পদ্মপুরাণ
এই পৃথিবীর সব মানুষই তার নিজের নামকে ভালোবাসে। কোথায় যেন কথাটা পড়েছিলাম কথাটা অনেক বছর আগে , মনে করতে পারছি না । আসলে মানুষের বয়সের সাথে সাথে স্মৃতিশক্তি কমে যায়, তার কর্মক্ষমতারও অবনতি ঘটে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। তা সেই ব্যতিক্রমী মানুষেরা হলেন রাজনৈতিক নেতা। আর সে জন্যই তো একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর চাকুরী থেকে অবসর।।
দেখতে দেখতে আমারও তো বয়স কম হল না, তা সে যতই চুলে কলপ লাগাই না কেন । তাই কবে কোথায় পড়েছি তা কি আর মনে থাকে।। আমার এ কথা শুনে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা ভাবছেন এ আবার কেমন কথা। সব্বারই যদি বয়সের সাথে সাথে স্মৃতি শক্তি কমে যায় বা কর্মদক্ষতা হ্রাস পায় তবে সরকার কেন উত্তরোত্তর অবসরকালীন বয়স বাড়িয়ে চলছে। যতই দেশে কোটি কোটি বেকার যুবক যুবতী থাকুক ? দেখ বাপু তা তাদের কি ইচ্ছে বা কি পলিসি তা আমি চুনোপুটি মানুষ কি করে জানবো ? তা যাক সে কথা । বয়সের এই হল আর একটা দোষ কি কথা বলতে গিয়ে কোথা থেকে ফ্যাকড়া বের করে কোন দিকে যে চলে যাই তার আর হুঁশ থাকে না। এ যেন ঠিক টিভির মেগাসিরিয়াল !
যাক, কি কথা দিয়ে যেন শুরু করেছিলাম -ওহ মনে পড়েছে প্রতিটা মানুষ নিজের নামটা ভীষণ ভালোবাসে, এই কথা দিয়ে । কিন্তু এটা কি বিলকুল ঠিক কথা ? আর ঠিকই যদি হবে তবে বাপু লোকে গাদাগূচ্চের অর্থ গচ্চা দিয়ে কোর্টে এফিডেভিট করে নাম পরিবর্তন করে কেন ? সব্বাই কি আর ওই সম্পত্তির জন্য না নিজের পরিচয় বদলানোর জন্য ? কি জানি বাপু আমার তো তা মনে হয় না । আমার তো মনে হয় এর বিপরীতটাই সেক্ষেত্রে সত্যি !
আমার ছোটবেলাটা কেটেছে এখন যেখানে আছি এই কোলকাতা থেকে বহূদ্দূরে একটা জেলার এঁদো গ্রামে । সে যাই হোক গ্রামটা আমার এঁদো হতে পারে কিন্তু মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ভালোবাসা তার উদার নীলাকাশের মতোই। কুলুকুল নদীর মিঠা কলতানের মতোই মনের সাথে মনের যোগ সেথায় । ফুরফুরে দখিনা বাতাসের মতোই প্রাণ জুড়ানো। শিশিরের মতো সিগ্ধ তার আন্তরিকতা । রাখালিয়া বাঁশির মতোই সুরের গুঞ্জন অহর্নিশি খেলে যায় সেখানকার মানুষের প্রাণে-মনে॥
সেই গ্রামেই আমাদের পাশের পাড়ায় থাকত পদ্মলোচন আদর করে কেউ ডাকে পদা আবার কেউ বা ডাকে পদু । তা সে পদা হোক বা ওই পদু তার বয়স তখন আমার চেয়ে দু এক বছর বেশি হলেও পড়ি আমরা একই ক্লাশে । নিন্দুকেরা যতই বলুক যে নাম নাকি স্বার্থকনামা হয় কদাচিৎ , কিন্তু আমাদের সেই পদা বা ওই পদুর কিন্তু পদ্মলোচন নাম স্বার্থক । সত্যি তার চোখদুটো যেন সদ্যফোটা কমলের মতোই । গায়ের রংটাও চমৎকার । শুধু সে স্লিম না হয়ে ওই এখনকার গোপাল ভাঁড় সিরিয়ালের গোপালের মতোই , একটু নাদুস -নুদুস ! আর সেটাই হয়েছে যতো জ্বালা ॥
আমরা যারা অত সুন্দর নয় দেখতে আমাদের মনে যে ওর উপর একটুও ঈর্জেষা ওই ইংরাজিতে যাকে জেলাসি ছিল না সে কথা বললে নির্ঘাত মিথ্যে বলা হবে । তবে তার জন্য যে আমার ওকে ভালোবাসতাম না একথা যদি কেউ বলে তবে তাকে শেম শেম ! ভালো আমরা প্রত্যকেই ওকে বাসতাম । সত্যি কথা বলতে কি খুবই বেশি বেশি বাসতাম । আরে বাবা ভালো না বেসে কি পারা যায় ! ওর চুরি করে আনা ওর মায়ের হাতের আঁচার , আমসত্ত্ব কি কম আমাদের পেটে ঢুকেছে? তবে তাই বলে যে ওর পিছনে আমরা লাগব না সেটা কি হয় কখনও ! কিন্তু কিছু কিছু বিচ্ছু ছেলে সব কালেই থাকে, যারা রসিকতা বা মজা বা ওই পেছনে লাগার ও যে একটা সীমানা থাকা দরকার সেটাই ভুলে যায়। আর তখনই সেটা আর রসিকতা থাকে না, হয়ে যায় নিষ্ঠুরতা ॥
আমাদের দলেও ঠিক সে রকম বেশ দুচার জন ছিল। বিপিন অর্থাৎ বিপনা ব্যাটাছেলে ছিল তাদের সর্দার । বিপিন আবার যে সে ছেলে নয় ‘কেলাসের ফাসটো বয়’ । সে বছর আবার ইস্কুলের ওয়াল ম্যাগাজিনে তার লেখা ছড়া প্রকাশ পেয়েছে , গুমোরে মাটিতে পা কি আর পড়ে !
তা হঠাৎ একদিন বিকালে খেলার শেষে খেলার মাঠের মাঝখানে সব্বাই বসেছি একসাথে । পদ্মলোচন অর্থাৎ পদা ওরফে পদু ও আছে আমাদের সেই দলে। বিপনা শুরু করলে তার কাব্যি
–ওরে ওরে ওরে ব্যাটা পদু
ছোট্ট বেলায় কত্ত তুই খেয়েছিলি কদু !
কেন তোর চেহারাটা বল এতো ভদু ?
নাকি তোর ওই লাল টমাটো দাদু
তোর গালেতে ঢেলেছিল একটি হাঁড়ি মধু ?
বল না সোনা যাদু
কেন যে দেরি করিস তু্ই শুদু ?
তা যেই না ছড়া শেষ আর যায় কোথা। পদা ক্ষিপ্র বাঘের মতো লাফ দিয়ে বিপিনের ঘাড়ে । নিমেষে হুড়োহুড়ি , মাঠের মধ্যে গড়াগড়ি – মারামারি কামড়াকামড়ি ও সে এক রক্তারক্তি ব্যাপার। দুজন কে ছাড়াতে গিয়ে আমার অত সাধের নতুন স্যান্ডো গেঞ্জি ফালাফালা । শেষমেষ অনেক কষ্টে দুজন কে আলাদা করা গেল ॥
পদা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি । তিন দিন ও আর ইস্কুল মুখো হলো না ! তার পরের দিন হাসি হাসি মুখে বীরদর্পে শ্রীমান পদ্মলোচন বাপের সাথে স্কুলে গিয়ে আগে হেডস্যার এর রুমে। আমাদের তো ভয়ে হাত -পা পেটের মধ্যে সেদিয়ে যাওয়ার জোগাড়। হেড স্যার মোহিণীবাবু যে স্বার্থক বিপরীত নামা । তার ইস্পেশাল ”ষষ্টি চরণে “র আদর নিয়ে তো কম গপ্প নেই !
প্রার্থণা শেষে সব্বাই ক্লাশ রুমে। বাংলা স্যার তরণী বাবু রোলকোলের খাতা নিয়ে ক্লাশে। আমার নামের দুজনের পরেই পদা সরি পদ্মলোচনের নাম । তরণী বাবু ডাকছে
—রোল নম্বর ওয়ান -বিপিন মাল -বিপিন বললে ইয়েস স্যার ।
-টু –থ্রি —
সেভেন -অনিকেত সাঁতরা –ইয়েস স্যার
রোল নম্বর -এইট – – – –
নাইন – — – –
-টেন – – –কমল কুমার মাইতি — পদা উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বল্লে –ইয়েস স্যার ।
সারা ক্লাশ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আর ওর মুখে বিজয়ীর হাসি ।।
