Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » রামধনু || Tapas Jana

রামধনু || Tapas Jana

গিরিশ পার্ক থেকে কলেজ স্ট্রিট এই চার/পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা নিজের গাড়িতে করেই আস্তে পারে রোদ্দুর কিন্তু কলেজে আসতে সে গাড়ির বদলে মেট্রোকে বেশী প্রেফার করে। রোদ্দুর মনে করে গাড়ি করে গেলে, সে বাকি মানুষের কথা শুনতে পাবে না, জানা যাবে না বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন সমস্যার কথা, উচ্ছ্বাসের কথা, ভালবাসার কথা, আরো কত কি। সে কারোর কোনো সমস্যার সমাধান যেমন করে না, উপযাজক হয়ে তেমনি আবার কারোর আনন্দে ভাগও বসাতে যায় না। কিন্তু তার ভালো লাগে।
আজ সকাল থেকেই আকাশের মুখটা একটু ভার হয়ে আছে। হরি, অনেকবার বলেছিল গাড়িটা নিয়ে যেতে, কিন্তু রোদ্দুরের মনে চায়নি, বরং সে হরিকে হাসতে হাসতে বলেছিল “অনেকদিন জ্বরও হয়নি আর তোমার আদর, যত্নও পাওয়া যায় নি, তা একটু জ্বর হলে ক্ষতি কি?”

মেট্রো থেকে বেরিয়ে, আসতে আসতে কলেজ স্ট্রিট এর ক্রসিং এ পৌঁছানোর ঠিক একটু আগেই হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টিটা এসে পড়ল। বৃষ্টিটা এমন শুরু হলো, যে ব্যাগ থাকে ছাতাটা বের করার পর্যন্ত সময় পাওয়া গেলো না। কোনো উপায় না পেয়ে, রোদ্দুর, ফুটপাথের চায়ের দোকানের প্লাস্টিক্টার নিচে এসে দাঁড়ালো।

” মা, তুমি চিন্তা করো না, আমি কয়েকটা বই নিয়েই ফিরে আসবো। দরকার পরলে আমি মামার বাড়ি চলে যাবো। রাখছি এখন”। গলার আওয়াজটা ভীষণ পরিচিত লাগলো রোদ্দুরের, সেই এক ধরনের বলার ভঙ্গিমা, এক ধরনের টোন।
প্যান্টের বাঁ পকেটে রাখা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো রোদ্দুরের। “হ্যালো, রোদ্দুর রায় বলছি। আমি একটু বৃষ্টিতে আটকে পরেছি, কাছেই আছি। ঠিক আছে, আমার reshuffle করতে কোনো অসুবিধা নেই, আপনি আমার ক্লাসটা নিয়ে নিন, আমি আপনারটা নিয়ে নেবো।” রোদ্দুর এই বলে ফোনটা রাখতেই, আবার ফোনটা বেজে উঠল।
“হ্যালো”
“অনুপ, হ্যাঁ বল, এই তো ব্যস কলেজের কাছেই আটকে পরেছি রে বৃষ্টির জন্য।”
স্কটিশ এর এলুমনি মিট তাও এত বছর পর যাবো তো বটেই। হ্যাঁ, আমি তোর আগেই পৌঁছাবো, রাখি তাহলে।”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি একটু ইতস্তত করেই জিজ্ঞাসা করে বসলো। ” আচ্ছা কিছু মনে করবেন না, আমিও স্কটিশেই পড়তাম, আপনি কোন ব্যাচ?”

১৯৯৭

আপনার নামটা যেনো কি বললেন?

রোদ্দুর, রোদ্দুর রায়, কেমিস্ট্রি অনার্স।

আপনি?”

“রোদ্দুর !তুই – তুই, চিনতে পারলি না আমাকে? “

” আমি, মেঘ ।”

” ওরে বাবা! কি সাংঘাতিক কাণ্ড বল! যাক বৃষ্টিটা হয়ে একদিকে ভালোই হলো। কতদিন পর দেখা হলো বল! “

“হুমম, তা বছর পঁচিশ তো হবেই।” উত্তর দিলো রোদ্দুর।

“তোর এই কালো চশমা আর মুখ ভরা দাড়ির জন্য তো আমি তো চিনতেই পারিনি। “

“তুই কিন্তু একইরকম আছিস, একটুও বদলাস নি।”

একটু মুচকি হেঁসে মেঘ বলল “তাই নাকি?”

বৃষ্টিটা একটু ধরে এসেছে। লোকজন যাঁরা ঐ চায়ের দোকানের ত্রিপলের নীচে দাঁড়িয়ে ছিল, এদিক ওদিক করে বেরাতে চেষ্টা করছে।

“আমার মনে হয় তোর হাতে একটু সময় আছে, তাহলে একটু কফি খেলে… মন্দ হয়না বল।” অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সাথে কথা গুলো বলল মেঘ।

প্রস্তাবটা রোদ্দুরের খারাপ লাগল না। ” আমার হাতটা একটু ধরবি, অবশ্য যদি তোর বর মানা না করে।” হাসতে হাসতে বলল রোদ্দুর।

এবার রোদ্দুরের চোখের দিকে তাকিয়ে, ডান হাত দিয়ে, রোদ্দুরের বাঁ হাতটা চেপে ধরে মেঘ।

এই হাতের স্পর্শ রোদ্দুরের খুব পরিচিত, অত্যন্ত আপন। হাতটা ধরে, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কলেজের দিনগুলো রোদ্দুরের মাথায় ভিড় করতে লাগলো। ফার্স্ট ইয়ারে ফেস্ট এর দিন প্রথম আলাপ। কবিতা এসে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল, যখন ফেস্টের প্রিপারেশন করছিলাম। ভীষণ শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল মেঘ। কারোর সাথে বেশি কথা বলত না। কিন্তু যখন কারোর সাথে কথা বলতো একটা হালকা হাসি সবসময় লেগে থাকত, ওর মুখে। বব কাট চুলের সাথে, লম্বা কানের দুলে, ভীষণ সুন্দর মানাতো ওকে। কেমিস্ট্রির কচকচি থিওরির সাথে, আবৃত্তিটাও করত খুব সুন্দর।

বন্ধুত্বটা গাঢ় হওয়া শুরু করলো, যখন সেকেন্ড ইয়ার এ পড়ি। একটা ওয়ার্কশপ এর জন্য আমাদের দুজনকে যখন লিড করার সুযোগ এলো। আমাদের এই বন্ধুত্ব অনেকেরই অবশ্য ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠেছিল।

এইসব ভাবতে ভাবতে দুজনে কফি হাউসের ফার্স্ট ফ্লোর এ উপস্থিত হলো।

“এক কাপ চা আর একটা ব্রেড টোস্ট, কি তাই তো?” কোনার দিকের একটা চেয়ার টেনে, বসতে বসতেই জিজ্ঞাসা করল রোদ্দুর।

“বা: বা:, তোর তো এখনো মনে আছে দেখছি! “

“এইরকম বৃষ্টির দিনে এটাই তো তোর ফেভারিট। এতদিনে অভ্যাসটা তোর পাল্টায়নি তাহলে।”

হাসতে হাসতে মেঘ বলল, “প্রিয় খাবার হোক বা মানুষ তাঁকে কি কখন বদলানো যায়? তোর তো আবার ব্রেড অমলেট এন্ড ব্ল্যাক কফি”।

“কোথায় আছিস এখন?” প্রশ্ন করলো মেঘ।

“এই প্রেসিডেন্সি তে, বছর কয়েক হলো এসেছি , আগে ছিলাম DU। আর তুই?”

“আমি BHU তে, গরমের ছুটিতে এখানে।”

কফি তে চুমুক দিতে দিতে রোদ্দুর বললো ” আচ্ছা অরূপ কে মনে আছে তোর? কোথায় আছে জানিস?”

” ও তো এখন কোনো একটা মিউজিক কোম্পানি তে আছে। ফেসবুক একদিন দেখেছিলাম। মনে আছে, সেই সুমনের এর অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য কিভাবে ড্রাইভ মেরেছিল ? “

“সে আবার থাকবে না, কি রক্তারক্তি কাণ্ড।”

“আমাদের সেই শ্রুতিনাটক টা মনে আছে তোর।”
“তা আবার মনে থাকবে না। তাহার নামটি রঞ্জনা”
“দারুণ হিট হয়েছিল বল”।

“আর তোর সেই অনুরক্ত পথিকের কি খবর?”

“বাজে বাকিস না তো, তোরাই আবীর কে নিয়ে আজগুবি গল্প বানিয়েছিলিস।” একটু মুচকি হেসে উত্তর দেয় মেঘ। ” শুনেছি, দিল্লি তে থাকে, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টে আছে।”

“আমি একা ছিলাম, একাই আছি।”

“আর, তোর উনিটি কি করেন ?”

” আমার কোনো উনি নেই। ওটা আর এ জন্মে করা হয়ে উঠলো না।” একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল “যাঁকে বলতে চেষ্টা করেছিলাম, তাঁকে আর বলা হয়ে উঠলো না আর বিয়েটাও হলো না।”

” একবারের জন্য সাহসটা জোগাতে পারতিস, রোদ্দুর?”

কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে রোদ্দুর বললো ” যখন মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম, যে আজকে বলেই দেবো, সেদিন কেই ওই একসিডেন্টটা ঘটে গেলো। তার মাসখানেক পর তুই যখন আমাকে তোর মামার কাছে নিয়ে গেলি, সেকেন্ড অপিনিয়ন নেওয়ার জন্য, সেদিন তোর মামার কথা গুলো স্পষ্ট শুনেছিলাম মেঘ। একজন অন্ধ মানুষের ভার তোর মত একটা সুন্দর মেয়েকে, কিভাবে তুলে নিতে বলতাম বল?”

চোখের কোণাটা চিক চিক করে উঠলো মেঘের। দু হাত দিয়ে রোদ্দুরের হাতটা চেপে ধরে বলল “সেদিন মামার কথাটাই শুনলি, আমার কথাগুলো শোনার তো চেষ্টা করলি না?”

মামার সাথে কথা বলে যখন বাইরের ঘরে এলাম, তখন দেখি তুই নেই। অনেকবার ফোন করেছিলাম তোকে, ধরিস নি আমার ফোনটা। অনেক চেষ্টা করেছিলাম রোদ্দুর তোকে খুঁজে পেতে। কলেজ থেকে তোর বাড়ির ঠিকানাটা নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম তোর বাড়ি কিন্তু কেও তোর নতুন ঠিকানাটা দিতে পারলো না। “
” মামার সাথে কথা বলার পর, বাড়ি এসে আমি মা কে সব জানিয়েছিলাম। মা বলেছিল, তুই একটা অন্ধ ছেলের সাথে থাকতে পারবি সারা জীবন? আমি বলেছিলাম, “আমার হাত দুটো আজ ওর ভীষণ দরকার মা। আমার চোখ দিয়েই না হয় বাকি দুনিয়াটা দেখাবো ওকে।”

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে রোদ্দুর। তারপর আস্তে অস্তে লাঠিটা ধরে ওঠার চেষ্টা করে। মেঘ ওর হাতটা চেপে ধরে বলে “ফোন নম্বর টা দে, আবার কবে দেখা করবি?”

রোদ্দুর হাতটা সরিয়ে নেয় আর বলে ” আমাদের আর কোনোদিন দেখা হবে না মেঘ। আকাশের বুকে যেই মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে, তাকে সে ভাবেই উড়ে বেড়াতে দে, রোদের ছটায় রামধনু টা নাই বা আঁকা হলো।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *