Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

সোমা গাড়ি থেকে নামল। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় মনে হল দরজা বন্ধ কফি হাউসের। সে ঘড়ি দেখল। ন’টা বাজেনি। সে উত্তেজনার মাথায় খুব তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। সে এখন কী করবে বুঝতে পারছে না। পুরনো বইয়ের দোকানগুলোর দিকে সে এগিয়ে গেল। সে দুটো একটা বই হাতে নিয়ে দেখছে। পছন্দ হলে কিনে ফেলবে। অনেকদিনের অভ্যাস এটা। সে এখান থেকে বহু দুর্মূল্য বই কিনে নিয়ে গেছে একসময়। তার পড়ার বাতিকের চেয়ে সংগ্রহের বাতিক বেশি।

কিন্তু কী যে মনের ভিতর হচ্ছে। একটা দুটো বই দেখেই তার কেমন হাঁপ ধরে গেল। সে এবার গাড়িতে এসে বসল। মাথাটা ধরেছে মনে হয়। মাথা ধরা আজকাল নানা কারণে ঘটছে। সকালে কোনোদিন মাথা ধরেনি। আজ এই প্রথম। সে কফি হাউস খুললে, প্রথমেই এক গেলাস জল চেয়ে নেবে। এবং একটা অ্যাসপ্রো খেয়ে ফেলবে। সে ব্যাগে অ্যাসপ্রো খুঁজতে থাকল। কেন যে সকালে মাথা ধরা—বিকেলে হলে সে বুঝত যেমন ঘটে তাই ঘটছে। তারপরই মনে হল, সে এখানে কেন এসেছে? সেই মুখ এবং উদাসীনতা লক্ষ্য করবে বলে? মনে হয়! সে কি এখানে এখন আসবে? এলে সে বিকেলে আসতে পারে। নাও আসতে পারে। তাকে সে আবার দেখলে যেন ঠিক চিনে ফেলতে পারত। তাহলে মনের ভিতর যে কষ্টটা, ওকে কোথায় যেন দেখেছি, সে আমার মনের মানুষ যে রে, গানের কলির মতো একটা মুখ বারবার চোখের সামনে ভেসে ভেসে হারিয়ে যাচ্ছে।

যাক, তবে একটা অ্যাসপ্রা পাওয়া গেল। সে অ্যাসপ্রোটা হাতের দু আঙুলে তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। নিরাময় হবে সে এবার। সংসারে মাঝে মাঝে এমন ট্যাবলেট খেলে মানুষ ভাবে নিরাময় হয়ে যাচ্ছে, বস্তুত কেউ নিরাময় হয় না। অসুখ তার ভেতরেই থাকে। সে তাকে নিয়ে শুধু বড় হয়।

ঘড়িতে ন’টা বাজল। সোমা ওপরে উঠে গেল। একগেলাস জল চেয়ে নিল। সে ট্যাবলেটটা ঘুমের বড়ির মতো মুখের ভিতরে ফেলে দিল। তারপর চারদিকে তাকাতেই মনে হল কফি হাউস ফাঁকা। কেউ আসেনি। এত বড় হলঘরটায় কেউ নেই। তাদের এবার কাজ আরম্ভ হবে। এক দুই করে এসে সবাই বসবে। ওরা সোমার দিকে তাকিয়ে থাকল। এই সকালে এমন মেয়ে, মুখ—চেনা, একসময় এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মেরে গেছে। সুতরাং ওরা কেউ কাছে এসে দাঁড়াল। কী দেব?

সোমা বলল, আচ্ছা আবদুল, তোমার মনে আছে কাল ঐ কোণের টেবিলে পুল—ওভার গায়ে একজন বসেছিলেন? এই তোমার তখন সাতটা কী সাড়ে সাতটা হবে হয়তো।

আবদুল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। কত মানুষ আসে, সে কী করে জানব।

আচ্ছা ঐ কোণের টেবিলে কাল বিকেলে কে সার্ভ করেছিল বলতে পার?

আবদুল কাউন্টারে গিয়ে কী ফিসফিস করে বলল। ভিতরে তখন একটা কাচের গেলাস ভেঙে পড়ার শব্দ। ঝনঝন। বুকটা কেঁপে উঠল সোমার। সে বুঝি এল। তুমি জান সে লোকটাকে?

সে বলল, না দিদিমণি। আমি ঠিক খেয়াল করতে পারছি না।

কেন মনে নেই তোমার? সে পিছন ফিরে বসেছিল।

সে বলল, না। তারপর সে আর দাঁড়াল না। উত্তরের দিকে দুজন ভদ্রলোক এসে বসেছে। ওরা রোজই এ—সময় এখানে আসে। এক কাপ করে কফি এবং এক প্লেট স্যান্ডউইচ খেয়ে ওরা কোথায় একসঙ্গে কাজে যায়। ওদের কাছ থেকে এখন আর অর্ডার নেবার প্রয়োজন হয় না। এলেই কফি আর স্যান্ডউইচ দিয়ে আসে। ওটা ওর টেবিল বলে, সে চলে গেল।

সোমা এখন একা। দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবি। সুভাষ বসুর ছবি। কিছুদিন আগে গান্ধী এবং নেহরুর দুটো ছবি ছিল। এখন আর সে ছবি দুটো নেই। নামিয়ে রাখা হয়েছে। অথবা চারপাশে যে সব তরুণেরা সমাজকে বদলে দেবার নেশাতে মেতে উঠেছে, তাদের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য, নিরাপদ জায়গায় বোধহয় সরিয়ে রেখেছে।

ওর যে এখন কী করণীয়! সে বসে বসে এক কাপ কফি খেল। চোখে—মুখে ভীষণ দুশ্চিন্তার ছাপ যেন। এত বড় শহরে একজন অপরিচিত মানুষকে খুঁজছে। সে কোথায় পাবে তাকে। সে কাকে জিজ্ঞাসা করবে, করতে পারলে যদি কোথাও তার ঠিকানা মিলে যায়। ওর পাশাপাশি যেসব মুখ ছিল, সে যে কী বোকা, যদি একটা মুখ ভালো করে দেখে রাখত তবে আর একজন সাক্ষী থাকত তার, আচ্ছা আপনি বলতে পারেন, আপনার টেবিলে পিছন ফিরে যিনি বসেছিলেন তার নাম কী, কোথায় থাকেন?

সোমা কাউকে দেখেনি। একমাত্র চুরি করে টেবিলের সেই মানুষটিকে সে দেখেছে। ওর উচিত ছিল, টেবিলের সব মুখগুলো একবার ভালোভাবে দেখে রাখা। তবে সে অন্তত আজ অথবা কাল কাউকে কফি হাউসে পেয়ে যেত। পেয়ে গেলেই সে তার সন্ধান পেতে পারত। বোকার মতো তাকে এ—ভাবে বসে থাকতে হত না।

সুতরাং সে উঠে পড়ল। এই সকালে এখানে একা বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না। বস্তুত সে যে কী চায়, তার কী পাওয়ার কথা ছিল, সে যেন নিজেও জানে না। কেবল সেই মানুষটির সঙ্গে দেখা হলেই যেন বলে দিতে পারত, তুমি সোমা এই চেয়েছিলে, এখন তুমি সব ভুলে গেছ। আর কী করা। সে ধীরে ধীরে নেমে গেল। তারপর বাড়ি। এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকা। শুয়ে থাকা। এই যে দীর্ঘ সময় সে একা বাড়ি থাকবে তখন তার মনে হয় সব প্রাচুর্য অহেতুক মনীষ দুটো মানুষের জন্য আটকে রেখেছে। এত দরকার কী? সেই মানুষটাকে দেখার পর থেকেই এমন মনে হচ্ছে তার।

সোমা ভাবল, সে আবার বিকেলে আসবে ওকে খুঁজতে।

সে বিকেলে এসেছিল। রাতে চুপচাপ কোণের একটা টেবিলে বসেছিল। বিনুর সঙ্গে দেখা। বিনু অবাক। তুমি এখানে?

তোমাদের কাছে এলাম।

ওরে বাপস! কী বলছ!

আচ্ছা বিনু, কাল তুমি লক্ষ্য করেছিলে একজন যুবক হবে হ্যাঁ বেশ লম্বা—চওড়া মানুষ, সাদা পুল—ওভার গায়ে, কালো প্যান্ট পরনে ঐ কোণের টেবিলটায় বসেছিল, এবং আমাকে মাঝে মাঝে চুরি করে দেখছিল!

বিনু পাশে একটা চেয়ার টেনে আনতে আনতে বলল, আমি যেদিকে তাকিয়েছি দেখেছি সব চোখ তোমার দিকে। চুরি করে সবাই তোমাকে দেখছিল, এবং তোমার দেখা মানুষটি যে কে কী করে বলব!

সোমা কথা বলল না আর। বিনু বলল, কফি খেয়েছ?

আমি খাব না, তুমি খাও।

আমি মটন ওমলেট নিচ্ছি সঙ্গে।

নাও।

বিনু বলল, মনীষ এল না?

সোমা তাকাল বিনুর দিকে, সে এখানে আসে না বিনু।

কাল যে এল!

কাল এল, সেই ছবিটা দেখে ওর অতীত দিনের কথা মনে পড়ে গেছিল।

খুব আবেগের বশে এসে গেছে। আর আসবে না।

তুমি এলে?

আমি এসেছিলাম ওর সঙ্গে আমার দরকার ছিল।

কী দরকার?

কী যে দরকার আমি ঠিক জানি না। ওর সঙ্গে দেখা হলেই সে বলে দিতে পারত আমার কী দরকার।

তুমি নিজে তোমার দরকারের কথা জান না, তার সঙ্গে দেখা হলে তোমার কী দরকার সে বলে দিতে পারত—কেমন কথা?

ঠিক কথা বিনু। আমরা যে কী চাই নিজে বুঝে উঠতে পারি না। আর একজন মানুষের দরকার হয়, সে বলে দিতে পারে, তোমার এটা দরকার সোমা, তোমার ওটা দরকার নয়। অনর্থক তুমি ছুটে মরছ।

ওসব তত্ত্বকথায় আমি নেই সোমা। তাহলে আমি খাচ্ছি।

খাও।

বিনু বলল, তুমি এলে মাঝে মাঝে ভালো—মন্দ খাওয়া যায়।

তুমি আরও কিছু খাবে?

না, আর না। খেতে ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু পেটে সহ্য হয় না। পেটে বোধহয় আলসার হবে। মাঝে মাঝে ব্যথা হয়।

তবে এসব ছাইপাঁশ খাওয়া কেন?

খেতে খুব ভালো লাগে। আজ জান, আমাদের ওখানে আবার গণ্ডগোল। টু উইকেট ডাউন।

সোমার মুখটা ব্যথায় নীল হয়ে গেল।

কী সুন্দর ছেলে দুটো। তাজা। একেবারে ফুলের মতো তাজা। গলগল করে রক্ত পড়ছে। পুলিশ গলায় গুলি চালিয়েছে।

সোমা আর কথা বলতে পারল না।

ওদের কে যে এমনভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে বুঝি না। ওরা দুজন একজন সার্জেন্টের গলা কেটে ফেলেছিল।

সোমা বলল, তুমি খাও। আমার ভালো লাগছে না ওসব শুনতে।

বিনু বলল, আমি তাড়াতাড়ি চলে যাব। তুমিও তাড়াতাড়ি ফিরে যাও। কখন কোথায় কীভাবে গণ্ডগোল বেধে যাবে বুঝতে পারবে না।

সোমা এবারও কোনো কথা বলল না। সে চারপাশে কাকে খুঁজছে। সোমা উঠছে না বলে সে—ও উঠতে পারছে না। সোমা কথাবার্তা আরম্ভ করল। সুধীর, অশোক এল না?

সবাই তো ভয়ে মরছে। এদিকে আসা সবাই এখন ছেড়ে দেবে। সাতটার পর রাস্তা ফাঁকা। তোমার কী মনে হয় এদেশে সিভিল ওয়ার শুরু হবে?

জানি না। ওর সঙ্গে দেখা হলে তোমাকে সব বলে দিতে পারতাম। সে বলল, অবশ্য মনে মনে। বিনু, আমার স্বামী মনীষ। সে এখন কত বড় ঘুষে কত বড় ইমপোর্ট লাইসেন্স দিল্লির উদ্যোগভবন থেকে বের করতে পারে তার মুসাবিদার জন্য ছুটোছুটি করছে। সে সংসারের এই অমঙ্গলের দিকটা দেখতে পাচ্ছে না।

বিনু বলল, তুমি কিছু ভাবছ সোমা?

কী ভাবব?

এই যে লক্ষ লক্ষ বেকার, আমার ভাইটা আজ চার বছর এঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বসে আছে। এখন বাড়ি থাকে না। রাত করে ফেরে। আমরা বাড়ির সবাই ওর জন্য রাত জেগে থাকি।…কেবল মনে হয় আমার ভাইটাকে কেউ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে কে সোমা?

সোমা বলল, তুমি উঠবে বলেছিলে, চল উঠি।

তুমি একা এতদূর যাবে? সঙ্গে যাব তোমার?

না। বরং চল আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাই।

না, সে কী করে হয়।

কী করে হয় দ্যাখো। বলে জোর করে সে বিনুকে গাড়িতে তুলে নিল। বলল, জান বিনু, আমাদের দেশের এই অবস্থা চোখে দেখা যায় না।

তুমি এমন কথা বলছ!

খুব খারাপ লাগে। রাতে একটা ভিখারি মেয়ে আমাদের বাড়ির নিচে রোজ পড়ে আছে দেখতে পাই।

তা খেতে না পেলে কী করবে? আশ্রয় না থাকলে যাবে কোথায়?

সে আজ হোক কাল হোক মরে যাবে।

তা যাবে।

মনীষকে মাঝে মাঝে বলি, এত দিয়ে আমাদের কী হবে?

কী কথায় কী কথা! বিনু বলল, মনীষের সঙ্গে তোমার রাগারাগি হয়েছে সোমা? আমি কাল যাব।

আমি রাগ করি না। কারণ রাগ করে আর লাভ নেই। আমরা দিন দিন একচক্ষু হরিণ হয়ে যাচ্ছি।

তারপর সোমা আর কথা বলল না। মানুষজন পাতলা। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। একটা বস্তির মতো জায়গার কাছে সোমা বিনুকে নামিয়ে দিল। বস্তির ভিতর দিয়ে বিনুকে যেতে হয়। সে যেতে যেতে মানুষের অসন্তোষ চারপাশে ফেটে পড়ছে দেখতে পেল। কারণ একটা কলের গোড়ায় আট—দশ তরুণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাটি খুঁড়ছে। বিনুর মনে হল ওর ভাইটা ওদের ভিতর আছে। তাকে ডাকতে পর্যন্ত বিনুর সাহসে কুলাল না।

সোমা একা একা যাচ্ছে। এত বড় কলকাতা নগরী, ট্রাম বাস অজস্র মানুষ, আর তাদের সেই অসন্তোষ, যেন সবাই ফেটে পড়বে—বলবে, আমরা এ চাই না, আমরা অজস্র এই তরুণের মৃত্যু চাই না—তখন সোমা জানে, তার স্বামী, মনীষ, বাজারে তেলের অভাব, সে হোয়াইট অয়েল প্যাক করে কেমিক্যাল ঘ্রাণ মিশিয়ে বাজারে নারকেল তেল বলে চালাচ্ছে। মনীষের কাছে লক্ষ লক্ষ টাকা হাওয়ায় উড়ছে। কেবল কুড়িয়ে নিতে জানা চাই।

মনীষ কিছুতেই কেন জানি সংসারের অমঙ্গলের দিকটা দেখতে পাচ্ছে না। সোমার চোখে জল চলে এল।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *