মাধব
বিশ্বকর্মা পূজা থেকে লক্ষ্মী পূজা পর্যন্ত শ্বাস ফেলার অবসর থাকে না মাধবের, তারপরের দিন গুলো তো এখানে ওখানে জন খেটে রোজগারের চেষ্টা করতে হয়।
গাঁয়ের অনেকেই এখন ভিন রাজ্যে গিয়ে কাজ করছে। ওখানে রোজগারটা ভালো হয়।
মাধবকে ওর বন্ধু অনন্ত বলেছিল -‘দেখ, এই মূর্তি গড়ে তোর ক টাকাই বা রোজগার হয়! তুইও চল না আমার সঙ্গে,কতজনই তো যাচ্ছে।’ যেতে চায় না মাধব। মূর্তি গড়ার মধ্যে আশ্চর্য একটা ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করে মাধবের বুকের মধ্যে, এ কাজটি শুধুমাত্র তার রোজগারের রাস্তা তা নয়। এটি তার ভালোলাগা,ভালোবাসা! ঠাকুর দালানে বারান্দার একপাশে মূর্তি গড়ার কাজ করে মাধব, দুর্গা পূজার দিন যত এগিয়ে আসতে থাকে ততই তৎপরতা বাড়তে থাকে।
…উৎসাহ আর উদ্দীপনায় নাওয়া খাওয়া ভুলে কাজ করে যাচ্ছে সেই সকাল থেকে। দুপুরে জোর ঝড় উঠেছিল। বাইরের দিকে বৃষ্টির জলের ছিটে আড়াল করার জন্য চটের বস্তাটা বাঁশ দিয়ে ঠেকনা দেওয়া ছিল। ঝড়ের টানে ছিঁড়ে গেল, বস্তাটার দোষ কী ! কম দিন তো হলোনা।
সেই কখন লাইন গেছে,কুপি জ্বেলে কাজ করছে মাধব। কাজ খুব একটা বেশি বাকি নেই ঠিকই কিন্তু শেষ পর্যায়ের কাজটিই তো আসল! মায়ের রূপটি মায়ের মতো হবে তবেই না।
চোখের কোণে ঠোঁটের হাসিতে মায়ের স্নেহ ঝরে ঝরে পড়বে তবেই না! সবাই বলে মাধবের হাতে মায়ের মাতৃরূপটি যেমন ফুটে ওঠে তেমনটি আর কারো নয়।
বাইরে ঘন অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। আজ রাতের মধ্যেই কমপ্লিট করতে হবে। হয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছে। কুপির আলোটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিভে যাবেনা তো!
সব হয়ে গেছে, মায়ের চোখের সামনে তুলিটা নিয়ে শেষ টান দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মাধব।
চোখের দৃষ্টিতে করুণাঘন ভাবটি ফুটিয়ে তুলতে থাকে একমনে।
…একী কি দেখছে মাধব! চোখ দুটো ধুতির খুঁট দিয়ে ভালো করে মুছে নিয়ে তাকিয়ে দেখে। মায়ের চোখ দিয়ে যেন টপটপ করে জল ঝরে পড়ছে। বুকের ভেতরে শির শিরানি ভাবটি জেগে ওঠে, করজোড়ে প্রণাম করে বলে,- ‘আসছে বছরও যেন তোর মূর্তি গড়তে পারি মা!’
পেটে খিদেটা পাক দিয়ে উঠতেই মাধবের মনে পড়লো সেই সকালের পর আর খাওয়া হয়নি তার। মনে পড়লো ছোট মেয়েটা বলেছিল, ‘বাবা বিকেলে আমাকে ফুচকা খাওয়াতে নিয়ে যাবে?’
…তাড়াতাড়ি দরদালান থেকে নেমে আসে সে, কোনদিকে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ীর দিকে হাঁটতে থাকে। ছুটকিটা এতক্ষণে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েই পড়েছে বোধহয়!
