Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » জঙ্গলগড়ের চাবি (১৯৮৭) || Sunil Gangopadhyay » Page 21

জঙ্গলগড়ের চাবি (১৯৮৭) || Sunil Gangopadhyay

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে মেজর। তার এক হাতে একটা কাচের গেলাস ভর্তি দুধ, তা থেকে ধোঁয়া উড়ছে। আর এক হাতে কয়েকখানা হাতেগড়া রুটি! সে পা দিয়ে দরজাটা ঠেলেছে বলেই অত জোরে শব্দ হয়েছে।

মেজর চোখ বড় বড় করে বলল, বাপ্ রে! তোমাকে দেখে ধড়ে প্রাণ এল! জানো তো, কী কাণ্ড? কাল তোমার দরজায় তালা লাগাতে ভুলে গেছি। এখন এসে তা দেখে ভাবলুম পাখি বোধহয় উড়ে গেছে! কী ব্যাপার, তুমি এত লক্ষ্মীছেলে হয়ে গেলে যে, পালাবার চেষ্টা করোনি?

সন্তু হাসল। তারপর বলল, দরজায় যে তালা লাগাননি, সে কথা বলে যাবেন তো! আমি জানব কী করে যে ডাকাতরাও তালা দিতে ভুলে যায়।

মেজর বলল, ভাগ্যিস তুমি পালাওনি! তা হলে রাজকুমার আর আমায় আস্ত রাখত না! রিভদ্ভারের ছটা গুলিই পুরে দিত আমার মাথার খুলিতে। তুমি আমায় খুব জোর বাঁচিয়ে দিয়েছ। তারপর, কী, খিদেটিদে পায়নি? এই নাও, দুধ আর রুটি এনেছি।

সন্তু বলল, আমি দাঁত না মেজে কিছু খাই না!

মেজর বলল, এই রে! তাহলে তো তোমায় নীচে নিয়ে যেতে হয়! নীচে কুয়ো আছে। কিন্তু তোমায় তো ঘর থেকে বার করার হুকুম নেই। তা বাপু, একদিন দাঁত না মেজেই খেয়ে নাও বরং!

সন্তু বলল, না, তা পারব না। আমার ঘেন্না করে।

তোমার জন্য কি আমি বিপদে পড়ব নাকি? তোমাকে আমি নীচে নিয়ে যাই, তারপর তুমি যদি একটা দৌড় লাগাও? এই পাহাড়ি জায়গায় তোমার পিছু পিছু আমি ছুটতে পারব না?

সকালবেলা ছোটাছুটি করার ইচ্ছে আমার নেই।

অত সব আমি শুনতে চাই না। এই তোমার খাবার রইল। খেতে হয় খাও, না হলে যা ইচ্ছে করো!।

লোকটি ঘরের মধ্যে গেলাসটা নামিয়ে তার ওপরেই রুটি রেখে দিল। তারপর দরজাটা খোলা রেখেই চলে গেল।

যখন অন্য কোনও কাজ থাকে না, তখন খুব খিদে পায়। গরম দুধ দেখেই সন্তুর পেট জ্বলতে শুরু করেছে। সে জানে, হাতের কাছে খাবার দেখলে কখনও অবহেলা করতে নেই। বিশেষত এইরকম বিপদের অবস্থায় কখন কী হয় তার ঠিক নেই, ইচ্ছে করলেই এরা তাকে শাস্তি দেবার জন্য খাওয়া বন্ধ করে দিতে পারে। সেইজন্য খেয়ে নেওয়াই উচিত।

কিন্তু ওই মেজরকে যে সে বলল, দাঁত না মেজে খেতে তার ঘেন্না করে। এখন সে খেয়ে নিলে লোকটা নিশ্চয়ই তাকে হ্যাংলা ভাববে।

লোকটা দরজাটা খোলা রেখে গেছে। কী ব্যাপার, এবারেও ভুলে গেছে নাকি?

তক্ষুনি মেজর আবার ফিরে এল। তার এক হাতে এক মগ জল।

সে গজগজ করে বলল, এই নাও, জল এনেছি। এখানেই চোখ মুখ ধুয়ে নাও।

সন্তু বলল, দাঁত মাজব কী দিয়ে? একটা নিমগাছের ডাল ভেঙে আনতে পারলেন না?

ইস, তোমার শখ তো কম নয়! এর পর বলবে, শুধু রুটি খাব না। আলুর দম চাই। হালুয়া চাই! এই জলেই আঙুল দিয়ে দাঁত মেজে নাও!

সন্তু দেখল কালকের রাত্তিরের সেই গাছের ডাল কেটে বানানো কলমটা তখনও সেখানে পড়ে আছে। সেটাকেই সে তুলে নিল। কোন্ গাছের ডাল তা কে জানে! সেই কলমটারই উল্টো দিকটা চিবিয়ে দাঁতন বানিয়ে নিয়ে সে দাঁত মাজল। বেশ মজা লাগল তার।

দুধটা এখনও বেশ গরম আছে। তাতে ড়ুবিয়ে ড়ুবিয়ে সে রুটি তিনটে খেয়ে ফেলল। কাছেই মেজর বসে রইল উবু হয়ে। তার পরনে একটা লুঙ্গি আর গেঞ্জি। মস্ত বড় ঝোলা গোঁফের জন্য তার মুখখানা সিন্ধুঘোটকের মতন দেখায়।

খেতে খেতে সন্তু ভাবল, এই মেজর লোকটি কিন্তু ঠিক ডাকাতদের মতন নয়। প্রথম থেকেই সে সন্তুর সঙ্গে বেশ ভাল ব্যবহার করছে। কাল রাত্তিরে চিঠি লেখার সময় সন্তুর দিকে তাকিয়ে ও একবার যেন চোখ টিপেছিল না? কেন, কিছু কি বলতে চায়? সন্তু জিজ্ঞেস করবে, না ও নিজের থেকেই বলবে?

এই যে সন্তুর মুখ ধোওয়ার জন্য জল এনে দিল লোকটা, এটাও কম কথা নয়। গেলাস প্রায় ভর্তি করে দুধ এনেছে। আধ গেলাসও তো দিতে পারত!

সত্তর খাওয়া শেষ হতে মেজর বলল, হ্যাঁ, বেশ খিদে পেয়েছিল বুঝতে পারছি। আর দুখানা রুটি খাবে?

সন্তু বলল, না।

আচ্ছা, এবারে তা হলে শুয়ে পড়ো। তোমার তো এখন কাজের মধ্যে দুই, খাই আর শুই! যতক্ষণ তোমার কাকাবাবু জঙ্গলগড়ের নকশাটা না দিচ্ছেন, ততক্ষণ তোমাকে এইভাবেই থাকতে হবে।

আচ্ছা, জঙ্গলগড়ে আপনারা কী খুঁজছেন বলুন তো?

তুমি জানো না?

না। কাকাবাবু আমায় কিছুই বলেননি!

ও-হো-হো-হো! তুমিও জানো না। আমিও জানি না!

আপনিও জানেন না? তা হলে আপনি এই ডাকাতের দলে রয়েছেন কেন?

ডাকাতের দল আবার কোথায়? আমি তো কোনও ডাকাতের দলে নেই!

আপনি এদের দলে নন? তা হলেমানে, এরা যে আমায় এখানে আটকে রেখেছে…আপনিও তো তাতে সাহায্য করছেন!

সে হল অন্য ব্যাপার। আসল ব্যাপারটা কী জানো? তোমায় বলছি, আর কারুকে জানিও না! আমি একটা বাড়িতে ঢুকে লোভ সামলাতে পারিনি। কয়েকখানা হিরে চুরি করেছিলাম। তারপর অবশ্য পুলিশ আমার বাড়ি সার্চ করে সে হিরে সব কটাই উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। আমায় জেলেও দিয়েছিল। তা চুরি করার জন্য জেল না হয় খাটতুম দুতিন বছর। কিন্তু যে বাড়ি থেকে আমি চুরি করেছিলুম, সেই বাড়ির একজন দারোয়ান খুন হয়েছে। পুলিশ এখন সেই খুনের দায়ে আমাকে জড়াতে চায়। কী অন্যায় কথা বলে তো! আমি খুন করিনি। সত্যি বলছি, বিশ্বাস করো। খুনটুন ব্রার সাহস আমার নেই। শুধু শুধু আমি কেন খুনের দায়ে ফাঁসি যাব?

আপনি জেল থেকে পালিয়েছেন?

আমি একলা নয়। সবশুদ্ধ ন জন। কাগজে পড়োনি, আগরতলা জেল ভেঙে আসামিদের পালানোর খবর? অন্যরা পালাচ্ছিল, আমিও তাদের দলে ভিড়ে পড়লুম!

তারপর?

তারপর এই তো দেখছ এখানে?

জেল থেকে পালিয়ে এখানে আছেন? এটা আপনার নিজের বাড়ি?

এটা আমার বাড়ি? আমার এত বড় বাড়ি থাকলে কি আমি হিরে চুরি করি? এটা আগেকার কোনও রাজা-টাজাদের বাড়ি হবে বোধহয়। কেউ থাকত না। আমিই তো এসে পরিষ্কার করেছি।

এটা ওই রাজকুমারের বাড়ি?

হতেও পারে, না-ও হতে পারে। সে-সব আমি জানতে চাইনি। আমার কাজ উদ্ধার হলেই হল।

কাজ মানে?

জেল থেকে পালালে তো সারাজীবন পালিয়েই থাকতে হয়। কোনওদিন নিজের বাড়িতে ফিরতে পারব না। আমরা যারা এই জেল থেকে বেরিয়েছি, তাদের কয়েকজনকে এই রাজকুমার বলেছে যে, আমরা যদি ওর কাজ উদ্ধার করে দিই, তা হলে উনি আমাদের নামে কেস তুলিয়ে নেবেন। পুলিশ আর আমাদের কিছু বলবে না। জঙ্গলগড়ে কী আছে না আছে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমি রাজকুমারকে সাহায্য করব, রাজকুমার আমায় সাহায্য করবে, ব্যাস!

রাজকুমার যদি মানুষ খুন করতে বলে তাও করবেন?

মাথা খারাপ! আমি অত বোকা নই! খুন করে আবার পুলিশের ফাঁদে পড়ব! খুন করিনি, তাতেই প্রায় ফাঁসি হয়ে যাচ্ছিল!

কিন্তু এই রাজকুমার তো সাংঘাতিক লোক!

সে যেমন থাকে থাক না, তাতে আমার কী? আমি ওসব সাতে পাঁচে নেই। এখন তোমার ওপর আর তোমার কাকাবাবুর ওপরে আমার সব কিছু নির্ভর করছে। তোমরা যদি মানে মানে জঙ্গলগড়ের জিনিসপত্তর সব রাজকুমারকে দিয়ে দাও, তা হলেই আমরা ছাড়া পাই। রাজকুমার বলেছে, পুরো কাজ হাঁসিল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের নিষ্কৃতি নেই।

ওই কর্নেলও সেই দলে?

হ্যাঁ, ও-ওতো আমারই মতন জেল-পালানো।

ওর নাম কর্নেল কেন?

কাজ হিসেবে এক-একজনের এক-একটা নাম দেওয়া হয়েছে। আসল নাম ধরে কারুকে ডাকা নিষেধ। এই যাঃ, তোমাকে অনেক কথা বলে ফেললুম। আসলে, সকালের দিকটায় আমার মনটা খুব নরম থাকে। আর ঠিক তোমার মতন বয়েসি আমার একটা ভাই আছে তো! আমি যে তোমাকে এত সব কথা বলেছি, তা যেন রাজকুমারকে আবার বলে দিও না! কী, বলবে না তো?

না, হঠাৎ রাজকুমারকে আমি এসব বলতে যাব কেন?

তবে তুমি এখানে থাকো। আমি যাই, চায়ের জল-টল বসাই গিয়ে। বাবুরা সব এখনও ঘুমোচ্ছেন। তোমার চিঠি তোমার কাকাবাবুর কাছে এতক্ষণ পৌঁছে গেছে বোধহয়।

দরজা বন্ধ করে দিয়ে মেজর চলে গেল।

সন্তু গিয়ে দাঁড়াল জানলার কাছে। এখানে সময় কাটাবে কী করে? সকালবেলা তার যে-কোনও ধরনের বই পড়া অভ্যেস। কিংবা একা একা বেড়াতেও তার ভাল লাগে। বাইরে দেখা যাচ্ছে বেশ ছোট ছোট পাহাড় আর জঙ্গল। গেটের বাইরে দুতিনটে ঘোড়া বাঁধা রয়েছে। একটাও মানুষজন দেখা যাচ্ছে না।

এইভাবে তাকে ঘরের মধ্যে সারাদিন বন্দী থাকতে হবে। কাকাবাবুকে সে চিঠি পাঠিয়ে ডেকে আনতে চায়নি। কাকাবাবু নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন যে, সন্তু ওই রকম চিঠি লিখতে বাধ্য হয়েছে।

কাকাবাবু যে কখন, কী ভাবে এখানে এসে পড়বেন, তা কিছুই বলা যায় না। যদি এই মুহূর্তে কাকাবাবু পেছন থেকে সন্তু বলে ডেকে ওঠেন, তাতেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

কী খেয়াল হল, সন্তু জানলার কাছ থেকে সরে এসে বন্ধ দরজাটা ধরে টান মারল। আর সঙ্গে-সঙ্গে সেটা খুলে গেল।

খানিকক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সন্তু। এবারেও দরজায় তালা লাগায়নি, এবারেও ভুলে গেছে? তা কখনও হতে পারে? এটা কোনও ফাঁদ। নয় তো!

যাই হয় তোক ভেবে সন্তু দরজার বাইরে পা বাড়াল।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *