(১)
সে আজ অনেক দিনের কথা
কতই বা তার বয়স তখন ছিল
তা বড় জোর হতেও পারে
পনেরো নয়তো বা এই ষোলো
গাঁয়ের দেশে এই বয়সে
সব মেয়েরাই হাঁটুর পড়ে
কাপড় পড়ে
দেখতে যেনো দিব্যি নারী
স্বাস্থ্যবতী এক যুবতী
গাঁয়ের মেয়ে পদ্মাবতী
পদ্মাবতীর চলন চপল
হেলায় লুটায় রঙীন আঁচল
ঘাড় ঘুরিয়ে যেনো বিহগ হাসে
তেঁতুল গাছে, ক্ষেতের পাশে
পদ্মাবতী মুক্ত মনে, শিউলি তোলে
দোলনা দোলে আম বাগানে
ছাগল ছানা চোখ বুজে নেয়, সরল কোলে
পদ্মাবতীর জীবন চলে
এমনিতর সহজ চালে
( ২)
পদ্মাবতীর ছিল না চালচুলো
বাপের ভিটা, মার মমতা
বাপ, মা মরা পদ্মাবতী
জন্ম থেকেই স্বজন হারা
গাঁয়ের সবাই বলেছিলো “ডাইনি মেয়ে”
জন্ম মাগীর বাপ, মা খেয়ে
এর চেয়ে তোর মরণ ভালো
যাবি কোথায়? খাবিই বা কি
আজ তারা পদ্মাবতীর অঙ্গ দেখে
জল ফেলে দেয় জিভের থেকে
দু – এক ফোঁটা
করে না আর গালমন্দ
কেবল জানে গতরখানা, দিব্যি খাসা
অন্ধকারে ঝোপে – ঝাড়ে, শুধায় ডেকে
পদ্মা রে তোর দুঃখ দেখে বুক ফেটে যায়
আয় সোনা মেয়ে এই বুকে আয়
পুশিয়ে দেবো, গড়িয়ে দেবো ঝুমকো কানের দুল
ভরিয়ে দেবো গন্ধ তেলে
পদ্মা রে তোর গহন কালো চুল
কেউ বা আবার আড়াল থেকে
ফাঁকের থেকে ফিকির খোঁজে
পদ্মাবতী এই সমাজের
মন্দ কাজের নিন্দা বোঝে
তাই তো এসব জন্তু থেকে
নিজের শরীর বাঁচিয়ে রাখে
হিংস্র শ্বাপদ শাখে শাখে ,পদ্মা চলে পাতায় পাতায়
পদ্মাবতীর জীবন চলে , এমনিতর বিপন্নতায়
(৩)
পদ্মা যে আজ বেজায় খুশি
আনন্দে তার পা পড়ে না
শহর থেকে ফিরছে সে আজ
পদ্মা যে তার নাম করে না
তাই তো সে শুধায় বামুন মাকে
দেখেছো কি আসতে তাকে
বাহাত্তরের বামুন মাও, রসিক মানুষ সকল বোঝে
বললো হেসে, এসেই যে বেড়িয়েছে সে
সুন্দরী এক মেয়ের খোঁজে
পদ্মা তাকে মুখ ভেংচিয়ে ,
দৌঁড়ে পালায় সেখান থেকে
মাঠ পেরিয়ে, বিল ডিঙিয়ে
দু চোখ খোঁজে শুধুই তাকে
পদ্মাবতীর জীবনে আজ
প্লাবন আসে, সাগর ডাকে
(৪)
ধনীর ছেলে গঙ্গাধরে
গাঁয়ের সবাই সমঝে চলে
ব্যবসা তাদের, শহর পাড়ে
জহর কেনে, প্রহর বেঁচে
গাঁয়ে ও তাদের অনেক জমি
জনা দশেক ভাগের চাষী
পুকুর সহ ঠাকুর দালান
তারাই গ্রামের পূরবাসী
জমিদারের উপস্থিতে, তারা গ্রামের সম্মৃদ্ধ প্রজা
নইলে তারাই এই ভূতের গাঁয়ে , অর্থলোভী ক্রুদ্ধ ওঝা
সবাই জানে পদ্মাবতী, গঙ্গাধরের সেবাদাসী
পদ্মা বলে গঙ্গাধরে, সত্যি তোকে ভালোবাসি
(৫)
সময় তখন বিকেল বিকেল
আকাশ যেনো সিঁদুর গোলা
বিহগ ফেরে আপন নীড়ে
পদ্মা চলে রাস্তা চিড়ে
পাঁচিল ভাঙা পেরিয়ে এসে
পদ্মা ঢোকে পাটের ক্ষেতে
এখানেই আজ গঙ্গাধরের, কথা ছিলো দেখা করার
আগের বারেও এখানেতেই, হয়েছিল মধুরমিলন
গঙ্গা তাকে বলেছিলো আসছে বছর সঙ্গে করে
নিয়ে যাবে সেই শহরে
যেখানে তার মস্ত বাড়ি, দাসদাসী আর মোটর গাড়ি
ফটোক সেবার তুলেছিল বলেছিলো রাখবে কাছে
শহর গিয়ে কাজের ফাঁকে
তাকেই ভুলে যায় না পাছে
আলোর ঝলক বুকের মাঝে
পদ্মাবতীর মনেও আছে
(৬)
আকাশ ক্রমে অন্ধকারে
গা ঢাকা দেয় পুকুর পাড়ে
ঝিঁঝিঁ ডাকে, পদ্মা ক্ষেতে
অধীর আকুল অপেক্ষাতে
গঙ্গাধরের নেই কো দেখা
পদ্মা তবু ও প্রতীক্ষাতে
নির্বিচারে, নির্বিকারে রাত্রি বাড়ে অন্ধকারে
হায় রে পদ্মা, পদ্মাবতী
গঙ্গা যে তোর আসবে না রে।
(৭)
এমন সময় ক্ষেতের পাশে
শোনা গেলো পায়ের আওয়াজ
পায়ের সাথে গলার এবং
গলার সাথে বলার আওয়াজ
কি বলে তা যায় না বোঝা
ক্ষেতের ভিতর ঝিঁঝিঁর ডাকে
শিউরে ওঠে পদ্মাবতী
তবে কি কেউ ডাকছে তাকে
চুপটি করে ঘাপটি মেরে, পদ্মা কাঁপে অন্ধকারে
যেমন কাঁপে হরিণ শাবক, বাঘের ভয়ে নদীর পাড়ে
অন্ধকারের বক্ষ চিরে, তীব্র আলোর ঝলকানিতে
উন্মোচিত পদ্মাবতীর আব্রু,
সায়ায় যে তার পলকা ফিতে
নির্মম সেই অন্ধকারে, মাতলো কিছু হিংস্র শ্বাপদ
ভয়াল ময়াল পেশির চাপে, পদ্মাবতীর অঙ্গ কাঁপে
আর কিছু তার নেই মনে নেই,
হারিয়ে গেলো অন্ধকারে
বনের এবং মনের গভীর, নির্জনে সেই তেপান্তরে
(৮)
প্রলয় শেষে পদ্মাবতী, আসাড় দেহে ক্লান্ত চোখে
দেখেছিল খানিক দূরে গঙ্গাধর
আর গঙ্গাধরের সঙ্গে কজন
মিটমিটিয়ে হাসছিল যে
পদ্মাবতীর আপন, স্বজন
ঘেন্না এবং কান্না এসে পদ্মাবতী চোখ বুঝে দেয়
অন্ধকারে গঙ্গা তখন বুক পকেটে নোট ভরে নেয়
আর তখনই পদ্মাবতীর
জ্বললো চিতা জীবদ্দশায়
(৯)
অন্ধকারে চললো গাড়ি
পদ্মা চলে শ্বশুর বাড়ি
রইলো পড়ে তেঁতুল গাছ আর
গাছের ডালের দোলনা খানা
ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ করে
যাচ্ছে পদ্মা রাত্রি গভীর
স্তব্ধ চোখে ছাগল চানা
নিঝুম নিবিড় অন্ধকারে
পদ্মা চলে তেপান্তরে, যাচ্ছে পদ্মা ফিরবে না রে
অন্ধকারে রাত্রি বাড়ে , রাত্রি বাড়ে
