Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » আলোহীন মঞ্চে || Swarup Kayal

আলোহীন মঞ্চে || Swarup Kayal

কলকাতার থিয়েটার রোডে একসময় একটি ছোট নাট্যশালা ছিল—‘রূপসী থিয়েটার’। সেখানেই একদিন প্রথম আলো মেখেছিলেন রূপা। তখন তিনি ছিলেন কিশোরী, চোখের মণিতে ঢেউ খেলত, স্বপ্নের ঝিকিমিকি। বড় হবেন, বিখ্যাত হবেন, অভিনয় দিয়ে মানুষকে কাঁদাবেন, হাসাবেন, ভাবাবেন—এই স্বপ্নই ছিল তাঁর জীবনযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু।
তাঁর বাবা-মা ছিলেন সাধারণ চাকুরিজীবী; সংসারে বিলাসিতা ছিল না, কিন্তু স্বপ্নের অভাব ছিল না কখনো। বাবা বলতেন,
“মানুষ নিজের প্রতিভায় বাঁচে, নামের জৌলুসে নয়।”
কিন্তু রূপা যখন টলিউডে প্রথম পা রাখলেন, দেখলেন—নামের জৌলুসই যেন সবচেয়ে বড় মুদ্রা। সেখানে প্রতিভা নয়, সম্পর্ক; হৃদয়ের শক্তি নয়, বাজারের কৌশলতাই মুখ্য। তবু তিনি লড়লেন। তাঁর চোখে ছিল অদম্য বিশ্বাস—‘আমি পারবো’।
একসময় সুযোগ এল। বড় পর্দায় নয়, ছোট টেলিভিশনের ধারাবাহিক। কিন্তু দর্শকের পছন্দে তিনি দ্রুতই পরিচিত হয়ে উঠলেন। ছবিও করলেন। পরিচিতি বাড়ল, সাক্ষাৎকার বাড়ল, প্রশংসার সাথে সাথে বাড়ল অহং, আর বাড়ল হিংসা—পরিচিত, বন্ধু, সহকর্মী সবার মধ্যেই।
সময়ের অনিবার্য প্রবাহে রূপার চারপাশের মানুষগুলো বদলাতে লাগল। যে নায়িকা একসময় স্টুডিওর বাইরে দাঁড়িয়ে স্ক্রিপ্টের অপেক্ষা করতেন, সেই নায়িকার চারপাশে তখন ভিড়—ডিরেক্টর, প্রডিউসার, সাংবাদিক।
কিন্তু সেসব ছিল আলো, আর আলো কখনোই স্থায়ী নয়।
রাজনৈতিক গসিপ, টলিউডের ঠাণ্ডা যুদ্ধ, সামাজিক মাধ্যমে ট্রোল—ধীরে ধীরে রূপা ক্লান্ত হয়ে উঠছিলেন।
নিজেকে প্রমাণের চাইতে নিজেকে রক্ষা করাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল বড় বিষয়। তার উপর মনের মধ্যে বাড়তে লাগল একাকীত্ব—যা খ্যাতির সঙ্গে বাড়ে বলে কেউ বলে না।
একদিন তিনি বলেছিলেন বন্ধু মীরাকে—
“তুই জানিস, এই যে সবাই হাসে, হাত বাড়ায়, ছবি তোলে—সবটাই কেপচা, ভেতরে ভেতরে আমি একা। খুব একা।”
মীরা হেসে বলেছিল— “একা ? যে মানুষটাকে সবাই চেনে সে একা হতে পারে কীভাবে?”
রূপা তখন মৃদু হাসি হাসলেন— “খুব সহজে… খুব নীরবে।”
চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রে কাজ কমে এল। নতুন মুখেরা এলো, নতুন নায়িকারা এলো। রূপার ফোন কম বেজে উঠতে লাগল। তার উপর একটি ভুয়ো বিতর্ক তাঁকে সামাজিকভাবে জর্জরিত করল। কেউ পাশে দাঁড়াল না, কেউ কিছু ব্যাখ্যা শোনার আগ্রহ দেখাল না— কারণ মানুষ গল্প ভালোবাসে, সত্য নয়।
সংসার, সন্তান, অভিমান, অপমান—সব মিলিয়ে রূপার ভিতরে তৈরি হতে লাগল অদৃশ্য শূন্যতা। তিনি ছাড়লেন অভিনয়। বন্ধ হল তাঁর অভিনয় স্কুল।
জীবন নিত্য নিয়মে একাকীত্বে চলতে থাকে। কিন্তু সংসার চালাতে টাকা লাগে। আর টাকা আসছিল না। মানুষের পেট যখন ক্ষুধায় ডাকে, নীতি তখন ঠান্ডা হয়ে আসে।
রূপা প্রথম দিন যখন ব্যস্ত বাজারের দোকানে কাউকে ফেলে রাখা ব্যাগের দিকে তাকালেন, তাঁর ভিতরটা দুমড়ে গেল। এটা তাঁর কাজ নয়। কিন্তু ভয়, অপমান, অভাব, অবহেলার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তাকে টেনে নিল অন্যপথে।একদিন… দুইদিন…
ধীরে ধীরে ভবিষ্যতের আলো নিভে গেল, আর ছায়া-র পথ হয়ে উঠল সহজ। মানুষ দেখল তিনি হাসছেন।
কেউ জানল না তিনি কতখানি ভেঙে পড়েছেন।
সেই দিন পোস্তার দোকানে ঘটনাটা ঘটল। তিনি সবসময় নিখুঁত ছিলেন, দ্রুত ছিলেন। কিন্তু ভুলের জন্ম হয় তখনই, যখন মন থাকে অস্থির।
সিসিটিভিতে ধরা পড়লেন তিনি। বড়বাজারে রাতের অন্ধকারে পুলিশ তাঁকে আটকাল। প্রথমে অস্বীকার।তারপর প্রশ্নের পর প্রশ্ন বাড়তে থাকে। তারপর বাড়ি থেকে উদ্ধার হল সোনা। তারপর নিঃশব্দে ভেঙে পড়া।
জেরায় রূপার কণ্ঠ ছিল কর্কশ— “আমি জানি এটা অপরাধ। কিন্তু তুমি জানো কি ? অপরাধ কখনোই আচমকা জন্মায় না— ওটা জন্মায় দীর্ঘ অবহেলা, বঞ্চনা, দুঃখ আর ফুরিয়ে যাওয়া স্বপ্নের ভিতর থেকে।”
তার চোখ তখন শুকনো। কারণ কাঁদার জল তো আগেই ফুরিয়ে গেছে।
আদালতের বারান্দায় যখন তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো, সাংবাদিকেরা ভিড় করল। ফ্ল্যাশের আলো পড়ল তাঁর মুখে। কিন্তু সেই আলো আর্টিস্টের আলো নয়, ওটা আত্মসমর্পণের আলো।
এক বৃদ্ধা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখছিলেন। চেনেন না। তবু বললেন—
“মানুষ ভুল করেই জীবনকে শেখে।”
রূপা মাথা তুললেন। কানে যেন ধ্বনি বাজল—
তার পুরনো থিয়েটার শিক্ষকের কণ্ঠ—
“মঞ্চের আলো টিমটিম করলে থেমে যাস না রূপা—
কারণ আলো নিভে গেলে অভিনয়টাই আসল।”
আজ তাঁর সামনে মঞ্চ নেই, দর্শক নেই। তবু জীবন তাঁকে দ্বিতীয় অভিনয়ের সুযোগ দিচ্ছে।
সে হয়তো আর পর্দায় ফিরবেন না। হয়তো সমাজ তাকে ক্ষমা করবে না।
কিন্তু…
একজন মানুষ যদি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে—
তবে সে কখনোই শেষ হয়ে যায় না। রূপার গল্পও এখানেই শেষ নয়। এখনো নয়। কখনো নয়। এই গল্পের শেষ হয়তো, তার জীবনে নতুন শুরু…)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *