Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » মন নাকি শরীর || Swarup Kayal

মন নাকি শরীর || Swarup Kayal

কলকাতার এক জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠান— “অন্তর্যামী”। প্রতি শনিবার রাত দশটায় সরাসরি সম্প্রচার। অনুষ্ঠানের দুই সঞ্চালক ঈশা ও রুশা। দু’জনই বহু বছর ধরে মানুষের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের গল্প শুনে আসছে। তবে ঈশা ও রুশা, দু’জনের প্রেম সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
ঈশা বিশ্বাস করতো—
“প্রেম মানে আত্মার স্পর্শ। মন যদি না জড়ায়, শরীরের কাছে যাওয়া অর্থহীন।”
রুশা বলতো—
“শরীরও প্রেমের ভাষা। মন যেমন বাঁধন, শরীর তেমনই তার স্পন্দন।”
বিরোধ থাকলেও দুজন ছিল খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেদিনের অতিথি ছিল দুইজন— জনপ্রিয় থিয়েটার অভিনেত্রী অমৃতা এবং খ্যাতনামা সম্পর্ক-বিশ্লেষক সৌরেন সেন।
এবং সেইদিনের পর্বের মূল আলোচ্য ছিল—
“প্রেমে মন নাকি শরীর—কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?”
অনুষ্ঠান শুরু হতেই ঈশা মাইক অন করে বলল—
“প্রেম কি শুধু মন দিয়ে হয়, নাকি শরীরেরও একটি অবিচ্ছেদ্য দাবি আছে—আজ আমরা সে নিয়েই কথা বলবো।”
রুশা হাসল। তার হাসিতে বিদ্রুপের মৃদু শিহরণ।
“প্রেম মানে শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকা নয়, স্পর্শের উষ্ণতা, নিশ্বাসের সঙ্গমও প্রেমের অংশ।” – রুশা বলল।
অমৃতা নিজের অভিজ্ঞতা খুব শান্ত কণ্ঠে বললেন—
“আমি একবার একজনকে ভীষণ ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু সে আমাকে কখনো ছুঁয়েও দেখেনি। তবুও আমি অনুভব করেছি, আমি তার ছিলাম পুরোপুরি।”
ঈশা গর্বের সঙ্গে মাথা নাড়ল। কিন্তু সৌরেন মৃদু হাসল।
“প্রেমে মনই সব? শরীর কি তাহলে পাপ? শরীরও তো ভালোবাসার ঘর।” এবার ঈশা স্পষ্ট বিরক্ত। “শরীর ভুল করতে পারে, কিন্তু মন যদি নিজের থাকে—তবে সেটা প্রতারণা নয়।” রুশা সাথে সাথে সমর্থন করল—
“ঠিক তাই। মনটাই মূল। শরীর অনেক সময় কেবল মুহূর্তের দুর্বলতা।”
স্টুডিওর পরিবেশ বেশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠল। ঠিক তখন ফোনে যুক্ত হলেন এক নতুন কণ্ঠ—
আনন্দী নামের এক যুবতী।
“হ্যালো… আমি আনন্দী।” তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
“আমি আমার প্রেমিক অয়নের সঙ্গে পাঁচ বছর ধরে সম্পর্কে আছি। আমরা দুজনই একে অপরের সব। মন, আবেগ, ভবিষ্যৎ—সব ভাগ করে নিই। কিন্তু… একদিন জেনে গেলাম সে অন্য একজনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে।”
স্টুডিও নিস্তব্ধ।
রুশা জিজ্ঞেস করল—
“তোমার মনে হয়, সে তোমাকে আর ভালোবাসে না?”
“না…” —আনন্দী নিঃশ্বাস নিল—
“আমি জানি সে আমাকে ভালোবাসে। এখনও। কিন্তু আমি জানি আমিও তাকে ভালোবাসি। তবুও আমি প্রতারিত বোধ করি। কারণ প্রেম মানে শুধু মন নয়, শরীরও তো প্রতিজ্ঞা!”
ঈশা স্থির হয়ে বসে রইল। রুশার চোখে জটিল অনুভূতির ঝড়। সৌরেন এবার খুব নরম স্বরে বলল—
“প্রেম কখনোই শুধু এক দিক নয়। মন রেখেও মানুষ ভুল করতে পারে। শরীর দিয়েও মানুষ সম্পর্ক গড়তে পারে না। প্রতারণা আসলে তখনই হয়—যখন একজন অন্যজনের অনুভূতিকে উপেক্ষা করে।”
অমৃতা শান্ত কণ্ঠে বললেন— “প্রেম মানে কারো কাছে ফিরে আসার ঠিকানা। যদি সেই ঠিকানাটি বদলে যায়—তাহলেই প্রতারণা।”
আলোচনার শেষের দিকে ঈশার চোখ দুটি অদ্ভুত ভেজা।
রুশা ধীরে জিজ্ঞেস করল— “তোর কিছু বলার আছে?”
ঈশা প্রথমে চুপ রইল। তারপর ধীরে বলল— “আমার স্বামী অর্ক তিন বছর আগে অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিল। আমি তাকে ক্ষমা করেছিলাম, কারণ আমি বিশ্বাস করতাম—তার মন আমার সঙ্গেই ছিল।”
রুশা কাঁধে হাত রাখল। ঈশার কণ্ঠ আরও ভেঙে এল—
“কিন্তু আজ বুঝতে পারছি—সে দিন আমার হৃদয় ভেঙেছিল শরীর নয়। কারণ আমি তাকে হারাইনি, আমিই হারিয়ে গিয়েছিলাম।”
স্টুডিওর ভেতর যেন শীতল নীরবতা নেমে এলো।
ঈশা ধীরে বলল— “প্রেমে মন ও শরীর—দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।
একটির অভাব হলে প্রেম অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। মন ভালোবাসার শিকড়, আর শরীর তার ফুল। একটি ছাড়া অন্যটি বাঁচে কি?”
রুশা ধীরে মাথা নাড়ল।
“হয়তো আমরা দু’জনে ভুল করছিলাম। হয়তো প্রেম মানে দুই দিক থেকেই অঙ্গীকার।”
মাইক্রোফোনের সামনে চারজন মানুষ নিশ্চুপ।
আলোচনার পর্ব শেষ।
কিন্তু প্রত্যেকের ভেতরে একটি অদৃশ্য দরজা খুলে গেছে।
প্রেমের সংজ্ঞা এক নয়, দুই নয়, একাধিক ।
প্রতিটি মানুষের জন্য প্রেমের রঙ ভিন্ন।
কখনও মনই সব। কখনও শরীরই সত্য। কিন্তু অধিকাংশ সময়— প্রেম বেঁচে থাকে যখন মন এবং শরীর দু’টোই এক সাথে থাকে।
প্রেম কঠিন। কিন্তু তার সত্যতা আরও কঠিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *