দ্বিধা (পর্ব ৩৩ – ৩৬)
পর্ব ৩৩
টোটো ড্রাইভার এর সঙ্গে বচসা মেটাতে আধাঘন্টা লেগে যায় প্রায়, সেঁজুতির ব্যাগে ক্রেপ ব্যান্ডেজ ছিল, একপ্রকার জোর করেই বেঁধে দেয় স্বয়ম্ভূর হাতে। প্যারাসিটামল খেতে বললে স্বয়ম্ভূ বলে ওই চায়ের দোকানে একটু চা খেয়ে ওষুধটা খাবো। স্বয়ম্ভূ এগিয়ে চায়ের অর্ডার করে, দোকানী চা দিলে সবাই চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিতে থাকে, বেড়িয়ে ফেরার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে যেন একটা তিক্ততা গ্রাস করে। আর্য স্বয়ম্ভূর কাছে এসে বলে প্রায় অর্ধেক রাস্তা বাকি ,ভার্গব ওর গাড়িটা চালাবে কিন্তু তুই হাতে চোট নিয়ে চালাতে পারবি? স্বয়ম্ভূ: উপায় কি আছে? তুই হাইরোডে চালাতে অভ্যস্ত নয়, হয়ে যাবে,স্পিড কমিয়ে চালাবো। খানিকটা এগিয়ে যেতে পারলেও রাস্তায় জ্যামে থাকায় গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে, চম্পা দেবী সেঁজুতিকে ফোন করে ওদের পৌঁছতে কত দেরি জিজ্ঞেস করলে, সেঁজুতি বলে ঘন্টা দুয়েক মনে হয়,স্বয়ম্ভূ সেই সময় চেঁচিয়ে বলে আরো বেশি সময় লাগবে হয়তো, খুব জ্যাম। সেঁজুতি, চম্পা দেবীকে বলেন মা তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো, আমরা পৌঁছে ফোন করবো। চম্পা দেবী: ঘুমিয়ে পড়ো বললেই কি ঘুমিয়ে পড়া যায়! সাবধানে আসো, ছেলেকে সাবধানে গাড়ি চালাতে বলবে, ঠিক আছে রাখছি এখন। ফোনটা ছাড়ার পর সেঁজুতি স্বয়ম্ভূকে বলে মা দুশ্চিন্তা করছেন, তোমার হাতের চোটের কথা কিছু জানাই নি। কিন্তু ফিরে কি হবে? রাত্রি: চিন্তা করো না,সব ঠিক হয়ে যাবে, বিয়ের পর প্রথম প্রথম আমার শাশুড়ি মা একইরকম রিঅ্যাক্ট করতেন, কিন্তু এখন আর অতো চিন্তা করেন না। বন্ধুদের ফ্ল্যাটে নামিয়ে বাড়িতে পৌঁছাতে প্রায় ১০টা বেজে যায়। গাড়িতে হর্ণ দেয় স্বয়ম্ভূ, সাত্যকি বাবু এসে গেট খুলতে খুলতে বলেন খুব বেড়ানো হলো তবে তোদের,, চম্পা দেবী দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেঁজুতি গাড়ি থেকে নিজে নেমে ব্যাগ নামাতে থাকে, সাত্যকি বাবু বলেন আমি আছিতো , তুমি পর দাঁড়াও। স্বয়ম্ভূ গাড়ি থেকে নামতেই চম্পা দেবী চেঁচিয়ে ওঠেন, তোর হাতে আবার চোট লেগেছে কিভাবে, সেইজন্য কাল রাতে থেকে আমার একটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল, সারারাত আমি ঘুমাতে পারি নি। স্বয়ম্ভূ রেগে বলে উফ মা তুমি থামবে, আমরা ফ্রেশ হয়ে অল্প কিছু ডিনার সেরে নেব, কাল অফিস আছে, তুমি সেই ব্যবস্থা করো। বিয়ে সবাই করে,তোর মতো বিয়ে পাগলা কাউকে হতে দেখিনি , চম্পা দেবীর কথা শুনে সাত্যকি বাবু বলেন সেকি! তুমি আমার কথা বেমালুম ভুলে গেলে কিভাবে চলবে গিন্নী! চম্পা দেবী: তুমি বাজে কথা না বলে ব্যাগগুলো এক সাইড করে রাখো। সেঁজুতি মাকে ফোন করে বলে পৌঁছে গেছি মা, চিন্তা করো না, একটু ক্লান্ত লাগছে, স্নান করে নিলে ঠিক হয়ে যাবে। বাসবী দেবী: তোরা পৌঁছেছিস শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। স্বয়ম্ভূর চোটের কথা বলতে গিয়ে, বলতে পারে না , বলে এখন রাখছি তবে। দুজনেই স্নান সেরে খেতে বসলে চম্পা দেবী কথার হাবেভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেন, কোনো কিছুর কুপ্রভাবে এই রকম ঘটনা ঘটেছে, দোষ কাটাতে হবে, দেশের বাড়িতে যেতে পারলে ভালো হতো। সেঁজুতি কিছুটা শোনার পর বলতে বাধ্য হয়, এইসব কুসংস্কার আমি মানতে পারলাম না মা,যুগ অনেক এগিয়েছে, স্বয়ম্ভূর হাতের চোট লেগেছে, আমার মনটা খারাপ, মনে হচ্ছে না বেরোলেই ভালো হতো, কিন্তু এটা নেহাত দূর্ঘটনা। কথা শেষ হতে না হতেই চম্পা দেবী ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠেন,যা ইচ্ছা হয় তাই করো তোমরা। খাবার থালা একরকম ঠেলে উঠে যান। সাত্যকি বাবু বলেন খেপেছেন এখন যখন কথা না বাড়িয়ে তোমরা খেয়ে নাও।
পর্ব ৩৪
বেনিন সিটিতে ফেরার পর রিধানের পদোন্নতি হয়, তিথির জন্য সুন্দর নেকলেস সেট কেনে রিধান। ফেরার পথে একটা ফুলের বোকে কিনে নেয়। রাতে খাওয়ার জন্য তিথি ডাকলে নেকলেস সেট আর ফুলের বোকে দিয়ে বলে নিজের প্রমোশনের কথা। তিথি খুব খুশি হয়ে বলে খুব ভালো, তুমি গিফ্ট কিনতে শিখেছ তবে! আমি কবে আবার চাকরি পাবো, তোমায় গিফ্ট দেবো। রিধান বলে আমার আর তোমার টাকা তো আলাদা নয়,যখন প্রয়োজন পড়বে বলবে অবশ্যই, তোমার বাড়িতে ও পাঠাতে পারো। তিথি বলে খুব প্রয়োজন হলে নিশ্চয়ই জানাবো।রণির মাঝে মাঝেই জ্বর,আমাশা হয়, রিধানের অনুপস্থিতিতে একাই সামলাতে থাকে তিথি। দেখতে দেখতে রিধান আড়াই বছরের প্রায়, রিধান তিথি আলোচনা করে তিন বছরের হলে স্কুলে দেওয়া হবে, কিছু অনলাইন ক্লাস করায় রণিকে। তিথি নিজেও চাকরির চেষ্টা করতে থাকে।এর মধ্যে একদিন হঠাৎ ব্রজ বাবুর শরীর খারাপ হয়,ডাক্তারবাবু এসে দেখে বলেন হাইপ্রেসার এবং কিছু টেস্ট করতে দেন। বিথিকে ফোন করে শোভা দেবী জানালে বিথি বলে কাল শনিবার ছুটি নিয়ে টেস্টগুলো করিয়ে আনবো।ইকো কার্ডিওগ্রামের জন্য বুকিং করে দিচ্ছি।কবে ডেট পাই দেখি। শনিবার অফিসের থেকে ছুটি নিয়ে ব্রজবাবুকে টেস্টের জন্য নিয়ে যায় বিথি। এইসময় তিথি বিথিকে ফোন করে,বিথি বাবার অসুস্থতার কথা জানায়, তিথি বলে আমায় বলিস নি কেন?বিথি বলে তুই এমনিতেই রণিকে নিয়ে বেতিব্যস্ত থাকিস, বাবার শরীর খারাপ শুনলে টেনশন করবি তাই জানাই নি, আমি এসেছিতো, চিন্তা করিস না।
পর্ব ৩৫
রিধানের ডিউটিতে, নিজেকে কিরকম অস্থির মনে হয়, ফোন করে রিধানকে কিন্তু ফোন বেজে যায়,কেউ তোলে না। খুব অস্থির লাগে , নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখে, রিধানের ফেরার অপেক্ষা করতে থাকে। রিধান ফিরে এলে তিথি বাবার শরীর খারাপের কথা জানায়। তিথি বলে আমার খুব চিন্তা হচ্ছে।রিধান বিরক্ত হয়ে বলে সারাদিন অনেক পরিশ্রম করতে হয় তিথি, গালে হাত দিয়ে ভাবার সময় আমার নেই, এইতো কদিন আগে মায়ের শরীর খারাপ হলো,কি হবে তো, কিছু টাকা পাঠিয়ে দাও,বয়স হচ্ছে শরীর খারাপ হবেই, খুব গুরুতর অসুস্থ নন, অনেক critical patient আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হয়। নিজের ছেলের যত্ন নাও। তিথি রিধানের এই ব্যবহারে হতচকিত হয়ে যায়। চুপ করে থাকে, মনে মনে ঠিক করে চাকরির চেষ্টা করতেই হবে। রিধান চেঁচিয়ে ওঠে রাগ হলো তো, সবেতেই তোমার রাগ, কিছু খাবার জুটবে কি? তিথি কথা না বাড়িয়ে খাবার এগিয়ে দেয়। সেদিন নিজের পার্সোনাল একাউন্ট থেকে কিছু টাকা অনলাইন ট্রান্সফার করে। রাতে রিধান বলে জানোতো আমার স্বভাব,রাগ করে থেকো না। পরদিন মাকে ফোন করে বাবার খোঁজ নেয়, বলে কিছু টাকা একাউন্টে ট্রান্সফার করেছি। মা বলেন কি দরকার ছিল, তুই এমনিতেই সমস্যায় থাকিস ছেলের জন্য,জামাই কি মনে করবে? তিথি বলে তোমার জামাই বলেছিল তবে এটা আমার একাউন্ট থেকে সামান্য পাঠিয়েছি, দিদি তবু যেতে পেরেছে এই সুবিধা, আজকে যাবে তো? শোভা দেবী বলেন হ্যাঁ,মেয়েটা সব দিক সামলে পেরে ওঠে না নিজের যত্ন নেওয়ার।
পর্ব ৩৬
বিথি বাবাকে নিয়ে টেস্ট করতে বসে আছে, এমন সময় নীরার ফোন।কিরে খবরটা শুনেছিস?বিথি বলে চৌহান স্যারের বৌ এক্সিডেন্ট হয়ে ICU তে ভর্তি আছেন।বিথি বলে তুই কি ভাবে খবর পেলি?নীরা বলে দাশবাবু বললেন।বিথি বলে মানুষের জীবনের কোন দাম নেই, প্রতিনিয়ত এক্সিডেন্ট বেড়েই চলেছে। নীরা বলে বসকে ফোন করা ঠিক হবে?বিথি বলে দেখছি ফোন করে। নীরার ফোন ছেড়ে বসকে ডায়াল করতে থাকে, একবার রিং হয়ে কেটে যায়, পরেরবার চৌহান বাবু ফোন রিসিভ করে বলেন বলুন কিছু দরকারে ফোন করছেন? বিথি বলে না মানে একটা খারাপ খবর পেয়ে ফোন করছি। চৌহান বাবু বলেন ঠিক শুনেছেন আমার Misses এর এক্সিডেন্ট হয়েছে, আমরা একসাথে ফিরছিলাম একটা ট্রলার ধাক্কা মারে, প্রচন্ড আঘাত লাগে ওর, এখন ICU তে, আমার ও চোট লেগেছে অল্প।বিথি বলে ঈশ্বর সহায় হোন। চৌহান বাবু বলেন আগামী কয়েক দিন হয়তো যেতে পারবো না, একটু দেখে নেবেন।বিথি বলে ঠিক আছে স্যার। কয়েকদিন লড়াইয়ের পর শেষ রক্ষা হয় না,বিথিরা খবর পায় চৌহান বাবুর স্ত্রী আর নেই। খুব খারাপ লাগে বিথির, ফোন করতে গিয়ে থমকে যায়,
বাড়িতে ফিরে সোহমকে জানায় খবরটা।সোহম বলে আহা বড়ো ভালো মানুষ, ভালো মানুষগুলো বেশি কষ্ট পায়।বিথি বলে তবু ও মানুষ ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য বাজে কাজ করতে পিছপা হয় না। সোহম বলে তোমাদের একবার যাওয়া উচিত।
