Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » দুর্গাপূজা বিভিন্ন আঙ্গিকে || Sanjit Mandal

দুর্গাপূজা বিভিন্ন আঙ্গিকে || Sanjit Mandal

ভূমিকা – মহাষ্টমীর ভোর সকালে বেরিয়েছিলাম প্রাতঃভ্রমণের বন্ধুরা মিলে। ভীড় বাঁচিয়ে, ঠেলাঠেলি এড়িয়ে শান্তিতে, নিরুপদ্রবে এবং নির্বিঘ্নে মহাপূজার কিছু মণিময় স্মৃতি মনের মণিকোঠায় তুলে রাখবো বলে। আমরা কেউ ৬৫ কেউবা ৬৭ হলে কি হবে আমাদের মনের বয়স এখনো সে ২৫-২৬ই আছে। তাই এখনো আমরা পাহাড়ে চড়ি, সাগরে ঝাঁপাই, গভীর জঙ্গলে হারাই। সুযোগ পেলেই ঝোলা কাঁধে শহর থেকে ছুটে পালাই।

ভাবনা – প্রতিবারের মতো এবারেও আমাদের পুজো পরিক্রমা দক্ষিণ কোলকাতার সুবোধ পার্ক থেকে শুরু আর শেষ হয় যোধপুর পার্কে, পুরো পরিক্রমাই পদব্রজে, প্রভাত ভ্রমণ হলো আবার দেবী দর্শন ও হলো।
আমরা যখন বাড়ি থেকে বের হই তখনও অন্ধকারের আবেশ, তখনও সারারাতের ক্লান্তি নিয়ে, সারা দিনের তৃষায়, এলোমেলো ব্যাথাতুর পায়ে, নির্ঘুম চোখের ঢুলুঢুলু আবেশ নিয়ে এক ঝাঁক তরুণ তরুণীর পদব্রজে ঘরে ফেরা, হাল্কা অন্ধকার আর শিশির কুয়াশায় আমাদের সেই পথে আগে চলা, আমাদের যাওয়া আর ওদের আসা ঠিক যেন পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে চিরপুরাতন আসা যাওয়ার খেলা পথের ধারে নিত্য বসে মেলা।
ভাবনাটা আরো প্রগাঢ় হয় বিচিত্র সব আলোক মালায়, মহার্ঘ্য মণ্ডপের বর্ণচ্ছটায়, শৈল্পিক বিভায় উদ্ভাসিত প্রতিমার রূপের অবিশ্বাস্য মুগ্ধতায়। এ যেন এক অলৌকিক প্রতিযোগিতা ; শিল্প, শিক্ষা, রুচি, সৌন্দর্য আর সভ্যতার। কে কত নতুন ভাবনার প্রতিফলন করতে পারে, কে কোন আধুনিক অথবা পৌরাণিক ভাবনার অভিব্যক্তিকে জনসমক্ষে বাঙ্ময় রূপ দিতে পারেন তার এক অভিনব প্রদর্শনী প্রতিটি মণ্ডপে।

সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, কেউ পাটের কাজের প্রদর্শন করেন, কেউবা বাঁশের, কেউবা বেঁতের, কেউবা মাটির হাঁড়ি পাতিল, কেউ বা লাটাই ঘুড়ি, কেউবা মৌচাক, কেউবা কুটির বাড়ি, কেউবা ডোঙা শালতি, আরো কত কিছু যে, অসাধারণ সব শৈল্পিক ভাবনার উদ্ভাসিত ছবি।
সবই ভিন্ন ভাবধারায়, কখনো গ্রাম বাংলার অনাবিল সরল সৌন্দর্যের মুগ্ধতায়, কখনো বা আধুনিক শহরাঞ্চলের বৈভবের ছোঁয়ায় বিভূষিতা দেবী। দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ তথা কলাবউ মহাদেবীয় কর্তব্যে অসুর বিনাশের মহান আদর্শে গ্রাম, শহর বা শহরতলিতে অলিতে গলিতে এ কয়দিনে কত কিছু যে দেয় ভুলিয়ে হিসাব কে রাখে তার।
জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, রোগ, শোক, তাপ, দুঃখ, দুর্দশা, হতাশা, ক্রোধ, ঈর্ষা, জিঘাংসা কিছু কি নাশ হয়? নাশ হয় কি দহন জ্বালা? ঢাক আর মাইকের শব্দে কান ঝালাপালা হলেও কারো আর্ত কান্নার আওয়াজ কি চাপা পড়ে?

ইতিবাচক দিক- তবু ইতিবাচক দিকটাও অনুজ্জ্বল নয়, যখন দেখি ওই পাঁচটা দিন কত প্রচেষ্টায় সোমবচ্ছরের দুঃখ ভোলার আন্তরিক প্রচেষ্টা, পথশিশুদের জামা কাপড়, দরিদ্রদের বস্ত্র বিতরণ, দু তিনটে দিন তাদের অন্ন বিতরণ, বৃদ্ধাবাসের অধিবাসীদের নিঃসঙ্গতা মোচন, তাদের নিয়ে বিভিন্ন মণ্ডপে পরিভ্রমণ, সব না হলেও সামান্য কিছু মানবিক মানবতার প্রদর্শন ভালো লাগে বৈকি। বঞ্চনা আর বেদনার দীর্ঘ শ্বাস, কখনো বা ভালোবাসার নাভিশ্বাস, বনেদীয়ানা,বেকারের বাণিজ্য ভাবনা,ব্যর্থতার গ্লানি মুছে শহর পরিক্রমা, হইচই থেকে দূরে যেতে বাউন্ডুলে বাঙালির বিজনভূমি, সাগর, মরু পাহাড় পরিক্রমা, সবইতো সেই আনাগোনা, চেনাশোনা, কর্পোরেট এর কড়ি গোনা, কত বাণিজ্য করা যাবে তার যুদ্ধ ভাবনা এই সব কাকে ঘিরে? দিন পাঁচেক পরে ঝপাং করে ফেলে দেবে বলে!!

শিক্ষা – অথচ কি উন্মাদনা, সারাটা বছর উদাসী চাওয়া, পাহাড় পুরের কৈলাস ভাবনা, কল্পনার উপর কল্পনা। তবুও তো এটাই পাওনা, কত মানুষের জাত, ধর্ম, বর্ণ উঁচুনিচু ভেদাভেদ ছাপিয়ে উঠে এক বিশাল কর্মযজ্ঞের সম্ভাবনা। কিভাবে তা সে সবার জানা। কে দেবদেবীর শাড়ি তৈরি করবে, কে সেই শাড়ির উপর জরীর কাজ করবে, কে শাড়িকে কোন রঙে রাঙাবে, কে দেবদেবীর চুল তৈরি করবে, কে তার জন্য পাট জোগাবে, কে শোলার সাজ তৈরি করবে, কে ডাকের সাজের গহনা তৈরি করবে, কে কাঠামো তৈরি করবে কে মাটি জোগাড় করবে, কে রঙ করবে, কে চক্ষু দান করবে, কে ফুল বেল পাতা যোগাবে, এযে বিপুল কর্মকাণ্ড, এ এক বিশাল শিক্ষা, বিশাল ভাবনা। এই কর্মযজ্ঞের পুরোহিতের বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে মন্ত্রপাঠ, তার জন্যে ও চাই শিক্ষা। আর মৃৎশিল্পী, কারু শিল্পী, জারি শিল্পী পাট শিল্পী, বয়ন শিল্পীদের প্রতি পদক্ষেপে যে শিল্পী সত্ত্বার এক সম্মিলিত প্রচেষ্টার রাজসূয় যজ্ঞের সমাপন এই দুর্গাপূজা। পৌত্তলিক হোক অথবা নিরাকারবাদীই হোক সকলেরই এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কিছু না কিছু ভূমিকা থাকে। আর এরই নাম সার্বজনীনতা তথা বিশ্বজনীনতা।

বিশ্বজনীনতা – আজ শুধু মাত্র বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায় নয় বরং ভারত বর্ষের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপ আমেরিকা, কানাডা, চীন ও আফ্রিকায় দুর্গাপূজার প্রচলন হচ্ছে। এই মহাপুজা আজ এক মহানন্দের বিষ্ফোরণ ও বটে। যেভাবে জাতি ধর্ম বর্ণ উচ্চনীচ ভেদাভেদ ভুলে সকলে মিলে মিশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই পূজায় একাত্ম হয়ে ওঠেন, তেমন নজীর দুনিয়ার আর কোথায় আছে বলে আমার জানা নেই।সকলেই মিলে মিশে যার যতটুকু কাজ সেটা সম্পন্ন করে, সংসারে সকলের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটাবে বলে। আমার কাছে এ পুজোর শিক্ষা মহামিলনের শিক্ষা, একাত্মতার শিক্ষা,বিশ্বরূপ দর্শনের শিক্ষা।

উপসংহারে এটুকু না বললেই নয়,যে পরিবেশ এবং পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা যে কিছুটা হলেও বিস্তার লাভ করেছে তার পরিচয় পেয়েছি প্রতিটি পূজা মণ্ডপে প্রায় সর্বত্র। এটা একটা ইতিবাচক দিক। ভোরের মনোরম পরিবেশে সুস্নিগ্ধ হাওয়ায় পথ চলার ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দেয়, মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। অসাধারণ শৈল্পিক সৌন্দর্যে ভরা অসাধারণ সব প্রতিমা দেখে যে ভালো লাগাটা মনে উদয় হয় তা অনির্বচনীয়। শেষ করি কবি গুরুকে স্মরণ করে,
এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন,
এক কার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন—
বন্দে মাতরম।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *