ভালবাসি খুব
“আমাকে তুই কবে বুঝবি আর অর্ক,আদৌ কবে বলতে পারিস”!? মিঠে রোদ্দুর গায়ে মেখে পার্কের কাঠের বেঞ্চে হেলান দিয়ে একমনে অর্ক প্রাঙ্ক দেখছিল।বেশ খানিকক্ষণ প্রায় সামনে এসে অপেক্ষা করেও যখন ওর হুঁশ ফিরলো না,পেছন থেকে এসে ওর দুই কাঁধ তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে আক্ষেপ ঝরে পড়লো মিতুলের গলায়!অর্কের এমন ভাবে মোবাইলে বুঁদ হয়ে গেম খেলাতে অপেক্ষায় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল মিতুলের!এমনিতেই বাড়ি থেকে বেরুনোর সুযোগ পায় না মিতুল,আর যার জন্য আসা সেই অর্ক কিনা নির্বিকার চিতে বসে আছে!
‘ওহো এসেছিস? আয় বস, ভাবলাম দেরি হবে বুঝি’,হালকা চালে বললো অর্ক। মোবাইলের ভিডিও কল বা চ্যাটে যে মিষ্টি মিতুলকে ক্ষনিক দেখার জন্য পাগল হতো অর্ক,সে মোবাইল গেমের আকর্ষণে যেন চোখ সরাতেই পারছে না! অজান্তে মিতুলের চোখ থেকে অর্কের গলায় দু ফোঁটা জল টপ করে ঝরতেই অবাক প্রশ্ন ‘” কিরে মিতু কাঁদছিস”!?
“ডাকবি না ওই নামে কোনোদিন,তোর মিতু মরে গেছে” চোখ লাল, নাকের পাটা ফুলিয়ে হনহন করে পিছু হাঁটলো মিতুল।প্রতিটা মেয়ের কিছু প্রত্যাশা থাকে প্রিয়জনের কাছে।যতবারই গুরুত্ব সহকারে কিছু বলতে এসেছে,নয় অর্ক,বন্ধুদের কথা,ক্রিকেট, ইউটিউব নচেৎ আগডুম বাগডুম গল্প জুড়ে সময় কাটিয়ে দিতো।বাবাকে যেমন মিতুল দায়িত্ববান পুরুষ হিসাবে দেখেছে, অর্ক যেন কোনো কিছুতেই সিরিয়াস নয়! এমন আচরণ দেখে মিতুলের নিজেকে বড্ড সস্তা লাগে অর্কের উদাসীনতায়। অর্কের জন্য পরিপাটি করে সেজে এসেছিল মিতুল কিন্তু এখন ঝলমলে রোদ্দুর মনের চনমনে ভাবটা সরে গিয়ে চোখের নিচে পড়েছে এক পোঁচ চিন্তার কালি!
পরীক্ষা নিয়ে দীর্ঘ কয়েকমাস গৃহবন্দি শেষে অনেকদিন পর অনুমতি নিয়ে অল্প সময়ের জন্য নির্ভেজাল সময় কাটাতে এসেছিল মিতুল। আগেভাগে পৌঁছে কি দেখলো!অর্ক যেন অনিচ্ছায় পার্কে এসেছে,পরস্পরের প্রতি সেই টান উধাও!মিতুল সেদিনই বুঝিয়েছে,” দেখ অর্ক দুই বাড়িতেই যখন সম্পর্কটায় সায় দিয়ে আমাদের ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়েছে তখন নিজেদের কিছু পরিকল্পনা তো থাকে তাইনা”! সিগারেটের রিংধোঁয়া ছেড়ে অর্ক গা এলিয়েছে মিতুলের কোলে।ওর প্রতিবার একটাই কথা,”ধুস ওসব নিয়ে আলোচনা পরে হবে,এখন পরিবেশ,পরস্পরের সান্নিধ্য উপভোগ কর দেখি”
শীত পড়তেই শহরজুড়ে বসে যায় হরেক রঙবাহারি মেলা। রঙিন দুই প্রজাপতি মিতুল-অর্ক মিঠে রোদ্দুরে ঘুরে ডানা মেলতো ফুল প্রদর্শনী,পার্কে। কত খুনসুটি,গল্পের সাক্ষী ওরা দুজন ।আজ নিরালায় কিছু কথা শেয়ার করতে চেয়েছিল মিতুল,কিন্তু বলবে কাকে!সম্পর্কের মধ্যে কেমন যেন এসেছে উদাসীনতার মেঘ আচ্ছাদন !আজ নিজে হাতে অর্কের প্রিয় মিক্সড ফ্রাইড রাইস বানিয়েছিল মিতুল। যত দ্রুত হাঁটছে ব্যাগের মধ্যে থাকা টিফিন কৌটোর শব্দ যেন বিদ্রুপ করছে মিতুলকে।জাঁকিয়ে ঠান্ডা,কুয়াশা কেটে আজ ঝকমকে রোদ্দুর চতুর্দিকে কিন্তু মিতুলের মনের মধ্যে ভিড় করে আসা মেঘেদের আছড়ে পড়া বৃষ্টি!
গেটে বসা অভাবী ভিখারি দাদুর থালায় পরম যত্নে খাবার ঢেলে অটো চাপলো মিতুল।কানে ভাসছে তার পেছন থেকে অর্কের ডাক ! পরিস্থিতি যে এতটা হাতের বাইরে চলে যাবে ভাবেনি অর্ক, আর এখানেই আপত্তি মিতুলের, কেন অর্ক সিরিয়াস হবে না!
কাল বড়দিন,আলোর স্রোতে ভাসছে শহর। অর্কর প্রায় বার পাঁচেক ফোন কেটেছে মিতুল। কাল বন্ধুদের নিয়ে পিকনিকে যাবে অর্ক। ফোন ধরতেই এসেছে নানা অজুহাত। মিতুল স্বাভাবিক গলায় রিপ্লাই দিয়েছে। আশা ছিল অর্ক বর্ষশেষে কিছু স্পেশাল প্লান করবেই ,কিন্তু সেসব উহ্যই রইল! মিতুলের ঘরে অর্কর দেওয়া গিফ্টের ছড়াছড়ি যা বড্ড নিষ্প্রাণ লাগছে।মিতুল,পুতুল খেলতে ভালোবাসতো কিন্তু নিজেকে পুতুল ভাবতে নয়।চুপ করে খাতায় একটা কালো গোলাপ আঁকছে। দূরে হালকা গান বাজছে “ডিসেম্বরের শহরে চেনা শুভেচ্ছা চেনা সেলফোন….”।
জলে ঝাপসা হচ্ছে চোখ,আচ্ছন্ন হৃদয়! একদলা উৎকন্ঠা!কিভাবে এই অর্কের সাথে আজীবন স্যাকরিভাইজ,এভাবেই কি ধূলিসাৎ হবে মিতুলের স্বপ্ন,চলবে মেঘ রোদ্দুর মান অভিমানের লুকোচুরি?গোলাপের পাপড়িতে একমনে পেন ঘষছিল হঠাৎ দরজায় বাবার টোকা।গুমোট পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক হলো দায়িত্বশীল মানুষটার আবির্ভাবে।” বর্ষশেষে তোদের কি পরিকল্পনা মামনি”?’ “কিছুই নেই ড্যাডি, তোমাদের সঙ্গেই ভাবছি থাকবো”! উনি উছ্বাসে বললেন,”তবে তো দারুন,চল গোয়া ঘুরে আসি,অর্ক যাবে তো”!পিছনেই মিতুলের মা বললো “ওদের ঘোরার দিন কি পালাচ্ছে ,যাবে নিজেরা সারাজীবন”।সুতরাং পারিবারিক ভ্রমন প্রস্তুতি সেরে তিনজন বেরিয়ে গেলো।
এয়ারপোর্টে অর্ককে ম্যাসেজ করে সুইচ অফ করলো মিতুল”গোয়া যাচ্ছি এডভান্স নিউ ইয়ার শুভেচ্ছা রইল।” বাবাকে জড়িয়ে ধরলো রাজকন্যা।ওখানে পৌঁছে নতুন পরিবেশে বেশ ভালো লাগছিল মিতুলের।রাত্রে বাবা জানালো বাড়ির গার্ড ফোন করে জানিয়েছে অর্ক বাবু সারারাত বাড়ির বাইরে বসে ছিল,বারণ করা সত্বেও ফেরেনি।শুনে বুকটা ধড়াস করে উঠলো মিতুলের।সে অনুভব করছে এক অদৃশ্য টান।সারাদিন আজ কোথাও বেড়াতে মন চাইলো না মিতুলের।”যাচ্ছি রে অর্ক,পরশু ফিরছি,কাছে থাকলে উপেক্ষা আর কোনোদিন করবি না কথা দে?ফোনের ওপ্রান্ত থেকে অর্কের কম্পিত কণ্ঠে ভেসে এলো প্রমিস,খুব মিস করছি রে তোকে মিতু। মেঘ কেটে হঠাৎ যেন মিতুলের মন ওঠান জুড়ে আলোকিত রোদ্দুরের ছোঁয়া।
