দুঃস্বপ্ন – চৌদ্দ
সোমা পরদিন ফোন করে বলল, অজিতেশ আছে।
ধরুন দিচ্ছি।
অজিতেশ বলল, হ্যাঁ, আমি অজিতেশ বলছি।
শোন, আমি সোমা।
বুঝতে পারছি।
আমার ঘর ঠিক। কখন আসছ?
রাতে।
রাত কটায়?
এই ধর আটটায়।
সবাইকে তো জানিয়ে দিতে হবে।
তোমায় ব্যস্ত হতে হবে না। বিনু সব করছে।
বিনু না থাকলে কী যে হত!
কেউ কেউ এ—ভাবে থেকে যায়। মানুষ কখনও একেবারে নির্বান্ধব হয় না।
সোমা উত্তরে কিছু বলতে পারল না। কেবল অজিতেশ বলল, সোমা, তোমরা সামান্য স্ফুলিঙ্গ দেখেই ভয় পেয়ে গেলে!
সোমা হঠাৎ অজিতেশ এমন কথা বলছে কেন বুঝতে পারছে না।
সে বলল, স্ফুলিঙ্গ মানে!
আরে এই যে ছেলে—ছোকরারা বিপ্লব করছে না!
তা করছে।
যাক শোনো, আটটা।
আচ্ছা, ফোন ছেড়ে দিল সোমা।
বিকেলে ফোন করল ফের অজিতেশ। আচ্ছা তোমার আত্মীয়স্বজন কে কে তোমাদের বাড়িতে রেগুলার আসত।
রেগুলার কেউ আসে না। আসলে মনীষ এত বেশি ব্যস্ত ছিল নিজেকে নিয়ে, আমি কলেজ নিয়ে, এবং সন্ধ্যায় মনীষ বাড়িতে থাকতেই ভালোবাসত।
তবু কে কে আসত জানতে পারলে ভালো হয়।
সোমা বলল, যে গেছে তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। আমার ইচ্ছে নয় এজন্য অন্য কেউ হ্যারাস হোক।
হ্যারাস হবে কিনা জানি না, তবে এটা আমি যা ভেবেছি, এক আজগুবি ঘটনা। এমন হয়, সুতরাং এমন যখন হয়, তখন ভীষণ হাসি পায়।
সোমা আর কিছু বলল না। ফোন রেখে দেবে ভাবল। তখনই অজিতেশ বলল, আমাদের সিটিং অনিবার্য কারণে আজ বন্ধ। সিটিং হচ্ছে চারদিন পর। বিনুকে ফোন করে দিচ্ছি। সেই খবর দিয়ে দেবে।
সোমা কী বলবে ভেবে পেল না। সে শুধু বলল, আচ্ছা।
এবং রাতে সোমা আর মনোরমা একঘরে। সারারাত সোমার কেমন ভয় ভয় করতে থাকল ফের। সারারাত মনীষের সেই মরা মুখ কেমন বাতাসে ভেসে ভেসে কাছে চলে আসছিল। আর সোমা ঢেউ দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছিল। সোমা ভয়ে ঘামছিল। শীতেও সে ঘামছিল। সে একবার ডাকল, মনোরমা। মনোরমা উঠলে বলল, জল। তারপর বলল, তুই কিছু দেখতে পাচ্ছিস।
মনোরমার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল, না তো!
কোনো শব্দ?
সে বলল, না তো!
আমার কেবল কী যে মনে হয়!
মনোরমা বলল, ও কিছু না! মনের ভুল!
এ—ভাবে রাত কেটে যেত, সোমা রাতে ঘুমোতে পারত না। একটা কী যে রহস্য থেকে গেল। এখন আর কিছু মনে হয় না। এখন এ—বাড়িতে কেউ এসে মনীষকে খুন করতে পারে মনে হয় না। সব কেমন মনীষের মৃত্যুর সঙ্গেই শেষ হয়ে গেল। এখন বদলে মনীষ বাতাসে ভেসে ভেসে চলে আসে। এবং একটা মমির মতো ঠিক ওর সামনে নাকের ডগায় ভেসে থাকে। সে ছুঁয়ে দিতে পারে না, ছুঁয়ে দিলেই যেন সোমাও মমি হয়ে যাবে। সোমা কিছুতেই মমি হতে চায় না। সে বাঁচতে চায়। সে কখনও রাতে চিৎকার করে ওঠে, আমাকে বাঁচতে দাও তোমরা। আমাকে এ—ভাবে ভয় দেখিও না।
তারপর যেমন কথা ছিল, সেই বড় হলঘরের মতো ঘরে লম্বা টেবিলের চারপাশে চুপচাপ বসে পড়ার, যেমন কথা ছিল যার যার আসার এবং যেভাবে ঠিকঠাক ছিল ঘর রাখার, সেভাবে ঘর রেখে এখন একটা অদ্ভুত নির্জনতা এই ঘরে। নীল রঙের আলো জ্বলছে ঘরে। ঝাড়বাতিগুলোতে ছোট ছোট আলোর চুমকি। সোমা পরেছে খুব সুন্দর সাদা সিল্ক। তার গায়ে জোনাকি পোকার মতো চুমকি বসানো। সে বসেছে টেবিলের ঠিক মাঝখানে। একে মাঝখানে ঠিক বলা যায় না অবশ্য, কারণ বড় টেবিলটা ডিনার টেবিলের মতো, অনেক বড়, খুব বড় এবং ডিমের মতো আকৃতি টেবিলের। সূচলো ডিমের আকৃতি বলে, সোমা সূচলো দিকটায় বসে রয়েছে। তার মুখ দক্ষিণ—মুখো। তার ডান পাশে সরে সরে বসেছে অশোক, সুধীর, অসিত। আর বাঁ পাশে আছে বিনু, অজিতেশ। অজিতেশ পুলিশের ইউনিফরমে এসেছে। অজিতেশের এটা পাগলামি, বিনু এবং অন্যান্যরা এমন ভাবছে। অন্য সময় হলে ওরা এসব নিয়ে হাসিঠাট্টা করত, কিন্তু খুন—টুনের গন্ধ এর সঙ্গে আছে, তার ওপর অজিতেশ পুলিশের একজন মোটামুটি বড়কর্তা, তাকে অবহেলা করা যায় না। অজিতেশের কথাবার্তায় মনে হয়, ওরা কেউ সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। সুতরাং এখন এই অজিতেশ ব্যক্তিটি যা যা করবে, তাতে সায় রাখতে হবে, না থাকলেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়, এটা বেশি প্রমাণিত হবে।
আর এ—ছাড়া কী—যে বড় মনে হচ্ছে এখন এই হলঘরটা। নীল আলোতে দেয়ালে মোমের প্লাস্টার বেশি চকচক করছে, দেয়ালে সব ছবি, এবং ছবিগুলো সেই রুপো বাঁধানো ফ্রেমে অবিকল মানুষের মতো হঠাৎ সহবাসের ছবি পরিত্যাগ করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা এখন কী বলছে যেন ছবিগুলো শুনতে চায়। আর মাথার ওপরে হলঘরের ছাদটা এত বেশি লম্বা হয়ে গেছে যে মনে হয় দ্রুত বাতাসে লম্বা হয়ে যাবে ছাদটা, এবং ঠিক এই ছাদের শেষ যেন অনেকদূরে এক অন্ধকার নির্জনতায় মিশে গিয়ে নক্ষত্রের দেশে ঢুকে গেছে। ফলে এইসব মানুষগুলোকে টেবিলের পাশে খুব ছোট এবং আকাশের নিচে কোনো সৌরলোক থেকে আসা গ্রহান্তরের মানুষের মতো মনে হচ্ছিল। ওরা টেবিলের চারপাশে বসে রয়েছে। ওদের দেখলে এখন মনে হবে, ওরা কেউ কাউকে চেনে না। ওরা মাথা নিচু করে কিছু ভাবছে। দেখে মনে হচ্ছিল কোনো মহাকাশযানে ওরা নীল অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে।
কেউ কিছু বলছে না। এ—ভাবে তো চুপচাপ বসে থাকার কথা না। বিনু একবার ঘাড় তুলে তাকাল। সবাই কেমন শোকে মুহ্যমান এমন দেখাচ্ছে। বিনু ফিক করে হেসে দেবে ভাবল, এটা যেন প্রহসনের মতো মনে হচ্ছে, অথবা ব্যাপার দেখে মনে হচ্ছে অলৌকিক উপায়ে মনীষের আত্মা এখানে নিয়ে আসা হবে। অজিতেশ কী পুলিশের কাজ করতে করতে পরলোকচর্চা করে থাকে! বিনুর কেমন সন্দেহ হল। আসলে কী অজিতেশের মনে মনে খারাপ মতলব আছে। সে কী দেখাতে চায়, আর একটা যে খালি চেয়ার রাখা হয়েছে, রাত গভীর হলে চেয়ারটা খালি থাকবে না। সেখানে যে বসে থাকবে, সে মনীষ। মনীষের মুখ দেখা যাবে না হয়তো। ওর অস্পষ্ট অবয়ব দেখতে পাবে সবাই। বিনু ভীষণ ঘাবড়ে গেল। বলল, আমরা এ—ভাবে কতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকব অজিতেশ?
অজিতেশ কোনো কথা বলল না। ওর হাতের ব্যাটনটা মাথার ওপর তুলে দিল শুধু। অর্থাৎ বলতে চাইল যেন, চুপ। অজিতেশের মোটা গোঁফ কিছুটা ঝুলে পড়েছে মনে হল। অজিতেশের খাটো চুল, খাড়া চুল আরও খাড়া হয়ে গেছে। বিনু ভাবল, মাথা নিচু করে দেখবে মুখটা।
কিন্তু বিনুর তখন মনে হল, সোমা উঠে দাঁড়িয়েছে। সে কেমন এক অপার্থিব চেহারায় ওদের দেখছে। যেন সোমা ইচ্ছে করলেই বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে এখন। এটা কী অজিতেশ কোনো মন্ত্রতন্ত্র আওড়ে এমন করছে, না কী সে শালা ভয় পেয়ে চোখে গণ্ডগোল দেখছে। সে বলল, সোমা, তুমি এ—ভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোস।
অজিতেশ বলল, চুপ। কথা না। শব্দ!
শব্দ!
হ্যাঁ শব্দ!
কীসের শব্দ!
কেউ কাঠের সিঁড়ি ধরে উঠে আসছে!
হ্যাঁ। তাইতো। কাঠের সিঁড়ি!
তুমি শুনতে পাচ্ছ সোমা?
না তো!
অজিতেশ বলতে বলতে উত্তেজনায় উঠে পড়েছিল। কিন্তু সোমা শুনতে পায়নি ভেবে সে কেমন হতাশ গলায় দুস বলে বসে পড়ল। হল না।
অসিত বলল, অজিতেশবাবু, আর যাই করুন আমাদের ভয় পাইয়ে দেবেন না। ঘরের এমন চেহারা হয়, আর সোমাকে যা দেখাচ্ছে মনে হচ্ছে যেন কোনো পরলোক—টরোলোকে চলে এসেছি।
অজিতেশ বলল, বুঝলেন অসিতবাবু, পৃথিবী ভারী আশ্চর্য জায়গা। মানুষ আরও আশ্চর্য। বলতে বলতে ওর গোঁফটা এবার সোজা হয়ে গেল।
বিনু বলল, তুই কী বলতে চাস বুঝতে পারছিনে!
বলছি, এই মৃত্যুর জন্য তোমরা সবাই দায়ী।
তার মানে! অশোক লাফিয়ে উঠল। যেন ভিতরে একটা চোট খেয়েছে।
অজিতেশ বলল, রাগ করছিস কেন! যা ঘটনা তাই বললাম।
সুধীর বলল, অ্যাবসার্ড ঘটনা। এর সঙ্গে আমরা যুক্ত নই।
যুক্ত আছিস। এসব নানাভাবে জানতে হয়। সোমাও কিছুটা দায়ী।
বিনু বলল, কাঠের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনে তোর বুঝি এটা মনে হয়েছে।
অজিতেশ বলল, সোমা, প্রথম দিন থেকে আরম্ভ করা যাক।
সোমা ফের বসে পড়ল। চারপাশের দরজা বন্ধ। ঘরটাকে সামান্য উষ্ণ রাখার আর দরকার হচ্ছে না। শীতকাল চলে যাচ্ছে। সোমা কিছু বলল না। সে শুনে যাচ্ছে। সে অজিতেশের গোঁফ নড়তে দেখল শুধু।
অজিতেশ বলল, প্রথম দিন থেকে মানে, সেই ছবি দেখার দিন থেকে, ছবিটা ছিল, বলে ছবির নাম এবং পরিচালকের নাম বলল। তোমরা সোমা সেই ছবিটাই তো দেখেছিলে!
সোমা মুখ তুলে তাকাল। ওর শরীর কাঁপছিল যেন। চোখ দুটো মায়াবী, এবং যেন জলছবির মতো নিরুপায় মুখ। সে বলল, হ্যাঁ। আর তখনই মনে হল ওর সাদা সিল্ক থেকে একটা চুমকি সত্যি জোনাকি হয়ে বাতাসে উড়ে গেল।
অজিতেশ বলল, তোমরা বুঝতে পারছ আমার খবরাখবর ঠিক।
বিনু হঠাৎ ক্ষেপে গেল। বলল, ধুস শালা, তুই একটা চারশো বিশ। তোকে তো আমি বলেছিলামরে, সোমা কী বই দেখার পর মনীষকে নিয়ে কফি—হাউসে গিয়েছিল। এর আবার খবরাখবর ঠিক বেঠিক কী।
অজিতেশ বেশ অবিকল নকল করে বলল, পৃথিবীটা ভারি মজার জায়গা হে বাপু। অত সহজে ক্ষেপে গেলেই চলে! বলেই সে বলল, ওটাতে একটা দৃশ্য ছিল, সোমা তুমি মনে করতে পার কিনা দ্যাখো। আমি বলার চেয়ে এখানে দেখ। প্রজেকটার দিয়ে তোমাকে সেই রিলটা দেখিয়ে দিচ্ছি বরং। বলে সে ওর লম্বা ব্যাগ থেকে সব টেনে টেনে বের করতে থাকল। সে বেশ নুয়ে থাকল ব্যাগের ওপর। ক্যানভাসের ব্যাগ, কিছুটা জাদুকরের মতো ওকে এখন দেখাচ্ছে। ক্যানভাসের ব্যাগ থেকে টেনে নামানোর চেয়ে সে হাত দিয়ে অনেকক্ষণ উপুড় হয়ে থাকল। সাপুড়ে ওঝার মতো সে যেন বের করেই জিনিসটা সবার ওপর ছুঁড়ে দেবে। সাপ—টাপের মতো কিছু একটা ছুঁড়ে দেবে—এমন মনে হচ্ছে ওর আচার—আচরণ দেখে। এবং সবার এতে ভয় পাবার কথা। চারপাশের মানুষ জনের ভিতর একটা এখন বিস্ময়কর সতর্কতা। সাপটা কার ওপরে এসে পড়বে কেউ বলতে পারে না। তবু নিজেদের রক্ষা করার জন্য সবাই সতর্ক থাকছে। যেন ছুঁড়ে দিলেই দুহাতে ঠেলে ফেলে ছুটতে পারে। কেবল সোমা এসব কিছু ভাবছে না। সাত আট দিনের মাথায় অজিতেশ এতদিনের একটা রহস্যকর ঘটনার সমাধান করতে চায়। ওর মনে মনে হাসি পেল।
অজিতেশ হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই সোজা হয়ে দাঁড়াল। সবার দিকে চোখ ঘোরাল। কী দেখল চোখ ঘুরিয়ে। তারপর বলল, এই দেখুন। সে টেবিলে স্ট্যান্ড বসিয়ে সামনের সাদা রঙের দেয়ালে আলো ফেলে ছবির রিলটা দেখাবে বলে বোতাম টিপে দিল। এবং তখনই দেয়ালে এক তরুণের ছবি। সে একটা মরুভূমির মতো বালিয়াড়ির ওপরে ছুটছে। চারপাশ থেকে পুলিশের রাইফেল, বেয়নেট চার্জ করার জন্য ওরাও ছুটছে। এবং সেই তরুণ এই বয়স তেইশ—চব্বিশ হবে, মুখে সামান্য দাড়ি, চোখ বড়, সে সব কিছু অন্যায় শোষণ দূর করার জন্য শহরের রাস্তায়, গ্রামের নির্জনতায়, চারপাশের মাঠে, সুন্দর সূর্য উঠলে শারীরিক কৌশলে এবং এক আশ্চর্য দৃঢ়তায় সে যখন পৃথিবীতে সুখী রাজপুত্র, তখনই অজিতেশ অনেক দূরে থেকে বলার মতো বলে চলল, সোমা তুমি ওকে ভালো করে দেখ। শৈশবে অথবা যখন তুমি নানাবর্ণের স্বপ্নের ভিতর বড় হয়ে উঠেছিলে, তখন তোমার বাবার আত্মহত্যা, তোমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। তুমি জানতে কেন তোমার বাবার এই আত্মহত্যা, তুমিও স্বপ্ন দেখতে, কোনো সকালে ঠিক এই ধরণিতে আশ্চর্য এক সকাল আসবে। সব মানুষ সুখী, তোমার বাবাকে সেখানে তেলেভাজা চুরি করে খেতে হবে না, তোমার মাকে…বলে সে থামল কিছুক্ষণের জন্য। আজীবন এমন একটা সকাল আসবে ভেবেছিলে। এবং এমন একজন তোমার পাশে কেউ থাকবে যার চোখ বড়, যে সুখী রাজপুত্রের মতো স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে।
রিলে তখন সেই তরুণ অথবা বলা যায় যুবাকে দেয়ালে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বর্তমান অসাম্যের জাগ্রত প্রহরী এই পুলিশের গুলি, ওর মাথায় বুকে পেটে, জঙ্ঘায় তুমি দৃশ্যটি দেখে কেঁদে ফেলেছিলে। সে কেমন সারমন দেবার মতো বলতে বলতে শেষে বলে ফেলল, তুমি কেঁদেছিলে কী না!
সোমা ঘাড় নিচু করে সম্মতি জানাল।
অজিতেশ বলল, মুখটা দেখ। চোখ দেখ। ফের সে রিল ঘুরিয়ে দিল।
সবাই ফের ছবিটা দেখল।
অজিতেশ বলল, আমি চাই মুখটা সোমা মুখস্থ করে ফেলুক।
সোমা বলল, আমার মনে থাকবে।
অজিতেশ বলল, মুখটা কিন্তু যুবার আসল মুখ নয়। মেক—আপ নেবার পর।
বিনু বলল, তারপর কী!
এবং সঙ্গে সঙ্গে অজিতেশ রিল বন্ধ করে দিল। তারপর বসে পড়ল। এখন ওরা আগের মতো বসে রয়েছে। টেবিলে স্ট্যান্ড তিনটে পা যেন। জিরাফের মতো গলা উঁচু করে রেখেছে। এবং দেখলে মনে হবে এই নীল অন্ধকারে এ প্রজেকটারও একটা জীবের মতো। যেন ওরা এখন সাত জন। ওর জন্যও আলাদা একটা চেয়ার দরকার।
অজিতেশ বলল, এবারে সোমা তোমাকে বলতে চাই, সেই অভিনেতাকে তুমি কফি—হাউসে দেখেছিলে। তুমি এত সুন্দর, সবাই তোমাকে দেখছে, অথচ তুমি ওকে দেখছ, বারবার ওকে দেখছ, সেও এমন সুন্দরী যুবতী ওকে এত দেখছে ভেবে অবাক হয়নি, কারণ সে প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছে, এবার থেকে অনেকেই ওকে দেখবে তাতে বেশি কী। আসলে ব্যাপারটা সেখানেও নয়। সে তোমার মতো মেয়ের রূপ ভুলতে পারছিল না। ওর চোখে ছিল উদাসীনতা। যেন এসব কিছু না। আরও সে ওপরে উঠবে। বহু সুন্দরীদের সে ক্রমে লোভনীয় বস্তু হয়ে যাবে।
সোমা বলল, অজিতেশ, তুমি আমাকে ঘাবড়ে দিও না।
অজিতেশের গোঁফ আবার লম্বা হয়ে গেল। বলল, সেই অভিনেতার গালে দাড়ি না থাকলে কেমন দেখায়! তুমি ভাবছিলে ওকে যেন কোথায় দেখেছ! কত কালের চেনা, কিন্তু ঠিক কারও সঙ্গে মেলাতে পারছ না। ছবির মতো ওর মুখে দাড়ি গোঁফ ছিল না। কিন্তু চোখ দুটো ছিল একরকমের। তুমি কিছুতেই মেলাতে পারছিলে না।
সোমা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, না না! মিথ্যে কথা।
অজিতেশ বলল, সোমা, তুমি বসো। উত্তেজিত হবে না।
সোমা একেবারে বসে গেল। সে চেয়ারে মাথা হেলান দিয়ে ছাদে যেন কী দেখছে। আসলে কিছুই দেখছে না। শূন্য দৃষ্টি। সে বলতে পারত, তুমি ঠিক বলেছ অজিতেশ। এতদিনে আমি ওকে চিনতে পেরেছি।
অজিতেশ বলল, চারপাশে যখন দুর্ঘটনা, যখন হত্যাকাণ্ড, সুখী রাজপুত্রেরা পৃথিবীতে সু—সময় আনবে বলে যখন বাজি ধরেছে তখন তোমরা নিশ্চিন্তে ছবি দেখবে, কোনো ভাবনা থাকবে না, এটা তোমার বন্ধুদের কেউ চাইল না। বলেই সে আবার ঘাড় নিচু করে দিল। সেই ক্যানভাসের ব্যাগ থেকে বের করল একটা খাতা। বলল, এখানে সবাই যদি একটা চিঠি লিখে দেন মনীষ দত্তকে। লিখবেন, যে যেভাবে পারবেন লিখবেন। চিঠিটা মনীষ দত্তকে উদ্দেশ্য করে লেখা। ওর নাম ঠিকানা থাকবে। লাল কালিতে লিখবেন।
বিনু আর এখন কিছু বলতে পারছে না। সে দেখল অজিতেশ এখন বাজিকরের মতো ভারি সব সুন্দর সুন্দর খেলা দেখাচ্ছে। সে খাতাটা নিয়ে লিখল, মনীষ দত্ত…।
সুধীর লিখল, আরও কিছু।
অসিত বলল, আমিও কিছু লিখে দিচ্ছি।
অশোক বলল, কী লিখব বুঝতে পারছি না।
তারপর অজিতেশ লেখাগুলো বের করে একটা লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দিল। দ্যাখ তো দুটো লেখাতে মিল আছে কিনা।
একেবারে এক। হাতের লেখা এক।
অজিতেশ এবারে দু হাতের ওপর টেবিলে ঝুঁকে দাঁড়াল। বলল, অশোক তুমি থ্রেটনিঙের চিঠি দিয়েছিলে! ছেলেমানুষী। আসলে তোমার কোনো মতলবই ছিল না খুন—টুন করার। সেদিন কফি—হাউসে এমন একজোড়া পায়রা আকাশের নিচে খুব বকম বকম করে উড়ে বেড়াচ্ছে বলে হিংসে হয়েছিল। কী করে জব্দ করা যায় ভেবেছিলে। কত উড়ো চিঠি আসছে, ভয়ে পুলিশে উড়ো চিঠি জমা দিচ্ছে না এসব ভালো করে জানতে। মনীষকে একটু ঘাবড়ে দিয়ে কাপুরুষের মতো প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলে! চিঠিটা তুমি নিজের হাতেই রসুলকে দিয়ে গেছিলে। নাম বলেছিলে অঞ্জন? ঠিক?
অশোক বলল, আমি কিছু বলব না।
সুধীর বলল, কিন্তু ও তো একচুয়েলি খুন করেনি!
অজিতেশ হাসল। খুব প্রাজ্ঞ ব্যক্তির মতো হাসল। বলল, না। অশোকের ঐ চিঠি লেখাই সার। ওর আর কিছু করার ক্ষমতা নেই।
অসিত বলল, তাহলে!
সোমা তখন বাধা দিয়ে বলল, হঠাৎ কেউ কেউ আসত দেখা করতে। কিন্তু দেখা হত না।
সুধীর বলল, আমি একদিন এসে দেখা পাইনি তোর! কেবল নাম জানতে চায়। যত বলি, এলেই চিনতে পারবে, নাম বলার দরকার হবে না, ততই তোমার লোকেরা ক্ষেপে যায়। রাগ করে শেষে চলে গেছি। হাতের কাছে ফোন থাকলে একচোট নিতাম। তারপর মনে হয়েছে, যাকগে বড়লোক হয়ে গেলে এমনি হয়ে থাকে। নালিশ করার প্রয়োজন মনে করিনি। আগেই বলেছিলাম, না হলে এ—থেকে তোমরা একটা ক্লু বের করার চেষ্টা করবে।
অজিতেশ বলল, ওটা একদিনই হয়েছে। অথচ এমনভাবে একটা ভয়ের ভিতর তোমরা পড়ে গেলে যে মনে হত বারবার এটা তোমাদের জীবনে ঘটছে। নতুবা বাথরুমে কেউ ঢুকে যাবে না। আয়নায় কারও ছবি ভেসে ওঠে না। কীভাবে এইসব সুখী রাজপুত্রেরা যে তোমাদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিল, বুঝতে পারছ না! ভয়ংকর একটা ইলুসানের ভিতর ডুবে গেছিলে।
সোমা বলল, চিঠিটা পাবার পর আমি কেন যে ওকে বললাম, জানি সে আসবে!
মনীষ তখন কী বলেছিল? অজিতেশ প্রশ্ন করল।
মনীষ আর্তনাদ করে উঠেছিল। বলেছিল, কী বলছ সোমা!
বিনু বলল, ওভাবেই তুমি ওকে আরও বেশি ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।
অজিতেশ বলল, সোমার সেই যে শৈশবে স্বপ্ন ছিল, সুখী রাজপুত্রেরা এসে ওর বাবার মৃত্যুর শোধ নেবে, এবং সে কোনোদিন যেজন্য কাজল পরল না, অথচ বড় হতে হতে সে সুখী রাজপুত্র ভেবে মনীষকেই বিয়ে করে ফেলল, তারপর দেখা গেল, না মনীষ ঠিক সুখী রাজপুত্র নয়। বরং সে শহরের সেই সেরিফ ভদ্রলোকটির মতো, যার কাণ্ডজ্ঞান একেবারেই নেই—আর আমরা এ—ভাবে সবাই তরুণ বয়সে এমন স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি, বয়স বাড়ে, ক্রমে আমরা কঠিন রাস্তায় হেঁটে হেঁটে স্বপ্নের কথা ভুলে যাই। মনীষও ভুলে গিয়েছিল। সোমার তখন মনে হত, কেউ আসবে। আর এ—পথেই সোমার সংসারে গণ্ডগোল এমনভাবে দানা বেঁধে গেল যা মনীষের মৃত্যুর কারণ।
অসিত বলল, মনীষবাবু তো পালাচ্ছিল। অথচ ট্রেনের নিচে পড়ে গেল পালাতে গিয়ে।
আমরা এর আগে বিনুকে কিছু জিজ্ঞাসা করব। আচ্ছা বিনু, তুমি কি কোনো ভয় দেখিয়েছিলে!
সে বলল, না তো।
মনে করে দ্যাখো।
বিনু বলল, যেদিন সে পালিয়েছিল, সেদিন বিকেলের দিকে ওকে একবার ফোন করেছিলাম।
ফোনে কী বলেছিলে?
ফোনে…ফোনে! সে মনে করার চেষ্টা করল।—অঃ। মনে পড়ে গেল কথাটা। বলেছিলাম, কে এক জহুরিমল না হুজুরীমলের গলা কেটে দিয়েছে। ঘটনাটা চিৎপুরে ঘটেছিল।
একটা লোক ভয়ে মরে যাচ্ছে, তুমি ওকে আরও ভয় পাইয়ে দিলে। ওতো পালাবেই।
আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।
কেউ আমরা বুঝতে পারিনি। অসিত বলল।
অজিতেশ বলল, আপনারা এখন বুঝতে পারছেন, ভয় কখনও কী ভয়ংকর হয়ে যায়। এবং অহেতুক মৃত্যুকে টেনে আনে! আমরা মনীষের কাছে কিছু শুনতে চাই। আসুন না আমরা ভাবি ঐ যে খালি চেয়ারটা রাখা হয়েছে সেখানে মনীষ বসে আছে। আপনারা সবাই ভাবুন খালি চেয়ারটাতে মনীষ বসে রয়েছে। ওকে সবাই আপনারা প্রশ্ন করুন। তারপর কী! তুমি কোথায় কীভাবে পড়ে গেলে, না কেউ তোমাকে কামরায় মেরে ট্রেনের চাকার নিচে ফেলে গিয়েছে। আপনারা সবাই কায়মনোবাক্যে প্রশ্ন করে যান। যান। বলুন। নিবিষ্ট হোন। দেখুন নীল অন্ধকারে খালি চেয়ার এবং সোমার সাদা সিল্কে একটাও চুমকি আর নেই, সব জোনাকি হয়ে গেছে। ছাদটাকে ছাদ আর মনে করবেন না, নীল আকাশ ভেবে ফেলুন। দেখুন সেখানে সব জোনাকি পোকারা একে একে সব নক্ষত্র হয়ে গেছে। আপনারা সবাই কোনো মহাকাশযানে চড়ে আত্মার অন্য স্তরে চলে যাচ্ছেন। ভাবুন, এ—ভাবে ভাবুন! দেখুন ঐ তো, ঐ তো মনীষ ঘাড় নিচু করে বসে আছে। চেয়ারটা আর খালি নেই। অন্ধকারের ভিতর থেকে চেয়ারটায় অস্পষ্ট কিছু যে দেখছেন, ঐ মনীষ। সে এবার আপনাদের মানুষের অধম চরিত্রহীনতার কথা বলবে। মানুষ যে কখনও সম্পূর্ণ নয় তার কথা বলবে। তাকে এবার চুপচাপ বলতে দিন।
