অসহায়
অধ্যায় এক : অরণ্যের ডাক
গ্রামের প্রান্তে ছোট্ট কুঁড়েঘর। সকালবেলা সূর্যের আলো উঠতেই কাঠুরে গোপাল কাঁধে কুঠার নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তার সঙ্গে এবার যেতে চাইলো দশ বছরের ছেলে অমল।
— “তুই ক্লান্ত হয়ে যাবি, অমল। বনের কাজ সহজ নয়।”
গোপাল বলল সতর্ক সুরে।
অমল উত্তর দিল দৃঢ় কণ্ঠে—
— “তুমি থাকলে আমি সব পারব বাবা।”
বনের পথ দীর্ঘ, কিন্তু ছেলের মুখে অকৃত্রিম আনন্দ দেখে বাবা আর আপত্তি করলেন না। দু’জন মিলে ঢুকে গেল গভীর অরণ্যে। চারদিকে পাখির ডাক, গাছের সবুজ ছায়া, আর শুকনো পাতার মচমচে শব্দে ভরে উঠল পথচলা।
অধ্যায় দুই : জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্ব
দিনভর কেটে গেল কাঠ কাটতে কাটতে। দুপুরে ছেলেকে পাশে বসিয়ে বাবা শুকনো রুটি আর জল ভাগ করে খেলেন। বিকেলের আলো ফিকে হতেই ঘরে ফেরার পথ ধরলেন।
হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে ভেসে এল গর্জন। চোখের সামনে উদ্ভাসিত হলো ভয়ংকর বাঘ। অমল আতঙ্কে বাবার হাত আঁকড়ে ধরল।
গোপাল চিৎকার করে উঠলেন—
— “পিছিয়ে যা অমল!”
এরপর শুরু হলো এক অসম লড়াই—মানুষ বনাম বাঘ। কুঠারের ঝলকে অরণ্য কেঁপে উঠল। বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ল, গোপাল প্রতিঘাত করলেন। কুঠারের আঘাতে রক্তাক্ত হলো জন্তুটি। গর্জনে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে শেষমেশ পিছু হটে অদৃশ্য হলো অরণ্যের অন্ধকারে।
অমল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুক এখনও কাঁপছে ভয়ে। কিন্তু বাবার কণ্ঠে তখনও দৃঢ়তা—
— “ভয় পাস না, আমি আছি।”
সেই রাতে তারা ঘরে ফিরল, কিন্তু ছেলের চোখে বাবা তখন শুধু কাঠুরে নন—এক রাজার মতো সাহসী, যিনি মৃত্যুকেও হার মানাতে পারেন।
অধ্যায় তিন : সময়ের স্রোত
বছরের পর বছর গড়িয়ে গেল। অমল ধীরে ধীরে বড় হলো, সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিল। গোপাল কালের নিয়মে বার্ধক্যে নুয়ে পড়লেন। এককালে যে শক্ত হাতে কুঠার উঠত, আজ তা কাঁপতে কাঁপতে থেমে যায়।
গ্রামের মানুষ এখনো বলে— “গোপাল সেই যে একদিন বাঘকে পরাস্ত করেছিল…” কিন্তু অমলের মনে সেই ঘটনা যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। বাবাকে তার চোখে মনে হয় জীবনের যোদ্ধা।
কিন্তু সময় থেমে থাকে না। শরীর ক্ষয়ে যায়, শক্তি ম্লান হয়ে আসে।
অধ্যায় চার : নিয়তির কাছে অসহায়
একদিন গোপাল অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলেন। শরীর কঙ্কালসার, নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে। অমল সারারাত বাবার শিয়রে বসে থাকে।
মৃদু কণ্ঠে গোপাল বললেন—
— “অমল, মনে আছে রে, বনের সেই দিন?”
চোখ ভিজে এল ছেলের।
— “কী করে ভুলব বাবা! তুমি না থাকলে আমি বেঁচেই থাকতাম না।”
গোপাল নিঃশব্দে হাসলেন, যেন মনে হলো—এই কথাটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
কিন্তু অমলের বুক ফেটে কান্না এল। সে ভাবল—
“বাবা তখন মৃত্যুর হাত থেকে আমাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু আজ? আজ আমি নিয়তির কাছে এতটাই অসহায় যে বাবার প্রাণ ফিরিয়ে আনার ক্ষমতাও আমার নেই।”
অশ্রুভেজা চোখে সে বুঝল—
মানুষের সাহস যতই প্রবল হোক না কেন, মৃত্যুর সামনে সে চিরকাল পরাজিত।
উপসংহার
অরণ্যের সেই ঘটনার পর গ্রামে গোপাল পরিচিত হয়েছিল “বাঘজয়ী” হিসেবে। কিন্তু জীবনের অন্তিম মুহূর্তে অমলের মনে একটাই উপলব্ধি জন্ম নিল—
প্রকৃত বাঘ আসলে মৃত্যু, যাকে কোনো কুঠারের আঘাতেই জয় করা যায় না ।
