বাঁশির ডাক
সকালে বাঁশির শব্দে ঘুম ভাঙলো বিনীতার। বাঁশি মানে মধুর সুরেলা বাঁশি নয়। এ বাঁশি কর্কশ। ময়লা ফেলার ওয়ার্নিং দেওয়ার বাঁশি।
নতুন বউ সে। গতকাল অনেক রাত হয়েছে ঘুমাতে আর এতো সাত সকালে ঘুম থেকে ওঠাও তার অভ্যাস নেই। বিয়ের আগে বাপ -মায়ের একমাত্র আদুরে মেয়ে সে। ঘরের কুটোটি কাটার দরকার হয়নি কোনদিন তাকে। এমনকি তেষ্টার সময় ফিল্টার থেকে একগ্লাশ জলও নিজেকে নিয়ে খেতে হয়নি কখনও। তাই এখন এই কর্কশ বাঁশির শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল।
একরাশ বিরক্তিতে বিছানায় উঠে বসল সে । তারপর কোমল করপল্লব দুটি দিয়ে চোখ রগড়ে দেখল পাশে অনির্বাণ ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে তখন পর্যন্ত। আর ঘুমাবে নাই বা কেন? অত রাত অব্দি অমন পরিশ্রমের কাজ করলে ঘুম তো পাবেই। ঘুমের আর দোষ কোথায়!
বিনীতা যে এতো আদরে আদরে তাকে এতো রাত পর্যন্ত এতোবার পাগল করে দেবে তাই বা কে আর জানত। বিনিময়ে বিনীতারও ষোলো আনার জায়গায় আঠারো আনা প্রাপ্তি ঘটেছে। তাই মনটা বিরক্তিতে ভরে গেলেও সে মনে মনে হাসল খুব।।
ঠেলা মেরে ডাকল- অনি, এই অনি । বলি শুনছো..!
ঘুম জড়ানো স্বরে ধড়ফড় করে উঠে বসল সে।
বলল- কি হয়েছে সোনা। ডাকছো কেন?
দেখ, নীচে বোধহয় সাফাইওয়ালা এসেছে। বাঁশি বাজাচ্ছে তো।
–তা তুমি কি ময়লার প্যাকেটটা একটু নীচে নামিয়ে দিলেই তো পারতে ?
–কি বললে; আমি যাবো ময়লা ফেলতে !
— কেন ময়লা ফেলতে গেলে কি মহাভারত অশুদ্ধি হবে?
ওদের দুজনের মধ্যে কে ময়লা ফেলবে সেই নিয়ে প্রেমের বাদানুবাদ চলতে থাকুক। আমরা বরং ইত্যবসরে ওদের পরিচয় আর সেইসাথে বিয়ের ব্যাক গ্রাউন্ডটা জেনে নিই কি বলেন।
প্রথমে আসি আমাদের এই গল্পের নায়িকা বিনীতার কথায়। বিনীতার পুরো নাম বিনীতা মোদক। বাবা কোলকাতার ডাকসাইটে বিজনেসম্যান মিঃ শশিকান্ত মোদক। বালিগঞ্জে মেইন রাস্তার উপর যে প্রাসাদোপম ছয়তলা হোয়াইট কালারের বাড়ি সেটাই তাদের। মা মিসেস মধুরিমা মোদক। সোসাইটির সব্বাই মিসেস মোদককে এক ডাকে চেনে। সারাবছর বিভিন্ন রকম সামাজিক কর্মকান্ডে সারাদিন সতত ব্যস্ত থাকেন। আর এসব ব্যাপারে খরচে তিনি উদার হস্ত। আসলে মোদকবাবুর রয়েছে অঢেল সম্পদ আর উত্তরাধিকারী বলতে একটামাত্র কন্যা বিনীতা। তাই সেই সম্পদ ধ্বংস করার জন্য তো কাউকে লাগবে।মিসেস মোদক সুচারু ভাবে সেই কাজ টি করছেন।
বিনীতার দেখাশোনা করার জন্য বাড়িতে একগাদা লোকজন। তাই সেদিকে তাঁর নজর না দিলেও চলবে এই বিবেচনায় তিনি উক্ত কাজ করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন।
বিনীতা চিরদিনই ভীষণ রকমের মেধাবী। কোনোদিনও কোনো ক্লাশে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয় নি। আর সে কারণেই শশিকান্তবাবু তাকে নিয়ে মনে মনে বেশ উচ্চাশা পোষন করতেন । তাঁর সে ইচ্ছাতে যে এরকম ভস্ম ঢালিয়া দেবে তা তাঁর চরম শত্রুও কল্পনা করে নাই।
স্কুলেরপাঠ শেষ করার পর বিনীতা বা্লিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে ভর্তি হল। ইচ্ছা এখানে পাঠ সমাপনের পর রসায়ন নিয়ে গবেষণা করে মাদাম কুরীর মতো বিশ্বের দুয়ারে ভারতের নাম উজ্জ্বল করবে।
গল্পের নায়ক অনির্বাণ দেখিতে কন্দর্পনারায়ণ। তার পিতা গোকুল মুখুজ্জে রাইটার্স বিল্ডিং এর এক লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক। বাস জগুবাবুর বাজারের কাছে একটা দু কামরার ভাড়া বাড়িতে।অনির্বাণেরা চার ভাই আর তিন বোন। আর ওই অত গুলো মানুষের দুবেলা উদরপূর্তি করতেই গোকুলবাবুর জিভ বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়, তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা সে দূর কি বাত। অনির্বাণ অনেক কষ্টে টেনে টুনে মাধ্যমিক পাশটুকু করে আর তারপর একটা ছোটো লেদ কাড়খানায় কাজ জোগাড় করে নিয়েছিলো।
এভাবে দিন গঙ্গার স্রোতের মতো সুন্দর বয়ে যাচ্ছিল। একদিন কাজের শেষে অনির্বাণ কি কারনে যেন বিনীতার সায়েন্স কলেজের পাশ দিয়ে বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছিল কোন একটা দরকারে। এমন সময় দ্যাখে কি কয়েকটা ষন্ডা মতো ছেলে একটা মেয়েকে জোর করে একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মেয়েটার আর্ত চিৎকার শুনেও কেউই তাদের বাধা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছে না। অনির্বাণ কাল বিলম্ব না করে নিজের কি হবে তা না ভেবে মেয়েটিকে রক্ষা করার চেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ছুরিকাহত হয়। গুণ্ডাগুলো হয়তো ভেবেছিল কোনও বাধাই আসবে না। আচমকা এ রকম রক্তারক্তি কাণ্ড দেখে এবং দু একজন মানুষ কে ছুটে আসতে দেখে অপহরণের ভাবনায় ইতি টেনে পিঠটান দিল। সেই মেয়েটি তখন সেই ছুটে আসা মানুষদের সহায়তায় ছেলেটিকে কাছাকাছি একটা নার্সিং হোমে ভর্তি করল এবং নিজস্ব বিবেকের টানে ভর্তি থাকা ছেলেটির খোঁজ খবর নিতে গিয়ে মদনদেবের শরে আহত হয়ে ছেলেটির প্রেমে পড়ে গেল। সেই মেয়েটি যে এই গল্পের নায়িকা বিনীতা তা বুঝে নিতে পাঠককূলের নিশ্চয়ই কোনো অসুবিধা হয় নি।
তারপর যা হওয়ার ছিল তাই বা সহজে হল তা নয়। শশিকান্তবাবু প্রথমে চেয়ে ছিলেন কিছু থোক টাকা দিয়ে মেয়ের রক্ষাকর্তার হাত থেকে মেয়েকে রক্ষা ক্রবেন।কিন্তু মেয়ের একগুঁয়ে মনোভাব আর জিদের কাছে হার মেনে ছেলেটিকে নিজের ব্যবসার একটা কাজে নিযুক্ত এবং ঘর জামাই রাখলে সোসাইটিতে মধুরিমাদেবীর মানহানি হবে তাই শরৎবসু রোডে অবস্থিত দ্বিতল বাড়িসহ কন্যা সম্প্রদান করেছিলেন।
যাইহোক তারপর তাদের দুজনের মধ্যে পরদিন থেকে কে ময়লা ফেলেছিল তা অব্দি খোঁজ আমি আর নিই নি আর পাঠককূলেরও নিশ্চয়ই আগ্রহ নেই।
