শ্রী কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী ব্রতকথা

শ্রীকৃষ্ণ প্রণাম মন্ত্র
হে কৃষ্ণ করুণাসিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপতে।গোপেশ গোপিকাকান্ত রাধাকান্ত নমোহস্তুতে।।
দ্বিতীয় প্রণাম মন্ত্র (বাসুদেব প্রণাম)
নমঃ ব্রহ্মণ্যদেবায় গোব্রাহ্মণহিতায় চ।
জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ।।
বন্দনা ও প্রার্থনা
জয় জয় কৃষ্ণচন্দ্র দৈবকী নন্দন।
ভক্তিভাবে বন্দি আমি ও দুটি চরণ।।
জন্মাষ্টমী ব্রতকথা করিতে রচনা।
হৃদয়ে উদিত হয় এ সৎ বাসনা।।
পুনঃ চিন্তা করি যেন হইয়া বামন।
চন্দ্র ধরিবারে সাধ হইল তেমন।।
কিন্তু তবু মনে পড়ে তিনি দয়াময়।
করিলে তাঁহার কাজ কৃপা তাঁর হয়।।
যাঁর কৃপা হ’লে পঙ্গু গিরি পার হয়।
যাঁর কৃপা হ’লে মূক কত কথা কয়।।
সেই কৃষ্ণচন্দ্রে আমি করিয়া প্রণাম।
জন্মাষ্টমী ব্রতকথা পদ্যে লিখিলাম।।
প্রার্থনা মনোবাসনা পূর্ণ যেন হয়।
অন্তিমেতে পাই যেন চরণে আশ্রয়।।
শ্রীকৃষ্ণজন্মাষ্টমী ব্রতকথা
জন্মাষ্টমী ব্রতকথা করিতে শ্রবণ।
বশিষ্ঠ মুনির পদ করিয়া বন্দন।।
একদা দিলীপ রাজা ক’ন মুনি প্রতি।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মকথা শুনিতে সম্প্রতি।।
অতিশয় ইচ্ছা হয় ওহে মহামুনি।
কৃপা করি সেই কথা বলুন আপনি।।
ভাদ্রমাসে কৃষ্ণপক্ষে অষ্টমী তিথিতে।
কিবা হেতু জনার্দ্দন জন্মেন ধরাতে।।
শঙ্খ চক্র গদা পদ্মধারী নারায়ণ।
দৈবকী উদরে জন্মে কিসের কারণ।।
বশিষ্ঠ কহেন রাজা শুন ভক্তি মনে।
নারায়ণ স্বর্গ ত্যজি কিসের কারণে।।
এই পৃথিবীতে জন্মে দৈবকী উদরে।
সেই পুণ্যকথা বলি তোমার গোচরে।।
পূর্ব্বকালে কংসাসুর নামে নরপতি।
অহঙ্কারে মত্ত হয়ে থাকে দিবারাতি।।
ধরা অধীশ্বর হতে সেই দুরাচার।
পৃথিবীকে তাড়না করিল বহুবার।।
সহিতে না পারি দুঃখ পৃথিবী তখন।
মহেশ সকাশে গিয়া করে নিবেদন।।
পৃথিবীর দুঃখ দশা দেখি শূলপাণি।
ক্রোধেতে অধীর হয়ে কহে এই বাণী।।
দেবগণ চল যাই ব্রহ্মার সকাশে।
করিব উপায় আজি কংসের বিনাশে।।
অনন্তর মহেশ্বর দেবগণে লয়ে।
গমন করিল সবে ব্রহ্মার আলয়ে।।
দেবগণ নিবেদন করে ব্রহ্মা পাশে।
উপায় করুন প্রভু কংসের বিনাশে।।
ব্রহ্মা তবে হংসপৃষ্ঠে করি আরোহণ।
ক্ষীরোদ সাগরে যান লয়ে দেবগণ।।
সাগরের তীরে স্তব করে সুরগণ।
স্তবে তুষ্ট হইলেন দেব নারায়ণ।।
নারায়ণ বলিলেন ওহে দেবগণ।
বিষণ্ণ বদন সবে কিসের কারণ।।
কিবা হেতু করেছ হেথায় আগমন।
ব্রহ্মা বলিলেন প্রভু করি নিবেদন।।
শিববরে বলীয়ান হয়ে কংসাসুর।
পৃথিবীরে দেয় সদা যাতনা প্রচুর।।
নাহি মানে দেব দ্বিজ গুরুজন আদি।
অহঙ্কারে মত্ত হয়ে থাকে নিরবধি।।
মহেশ্বর দিল বর ভাগিনার হাতে।
নিধন হইবে কংস নহে অন্য হ’তে।।
তাই প্রভু নিবেদন অভয় চরণে।
রাখিতে দেবের মান কংসের নিধনে।।
দৈবকী উদরে জন্ম করিয়া গ্রহণ।
পৃথিবীর দুঃখ দশা করুন মোচন।।
নারায়ণ বলিলেন দেব মহেশ্বর।
পার্ব্বতীকে সাথে দেন একটি বৎসর।।
কার্য্যশেষে পুনরায় আসিবে চলিয়া।
এত বলি উমা রমা সাথেতে লইয়া।।
মথুরা উদ্দেশে যাত্রা করি নারায়ণ।
দৈবকী উদরে জন্ম করিলা গ্রহণ।।
যে কালে বৈকুণ্ঠ ত্যজি ব্রহ্ম সনাতন।
করেন দৈবকী গর্ভে আশ্রয় গ্রহণ।।
সে কালে শ্রীশিব ব্রহ্মা আদি দেবগণ।
সনকাদি নারদাদি মুনি ঋষিগণ।।
উপস্থিত হয়ে সেই কংস কারাগারে।
স্তবাদি করেন সবে ভক্তি সহকারে।।
তারপর আবির্ভাব কালের সময়।
ভাদ্র মাসে চন্দ্র ভানু হইল উদয়।।
আকাশেতে রবি আদি নবগ্রহগণ।
মঙ্গল-জনক স্থানে আসি স্থিত হ’ন।।
ভাদ্র মাসে কৃষ্ণপক্ষ অষ্টমী তিথিতে।
বুধবার রোহিণী নক্ষত্র নিশার্দ্ধেতে।।
সর্ব্বদিক আলোকিত করিয়া শ্রীহরি।
ধরাধামে অবতীর্ণ শিশুরূপ ধরি।।
পরিধানে পীতবাস কৌস্তুভ গলেতে।
চতুর্হস্ত শঙ্খ চক্র গদাপদ্ম করেতে।।
রূপ হেরি বসুদেব দৈবকী চিন্তিল।
ঋষি বা দেবতা আসি জনম লভিল।।
নানাবিধ স্তব করি বলে নারায়ণে।
চতুর্ভুজ পরিহার করুন এক্ষণে।।
কেমনে রক্ষিব প্রভু কংস হাত হতে।
ভাবিয়া উপায় মোরা নাহি পাই চিত্তে।।
অন্তর্য্যামী নারায়ণ অন্তরে বুঝিল।
পরিধান ত্যজি প্রভু দ্বিভুজ হইল।।
অনন্তর ভগবান হরির কৃপায়।
বসুদেব শৃঙ্খল হইতে মুক্তি পায়।।
মায়াময় শ্রীহরির আশ্চর্য্য মায়াতে।
রক্ষীগণ আচ্ছন্ন হইল নিদ্রাতে।।
যে সময়ে ভগবান আবির্ভূত হ’ন।
সেইকালে যোগমায়া ব্রজে জন্ম ল’ন।।
পূর্ব্বের আদেশমত পবিত্র ক্ষণেতে।
নন্দালয়ে নন্দপত্নী যশোদা গর্ভেতে।।
অতঃপর ভগবান কন বসুদেবে।
নন্দালয়ে তাঁরে রাখি আসিতে হইবে।।
নন্দ-কন্যা যোগমায়া শ্রীভগবতীকে।
আনয়ন করিয়া দিবেন দেবকীকে।।
ভগবান কৃষ্ণবাক্য করিয়া শ্রবণ।
নিজ বস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণকে করি আচ্ছাদন।।
বসুদেব নন্দালয়ে করেন গমন।
বিঘ্নহারী শ্রীবিষ্ণুকে করিয়া স্মরণ।।
যেইকালে বসুদেব গমন করিল।
কারাগৃহ লৌহদ্বার মুক্ত হয়ে গেল।।
মন্দ মন্দ মেঘগণ করয়ে গর্জন।
মৃদুমন্দ বৃষ্টিধারা হতেছে পতন।।
স্বয়ং অনন্তদেব সর্পরূপ ধরি।
বারি নিবারণ জন্য কৃষ্ণ শীর্ষোপরি।।
ছত্রের মতন ফণা করিয়া ধারণ।
শ্রীবসুদেবের সাথে করেন গমন।।
এইভাবে বসুদেব যাইতে লাগিল।
যমুনার তটে আসি উপস্থিত হ’ল।।
দু-কূলে বহিছে বান বসুদেব ভাবে।
কেমনে হইয়া পার গোকুলে যাইবে।।
হায় কি করিব বলি কাঁদিতে লাগিল।
অন্তর্য্যামী নারায়ণ অন্তরে জানিল।।
দেখিতে দেখিতে জল আসিল কমিয়া।
শিবারূপে পার হয়ে যান মহামায়া।।
শিবার পশ্চাৎ ধরি বসুদেব যান।
মায়া করি বারি মধ্যে পড়ে ভগবান।।
বসুদেব কাঁদে পুনঃ শিরে হাত দিয়া।
জলক্রীড়া করে কৃষ্ণ যমুনা লইয়া।।
যমুনার পূরে সাধ কৃষ্ণকে পাইয়া।
কিছুক্ষণ পরে কৃষ্ণ উঠিল ভাসিয়া।।
সানন্দেতে বসুদেব তুলি নিয়া কোলে।
যমুনা হইয়া পার আসিল গোকুলে।।
অনন্তর বসুদেব, আসি নন্দালয়ে।
যশোদা নিকটে দেখে কন্যা আছে শুয়ে।।
মহামায়া প্রভাবেতে গোপ-গোপী যত।
কেহ কিছু নাহি জানে সবে নিদ্রাগত।।
যশোদাও পুত্র কন্যা কিছু না বুঝেছে।
জানে কোন দেবরূপী জনম লভিছে।।
বসুদেব পুত্র দিয়া কন্যা কোলে নিল।
মথুরার কারাগারে চলিয়া আসিল।।
যোগমায়ারূপী কন্যা দৈবকীকে দিয়া।
বন্ধনস্থানেতে বসুদেব আসিল চলিয়া।।
যোগমায়া প্রভাবে পুনঃ বন্ধন ঘটিল।
কারাগৃহ পুনরায় আবদ্ধ হইল।।
মহামায়া সদ্যজাতা শিশুর মতন।
ক্রন্দন করিবামাত্র জাগে রক্ষীগণ।।
এক রক্ষী কংসপাশে করিয়া গমন।
দৈবকী প্রসবে শিশু করে নিবেদন।।
বিদিত হইয়া কংস আসি কারাগারে।
দেখিল দৈবকী কোলে কন্যা আছে শুয়ে।।
ক্রোধে কংস ধরিবারে উদ্যত শিশুরে।
দৈবকী কন্যায় হৃদে জড়াইয়া ধরে।।
অশ্রুসিক্ত আঁখি নিয়ে বলে বারে বার।
প্রাণভিক্ষা দাও রাজা কন্যারে আমার।।
না শুনিয়া তার কথা পাপরূপী কংস।
শিশুরে করিতে চায় চিরতরে ধ্বংস।।
ধরিয়া শিশুর পদ ঊর্দ্ধেতে তুলিল।
শিলাপৃষ্ঠ লক্ষ্য করি নিক্ষেপ করিল।।
কিন্তু সেই শিশু-কন্যা কংসহাত হ’তে।
আরও ঊর্দ্ধে যায় উঠে না পড়ে শিলাতে।।
কন্যা অষ্টভুজা হয়ে মহাদেবীরূপে।
বলেন বচন দুরাচার কংস ভূপে।।
দুষ্ট দুরাচার কংস শুনরে বচন।
কিবা লাভ হবে বধি আমার জীবন।।
তোর শত্রু যিনি তিনি বালক রূপেতে।
দিন দিন বর্দ্ধিত হতেছে গোকুলেতে।।
অতএব নির্দোষী দৈবকী বসুদেবে।
হিংসা করি উভয়েরে কিবা ফল হ’বে।।
তারপর অষ্টভুজা মাতা ভগবতী।
গেলেন কৈলাসধামে যথা পশুপতি।।
মহামায়া বাক্য কংস করিয়া শ্রবণ।
বসু ও দৈবকীর করে বন্ধন মোচন।।
তৎপরে কিরূপে শত্রু করি বিনাশন।
পরামর্শ করে কংস লয়ে মন্ত্রিগণ।।
জন্মাষ্টমী ব্রতকথা হ’ল সমাপন।
জয় কৃষ্ণচন্দ্র বলি ডাক সর্ব্বজন।।
কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী ব্রত করে যেই জন।
সকল সদিচ্ছা তার হইবে পূরণ।।
রোগ শোক দূরে যায় শান্তি পায় মনে।
জন্মাষ্টমী ব্রতকথা যেই জন শুনে।।
স্বয়ং কৃষ্ণ হ’তে কৃষ্ণনাম হয় সার।
নামের প্রভাবে জীব তরে এ সংসার।।
সর্ব্বদুঃখ দূরে যায় হয় সুখোদয়।
ভক্তিভাবে কৃষ্ণনামে লইলে আশ্রয়।।
ভক্তিপ্রিয় কৃষ্ণচন্দ্র ভক্ত বড় ধন।
ভক্তের লাগিয়া তিনি অবতীর্ণ হন।।
হে গোলোকপতি কৃষ্ণ প্রার্থনা চরণে।
এ অধমে কৃপা কর আপনার গুণে।।
