এর নাম জীবন বলে
তখন থাকি নৈহাটি,বাসা ভাড়া অর্থাৎ ভাড়া বাড়িতে থাকি। পাশের বাড়িতে মুখোমুখি থাকেন এক দম্পতি,গনাদা আর মিনতি বৌদি । বয়স আনুমানিক 45 গনা দার আর মিনতি বৌদি 35 । বাঙাল বৌদি আর দাদা ঘটি । সংসার সাজানো গোছানো -পরিপাটি । নাম মিনতি হলে কি হবে বউদি কাজে ঠিক তার উল্টোটি ।
সেদিন রবিবার ছুটির দিন । অফিস ছুটি ,বাড়িতেই মানে ওই বাসায় বসে বসে ভাবছি কি করা যায়? অফিস না থাকায় ক্যান্টিন ও বন্ধ। আমি ব্যাচেলর মানুষ ,রান্না বান্নাও জানি না । হোটেলে যে খাবো তাতে ও জ্বালা । কেন না আমি বারোমেসে পেট রুগী। কি করি -কি করি ,ভাবছি বসে বসে ।
হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল মাথায় । গতকাল অফিস থেকে ফেরার সময় বৌদিও দাদার কথোপকথন যেটুকু কানে এসেছিল
—–ওগো শুনছো —
—হ্যাঁ বলো
—–কালতো রবিবার , খেয়াল আছে তো ?
—হ্যাঁ আছে, কেন ?
—–সেকি এর মধ্যে ভুলে গেলে —
—কি ভুলে গেলাম ? —-আরে সেদিন যে বললাম। ——কি বললে? ——–হায় ভগবান! এ কার হাতে পড়েছি আমি— —–আরে বাবা ভ্যানতারা বাদ দিয়ে বোলেই ফেলোনা …।
—–কাল একটু কচু এনো বাজার থেকে । অনেক দিন খাই নি !
—- ওহ আচ্ছা , এই কথা। আমি ভাবলাম কি না কি ! আনবো বাবা আনবো । ভাগ্যিস তোমরা এদেশে এসেছিলে —।
আর বিশেষ কিছু শোনা গেল না । পথ চলতে আর কতটুকুই বা শোনা যায় ।
সকাল নটার সময় আমি গনা দার বাড়ি গিয়ে হাজির । ধান্দা ,দুপরের দক্ষিণ হস্তের কাজটা যদি এখানে সারা যায় । অবশ্য মাঝে মাঝে যে সে কর্ম টা হয়না তা নয় ।
—-বৌদি কেমন আছেন ,গনাদা কই ?
—- ওহ তুমি এলে ঠাকুরপো।- কতদিন আসো নি বলতো । ভালো হয়েছে তুমি এসেছ । স্থির হয়ে বসতো একটু । এই বলে বৌদি রান্না ঘর থেকে পিড়েটা বাইরে পেতে দিলেন ।
—দাদা কই ? দেখছি না যে ?
—–বাজারে গেছেন , অনেকক্ষণ । তবে এই এলো বলে । তা তুমি চা খাবে তো ঠাকুরপো ?
—- চা ?-তা দাও – একটু। পিঁড়ের উপর বসে বউদির সাথে কথা বলছি আর বউদি ও চা বসাবেন বলে কলতলা থেকে চা করার সসপ্যান নিয়ে দাওয়ায় উঠবেন…।
বলতে বলতে গনাদা হাজির । হাতে একটা বিশাল ব্যাগ । একটি লম্বা নধর সলা কচু দৃশ্যমান । কচু দেখে বৌদি তো বহুত খুশ ।
—তুমিও তো চা খাবে নাকি ?
—-তা দাও একটু ।
চা খাওয়া তো হলো । বললাম —বৌদি আজ উঠি । কাচা কাচি করতে হবে। তাছাড়া -রান্না ও -করতে হবে —
—-সেকি ভাই । আজ রান্না করবে মানে ?
—- রান্না করবো না? বলি -দুপুরে খাবো টা কি ? হরিমটর ?
—–আরে -না -না । আজ দুপুরে এখানেই খেয়ো । তোমার দাদা কচু এনেছে না ?
—-আমার কিন্তু আসতে একটু দেরি হবে বৌদি ।
—–ঠিক আছে, তুমি ওই একটা -দেড়টার মধ্যেই এসো ।
আমি তো হাতে চাঁদ পেলাম ।
বাসায় ফিরে দরকারি কাজ গুলো সারলাম । কাচাকাচি টাও নমোনমো করে সার লাম । টিভির সুইচের কানটা মুড়ে একটা চ্যানেলে লাগিয়ে একটু বাসি সিরিয়াল (আমার কাছে অবশ্য টাটকা, কারণ প্রতি দিন ছুটির পরে সুমনার সাথে আউটরাম ঘাটে আড্ডা মেরে ফিরতে ফিরতেই সব শ্যাষ )দেখছিলাম আর একটি সিগারেট ধরিয়ে আরাম করে খেতে খেতে বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম । শালা ঘড়ির কাঁটাও বেইমান । নড়তেই চায় না । ও দিকে পেটের মধ্যে ছুঁচোরা ডন -বৈঠক মারা শুরু হয়ে দিয়েছে । যাক্ বাবা অনেক কষ্টে……
প্রায় পৌনে একটা । কখন একটা বাজবে আর আমিও ও বাড়ি যাবো ।
এমনই সময় ও বাড়ি থেকেই চিল চিৎকার ,গনাদা আর বৌদির ।
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলাম । গিয়ে দেখি গনাদা লাফাচ্ছেন আর বৌদি ও চিৎকার করে কাঁপাচ্ছেন পাড়া ।
——ওরে , আমার গলা গেলো রে –ওরে ও পুঁটি কোথায় গেলি মা। পুঁটি হলো গনাদা ও মিনতি বৌদির একমাত্র আদরের লাডলি -বয়স ৭-৮ । একটু তেঁতুল আন দৌড়ে । এই বাঙাল শালীর পাল্লায় পড়ে আমার গলা টা বোধহয় গেল । শালার কচু আমার গলাটা কে দিলো… –আমায় আদর করে টেস্ট করাচ্ছে ?
—–এই বাঙাল বলে গাল দেবে না বলছি –ভালো হবে না কিন্তু —
——কেন কি করবি , বাঙাল -শালা -একশো বার বলবো –হাজার বার বলবো -শালা বাঙাল -বাঙাল -বাঙাল ।
–কি ? তুমি ঘটি , তোমার না ছিল চটি । আমার বাবার পয়সায় ব্যবসা —
—-তোর বাপের পয়সা ? কত টাকা দিয়েছে রে তোর বাপ, হোতলা হাতি বিদায়ে –
—-এই খবরদার বাপ তুলবে না বলছি –কি আমি হোতলা হাতি ? তো বিয়ের আগে এই হোতলা হাতির পিছনে ঘুরঘুর করতে কেন ?
এভাবে তুলকালাম কাণ্ড । আমি অনেক কষ্টে রান্না ঘর থেকে লেবু এনে গনাদা কে খাইয়ে চুপ করালাম
কচু বাদ বাকি পদ সেটাও অবশ্যই খারাপ নয় ,ডাল ,বেগুন ভাজা, সর্ষে ইলিশ ,যদিও 1500/কিলো ,,চাটনি দিয়ে খ্যাঁটন সারলাম ও যথারীতি নিজের বাসায় ফিরলাম । পরে কি হলো জানিনা ।
বিকেল বেলায় স্টেশন পাড়ায় প্রতি রবিবারের মতো আড্ডা দিতে গেছি,দেখি গনাদা আর মিনতি বৌদি আদরের পুঁটি কে নিয়ে যাচ্ছেন ।
–ও গনাদা চললে কোথায় ?
আর বলিস না ভাই –নবীনাতে —সিনেমা দেখতে
“কুছ কুছ হোতা হ্যায় ” ।
এর নাম জীবন !
সব কিছুই মানিয়ে নে মন !
