শেষ যাত্রা
ঠকাঠক ঠকাঠক শব্দ গুলো আছড়ে পড়ছে বুকের মধ্যে। হৃদয় ভাঙার শব্দ ভাগ্যিস শোনা যায় না, কি লজ্জায় না পড়তে হতো ওদের সামনে, ওরা তো হেসে গড়িয়ে পড়তো। একটা শ্যাওলা ধরা ভাঙাচোরা বাড়ির জন্য ঠাকুমার কষ্টটা ওদের কাছে বড়োই হাস্যকর । নাঃ, বহু চেষ্টা করেও আটকানো গেল না! আর একার সাধ্যই বা কতটুকু !
তিন ছেলে আর তাদের বৌয়েরাই শুধু নয় মেয়ে জামাই পর্যন্ত….
সকলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কতক্ষণ যুদ্ধ করতে পারা যায়! তাও আবার একা!
বাড়িটা ছেড়ে চলে যেতে হবে!ভাবতে পারছি না।
চারতলা ফ্ল্যাট হবেএখানে। আজ সকাল থেকে বাড়ীভাঙা শুরু করে দিয়েছে প্রোমোটারের লোকজন। কথা ছিল দিন পনেরো পর ভাঙাভাঙি শুরু হবে প্রোমোটারের ধৈর্য থাকলেও বুবু আর জামাইয়ের ধৈর্যটুকু সইলো না। কতদিনের কতো পুরনো স্মৃতি! বুকের ভেতর আগলে রাখা দিন!
কত স্মৃতিই না জড়িয়ে আছে বাড়িটা কে ঘিরে ! ফেলে আসা দিনগুলো জীবন্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় বাড়িটার আনাচে কানাচে! ঘুরে বেড়াই আমিও, বাতের ব্যথা যতই অস্থির করে তুলুক চারদিক ঘুরে না দেখলে শান্তি পাই না।
রোজকার মতো আজো চাল আর গমের দানা ছড়িয়ে দিতেই পায়রা গুলো ঝটপট করে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে নেমে এসে ঘিরে ধরলো আমাকে। মনটা বড়ো খারাপ হয়ে গেল। আরো কিছু শস্য দানা ছড়িয়ে দিলাম শেষ বারের মতো। পায়রাগুলো যেন খানিকটা হতচকিত হয়ে আশ্চর্য চোখে চেয়ে দেখলো একবার, ওরাও হয়তো বুঝতে পেরেছে…..
রোজকার মতো আজও মালতী ধোয়ামোছা করে রান্না করে রেখে গেছে এবেলার মতো। বিকেলে আবার আসবে । রাতে এখানেই থাকে। বয়স্ক মানুষ কখন কী দরকার হবে বলা যায়!
চকমেলানো বারান্দাটা একসময় ঝকঝক করতো,কত কথাই না মনে পড়ছে! বিয়ের পরদিন বাসি বিয়ে সেরে শ্বশুরবাড়ি আসতেই দুধে-আলতার পায়ের ছাপ ফেলে ফেলে যখন আসছিলাম, খুব অবাক হয়ে গেছিলাম। এত বড়ো বড়ো ঘর কাটা কেন? এ বাড়িতে কী বড়োরাও এক্কা দোক্কা খেলে নাকি! ভাগ্যিস জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি না হলে কী ভাবত সব, কে জানে!
কুকুরটা কেমন আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে আর লেজ নাড়ছে। ওরা বোধহয় অনেক কিছু বুঝতে পারে!
একবার ছাদে উঠে শেষবারের মতো চারপাশটা দেখতে ইচ্ছে করছে । কিন্তু পায়ের যা অবস্থা! ঠিক মতো হাঁটতেও পারি না যে!
চোখদুটো বারবার জলে ভরে উঠছে আমার।
কাল সকালে বুবু আমাকে নিতে আসবে, বলেছে সব গুছিয়ে নিতে। গুছিয়ে নেবার মতো কীই বা আছে আমার!
শ্বশুর বাড়ি হলে কী হয় , আমার বড়ো হয়ে ওঠা তো এই বাড়িতেই!
ন বছর বয়স থেকেই জেনেছিলাম এটাই আমার আসল বাড়ি, একান্ত আপন জনের মতো বাড়িটা সবাইকে বুকের মধ্যে আগলে রেখেছিল।
জড়িয়ে নিয়েছিল মায়া মমতা আর ভালবাসা দিয়ে।
শ্যাওলা ধরা পোড়ো বাড়িটার আনাচে কানাচে আশ্চর্য এক স্নেহময় ছায়ার অনুভূতি আজো টের পাই।
সময়ের স্রোতে সবকিছুই একদিন হারিয়ে যায় , নশ্বর জীবনে আমিও হারিয়ে যাবো একদিন, হারিয়ে যাবে এই সব স্মৃতি গুলোও।
বাড়ীটাও হারিয়ে যাবে স্মৃতিগুলোকে বুকের মধ্যে নিয়ে।
তবুও বাতের ব্যথায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অশরীরী প্রেতের মতো বাড়িটার আনাচে কানাচে দিন রাত ঐ স্মৃতিগুলোকেই হাতড়ে বেড়াই।
এটাকেই বোধহয় মায়া বলে। মায়ার টান বড়ো টান! এ টান বড়ো সাঙ্ঘাতিক! নাড়ীর টানের থেকেও বেশী। না হবেই বা কেন। সেই যে নবছর বয়সে বিয়ে হয়ে এলাম তারপর কদিনই বা এই বাড়ীর বাইরে থেকেছি!
শাশুড়ী,দিদি-শাশুড়ী, শ্বশুরমশায়,ভাসুর ,জা এদের ভালবাসা ভুলিয়ে দিয়েছিল বাপের বাড়ির বিচ্ছেদ-ব্যথা। বছরকয়েক পর একে একে দুবছরের ব্যবধানে অমল, বিমল আর অতনু জন্মালো। বড়ো জায়েরও চার ছেলে তাই সকলের ইচ্ছে আমার একটা মেয়ে হোক। তা হলোও! অতনুর জন্মের পাঁচবছর পর জন্মালো বুবু। বুবুর ভারি আদর এ বাড়ীতে! হলে কী হয় মেয়েটা এই বাড়ীটাকে কোনদিনই ঠিক তেমন ভাবে ভালবাসতে পারলো না। আজ ওই উঠে পড়ে লেগেছে বাড়িটা তাড়াতাড়ি ভেঙে ফেলার জন্য।
বাড়িটার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা লতা গুল্মের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পায় নি ওরা। দীর্ঘশ্বাসের শব্দে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে ।
ভাশুরের অংশে বড়, মেজ দুই ছেলে বাড়িতেই থাকে , বাকী দুজনেই আমেরিকায়। গ্রীন কার্ড নিয়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছে। মা বাবা মারা যেতেই এখানের পাট চুকিয়ে দিয়েছে।
বিয়েও করেছে যে যার নিজের পছন্দ মতো।
অমল, বিমল দুজনেই ব্যাঙ্গালোরে ,অতনুটা কলকাতায় আর বুবু আসানসোলে। কাছে থাকে বলেই মায়ের উপর জোরটা ওরই বেশী । বুবু অনেকবারই বলেছে ওর ওখানে থাকতে । বলে ‘একা একা থাকো! আমাদের বড়ো চিন্তা হয়, আমার ওখানেই না হয় থাকলে..
বলেছিলাম -‘মালতী যদ্দিন আছে চিন্তা নাই, ওর বিয়ের পর না হয় দেখা যাবে! ‘ একবার বুবু নিয়ে গেছিল ওর ওখানে এক সপ্তাহ ছিলাম ।দুজনেই অফিস চলে যায়, মেয়েটা তো হস্টেলে, ভীষণ একা লাগতো সারাদিন। এখানে একাকীত্ব বোধ বলে কিছু আছে বলে মনেই হয়না।
পুরানো সবকিছুই একে একে বেচে দিলো বুবু,বলেছিলাম ‘অয়েল পেন্টিংগুলো থাক না! ‘ বলে কিনা ‘এসব রাখার জায়গা আছে নাকি! ‘
মায়া-মমতা ,আবেগ বরাবরই ওর কম।
কড়িকাঠের ফাঁকে ফোঁকরে কতকগুলো চড়ুই পাখি বাসা বেঁধে আছে, ওরাই বা কোথায় যাবে!
দ্রুত প্রবহমান জীবনে কারোর থাকা না থাকায় কোনো কিছুই আসে যায় না।
মুহূর্ত গুলি ছড়ানো রয়েছে চারপাশে, স্বপ্নের মায়াজাল!
এখানে রুখা-শুখা রাঢ় অঞ্চলে অনেক কিছুর অভাব থাকলেও বসন্তে পলাশ আর শিমুল ফুটতো অনেক।কতদিন অফিস থেকে ফিরেই ঘরে ঢুকে বলতো ‘চোখ বন্ধ করো’ চোখ বন্ধ করতেই একমুঠো পলাশের কুঁড়ি গুঁজে দিত হাতের মধ্যে। গুরুজনদের চোখ বাঁচিয়ে টুকরো টুকরো ঘটনার মধুর স্মৃতিগুলো আজও জ্বলজ্বল করছে মনের মধ্যে, মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা! তাই বা কেমন করে হয়,ওনার চলে যাওয়াই তো দশ বছর হলো। কী সুন্দরই না ছিল সেই দিনগুলো!
কত মায়ার বন্ধন এই বাড়ীটা জুড়ে!
কাল সকালে বুবু নিতে আসবে, মনটা ভালো নেই। এখানটা ছেড়ে যেতে মন সায় দিচ্ছে না।
খিড়কির পানা পুকুরে সেই পদ্ম ফুটবে, ভোরের আকাশে রঙ ছড়িয়ে সূর্য উঠবে!
…সন্ধ্যা হয়ে গেল নাকি, না মেঘ করেছে! এত অন্ধকার কেন! মালতীটা এলো না এখনো, এত দেরি তো করে না! তুলসীতলায়,ঠাকুর ঘরে সন্ধ্যা-প্রদীপ জ্বালিয়ে ধূপ-ধুনো দেয় প্রতিদিন।
….একি! তুমি ,বুবু কী তোমাকে পাঠালো নাকি!
-না না আমিই তোমাকে নিতে এসেছি। বুবুর কাছে থাকতে তোমার কষ্ট হবে বলেই তো এলাম।
-চড়ুইগুলো কে দেখবে?
-যাবার আগে ওদেরকেও উড়িয়ে দিয়ে যাও।
-আচ্ছা বাবা, আচ্ছা ঠিক আছে ,একটু অপেক্ষা করো।
-বেশী দেরী করো না যেন!
-না না এই তো আসছি।
কী আনন্দ যে হচ্ছে, বুবুর বাবা এসেছেন আমাকে নিতে!….
কিন্তু আমার চোখের উপরটা ভারি হয়ে আসছে চোখ খুলতেই পারছিনা। কেমন একটা শীতল অনুভূতি,শরীরটা ওঠাতে পর্যন্ত পারছি না যে!
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন, দু হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আমাকে জড়িয়ে ধরবেন বলে। কী লজ্জা, কী লজ্জা!
উফফ কী একটা যেন বুকের ভেতর থেকে প্রবল বেগে ঠেলে বেরিয়ে আসার জন্য ভয়ঙ্কর মোচড় দিচ্ছে, ভীষণ কষ্ট! ওহ কষ্টের দলাটা গলা বেয়ে ফ্যাস করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতেই অসম্ভব হালকা হয়ে গেল শরীরটা। এগিয়ে এসে উনি আমার হাত ধরেছেন, হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন
