প্রথাগত সেই জীবন
রাহুলের বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় পাঁচ বছর হতে চললো। বিয়ের আগের জীবনটা ছিল একেবারে ‘সিঙ্গেল কিং’। নিজের পছন্দমতো খাওয়া, ঘুম, সিনেমা, বন্ধু আড্ডা—সবকিছুই নিজের মত করে চলা। রাহুল সেই সময় ভাবতো—”বিয়ে মানেই বাঁধন, দায়, দায়িত্ব, ঝামেলা!” কিন্তু কে জানতো, এই দায়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কত হাসি, কত কান্না, কত চমৎকার জীবনের ঘ্রাণ।
রাহুল একদিন বন্ধুর আড্ডাতে বসে ছিল। আড্ডার মাঝেই পুষ্কর হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলো—
“এই রাহুল, তুই বিয়ে করে কি কি পেলি বলতো?”
সবাই গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু রাহুল যে উত্তর দিল, সেটা শোনার পর সবাই প্রথমে হো হো করে হেসে উঠলো, তারপর একসময় সবাই চুপ করে গেল, কারণ মজার মাঝে লুকোনো ছিল খাঁটি সত্য।
রাহুল, “বিয়ে করে প্রথমেই তো একটা বউ পেয়েছি।”
বলতে বলতে রাহুলের ঠোঁটের কোণে নরম একটা হাসি ফুটে উঠলো।
তন্বী—সে শুধু বউ না, রাহুলের জীবনের প্রতিদিনের সঙ্গী, সান্ত্বনা, ঝগড়া, অভিমান আর নিঃশব্দ ভালোবাসার জায়গা।
রাহুল হেসে বললো— “পকেটে মোবাইল থাকে, কিন্তু আগে কখনো দিনের পর দিন একটা কলও আসতো না। এখন যদি ৫ মিনিট বাড়ি ফিরতে দেরি হয়, সঙ্গে সঙ্গে কল আসে—’তুমি এখন কোথায়?’ এই জিজ্ঞেসটাই এমন যে মনে হয়—আমি কারো জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ!”
বন্ধুরা একটু থমকে গেল। কেউ যেন অদৃশ্যভাবে নিজের জীবনের ফাঁকা জায়গায় আঙুল দিয়ে দেখলো।
তন্বী খাবার রাঁধে দারুণ। আগে রাহুল ইনস্ট্যান্ট নুডুলস খেয়ে দিন পার করে দিত। এখন তন্বীর হাতের গরম ভাত, ডাল, মাছ, সবজির গন্ধে ঘরে একটা বাড়ির স্বাদ আসে।
রাহুল মজা করে বললো— “আমি একসাথে কুকার, শেফ, ওয়াশিং মেশিন সবই পেয়েছি। শুধু ‘পাঞ্জাবীটা ময়লা’ বললেই মেশিন অটো চালু হয়ে যায়।”
সবাই আবার হো হো করে হাসলো। কিন্তু এই হাসির মাঝেই একটা কৃতজ্ঞতা ছিল, রাহুলের চোখে সেটা স্পষ্ট।
তন্বীর একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে— কোনো কারণ ছাড়াই মাঝে মাঝে টেপরেকর্ডার চালু হয়ে যায়!
কখনো তার কণ্ঠে ঝড়, কখনো হালকা বৃষ্টি, আবার কখনো ভেজা সন্ধ্যার মতো নরম সুর।
যেদিন রাহুল ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে— তন্বীর কথা কমে যায়। সেদিন শুধু চোখের হাসি… আর চা’র কাপে ধোঁয়া নীরবে নাচে।
সপ্তাহে একদিন বাজারের লিস্ট হাতে রাহুল—
চশমা নাকে দিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছাপোষা লোকের মতো হাঁটে। আর তন্বী বলে— “এইটা আনবে, ওইটা আনবে, ভুল করোনি যেন!” রাহুল মজা করে বলে— ” বিয়ের পরে আমি একটা ‘প্রাইভেট কেয়ারটেকার’ও পেয়েছি। আর রাতে ১১টার পরে হালকা মদ্যপান করে লুকিয়ে চুপি চুপি চুপি ঘরে ঢুকতে চাইলে , দেখি আমার বউ দারোয়ান সেজে দরজায় দাঁড়িয়ে !”
বন্ধুরা হেসে লুটোপুটি। কিন্তু পুষ্পা, আড্ডার একমাত্র বিবাহিতা মেয়ে, ধীরে ধীরে বললো—
“এটাই তো সঙ্গ… ভালোবাসা মানেই একটু নিয়ন্ত্রণ, একটু অভিমান, চাপা আদর।” সবার মুখ নিস্তব্ধ।
রাহুল চোখ নিচু করে বললো— “তারপর আমি একটা সন্তান পেয়েছি… সে যখন বলে ‘বাবা’, তখন সব ক্লান্তি যেন ধুয়ে মুছে যায়।” তাঁর কণ্ঠ কাঁপছিল। আড্ডার পরিবেশ খানিকটা বদলে গেল। সবাই যেন নীরব হয়ে নিজেদের ভিতরের শূন্যতা ছুঁয়ে দেখলো।
রাহুল আবার হেসে উঠলো— “প্রথমত কুমারত্ব হারালাম—যদিও মেডিকেল রিপোর্ট নেই!” হাসাহাসি, খিলখিল হাসি।
“আর রিমোটের উপর অধিকার নেই, মানিব্যাগের ভিতরের নোটরাও খুব তাড়াতাড়ি বিদায় নেয়। এমনকি মোবাইলটাও মাঝে মাঝে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়!”
বন্ধুরা এবার আবার হাসলো, কিন্তু তারা জানে—
এই ‘হারানো’গুলো আসলে নতুন কিছু পাওয়ার জায়গা।
শেষে রাহুল মৃদু স্বরে বললো— “জীবনে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, রোগ-সুস্থতা… সবকিছুতে পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষ পেয়েছি।
বুঝতে পারি না সবসময়…
কিন্তু বিয়ে মানে—জীবনের পথে হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি।”
আড্ডা নীরব। পুষ্কর বললো— “তা হলে বিয়ে মানে আসলে লাভই লাভ?”
রাহুল চোখ তুলে তাকালো—
“হ্যাঁ… যদি তুমি সম্পর্কটাকে জীবন্ত রাখো, যত্ন করো, ক্ষমা করো। বিয়ে মানে শুধু ভালোবাসা নয় , বিয়ে সহযাত্রা.”
তন্বী তখন দরজা খুলে ডাকে— “চলো, রাত হয়ে গেছে!”
রাহুল উঠে দাঁড়ায়, বন্ধুরা তাকিয়ে থাকে।
রাহুল হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভাবে—
“একটা কথা বলার মানুষ পাওয়া—
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।”
