Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » দুর্গ রহস্য – ব্যোমকেশ বক্সী || Sharadindu Bandyopadhyay » Page 16

দুর্গ রহস্য – ব্যোমকেশ বক্সী || Sharadindu Bandyopadhyay

পাণ্ডে বলিলেন‌, ‘তল্লাসী পরোয়ানা আছে‌, আপনার বাড়ি খানাতল্লাস করব। ওয়ারেন্ট দেখতে চান?’

রামকিশোর ভীত পাংশুমুখে চাহিয়া রহিলেন‌, তারপর ভাঙা গলায় বলিলেন‌, ‘এর মানে?’

পাণ্ডে বলিলেন‌, ‘আপনার এলাকায় দুটো খুন হয়েছে। পুলিসের বিশ্বাস অপরাধী এবং অপরাধের প্রমাণ এই বাড়িতেই আছে। আমরা সার্চ করে দেখতে চাই।’

রামকিশোর আরও কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া ‘বেশ‌, যা ইচ্ছে করুন—বলিয়া তাকিয়ার উপর এলাইয়া পড়িলেন।

‘ডাক্তার!’

ডাক্তার ঘটক প্রস্তুত ছিল‌, দুই মিনিটের মধ্যে রামকিশোরকে ইনজেকশন দিল। তারপর নাড়ি টিপিয়া বলিল‌, ‘ভয় নেই।’

ইতিমধ্যে আমি জানোলা দিয়া উঁকি মারিয়া দেখিলাম‌, বাহিরে পুলিস গিসগিস করিতেছে; সিঁড়ির মুখে অনেকগুলা কনস্টেবল দাঁড়াইয়া যাতায়াতের পথ বন্ধ করিয়া দিয়াছে।

ইনস্পেক্টর দুবে ঘরে আসিয়া স্যালুট করিয়া দাঁড়াইল, ‘সকলে নিজের নিজের ঘরে আছে, বেরুতে মানা করে দিয়েছি।’

পাণ্ডে বলিলেন‌, ‘বেশ। দু’জন বে-সরকারী সাক্ষী চাই। অজিতবাবু্‌, ব্যোমকেশবাবু্‌, আপনার সাক্ষী থাকুন। পুলিস কোনও বে-আইনী কাজ করে কি না আপনারা লক্ষ্য রাখবেন।’

মণিলাল এতক্ষণ আমাদের কাছে দাঁড়াইয়া ছিল, বলিল, ‘আমিও কি নিজের ঘরে গিয়ে থাকব?’

পাণ্ডে তাহার দিকে ফিরিয়া বলিলেন‌, ‘মণিলালবাবু! না চলুন‌, আপনার ঘরটাই আগে দেখা যাক।’

‘আসুন।’

পাণ্ডে‌, দুবে‌, ব্যোমকেশ ও আমি মণিলালের অনুসরণ করিয়া তাহার ঘরে প্রবেশ করিলম। ঘরটি বেশ বড়‌, একপাশে খাট‌, তাছাড়া আলমারি দেরাজ প্রভৃতি আসবাব আছে।

মণিলাল বলিল‌, ‘কি দেখবেন দেখুন।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘বেশি কিছু দেখবার নেই। আপনার দুটো ফাউন্টেন পেন আছে‌, সেই দুটো দেখলেই চলবে।’

মণিলালের মুখ হইতে ক্ষণকালের জন্য যেন একটা মুখোশ সরিয়া গেল। সেই যে ব্যোমকেশ বলিয়াছিল‌, গর্দভচমাবৃত সিংহ‌, মনে হইল সেই হিংস্ৰ শ্বাপদটা নিরীহ চমবিরণ ছাড়িয়া বাহির হইল; একটা ভয়ঙ্কর মুখ পালকের জন্য দেখিতে পাইলাম। তারপর মণিলাল গিয়া দেরাজ খুলিল; দেরাজ হইতে পাকারের কলমটি বাহির করিয়া দ্রুতহস্তে তাহার দুদিকের ঢাকনি খুলিয়া ফেলিল; কলামটাকে ছোরার মত মুঠিতে ধরিয়া ব্যোমকেশের পানে চোখ তুলিল। সে-চক্ষে যে কী ভীষণ হিংসা ও ক্ৰোধ ছিল তাহা বৰ্ণনা করা যায় না। মণিলাল শ্বদন্ত নিষ্ক্রান্ত করিয়া বলিল‌, ‘এই যে কলম। নেবে? এস‌, নেবে এস।’

আমরা জড়মূর্তির মত দাঁড়াইয়া রহিলাম। পাণ্ডে কোমর হইতে রিভলবার বাহির করিলেন।

মণিলাল হায়েনার মত হাসিল। তারপর নিজের বামহাতের কত্তিজর উপর কলমের নিব বিঁধিয়া অঙ্গুষ্ঠ দ্বারা কালিভরা পিচকারিটা টিপিয়া ধরিল।

ব্যোমকেশ রামকিশোরবাবুকে বলিল‌, ‘দুধ কলা খাইয়ে কালসাপ পুষেছিলেন। ভাগ্যে পুলিসের এই গুপ্তচরটা ছিল তাই বেঁচে গেলেন। কিন্তু এবার আমরা চললাম‌, আপনার আতিথ্যে আর আমাদের রুচি নেই। কেবল সাপের বিষের শিশিটা নিয়ে যাচ্ছি।’

রামকিশোর বিহ্বল ব্যাকুল চক্ষে চারিদিকে চাহিতে লাগিলেন। ব্যোমকেশ দ্বার পর্যন্ত গিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইল‌, বলিল‌, ‘আর একটা কথা বলে যাই। আপনার পূর্বপুরুষেরা অনেক সোনা লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। সে সোনা কোথায় আছে আমি জানি। কিন্তু যে-জিনিস আমার নয় তা আমি ছুঁতেও চাই না। আপনার পৈতৃক সম্পত্তি আপনি ভোগ করুন। —চলুন পাণ্ডেজি। এস অজিত।’

অপরাহ্নে পাণ্ডেজির বাসায় আরাম-কেন্দারায় অর্ধশয়ান হইয়া ব্যোমকেশ গল্প বলিতেছিল। শ্রোতা ছিলাম। আমি‌, পাণ্ডেজি এবং রমাপতি।

‘খুব সংক্ষেপে বলছি। যদি কিছু বাদ পড়ে যায়‌, প্রশ্ন কোরো।’

পাণ্ডে বলিলেন‌, ‘একটা কথা আগে বলে নিই। সেই যে সাদা গুড়ো পরীক্ষা করতে দিয়েছিলেন‌, কেমিস্টের রিপোর্ট এসেছে। এই দেখুন।’

রিপোর্ট পড়িয়া ব্যোমকেশ ভ্রূকুঞ্চিত করিল—’Sodium Tetra Borate—Borax‌, মানে সাধু সোহাগা কোন কাজে লাগে? এক তো জানি‌, সেনায় সোহাগা। আর কোনও কাজে লাগে কি?

পাণ্ডে বলিল‌, ‘ঠিক জানি না। সেকালে হয়তো ওষুধ-বিষুধ তৈরির কাজে লাগত।’

রিপোর্ট ফিরাইয়া দিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘যাক। এবার শোনো। মণিলাল বাইরে বেশ ভাল মানুষটি ছিল‌, কিন্তু তার স্বভাব রাক্ষসের মত; যেমন নিষ্ঠুর তেমনি লোভী। বিয়ের পর সে মনে মনে ঠিক করল শ্বশুরের গোটা সম্পত্তিটাই গ্ৰাস করবে। শালদের কাছ থেকে সে সদাব্যবহার পায়নি‌, স্ত্রীকেও ভালবাসেনি। কেবল শ্বশুরকে নরম ব্যবহালে বশ করেছিল।

‘মণিলালের প্রথম সুযোগ হল যখন একদল বেদে এসে ওখানে তাঁবু ফেলল। সে গোপনে তাদের কাছ থেকে সাপের বিষ সংগ্ৰহ করল।

‘স্ত্রীকে সে প্রথমেই কেন খুন করল। আপাতদৃষ্টিতে তা ধরা যায় না। হয়তো দুর্বল মুহুর্তে স্ত্রীর কাছে নিজের মতলব ব্যক্তি করে ফেলেছিল, কিম্বা হয়তো হরিপ্রিয়াই কলমে সাপের বিষ ভরার প্রক্রিয়া দেখে ফেলেছিল। মোট কথা‌, প্রথমেই হরিপ্রিয়াকে সরানো দরকার হয়েছিল। কিন্তু তাতে একটা মস্ত অসুবিধে‌, শ্বশুরের সঙ্গে সম্পর্কই ঘুচে যায়। মণিলাল কিন্তু শ্বশুরকে এমন বশ করেছিল যে তার বিশ্বাস ছিল রামকিশোর তার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দেবেন না। তুলসীর দিকে তার নজর ছিল।

‘যা হোক‌, হরিপ্রিয়ার মৃত্যুর পর কোনও গণ্ডগোল হল না‌, তুলসীর সঙ্গে কথা পাকা হয়ে রইল। মণিলাল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগল‌, সম্পর্কটা একবার পাকা হয়ে গেলেই শালাগুলিকে একে একে সরাবে। দু’বছর কেটে গেল‌, তুলসী প্রায় বিয়ের যুগ্য হয়ে এসেছে‌, এমন সময় এলেন ঈশানবাবু; তার কিছুদিন পরে এসে জুটলেন সাধুবাবা। এঁদের দু’জনের মধ্যে অবশ্য কোনও সংযোগ ছিল না; দু’জনে শেষ পর্যন্ত জানতে পারেননি যে বন্ধুর এত কাছে আছেন।

‘রামকিশোরবাবু ভাইকে মৃত্যুর মুখে ফেলে পালিয়েছেন এ গ্লানি তাঁর মনে ছিল। সন্ন্যাসীকে চিনতে পেরে তাঁর হৃদয়যন্ত্র খারাপ হয়ে গেল‌, যায়-যায় অবস্থা। একটু সামলে উঠে তিনি ভাইকে বললেন‌, ‘যা হবার হয়েছে‌, কিন্তু এখন সত্যি প্রকাশ হলে আমার বড় কলঙ্ক হবে। তুমি কোনও তীৰ্থস্থানে গিয়ে মঠ তৈরি করে থাকে‌, যত খরচ লাগে আমি দেব।’ রামবিনোদ। কিন্তু ভাইকে বাগে পেয়েছেন‌, তিনি নড়লেন না; গাছতলায় বসে ভাইকে অভিসম্পাত দিতে লাগলেন।

‘এটা আমার অনুমান। কিন্তু রামকিশোর যদি কখনও সত্যি কথা বলেন‌, দেখবে অনুমান মিথ্যে নয়। মণিলাল কিন্তু শ্বশুরের অসুখে বড় মুশকিলে পড়ে গেল; শ্বশুর যদি হঠাৎ পটল তোলে তার সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে‌, শালারা তদণ্ডেই তাকে তাড়িয়ে দেবে। সে শ্বশুরকে মন্ত্রণা দিতে লাগল‌, বড় দুই ছেলেকে পৃথক করে দিতে। তাতে মণিলালের লাভ‌, রামকিশোর যদি হার্টফেল করে মরেও যান‌, নাবালকদের অভিভাবকরূপে অর্ধেক সম্পত্তি তার কিন্তুজায় আসবে। তারপর তুলসীকে সে বিয়ে করবে‌, আর গদাধর সর্পাঘাতে মরবে।

‘মণিলালকে রামকিশোর অগাধ বিশ্বাস করতেন‌, তাছাড়া তাঁর নিজেরই ভয় ছিল তাঁর মৃত্যুর পর বড় দুই ছেলে নাবালক ভাইবোনকে বঞ্চিত করবে। তিনি রাজী হলেন; উকিলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলতে লাগিল।

‘ওদিকে দুর্গে আর একটি ঘটনা ঘটছিল; ঈশানবাবু গুপ্তধনের সন্ধানে লেগেছিলেন। প্রথমে তিনি পার্টিতে খোদাই করা ফারসী লেখাটা পেলেন। লেখাটা তিনি সযত্নে খাতায় টুকে রাখলেন এবং অনুসন্ধান চালাতে লাগলেন। তারপর নিজের শোবার ঘরে গজাল নাড়তে নাড়তে দেখলেন‌, একটা পাথর আলগা। বুঝতে বাকি রইল না যে ঐ পাথরের তলায় দুর্গের তোষাখানা আছে।

‘কিন্তু পাথরটা জগদ্দল ভারী; ঈশানবাবু রুগ্ন বৃদ্ধ। পাথর সরিয়ে তোষাখানায় ঢুকবেন কি করে? ঈশানবাবুর মনে পাপ ছিল‌, অভাবে তাঁর স্বভাব নষ্ট হয়েছিল। তিনি রামকিশোরকে খবর দিলেন না‌, একজন সহকারী খুঁজতে লাগলেন।

‘দু’জন পূৰ্ণবয়স্ক লোক তাঁর কাছে নিত্য যাতায়াত করত‌, রমাপতি আর মণিলাল। ঈশানবাবু মণিলালকে বেছে নিলেন। কারণ মণিলাল ষণ্ডা বেশি। আর সে শালদের ওপর খুশি নয় তাও ঈশানবাবু বুঝেছিলেন।

‘বোধ হয় আধাআধি বাখরা ঠিক হয়েছিল। মণিলাল কিন্তু মনে মনে ঠিক করলে সবটাই সে নেবে‌, শ্বশুরের জিনিস পরের হাতে যাবে কেন? নির্দিষ্ট রাত্রে দু’জনে পাথর সরিয়ে তোষাখানায় নামলেন।

‘হাঁড়িকলসীগুলো তল্লাস করবার আগেই ঈশানবাবু মেঝের ওপর একটা মোহর কুড়িয়ে পেলেন। মণিলালের ধারণা হল হাঁড়িকলসীতে মোহর ভরা আছে। সে আর দেরি করল না‌, হাতের টর্চ দিয়ে ঈশানবাবুর ঘাড়ে মারল এক ঘা। ঈশানবাবু অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। তারপর তাঁর পায়ে কলমের খোঁচা দেওয়া শক্ত হল না।

‘কিন্তু খুনীর মনে সর্বদাই একটা ত্বরা জেগে থাকে। মণিলাল ঈশানবাবুর দেহ ওপরে নিয়ে এল। এই সময় আমার মনে হয়‌, বাইরে থেকে কোনও ব্যাঘাত এসেছিল। মুরলীধর ঈশানবাবুকে তাড়াবার জন্যে ভয় দেখাচ্ছিলই‌, হয়তো সেই সময় ইট-পাটকেল ফেলেছিল। মণিলাল ভয় পেয়ে গুপ্তদ্বার বন্ধ করে দিল। হাঁড়িগুলো দেখা হল না; টািৰ্চটাও তোষাখানায় রয়ে গেল।

‘তোষাখানায় যে সোনাদানা কিছু নেই একথা বোধ হয় মণিলাল শেষ পর্যন্ত জানতে পারেনি। ঈশানবাবুর মৃত্যুর হাঙ্গামা জুড়োতে না জুড়োতে আমরা গিয়ে বসলাম; সে আর খোঁজ নিতে পারল না। কিন্তু তার ধৈর্যের অভাব ছিল না; সে অপেক্ষা করতে লাগল‌, আর শ্বশুরকে ভজাতে লাগল দুৰ্গটা যাতে তুলসীর ভাগে পড়ে।

‘আমরা স্রেফ হওয়া বদলাতে যাইনি‌, এ সন্দেহ তার মনে গোড়া থেকেই ধোঁয়াচ্ছিল‌, কিন্তু কিছু করবার ছিল না। তারপর কাল বিকেল থেকে এমন কয়েকটা ঘটনা ঘটল যে মণিলাল ভয় পেয়ে গেল। তুলসী তার কলম চুরি করে রমাপতিকে দিতে গেল। কলমে তখন বিষ ছিল। কিনা বলা যায় না‌, কিন্তু কলম সম্বন্ধে তার দুর্বলতা স্বাভাবিক। রমাপতিকে সে দেখতে পারত। না-ভাবী পত্নীর প্রেমাম্পদকে কেই বা দেখতে পারে? এই ছুতো করে সে রমাপতিকে তাড়ালো। যা হোক‌, এ পর্যন্ত বিশেষ ক্ষতি হয়নি‌, কিন্তু সন্ধ্যেবেলা আর এক ব্যাপার ঘটল। আমরা যখন সাধুবাবার কাছে বসে তাঁর লম্বা লম্বা কথা শুনছি‌, ‘হ্যম ক্যা নাহি জনতা ইত্যাদিসেই সময় মণিলাল বাবাজীর কাছে আসছিল; দূর থেকে তাঁর আস্ফালন শুনে ভাবল‌, বাবাজী নিশ্চয় তাকে ঈশানবাবুর মৃত্যুর রাত্রে দুর্গে যেতে দেখেছিলেন‌, সেই কথা তিনি দুপুর রাত্রে আমাদের কাছে ফাঁস করে দেবেন।

‘মণিলাল দেখল‌, সর্বনাশ! তার খুনের সাক্ষী আছে। বাবাজী যে ঈশানবাবুর মৃত্যু সম্বন্ধে কিছুই জানেন না‌, তা সে ভাবতে পারল না; ঠিক করল রাত বারোটার আগেই বাবাজীকে সাবাড় করবে।

‘আমরা চলে আসার পর বাবাজী এক ঘটি সিদ্ধি চড়ালেন। তারপর বোধ হয়। মণিলাল গিয়ে আর এক ঘটি খাইয়ে এল। বাবাজী নিৰ্ভয়ে খেলেন‌, কারণ মণিলালের ওপর তাঁর সন্দেহ নেই। তারপর তিনি নেশায় বুদ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন; এবং যথাসময়ে মণিলাল এসে তাঁকে মহাসুষুপ্তির দেশে পাঠিয়ে দিলে।’

আমি বলিলাম‌, ‘আচ্ছা‌, সন্ন্যাসী ঠাকুর যদি কিছু জানতেন না‌, তবে আমাদের রাত দুপুরে ডেকেছিলেন কেন?

ব্যোমকেশ বলিল, ‘ডেকেছিলেন তাঁর নিজের কাহিনী শোনাবার জন্যে, নিজের আসল পরিচয় দেবার জন্যে।’

‘আর একটা কথা। কাল রাত্রে যে রামকিশোরবাবুর ঘরে চোর ঢুকেছিল সে চোরটা কে?’

‘কাল্পনিক চোর। মণিলাল সাধুবাবাকে খুন করে ফিরে আসবার সময় ঘরে ঢুকতে গিয়ে হোঁচটি খেয়েছিল‌, তাতে রামকিশোরবাবুর ঘুম ভেঙে যায়। তাই চোরের আবির্ভাব। রামকিশোরবাবু আফিম খান‌, আফিম-খোরের ঘুম সহজে ভাঙে না‌, তাই মণিলাল নিশ্চিন্তু ছিল; কিন্তু ঘুম যখন ভাঙল তখন মণিলাল চাটু করে একটা গল্প বানিয়ে ফেলল। তাতে রমাপতির ওপর একটা নতুন সন্দেহ জাগানো হল‌, নিজের ওপর থেকে সন্দেহ সরানো হল। রমাপতির তোরঙ্গতে হরিপ্রিয়ার সোনার কাঁটা লুকিয়ে রেখেও ঐ একই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল। যা শত্রু পরে পরে। যদি কোনও বিষয়ে কারুর ওপর সন্দেহ হয় রমাপতির ওপর সন্দেহ হবে।’

ব্যোমকেশ সিগারেট ধরাইল।

প্রশ্ন করিলম‌, ‘মণিলাল যে আসামী এটা বুঝলে কখন?’

ব্যোমকেশ ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিল‌, ‘অস্ত্রটা কী তাই প্রথমে ধরতে পারছিলাম না। তুলসী প্রথম যখন ফাউন্টেন পেনের উল্লেখ করল‌, তখন সন্দেহ হল। তারপর মণিলাল যখন ফাউন্টেন পেন আমার হাতে দিলে তখন এক মুহুর্তে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। মণিলাল নিজেই বললে বাড়িতে আর কারুর ফাউন্টেন পেন নেই। কেমন সহজ অস্ত্ৰ দেখ? সর্বদা পকেটে বাহার দিয়ে বেড়াও‌, কেউ সন্দেহ করবে না।’

কিছুক্ষণ নীরবে কাটিবার পর পাণ্ডেজি বলিলেন‌, ‘গুপ্তধনের রহস্যটা কিন্তু এখনও চাপাই আছে।’

ব্যোমকেশ মুচকি হাসিল।

বাড়ির সদরে একটা মোটর আসিয়া থামিল এবং হর্ন বাজাইল। জানোলা দিয়া দেখিলাম‌, মোটর হইতে নামিলেন রামকিশোরবাবু ও ডাক্তার ঘটক।

ঘরে প্রবেশ করিয়া রামকিশোর জোড়হস্তে বলিলেন‌, ‘আমাকে আপনারা ক্ষমা করুন। বুদ্ধির দোষে আমি সব ভুল বুঝেছিলাম। রমাপতি‌, তোকেই আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছি। বাবা। তুই আমার সঙ্গে ফিরে চল।’

রমাপতি সলজ্জে তাঁহাকে প্ৰণাম করিল।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *