দ্বিধা (পর্ব ১৬ – ২০)
পর্ব ১৬
স্বয়ম্ভূর দেশের বাড়ির চারপাশে শাল, জামরুল,আম গাছ, স্বয়ম্ভূ গল্প করছিল একটু দূরে পাশাপাশি দুটো পুকুর,একটাতে পোনা মাছ, অন্যটায় রঙিন মাছের চাষ হয়, পুজোর পরদিন বেড়াতে নিয়ে যাবে সেঁজুতিকে, কথাগুলো বলার সময় একটা অদ্ভুত প্রসন্নতা ছড়িয়ে ছিল স্বয়ম্ভূর চোখেমুখে। শহুরে আদব কায়দায় চলতে অভ্যস্ত হলেও দেশের বাড়ির জন্য একটা আলাদা ভালোবাসা আছে স্বয়ম্ভূর, বুঝতে অসুবিধা হয় না সেঁজুতির,ওর মনে হয় সেই আনন্দ ভাগ করে নিতে চাইছে স্বয়ম্ভূ। দেশের বাড়িতে পৌঁছে এই কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল সেঁজুতির। সবার সঙ্গে পরিচয় হবার পর সেঁজুতি বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরোলে বাসবী দেবী বলেন একেবারে শাড়ি পরে নে, আমি সব একসাথে রেডি করে রেখেছি, ছোট সোনার ঝুমকো,হার পরে নিবি রাখলাম। সেঁজুতি: তুমি এখানে সোনা এনেছ কেন? বাসবী দেবী: তুই নিজের কোনো জিনিস এনেছিস? এখন বচসা শুরু না করে রেডি হয়ে পুজোর জোগাড়ে সাহায্য কর বরং। সেঁজুতি কথা না বাড়িয়ে শাড়ি পরে নেয়, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে পুজো বাড়িতে শাড়ি পরার নিয়ম কে বানিয়েছে কে জানে, ভালো লাগে না… চুল ভিজে থাকায় শুধু আঁচড়ে, একটা ছোট টিপ পরে আয়নায় নিজেকে দেখে হেসে বলে চল সেঁজুতি,পুজোর জোগাড় করতে হবে। দরজা খুলে আস্তে আস্তে পুজোর জায়গায় পৌঁছে দেখে স্বয়ম্ভূর মা, কাকিমার সঙ্গে মা ভোগের জোগাড় দিচ্ছেন। সেঁজুতি দেখে চম্পা দেবী বলেন এসো মা,বসো, শাড়িটা খুব মানিয়েছে, খুব সুন্দর লাগছে,পাশ থেকে কাকিমা বলেন হ্যাঁ,দিদি রূপে গুণে সেরা বাসবী দিদিভাই এর মেয়ে। বাসবী দেবী বলেন আয় বোস,এই ফলগুলো বরং কেটে দে। সবাই একসাথে পুজোর জোগাড় করতে থাকে। ছেলেদের সঙ্গে স্বয়ম্ভূ আগেই বেরিয়ে গেছে ঠাকুর আনতে। হঠাৎ একটু বৃষ্টি শুরু হলে চম্পা দেবী স্বয়ম্ভূকে ফোন করলে স্বয়ম্ভূ বলে চিন্তা করো না বৃষ্টি থামলে আমরা বেরোবো, এখন ঠাকুর গাড়িতে তোলা হয়েছে।
পর্ব ১৭
ঘন্টা খানেক পর কালি মাকে নিয়ে স্বয়ম্ভূরা এলে সুন্দর ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সেঁজুতি অবাক চোখে সমস্ত পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে, ওর কাছে একদম অন্যরকম নতুন অভিজ্ঞতা। কখন সাত্যকি বাবু এসে দাঁড়িয়েছেন বুঝতে পারে না, সাত্যকি বাবু: কেমন লাগছে পুজোর আয়োজন? সেঁজুতি একটু হতচকিত হয়ে, খুব ভালো লাগছে কাকু, আমার কাছে একদম নতুন অভিজ্ঞতা। সাত্যকি বাবু হেসে বলেন ইন্টারভিউ কেমন হয়েছে? সেঁজুতি: বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছি, দেখা যাক, কম্পানিটি ভালো, working hours reasonable, চাকরিটা পেলে খুব ভালো হয়। সাত্যকি বাবু: চিন্তা করো না মা, ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি তোমার ভালো হোক। উৎসব বাবু এলে একসাথে গল্প চলতে থাকে, সেঁজুতির মনে হয় পৃথিবীতে ভালো মানুষের সংখ্যা এখনো বেশি।পুজো সম্পূর্ণ হতে ভোররাত হয়ে যায়, ঠাকুর দালানের একটা থামে হেলান দিয়ে পুজো দেখতে দেখতে হালকা ঘুম এসে যায়। ঘুম ভাঙে স্বয়ম্ভূর হালকা ঠেলায়, একটু অস্বস্তির সাথে সেঁজুতি বলে মা, বাবা কোথায়? স্বয়ম্ভূ: ওনারা তো আগেই উঠে গেছেন, ভেবেছেন তুমি পুজো দেখছ, কিন্তু তুমিও যে ঘুমিয়ে পড়েছ কেউ টের পায়নি , সবাই খুব ক্লান্ত নিজেদের ঘরে চলে গেছে, আমি উঠে যাওয়ার সময় দেখলাম তুমি বসে আছ, কাছে এসে দেখি ঘুমিয়ে পড়েছ, একটু থেমে স্বয়ম্ভূ বলে ডাকতে খারাপ লাগছিল, ঘুমন্ত তোমার মুখটায় একটা অদ্ভুত মায়া আছে, মনে হয় দেখেই যাই, তারপর হঠাৎ সেঁজুতির হাতটা টেনে ধরে বলে চলো এখানে কেউ নেই,কালী মাকে সামনে থেকে দুজনে প্রণাম করবো, ঘটনার আকস্মিকতায় সেঁজুতি স্বয়ম্ভূর সাথে ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করে চোখ বুজে। স্বয়ম্ভূ: সেঁজুতির চাকরিটা যেন পায় মা… বলে এগিয়ে গিয়ে ঠাকুরের রাখা তেলসিঁদুর টিপ সেঁজুতির কপালে পরিয়ে দিয়ে বলে মনে মনে তোমার সিঁথিতে এই সিঁদুর দিলাম, সত্যি পরাবার সাহস নেই। সেঁজুতি ( হতভম্ব হয়ে একচোখ জল নিয়ে ): এটা ঠিক করলে না, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এই ব্যবহার আশা করি নি, তুই আমার পরিস্থিতির সুযোগ নিলে, একছুটে ঘরে দরজা খুলে দেখে বাবা মা ঘুমাচ্ছে, পাশের বাথরুমের বেসিনে গিয়ে টিপ মুছতে গিয়ে স্বয়ম্ভূর কথাগুলো কানে যেন বেজে ওঠে, আস্তে আস্তে টিপ সাবান জল দিয়ে ধুয়ে ফেলে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে সোফায় বসে পড়ে, নিজেকে বড়ো অসহায় মনে হয়, মোবাইলে ম্যাসেজের শব্দ, ফোনটা তুলে নিয়ে দেখে স্বয়ম্ভূর ম্যাসেজ, আজকের ঘটনার জন্য দুঃখিত,এই ঘটনা আমাদের দুজন ছাড়া কেউ কোনদিন জানবে না। সেঁজুতি ম্যাসেজ ডিলিট করে দেয়।একটু পরে মা বাবা উঠে পড়েন, জলখাবারের জন্য স্বয়ম্ভূর কাকিমা ডাকতে এলে সেঁজুতি বলে আমার মাথাটা ধরেছে, এখন কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না, তোমরা যাও মা। বিছানায় শুয়ে পড়ে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে।
পর্ব ১৮
ঘুমের মধ্যে কালী মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে,একই সঙ্গে স্বয়ম্ভূর, ধড়মড়িয়ে উঠে বসে, ঠিক সেই সময় বাসবী দেবী চা নিয়ে এসে বলেন,চা খেলে মাথা ছেড়ে যাবে, এরকম তো অভ্যাস নেই, তবে এখানকার পরিবেশ, মানুষজন খুব ভালো, খুব ভালো লাগছে।আজ কালী মায়ের বিসর্জন, আগামী কাল ভোরে আমরা রওনা দেব।
সেঁজুতি কোনো কথার উত্তর দেয় না, চুপ করে বসে থাকে।একটু বেলায় বাসবী দেবী বলেন চল যেটুকু পারিস খেয়ে নে, ওদের রেস্টের দরকার,আজ ভাসানের প্রস্তুতি আছে। সেঁজুতি মায়ের কথা অনুযায়ী খাবার জায়গায় গিয়ে বসে, দেখে সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত,পাশের একটা সিট ফাঁকা ছিল, হঠাৎ চম্পা দেবী স্বয়ম্ভূকে বলেন তুই সেঁজুতির পাশে বসে পড়, স্বয়ম্ভূ: আমি পরে বসবো। চম্পা দেবী বলেন পরে নয়,আজ অনেক কাজ আছে, আমাদের ব্যাগ গোছাতে হবে, কাল ভোরে ফেরা, ভাসানের পর কিছু ভালো লাগে না,অতএব পাকামো না করে বসে পড়ো। স্বয়ম্ভূ এসে সেঁজুতির পাশে বসে পড়ে। দুজনের মধ্যে কোনো কথা নেই, পরিবেশন করার সময় সেঁজুতির পাতে দুটো মাছ দিয়ে দিলে, সেঁজুতি বলে এতো মাছ খেতে পারবো না, আমার শরীর ভালো নেই। স্বয়ম্ভূর কাকিমা অল্প হেসে বলেন তাহলে স্বয়ম্ভূকে দিয়ে দাও। সেঁজুতি চুপ করে আছে দেখে স্বয়ম্ভূ একটা মাছ তুলে খেতে থাকে। খাবার পর বাড়ির সামনের বাগানে সেঁজুতি পায়চারি করতে থাকে, স্বয়ম্ভূ দূর থেকে দেখে, কিন্তু কাছে গিয়ে কথা বলার সাহস পায় না। কিছু সময় পর ঘরে ফেরার পথে দেখে স্বয়ম্ভূ ভারি জিনিস নামাচ্ছে, ওদের পরষ্পরের চোখাচোখি হতে, সেঁজুতি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়, মনে মনে বলে তুমি একজন শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এতো দূর্বল হয়ে পড়ো না। ভাসানের আগে ঢাকের তালে স্বয়ম্ভূর দেশের বাড়ির সবাই পা মেলালেও স্বয়ম্ভূ চুপ করে বসে থাকে, একটু পরে ফোনে ব্যস্ত হয়ে যায়। সেঁজুতি বুঝতে পারে স্বয়ম্ভূ মানসিক অস্বস্তিতে আছে। রাতে সাত্যকি বাবু বলেন ভোরে আমরা রওনা দেব, উৎসব বাবু আপনাদের নামিয়ে দিয়ে আমরা বাড়িতে ফিরে যাব, স্বয়ম্ভূর অফিসে দরকারি কাজ পড়েছে। উৎসব বাবু বলেন ঠিক আছে সেঁজুতি মা ভোরে অ্যালার্ম দিয়ে রাখিস। সেঁজুতি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।
পর্ব ১৯
রাতে বাসবী দেবী ব্যাগ গুছিয়ে নিতে বলেন কাল বড়োদের সবাইকে প্রণাম করবি বুঝেছিস। সেঁজুতি: মা এগুলো এখন শেখাতে হয় না, তুমি ছোট থেকে অভ্যাস করিয়েছ। উৎসব বাবু: আমার সোনার মেয়েটাকে কিছু বলবে না তুমি, এখন ঘুমাও। খুব ভোরে ঘুম ভাঙার পর সেঁজুতি বাইরে এসে দেখে স্বয়ম্ভূ দাঁড়িয়ে বাইরের দালানে। পিছিয়ে আসতে গিয়ে চোখ পড়ে গেলে স্বয়ম্ভূ বলে সুপ্রভাত, মন থেকে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলুন, আপনি না চাইলে আমি আপনার জীবনের কোথাও থাকবো না । সেঁজুতি: আমি বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান, চাকরির চেষ্টা ছাড়া আমার মাথায়, মনে কিছু নেই। আপনি কষ্ট পাবেন না, আমরা পরষ্পরের বন্ধু হতে পারি, কথাগুলো বলতে পেরে যেন সেঁজুতি অনেকটা স্বস্তি পেল। স্বয়ম্ভূ অফিসের কাজ থাকায় একটু পরে রওনা দেয়। সাত্যকি বাবুর গাড়িতে দেশের বাড়িতে থেকে ফেরার সময় বড়োদের প্রণাম করলে, স্বয়ম্ভূর মা বলেন পরের বছর আসতে হবে কিন্তু। বাসবী দেবী বলেন নিশ্চয়ই আসবো আমরা, যদি কালী মায়ের কৃপা থাকে। গাড়িতে বাসবী দেবী ও চম্পা দেবী গল্প করতে থাকেন, সেঁজুতি মোবাইলে নেট সার্ফিং করতে থাকে। বাড়িতে পৌঁছতে বেলা হয়ে যায়। বাসবী দেবী ভাতে ভাত বসিয়ে দেন স্নান সেরে, তখনই বাসবী দেবীর মোবাইলে রান্নার তমশা পিসির ফোন আসে, বাসবী দেবী ফোন রিসিভ করলে তমশা পিসি কেঁদে বলে কয়েকদিন কাজে যেতে পারবো না বৌদি, মেয়েটার খুব খুব শরীর খারাপ… বাসবী দেবী: ঠিক আছে, তুমি এতো কাঁদছ কেন? সব ঠিক হয়ে যাবে। ফোনটা কেটে যায়।
পর্ব ২০
সেঁজুতি শরীরে মনে যেন ক্লান্তি অনুভব করে। স্নানের পর একটু ফ্রেশ লাগে নিজেকে, খাবার টেবিলে বাসবী দেবী খেতে দিতে দিতে বলেন তমশার মেয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ পোড়া অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আত্মহত্যার চেষ্টা না শশুরবাড়ির প্ররোচনা বুঝতে পারছি না। আমি স্নান সেরে ফোন করলে কাঁদতে কাঁদতে জানালো তমশা। উৎসব বাবু : কি সাংঘাতিক, তমশার মেয়ে নিজে প্রেম করে বিয়ে করেছিল যতদূর মনে পড়ে। বাসবী দেবী : হ্যাঁ,তমশা একাই মেয়েটাকে মানুষ করেছে,ওর বাবা মদ খেয়ে মারধর করত তমশাকে, তারপরতো লিভার সিরোসিস হয়ে মারা যায়, তমশা চেয়েছিল কলেজে পড়ুক মেয়ে, কিন্তু সে মেয়ে প্রেমে পাগল হয়ে বিয়ের জন্য খেপে উঠলো, বোধহয় পালিয়ে বিয়ে করবে ঠিক করেছিল, বুঝতে পেরে তমশা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ওর জামাই খাপছাড়া চাকরি, ব্যবসা কোনোটাই ভালো করে করেনি, প্রচুর দেনা শোধ করতে প্রায় দেউলিয়া, তমশা খেটে খাওয়া মানুষ কোথায় যোগান পাবে এতো টাকা!! মেয়েটাকে শশুর বাড়িতে,পাড়ায় কটুক্তি শুনে অবসাদ থেকে এই কান্ড ঘটিয়েছে। উৎসব বাবুর ফোনটা বেজে ওঠে, রিসিভ করে বলেন হ্যাঁ স্যার বলুন, হ্যাঁ আমি ফাইলগুলো চেক করে নিয়েছি, কাল নিয়ে যাবো। হ্যাঁ,সবার শরীর ঠিক আছে। কিছু সময় কথা বলার পর ফোন রেখে উৎসব বাবু বলেন এখনকার দিনে সত্যি সাত্যকি স্যার বিরল, ওদের পরিবারের ব্যবহার সত্যি মুগ্ধ করে। বাসবী দেবী: হ্যাঁ, চম্পা দেবী স্বয়ম্ভূ আর সেঁজুতি সম্পর্কে আমায় বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন,কত সুন্দর করে বললেন যদি আমরা রাজি হইতো জানাতে, না পারলেও যেন যোগাযোগ রাখি, কোনো অহংকার নেই ছেলের মা বলে। সেঁজুতি একবার ভেবে দেখিস। সেঁজুতি: মা আমি চাকরির চেষ্টা করছি, নিজের পায়ে দাঁড়াতে আমাকে হবেই, ওনারা ভালো না খারাপ এর থেকে ভাবো কোন পরিস্থিতিতে আমরা চলছি, আমাকে এইভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিও না দয়া করে। আমায় নিজের মতো করে বাঁচতে দাও…কোনোরকমে খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ে সেঁজুতি, তমশা পিসির মেয়ের মুখটা যেন ভেসে ওঠে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, ল্যাপটপ খুলে বসে, চাকরির ফর্ম ডাউনলোড করতে থাকে। কয়েকদিনের পেন্ডিং ওয়ার্কে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে,সব কাজ গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করলেও মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করে।
