বিজয়
রামরতন বাবু ছিলেন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রতিদিন ট্রেনে করে গন্তব্যস্থলে যেতেন। প্রতিদিন যারা ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করেন তাদের নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা হয়। এইরকম দুটি অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন আমাকে।
প্রতিদিন দুটি বাচ্ছা ভিক্ষে করতে ট্রেনে উঠত। একটি ১৩-১৪ বছরের মেয়ে ও একটি ৭-৮ বছরের ছেলে। মেয়েটি চোখে দেখতে পায় না কিন্তু কন্ঠ ভারি মিষ্টি। মেয়েটি গান গেয়ে গেয়ে ভিক্ষা চাইতো এবং ছোট ছেলেটি তার হাত ধরে নিয়ে যেত। রামরতন বাবু প্রতিদিনই কিছু না কিছু খাবার ওদেরকে কিনে দিতেন। তারপর হঠাৎ বেশ কয়েকদিন ওদেরকে দেখতে পেলেন না। না দেখতে পেয়ে তিনি একটু চিন্তিত হলেন। তারপর একজনের মুখ থেকে শুনলেন গত তিনদিন আগে রাত্রে বাড়ি ফেরার সময় মনুষ্যরূপী পশুর দল দ্বারা লালসার শিকার হয়েছে মেয়েটি। এটি শোনার পর মানসিকভাবে খুব ভেঙ্গে পড়েছিলেন। যাইহোক কোন রকমে সামলে উঠেন। এই ভাবেই বেশ কয়েকটি দিন কেটে যায়।
হঠাৎই একদিন একটি ১২ বছরের বালক ট্রেনের কামরায় উঠে বলতে শুরু করল–
“নমস্কার……………
এই চলার পথে চলেছেন, চলবেন চলতে চলতে আমার কথা শুনবেন।
আর চলার পথে অনেকেই অনেক কিছু দেখেছেন,
দেখার কোন শেষ নেই যতক্ষণ না গন্তব্যস্থলে পৌঁছাচ্ছেন।
তবে এই আসা-যাওয়ার মাঝে পাশাপাশি বসে খান,
অপরকে খাওয়ান, সঙ্গে করে কিছু বাড়ি নিয়ে যান।
হ্যাঁ, আমি এনেছি টাটকা তাজা, মুচমুচে বাদাম ভাজা।”
এইভাবে ওই ছোট্ট ছেলেটি বাদাম বিক্রি করছিল। ওর বলার কায়দায় সকলে মুগ্ধ হয়ে ওর কাছ থেকে বাদাম কিনতো। রামরতন বাবু কৌতুহল বসে ছেলেটিকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ” হ্যাঁ রে, তুই কেন বাদাম বিক্রি করছিস, তোর তো স্কুলে যাওয়ার বয়স, স্কুলে না গিয়ে এইভাবে বাদাম বিক্রি করছিস কেন ?” ছেলেটি একটাই কথা উত্তর দিয়েছিল, “পেটের জ্বালায়”। ছেলেটির এই কথাটি রামরতন বাবুর হৃদয়কে ভীষণভাবে আঘাত করেছিল। ছেলেটির বিষয়ে জানবার জন্য বেশ কয়েকদিন ধরেই ওর উপর লক্ষ্য রাখছিলেন। একদিন ছেলেটি বাদাম বিক্রি করে যখন বাড়ি ফিরছে তখন তিনি তার সাথে ট্রেন থেকে নেমে তার পিছনে পিছনে যেতে শুরু করলেন। দেখলেন একটু দূরে একটা ঝুপড়ির মধ্যে ছেলেটি ঢুকলো। ঝুপড়ি পর্দা ফাঁক করে দেখলেন, ছোট্ট দুটি শিশু ও তার মা। তখন রামরতন বাবু ঝুপড়ির মধ্যে প্রবেশ করলেন। ছেলেটি রামরতন বাবুকে দেখে অবাক হয়ে বলে উঠল,” বাবু আপনি এখানে ?” রামরতন বাবু বললেন, “তোদের বাড়ি দেখতে এলাম”। ছেলেটি উত্তর দিল,” গরিবদের বাড়ি দেখার কী আছে”। তারপর রামরতন বাবু ছেলেটিকে কাছে ডেকে তার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ছেলেটি বলল, “আমার নাম বিজয়। মায়ের পেটে ছোট্ট বোন হয়েছে বলে ছেড়ে চলে গিয়েছে বাবা। দরিদ্র সংসারে অভাব মেটাতে বেছে নিয়েছি এই পথ। হোটেলে কাজ করে মা। বড়ো বোন সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। আমিও এখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। পড়াশোনার খরচ জোগানো, মায়ের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছে না। তাই আমি মায়ের পাশে খুঁটি “।
সপ্তাহে তিন দিন স্কুলে যায় আর তিন দিন ট্রেনে থাকে। স্বপ্ন রয়েছে চোখে, বোনকে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষ করবেই। পড়াশোনার খরচ আর ছোটো বোনের দুধের খরচ চালায় বিজয়। রামরতন বাবু সপ্তাহের কয়েক দিন স্কুল ছুটির পর বিজয়কে পড়াতে যেতেন। সাথে ওদের সকলের জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। কখনও মায়ের জন্য কাপড় কিংবা বোনেদের জন্য জামা। এখন বিজয় একাদশ শ্রেণীতে পড়ে। মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে খুব ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করছে। রামরতন বাবু সব সময়ের জন্য বিজয়ের পাশে আছেন। কিন্তু এই ঘুন ধরা সমাজে এখনও এইরকম মানুষ আছেন ? কুর্নিশ জানাই রামরতন বাবুকে।
প্রচন্ড মনের জোর আর প্রবল ইচ্ছা শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলেছে বিজয়। বিজয় শুধু একা নয়। এই রকম হাজারো বিজয় ছড়িয়ে রয়েছে শহরের রাস্তায়। নিঃশব্দে সকলের চোখের আড়ালে একা লড়াই করে চলেছে এই রকম জীবনযুদ্ধে। বিরামহীন লড়াই। আর আমাদের মতো তথাকথিত সভ্য মানুষেরা ইনকামের ধান্দায় তাদের নিয়ে ভিডিও করে ভাইরাল করছি , লাইক দিচ্ছি, কমেন্ট করছি। ব্যস এই পর্যন্তই। অথচ বিজয়রা আজও শোষিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত। কোথায় আমাদের মূল্যবোধ, কোথায় আমাদের মানবিকতা, কোথায় আমাদের মনুষ্যত্ব। মুখেতেই শুধু হা-হুতাশ, কাজে নয়। নিজের নিয়ে আজ আমরা এত ব্যস্ত যে, বিজয়রা বাঁচুক কিংবা মরুক, কিছুই যায় আসেনা। কিন্তু বিজয়রা মরতে পারে না। বিজয়রা হলো সাহসী নির্ভিক এক যোদ্ধা। ওরা জানে এক পাশে আছে জয়। আর অপর পাশে মৃত্যু।ওরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে–
“আমরা করবো জয়, আমরা করবো জয়,
আমরা করবো জয় একদিন
আহা বুকের গভীরে আছে প্রত্যয়
আমরা করবো জয় নিশ্চয়।”
