এমন একটা বিজ্ঞাপনের খবরও পেতে চেষ্টা করে। আর এ—ভাবে এগারোটা বাজলে সে বুঝতে পারে, খবরটি শুধু ওর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়াই হয়নি, সেটা সে মুখস্থও করে ফেলেছে, তারপর সারাটা দিন, ঐসব নিহত মানুষের ছবি ওর চারপাশে ঘোরাফেরা করলে সে কেমন নিজেই পাগলের মতো জোরে জোরে কাকে উদ্দেশ্য করে বক্তৃতা দিতে থাকে। এই এগারোটায় তার এক নম্বর বক্তৃতখানা আরম্ভ হবার কথা। মনীষ এসে কিছুটা অসুবিধা ঘটিয়েছে।

মনীষ বলল, কাগজে কী দেখছিস?

কিছু দেখছি না!

তবে এ—ভাবে ঝুঁকে আছিস কেন?

খুঁজছি।

কী খুঁজছিস?

বিজ্ঞাপন।

ধুস! বলে মনীষ কাগজটা জোর করে কেড়ে নিল।

মনীষ প্রথম পাতায় বড় বড় হরফে দেখল সব হত্যাকাণ্ডের কথা লেখা আছে। বেশ জ্বল—জ্বল করছে লেখাগুলো। ছেলেছোকরা বয়সের হত্যাকাণ্ডে সে বেশ মজা পায়, কোনো মজুতদার অথবা পুলিশের হত্যাকাণ্ডে সে কেমন বিবর্ণ হয়ে যায়। পাঁচ—মেশালি হত্যাকাণ্ড কাগজটা জুড়ে, ছোট বড় সব রকমের। আর তাছাড়া সব হত্যাকাণ্ডের কথা লেখা হয় না, যেমন ওদের বাড়ির সামনে, ঠিক সামনে বলা যায় না, একটু পেছনে, রাস্তার ওপর একজন মানুষের গলাকাটা। কে খুন করল, কখন, কারা, কোনো হদিসই পাওয়া গেল না। খবরটা পর্যন্ত কাগজে বের হয়নি। আর এ—ভাবে, চারপাশে যে হত্যাকাণ্ড চলছে, তার ঠিক হুবহু ছবি কেউ দিতে পারে না। বারাসতে আটটা না আটশো কে বলতে পারবে। কীভাবে যে মাটির নিচে সব চাপা দিয়ে কেমন হাত সাফসোফ করে ভালো মানুষ সেজে যাচ্ছে সবাই।

শান্তি বলল, কী দেখলে?

মনীষ কোনো জবাব দিচ্ছে না।

কী দেখবে! আমার কাছে শোনো। আমি না দেখেও সব তোমাকে হুবহু বলে দিতে পারি।

মনীষ বলল, তোমাদের এক নম্বর যিনি তার খবরাখবর তুমি রাখো?

হ্যাঁ।

তিনি কোথায় আছেন?

তিনি এখন এখানে নেই। ওর শ্যালক থাকে গোণ্ডাতে। সেখানে চলে গেছে।

গোণ্ডা! সে আবার কোথায়?

উত্তরপ্রদেশে বোধহয়।

বেনারসের কাছে একটা খুন হয়েছে।

তাতে তোমার কী মনে হয়?

দ্যাখো এক নম্বর কিনা তোমাদের!

এক নম্বর হতে যাবে কেন?

হতেও তো পারে।

শান্তিবাবুর মনে হচ্ছে, না হওয়াটাই শ্রেয়। হলেই, ওর নম্বর কমে আসবে। বুকটা কেমন করতে থাকল। মুখে ভয় ধরা পড়ুক, সে চাইল না। সে বেশ সোজাসুজি তাকিয়ে থাকল। কিছু বলতে পারল না।

মনীষ বলল, তোমাদের এক নম্বরের ঠিকানা জান না?

তা জানি।

ফোন টোন আছে?

তা আছে।

তোমার কলিগ! ফোন করে খবর নেওয়া উচিত।

শান্তি উঠে দাঁড়াল। ফোন করা ঠিক হবে কিনা, কীভাবে ফোন করবে, কী বলবে এ—সব ভাবল। অধীরবাবুর মা আর বোন আছে। এক ভাই আছে। সে বাড়ি থাকে না। বাড়িতে সে ঢুকতে পারে না। সে ভাবল, ফোন করে বলবে, অধীরবাবুর কোনো চিঠি এসেছে কিনা! অধীরবাবুর স্ত্রী এখন কোথায়! যেন পারিবারিক কুশল নেওয়া। ফোনে যে স্বর ভেসে এল, অচেনা। কোনোদিন এমন স্বরে কেউ কথা বলতে পারে সে ভাবতে পারে না। সে বলল, তাহলে…।

হ্যাঁ।

ওটা ঠিক খবর।

বউদির ভাই টেলিগ্রাম করেছেন।

সত্যি খবর।

ও—পাশের কণ্ঠস্বর ভাঙা কিছু আর বলতে পারছে না, কান্নায় ভেঙে পড়ছে। এবং শান্তি একেবারে কেমন সাদা ফ্যাকাশে, দাঁড়াতে পারছে না, কোনোরকমে এসে সোফাতে হেলান দিয়ে বসে বলল, মনীষ, তুমি ঠিকই বলেছ। আমাদের এক নম্বর গেছে।

তারপর ওরা দুজনই চুপচাপ। চা রেখে গেছে। শান্তিবাবুর মা এ—বাড়িতে আছে টের পাওয়া যাচ্ছে না। নিঝুম, নিরিবিলি, কেবল চাকরটা ভীষণ দর্পের সঙ্গে হাঁটাহাঁটি করছে। কড়াইয়ে সে কিছু ভাজছে, সে এত জোরে জোরে খুন্তি চালাচ্ছিল যে মনে হয়, বাবুদের মজা দেখে সে খুন্তি নেড়ে তামাশা দেখাচ্ছে। আর ওরা দুজন মুখোমুখি। কীভাবে যে সব হয়ে যাচ্ছে! মনীষ বলল, উঠি।

বোসো।

মনীষ এখন উঠি বললেই উঠতে পারছে না। মনে হচ্ছে সে যখন নেমে যাবে সিঁড়ি ধরে, তখন দু—পাশ থেকে ওরা জড়িয়ে ধরবে। গলার শ্বাসনালিটা টুক করে কেটে দেবে। সে টেরও পাবে না। সে, নিজের গলাকাটা, অর্থাৎ শ্বাসনালি কাটা, রক্ত ওগলাচ্ছে, শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে এমন একটা দৃশ্যের কথা ভাবলেই কেমন চোখে ঘোলা ঘোলা দেখতে থাকে। কেমন তখন নিজেকে কবন্ধের মতো মনে হয়। সে একটা হত্যাকাণ্ডের হুবহু বর্ণনা দিয়েছিল। ভোজালি দিয়ে সাঁই করে মাথাটা কেটে দিলেও মানুষটা মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে। হাওয়ায় হাত দুটো যেন খুঁজে বেড়ায় শ্বাস—প্রশ্বাসের কারুকার্য। তারপর ধপাস করে পড়ে যায়। পৃথিবীতে এমন একটা দৃশ্য মনীষ যে—কোনো সময় তৈরি করে ফেলতে পারে। আর তৈরি করতে পারে ভেবে ফেললেই, সে পায়ে আর শক্তি পায় না। সিঁড়ি ধরে কীভাবে নেমে যেতে হবে সে যেন বুঝতে পারে না।

তবু সে উঠে পড়ল। এখানে আর তাকে কে চেনে। কিন্তু সেই সুদূর গোণ্ডাতে শান্তিদের এক নম্বরকে কে চিনত। এক নম্বর গেছে, এখন দুনম্বর যেখানেই পালাক না রক্ষা নেই। শান্তির সতেরো নম্বর। সতেরো না সাতাশ, না সাত। এত কম সময়ে সে সব গুলিয়ে ফেলছে। সে সতেরো হোক, সাতাশ হোক, আসে যায় না, শান্তি তুমি যাবে। আমিও যাব। তবে শালা আমি আর এখানে থাকছি না। ভেবেই সে সটান উঠে দাঁড়াল। শান্তিকে কিছু বলল না। যারা চিঠি পায় তারা বাঁচে না। লিস্টে নাম উঠে গেলে রক্ষা থাকে না। এখন একমাত্র বিদেশে পাড়ি দেওয়া, আর না হলে অগত্যা একটা শান্তির মতো বর্ম তৈরি করে নেওয়া। শান্তি ওকে চুপি চুপি ভিতরে একটা বর্ম পরতে বলেছিল। লোহার অথবা ভালো বিদেশি ইলেকট্রনিক টিনের প্লেট দিয়ে বর্ম। ফুল হাতা গেঞ্জির মতো ভিতরে পরে থাকবে। গলায় চোপ বসাতে পারে, তা গলাটা ঢাকা থাকবে। চারপাশ থেকে ঢাকা গলার নতুন পোশাক, অথবা সে বলবে এটা প্যাটার্ন এখন পোশাকের, পরে থাকলে, তা গুলি বারুদ এবং হাত চালাচালি সব নিরর্থক হয়ে যাবে।

শান্তিবাবু বলল, আমি আর নামছি না। শরীরটা ভালো নেই।

মনীষ জবাব দিল না। শান্তি এক নম্বর গেছে শুনে নিচে নেমে যেতে পর্যন্ত সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু দরজার কাছে গেলে ফের শান্তিবাবু ডাকল, মনীষ শুনতে পাচ্ছ?

কী?

কেমন জোরে জোরে খুন্তি নাড়ছে?

তা শুনতে পাচ্ছি।

স্পাই নাতো!

কী করে বলব!

কিছু বলতেও পারি না! যা খুশি করছে!

রাখছ কেন? লাথি মারতে পারছ না?

মারব। সময় আসুক। এমন লাথি মারব না, একেবারে উলটে পড়বে। নাক থেঁতলে যাবে। গল গল করে মুখ দিয়ে রক্ত বের হবে।

আর তখনই চাকরটা এদিকে আসছে দেখে মনীষ চোখে আঙুল রেখে ইশারা করল। তারপর বলল, যাচ্ছি।

যাও।

ছোকরা চাকরটা এদিকে এসেই আবার বাঁই করে ঘুরে গেল। যেন কী আনতে ভুলে গেছে। সেটা নিয়ে সে নিচে নেমে যাবে। এখন মনীষ ভাবতে পারছে না, আসলে ওর মতলব কী! সে দ্রুত দু লাফে সিঁড়ি ধরে নেমে গেল। এবং সেও বাঁই করে ঘুরিয়ে নিল গাড়ি। এলোমেলো চালিয়ে যখন গাড়ি নিয়ে বাড়ি ঢুকল তখন এক কঠিন কাণ্ড। মনোরমা হাই হাই করছে। অসিত নেমে যাচ্ছে। ওর ভিতরটা ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। সে বোকার মতো অসিতকে দেখল, কিছু বলতে পারল না। অসিত বলল, ভিতরে যাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *