প্রাপ্তি
“কী গো, কোথায় গেলে, শুনতে পাচ্ছো?
তাড়া-তাড়ি আসো, একটা খুব ভালো খবর দেওয়ার আছে।”
প্রবীর বাবু প্রায় এক নিঃশেষে কথা গুলো বলে গেলেন। এমনিতে উনি খুব নম্র ও ধীরে কথা বলতে পছন্দ করেন কিন্তু আজ তিনি ভীষণ ভাবেই উত্তেজিত ।
বাড়িতে ঢোকার মুখে বাঁদিকের ঘরটাতে তিনি থাকেন। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ইনস্টিটিউশনের ইতিহাসের শিক্ষক।
শুরুর দিন থেকে আজও পর্যন্ত সাদা ধুতি আর সাদা পাঞ্জাবি, এই পোশাকেই তিনি স্কুলে যেতে অভ্যস্ত। ছোটবেলায় টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার পর, তার চোখে আর পায়ে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ায় তাকে একটা মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরতে হয়, আর স্ক্র্যাচ এ ভর দিয়ে চলতে হয়। আজ বাড়ি ফিরে এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন যে হাতের স্ক্র্যাচটা খুলে, প্রায় কোনো কিছুর সাপোর্ট না নিয়েই, সুন্দর একটা হাসি মুখে আয়নাটার দিকে তাকিয়ে আছেন।
“কি হয়েছে গো? আরে পরে যাবে তো! এত আনন্দ তোমাকে আগে তো কখনও পেতে দেখিনি!”
“সুজনের কথা মনে আছে তোমার?”
“সুজন?” একটু চিন্তা করে বললেন “ঐ ছেলেটা কি, যে তোমার কৌটো থেকে একবার নস্যি বের সারা ক্লাসে উড়িয়ে দিয়েছিল?”
“একদম ঠিক ধরেছো”।
“জানো, আজকে আমি যখন স্কুলে ঢুকতে যাবো, একটা পুলিশের গাড়ি আর তার পিছনে একটা সাদা গাড়ি হর্ন দিতে দিতে স্কুলের গেটের সামনের ফুটপাথটার পাশে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ করে এইরকম একটা গাড়ি দাঁড়াতে দেখে আমিও একটু দাঁড়িয়েই গেলাম। দেখি একটা কোর্ট-টাই পরা ছেলে, গাড়ি থেকে নেমে আমার দিকে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে। কিছু বোঝার আগেই একটা প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলো “স্যার কেমন আছেন? আমাকে চিনতে পারছেন? আমি সুজন, ১৯৮৭ ব্যাচ।” ওর কাঁধে হাতটা রাখতে যাবো ততক্ষণে দেখি তিনটে পুলিশ ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি তো একটু হকচকিয়ে গেছি, ও তখন পুলিশ গুলোকে বলল “আপনারা গাড়িতে গিয়ে বসুন, আমি আসছি।”
আমি বললাম “সব ঠিক আছে তো”?
ও তখন হেঁসে বলল ” হ্যাঁ স্যার, ওরা আসলে আমার সিকিউরিটি র দায়িত্ব এ নিযুক্ত। ” প্রথমটায় বুঝতে পারি নি। তারপর ও নিজেই বলল “স্যার, এখন আমি বাঁকুড়ার ডি.এম.; তাই নিয়ম মেনে…।” মাথাটা নীচু করে একটু
লজ্জা আনত মুখেই কথাটা বলল। “জানেন তো, UPSC র পরীক্ষাতে আমার কিন্তু মেইন সাবজেক্ট ছিল ইতিহাস।” এই কথাটা শুনে আর ওকে দেখে আমার যে কি আনন্দ হলো তোমাকে কি বলব”।
স্ত্রী তখন বললেন “সে তো খুব ভালো কথা, সারা জীবন ছাত্র ছাত্র করেই তো গেলে। জামা কাপড় ছাড়ো, চা এনে দিচ্ছি।”
পরদিন সকালে, আবার রোজকারের মতোই বাড়ির গেটের সামনে ঠিক সাড়ে ন’টার সময় রিক্সা এসে দাঁড়িয়েছে। প্রবীর বাবু সেই পরিচিত সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে উঠে বসলেন রিক্সাতে। আজ প্রথম ক্লাসটা আছে নাইন- বি তে। রোল কল করতে করতে হঠাৎ চোখে পড়ল নবীন আজ চার দিন ধরে স্কুলে আসছে না। “হ্যাঁরে তোরা কেউ জানিস নবীন এই চারদিন ধরে স্কুলে আসছে না কেনো?” প্রায় সব বাচ্চাই মাথা নেড়ে ‘ না ‘ বলে দিলো। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে পড়াতে শুরু করলেন, প্রবীর বাবু।
স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রবীর বাবু, দুলাল অর্থাৎ তার রিক্সা চালককে বললেন “আজ আমাকে একটু বাঙাল পাড়া দিয়ে নিয়ে চলো তো”। দুলাল কোনো কথা না বলে, কেবল ঘাড় ঘুরিয়ে রিক্সাটা চালাতে শুরু করলো। বাঙাল পাড়ার মুখের গলিতে নেমে, ধীরে ধীরে স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে, তিনি একটা বাচ্চাকে নবীনের বাড়িটা কোন দিকে জানতে চাইলে, সে একটা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলো। প্রবীরবাবু ধীরে ধীরে নবীনের বাড়ির গেটের সামনে এসে “নবীন ” বলে দুবার ডাক দেওয়াতেই নবীনের মা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে, প্রবীরবাবু নিজের পরিচয় দেওয়াতে ভদ্রমহিলা ভীষণ একটা অস্বস্তিতে পরে গেলেন, কি করবেন, কোথায় বসতে দেবেন কিছুই যেনো বুঝে উঠতে পারলেন না। প্রবীর বাবু খুব সহজেই ওনার অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন “আপনাকে অতো ব্যস্ত হতে হবে না, আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমি এটা জানার জন্য এলাম, যে নবীন গত ৪ দিন ধরে স্কুলে আসছে না, ওর কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে? শরীর ঠিক আছে তো?” ভদ্রমহিলা, প্রবীর বাবুকে নমস্কার জানিয়ে বললেন “খোকা, এমনি ঠিক আছে, কিন্তু ওর বাবার তিন দিন ধরে জ্বর ছিল তাই বাজারে যেতে পারেনি। বেচা -কেনার কাজটা ওকেই করতে হচ্ছিলো, তাই আর যেতে পারে নি, তবে কাল থেকে যাবে মাষ্টারমশাই। ওর বাবার জ্বরটা আর আসেনি, এখন একটু ভালো।” প্রবীর বাবু ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। অভাবের সংসারে কোনো মতে নিত্য জিনিস কেনাবেচা করে দিন গুজরান এনারা। বাবার অসুস্থতার কারণে, স্বাভাবিকভাবেই ওই ছোট ছেলেটাকে বাজারে গিয়ে বসতে হয়েছে, সংসারের খরচ চালানোর জন্য।
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, নবীনের মা’কে বললেন “ঠিক আছে, চিন্তা করবেন না। উনি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন ; আর কাল থেকে নবীন কে স্কুলে পাঠিয়ে দেবেন । এই কদিনে যেটা পড়ানো হয়েছে, সেটা আমি ওকে সব বুঝিয়ে দেবো। ” এই বলে প্রবীর বাবু, ভদ্রমহিলাকে নমস্কার জানিয়ে আবার ধীরে ধীরে, গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রিক্সার দিকে হাঁটতে লাগলেন ।
নবীন পরের দিন স্কুলে এসে, ক্লাসে ঢোকার আগে টিচার্স রুমে প্রবীর বাবুর সাথে দেখা করতে গেলো। প্রবীর বাবুকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল “বাবা এখন ভালো আছে, আজ থেকে কাজে গেছে। আমিও তাই স্কুলে আসতে পারলাম।”
“ঠিক আছে, কোনো অসুবিধা নেই। স্কুল ছুটি হওয়ার পর, আমার কাছে তিন দিন বসবি, পড়াগুলো সব বুঝিয়ে দেবো, এখন ক্লাসে যা”
নবীন ঘাড় নেড়ে ক্লাসে চলে গেলো।
কয়েকদিন পরেই পুজোর ছুটি পরে গেলো।
স্কুল খুলল ভাইফোঁটার পর। চারদিন ক্লাস হওয়ার পর, প্রবীর বাবু আবার লক্ষ্য করলেন, নবীন স্কুলে আসছে না। মনে মনে স্থির করলেন, আজ আবার একবার বাড়ি ফেরার পথে ওর বাড়ি হয়ে যাবে।
নবীনের বাড়ির সামনে গিয়ে দু’বার ডাক পারলেন, “নবীন, নবীন; বাড়ি আছিস?”
গলার আওয়াজ টা নবীনের মা’ এর কাছে খুব পরিচিত। কিছু মানুষ আমাদের মধ্যে এমন থাকেন যাদের একটা উপস্থিতি বা একটা কথা জীবনে অনেকটা দাগ কেটে যায়। এমন কোনো দিন ছিল না, যেদিন নবীন স্কুল থেকে ফিরে প্রবীর বাবুর গল্প করতো না।
প্রবীর বাবু স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। ইতিহাসে পি.এইচ. ডি করেছেন, বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং ড. রাজেন্দ্র লাল মিত্রর ছেলে। চেষ্টা করলে কোনো বড় কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতে পারতেন কিন্তু তার ধারণা, মানুষ গড়ার জন্য স্কুল হলো সবচেয়ে সঠিক জায়গা। ইতিহাসের শিক্ষক হলেও অঙ্ক থেকে সংস্কৃত সব বিষয়েই ছিল তার অগাধ পাণ্ডিত্য। কানমলা দেওয়া ছাড়া, কোনো দিন কোনো ছাত্রের গায়ে হাত দিতেন না। স্বল্পভাষী মানুষটি ক্লাসে পড়ানোর বিভিন্ন জটিল বিষয়গুলোকে ছবির মত তুলে ধরতেন।
নবীনের মা ঘর থেকে বাইরে বেড়িয়ে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। দেখে বেশ বিধ্বস্ত লাগছিল। প্রবীর বাবুর কেমন যেনো একটা অস্বস্তি হতে লাগলো। আস্তে করে জিজ্ঞাসা করলেন “নবীন স্কুলে আসছে না, তাই…।”
মহিলার হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন। “স্যার, নবীন তো আর কোনো দিন স্কুলে যাবে না। ও আমাদের সবাই কে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে।”
প্রবিরবাবুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
“বিজয়ার পরের দিন বিকাল থেকে মাথায় খুব যন্ত্রণা শুরু হলো। হাসপাতালে নিয়ে গেলুম, সব পরীক্ষা করে ডাক্তার বাবু বললেন ‘ আর কিছু করার নেই, অনেক দেরি হয়ে গেছে। সাত দিনের মধ্যে সব…” বলতে বলতে চোখের জল মুছতে লাগলেন।
প্রবীরবাবু কিছুক্ষণের জন্য নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আর কোনো কথা ন বলে আস্তে আস্তে মুরতে যাবেন, নবীনের মা বলল “স্যার একটু দাঁড়ান”।
ঘর থেকে একটা কাগজের রোল নিয়ে এসে, প্রবীর বাবুর হাতে দিয়ে বললেন “আপনার একটা চাবি এঁকেছিল হাসপাতালের বিছানায় বসে বসে, বলেছিল “মা, দেখবে এই ছবিটা যখন স্যার কে দেবো, স্যার কেমন চমকে যাবে।”
প্রবীরবাবু, ছবিটা ডান হাতে নিয়ে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরলেন, আর টপটপ করে দু ফোঁটা জল এসে পড়ল ছবিটার উপর।
