বৈধ অবৈধ
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কানে নতুন হীরের দুলটা দেখে ভাবছিল তানু,হীরে আজ তার কানে গলায়!এতো সুখও ছিল তার কপালে! রাজীবকে বলা হয়নি সুখবরটা।বাড়ি ভর্তি লোক,প্রথম বছর বিবাহ বার্ষিকী।হরেক রকম রান্নার সুগন্ধ ভেসে আসছে।তবু রাজীবের বায়না ডিনার করবে বাইরে ওরা দুজনে।কোথায়, সেটা সারপ্রাইজ!
শাড়ি গয়না দুবাড়ি থেকেই পেয়েছে আজ।মনটায় হালকা খুশীর রেশ।সাধারণ বললে ভুল হবে, নিতান্তই গরীব ঘরের মেয়ে তানু।দেখতেও যে খুব একটা আহামরি তা নয়।লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী।বাবা সাধারণ একটা বেসরকারি চাকুরিজীবী,ওনার সব আয় মেয়ের পিছনেই চলে যেত।বাবা মায়ের বিবাহ বার্ষিকী তেমনভাবে হতে দেখেনি ও।ওর জন্মদিনে শুধু পায়েস হত।প্রতিকূলতার মাঝেই বড়ো হয়ে ওঠা।আত্মীয়স্বজনের সাহায্য নিয়ে এম এস সি,বি এড করেছে।তার পরপরই সম্বন্ধটা আসে।এতো বড়ো ঘর!বাবা মা তেমন সাহস পাচ্ছিলেন না।ছেলের বাড়ির আগ্রহ দেখে শেষপর্যন্ত বিয়েটা হয়েই গেল।
তানু গ্রামের বাঙলা মিডিয়ামের ছাত্রী।রাজীব কিন্তু নামী ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্র।বিদেশ থেকেও ডিগ্রি আনা।এখন পারিবারিক ব্যবসা চালাচ্ছে।শহরের দামী জায়গায় আকাশভেদী বাড়ি, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য যেন উপছে পড়ছে।
“আর কি দিয়েছে রে রাজীব”? মায়ের কথায় সম্বিত ফিরল তানুর।” আই ফোন আর শাড়ি “
“ওদের কথামতো চলিস মা,খুব ভালো মনের মানুষ ওনারা,তোকে সবাই খুব ভালোবাসেন।আর রাজীব. ….”? লজ্জায় মুখ নামিয়ে মুচকি হাসি তানুর মুখে।মা বুঝলেন সব।
সন্ধ্যা বেলায় নতুন শাড়ি গয়নায় বেশ লাগছিল তানুকে।বাড়ি ভর্তি লোকজন সবাই তানুকেই দেখছে।রাজীবের সাথে আলাদা কথা বলার জো নেই।আরেকটু পরেই বেরোবে ওরা ডিনারে।
ড্রাইভিং সিটে রাজীব,পাশে তানু।
“একটা কথা আছে রাজীব”
“কি?”
“আমি মা হতে চলেছি “
“তবে তো ডাবল সেলেব্রেশন,কি বলো?আগে বলোনি কেন? বাড়ির সবাই জানতো ছেলের বীরত্ব! “
লজ্জায় মাথা নিচু করলো তানু।
ডিনার থেকে ফিরে খুব ক্লান্ত লাগছিল,তাই নিজের ঘরে ফিরে ঘুমিয়ে পরলো তানু।পরদিন খুব ভোরে নিজের জন্য একটু চা বানাতে নামলো।রাজীবের মা দেখেই বলে উঠলেন, “তুই ঘরে যা,আমি অনিমাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি ” অনিমা,মানে এ বাড়িতেই থাকে।কমবেশি তানুর বয়েসী।একটা ছেলে আছে।বোর্ডিংয়ে পড়ে।বেশ প্রভাব আছে পরিবারে।শাশুড়ি মায়ের কথা শুনে বুঝলো,রাজীব রাতেই সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে।উপরে বসার খানিক পরেই চা হাতে ঢুকলো অনিমা।বেশ আবদারের সুরে বলল,”এই শরীরে তুমি ওঠানামা করোনা,আমি মাঝে মাঝে এসে দেখে যাব তোমার কি দরকার “।
যত দিন যায়, তানু ততই ঘরবন্দী হয়ে পরে।দিন মাস পেরিয়ে সন্তানের ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় হলো।ঘর আলো করে জন্ম নিল এক কন্যা।পরিবারে যেন আবার খুশীর পরব।রাজীবের আনন্দ আর ধরে না।নার্সিংহোম থেকে মেয়ে বৌ নিয়ে সোজা নিজের বাড়িতে।তানু আজ বেশ খুশী।নারীর সম্পূর্ণ সম্মান তার ঝুলিতে।বুঝি বিধাতার লিখন অন্যকিছু ছিল।
একদিন রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখে স্বামী তার পাশে নেই।এদিক ওদিক খোঁজ করার পর,আলো আঁধারিতে দেখে সিঁড়ির কোণে দাঁড়িয়ে ও আর অনিমা।ঝগড়া করছে।কানে যা ভেসে এল,তা থেকে তানু বুঝল,অনিমার সন্তানটি রাজীবের।ওর খরচাতেই পড়াশোনা করছে।ভবিষ্যতের সব খরচও রাজীব ও তার পরিবারের।অনিমারও সব দায় এই পরিবারের।তবুও অনিমা ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।তাকে নিশ্চিত না করলে,সে তানুকে সব জানিয়ে দেবে।
আকাশ ভেঙে পড়লো তানুর মাথায়।এত বড়ো পাপ লুকিয়ে এনারা বিয়ে দিয়েছেন?আর রাজীব?অপমানে লজ্জায় ঘৃণায় স্তব্ধ হয়ে গেল তানু।চুপ করে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো।দুচোখে অবিরাম জলের ধারা।কি করা উচিত তার ভেবে পাচ্ছে না! কিছুক্ষণ পর রাজীব এসে শুয়ে পড়লো।শুয়ে শুয়ে ভাবছে তানু কি করবে?হঠাৎ মানসীর কথা মনে পরলো।মেয়েকে দেখতে এসে জানিয়েছিল,এস এস সি র ফর্ম বেরিয়েছে।খুব শীঘ্রই শেষ তারিখ।কালকেই যাবে ফর্ম তুলতে।নতুন সূর্যের সাথে তার জীবনের নতুন লড়াই শুরু করবে।
